পঞ্চদশ পাঠ ➤ নদীর বিদ্রোহ

নদীর প্রতি নদেরচাঁদের এত বেশি মায়া একটু অস্বাভাবিক। এই কথাটি সে বোঝে।

নদেরচাঁদ জানে তার নদীপ্রীতিকে কেউ সমর্থন করবে না। তার একান্ত নিজস্ব অনুভূতি। অনুভূতি সর্বজনীন নয়। তাড়া সে যে কাজে নিযুক্ত তাতে নদী সম্পর্কে এত চিন্তা করাটাও বিপজ্জনক। কেননা, সে যে একজন স্টেশনমাস্টার তথাপি নদেরচাঁদ তার মনকে বোঝাতে পারে না। এক অজানা কারণেই তার চল সর্বদা নদীর কাছেই ছুটে যায়।

নদেরচাঁদের দেশের ক্ষীণস্রোতা নদী যেন অসুস্থ দুবল আত্মীয়ের মতোই তার মমতা পেয়েছিল। নদীর জল শুকিয়ে গুনে নদের শরনার্থীর বিয়োগ ব্যথায় কেঁদেছিল।

অন্যদিকে স্টেশনমাস্টারি করতে এসে পরিচিত গভীর প্রশস্ত নদী ছিল তার পরমবন্ধু। একদিনও সে নদীকে না দেখে থাকতে পারত না। নদীর স্রোতে নিজের স্ত্রীকে লেখা চিঠি ফেলে এক অদ্ভুত খেলায় নদেরচাঁদ মেতে উঠত। নদীও যেন তার খেলায় যোগ নিয়েছিল। এইরকমই ছিল তার ভালোবাসা।

উদ্ধৃতাংশটিতে নদেরচাঁদের স্টেশনমাস্টারি করতে এসে পরিচয় হওয়া বাঁধে বন্দি নদীটির কথা বলা হয়েছে। এই নদী গভীর, প্রশন্ত ও জলপূর্ণ। কিন্তু প্রবল বর্ষায় পাঁচ দিন সে নদীকে দেখতে যেতে পারেনি। পাঁচ দিন পরে গিয়ে নদেরচাঁদ দেখল, নদী যেন তার বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ করছে। নদীর গাঢ় পঙ্কিল জল ফুলেফেঁপে ছুটে চলেছে। নদীর এই ভয়ংকর রূপ নদেরচাঁদ আগে কখনও দেখেনি। তাকে তার অপরিচিত বলে মনে হল।

এক বর্ষার দিনে নদীর কাছে গিয়ে নদেরচাঁদ দেখল নদীর জল ব্রিজের ধারকস্তম্ভে বাধা পেয়ে এক ফেনিল আবর্ত রচনা করেছে। সে পকেট থেকে অনেকদিন আগে স্ত্রীকে লেখা একটা চিঠি বার করে নদীর স্রোতে ছুড়ে ফেলল। চোখের পলকে সেই চিঠি অদৃশ্য হয়ে গেল। চিঠির এক-একটি পাতা ছিঁড়ে দুমড়ে-মুচড়ে সে নদীর মধ্যে ফেলতে লাগল আর নদীও যেন সেগুলি নিজের মধ্যে লুকিয়ে ফেলতে লাগল। এইভাবে নদেরচাঁদ এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছিল।

বর্পষায় নদী টইটুম্বুর  হয়ে উঠেছে । প্রবল তার জলস্রোত । পরিপূর্ণতার  আনন্দে সে যেন মাতোয়ারা। কোনো বাধা সে মানতে চায় না। প্রমত্ত জলের ঘূর্ণিতে পলি আবর্ত সৃষ্টি হয়েছে। নদেরটা মনে করেছে, নদী এবার বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। মানুষ বিদ্রোহী হলে যেমন দুবার পুরুষ হয়, হয়ে ওঠে প্রতিবাদী, ঠিক তেমনই নদীও যেন আজ আগ্রাসী মানুষের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে চাইছে।

নদেরচাঁদ নদীকে বড়ো বেশি ভালোবাসত। বর্ষায় নদী পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সে বিমুগ্ধ চোখে পরিপূর্ণ নদীকে দেখছিল। উন্মত্ত জলস্রোত পাগলের মতো ছুটে চলেছিল। জলঘর এত উঁচুতে উঠে এসেছিল যে, নদেরচাঁদ হাত বাড়িয়ে তা ছুঁতে পারত। নদী যেন এখন পূর্ণ যৌবনা। অপ্রতিরোধ্য তার গতি । জলের কোলাহল যেন প্রাণের কোলাহল। নদীর এই পরিপূর্ণ রূপ দেখে নদেরচাদের ভারী আমোদ বোধ হয়েছিল।

নদেরচাঁদ নদীর সঙ্গে খেলায় মেতেছিল। মুষলধারে বৃষ্টি নামলেও সে ভিজে ভিজেই নদীর পরিপূর্ণ রূপ দেখছিল। তারপর দিনের ম্লান আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। চারিদিকে নেমে এল নিবিড় অন্ধকার। বৃষ্টি একটু থেমে আবার প্রবল বেগে শুরু হল। নদীর কলধ্বনি আর বর্ষণের ঝমঝম শব্দ সংগীতের ঐকতান সৃষ্টি করল। নদেরচাঁদের মন থেকে ছেলেমানুষি আমোদ মিলিয়ে গেল। সহসা যেন তার সর্বাঙ্গ অবশ, অবসন্ন হয়ে এল। এই পরিবেশে নদীর রহস্যময়তা দেখে নদেরচাদের ভয় করতে লাগল ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পটিতে একজন সাধারণ স্টেশনমাস্টার নদেরচাঁদ নদীকে ভালোবেসেছিল পরমাত্মীয়, বন্ধুর মতো। নদীর প্রতি সে অসম্ভবরকম এক টান অনুভব করত। তার জীবনের যেন অর্ধেকটা জুড়েই ছিল নদী। যেখানেই সে থেকেছে, সেখানকার নদীকেই সে ভালোবেসেছে। স্টেশনমাস্টারি করতে এসে সে পরিচিত হয় প্রশস্ত জলপূর্ণ অথচ বন্দি এক নদীর সঙ্গে। ব্রিজ, বাঁধ দিয়ে তাকে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ। নদেরচাদের মনে হয়েছিল নদী যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। ব্রিজ আর বাঁধকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে নদী যেন ফিরে পেতে চেয়েছে তার স্বাভাবিক গতি। নদী যেন যান্ত্রিকতা তথা মানবসভ্যতার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করছে। সে ভেঙে চুরমার করে দিতে চেয়েছে ব্রিজ আর বাঁধকে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে নদেরচাঁদের মনে হয়েছে আজ যদি নদী ব্রিজ, বাঁধ ভেঙে নিজে বন্দিদশা কাটিয়েও ওঠে, মানুষ তাকে রেহাই দেবে না। নিজেদের সুবিধার্থে আবারও নদীকে তারা বন্দি করবে। আবার মানুষ গড়ে তুলবে ব্রিজ, গড়ে তুলবে বাঁধ। তাকে আবার বন্দি করবে। প্রশস্ত নদীকে পরিণত করবে ক্ষীণস্রোতা নদীতে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'নদীর বিদ্রোহ ছোটোগল্পে নদেরচাঁদের নদীকে জীবন্ত বলে মনে হয়েছিল।

ইতিপূর্বে তার দেশের নদীটির সঙ্গে নদেরচাঁদের সখ্য গড়ে উঠলেও সেই নদীটি ছিল ক্ষীণ, রুগ্ন। রোগক্লিষ্ট পরমাত্মীয়ার প্রতি মানুষের যেমন মায়া-মমতা সহানুভূতি গড়ে ওঠে, দেশের নদীটির প্রতিও নদেরচাঁদের তেমন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। স্টেশনমাস্টারি করতে এসে নদেরচাঁদ এক নতুন নদীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। সে নদী ছিল প্রশস্ত, বর্ষায় তার জলপ্রবাহ হয়ে উঠত উদ্দাম, উন্মত্ত। আর এই নদীর টানে নদেরচাঁদ  প্রতিদিন ছুটে যেন। ব্রিজের ধারে বসে সে নদীকে দেখত। এইরকমই এক বর্ষায় নদীর উদ্দাম জলস্রোত ব্রিজের ধারকস্তস্তে বাধা পেয়ে ফেনিল আবর্ত রচনা করেছিল। নদীর এই আবর্তে নদেরচাদ তার স্ত্রীকে লেখা পুরোনো প্রঠি ছুড়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয় সেটিকে পেয়েই নদী যেন তার নিজের স্রোতের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল।

নদীও যেন নদেরচাঁদের  সঙ্গে খেলায় যোগ দিয়েছে। উন্মত্ত হয়ে উঠেছে নদীর জলপ্রবাহ। নদীর এই খেলায় যোগ দেওয়া এবং জনপ্রবাহের এমন উন্মত্ততা—এই সবকিছু দেখেই নদেরচাঁদের নদীকে জীবন্ত বলে মনে হয়েছিল।

নদেরচাঁদ শৈশব থেকে নদীকে ভালোবাসত। নদী তার জীবনের সঙ্গে যেন জড়িয়ে গিয়েছিল। কর্মসূত্রে যে নদীটির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল সেই নদীটি ছিল প্রশস্ত, উদ্দাম ছিল তার জলস্রোত। এই নদীর সঙ্গে এক অদ্ভুত সখ্য ছিল নদেরচাঁদের। প্রতিদিন নদেরচাঁদ এক অদ্ভুত টানে ছুটে যেত এই নদীর কাছে। বর্ষায় নদীকে পাঁচ দিন দেখতে না পেয়ে তার মন ছটফট করেছে। ছেলেমানুষের মতো আবার নদীকে দেখার জন্য ঔৎসুক্য সে বোধ করেছে। পাঁচ দিন প্রবল বর্ষণের পর সে যখন নদীকে আবার দেখার সুযোগ পেল তখন দেখল নদী যেন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। রোমে, ক্ষোভে নদী যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। নদীকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে চাইছে। ব্রিজকে যেন সে ভেঙে চুরমার করে ফেলে দেবে। নদেরচাঁদ অনুভব করেছে নদীর বন্দিদশার থাপা। তাই নতুন রং করা যে ব্রিজের জন্য একসময়  গর্ব অনুভব করেছিল সেই ব্রিজকেই তখন তার অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল। কারণ এই ব্রিজের জন্যই নদীর স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হয়েছে। তাই নদেরচাঁদের মনে হয়েছে এই ব্রিজের কোনো প্রয়োজন নেই।

কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নদীর বিদ্রোহ' গল্পে তিরিশ বছর বয়সেও নদীর জন্য নদেরচাঁদের অতিরিক্ত মায়াকে একটু অস্বাভাবিক বলেই মনে হত। নদেরচাঁদের নদীর প্রতি এই ভালোবাসাকেই পাগলামি বলা হয়েছে।

→ নদীর তীরেই নদেরচাঁদের জন্ম। নদীই তার আবাল্য বন্ধু। নদীর কলতানের মধ্যে সে যেন বোবা ভাষার স্বরলিপি আবিষ্কার করতে চাইত। স্টেশনমাস্টারের কাজে এসে আর এক নদীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এই নদীটিও তার আপন হয়ে ওঠে। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও সে নদীর চিন্তায় মশগুল থাকত। এই নদীটি বর্ষার জলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে সে পরম বিস্ময়ে তার জলস্রোতের চাঞ্চল্য দেখত। তার মনে হত নদীর এই চাঞ্চল্য যেন তার আনন্দেরই প্রকাশ। দিবারাত্রি প্যাসেন্ডার ও মালগাড়ির তীব্রবেগে ছোটাছুটি নিয়ন্ত্রণ করা যার কাজ, সে কিনা একজন নদীপাগল! নিজেও সে এ কথা বোঝে, কিন্তু মনকে কিছুতেই বোঝাতে পারে না। আসলে নদেরচাঁদ নিজেও একটি নদী। সত্তার গভীরে প্রবাহিত প্রাণের স্রোত যেন নদীরই স্রোত | নদীর সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে পেরে সে নিজেকে ধন্য মনে করত। নদী-প্রীতির এই পাগলামিতে নদেরচাঁদ উপভোগ করত এক অপরিমেয় আনন্দ, যা একান্তই তার নিজস্ব ।