নবম অধ্যায় ➤ মানচিত্র ও স্কেল

এস্কিমো, রেড ইন্ডিয়ান, মার্সাল দ্বীপবাসীদের আঁকা মানচিত্রগুলি নৃতত্ত্ববিদদের মতে প্রাচীন। সরু কাঠামোর সাথে তালপাতা দিয়ে মাছ বা শামুকের খোলা বেঁধে চার্ট তৈরি করা হত।

মানচিত্রে দুটি বিন্দুর দূরত্ব ও ভূপৃষ্ঠের ঠিক ওই দুটি বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্বের অনুপাত হল স্কেল।

যেমন— মানচিত্রে 1 সেমি দুরত্ব ভূপৃষ্ঠের 500 মিটার দূরত্বের সমান হলে মানচিত্রের স্কেল হবে 1 সেমিতে 500 মিটার

 

স্কেলের ভিত্তিতে মানচিত্র তিন প্রকার। যথা— ক্ষুদ্র স্কেল

মানচিত্র, মাঝারি স্কেল মানচিত্র ও বৃহৎ স্কেল মানচিত্র।

[1] ক্ষুদ্র স্কেলে বড়ো অঞ্চলকে ছোটো করে দেখানো যায়।

[2] একটি কাগজে সমগ্র পৃথিবী বা তার অংশকে দেখানো যায়।

[1] ছোটো অঞ্চলকে বড়ো করে দেখানো যায়। [2] আন্তর্জাতিক সাংকেতিক চিহ্নের সাহায্যে বিভিন্ন বিষয়কে

মানচিত্রে তুলে ধরা যায়।

ব্যাবিলনে। ব্যাবিলনীয়রা মানচিত্র আঁকার ক্ষেত্রে উত্তর, পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম এই চারটি দিক প্রথম ব্যবহার করেছিল।

মানচিত্র আঁকার প্রধান উপাদানগুলি হল—

স্কেল, অভিক্ষেপ, সমতলপৃষ্ঠ, বিষয়, উত্তররেখা নির্দেশ, সীমারেখা অঙ্কন প্রভৃতি।

ভগ্নাংশসূচক স্কেলে মানচিত্রে দুটি বিন্দুর দূরত্ব এবং ভূপৃষ্ঠে স্কেল 1 : 3000 অর্থাৎ মানচিত্রের 1 একক দূরত্ব ভূপৃষ্ঠের 3000 ওই দুটি বিন্দুর প্রকৃত দূরত্বের অনুপাতকে ভগ্নাংশ বা আনুপাতিকভাবে প্রকাশ করা হয়। যেমন—কোনো মানচিত্রের একক দূরত্বের সমান।

গৃহ, বাজার, নগর প্রভৃতি পরিকল্পনামতো নির্মাণের জন্য আগেই স্কেলের সাহায্যে একটি নকশা আঁকতে হয়, যা ব্লু প্রিন্ট (blue print) নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে স্কেল 1 500, 1: 1250, 1 ইণিতে ৪ ফুট প্রভৃতি হয়ে থাকে।

ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র মাঝারি স্কেল মানচিত্র। এই মানচিত্রের স্কেল 1 : 50000 থেকে 1 : 10000000 হয়ে থাকে।

ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্রে গ্রামীণ অঞ্চলের ভূমিভাগ জরিপ করে প্রতিটি জমির আকার, ক্ষেত্রফল, সীমারেখা নির্দিষ্ট দাগনম্বরসহ স্কেলের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে স্কেল সাধারণত 16 ইম্বিতে 1 মাইল হয়ে থাকে।

ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্র ভূমিরাজস্ব অফিসে জমির খাজনা আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ভূমি ব্যবহার মানচিত্র (land use map) তৈরিতে এই মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।

উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে মানচিত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—সাধারণ উদ্দেশ্যে নির্মিত মানচিত্র (যেমন—ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশের এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্মিত মানচিত্র (যেমন—সড়কপথের মানচিত্র)।

পরিমাণগত মানচিত্রে ভৌগোলিক উপাদানের পরিমাণগত দিক (রাশিতথ্যের পরিমাণের তারতম্য, উচ্চতা, ক্ষেত্রফল প্রভৃতি) প্রকাশ করা হয়। যেমন— ভারতের জনঘনত্ব

যেসব মানচিত্র বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়, সেগুলি হল বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র। যেমন—জলবায়ুগত মানচিত্র।

মানচিত্রে যখন প্রাকৃতিক বিষয়গুলি (যেমন— ভূপ্রকৃতি, নদনদী, জলবায়ু প্রভৃতি) দেখানো হয়, তখন সেগুলিকে প্রাকৃতিক মানচিত্র বলে।

যে মানচিত্রে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলিকে (যেমন— ধর্ম, ভাষা, জনসংখ্যার বণ্টন, জনঘনত্ব প্রভৃতি) উপস্থাপন করা হয়, তাকে সাংস্কৃতিক মানচিত্র বলে।

প্রকাশের মাধ্যম অনুযায়ী স্কেল তিন প্রকার। যথা— [1] বিবৃতিমূলক স্কেল (statement scale) [2] ভগ্নাংশসূচক স্কেল (representative fraction scale) [3] লৈখিক স্কেল (graphical scale) ।

বিবৃতিমূলক স্কেলে মানচিত্রে দুটি বিন্দুর দূরত্ব ও ভূমিভাগে ওই দুটি বিন্দুর প্রকৃত দূরত্বের সম্পর্ককে লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। যেমন—1 সেমিতে 2 কিমি। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে, মানচিত্রের ওপর 1 সেমি দূরত্ব ভূপৃষ্ঠে 2 কিমি দূরত্বকে নির্দেশ করছে।

সুবিধা: [1] এটি সহজ ও সরল স্কেল। তাই মানচিত্র পাঠে এই স্কেল ব্যবহার করা সুবিধাজনক। [2] এটি বিবৃতির মাধ্যমে বা কথায় লেখা হয় বলে আঁকার প্রয়োজনীয়তা নেই। [3] অঙ্কের জটিলতা বা হিসাবের কোনো জটিলতা নেই।

অসুবিধা: [1] যে ভাষায় স্কেল লেখা আছে সেই ভাষা জানা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে মানচিত্র পাঠ গ্রহণ করা অসুবিধা জনক। [2] এই স্কেলের একক পরিবর্তনের সময় জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং তা সময়সাপেক্ষ। [3] মূল মানচিত্রকে ছোটো বা বড়ো করলে আবার নতুন করে স্কেলের হিসাব করতে হয়।

সুবিধা: [1] রৈখিক স্কেল লৈখিক স্কেলের সহজতম রূপ কারণ এতে হিসাবে জটিলতা কম। [2] মানচিত্রকে ছোটো কিংবা বড়ো করলে রৈখিক স্কেলও সেই অনুপাতে ছোটো কিংবা বড়ো হয়। যার ফলে এই স্কেল মানচিত্রের দূরত্ব ও ভূমিভাগের দূরত্বের অনুপাত সঠিক রাখে। [3] মানচিত্রের ক্ষেত্রফল রৈখিক স্কেলের সাহায্যে খুব সহজেই নির্ধারণ করা যায়। [4] মানচিত্রের ছোটো দূরত্বও এই স্কেলের সাহায্যে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।

অসুবিধা: [1] স্কেল আঁকার জন্য হিসাবের যথেষ্ট জটিলতা আছে। [2] স্কেলের নকশা তৈরি ও শিরোনাম ইত্যাদি লেখা দিয়ে, একে দৃষ্টিনন্দন করতে যথেষ্ট সময় ও পরিশ্রম ব্যয় করা হয়।

মানচিত্র হল নির্দিষ্ট স্কেল ও নির্দিষ্ট অভিক্ষেপের ওপর রেখা, রং এবং বিশেষ নিয়মানুযায়ী বিশেষ সংকেতের সাহায্যে অঙ্কিত একধরনের চিত্র, যা থেকে ভূগোলের অনেক বিষয় জানা যায়। মানচিত্রের প্রয়োজনীয়তা অসীম। সেগুলি হল—
[1] সর্বজনীন : মানচিত্র কেবলমাত্র যে ভূগোলবিদদের প্রয়োজন তা নয়। মানচিত্র নানা পেশার মানুষ ব্যবহার করতে পারেন। সেকারণে মানচিত্র সর্বজনীন।
[2] ভৌগোলিকদের মূল হাতিয়ার : ভূগোলবিদদের কাছে মানচিত্র এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এর সাহায্যেই পৃথিবীর  যে-কোনো স্থানের সম্পর্কে ভৌগোলিকের ধারণা পরিষ্কার হয়।
[3] প্রশাসনিক কাজকর্ম : প্রশাসনিক নানা কাজকর্মে মানচিত্র আবশ্যিক, খাজনা সংগ্রহে মৌজা মানচিত্রের সবিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
[4] সেনাবাহিনীর কাজে : পৃথিবীর যে-কোনো স্থানের মানচিত্রের সাহায্যে সেনাবাহিনী তার পথনির্দেশ তৈরি করে। বিশেষ করে টোপো মানচিত্র এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এ ছাড়া দুর্গম স্থানে ভ্রমণকারীদের জন্য মানচিত্রই তাদের পথনির্দেশ করে।

পরিমাণবাচক মানচিত্র নানা প্রকার হয়—

[1] সমমনিরেখা মানচিত্র: সমান মানবিশিষ্ট স্থানগুলিকে যুক্ত করে যে রেখা পাওয়া যায়, তাকে সমমান রেখা মানচিত্র বলে। এই মানচিত্র নানারকমের হতে পারে— [a] সমপ্রেষ রেখা, [b] সমতাপ রেখা, [c] সমবর্ষণ রেখা, [d] সমলবণতা রেখা, [৪] সম সূর্যালোকজ্ঞাপক মানচিত্র [f] সমোন্নতি রেখা মানচিত্র ইত্যাদি।
[2] প্রতীক চিহ্নভিত্তিক মানচিত্র : আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন চিহ্ন ও প্রতীকের সাহায্যে এই মানচিত্র আঁকা হয়। এরা নানা রকমের হতে পারে - [a] বিন্দু মানচিত্র, [b] বৃত্ত মানচিত্র, [c] চক্র মানচিত্র ইত্যাদি।
[3] জ্যামিতিক মানচিত্র : এই প্রকার মানচিত্র নানা প্রকারের হতে পারে—[a] গোলক ও উপবৃত্ত মানচিত্র [b] প্রবাহরেখা মানচিত্র, [c] ঘনত্বজ্ঞাপক মানচিত্র।

বিভিন্ন সিরিজের ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রগুলি হল—

[1] আন্তর্জাতিক সিরিজের মানচিত্র : আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী এই ধরনের মানচিত্র আঁকা হয়। এই সিরিজের মানচিত্রের স্কেল হয় 1:100000। এতে 4° অক্ষাংশ এবং 4° দ্রাঘিমার বিস্তারে কোনো অঞ্চলকে দেখানো হয়।
[2] দক্ষিণ এশিয়া সিরিজ: ইরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, চিন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ-পূর্ব চিন প্রভৃতি দেশগুলি এই সিরিজের অন্তর্গত। 1:200000 স্কেলে এই মানচিত্র আঁকা হয়। এটি ৪° অক্ষরেখা এবং 12° দ্রাঘিমারেখার মধ্যে বিস্তৃত থাকে।
[3] ভারত ও প্রতিবেশী দেশের সিরিজ : এই মানচিত্রটি 1:1000000 স্কেলে আঁকা হয়। প্রতিটি মানচিত্র 4° অক্ষরেখা ও 4° দ্রাঘিমারেখার মধ্যে বিস্তৃত থাকে।
[4] ভারতীয় জরিপ বিভাগের মানচিত্র : জরিপের সুবিধার জন্য সার্ভে অব ইন্ডিয়া ভারতীয় উপমহাদেশে 44° পূর্ব থেকে 104° পূর্ব এবং 4° উত্তর থেকে 40° উত্তর পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে 4°×4° গ্রিডে ভাগ করে আঁকা হয়।

মানচিত্র স্কেলকে যখন কথায় বা ভাষায় প্রকাশ করা হয় তখন তাকে বিবৃতিমূলক স্কেল বলে। এটি হল মানচিত্র স্কেল উল্লেখের সহজতম পদ্ধতি। বিবৃতিমূলক স্কেলকে খুব সহজে R.E স্কেলে পরিবর্তন করা যায়। দুভাবে এই R.E নির্ণয় করা যায়।

[1] সূত্রের সাহায্যে R.F. নির্ণয় :

R.F. = মানচিত্র দূরত্ব ভূমি দূরত্ব যেমন, মানচিত্রে 16 ইঞ্চিতে ভূমি দূরত্ব 1 মাইল হলে R.E = 16 ইঞ্চি 63360 ইঞ্চি (1 মাইল = 63360 ইঞ্চি) = 63360314) 1 3960 =

অতএব, মানচিত্রের R.E = 1 : 3960 [2] ঐকিক নিয়মে R.F. নির্ণয় :

ভূমিতে 10 কিমি দূরত্ব মানচিত্রে 1 সেমিতে দেখানো হলে ওই মানচিত্রের RF হবে— মানচিত্রে 1 সেমি ভূমিতে 10 কিমি বা মানচিত্রে 1 সেমি ভূমিতে 10 x 100000 সেমি = 1000000 সেমি

অতএব, মানচিত্রের R.E = 1 : 1000000

রাজনৈতিক মানচিত্র: কোনো জেলা, মহকুমার সীমানা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান তথা কোনো দেশের বা রাজ্যের অবস্থান দেখিয়ে যে মানচিত্র তৈরি করা হয়, তাকে রাজনৈতিক মানচিত্র। বলে। কোনো জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে তার মহকুমা, সি ডি ব্লক, ব্লক অফিস কেন্দ্র, জেলা সদর শহর, মহকুমা শহরের অবস্থান উল্লেখ করা থাকে।বৈশিষ্ট্য:   [1] এতে বিভিন্ন ধরনের রৈখিক চিহ্ন দিয়ে ছোটো থেকে বড়ো প্রশাসনিক এলাকা পৃথক করা থাকে। [2] এর সাহায্যে যে-কোনো মানচিত্রের সীমান্তবর্তী দেশ, রাজ্য, জেলা প্রভৃতির নাম সম্পর্কে জানা যায়। [3] রাজনৈতিক তথা প্রশাসনিক একক সম্পর্কে এই মানচিত্রের মাধ্যমে জানা যায়। [4] এই মানচিত্র যথেষ্ট দৃষ্টিনন্দন হয়।