পঞ্চম অধ্যায় ➤ আবহবিকার

আবহবিকার দুই প্রকার
[2] রাসায়নিক ও [3] জৈবিক আবহবিকার।

আবহাওয়ার উপাদান (যেমন – উন্নতা, বৃষ্টিপাত) দ্বারা
শিলা, নিজ স্থানে চূর্ণবিচূর্ণ হলে তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে।

বায়ুমণ্ডলে ও জলে উপস্থিত থাকা অক্সিজেন, কার্বন
তিন প্রকার। যথা— [1] যান্ত্রিক, | ডাইঅক্সাইড, জলীয়বাষ্প প্রভৃতি উপাদান দ্বারা শিলার, নিজ
স্থানে বিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়াই হল রাসায়নিক আবহবিকার।

উয় মরু অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকারের একটি প্রক্রিয়া হল।ক্ষুদ্রকণা বিশরণ। একাধিক খনিজে গঠিত শিলায় তাপের ফলে সংকোচন ও প্রসারণের পরিমাণ পৃথক হয় ফলে শিলাগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে যায়, যা ক্ষুদ্রকণা বিশরণ নামে পরিচিত।

উয়তার প্রসর বেশি হলে শিলাস্তরের বাইরের ও ভেতরের অংশের মধ্যে সংকোচন ও প্রসারণের তারতম্য ঘটে। ফলে শিলার ওপরের স্তর নীচের স্তর থেকে পেঁয়াজের খোসার মতো খুলে আসে যা, শল্কমোচন নামে পরিচিত।

শীতল জলবায়ুতে শিলাস্তরের ফাটলে জমা জল, তাপ
বিকিরণের ফলে তুষার কেলাসে পরিণত হলে আয়তনে 9% বেড়ে যায়। ওই তুষার কেলাস শিলাস্তরে চাপ দিয়ে শিলার বিচূর্ণন ঘটায় ফলে যান্ত্রিক আবহবিকার ঘটে।

[1] উদ্ভিদের শিকড় শিলার ফাটল বা মুত্তিকার রঞ্জু দিয়ে প্রবেশ করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে শিলায় চাপ দেয় ও শিলার বিচূর্ণন ঘটায়। [2] উদ্ভিদের দেহাংশের (যেমন – পাতা, কাণ্ড প্রভৃতি) পচনে সৃষ্ট হিউমিক অ্যাসিড শিলার বিয়োজন ঘটায়।

কৃষিকার্য, খনিজ উত্তোলন প্রভৃতির মাধ্যমে শিলার
বিচূর্ণন ঘটায়। [2] ঘরবাড়ি নির্মাণ, খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ প্রভৃতির মাধ্যমে শিলার বিচূর্ণন ও বিয়োজন ঘটায়।

প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক কারণে মূল শিলা থেকে
মৃত্তিকাকণার বিচ্ছিন্নকরণ ও স্থানান্তর হল মৃত্তিকাক্ষয়।
যেমন—জলপ্রবাহের ফলে মৃত্তিকাক্ষয় হয়।

পাহাড়ি বা পার্বত্য অঞ্চলের ঢাল বরাবর ধাপচাষ দেখা
যায়। যেমন–দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে ধাপচাষ দেখা যায়।

আবহবিকারের মাধ্যমেই ভূপৃষ্ঠের শিলা যান্ত্রিক ও
রাসায়নিক পদ্ধতিতে চূর্ণবিচূর্ণ এবং বিয়োজিত হয় বলে
আবহবিকারকে বিচূর্ণীভবন বলে।

সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রতিদিন দুবার জোয়ার ও ভাটার জন্য শিলা ক্রমান্বয়ে আর্দ্র এবং শুষ্ক হয়। শিলার আর্দ্র এবং শুষ্কতার প্রভাবে শিলা ফেটে যায়। একে কলিকরণ বলে।

শিলাস্তরের ওপর আর্দ্র মাটিরকণা বা কলয়েড সঞ্চিত হলে তা পরে শুকিয়ে যায় এবং মূল শিলার খনিজের ওপর চাপ দেয়। এর ফলে শিলার আবহবিকার ঘটে। এটিই কলয়েড প্লাকিং।

চুনাপাথরগঠিত অঞ্চলে অঙ্গারযোজন প্রক্রিয়া বেশি
কার্যকরী। জলের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইড মিশে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি করে। ওই মৃদু অ্যাসিড চুনাপাথরের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেট তৈরি করে, জলে দ্রবীভূত করে।

অতি শীতল পার্বত্য অঞ্চলে তুষারের ক্রিয়ার ফলে শিলার ফাটল বৃদ্ধি পেলে তীক্ষ্ণ কোণবিশিষ্ট শিলাখণ্ড সৃষ্টি হয়। এই শিলাখণ্ডগুলি যখন পর্বতের পাদদেশে কৌণিক আকারে সঞ্চিত হয়, তখন তাকে ট্যালাস বা স্ত্রী বলে। লাদাখ মালভূমিতে এই ধরনের ভূমিরূপ দেখা যায়। একে ব্লকস্পেড বা ফেলসেনমারও বলে।

নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর ধরে অধিক উন্নতা,
বৃষ্টিপাতের কারণে শিলায় রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে।
[2] নিরক্ষীয় অঞ্চলের গাছের পাতা মাটিতে পড়ে তা হিউমিক অ্যাসিড তৈরি করে। ওই অ্যাসিড শিলার রাসায়নিক আবহবিকার ঘটায়।

যেসব শিলায় খনিজ হিসেবে লোহা অবস্থান করে
সেইসকল শিলার ওপর মরচে পড়ে। লোহাজাতীয় খনিজ বায়ুর অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে জারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরাস অক্সাইডকে ফেরিক অক্সাইডে পরিণত করে। এই ফেরিক অক্সাইড-ই লোহায় হালকা বাদামি ও হলুদ রঙের মরচে পড়তে সাহায্য করে।

পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের ঢাল বরাবর নেমে আসা জলের
প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এক্ষেত্রে পার্বত্য ঢালের সমান্তরালে বিভিন্ন উচ্চতায় সিঁড়ির মতো
ধাপেধাপে কৃষিজমি প্রস্তুত করা হয়। এই কৃষিজমিগুলি মাটির
ছোটো ছোটো বাঁধ দিয়ে ঘেরা থাকে। ফলে ঢাল বরাবর জলপ্রবাহ
বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং কৃষিজমিতেই জল জমতে থাকে। এভাবে
পৃষ্ঠীয়প্রবাহ হ্রাস পায় ও অনুস্রাবণ বৃদ্ধি পায়।
এই ধাপ তিন প্রকার। যথা—
[1] বেঞ্চ ধাপ : ধাপের নীচের অংশ সমতল থাকে এবং বাইরের দিকের প্রান্তে নীচু আল তৈরি করা হয়।
[2] পর্যায়িত ধাপ : এইসকল ধাপগুলি প্রবহমান জলের গতিকে রোধ করে মৃত্তিকা সংরক্ষণে সহায়তা করে।
[3] সমতল ধাপ : এইসকল ধাপের তলদেশ সমতল এবং বিভিন্ন শস্য চাষের জন্য জল ধরে রাখা হয় ও মৃত্তিকা ক্ষয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মৃত্তিকার সংরক্ষণ করা হয়।

উয় মরু অঞ্চলে উন্নতার প্রসর বেশি, ফলে দিনেরবেলা উত্তাপ বেশি থাকায় অসমসত্ত্ব শিলা অধিক উত্তপ্ত হয় ও প্রসারিত হয়। অপরপক্ষে, রাত্রিবেলা উত্তাপ কম থাকায় সেই শিলা সংকুচিত হয়। এই প্রসারণ ও সংকোচন ক্রমাগত চলতে থাকায় শিলাগাত্রে প্রবল পীড়ন ও টানের সৃষ্টি হয়। ক্রমাগত পীড়ন ও টানের ফলে শিলাস্তরগুলি আলগা হয়ে যায় এবং অবশেষে আবহবিকারপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে ভেঙে যায়। এইজন্য উন্ন মরু অঞ্চলে ক্ষুদ্রকণা বিশরণ বেশি হয়।

[1] যান্ত্রিক আবহবিকারে শিলায় রেগোলিখ নামক নরম আস্তরণ তৈরি হয়। [2] শঙ্কমোচন ঘটলে শিলায় গোলাকৃতি ভূমিরূপ তৈরি হয়। যেমন গ্র্যানাইটের শঙ্কমোচনে ঝাড়খণ্ডের হ্রদের পাশে ‘রাঁচি ডোম' সৃষ্টি হয়েছে। [3] তুষার আবহবিকারে শিলা টুকরো টুকরো তীক্ষ্ণ শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। এদের ট্যালাস বা স্ক্রী বলে।

নীচের উপাদানগুলি আবহবিকারকে প্রভাবিত করে—
(1) শিলার গঠন : নরম শিলা, ফাটলযুক্ত শিলায় দ্রুত
আবহবিকার ঘটে।
[2] ভূপ্রকৃতি : পর্বত ও মালভূমির অধিক ঢালযুক্ত অংশে আবহবিকারের প্রাধান্য বেশি।
[3] জলবায়ু : জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদান (বায়ুর আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, উচ্চতা) আবহবিকারকে সর্বাধিক প্রভাবিত করে।
[4] জৈবিক উপাদান: উদ্ভিদের শিকড়, ফুল, ফল, মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী ইত্যাদি আবহবিকারকে প্রভাবিত করে।

মৃত্তিকার উর্বরতা বৃদ্ধিতে আবহবিকারের ভূমিকা
[1] আবহবিকারের মাধ্যমে সৃষ্ট শিলাচূর্ণ ভূত্বকের ওপর নরম আস্তরণ তৈরি করে, যাকে রেগোলিথ বলে। এই রেগোলিথের খনিজগুলি বৃষ্টির জলের মাধ্যমে মাটির নীচের স্তরে যায় ও উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগায়।
[2] জৈব আবহবিকার প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের শিকড় শিলাকে ফাটিয়ে দেয়। এ ছাড়া কেঁচো, ইঁদুর প্রভৃতি প্রাণী মাটির গভীর পর্যন্ত বায়ু চলাচলের সুযোগ করে দিয়ে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করে।
[3] গাছের পাতা, ফুল, শিকড়, প্রাণীর দেহাবশেষ প্রভৃতি মাটির সাথে মিশে হিউমাস তৈরি করে। ওই হিউমাস বায়ুর O2 এর সাথে জারিত হয়ে বিভিন্ন খনিজ পদার্থে রূপান্তরিত হয়। এই খনিজ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।

মাটি ক্ষয়ে মানুষের ভূমিকা যথেষ্ট বেশি। মানুষের যেসব কার্যাবলি মৃত্তিকাক্ষয়কে বাড়িয়ে দেয় তা হল—(1) অরণ্য হ্রাস: মানুষ দ্রুত বনভূমি ধ্বংস করছে। এতে মৃত্তিকার স্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির জল দ্রুত এইসব মাটিকে ক্ষয় করছে। [2] অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষবাস : পাহাড়ের ঢালে চাষ,
ঝুমচাষ, অতিরিক্ত ভূমিকর্ষণ, একই জমিতে বারবার চাষ ইত্যাদির ফলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায়।
[3] পশুচারণ বৃদ্ধি : পাহাড়ের ঢালে পাতলা মাটির স্তরে পশুচারণ, তৃণভূমিতে অতিরিক্ত পশুচারণের জন্য মাটির ক্ষয় দ্রুত বাড়ছে।

আবহবিকার

[1] সংজ্ঞা: আবহাওয়ার উপাদানগুলি দ্বারা (যেমন— উয়তা, বৃষ্টিপাত) কোনো শিলার নিজ স্থানে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়া বা বিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে আবহবিকার বলে।
[2] নামকরণ: আবহাওয়ার উপাদান দ্বারা শিলার 'বিকার' বা 'পরিবর্তন' ঘটে বলে এরূপ নামকরণ হয়েছে।
[3] নিয়ন্ত্রক: জলবায়ু, উদ্ভিদ, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী, ভূপ্রকৃতি, আদি শিলার প্রকৃতি, সময় প্রভৃতি।
[4] প্রকারভেদ আবহবিকার মূলত তিন প্রকার। যথা— [a] যান্ত্রিক (শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়) [b] রাসায়নিক (শিলার বিয়োজন হয়) [c] জৈবিক (উদ্ভিদ ও প্রাণীর দ্বারা শিলার পরিবর্তন হয়)।
[5] প্রক্রিয়া: শল্কমোচন, ক্ষুদ্রকণা বিশরণ, জলযোজন, জারণ প্রভৃতি। [6] বৈশিষ্ট্য : [a] শিলার বিচূর্ণন ও বিয়োজন ঘটে, [b] এটি একটি স্থিতিশীল প্রক্রিয়া, [c] শিলাচূর্ণের অপসারণ হয় না, [d] আবহবিকারের শক্তি শিলার গঠন, প্রকৃতি ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।
[7] প্রভাব : গোলাকৃতি পাহাড়, ইনসেলবার্জ, টর, গুহা প্রভৃতি ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। মৃত্তিকা সৃষ্টিতেও আবহবিকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
পুঞ্জিত ক্ষয়
[1] সংজ্ঞা: উচ্চভূমির ঢাল বরাবর, আবহবিকারপ্রাপ্ত নুড়ি, পাথর প্রভৃতি যখন অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে নীচের দিকে নেমে আসে তখন তাকে পুঞ্জিত ক্ষয় (mass wasting) বলে। ভূবিজ্ঞানী ব্লুম (A. L. Bloom)-এর মতে
[2]নামকরণ : উচ্চভূমির ঢাল বরাবর আবহবিকারপ্রাপ্ত শিলাচূর্ণ ‘স্তূপ’ বা ‘পুঞ্জ' আকারে নেমে আসে বলে এরূপ নামকরণ হয়েছে।
[3] নিয়ন্ত্রক : ভূমির ঢাল, উচ্চতা, আবহবিকারপ্রাপ্ত পদার্থের আকৃতি ও পরিমাণ, উদ্ভিদের উপস্থিতি, বৃষ্টিপাত, অভিকর্ষজ বল প্রভৃতি।
[4] প্রকারভেদ : পুঞ্জিত ক্ষয় মূলত চার প্রকার। যথা— [a] ধীর প্রবাহ, [b] দ্রুত প্রবাহ, [c] ধস ও [d] অবনমন।
[5]প্রক্রিয়া : মৃত্তিকা প্রবাহ, কর্দম প্রবাহ, সলিয়াকশন, স্লাম্প, স্লাইড প্রভৃতি।
[6] বৈশিষ্ট্য : [a] ইহা ঢালযুক্ত ভূমিভাগে দেখা যায়, [b] অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে শিলাস্তরের সরণ ঘটে, [c] ধীর বা দ্রুতগতিতে হতে পারে, [d] প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তি (নদী, হিমবাহ প্রভৃতি) দ্বারা ক্ষয়কার্য হয় না।
[7] প্রভাব: [a] পাহাড়ি অঞ্চলে পুঞ্জিত ক্ষয়ের ফলে ধস নামে, [b] জীবন ও সম্পদহানি ঘটে, [c] খাড়া ঢাল, ভূমিঢালে ক্ষয়, ট্যালাস শঙ্কু প্রভৃতি ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়।

No Content