দ্বিতীয় পাঠ ➤ অসুখী একজন

 

  • এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো যুদ্ধ এল, আর তাতেই সমতলে আগুন ধরে গেল।
  • যুদ্ধের আগুন ধ্বংসাত্মক। তাই ভেঙে পড়ল মন্দির। টুকরোটুকরো হয়ে গেল শান্ত হলুদ দেবতাদের পাথরের মূর্তি। পুড়ে গেলস্বপ্নের ঘরবাড়ি, সাধের বাগান, গোলাপি গাছ, চিমনি আর প্রাচীন জলতরঙ্গ | বলা যায় সবকিছুই চুরমার হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে। যেখানে শহর ছিল সেখানে পড়ে রইল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর কবধ পাথরের মূর্তির মাথা।

  • যুদ্ধ হলে সমাজের স্থিরতার অবসান ঘটে। যুদ্ধ হল রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো, যাতে শিশুমৃত্যু ঘটে, মানুষ নিরাশ্রয় হয়। সমতলে যেন আগুন ধরে যায়। এই অবস্থায় যে ঈশ্বরেরা হাজার বছর ধরে মন্দিরে ধ্যানমগ্ন ছিল তারাও ভেঙে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে। তাদের স্বপ্ন দেখা, বিশ্ববিধানকে নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদির শেষ। হয়। এ আসলে ঈশ্বরের ভেঙে পড়া নয়, ঐশ্বরিকতার বা মানুষের ঈশ্বরবিশ্বাসের ভেঙে পড়া।

  • বিপ্লবের পথ আসলে যুদ্ধের পথ। এ হল স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সমাজ পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ। তাই সাম্রাজ্যবাদী হোক বা শোষক শক্তি—প্রত্যাঘাত করে। সেই প্রবল লড়াইয়ে ভেঙে পড়ে সেই সুন্দর বাড়ি, যেখানে কবিতার বিপ্লবী মানুষটি একদিন থাকতেন, সেই বারান্দা যেখানে তিনি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমাতেন, কিংবা গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ ইত্যাদি। যুদ্ধের তাণ্ডবের অনিবার্যতায় সব কিছুই ভেঙে পড়ে, চূর্ণ হয়ে যায়।

  • যে-কোনো যুদ্ধই আসলে ধ্বংসকে বহন করে আনে | জনজীবন বিনষ্ট হয়ে যায়। যেখানে একদিন শহর ছিল, সেখানে পড়ে থাকে শুধু কাঠকয়লা, যেন ধ্বংসস্তূপের সাক্ষ্য হয়ে। দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা ইত্যাদি যেন ধ্বংসের চিহ্ন হয়ে থাকে। আর রক্তের কালো দাগ হত্যা, হিংসা, রক্তাক্ততার কাহিনিকে স্পষ্ট করে দেয় | সমাজে অত্যাচারী শাসক শক্তির নিজেকে রক্ষার তাগিদ এই রক্তপাত ঘটায়।

  • c‘অসুখী একজন’ কবিতার প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে একটা শহরের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। শান্ত সমাহিত পরিবেশে যুদ্ধ অস্থিরতা আর ধ্বংসকে আবাহন করে আনে। ঠিক তেমনই এক যুদ্ধে একটা শহর পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। চারিদিকে শুধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা। এভাবেই যুদ্ধের তাণ্ডবে আস্ত একটা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

পাবলো নেরুদা-র ‘অসুখী একজন’ কবিতায় বিপ্লবেরআহবানে ঘর ছেড়েছিলেন। কবির প্রিয়তমা অপেক্ষা করেছিলেন যে, একদিন কবি ফিরে আসবেন। অপেক্ষার প্রহর কিন্তু শেষ হয়। না। বৃষ্টির জলে একসময় ধুয়ে যায় কবির পায়ের ছাপ। রাস্তা ঢেকে যায় ঘাসে। বছরের পর বছর এভাবে কেটে যাওয়ার পরে একসময় প্রযুক্তির কাল পেরিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। তারপর' কথাটির দ্বারা এই সময়কেই বোঝানো হয়েছে।

  • প্রস্তুতির কাল পেরিয়ে যখন যথার্থই মুক্তির লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু হয় সে যুদ্ধ আসে রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো। শিশুরাও সে হত্যালীলা থেকে রেহাই পায় না, মানুষের বসতি ধ্বংস হয় | আগুন লেগে যায় সমতলে। যেসব দেবতারা মন্দিরে ধ্যানমগ্ন ছিল হাজার বছর ধরে—তারা উলটে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অর্থাৎ ধ্বংস আর বিশ্বাসের ফাটল একইসঙ্গে ঘটে। যে সুন্দর বাড়িতে একদা কবি থাকতেন, বারান্দার যে ঝুলন্ত বিছানায় তিনি ঘুমাতেন এবং তার পুরোনো স্মৃতির সব আশ্রয় একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় যুদ্ধের তাণ্ডবে। শহর রূপান্তরিত হয় ধ্বংসস্তূপে। কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা যেন ধ্বংসের প্রতীক হয়ে উকি দেয়। আর রক্তের কালো দাগ প্রামাণ্যতা দেয় সেই হত্যালীলা ও ধ্বংসস্তূপের। এভাবেই যুদ্ধ আসে সর্বগ্রাসী চরিত্র নিয়ে।

  • পাবলো নেরুদার Extravagaria গ্রন্থের একটি কবিতার নবারুপ ভট্টাচার্যের করা অনুবাদ ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চিরজীবী ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ কবির কাছে রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো। শিশুহত্যা, নিরাশ্রয়তা—যুদ্ধের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে দেয়। মারণ যুদ্ধের স্পর্শে ছারখার হয়ে যায় পৃথিবী | প্রলয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যায় সব কিছু। যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ হয়ে যায় চারপাশ। মন্দিরের ভিতরে প্রতিমার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরের ঈশ্বরত্বও ধবংস হয়। যুদ্ধের নির্বিকার ধ্বংসে লুপ্ত হয়ে যায় কবির স্মৃতি। তার ফেলে আসা সুন্দর বাড়ি, সেই বারান্দা যেখানে তিনি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমাতেন, গোলাপি গাছ, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ অর্থাৎ যা কিছু ছিল কবির ফেলে আসা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জীবনের স্মৃতি সবই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। যুদ্ধ শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি বা জীবনহানি নয়, যুদ্ধ মানবিক বিপর্যয়ও। মানুষের স্মৃতির সঞ্চয়কেও সে শূন্য করে তোলে। যেসব জিনিসকে আশ্রয় করে অনুভূতির বিস্তার ঘটে সেগুলি যুদ্ধের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়। ঘরছাড়া একজন বিপ্লবীর মধ্যেও পুরোনো ফেলে আসা দিনের জন্য যে আবেগ কাজ করে, তা এই গোপন দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায়।