নবম পাঠ ⇒ আকাশে সাতটি তারা

জীবনানন্দ দাশের আকাশে সাতটি তারা' কবিতা থেকে উদ্ধৃত পক্তিটি নেওয়া হয়েছে। বাংলার গ্রামে শহরের মতো কোলাহল নেই—জীবনযাত্রা সেখানে শান্ত। তাই গ্রামবাংলার বুকে সন্ধ্যাও নামে শান্তভাবে । পল্লিবাংলার সন্ধ্যা গ্রামের পরিবেশের অনুসারী- —তার চাকচিক্য নেই, আছে হিগ্ধতা। তাই সন্ধ্যা অনুগত। কবির ভাবুক চোখের সামনে সে কাব্যিক ছলে দেখা দেয়। সন্ধ্যায় অকার আর দিনের আলো মিশে যে আবছায়া তৈরি করে তার গাছপালার সবুজাভা মিলে সন্ধ্যাকে নীল করে তোলে।

উদ্ধৃত পত্তিটি 'রূপসী বাংলা'র কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা আকাশে সাতটি তারা' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

এই কবিতায় জীবনানন্দ তাঁর একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিতে পল্লিবাংলার সংখ্যাকে বর্ণনা করেছেন। সূর্য ডুবে গেলে যখন দিনের আলো ফিকে হয়ে আসে, কবির মনে হয় যেন এক কেশবতী কন্যা এসেছে সন্ধ্যার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলে ঘনিয়ে আসে রাতের অন্ধকার। ভাবুক কবির চোখে এমনই কাব্যিকরূপে ধরা দেয় পল্লিবাংলার সন্ধ্যা।

উদ্ধৃত পদ্ধতিটি জীবনানন্দ দাশের আকাশে সাতটি তারা কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। সবে যখন সূর্য অস্ত গেছে, আকাশে তারার বিন্দু ফুটে উঠছে সেইসময় কবি মাসের উপর বসে গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শ দিয়ে পল্লিবাংলার সংখ্যাকে অনুভব করেন। তাঁর মনে হয় যেন এক এলোকেশী কন্যা দেখা দিয়েছে সন্ধ্যার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের মতো করে ধীরে ধীরে। অন্ধকার নানে। কবি তাঁর চোখে-মুখে সেই চুল অর্থাৎ অন্ধকারের স্পর্শ উপলব্ধি করেন।

উদ্ধৃত পতিটি জীবনানন্দ দাশের আকাশে সাতটি "তারা" কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। কবি ঘাসের উপর বসে পল্লিবাংলার দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণে সন্ধ্যাকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মনে হয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে যেন এক এলোকেশী কন্যার আবির্ভাব হয় বাংলার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া চুল ছুঁয়েই নেমে আসে অন্ধকার। কবির কল্পনার এই কন্যা আসলে সন্ধ্যাকালীন বাংলার প্রকৃতি। রূপসি বাংলার মতো সৌন্দর্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই, তাই কেউ এই কন্যাকে দেখেনি।

যে-কোনো সাহিত্যকর্মের মতোই কবিতার ক্ষেত্রেও - নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত কবিতার বিষয়বস্তু অনুসারে অথবা ভাব অনুযায়ী ব্যঞ্জনাধমী নামকরণ হয়ে থাকে ।

জীবনানন্দ তাঁর রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের "আকাশে সাতটি তারা' কবিতায় পরিবাংলার সংখ্যার অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। সবে যখন সূর্য অস্ত গেছে, তার শেষ আভায় লাল হয়ে ওঠা মেঘটুকুও বিলীন হয়েছে সাগরজলে আর আকাশে । দেখা দিয়েছে সপ্তর্ষিমণ্ডল, সেই সময় কবি ঘাসের উপর বসে দিনরাত্রির সন্ধিক্ষণকে দু-চোখ ভরে দেখছেন। কবির মনে হয় যেন এক এলোকেশী কন্যা দেখা দিয়েছে আকাশে। মাটির বুকে ধীরে ধীরে নেমে আসা অন্ধকার যেন সেই মেয়ের ছড়িয়ে পড়া কালো চুলের রাশি। সেই চুলের স্পর্শ যেন তাঁর চোখে-মুখে । অর্থাৎ কবি তাঁর ইন্দ্রিয় নিয়ে অনুভব করেন সেই ঘনিয়ে আসা আঁধারকে। তাঁর মনে হয় পৃথিবীর কোনো অঞ্চল প্রকৃতির এমন মোহময়ী সৌন্দর্য দেখেনি। হিজল-কাঁঠাল-জামের পাতা ছুঁয়ে নামা রাত্রি যেন সেই রূপসির চুলের চুম্বন। শুধু চোখ বা ত্বক দিয়েই নয়, কবি ঘ্রাণেন্দ্রিয় দিয়েও অনুভব করেন সংখ্যাকে। পরিবেশের অনেক রকমের গন্ধ মিলেমিশে তৈরি হয় সংখ্যার এক বিশেষ গন্ধ। ধান গাছ, কলমি শাক, জলে ভেজা হাঁসের পালক, শর ইত্যাদির মৃদু গন্ধ, পুকুরের সোঁদা গন্ধ, মাছের আঁশটে গন্ধ, কিশোরী মেয়ের চালধোয়া ভিজে ঠান্ডা হাতের পদ, কিশোরের পায়ে দলা মুখা ঘাসের গন্ধ আর বট ফলের হালকা গন্ধ মিশে তৈরি করে বাংলার একান্ত নিজস্ব সংখ্যার মধুর শীতল গন্ধ। এইভাবে কবি বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শ দিয়ে অনুভব। করেন বাংলাকে।

আকাশে সাতটি তারা যখন ফুটে ওঠে অর্থাৎ সন্ধ্যা এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু। 'আকাশে সাতটি তারা" নামটি সেই বিষয়বস্তুরই ইঙ্গিত দেয়। এই কবিতার নামটি সংকলকদের দেওয়া হলেও নিঃসন্দেহে বলা যায় কবিতাটির নামকরণ সার্থক ।

প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দু-চোখ ভরে রূপসি বাংলার যে সৌন্দর্য দেখেছেন তাকেই মূর্ত করে তুলেছেন তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। আকাশে সাতটি তারাও এমনই একটি কবিতা। কবিতাটিতে তিনি পল্লিবাংলার সন্ধ্যাকালীন ছবি এঁকেছেন শব্দের জাদুতে।

সূর্য যখন অস্ত যায় তার লাল আভায় আকাশের মেঘ পাকা কামরাঙা ফলের মতো লাল হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর সেই মেঘও দিগন্তরেখায় সাগরজলে বিলীন হয়। আকাশে তারা ফুটে। ওঠে। এই সময়ে দিনের উজ্জ্বলতাও থাকে না, আবার রাতের গাঢ় অন্ধকারও থাকে না। এই সময়টিই হল দিনরাত্রির ক্ষণ, সন্ধ্যা। বাংলার প্রকৃতিতে সন্ধ্যার অপরূপ রূপ পৃথিবীর সব জায়গার থেকে আলাদা। সূর্য অস্ত গেলে যেন এক এলোকেশী কন্যার উদয় হয় বাংলার আকাশে। তার ছড়িয়ে পড়া কালো চুল ধীরে ধীরে অন্ধকারের আমেজ নিয়ে আসে বাংলা প্রকৃতির বুকে। হিজল-কাঁঠাল- জাম ইত্যাদি গাছের পাতা ছুঁয়ে নেমে আসা অন্ধকার যেন সেই রূপসির চুলের সোহাগ চুম্বন।

কবি বাংলার সংখ্যার রূপ শুধু চোখেই দেখেননি, গন্ধেও তাকে অনুভব করেছেন। গ্রামবাংলার সংখ্যার নিজস্ব একটা গম্বু আছে যা দিনের থেকে আলাদা। গাছপালা, লতা-গুলু, ঘাস, ফল, পুকুর, মাছ, হাঁস, মানুষ—সবকিছুর গন্ধ মিলে তৈরি হয় বাংলার সন্ধ্যার গন্ধ। কবির মনে হয় এ যেন সেই এলোকেশী কন্যার চুলের স্নিগ্ধ গন্ধ।

প্রাণ তথা প্রাণীকে বাদ দিয়ে প্রকৃতি কখনও সম্পূর্ণ হয় না। গাছপালা, মানুষ, অন্যান্য জীবকে নিয়ে বাংলার যে পরিপূর্ণ প্রকৃতি তার মধ্যেই জীবনানন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর রূপসি বাংলার মুখ ও প্রাণকে।