পঞ্চম অধ্যায় ➤ ভারতের প্রাকৃতিক পরিবেশ

ভারতের উত্তর-দক্ষিণে বিস্তার 3214 কিমি এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তার 2933 কিমি।

অক্ষাংশ অনুসারে: [1] অক্ষাংশ অনুসারে ভারত উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। [2] ভারতের মূল ভূখণ্ড দক্ষিণে ৪°4' উত্তর অক্ষাংশ (কন্যাকুমারী অন্তরীপ) থেকে উত্তরে 37°'6' উত্তর অক্ষাংশ (কাশ্মীরের উত্তরসীমা) পর্যন্ত বিস্তৃত। গ্রেট নিকোবর দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে পারসন্স পিগম্যালিয়ন পয়েন্ট বা ইন্দিরা পয়েন্ট ভারতের দক্ষিণতম স্থলবিন্দু (6°43' উত্তর অক্ষাংশ)।

◉ দ্রাঘিমা অনুসারে: দ্রাঘিমা অনুসারে ভারত পূর্ব গোলার্ধে 97°25' পূর্ব দ্রাঘিমা (অরুণাচল প্রদেশের পূর্বসীমা) থেকে 68°7' পূর্ব দ্রাঘিমা (গুজরাতের পশ্চিমসীমা) পর্যন্ত বিস্তৃত।

[1] উত্তরে ভারতের উত্তর সীমানা বরাবর অবস্থান করছে সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালা এবং চিন, নেপাল ও ভুটান রাষ্ট্র। উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে আফগানিস্তান। [2] পশ্চিমে অবস্থান করছে পাকিস্তান ও আরব সাগর। [3] পূর্ব সীমানায় রয়েছে মায়ানমার, বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর। [4] দক্ষিণের উপদ্বীপ অংশের তিনদিক বেষ্টন করে রয়েছে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলরাশি। ভারতের সর্ব দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। এই দেশটি পক প্রণালী ও মান্নার উপসাগর দ্বারা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

এশিয়ার দক্ষিণে এবং ভারত মহাসাগরের উত্তরে ভারত অবস্থিত। ভারতের পূর্বে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগর থাকায় ভারতকে বলে উপদ্বীপ। ভারতের তিনদিকে সমুদ্র থাকায় দেশের কোনো অংশই সমুদ্র থেকে 1700 কিমি-র বেশি দূরে অবস্থিত নয়। ভারতের স্থলসীমার মোট দৈর্ঘ্য 15200 কিমি। আর উপকূলের দৈর্ঘ্য প্রায় 7517 কিমি।

ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি দেশ। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে, যেমন – [1] এই দেশের উপদ্বীপীয় অবস্থান যেমন ভারতকে জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধে দেয়, তেমনি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকেও রক্ষা করে। [2] অন্যদিকে উত্তরের হিমালয় ও পশ্চিমের মরু অঞ্চল। বহিঃশত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করতে সাহায্য করার সঙ্গে সঙ্গে গিরিপথগুলির সাহায্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগও বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া, [3] তিনদিকে সমুদ্র থাকায় নৌবিদ্যা ও মৎস্যশিকারে ভারত একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, [4] হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল পর্যটন শিল্পসহ বিভিন্ন ফলজাত শিল্প ও কাষ্ঠ শিল্পের বিকাশকে প্রভাবিত করেছে।

[1] ভারতের তিনদিকে সমুদ্র থাকায় জলপথে ব্যাবসাবাণিজ্যের সুবিধা পাওয়া যায়। [2] সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় নৌবিদ্যায় ও মৎস্যশিকারে ভারত যথেষ্ট উন্নত। [3] সমুদ্রবেষ্টিত এই তিনদিক থেকে বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কাও কম। [4] ভারতের উত্তরাংশ এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভারত এশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। স্থলপথেও প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সহজে যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে।

কন্নড় ভাষায় ‘মালনাদ' কথাটির অর্থ পাহাড়ি দেশ। কর্ণাটক মালভূমির পশ্চিমভাগের পশ্চিমঘাট পর্বতসংলগ্ন পাহাড়ি ভূমিকে মালনাদ বলে।

কেরল রাজ্যের মালাবার উপকূলে বহু উপহ্রদ বা লেগুন আছে। এগুলিকে ব্যাকওয়াটার্স বলা হয়। এগুলির স্থানীয় নাম কয়াল। উদাহরণ—ভেমবানাদ, অষ্টমুদি, পোনমুদি প্রভৃতি।

সর্বোচ্চ মালভূমি: ভারতের সর্বোচ্চ মালভূমি হল লাদাখ।

দীর্ঘতম হিমবাহ: ভারতের দীর্ঘতম হিমবাহ হল সিয়াচেন (76 কিমি)।

উচ্চতম পর্বত: ভারতের উচ্চতম পর্বত হল কারাকোরাম, এর উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ গডউইন অস্টিন বা Ka (8611 মি)।

উচ্চতম জলপ্রপাত: ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত হল সরাবতী নদীর গেরসোপ্পা (275 মি)।

প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত: ভারতের প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বত হল আরাবল্লি।

নবীন ভঙ্গিল পর্বত: ভারতের নবীন ভঙ্গিল পর্বত হল হিমালয়।

চিলকা একটি উপহ্রদ। কারণ এই হ্রদটির একদিক বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত, তিনদিক স্থলভাগ বেষ্টিত। একদিক জলভাগে উন্মুক্ত হ্রদকে উপহ্রদ বলা হয়, সেহেতু চিলকা একটি উপহ্রদ। এটি ওডিশা রাজ্যের উপকূলে অবস্থিত।

কাশ্মীর হিমালয়ের দক্ষিণ থেকে উত্তরে পরপর পাঁচটি পর্বতশ্রেণি পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত রয়েছে – [1] শিবালিক [2] পীরপাঞ্জাল [3] জাস্কর [4] লাদাখ [5] কারাকোরাম।

হিমাদ্রি হিমালয়ের উত্তরসীমা থেকে তিব্বতের মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে ট্রান্স হিমালয় বা টেথিস হিমালয় বলে। এখানেই রয়েছে জাস্কর, লাদাখ, কারাকোরাম পর্বত ও লাদাখ মালভূমি।

আরাবল্লি পর্বতের পাদদেশে, মরুভূমির একেবারে পূর্বদিকে অবস্থিত অঞ্চলটির নাম বাগার। এটি মরুভূমি এবং সমভূমির মাঝখানে অল্প বালুকাময় স্থান এবং বেশিরভাগ জায়গা ঘাসে ঢাকা। এর মধ্যে কোথাও কোথাও কৃষিকাজ হয়।

ভারতের রাজস্থান মরুভূমিতে দুটি সমান্তরাল বালিয়াড়ির মধ্যের স্থানে অনেক সময় হ্রদ দেখা যায়। যারা বছরের বেশিরভাগ সময়ে শুকনো থাকে। এইসব শুকনো হ্রদগুলিকে স্থানীয়ভাবে ধান্দ বলে।

ভারতীয় জনজীবনে উত্তর ভারতের সমভূমির প্রভাব: ভারতীয় জনজীবনে উত্তর ভারতের সমভূমির প্রভাব অপরিসীম।

[1] কৃষি উৎপাদনে: পশ্চিমাংশের মরুস্থলী ছাড়া সমভূমির বাকি অংশ অত্যন্ত উর্বর এবং কৃষিসমৃদ্ধ। এখানে ধান, পাট, আখ, গম, তুলো, ডাল, তৈলবীজ প্রভৃতি শস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।

[2] শিল্পস্থাপনে: যোগাযোগের সুবিধা, স্থানীয় কৃষিজ কাঁচামাল, সুলভ শ্রমিক প্রভৃতি অনুকুল অবস্থার জন্য এখানে অনেক শিল্পও গড়ে উঠেছে, যেমন—চিনি শিল্প, পাট শিল্প, কার্পাস-বয়ন শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, রাসায়নিক শিল্প, চর্ম শিল্প প্রভৃতি।

[3] নগরায়ণে: সমতল ভূমিরূপ, অনুকূল জলবায়ু, জীবিকা সংস্থানের সুবিধা, উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা প্রভৃতি কারণে এই অংশ ভারতের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল। এই সমভূমি অঞ্চলের প্রধান নগরগুলি হল—চণ্ডীগড়, অমৃতসর, দিল্লি, আগ্রা, লখনউ, এলাহাবাদ, বারাণসী, কলকাতা, পাটনা প্রভৃতি।

[4] অন্যান্য কাজকর্মে: ভূমি সমতল বলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত। পশ্চিমের মরু ও মরুপ্রায় অঞ্চলের লবণাক্ত হ্রদগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপন্ন হয়।

পূর্ব ভারতের উচ্চভূমি: ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ছোটোনাগপুর মালভূমি, ছত্তিশগড় রাজ্যের বাঘেলখণ্ড মালভূমি ও সমতলক্ষেত্র-সহ মহানদী অববাহিকা এবং ওডিশার দণ্ডকারণ্য অঞ্চলকে একসঙ্গে বলা হয় পূর্ব ভারতের উচ্চভূমি।

ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য: [1] বহু যুগ ধরে ক্ষয় হওয়ার ফলে এখানকার উচ্চতা বেশ কমে গেছে (গড়ে 700 মি উঁচু)। এই অংশে অনেক সমপ্ৰায়ভূমি (peneplain) দেখা যায়।

[2] ছোটোনাগপুর মালভূমির সর্বাপেক্ষা উঁচু অংশ পশ্চিমের পাট অঞ্চল (গড় উচ্চতা 1000 মিটারের বেশি)। রাঁচি মালভূমি পাট অঞ্চলের পূর্বদিকে অবস্থিত। রাঁচি মালভূমির উত্তরদিক দিয়ে দামোদর নদ প্রবাহিত হয়েছে। এই নদের উত্তরে আছে হাজারিবাগ মালভূমি। ছোটোনাগপুর মালভূমির উত্তর-পূর্ব কোণে রাজমহল পাহাড় অবস্থিত। ছোটোনাগপুরের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হল পরেশনাথ (1366 মি)।

[3] বাঘেলখণ্ড মালভূমির দক্ষিণে মহানদী অববাহিকার মধ্যভাগের নাম ছত্তিশগড় সমতলক্ষেত্র।

[4] এই সমতলক্ষেত্রের দক্ষিণে বন্ধুর ও ব্যবচ্ছিন্ন দণ্ডকারণ্য পাহাড়িয়া অঞ্চল অবস্থিত। এই মালভূমির সর্বোচ্চ অংশ হল কোরাপুট।

[5] রাঁচি মালভূমির দক্ষিণে ওডিশার গড়জাত অঞ্চল অবস্থিত, এখানে কতকগুলি পাহাড় আছে, যেমন—–বোনাই, কেওনঝড়, সিমলিপাল প্রভৃতি।

ভারতীয় জনজীবনে উপদ্বীপীয় মালভূমির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন— মালভূমির বিভিন্ন অংশে আকরিক লোহা, কয়লা, চুনাপাথর, তামা, ম্যাঙ্গানিজ প্রভৃতি খনিজ দ্রব্য উত্তোলন করা হয়।

মালভূমির নদী উপত্যকাগুলিতে প্রচুর পরিমাণে তুলো (রেগুর মৃত্তিকা অঞ্চল), ধান (কৃষ্ণা, গোদাবরী, কাবেরী অববাহিকা ও খান্দেশ সমভূমি), বাদাম (কর্ণাটকের ময়দান), পিঁয়াজ, আখ (মহারাষ্ট্র সমভূমি), কমলালেবু (নাগপুর সমতলভূমি), আঙুর (কর্ণাটকের ময়দান) প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।

কৃষিজ ও খনিজ কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধা থাকায় এখানে অনেক শিল্প গড়ে উঠেছে।

মালভূমি অঞ্চলের নদীগুলি সেচকার্য এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী।

এই মালভূমির বিভিন্ন অংশ অরণ্য সম্পদে সমৃদ্ধ।

মনোরম প্রাকৃতিক শোভার জন্য এখানে অনেক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যেমন—আরাবল্লির মাউন্ট আবু, ছোটোনাগপুরের নেতারহাট, মহাদেব পাহাড়ের পাঁচমারি, তামিলনাড়ুর উদাগামণ্ডলম (উটি), কেরলের মুন্নার প্রভৃতি।

থর বা রাজস্থানের মরুভূমি ভারতের একমাত্র মরুভূমি। এটি সৃষ্টির কতকগুলি কারণ রয়েছে—

➀ আরাবল্লি পর্বতের অবস্থান: থর মরুভূমির পূর্বদিকে আরাবল্লি পর্বত উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এখানে সেভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় না। তাই বৃষ্টি ঘটাতে পারে না।

➁ বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু যখন এই অঞ্চলে প্রবেশ করে তখন তাতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ খুব কমে যায়।

➂ আয়ন বায়ুর প্রবাহপথ: গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে একধরনের উষ্ণবায়ু প্রবাহিত হয়। যে কারণে এখানে বৃষ্টিপাত তেমন হয় না। দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ার জন্যই এখানে মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতীয় জনজীবনে হিমালয়ের প্রভাব: ভারতের জনজীবনে হিমালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম—

➀ জলবায়ুগত প্রভাব: [i] এই পর্বতমালা ভারতের উত্তর ও পূর্বদিকে প্রাকৃতিক প্রাচীরের (natural barrier) মতো বিরাজ করায় শীতকালে মধ্যএশিয়ার তীব্র ঠান্ডা বায়ুকে ভারতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, এজন্য উত্তর ভারত প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে রক্ষা পায়। [ii] গ্রীষ্মকালীন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হিমালয়ে বাধা পায় বলে সারা ভারতে বৃষ্টিপাত হয়।

➁ ভূমিরূপগত প্রভাব: [i] সুউচ্চ হিমালয়ের বিভিন্ন হিমবাহ থেকে গঙ্গা, যমুনা, তিস্তা প্রভৃতি বহু বরফগলা জলে পুষ্ট নদীর সৃষ্টি হয়েছে। এইসব নদী পার্বত্য প্রবাহে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূমিরূপ গঠন করেছে, যেমন—গিরিখাত, জলপ্রপাত প্রভৃতি। [ii] হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল থেকে পলি বয়ে এনে নদীগুলি উত্তর ভারতে বিস্তীর্ণ উর্বর সমভূমির সৃষ্টি করেছে। ফলে এই সমভূমি অঞ্চলে কৃষিকার্য ও পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এখানে জনবসতির ঘনত্ব বেশি।

➂ অর্থনৈতিক প্রভাব: [i] পার্বত্য অঞ্চলের নদীগুলি খরস্রোতা এবং সারাবছর বরফগলা জল পায় বলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী। [ii] পশ্চিম হিমালয়ের বিক্ষিপ্ত অল্পবিস্তৃত তৃণভূমিগুলি মেষপালন এবং বিস্তীর্ণ সরলবর্গীয় অরণ্যগুলি কাষ্ঠ সম্পদের জন্য বিখ্যাত। [iii] পার্বত্য ঢালে প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উদ্ভিদ, চা, সিঙ্কোনা এবং বিভিন্ন ফল (আপেল, কমলালেবু প্রভৃতি) উৎপন্ন হয়। [iv] এখানকার জলবায়ু সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি (যেমন—ঘড়ি), শাল, কার্পেট, সুক্ষ্ম কারুশিল্প ও মৃৎশিল্প নির্মাণের পক্ষে বিশেষভাবে উপযোগী। [v] হিমালয়ের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য দেশ বিদেশ থেকে অনেক পর্যটক আসেন যা হোটেল শিল্প তথা পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে।

➃ সাংস্কৃতিক প্রভাব: [1] পার্বত্য অঞ্চলে পৃথক পৃথক সামাজিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ঐতিহ্যবিশিষ্ট সভ্যতা গড়ে উঠেছে। [ii] প্রাচীনকাল থেকেই হিমালয় পর্বতমালা প্রাচীরের মতো অবস্থান করে বহিঃশত্রুর হাত থেকে ভারতকে রক্ষা করে এসেছে। (কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া), যা ভারতের নিজস্ব সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে ও বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।

◉ দাক্ষিণাত্য মালভূমির অবস্থান: ‘উপদ্বীপীয় মালভূমি’র মূল ভূখণ্ডটির নাম দাক্ষিণাত্য মালভূমি। উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত, দক্ষিণে কন্যাকুমারী, পূর্বে পূর্বঘাট পর্বতমালা বা মলয়াদ্রি এবং পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা বা সহ্যাদ্রি-র মধ্যবর্তী অংশে দাক্ষিণাত্য মালভূমি বিস্তৃত। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ও তামিলনাড়ু রাজ্যের মালভূমি এই অঞ্চলের অন্তর্গত।

◉ দাক্ষিণাত্য মালভূমির ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য:

এই অঞ্চলটি পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূভাগ বা শিল্ড (shield) মালভূমির অংশ।

অঞ্চলটি প্রাচীন গ্রানাইট, নিস প্রভৃতি আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত।

কোটি কোটি বছর ধরে ক্ষয় হওয়ার ফলে দাক্ষিণাত্য মালভূমির অনেক অংশ সমপ্রায়ভূমি এবং ব্যবচ্ছিন্ন মেসা (mesa) ও বিউট (butte) ভূভাগে পরিণত হয়েছে।

সমগ্র মালভূমি পশ্চিম থেকে পূর্বে ঢালু এবং উত্তরাংশের তুলনায় দক্ষিণাংশ ক্রমশ উঁচু।

মালভূমির উত্তর-পশ্চিমাংশে লাভা গঠিত ডেকান ট্র্যাপ (deccan trap) অঞ্চল দেখা যায়। ট্র্যাপ’ (trap) শব্দটির অর্থ ‘সিঁড়ি’। মহারাষ্ট্র মালভূমি নামে পরিচিত এই মালভূমির শীর্ষদেশ চ্যাপটা, ঢাল যথেষ্ট খাড়াই এবং দুই পার্শ্বভাগ ধাপ সমন্বিত।

ডেকান ট্র্যাপের দক্ষিণে কর্ণাটক মালভূমি অংশে যে অনুচ্চ প্রায় সমতল শীর্ষভাগযুক্ত অঞ্চল দেখা যায় তা ময়দান এবং ময়দানের দক্ষিণে যথেষ্ট উঁচু ও পাহাড় সমন্বিত যে অঞ্চল দেখা যায় তা মালনাদ নামে পরিচিত।

ত্রিভুজাকৃতি এই মালভূমি তিনদিকে পর্বতবেষ্টিত। এগুলির মধ্যে উত্তরে আছে সাতপুরা-মহাদেব-মহাকাল-অজন্তা পর্বতশ্রেণি, পশ্চিমে আছে পশ্চিমঘাট বা সহ্যাদ্রি পর্বতমালা এবং পূর্বে আছে পূর্বঘাট বা মলয়াদ্রি পর্বতমালা।

পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দক্ষিণ প্রান্তে আনাইমালাই পর্বত অবস্থিত। এই পর্বতের আনাইমুদি (2695 মি) দাক্ষিণাত্য মালভূমির উচ্চতম শৃঙ্গ।

নদী সাধারণত ভূপৃষ্ঠ বরাবর প্রবাহিত হয়। কিন্তু চুনাপাথরগঠিত অঞ্চলে কোনো কোনো সময় চুনাপাথরের সচ্ছিদ্রতা বা প্রবেশ্যতা বেশি (চুনাপাথর জলে দ্রবীভূত হয়) বলে নদী ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এই ধরনের নদীকে বলে অন্তঃসলিলা বা ফল্গু নদী। চুনাপাথরগঠিত অঞ্চল পার হয়ে নদীটি পুনরায় ভূপৃষ্ঠে আত্মপ্রকাশ করে। অন্ধ্রপ্রদেশের বোরা গুহালুতে গোস্থানী নদী এইভাবে প্রবাহিত হচ্ছে।

ভূমির উত্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যখন কোনো নদী ক্ষয়কাজ চালিয়ে যায় এবং তার প্রবাহপথ বজায় রাখে, তাকে পূর্ববর্তী নদী বলে। অর্থাৎ এইসব নদী ভূমির উত্থানকে অগ্রাহ্য করে তাদের প্রবাহপথ বজায় রাখে। যেমন—হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদী পূর্ববর্তী নদী।

অসমের প্রধান নদ ব্রহ্মপুত্র । প্রায় প্রতি বছরই বর্ষাকালে এই ব্রহ্মপুত্র নদে প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়, ফলে অসমের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার কবলে পড়ে। কারণ—

➀ ভূমির ঢাল কম: ব্রহ্মপুত্র নদ অসমের যে অংশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, সেখানে ভূমির ঢাল খুবই কম। এজন্য ব্রহ্মপুত্র নদের গতি অত্যন্ত ধীর এবং পলির বহনক্ষমতাও সামান্য। তাই ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলি তাদের ঊর্ধ্বপ্রবাহ অঞ্চল থেকে যে পরিমাণ পলি বহন করে আনে তার বেশিরভাগই এখানকার নদীখাতে জমা হয়। এইভাবে বহুবছর ধরে পলি সঞ্চিত হওয়ার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গভীরতা বর্তমানে যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে।

➁ প্রচুর বৃষ্টিপাত: গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে সাংপো নদ যখন তিব্বতের ঊর্ধ্বপ্রবাহ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে বরফগলা জল বহন করে আনে, সেই সময় অসমেও প্রবল বর্ষণ হয়। অগভীর ব্রহ্মপুত্রের খাতে যখন ওই বরফগলা জল ও বৃষ্টির জল এসে পড়ে, তখন তা বহন করার ক্ষমতা ব্রহ্মপুত্রের আর থাকে না। ফলে দুকূল ছাপিয়ে বন্যা হয়।

◉ আদর্শ নদী: যে নদীর গতিপথে ক্ষয়কার্য প্রধান পার্বত্যপ্রবাহ বা উচ্চগতি, বহনকার্য-প্রধান সমভূমিপ্রবাহ বা মধ্যগতি এবং সঞ্চয়কার্য-প্রধান বদ্বীপপ্রবাহ বা নিম্নগতি সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, তাকে আদর্শ নদী বলে।

◉ গঙ্গাকে আদর্শ নদী বলার কারণ: গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ তুষারগুহা থেকে গঙ্গানদীর উৎপত্তি। এই উৎসস্থল থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত গঙ্গানদীর পার্বত্যপ্রবাহ বা উচ্চগতি, হরিদ্বার থেকে রাজমহল পর্যন্ত সমভূমিপ্রবাহ বা মধ্যগতি এবং রাজমহল থেকে বঙ্গোপসাগরের উপকূল অর্থাৎ মোহানা পর্যন্ত বদ্বীপপ্রবাহ বা নিম্নগতি লক্ষ করা যায়। যেহেতু গঙ্গানদীর গতিপথে তিনটি গতিই সুস্পষ্ট, তাই গঙ্গাকে আদর্শ নদী বলে।

◉ খাল দ্বারা জলসেচের উপযোগিতা: প্রধানত নদনদী বা জলাধারের জল কৃষিজমিতে ব্যবহারের জন্য যে খাল খনন করা হয়, তাকেই বলে সেচখাল। এই খাল দুই প্রকার— প্লাবন খাল ও নিত্যবহ খাল। ভারতীয় কৃষিতে এই খাল দ্বারা জলসেচের উপযোগিতা অপরিসীম। এর কারণ—

➀ অসংখ্য নদনদীর জল: ভারত নদীমাতৃক দেশ, অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন অংশের ওপর দিয়ে অসংখ্য নদনদী প্রবাহিত হয়েছে। এর ফলে এখানকার অধিকাংশ জায়গায় খাল খনন করে কৃষিজমিতে জলসেচ করা যায়।

➁ সারাবছর বরফগলা জলের যোগান: সুবিস্তৃত উত্তর ভারতের নদীগুলি বরফগলা জলে পুষ্ট বলে এগুলিতে সারাবছর জল থাকে এবং তাই প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতেই সারাবছর খাল দ্বারা জলসেচ করা যায়।

➂ খাল খননের উপযোগী ভূমিরূপ: ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সমভূমি থাকায় সহজে খাল খনন করে জলসেচ করা যায়।

➃ ভূমির ঢালজনিত সুবিধা: দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভূমির ঢাল সুষম বলে খাল দিয়ে সহজেই জল প্রবাহিত হতে পারে (যেমন— সমভূমি অঞ্চলে)।

➄ জলাধার তৈরির সুবিধা: দক্ষিণ ভারতে বরফগলা জলে পুষ্ট নদী না থাকলেও এখানকার ভূমিরূপ ঢেউখেলানো বলে সহজেই বাঁধ দিয়ে জলাধার নির্মাণ করা যায় এবং তারপর ওগুলি থেকে খাল খনন করে জলসেচ করা হয়।

➅ ভূগর্ভস্থ জলস্তর হ্রাস: দেশের অধিকাংশ জায়গাতেই এখন ভূগর্ভস্থ জলস্তর হ্রাস পাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে ভূপৃষ্ঠস্থ জল অর্থাৎ নদনদী, জলধারা খালের মাধ্যমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা ছাড়া আমাদের কৃষির উন্নতি বিধান বা জলসম্পদ সংরক্ষণের আর কোনো বিকল্প নেই। সবশেষে বলা যায়, খাল দ্বারা জলসেচের উপযোগিতা এতটা বেশি বলেই বর্তমান ভারতের মোট সেচসেবিত কৃষিজমির সর্বাধিক অংশে (প্রায় 26 শতাংশ) খালের মাধ্যমে জলসেচ করা হয়।

শীতকালে ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু। এই বায়ু অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক প্রকৃতির হয়। কারণ—

[1] এই বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করতে পারে না।

[2] এ ছাড়া খুব শীতল হয়। বলে এই বায়ুর জলীয়বাষ্প ধারণ ক্ষমতাও হ্রাস পায়।

এর ফলে শীতকালে সমগ্র দেশের তাপমাত্রা যথেষ্ট হ্রাস পেলেও এসময় বৃষ্টিপাত হয় না (কেবলমাত্র প্রত্যাবর্তনকারী মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে তামিলনাড়ু উপকূলে এবং পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতে কিছু বৃষ্টিপাত হয়)।