নবম পাঠ ➤ প্রলয়োল্লাস

● মহাকালরূপী শিব ঝাপটা যেরে গগন দুলিয়ে দেন।
• সংহারক শিব বড়ো ভয়ংকর। তাঁর আগমনে পৃথিবীতে প্রলয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাঁর জটীডার দুলে উঠলে আকাশ বাতাসসহ  চরাচর কেঁপে ওঠে। যাবতীয় জীর্ণতা দূর হয় তাঁর আগমনে। তারপরই নতুন সৃষ্টির প্রকাশ ঘটে পৃথিবীতে। তাঁর ঝাপটা আসলে
পুরাতন জড়বাদী অচলায়তনকে ভাঙার আঘাত। সেই আঘাতে গগনমণ্ডলও কেঁপে ওঠে। এর মধ্যেই নিহিত আছে নবসৃষ্টির গোপন বাতা।

● সংগ্রামের পথ কখনও ফুলে ঢাকা নয়। স্বাধীনতার জন্য মানুষের
যে সংগ্রাম, তার পথ তৈরি হয় মৃত্যু আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। যে
কারণে কবি তাঁর কল্পনায় বিশ্বপিতার কোলে রক্তমাখা তরবারি
সেখেছেন। সুন্দরের বা নবীনের কোনো শান্ত, সৌম্য মূর্তি এখানে
বর্ণিত হয়নি। নতুনের প্রায় রুপই বর্ণিত হয়েছে। সর্বনাশের বেশে
সুন্দরের সেই আগমনকে বর্ণনা করতে গিয়েই কবি বলেছেন
অগ্নিতাবি ধূমকেতু যেন তার চামর চুলায় অর্থাৎ পুষ্প নাচায়।

  • মহাকালের আগমনে প্রণয়-বিক্ষুব্ধ পৃথিবীর কথা বলতে গিয়ে
    কবি আলোচ্যমান উদ্ধৃতিটির অবতারণা করেছেন।
  • মহাকালরূপী শিব ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছেন। তাঁর প্রণয়- তাঙবে বিশ্বচরাচর কম্পিত। বজ্রশিয়ার মশাল জ্বেলে তিনি 'আবির্ভূত হয়েছেন। কালবৈশাখী ঝড়ের রূপ ধারণ করে তিনি আসছেন নবসৃষ্টির বার্তা নিয়ে। তাঁর অষ্টরোলে মুখরিত আকাশ-বাতাস। পৃথিবীর জীবকুল ।

● স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন এক কঠিন সংগ্রাম । এ যেন এক ভয়ংকরের আহবান। সূর্যের মতো আগুন যেন বিপ্লবের বার্তাবাহকের চোখে। আবার কখনও তা মেঘের থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মহাসিখুর জোরা নেয়। দুর্যোগের ভয়াবহতার উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির বুদ্ধরূপে ঘোষিত হয়।

‘বিশ্বনা' বলতে কবি এই বিশাল পৃথিবীকেই বুঝিয়েছেন।
•প্য়ংরলয়কর বিবস্ত্রশিখার মশাল সেলে অসুরকে ধ্বংস করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি পৃথিবীতে আনবেন শাস্তিযুদ্ধের বার্তা। তাঁর বিশাল বস্তুর লোই বিশ্বমাতার স্থান হবে। কেননা, মহাকালী হলেন এই মহাবিশ্বের রাত। তিনিই যাবতী পঙ্কিলতা থেকে বিশ্বনাকে রক্ষা করে চলেছেন। সেই কারণেই কবি মনে করেছেন মহাকালরূপী শিবের বিপুল বাহুর ওপর জগজ্জননীর অবস্থান ।

ঝড় না উঠলে গাছের জীর্ণপাতা ঝরে না। জীর্ণপাতা না ঝরলে নবকিশলয়ের আগমন ঘটে না। ধ্বংসের পিছনেই থাকে সৃষ্টির ান বীজ। জড়তাগ্রস্ত সমাজকে নাড়া দিতে হয়। তাতে লুকানো প্রাণ জেগে ওঠে। রুদ্ররূপী শিব ধ্বংসের ত্রিশূল হাতে আবির্ভূত হন। তাঁর আগমনে জগতে নেমে আসে প্রলয়ের পরিবেশ। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে ষ জীবকুল। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই আছে নববিধানের দুর্ধর্ষ আশ্বাস। এই কারণেই কবি ‘মাভৈঃ মাভৈঃ' বলে উল্লাস প্রকাশ করেছেন।

  • কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি গৃহীত | রুদ্ররূপী মহাকালের কর্মপন্থা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি আলোচ্যমান প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন।
  • মহাকাল শিব আসেন ধ্বংসরূপী কালবৈশাখীর রূপ ধারণ করে। তাঁর তাণ্ডবে পৃথিবীর জরাজীর্ণ সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর ঘটে নতুনের আগমন । জড়তাগ্রস্ত মৃতপ্রায় জীবজগৎ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তাই কবি বলেছেন রুদ্ররূপী শিবের বিনাশমূর্তির নেপথ্যেই উজ্জীবনের মহামন্ত্র লুকিয়ে আছে।

> ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অগ্নিগর্ভ সময়ে কাজী নজরুল
ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি রচিত হয়েছে। অন্যদিকে, সমগ্র
পৃথিবীজুড়ে নানাভাবে মুক্তি আন্দোলনের যে ঘটনা ঘটছিল কবি
সেগুলি সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন। এসব থেকেই তাঁর মনে হয় যে,
নতুন দিনের আগমন সুনিশ্চিত হতে চলেছে। এবং তার আগমন
‘কালবৈশাখির ঝড়’-এর মতো অর্থাৎ কঠিন সংগ্রামের রক্তাক্ত পথ
ধরে সর্বনাশের বিচারে এই পরিবর্তন আসবে—"বজ্রণিষার মশাল
জ্বেলে আসছে ভয়ংকর।" সর্বনাশী ধুমকেতুর মতো তার আগমন
ঘটবে। সশস্ত্র সেই আবির্ভাবে ("রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে)
স্থিতাবস্থার আসন চলে যাবে। মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রখরতা কিংবা
মেঘগর্জনের মতো প্রবলভাবে ঘটবে বিপ্লবীশক্তির আগমন।
মহাসমুদ্র দুলে উঠবে সেই ভয়ংকরের আগমনে। এই ভয়ংকরের
আড়ালেই রয়েছে সুন্দরের প্রতিশ্রুতি। "মহানিশার শেষে/আসবে
ঊষা অরুণ হেসে ।” প্রলয়ের বেশে এ হল 'চিরসুন্দর' -এর আগমন
ভাঙনের মধ্য দিয়ে সৃজনই তার লক্ষ। তাই ভয়ংকরকে জয় না
পেয়ে তার জয়ধ্বনি করতে বলেছেন কবি, কারণ 'কালবৈশাখির
ঝড়-এই ওড়ে নূতনের কেতন–“কাল-ওয়ংকরের বেশে এবার
ওই আসে সুন্দর।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি স্বাধীনতা
সংগ্রামের প্রবল স্বরূপকে তুলে ধরার জন্য প্রশ্নোদ্ভূত বিষয়টির
উপস্থাপনা করেছে। মধ্যাংকালীন সূর্যের দীপ্তি ওয়াল, তা
অগ্নিহালা সৃষ্টি করে। আবার যখন সেই আকাশে মেঘ করে. মনে
হয়, যেন পিঙ্গল জটাজাল সৃষ্টি হয়েছে। সেই মেঘ থেকে ঝড়ে পড়া
বৃষ্টি যেন দিগন্তেরই কান্না। বিন্দু বিন্দু করে পড়া সেই চোখের জলই
সপ্তমহাসিন্ধুকে আলোড়িত করে তোলে। প্রলয়ের এই রূপকে শুধু
প্রকৃতিতেই নয়, চারপাশের সমাজজীবনেও কবি প্রত্যক্ষ করেছেন।
• প্রলয়ের বিভীষিকাতেই বিশ্বমায়ের অভিষেক দেখেছেন কবি।
যুগবাণী গ্রন্থের 'নবযুগ' নামক রচনায় নজরুল লিখেছেন—“আজ
মহাবিশ্বে মহাজাগরণ, আজ মহামাতার মহা আনন্দের দিন, আজ
মহামানবতার মধ্যযুগের মহাউদবোধন।" এই অভিষেককেই কবি
দেখেছেন ভয়ংকরের মধ্য দিয়ে। বিক্ষোভ-আন্দোলনের তীব্রতায়
ধ্বংসের যে উন্মাদনা কবির চোখে পড়ে তার সঙ্গে কবি মিল খুঁজে
পান প্রকৃতির রুদ্ররূপের। সেই রূপে মানুষ শঙ্কিত ও দিশাহারা হয়ে
উঠতে পারে, কিন্তু তার মধ্যেই নতুন দিন ও জীবনের নিশ্চিত
প্রতিযুতি কবি খুঁজে পেয়েছেন। সংগ্রামের সেই ভয়ংকর রূপকে
প্রকাশ করতে গিয়েই কবি মক্তব্যটি করেছেন।

কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পটভূমিতে রচিত হলেও পৃথিবীজুড়ে যে গণমুক্তির সংগ্রামসমূহকে কবি নানাভাবে সংঘটিত হতে দেখেছেন, তাও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। কাব্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাও
কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে। রাশিয়ার বিপ্লব, তুরস্কে কামাল পাশার উত্থান, আয়ারল্যান্ডের বিপ্লব ইত্যাদি ঘটনা নজরুলের মধ্যে প্রবলভাবে রেখাপাত করেছিল। সংগ্রাম এবং শোষণমুক্তির নানা চেহারা বিক্ষিপ্ত আকারে নানাভাবে থাকলেও বিপ্লবের সেই উন্মাদনা কবিকে স্পর্শ করেছিল। 'জগৎ জুড়ে প্রলয়' বলতে এই বিশ্বব্যাপী
সংগ্রাম-আন্দোলনের কথাই বোঝানো হয়েছে।
● প্রলয় ধ্বংসের বার্তাবাহক হলেও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এই প্রনয়কে কবি স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ, তাঁর মতে এই প্রলয় প্রচলিত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন দিনের প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করবে—“ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন- বেদন!/আসছে নবীন—জীবনহারা অসুন্দরে করতে ছেদন!” এই সূলই আসলে স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা। 'যুগবাণী'র নবযুগ রচনায় নজরুল লিখেছিলেন— 'নরে আর নারায়ণে আজ আচার-ভেদ নাই। আজ নারায়ণ মানব । তাঁহার হাতে স্বাধীনতার বাঁশী।” প্রলয়ের মধ্যে
এই নতুন ব্যবস্থাকেই প্রত্যক্ষ করেছেন কবি। তাই ভয়ংকরকে ডয়কে না পেয়ে তার জয়ধ্বনি করার কথা বলেছেন তিনি।

● জাগ্রত যৌবনের সার্থক রূপকার কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োয়াস' কবিতায় রুদ্ররূপী শিবের সংস্কারমূর্তি কল্পিত হয়েছে। সেই সংহারমূর্তিতে শিব অসুন্দরকে ধ্বংস করে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করবেন। এখানে মহাকান শিবের ধ্বংসলীলার কথাই বলা হয়েছে।

● জীর্ণ পাতা ঝরে গিয়েই গাছে গাছে নবকিশলয়ের জন্ম হয়। সামাজিক জীর্ণতাকেও ধ্বংস করতে হয়; না হলে নতুন সৃষ্টি সম্ভব নয়। সমকালীন বাংলাদেশে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কালো ছায়া নেমে এসেছিল। সাম্রাজ্যবাদী শাসন মানুষের প্রাণের মুক্তিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। অন্যদিকে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, পরানুকরণপ্রিয়তা
ইত্যাদি বিষয়গুলি সমাজের অগ্রগতিকে বুদ্ধ করেছিল। মনুষ্যত্বের পদদলন, শোষণ, বঞ্চনা প্রভৃতি হয়েছিল সাধারণ মানুষের ডাগালিপি। নবুন আন্তরিকভাবে এই সমাজের ধ্বংস চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই প্রলয়রূপী শিবের আবির্ভাব কামনা
করেছেন। শিব হলেন একাধারে সংহারক ও রক্ষক। তিনি ধ্বংসের মধ্যে দিয়েই সৃষ্টি করেন। তাঁর আবির্ভাবে প্রলয় সংঘটিত হয়।