দ্বিতীয় পাঠ

উঃ-প্রবাসে থাকাকালীন ভাগ্যের পরিহাসে কবি তাঁর মৃত্যু ঘটার প্রসঙ্গ এনেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য ভাগ্যের পরিহাসে যদি তাঁর জীবনতারা দেহ-আকাশ থেকে খসে যায়, তবু তিনি সেজন্য দুঃখ করবেন না।

উঃ-‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি বলতে চেয়েছেন মানুষ জন্মগ্রহণ করলে তাকে একদিন মরতেই হয়, কেউই অমর নয়। যেমন জীবনরূপ নদীতে জল কখনও স্থির হয়ে থাকে না, তেমনি মানুষের জীবনও যে-কোনো দিন শেষ হয়ে যেতে পারে।

উঃ-‘বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতাটিতে কবি জন্মভূমির প্রতি তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। মাতৃরূপিণী শ্যামা-জন্মদে-র কাছে সেই অমরতা প্রার্থনা করেছেন, যে অমরতা ধরা থাকে মানবমনে। কবির অমরতা হল মানুষ যেন তাঁকে না ভোলে, মনের মন্দিরে সর্বদা ধরে রাখে।

উঃ-কবি মধুসূদন মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে, স্বদেশ ত্যাগ করে, বিদেশে গিয়েছিলেন বিদেশি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে খ্যাতিমান হবেন বলে। মনের এই সাধকেই ‘ভুল দোষ’ বলা হয়েছে। আর কাব্য-নাটক রচনা করে তিনি যে বঙ্গভূমির সেবা করতে চান, তাকে ‘গুণ’ বলে প্রচার করেছেন।

উঃ-‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতাটি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা।

কবি তাঁর প্রবাসজীবনে ব্যথাভরা মন নিয়ে বঙ্গভূমিকে আন্তরিকভাবে স্মরণ করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, মা-এর স্নেহচ্ছায়া থেকে তিনি দূরে চলে এসেছেন বলে মা বুঝি তাঁকে ভুলে গেছেন। তাই তিনি মা-এর কাছে আত্মনিবেদনের মাধ্যমে করুণ মিনতি জানিয়েছেন। তাঁর এই মিনতিটি হল—মা যেন তাঁর মাতৃদাস এই সন্তানকে ভুলে না যান। মনের সাধ সাধন করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল তাঁর হয়ে থাকে, তবু মায়ের মন যেন কখনও মধুহীন না হয়।

উঃ-কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত একদা স্বেচ্ছায় প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছিলেন। ফ্রান্সে যাওয়ার আগে তিনি বঙ্গভূমির প্রতি এক অকৃত্রিম টান বা আকর্ষণ অনুভব করেন। তারই অনিবার্য ছাপ লক্ষ করা যায় এই কবিতায়। তিনি বলেন—দৈব অনুগ্রহে প্রবাসে যদি তাঁর মৃত্যু হয়, তবে তার জন্য তাঁর কোনো খেদ থাকবে না। কারণ জন্ম হলে মৃত্যু ঘটবেই। কেউই এই পৃথিবীতে অমর নয়।

উঃ-মৃত্যু যে অনিবার্য তা বোঝাতে কবি প্রথমে বলেছেন—

জীবননদীর জল কখনোই স্থির নয়—

‘চিরস্থির করে নীর,    হায় রে, জীবন-নদে'?

অন্যদিকে কবি বলেছেন—কোনো মাছি যদি অমৃতে পড়ে,তবুও অমৃতের সঞ্জীবনী গুণ তাকে অমরতা দেয় না, পরিবর্তে তার মৃত্যু হয়—‘মক্ষিকাও গলে না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে !’

উঃ-‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতায় কবি দেশমাতৃকার কাছে তাঁর মনোগত অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। কবি বলেছেন—তিনি যদিও যথেষ্ট গুণের অধিকারী নন, তবুও অমরতার প্রতি তাঁর আসক্তি আছে। সেই অমরতা হল–লোকে যেন তাঁকে না ভোলে, মনের মন্দিরে তাঁকে ধরে রাখে এবং স্মরণ করে।

উঃ- ‘বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতায় দেশ মায়ের কাছে অমরতা চাইতে গিয়ে কবি মনে করেছেন তাঁর তেমন গুণ নেই, তবে মা যদি দয়া করে তাঁর ভুল-দোষগুলিকে গুণ বলে ধরেন, তবে তাঁকে বর দান করতে পারেন। যেহেতু মা সুবরদাত্রী, তাই সে বর অবশ্যই অমরতার বর, যে অমরতার অর্থ সৃষ্টির জন্য জনমানসে বেঁচে থাকা। কবি মায়ের কাছে এই বর প্রত্যাশা করেছেন।

উঃ-কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘বঙ্গভূমি’ কবিতায় ‘সুবরদে’ বলে মাতৃভূমি বঙ্গদেশকে বুঝিয়েছেন।

মাতৃভূমির কাছে কবি অমর হওয়ার বর চেয়েছেন।

কবি মনে করেন তিনি জীবনে বহু ভুল করেছেন। ভুল করে তিনি বহু মূল্যবান সময়, সম্পদ, শক্তি নষ্ট করেছেন। মাতৃভূমির জন্য তিনি কিছু করতে পারেননি। মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে অবহেলা করে তিনি বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তাই কবি অনুতাপে মাতৃভূমির কাছে এভাবে বর প্রার্থনা করেছেন।

উঃ-ইউরোপে থাকাকালীন ফ্রান্সে যাওয়ার পূর্বে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতাটি  রচনা করেন। এটি একটি গীতিকবিতা। এই ধরনের কবিতা হল এমন কবিতা, যেখানে কবির মনোভাবই কাব্যিক ব্যঞ্জনায় সার্থক রূপলাভ করে। প্রবাসে কবি নিজেকে বৃহত্তম কাব্যমঞ্জের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। বেশ কিছু কাব্যকবিতা ইংরেজি  ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল কবির। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম টান অনুভব করেছিলেন কবি মনের গভীরে। দেশ, দেশীয় ভাষা, দেশের সারস্বত সমাজ, সাধারণ মানুষ তাঁকে গভীরভাবে টানলেও; কবিতাটির রচনাকালে তিনি এসব কিছু থেকে ছিলেন বহুদূরে। তাই তাঁর মনের যন্ত্রণাই এই কবিতাটিতে প্রধান ভাব হিসেবে ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে। ছন্দ-অলংকার ও ভাষার সুন্দর প্রকাশে কবিতাটি তাই আধুনিক পদ্ধতিতে ভাবপ্রকাশের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে উঠেছে। কবিতার বক্তা অর্থাৎ কবি তাঁর মনের ব্যক্তিগত ভাবকেই কবিতায় বড়ো করে স্থান করে দিয়েছেন, আর এতেই কবিতাটি সার্থক হয়ে উঠেছে।

উঃ-আধুনিক যুগের মহাকাব্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতাটি একটি গীতিকবিতা। কবিতায় প্রবাসে থাকাকালীন কবির দেশের প্রতি আন্তরিক টান ও ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে। কবি তখন ইউরোপে, ফ্রান্সে যাওয়ার পূর্বে যখন তিনি এই কবিতা রচনা করেন, তখন তাঁর মনে প্রবল আবেগ দেশকে নিয়ে। তাই এই কবিতায় দেশকে মা সম্বোধন করে তিনি বলেন—মা যেন তাঁকে মনে রাখেন, মনের সাধ সাধন করতে গিয়ে যদি তিনি কোনো ভুল করে থাকেন, তবুও মা যেন তাঁর মনকুসুমকে মধুহীন না করেন। দেশমাতৃকাকে ভুলে তিনি যে প্রবাসী হয়েছেন—এই দুঃখ থেকে তিনি বলেন—ভাগ্যের বশে প্রবাসে যদি তাঁর মৃত্যুও হয়, তাতে তাঁর কোনো খেদ নেই; কারণ তিনি জানেন, জন্ম নিলে একদিন মরতেই হয়। কেউই অমর নয়। মা যদি সন্তানকে মনে রাখেন, তবে তিনি যমকেও ভয় পান না। অবশেষে কবি বলেন—তাঁর তেমন কোনো গুণ নেই যা দিয়ে তিনি মা-এর কাছে অমরতা চাইতে পারেন। তবে মা যেহেতু সুবরদাত্রী, তাই তিনি যদি একান্তই কোনো বর দান করেন, তা যেন হয় দেশের মানুষের মনে চিরকালীন হয়ে বেঁচে থাকা। এইভাবেই কবি দেশমাতা তথা বঙ্গভূমির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেছেন।

উঃ-মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘প্রভাতবর্ণন' কবিতার অংশ।

কবিতাটি কবির ‘শিশুশিক্ষা’ (প্রথম ভাগ) গ্রন্থে আছে।

উঃ-শৈশবে পাঠশালায় পড়া এই পঙ্‌ক্তি মন্ত্রের ছন্দের মতোই পবিত্র বাক্য মনে হয়েছে কবির। মন্ত্র যেমন বার বার উচ্চারিত হয়, এই পঙ্‌ক্তিটিও তেমনি দুলে দুলে পাঠ করা হয়।

উঃ-এই সুর কবির শৈশবের মধুর স্মৃতিগুলিকে জাগিয়ে দেয়, তাই একে ‘স্মৃতির মধুভাণ্ডার’ বলা হয়েছে।       এই সুর কবির মনে তাঁর দেশ-মাঠ-বন-নদী, দেশের জারি- সারি-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি গান এবং মায়ের মুখ মনে করিয়ে দেয়।

উঃ-অরণ্য—সুন্দরবন, জলদাপাড়া, গোরুমারা, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোলা ও মধুমতি।

নদী–গঙ্গা, পদ্মা, তিস্তা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা।

উঃ-জারি : ফারসি শব্দ, ‘জারী’ বা ‘যারী’ থেকে এই শব্দটি এসেছে। এটি বাংলার মুসলমানি পল্লিগীতিবিশেষ, যা মুসলিম শোকগাথা হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশের ইসলামধর্মী লোকশিল্পীরা কারবালার প্রান্তরে হাসান-হোসেনের শোকাবহ মৃত্যুকে স্মরণ করে উদাও কণ্ঠে এই পল্লিগান গেয়ে থাকেন।

সারি : তুরস্কের শব্দভাণ্ডার তথা তুর্কি শব্দ থেকে বাংলায় শব্দটির আগমন। এটিও বাংলাদেশের একপ্রকার লোকগীতি, মূলত মাঝিমাল্লাদের গান। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গের মাঝিমাল্লারা নদীর খোলামেলা পরিবেশে সুরেলা কণ্ঠে দ্রুত ছন্দের এই গান গেয়ে। থাকেন। এই বীররসের গান সমবেত কণ্ঠেও ধ্বনিত হতে দেখা যায়।

ভাটিয়ালি : ‘ভাটিয়ালি’ শব্দটি যে অর্থ বহন করে আনে, তা আসলে সুর। ভাটার টানে নৌকো ভাসিয়ে বিশেষ রাগণীতে এই সুর মাঝিমাল্লাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। এটি বাংলার লোকসংস্কৃতিতে এক বিশেষত্বময় এমন এক সুরের প্রবাহ, যা সকল মানুষকে মুগ্ধ করে।

মুর্শিদি : মুসলমান সাধক সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বলা হয় পির। ‘মুর্শিদি’ হল সেই পিরদের গান। এই গানে থাকে বাস্তবতা। সংকেতের মাধ্যমে দেহতত্ত্বকে এই গানে প্রকাশ করা হয়, থাকে লৌকিক উপমা। সব মিলিয়ে এই গানকেও পল্লিগীতি বলা হয়।

উঃ-আমার জানা দুটি পৃথক লোকসংগীত ধারার নাম হল—লালনগীতি, ঝুমুর গান।

উঃ-একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মৃত শহিদদের কথা এবং বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার জন্য মানুষের প্রতিবাদের কথা লিখে নিল ইতিহাস।

উঃ-বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে, গান গায় – সেইসব মানুষদেরকে ‘সহস্র পাখি’ বলা হয়েছে।

উঃ-উৎস : উদ্ধৃতাংশটি কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘একুশের কবিতা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ : মাতৃভাষা বাংলার জন্য ভাষা-শহিদদের স্মরণ করে কবি এই উক্তি করেছেন।

তাৎপর্য : ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারি খান সেনাদের গুলিতে যে পাঁচজন তাজা তরুণ প্রাণ হারায়, তাদের কবি ‘পাখি’ বলেছেন। তারাই ঝরে গেছে অকালে ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিয়ে।

উঃ-উৎস : উদ্ধৃতাংশটি কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘একুশের কবিতা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ : মাতৃভাষা বাংলার জন্য যাঁরা শহিদ হয়েছিলেন, তাদের কথা উল্লেখ করতে গিয়েই কবি এ কথা বলেছেন।

তাৎপর্য : ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে পাঁচজন তাজা-তরুণ প্রাণ ঝরে পড়ে ঢাকার রাজপথে। কেঁপে ওঠে মাঠ-ঘাট-বাট-হাট-বন-মন। সমস্ত দেশ জুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। গণ-আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এই গণ-আন্দোলনকেই কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

উঃ-উৎস : উদ্ধৃতাংশটি কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘একুশের কবিতা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ : মা, যিনি বাংলা ভাষায় কথা বলতে ভালোবাসেন তিনি কথায় কথায় কথকতা করেন এবং রুপকথা বলেন।

তাৎপর্য : আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা। আমাদের মা বাংলা ভাষাতেই আমাদের কথকতা রূপকথা আর ছড়া শোনান। মায়ের ভাষা আমাদের মাতৃভাষা।

উঃ-উৎস : উদ্ধৃতাংশটি কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘একুশের কবিতা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ : মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য সবার সঙ্গে মা-ও এসে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তিনিও বাংলা ভাষায় কথা বলেন।

তাৎপর্য : মাতৃভাষা মায়ের মুখের ভাষা। মুখের ভাষা প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো দেশের জাগরণ সম্ভব নয়। তাই মিছিলে মা এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

উঃ-‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল।'—এই পঙ্‌ক্তিতে ‘পাখি’ শব্দটিকে কবি রুপক হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। পাখির প্রথম কলকাকলিতে রাত শেষ হয়। দেশের কিশোর তরুণ জেগে উঠলে শেষ হয় অন্যায়ের রাত। ভাষা-আন্দোলনে এরকমই তরতাজা যুবকরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। তাই কবি লিখেছেন—‘কয়েকটি পাখির গান শেষ না হতেই তারা ঝরে গেলো,' কিন্তু ইতিহাস তা লিখে নিয়েছিল। তাই সারা বিশ্ব পরবর্তীকালেও মাতৃভাষা ও তার সম্মান নিয়ে মুখরিত হয়েছে। তাই কবি লিখেছেন—

‘সহস্র পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর'।

উঃ-বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘একুশের কবিতা’-র মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অত্যুজ্জ্বল ইতিহাসকথা। অধুনা বাংলাদেশের মাতৃভাষাপ্রেমী ভাষা-আন্দোলনকারীদের প্রিয় ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিকথা। আশ্চর্য সংযমে কবি সারা কবিতার কোথাও একটিবারের জন্য ‘একুশে’শব্দটি উচ্চারণ করেননি, অথচ সমগ্র কবিতাটির অঙ্গে তিনি শৈল্পিক দক্ষতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন একুশের ভাষা আন্দোলনের প্রলেপ। 'একুশের কবিতা’র মধ্যে ধরা আছে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ইতিহাস, যার মূলে রয়েছে মাতৃভাষার মর্যাদা ও ঐতিহ্যরক্ষার আত্মিক প্রচেষ্টা। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে দ্বিখণ্ডিত ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর পূর্ববঙ্গের অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা ভাষার উপর উর্দুকে বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। আন্দোলনের জোয়ার বয়ে যায় পূর্ববঙ্গে। মিছিলের উপর সেনাদের গুলিবর্ষণে পাঁচ মাতৃভাষাপ্রেমিক তরুণের মৃত্যু হলে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গের মানুষ। মাতৃভাষাকেন্দ্রিক এই গণ-আন্দোলনের সূচনা হয় ২১ ফেব্রুয়ারিতেই। এই আন্দোলনে বিজয়ী হন আন্দোলনকারীরা, জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের, জয় হয় বাংলা ভাষার। এই আন্দোলন, এই মরণপণ লড়াই, এই বিজয়ের স্মরণেই ‘একুশের কবিতা’। স্বভাবতই কবিতায় একুশে শব্দটির অস্তিত্ব ধরা না পড়লেও নামকরণে কবি একুশে শব্দটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রয়োগ করতে ভোলেননি। নামকরণটি তাই সার্থক।

উঃ-সুরের সঙ্গে মিশে আছে কবির মায়ের মুখ, মায়ের গাওয়া কত না গানের কলি।

উঃ-আকাশে কালবৈশাখীর ঝড় উঠলে মাঠ, ঘাট, বাট, হাট, বন, মন কাঁপলো।

উঃ-মা বাংলা ভাষায় কথা বলতে ভালোবাসেন। তিনি কথায় কথায় কথকতা, রূপকথা, আর ছড়ার ছন্দে মিষ্টি সুরের ফুল ছড়ান।

উঃ-বিশিষ্ট কবি আশরাফ সিদ্দিকী তাঁর ‘একুশের কবিতা’-র প্রথম ও শেষাংশে বিদ্যাসাগর-সতীর্থ মদনমোহন তর্কালঙ্কারের তিন-ভাগে বিভক্ত শিশুপাঠ্য ‘শিশুশিক্ষা’ বইয়ের ‘প্রভাতবর্ণন’ কবিতায় অংশবিশেষ ব্যবহার করেছেন। কবি বঙ্গভাষী, তিনি জানেন প্রায় সব শিশুকেই ‘প্রভাতবর্ণন’-এর মতো এমন মনোমুগ্ধকর শিশু-কবিতা পড়তে হয়। ভাষাশিক্ষায় প্রবেশের এ এক চিরায়ত পথ৷ ‘প্রভাতবর্ণন’ কবিতা পড়ার মধুময় স্মৃতি কবির মনকে তাঁর আলোচ্য কবিতা রচনার কাল পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তাই ভাষার আত্মীয়তা ও ভাষার ঐতিহ্য বোঝাতেই তিনি এই কবিতার বিশেষ অংশ নিজের কবিতায় ব্যবহার করেছেন।

উঃ-‘একুশের কবিতা’ কবি আশরাফ সিদ্দিকীর এমন একটি কবিতা, যেখানে তিনি তাঁর বঙ্গপ্রীতি ও মাতৃভাষাপ্রীতিকে একসূত্রে গ্রথিত করে দেখেছেন। স্বভাবতই কবিতায় বঙ্গজননীই ‘আমার মা’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তাই তিনি মাতৃকণ্ঠে মাতৃভাষায় উচ্চারিত পল্লিসংগীত ও আরও কত সুরের সঙ্গে মায়ের মুখকে মিশে থাকতে দেখেন। বাংলা শব্দে কোমল উচ্চারণের মধ্যে ‘আমার মায়ের গাওয়া কত না গানের কলি’ অনুভব করেন। ভাষা-আন্দোলন যখন বিজয়ে সার্থকতা পায়, তখন তিনি দেখেন বিজয়-মিছিলে পা মেলানো আমার মা-কে, যিনি মাতৃভাষায় কথা বলতে বড়ো ভালোবাসেন, যিনি এখনো মিছিলে দাঁড়িয়েও গুণ গুণ করে গাইতে পারেন।

উঃ-২১ ফেব্রুয়ারির ইতিকথা আসলে এক জোরালো ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ধর্মের ভিত্তিতে দুটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়—ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের ভাগে পড়ে পূর্ববঙ্গ। পূর্ববঙ্গ পশ্চিম-পাকিস্তানের থেকে কেবল স্থানিক দূরত্বেই অবস্থিত ছিল না, দুটি স্থানের ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যেও ছিল যথেষ্ট ফারাক। তাই যখন পশ্চিম-পাকিস্তান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের উপর বাংলার বদলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপানোর চেষ্টা চালায়, তখন মাতৃভাষা প্রীতি ও ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতায় উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গ। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের স্বার্থে এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে পাকিস্তান সরকারের পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। মারা যান আব্দুস সালাম, রফিক-উদ্দিন আহমেদ, সফিউর রহমান, আবুল বরকত ও আব্দুল জব্বার নামক পাঁচ তরুণ ভাষাপ্রেমী। এঁরা ভাষা-শহিদ। এই মৃত্যু ও হিংসার রক্ত ভাষা-আন্দোলনকে দেয় গণ-আন্দোলনের জমাট রূপ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন জনপ্রজাতন্ত্রী ‘বাংলাদেশ’-এর আত্মপ্রকাশের মধ্যে এই আন্দোলন সমাপ্ত হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো (UNESCO) এই ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর মর্যাদা দান করলে বঙ্গভাষা এক বিশ্বমাত্রিক মর্যাদায় ভূষিত হয়।