নবম পাঠ

অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে বাড়িতে না ফিরে রঞ্জন গঙ্গার পাড়ে গিয়ে পৌঁছোল। সেখানে তার চোখে পড়ল গঙ্গার জলের ছোটো ছোটো ঢেউ, দূরে নোঙর করা কয়েকটা ছোটো-বড়ো জাহাজ, অনেকগুলো নৌকো, ফেরি স্টিমার ইত্যাদি।

বারপুজোর দিন ক্লাবে আমন্ত্রিত না হওয়ায় অপমানিত রঞ্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিদ্ধান্তটি হল, নিজের ক্লাব থেকে ডাক আসে কি না দেখার জন্য দু-দিন সে অপেক্ষা করবে, ডাক না এলে ক্লাব ছেড়ে দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদে বিপক্ষ বড়ো দলে যোগ দেবে সে।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘পরাজয়' গল্পে একটি বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারি 'স্বপনদা', ঘোষদাকে যে বড়ো খবরটি দিলেন তা হল, তাদের বিপক্ষ ক্লাবের রঞ্জন সরকার ফুটবলার হিসেবে তাদের ক্লাবে যোগ দিতে চায়।

রঞ্জনের দলবদলের খবর তাড়াতাড়িই ছড়িয়ে পড়ল।তখন পুরানো ক্লাবের কর্তারা রঞ্জনের বাড়িতে ছুটোছুটি শুরু করলেন। জনে জনে ফোন করলেন কিংবা রঞ্জনের স্নেহের পাত্র ও কনিষ্ঠ সহ-খেলোয়াড়দের তার মত বদলের জন্য পীড়াপীড়ির কাজে নিযুক্ত করলেন। তাতেই বোঝা গেল যে এই ঘটনায় ‘টনক নড়েছিল ক্লাবকর্তাদের'।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পরাজয়' গল্প থেকে নেওয়া আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে ‘ব্যাপার' বলতে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে দুই প্রধান দলের ম্যাচে রঞ্জন সরকারের ব্যাকভলিতে করা গোলের কথা বোঝানো হয়েছে।

আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে স্ট্রাইকার রঞ্জন সরকারের দুহাতে মুখ ঢেকে একটা বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ার কারণ হল, পুরোনো ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও ক্লাব ছেড়ে আসার জন্য তার যে কান্না, তা সে অন্যদের কাছে আড়াল করতে চায়।

আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে 'ও' বলতে ফুটবলার রঞ্জন সরকারের কথা বোঝানো হয়েছে।
নববর্ষের দিন সকালবেলায় বারপুজো উপলক্ষ্যে তার ক্লাবের অনুষ্ঠানে কারা কারা উপস্থিত ছিলেন তা জানার জন্যই রঞ্জন সরকটা কাগজে রত্র বারপুজোর রিপোর্ট পড়েছে।

উদ্ধৃত অংশটিতে শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত "পরাজয়' গল্পের প্রধান চরিত্র রঞ্জন সরকারের কথা বলা হয়েছে।

যে ক্লাবের হয়ে রঞ্জন গত পনেরো বছর ধরে খেলেছে, প্রত্যেক বছর নববর্ষের দিন সকালে বারপুজোয় মাঠে যাবার জন্য সেখান থেকে তার কাছে একের পর এক ফোন আসত। ফোন করতেন ক্লাবের সভাপতি, সম্পাদক, ফুটবল সম্পাদক। ক্লাবের বারপুজোয় উপস্থিত থাকার নিমন্ত্রণ জানাতে বাড়িতেও যেতেন কেউ কেউ। অনুষ্ঠানের দিন সকালে গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হত তাকে টি নিয়ে যাওয়ার জন্য । কিন্তু গেল বছরই রঞ্জন ক্লাব কর্তৃপক্ষের ছাড়াছাড়া ভাব দেখে বুঝতে পারছিল যে, ওকে নিয়ে মাতামাতিটা ঠিক আগের মতো আর নেই।

উদ্ধৃতাংশটি শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পরাজয়' গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।

‘ঠিক এক বছর আগের ঘটনা' বলতে এখানে ফুটবলার রঞ্জন সরকারের সঙ্গে তার ক্লাবের ফুটবল সেক্রেটারি আর কোচের দল গড়া নিয়ে क আলোচনার কথা বোঝানো হয়েছে। রঞ্জন আগের বছর তার সম্পর্কে ক্লাব  কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা লক্ষ করলেও এই দুজন মানুষ, কাকে কাকে দলে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে রঞ্জনের পরামর্শ চেয়েছিলেন।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পরাজয়' গল্প থেকে গৃহীত আলোচ্য অংশে পয়লা বৈশাখের বিশেষ দিনটির কথা বলা হয়েছে। পনেরো বছরের সম্পর্ক ভুলে স্ট্রাইকার রঞ্জন সরকারের ক্লাব এ দিন তাকে বারপুজোয় মাঠে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণটুকু পর্যন্ত জানায়নি। কেউ একবার টেলিফোন পর্যন্ত করেনি। দুঃখে, যন্ত্রণায় রঞ্জন সারাটা দিন বাড়ি থেকে বেরোয়নি, হালখাতার কোনো নেমন্তন্নে পর্যন্ত যাবার ইচ্ছা সে অনুভব করেনি।

'পরাজয়' গল্পের প্রধান চরিত্র রঞ্জন পয়লা বৈশাখের পরের দিন অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা গঙ্গার ধারে চলে যায়। সেখানে গঙ্গার ঢেউয়ে দুলতে থাকা, দূরে নোঙর করে রাখা কয়েকটি ছোটো-বড়ো জাহাজ সে দেখতে পায়। সেই জাহাজের নামগুলোই রঞ্জন পড়ার চেষ্টা করে।

এই প্রথম অন্য বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদাকে রঞ্জন টেলিফোন করে। দীর্ঘ পনেরো বছর নিজের সব ভালোবাসাটুকু উজাড় করে যে ক্লাবের হয়ে রঞ্জন খেলেছে, তারা আজ তাকে বারপুজোয় নেমন্তটুকু করেনি। রাগে দুঃখে রঞ্জন পুরোনো ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফোন করে অন্য বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদাকে। স্বপনদা আধ ঘণ্টার মধ্যে তার বাড়িতে পৌঁছে যাবেন বলে জানালে রঞ্জন টেলিফোনটা রেখে দেয়।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পরাজয়' গল্পে রঞ্জনের সঙ্গে কথাবার্তার সময় অন্য বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদা আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।

পুরোনো ক্লাবের জন্য 'জীবন' দিয়েছে রঞ্জন, অন্য কারুর প্রলোভনে সাড়া দেয়নি। পয়লা বৈশাখে বারপুজোয় নিমন্ত্রণ জানাতে বাড়িতে আসা তো দূরের কথা, সেই ক্লাবের পক্ষ থেকে কেউ একবার ফোনও পর্যন্ত রঞ্জনকে করেনি। স্বপনদা রঞ্জনের সেই ক্লাবের এই অনুচিত কাজের প্রতি নির্দেশ করেছেন।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত “পরাজয়' গল্পে এক বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদা ফুটবলার রঞ্জন সরকারকে এ কথা বলেছেন।

দীর্ঘ পনেরো বছর পুরোনো ক্লাবের হয়ে খিদিরপুর থেকে এসে সে খেলেছে। বাংলা ও ভারতের হয়ে খেললেও, জাতীয় অধিনায়ক হলেও, শত প্রলোভন ও পুরস্কারের বিনিময়েও সেই ক্লাব রঞ্জন হাড়েনি। কিন্তু এ বছর বার পুজোয় আমন্ত্রণ না জানিয়ে যে অন্যায় তার ক্লাব করেছে, রঞ্জন তার যোগ্য জবাব দিতে চায়। খেলা না ছেড়ে নিজেকে প্রমাণ করার এক প্রবল ইচ্ছায় সে ‘স্বপনদা'দের ক্লাবে যোগ দিতে চায়। পুরানো ক্লাবের প্রতি ভালোবাসার কারণে একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আবার সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলবে কি না—সে বিষয়ে নিশ্চিত হতেই স্বপনদা তাকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পরাজয়' গল্পে সাইকার রঞ্জন সরকার অন্য বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদাকে একথা বলেছে। এই 'ব্যবস্থা করা' বলতে রঞ্জন যাতে সহজেই তার পুরোনো ক্লাব ছেড়ে নতুন ক্লাবে যোগ দিতে পারে, সেই আয়োজনের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। নববর্ষের দিনে বারপুজোয় তাকে মাঠে আমন্ত্রণ না জানানোয় কুখ অপমানিত স্ট্রাইকার রঞ্জন অনেক ভাবনা চিন্তা করেই দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আলোচ্য উদ্ধৃতিটির মধ্য দিয়ে সেকথাই সে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে।

অবাক হয়েছিল রঞ্জন সরকারের অফিসের সেইসব সহকর্মীরা, যারা নিজেরাই খেলোয়াড়।

তাদের অবাক হওয়ার কারণ হল আগের দিন বারপুজোয় রঞ্জনের মতো বিখ্যাত খেলোয়াড়ের ক্লাবে না-যাওয়ার ঘটনা।

প্রিয় ক্লাব বার পুজোয় তাকে না ডাকায় রঞ্জন অপমানিত হয়েছিল। রাগে দুঃখে তার মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। সেই অস্থিরতা কাটাবার জন্যই রঞ্জন একটু ফাকা জায়গা খুঁজছিল। ওই সময় গঙ্গার ঘাট ফাঁকা থাকে বলে রঞ্জন বেঞ্চিতে বসেছিল।

স্ট্রাইকার রঞ্জন সরকারের নিস্তার নেই। নিস্তার না থাকার কারণ, অনেক খেলোয়াড় ওর অফিসে চাকরি করে। আগের দিন রঞ্জনের ক্লাবের বারপুজোয় উপস্থিত অতিথিদের নামের তালিকা সংবাদপত্রে বেরিয়েছে। সেখানে রঞ্জনের নাম ছিল না। তাই সকলে ওকে না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করে।

রঞ্জন সরকার নামকরা একটি ক্লাবের বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। দীর্ঘ পনেরো বছর সে একই ক্লাবে খেলে আসছে। সে তার ক্লাবকে ভালোবাসে। অনেক সুযোগ পেলেও অন্য ক্লাবে যায় না। কিন্তু গত বছর থেকেই রঞ্জন অনুভব করেছে, ওকে নিয়ে মাতামাতিটা ঠিক আগের মতো নেই। কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। রঞ্জন এসব গায়ে মাখেনি। কিন্তু বারপুজোর দিন ক্লাবের কর্মকর্তারা ওকে নিমন্ত্রণ করেনি। প্রতিবছরের মতো রঞ্জন চানটান করে তৈরি হয়েছিল। ভেবেছিল ক্লাব থেকে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি পাঠাবে। কিন্তু গাড়ি পাঠানো তো দূরের কথা, কেউ একটা ফোনও করেনি। রঞ্জন সারাদিন বাড়িতে অপেক্ষা করেছে। সেইদিনের পরেও কেউ তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। এইভাবেই রঞ্জন বুঝে গিয়েছিল যে তার ক্লাব তাকে আর চায় না।

বারপুজোয় তাকে না ডাকায় রঞ্জন সরকার ভীষণ অপমানিত হয়েছিল। তারপর দুটো দিন ও বাড়িতে ছটফট করে। অফিস ছাড়া কোথাও যায় না। অফিসে সহকর্মী খেলোয়াড়রা রঞ্জনকে গম্ভীর দেখে কাছে আসে না। ইচ্ছে করেই রঞ্জন দুদিন পুরো সময় অফিস করে। তখনও তার মনে আশা ছিল হয়তো ক্লাব থেকে কেউ তার কাছে আসবে। অফিস ছাড়া বাকি সময় রঞ্জন শুধু বাড়িতে টেলিফোনের পাশে বসে থেকেছে। আশা করেছে হয়তো টেলিফোনেও কেউ যোগাযোগ করবে। ওর বাড়ির লোকও রঞ্জনকে দেখে একটু অবাক হয় বাড়ি থেকে ও বাইরে বেরোয় না। চোখ মুখ দেখে বোঝা যায় যে প্রচন্ড টেনশনে আছে। এইভাবেই রঞ্জন নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করতে থাকে। লড়াই হয় তার মনের আশা আর বাস্তব ঘটনার সঙ্গে। আশা ছিল ক্লাব ওকে আবার ডাকবে। কিন্তু বাস্তবে যখন তাকে তার পুরানো ক্লাব কো ডাকল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

স্বপনরা চেয়েছিল রঞ্জনকে হারিয়ে তার পুরোনো ক্লাব যেন মোক্ষম ধাক্কা খায়।

রঞ্জন যে ফুরিয়ে যায়নি তা প্রমাণ করার জন্য মরসুমের শুরু থেকে সে দুর্দান্ত খেলতে থাকে প্রতি ম্যাচে গোলের পর গোল করতে থাকে। নিজের পুরোনো ক্লাবকে হারিয়ে রঞ্জন স্বপনদের ইচ্ছে সফল করে তোলে।

খেলার প্রথমভাগে যারা দেওয়ালে পিঠ দিয়ে লড়ছিল তারা দ্বিতীয়ার্ধে রুখে দাঁড়াল। তারা এবার বেশি করে বিপক্ষের গোলের দিকে আক্রমণ করতে লাগল।তাতে অবশ্য রঞ্জনের সুবিধাই হল। তার পায়ে পায়ে যে খেলোয়াড়রা ঘুরছিল তারা সরে গেল। এবার আক্রমণ প্রতি-আক্রমণে খেলা জমে উঠল।

রঞ্জন সরকার ময়দানের বিখ্যাত স্ট্রাইকার ফুটবলার, যে নিজের ক্লাবে অপমানিত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে সই করতে বাধ্য হয়

সাজঘরে এসে রঞ্জন সরকার কোণের একটা চেয়ারে বসে পড়ে। কিন্তু গোল দিয়ে দলকে জেতানোর পরেও তার প্রত্যাশামতো আনন্দ হয়নি। সাজঘরে তাকে নিয়ে খুব হইচই হয়। হাতে কেউ একটা কোল্ড ড্রিংকসের বোতল ধরিয়ে দিয়ে গেলেও সে তা মুখে তোলে না। একটা কষ্ট, যন্ত্রণা, অভিমান তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তারপরে ক্লাবকর্তা স্বপনবাবুকে বলে সে পাশের ঘরে চলে যায়।

পনেরো বছর যে ক্লাবের হয়ে রঞ্জন খেলেছে, সাফল্য এনে দিয়েছে, যে ক্লাব তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে, ফুটবলার জীবনের শেষপর্বে সেই ক্লাবের অপমান সহ্য করতে না পেরে রঞ্জন দল বদল করে, যোগ দেয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে। কিন্তু তার গোলেই নিজের পুরোনো ক্লাব হেরে যাওয়ায় নাড়ির সম্পর্কে যেন আঘাত লাগে। বাস্তব আর আবেগের সংঘাতে ভিতরে ভিতরে যন্ত্রণায় কাতর হয় সে। তার চোখে জল চলে আসে।

রঞ্জন সরকার পনেরো বছর এক ক্লাবে ফুটবল খেলার পরে দলবদল করতে বাধ্য হয়। নববর্ষে বারপুজোর দিন তাকে ক্লাবে আমন্ত্রণ না করায় তাঁর অভিমান এবং অপমানবোধে রঞ্জন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে যোগ দেওয়ার । সিদ্ধান্ত নেয়। অন্য বড়ো দলটিও এই সুযোগ হাতছাড়া করে না। এই দলবদলের খবর প্রচারিত হতেই পুরোনো দলের সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। • রঞ্জনের পুরোনো ক্লাবের সমর্থকরা ক্লাব তাঁবুর সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। রঞ্জন সরকারকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানায় তারা। তার দলবদলের জবাব চায় তারা। এরকম গুরুত্বপূর্ণ খবর না পাওয়ার জন্য সাংবাদিকরা ক্রীড়াসম্পাদকের কাছে কথা শোনে। টনক নড়ার পরে ক্লাবকর্তারা রঞ্জনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু অন্য ক্লাবের কর্তারা তাকে ততদিনে লুকিয়ে ফেলেছিল।

জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটিতে উল্লিখিত 'সাত' শব্দটি 'বহু' বা 'নানান' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রেল-বাজারে হোমগার্ডদের তৈরি করা নানান ঝামেলার কথা বোঝাতেই 'সাত' শব্দটি কবি ব্যবহার করেছেন ।

কবি জয় গোস্বামীর ‘মাসিপিসি' কবিতায় 'মাহিনা' শব্দটি ‘মাস' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

‘মাহিনা' শব্দটি ফরাসি ‘মাহিয়ানা' শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'মাসিক বেতন'। গ্রাম্য উচ্চারণে শব্দটিকে 'মাহিনা' বা 'মাইনে' শব্দে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়।

কবি জয় গোস্বামীর 'মাসিপিসি' কবিতায় 'জষ্টি' শব্দটি ‘জ্যৈষ্ঠ' শব্দ থেকে অভিশ্রুতির নিয়মে এসেছে। ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র অনুযায়ী শব্দটি এসেছে এভাবে—জ্যেষ্ঠ > জইষ্ট > জষ্টি ।

কবি জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' শীর্ষক কবিতা থেকে উদ্ধৃত আলোচ্য পঙক্তিটির মাধ্যমে ভোরের আলো ফোটার সময়ের কথা বলা হয়েছে।

ভোরের আকাশে শুকতারার আবির্ভাব ঘটে। অন্যদিকে চাঁদের তালগাছে থেমে যাওয়া অর্থাৎ বিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়েও ভোরের ছবি ফুটে ওঠে। এই দুই ঘটনার মধ্য দিয়ে কবি তাই নিশ্চিতভাবে ভোরের কথাই বলতে চেয়েছেন।

কবি জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' কবিতা থেকে উদ্ধৃত আলোচ্য পঙক্তিতে শীতের ভোরে শিশির ভেজা ঘাসের দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে।

ঘাসের মাথায় এমনভাবে শিশির জমেছে যেন মনে হচ্ছে একে অপরের দিকে কৌতুক ভরে তাকাচ্ছে। ভোরের এই শিশির, রোদ উঠলেই হারিয়ে যাবে। ততক্ষণে মাসিপিসিরা চালের বস্তা নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবেন। রাত থাকতে ঘুম থেকে উঠে মাসিপিসিরা ঘরের সব কাজ সেরে বাইরের কাজে বেরোন, মাঠের শিশির সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে।

কবি জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' কবিতায় লালগোলা কিংবা বনগাঁ লোকালে বস্তাভরতি চাল তুলতে আসা মেহনতি মহিলাদের সাল মাহিনার হিসাব থাকে না। এই হিসাব না থাকার মধ্য দিয়ে কবি তাদের প্রতিদিনের কঠোর কাজের ধারাকে বোঝাতে চেয়েছেন। যাদের কোনো ছুটি বা বিশ্রাম নেই, রোজকার একঘেয়েমিতে আর জীবনের জটিলতায় যাদের কোনো আনন্দ নেই, নেই কোনো অনুষ্ঠানের আড়ম্বর—তাদের কাছে নতুন একটি দিনেরও কোনো বিশেষ তাৎপর্য নেই। শ্রমজীবী, দরিদ্র, লাঞ্ছিত এই নারীরা পরিবারের সব কাজ সেরে বারো মাস, ৩৬৫ দিন রাত ভোর হওয়ার আগেই রোজগার করার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। তাদের কাছে 'সাল' বা 'মাসের' বা বিশেষ কোনো দিনের কোনো তাৎপর্য নেই।

কবি জয় গোস্বামী রচিত 'মাসিপিসি' কবিতা থেকে প্রশ্নোধৃত পঙক্তিটি নেওয়া হয়েছে।

শতবর্ষের এগিয়ে আসা বা শতবর্ষ পার হওয়ার উল্লেখের মধ্য দিয়ে কবি নানান সামাজিক অনুষ্ঠান বা উন্নয়নমূলক কাজের ধারার দিকটি কবিতায় তুলে ধরেছেন। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজের নানান ক্ষেত্রে দুর্বার গতিতে উন্নতি ঘটছে। কৃষির ক্ষেত্রে, শিল্পের ক্ষেত্রে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, পরিবহণের ক্ষেত্রে, বিজ্ঞান বা চিকিৎসার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি হলেও সমাজের সব অবস্থানের মানুষ তার সুফল লাভ করতে পারছে না। সেই উন্নতি আর অগ্রগতির প্রভাব কেবল ধনী ও শিক্ষিত মানুষের জীবনকেই প্রভাবিত করছে। দরিদ্র কিংবা পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনে এই উন্নতি বা অগ্রগতির কোনো ছাপ পড়ে না। শ্রমজীবী, নিপীড়িত মানুষের ছবি শতবর্ষ আসা বা অতিক্রান্ত হওয়াতে বিশেষ বদলায় না। জীবনসংগ্রামে টিকে থাকার জন্য তাদের দিনরাত্রি কঠোর পরিশ্রম করতেই হয়। এর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

আধুনিক কবি জয় গোস্বামীর লেখা 'মাসিপিসি' কবিতায় মাসিপিসি হলেন দরিদ্র, শ্রমজীবী মহিলারা, যাঁরা সংসার চালানোর তাগিদে কাকভোরে বনগাঁ বা লালগোলার মতো বিভিন্ন ট্রেনগুলোতে আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চালের বস্তা তুলে দেন।

আলোচ্য কবিতায় এই অসহায়, কঠোর জীবনসংগ্রামী মাসিপিসিদের জীবনের ছবি আঁকা হয়েছে। রাতের অন্ধকার দূর হয়ে ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগে তাঁরা ঘুম থেকে ওঠেন। স্বপ্নের আবেশ তাঁদের জন্য নয়। শুকতারা যখন ছাদের ধারে এসে থমকে দাঁড়ায়, তালগাছের আড়ালে যখন চাঁদ থেমে যায় অর্থাৎ ভোর হওয়ার কিছু আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ে তাঁরা গতরাতের পরে থাকা কাপড়-চোপড় কাচতে যান। এইভাবে নিজের হাতে পরিবারের কাজ সামলে তাঁরা যান রেলস্টেশনের দিকে। কোলে-কাঁখের পোঁটলাপুঁটলিতে, বস্তায় থাকে চাল। পরিবারের অনেকগুলি মানুষ তাঁদের রোজগারের ওপরই নির্ভরশীল। সামান্য রোজগারের তাগিদেই তাঁদের এতা পরিশ্রম করা। দুঃসহ পরিশ্রমের পাশাপাশি চলে পুলিশি নজরদারি, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, বিপত্তি। রেলস্টেশনগুলিতে কর্তব্যরত হোমগার্ডদের নানা তাদের পোহাতে হয়। বিশেষ সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠান তাঁদের জীবনে কোনো আলাদা আনন্দ নিয়ে আসে না। অপরিবর্তনীয়, আশাহীন, অনুজ্জ্বল এক পৃথিবীতে তাঁরা নিজেদের বেঁচে থাকার সামান্য তাগিদটুকু নিয়েই দিন কাটান।

জয় গোস্বামীর লেখা ‘মাসিপিসি' কবিতায় মাসিপিসি বলতে কবি সেইসব মহিলাদের বুঝিয়েছেন, যাঁরা সারা বছর ধরেই খুব ভোরের ট্রেনে চালের বস্তা নিয়ে শহরে চাল বেচতে আসেন। এতে যে সামান্য আয় হয় তা দিয়েই এঁরা কোনোরকমে সংসার চালান। শুধু তাই নয় বাড়ির কাজও তাঁদেরই করতে হয়। ঘরে-বাইরে এই কঠিন কাজকর্মের মধ্য দিয়েই তাঁদের দিন কাটে।

'ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি' বলতে কবি সেই শ্রমজীবী রমনীদের কথা বলেছেন যাঁরা ট্রেনে করে শহরে চাল বয়ে নিয়ে যান।

যখন ভোর হয়, ঘাসের উপরে শিশির পড়ে তখনই ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিরা ট্রেন ধরতে আসেন।

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিদের পরিবার অনেক বড়ো, উপার্জন সে তুলনায় অনেক কম। রেলবাজারের হোমগার্ডরা পয়সা আদায়ের জন্য তাদের সঙ্গে ঝামেলা করে। আর এইসব জীবনযন্ত্রণা সহ্য করেও বছরের পরে বছর লালগোলা কিংবা বনগাঁর ট্রেনে চাল নিয়ে যান মাসিপিসিরা।এইভাবে সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় চলে তাদের প্রতিদিনকার কষ্টের জীবন।

জয় গোস্বামীর 'মাসিপিসি' কবিতায় মাসিপিসির দল জীবন ধারণের জন্য খুব ভোরে ট্রেনে চালের বস্তা তোলে শহরে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে। এইসময় তাঁদের রেলবাজারের হোমগার্ডরা নানা ধরনের ঝামেলা বা সমস্যায়
ফেলার চেষ্টা করে। উদ্ধৃতাংশে কবি 'সাত' শব্দটি 'ঝামেলা' শব্দের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এখানে সাত ঝামেলা বলতে তিনি নানানপ্রকার ঝামেলার কথাই বুঝিয়েছেন। সুতরাং বলা যায়, ‘মাসিপিসি' কবিতায় মাসিপিসিদের নিত্যদিনের রেলযাত্রার পথে হোমগার্ডদের বিভিন্ন উৎপাতকেই 'সাত ঝামেলা' বলা হয়েছে।

কবি জয় গোস্বামীর 'মাসিপিসি' কবিতায় শহরে চাল বয়ে নিয়ে যাওয়া যাদের পেশা সেই মাসিপিসিরা রাত থাকতেই ঘুম থেকে ওঠে। শুরু হয় তাঁদের কঠোর দিনযাপনের প্রস্তুতিপর্ব। ভোর হতে না হতেই তাঁরা ট্রেন ধরার জন্য রওনা হন। বড়ো পরিবারের সকল সদস্যের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য এই পরিশ্রম তাদের করতেই হবে। কিন্তু পরিশ্রমের পথও সহজ নয়। রেলবাজারের হোমগার্ডরা জোর করে পয়সা রোজগারের চেষ্টা করে তাঁদের কাছ থেকে। এভাবেই অনন্তকাল ধরে চালের বস্তা নিয়ে মাসিপিসিদের জীবিকা চলতে থাকে। শ্রমজীবী রমণীদের এই অব্যাহত জীবনধারাকে বোঝানোর জন্যই কবি মন্তব্যটি করেছেন। চালের বস্তা বয়ে এনে শহরের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা যাঁরা করে দেন তাদের শুধু সহানুভূতিই জানাননি কবি, সম্মানও জানিয়েছেন।

স্কুলের ছেলেমেয়েরা নাগরাজনের অ্যালবামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল কারণ নাগরাজন সেই অ্যালবামটি আনন্দিত মনে সবাইকে দেখতে দিত, একটুও অধৈর্য হত না। রাজাপ্পার অ্যালবামের থেকে চোখ সরিয়ে নাগরাজনের সিঙ্গাপুর থেকে আসা অ্যালবামটির প্রতি সকলের আকৃষ্ট হয়ে পড়ার এটিই সবচেয়ে বড়ো কারণ ছিল।

সুন্দর রামস্বামী রচিত "টিকিটের অ্যালবাম' গল্পে আলোচ্য উদ্ধৃতিটির বক্তা হল রাজাপ্পা ও নাগরাজনের এক সহপাঠী কৃস্নান।

ক্লাসের সবাইকে নাগরাজনের অ্যালবামের প্রতি আকৃষ্ট হতে দেখে রাজাপ্পা রাগ প্রকাশ করলে তাকে উদ্দেশ্য করেই সে এমন কথা বলেছে।

কৃস্নানের রাজাপ্পাকে ‘হিংসুটে পোকা' বলার মধ্যে যুক্তিটি হল এই যে, নাগরাজনের জনপ্রিয়তা বা তার কাকার পাঠানো সুন্দর অ্যালবামটি রাজারা সহ্য করতে পারেনি। নাগরাজনের অ্যালবামের প্রথম পাতার লেখাটি ক্লাসের সবাই নিজেদের বই খাতায় লিখে নিলে রাজারা রেগে গিয়ে তাদের নকলনবিশ বলে। তখন অন্য ছেলেরা রাগে কটকট করে তাকায় আর কৃষ্ণান তাকে বলে, "কেটে পড় হিংসুটে পোকা।''

সুন্দর রামস্বামী রচিত 'টিকিটের অ্যালবাম' শীর্ষক ছোটোগল্পে এই উপলন্ধিটি ক্লাসের অন্যতম ডাকটিকিট সংগ্রাহক ছাত্র রাজাপ্পার।

আলোচ্য অংশে ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে কার ডাকটিকিটের অ্যালবামটি ভালো—নাগরাজনের না রাজাপ্পার—তা নিয়ে তর্কের প্রসঙ্গ এসেছে।

একসময় ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কাছে রাজাপ্পার অ্যালবামটির খুবই কদর ছিল। তারপর ক্লাসের অন্য এক ছাত্র এস নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে একটি চমৎকার অ্যালবাম তাকে পাঠান। এরপর অ্যালবামটি দেখার জন্য ছেলেমেয়েরা প্রায় সবাই তার কাছে ভিড় জমাতে শুরু করে। এই জনপ্রিয়তা হারানোর বিষয়টি রাজাপ্পার একেবারেই পছন্দ হয়নি। সে ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সমালোচনা করতে থাকে। নিজের অ্যালবামটিই যে বড়ো আর মূল্যবান টিকিটের সংগ্রহ, তা বারবার ঘোষণার মাধ্যমে বোঝাতে চায়। প্রসঙ্গত, কৃয়ান রাজাপ্পাকে তার অ্যালবামটি ডাস্টবিনে রাখার যোগ্য বললে অন্য ছেলেরাও তার পক্ষ নিয়ে “বাজে অ্যালবাম, বাজে অ্যালবাম" বলে চিৎকার করতে থাকে। দুটি অ্যালবামের মধ্যে পার্থক্য বোঝারই কোনো ক্ষমতা ছেলেদের নেই বলে রাজাপ্পা মনে করেছে। আর সেই কারণেই তার মনে হয়েছে যে তাদের সঙ্গে সে বিষয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়া নিতান্তই অর্থহীন।

সুন্দর রামস্বামী রচিত "টিকিটের অ্যালবাম" গল্পে ডাকটিকিট সংগ্রাহক স্কুলছাত্র রাজাপ্পার এমনটি মনে হয়েছে।

ক্লাসের অন্য এক ছাত্র এস নাগরাজনের কাকা হঠাৎই সিঙ্গাপুর থেকে তাকে একটি সুন্দর, সুদৃশ্য ডাকটিকিটের অ্যালবাম পাঠিয়েছেন। তেমন অ্যালবাম সেখানকার স্থানীয় কোনো দোকানেই পাওয়া সম্ভব ছিল না। আর তা ছাড়া সেই সুন্দর অ্যালবামটিতে রাজাস্নার মতো অত বেশি কিংবা একই ডাকটিকিট না-থাকলেও সেটিই ছিল সেরা। আর নাগরাজনের সুমিষ্ট ব্যবহারও সবাইকে তার অ্যালবামের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলেছিল। সে নিজের হাতে অ্যালবামটি রেখে আনন্দিত মনে পাতা উলটে সকলকে দেখাত ।
মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ডানপিটে পার্বতী সবার হয়ে অ্যালবামটি দেখতে নিয়ে যেত। ফলে ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা হিংসুটে রাজায়ার অ্যালবাম তথা রাজাপ্পার কাছ থেকে সরে নাগরাজনের দিকে ভিড় জমাত। তাই রাজাপ্পার মনে হয়েছে গত দিন তিনেকের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা যেন হঠাৎ কমে গেছে।

সুন্দর রামস্বামীর লেখা "টিকিটের অ্যালবাম" গল্পে একসময়ে রাজাপ্পার অ্যালবাম ক্লাসের ছেলেমেয়েদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু তার অহংকারী মনোভাব, কঠোর কথাবার্তায় সবাই অখুশি হত। ক্লাসের অন্য এক ছাত্র এস নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে তাকে একটি অত্যন্ত সুন্দর দেখতে ডাকটিকিটের অ্যালবাম পাঠালেন। তারপর থেকে অ্যালবামটির সৌন্দর্য আর নাগরাজনের মিষ্টি ব্যবহারের কারণে সবাই তার চারপালেই ভিড় জমাতে লাগল। নিজের হাতে রেখে দেখানোর সময় বা মেয়েদের সেই অ্যালবামটি দেখতে দিয়ে নাগরাজ কখনোই ধৈর্য হারিয়ে ফেলত না। সবাই প্রাণভরে, আশ মিটিয়ে সেই অ্যালবামটি দেখতে পেত। সে কারণেই অহংকারী রাজাপ্পার অ্যালবামের কথা কেউ উল্লেখও করত না, বা তাকে পাত্তা ও দিত না।

সিঙ্গাপুর থেকে কাকার পাঠানো ডাকটিকিটের সুন্দর অ্যালবামটি এস নাগরাজন ক্লাসের অন্যান্য ছেলেমেয়েদের অত্যন্ত যত্নসহকারে দেখতে দিত। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে, দুপুরে খাওয়ার ঘন্টা বাজলে কিংবা সন্ধ্যাবেলা ওর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ছেলেমেয়েরা ওর অ্যালবামটি দেখত। নাগরাজন এতে কখনও অধৈর্য হয়ে পড়ত না। ও শুধু একটি মাত্র শর্ত করেছিল যে কেউ যেন অ্যালবামটি না ধরে। নিজের কোলের উপরে অ্যালবামটি রেখে নিজে পাতা উলটে উলটে সে সকলকে প্রাণভরে দেখার সুযোগ করে দিত। আর মেয়েদের পক্ষ থেকে পার্বতী এসে অ্যালবামটি চেয়ে নিয়ে যেত। দেখা হয়ে গেলে সন্ধ্যাবেলা অ্যালবামটি আবার নাগরাজনকে ফিরিয়ে দিত।

সুন্দর রামস্বামী রচিত "টিকিটের অ্যালবাম' পরে রাজারার ডাক টিকিট সংগ্রহ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথা জানা যায়। গল্পে তার ডাক টিকিট সংগ্রহের উৎসাহকে মৌমাছির যন্ত্রসংগ্রহের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই বিষয়টিই রাজাপ্পাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত। সে অন্যান্য ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের সঙ্গে দূরদূরান্তে দেখা করতে যেত, তাদের সঙ্গে টিকিটের বিনিময় করত। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে বইপত্র ঘরের এক কোপে কোনোরকমে ফেলে রেখেই সামান্য জলখাবার প্যান্টের পকেটে ভরে নিয়ে চার মাইল দূরে কারোর কাছে কানাডার কোনো-একটি ডাকটিকিটের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল গল্পে সেকথাও রয়েছে। রাজামার অ্যালবামটিই ক্লাসের সবার অ্যালবামের চেয়ে বড়ো ছিল। অথচ নিজের ব্যবহারের কারণে সব প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছিল সে।

মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ডানপিটে ছিল পার্বতী। সে নাগরাজনের থেকে মেয়েদের নাম করে অ্যালবামটা চেয়ে নিয়ে যেত। নাগরাজন মলাট লাগিয়ে তাকে অ্যালবামটা দিত । সব মেয়েদের দেখা হয়ে গেলে সন্ধ্যাবেলা আবার অ্যালবামটা তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হত ।

সুন্দর রামস্বামীর 'টিকিটের অ্যালবাম" গল্প অনুসারে, নাগরাজনের অ্যালবাম আসার আগে পর্যন্ত রাজাপ্পার টিকিটের অ্যালবামটিই তার স্কুলের সহপাঠীদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু সিঙ্গাপুর থেকে নাগরাজনের অ্যালবামটি আসামাত্রই সকলে সেটির প্রতি আকৃষ্ট হল। এখন কেউ রাজাপ্পার অ্যালবামের দিকে আর ফিরে তাকায় না। নাগরাজনের চারপাশেই সকলে ভিড় করে। উপরন্তু তারা রাজাপ্পাকে বিদ্রুপ, উপহাস করতেও পিছপা হয় না। এসব কারণেই রাজাপ্পার স্কুলে যেতে ক্রমশ অনিচ্ছা জাগতে লাগল।

‘টিকিটের অ্যালবাম" গল্পের রাজাপ্পা ডাকটিকিট সংগ্রহ করে সুনাম অর্জন করেছিল। যেমন করে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে, তেমনি খুব কষ্ট করে সে টিকিট সংগ্রহ করত। খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ত, চার-পাঁচ মাইল দূরে চলে। যেত টিকিটের সন্ধানে। স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া বা বিশ্রাম ভুলে যেত শুধু টিকিটের জন্য। রাজস্ব বিভাগের এক অফিসারের ছেলে পঁচিশ টাকায় তার অ্যালবামটি কিনতে চাইলে রাজাপ্পা জবাব দেয়—“তুই কি তোর বাচ্চা ভাইকে আমার কাছে তিরিশ টাকায় বিক্রি করবি?” – ছেলেরা সেই জবাবটিরই তারিফ করেছিল।

'টিকিটের অ্যালবাম' গল্পে রাজাপ্পার অ্যালবামের কথা বলা হয়েছে।

রাজাপ্পা অনেক কষ্টে টিকিট সংগ্রহ করে তার এই অ্যালবামটি তৈরি করেছিল। ভোরবেলাতেই সে এজন্য অন্যান্য টিকিট সংগ্রাহকদের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেরিয়ে পড়ত। একটা রাশিয়ার টিকিটের সঙ্গে দুটো পাকিস্তানি টিকিট বিনিময় করত বিকেলে আবার বাড়ি ফিরেই স্কুলের ব্যাগ রেখে চার মাইল দূরের কোনো ছেলের কাছে যেত কানাডার টিকিট আনতে। অ্যালবামটাকে রাজাপ্পা নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসত। তাই পঁচিশ টাকার বিনিময়েও সে এই অ্যালবামটি বিক্রি করতে রাজি হয়নি।
নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে তাকে টিকিটের একটা অ্যালবাম পাঠানোর পরে রাজাপ্পার অ্যালবাম আর কাউকে আকর্ষণ করে না। সকলেই নাগরাজনের অ্যালবামটার চারপাশে সুযোগ পেলেই জড়ো হত। ছেলেরা কিংবা মেয়েরা সকলেই অ্যালবামটা দেখতে চাইত। তারা এমনও বলত যে নাগরাজনের অ্যালবামের কাছেপিঠে আসার যোগ্যতাও নাকি রাজাপ্পার অ্যালবামের নেই।

টিকিটের অ্যালবাম গল্পে রাজাপ্পা তার ক্লাসের বন্ধুদের বোঝাতে চেয়েছিল।

রাজাপ্পা অনেকদিন ধরে একটা একটা করে টিকিট সংগ্রহ করেছে তার অ্যালবামের জন্য। ক্লাসের সকলে এতদিন তার অ্যালবামটা দেখার জন্যই ঝাঁপিয়ে পড়ত৷ কিন্তু হঠাৎ একদিন নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে একটা অ্যালবাম পাঠিয়েছিলেন। আর সেটা পেয়ে নাগরাজন মহামান্য লোক হয়ে গেল। রাজাপ্পা সবাইকে বোঝাতে চেয়েছিল তাদের দুজনের অ্যালবামের মধ্যে তফাত আছে। কারণ তার নিজেরটা কষ্ট করে টিকিট সংগ্রহের দ্বারা তৈরি, আর নাগরাজনেরটা হঠাৎ করে পাওয়া। সংগ্রহ করার আনন্দ আর কোন্ টিকিট কত মূল্যবান সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নাগরাজনের নেই।কিন্তু বন্ধুদের মনোভাব দেখে রাজাপ্পা বুঝেছিল যে, যতই বোঝানো যাক বন্ধুরা কিছুতেই এই সত্যটা বুঝবে না।

নাগরাজনের অ্যালবাম চুরি করে রাজাপ্পার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। ভয়ে মনে হয়েছিল তার মাথার রক্ত চেপে বসেছে। উলটোদিকের বাড়ির ছেলে আব্বু এসে নাগরাজনের অ্যালবাম চুরির খবর দেয়। আপ্লু চলে গেলে রাজাপ্পা অ্যালবামটা বইয়ের শেলফের পেছনে রেখে দেয়। রাতের বেলা রাজারা খাবার খায় না। এতে ওর বাবা-মা চিন্তিত হন। ওর শরীর ভালো। আছে কি না জিজ্ঞাসা করেন। বিছানায় শুলেও রাজাপ্পার ঘুম আসে না। বিছানা থেকে উঠে অ্যালবামটা বালিশের তলায় রেখে দেয়।

রাজাপ্পা টিকিট সংগ্রহ করত বহু কষ্ট করে। এ বিষয়ে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু নাগরাজন নিজে কোনোদিন টিকিট সংগ্রহ করেনি। তার কাকা তাকে উপহার হিসেবে টিকিটসুখ অ্যালবাম পাঠিয়েছিলেন। তাই টিকিট সংগ্রহের রহস্য ও টিকিটের মূল্য ঠিক করা বিষয়ে নাগরাজনের কোনো ধারণা ছিল না বলেই রাজারা মনে করত।

নাগরাজন তার টিকিটের অ্যালবাম হারিয়ে গেছে বলে কাঁদছিল।

রাজাপ্পা তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করেছিল।

রাজাপ্পা নাগরাজনকে শান্ত করার জন্য নিজের অ্যালবামটা নিয়ে আসে এবং অ্যালবামটি নাগরাজনকে দিয়ে দেয়। নাগরাজন বিষয়টি রাজাপ্পার ঠাট্টা কি না বুঝতে পারে না। রাজাপ্পা তাকে বোঝায়, সে সত্যিই অ্যালবামটি নাগরাজনকে দিয়ে দিচ্ছে। নাগরাজন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যই রাজাপ্পা নাগরাজনকে নিজের অ্যালবামটি দিয়েছিল।

টিকিটের অ্যালবাম গল্পে নাগরাজন স্কুলে পড়া এক বালক। তার কাকা সিঙ্গাপুর থেকে একটা টিকিটের অ্যালবাম পাঠান। সেটা ছিল খুব সুন্দর। আগে নাগরাজনের বন্ধু রাজায়ারই শুধু টিকিটের অ্যালবাম ছিল কিন্তু নাগরাজন অ্যালবাম পাওয়ায় সবাই তার প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠল। নাগরাজনের ধৈর্য ছিল প্রশংসা করার মতো। সে খুব ধৈর্যের সঙ্গেই সবাইকে তার অ্যালবামটা দেখতে দিত। তবে অ্যালবামের প্রতি তার যন্ত্রের পরিচয় পাওয়া যায় দুটি দিক থেকে । প্রথমত, সে কাউকে অ্যালবামটা ধরতে দিত না। নিজের কোলে রেখে সবাইকে দেখাত। দ্বিতীয়ত, মেয়েদের কাছে দেখতে দেওয়ার সময় সে অ্যালবামটাতে মলাট দিয়ে দিত । নাগরাজন সরল মনের বলে একবারও রাজাপ্পাকে অ্যালবাম চুরির জন্য সন্দেহ করেনি। বরং সে অ্যালবাম চুরি যাওয়ার দুঃখ ভাগ করে নিতে রাজায়ার বাড়ি গিয়েছিল। রাজারা তার নিজের অ্যালবামটা কেন দিচ্ছে, তার আসল কারণও সে বুঝতে পারেনি। তাই সবমিলিয়ে সহজসরল মনের নাগরাজনকে আমার ভালো লেগেছে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'লোকটা জানলই না' কবিতায় ‘ইহকাল পরকাল' শব্দ দুটি রয়েছে। কবিতার অর্থ অনুসারে শব্দ দুটির যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। ‘ইহ' শব্দের মানে পৃথিবী। তাই ইহকাল' মানে মানুষ পৃথিবীতে যতদিন বাস করে সেই সময়কাল। 'পরকাল' মানে মৃত্যুর পরের সময়। অর্থাৎ যে কাল বা সময় কেমন তা মানুষ জানেনা। যে লোকটা শুধু টাকাপয়সার হিসেব করে চলেন তাঁর চোখ বাইরের পৃথিবীকে দেখতে পায়না। তাই কবি বলেছেন তাঁর ইহকাল নষ্ট হল। আবার একই সঙ্গে করি লোকটার পরকাল নষ্ট হওয়ার কথাও বলেছেন। কারণ ইহকালে ভালো কাজ না করলে পরকালে কেউ তাঁকে মনে রাখে না। তাই 'ইহকাল পরকাল' শব্দ দুটি পাশাপাশি বসে বিশেষ অর্থ তৈরি করেছে।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত 'লোকটা জানলই না' কবিতায় বর্ণিত মানুষটির দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে খসে পড়ল তাঁর জীবন। অর্থের পিছু ছুটে চলা মানুষটি এমনই লোভের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলেন যে, মৃত্যুর ডাক এসে গেছে সে খেয়ালও তাঁর ছিল না। অত্যন্ত আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুর গভীর অন্ধকারে তাঁর তলিয়ে যাওয়াকেই কবি দু-আঙুলের ফাঁক দিয়ে জীবন খসে পড়ার উপমার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।

আলোচ্য কবিতায় মানুষের হৃদয়কে ‘আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ'-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

আরব্য উপন্যাসের একটি জনপ্রিয় চরিত্র হল আলাদিন। সে একটি জাদু প্রদীপ লাভ করেছিল। সেই প্রদীপটি ঘষলেই এসে দাঁড়াত এক জিন বা দৈত্য। সেই সর্বশক্তিমান দৈত্য তার মালিক আলাদিনের ইচ্ছা অনুসারে মুহূর্তের মধ্যে তার সব কাজ শেষ করত।

আলাদিনের প্রদীপ থেকে উদ্ভূত দৈত্য অসাধ্য সাধন করতে পারত। মানুষও তার হৃদয়ের শক্তির জোরে অনেক অসাধ্যকে সাধ্য করতে পারে।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত 'লোকটা জানলই না' নামক কবিতায় ‘লোকটা জানলই না' পত্তিটি দু-বার ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃতিটি প্রথমবার ব্যবহৃত হয়েছে কবিতায় বর্ণিত মানুষটির হৃদয়ের সন্ধান না পাওয়া প্রসঙ্গে দ্বিতীয়বার সেই একই পক্তি ব্যবহারের কারণ নিজের অজান্তেই যে তিনি অমূল্য জীবন হারিয়ে ফেললেন, তা বিশেষভাবে প্রকাশ করা। কবিতার নামকরণ হিসেবেও কবি এই পক্তিটি ব্যবহার করে তাঁর কবিতার মূলভাবটিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'লোকটা জানলই না' কবিতায় একজন এ সাবধানী, সঞ্চয়ী এবং অর্থসর্বস্ব মানুষের কথা রয়েছে। তার সম্বন্ধে খেদ ও আক্ষেপ প্রকাশ করতে কবি ‘হায় হায়' শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন।

জামার বাঁদিকের বুকপকেটের, অর্থাৎ গচ্ছিত টাকাকড়ির প্রতি অতিসচেতনতায় মানুষটি জীবনের কোনো মহত্তর উদ্দেশ্যই পূর্ণ করতে পারেননি।এই অমূল্য জীবনে অন্যদিকে মন না দিয়ে তিনি টাকাপয়সাকেই শুধু আঁকড়ে ধরেছেন। এইভাবে ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় সম্ভাবনা তিনি নষ্ট করেছেন। অর্থ উপার্জন বা সঞ্চয় করলেও তা কোনো কাজে আসেনি। এভাবে জীবন কাটালেও মৃত্যুর পর কেউ মানুষকে মনে রাখে না। কবিতায় মানুষটির জীবনের অসারতার কথা ভেবে এবং তার অসহায়তায় বেদনাবোধ করেই কবি ‘হায় হায়' করে উঠেছেন।

 

কবিতার নামকরণে কবির মনের ইচ্ছাই প্রধান। তবু কবিতা পড়ে পাঠকের মনে হতেই পারে অন্য কোনো নাম হলে যথাযথ হতে পারত। 'লোকটা জানলই না' কবিতাটি পড়লে দেখা যায়, ‘হৃদয়' শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। টাকাপয়সা নিয়ে সারাজীবন ব্যস্ত লোকটা তাঁর হৃদয়ের কথা শুনতে পান না। সেই হৃদয় আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হয়ে উঠতে পারত। অর্থাৎ হৃদয়ের কথা শুনে চললে লোকটা জীবনে আশ্চর্য ফল পেতেন। কিন্তু কবিতার নামকরণ ‘হৃদয়' হলে লোকটার গুরুত্ব কমে যেত। তাঁর চরিত্র বৈশিষ্ট্য প্রাধান্য পেত না। আবার ‘আলাদিনের আশ্চর্য-প্রদীপ' নামকরণ হলেও লোকটার জীবন প্রধান হয়ে উঠত না। 'লোকটা জানলই না' নামকরণে 'লোকটা'ই প্রধান হয়ে উঠেছেন।আবার একইসঙ্গে 'জানলই না' শব্দ দুটিতে লোকটার অজ্ঞানতা ও বোকামির পরিচয় ফুটে উঠেছে। 'লোকটা জানলই না' নামকরণটি তাই উপযুক্ত ও সার্থক হয়েছে।

প্রিয় অর্ক,

কেমন আছিস ? অনেকদিন তোর কোনো খবরাখবর নেই। এর আগে তো এসেছিলি সেই বইমেলায়, শেষদিনে। হঠাৎ একটা স্টলে ঢুকে কিনে দিয়েছিলি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বই, যার ভূমিকা লিখেছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কী চমৎকার সেই গদ্য !

এবার আমাদের বাংলা বইতে তাঁরই লেখা একটি কবিতা পড়লাম | ‘লোকটা জানলই না'। টাকা-পয়সার চিন্তায় আটকে থেকে কীভাবে একজন মানুষ তাঁর জীবনের সব অর্থ, আনন্দ আর সুখ হারিয়ে এই জগৎ-সংসার থেকে বিদায় নিলেন, কবিতাটিতে সেই কথাই অত্যন্ত সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। আমার তো পড়ে মনে হল এটাই তাঁর লেখার ধরন। অত্যন্ত সোজাসুজিভাবে যে মানুষের জীবনের বিবরণ তিনি দিয়েছেন, তা যথেষ্ট গভীর। আসলে এই বিবরণের মধ্যে দিয়ে মানুষকে শুধু টাকাপয়সার হিসেব থেকে সরে এসে জীবনকে ভালোবাসার বার্তাটিই তিনি দিতে চেয়েছেন। আধুনিক কবিতায় কবিরা সাধারণত যে জটিল, তির্যক ভঙ্গি বা কঠিন শব্দ ব্যবহার করে থাকেন, তাঁর কবিতায় সেই ঝোঁক একেবারেই নেই। সাধারণ ভাষায় মানুষের জীবনের হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও সার্থকতা ছাড়াই জীবনের পরিসমাপ্তি তুলে ধরাই তাঁর এই কবিতাটির বিশেষত্ব বলে আমার মনে হয়েছে। সংকীর্ণ। স্বার্থপূরণের জন্য যে জীবন নয়, তা যে লোককল্যাণ ও বৃহৎ স্বার্থের প্রয়োজনে, কবিতাটি থেকে এই শিক্ষাই পেলাম।আমি তাঁর জীবন ও কাব্য সম্পর্কে আরও জানতে চাই। ধীরে ধীরে লাইব্রেরি থেকে, বন্ধুদের থেকে বা স্যার-ম্যাডামদের থেকে নিয়ে আমি তাঁর লেখা। বইগুলো পড়তে চাই। যদি তোর কাছে তার কোনো কবিতার বই থাকে, পড়ে, মতামত জানাস অবশ্যই। আর সম্ভব হলে এবার বইমেলাতেও আসিস। দুজনে মিলে অনেক বই দেখা যাবে।আজ এখানেই শেষ করছি।

'লোকটা জানলই না' কবিতায় কবি বলতে চেয়েছেন মানুষের জীবনে অর্থই হল অনর্থের মূল। লোকটা বাঁদিকের বুক পকেট সামলাতে সামলাতে অর্থাৎ টাকাপয়সার হিসাব করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। এইভাবে “তার কড়িগাছে কড়ি হল”। অর্থাৎ তিনি প্রচুর টাকাপয়সা উপার্জন” করলেন। ‘কড়িগাছ' বলতে অর্থভাণ্ডারকেই বোঝানো হয়েছে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর 'লোকটা জানলই না' কবিতায় মানুষের জীবনের কথা বলেছেন। এই কবিতায় মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কবির মনোভাব জানা যায়। সেই মনোভাব ফুটে ওঠে একটি লোকের কাহিনির মাধ্যমে। কবিতার লোকটি আসলে এক বিশেষ শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধি। তিনি কেবল টাকা পয়সাকেই জীবনের একমাত্র প্রয়োজন বলে মনে করতেন। সারাজীবন তিনি বাঁদিকের বুক পকেট সামলেছেন। অর্থাৎ তিনি কেবল টাকাপয়সাকে আগলে রেখেছেন। এভাবেই তাঁর সারা জীবন কেটে গেছে কিন্তু শেষপর্যন্ত আঙুলের ফাঁক দিয়ে কখন যে তাঁর জীবন খসে পড়েছে, তিনি নিজেও জানেন না। জীবনে অর্থ প্রয়োজন হলেও তা একমাত্র প্রয়োজন নয়। হৃদয়ের ডাকে সাড়া না দিলে লোকটার মতোই জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়। ইহকালে নিজের হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষের হাত ধরে বাঁচতে পারলেই ইহকাল এবং পরকাল সার্থক হয়।