পঞ্চম পাঠ ⇒ নব নব সৃষ্টি

আলোচ্য উদ্ধৃতাংশটি সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত 'নব নব সৃষ্টি' রচনাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। ভাষা তার নিজ শব্দভান্ডারের ধাতু বা শব্দ দ্বারা নতুন শব্দ তৈরি করতে পারলেই ভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণতা প্রমাণিত হয়। কিছু বিদেশি শব্দ গ্রহণ করলেও ভাষা অনেকসময়ই মধুর এবং তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যদি সেই ভাষা বিষয়কেন্দ্রিক হয়। লেখক নিজেই বলেছেন, "রচনার ভাষা তার বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর
করে।" প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ভাষায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি প্রভৃতি শব্দ অবলীলাক্রমে মিশেছে। শিক্ষার মাধ্যম রূপে ইংরেজি বর্জন করার ফল বাংলা ভাষা পেয়েছে, কারণ বাংলায় তারপরই প্রচুর পরিমাণে ইউরোপীয় শব্দ ঢুকেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও নানান দ্রব্য ব্যবহৃত হয় যা বিদেশি বস্তু। অনুরুপভাবে বিদেশি শব্দও প্রবেশ করবে ভাষায়। হিন্দি ভাষাকে আরবি-ফারসি শব্দ মুক্ত করার জন্য চেষ্টা শুরু করেছেন হিন্দি ভাষার সাহিত্যিকরা। তার ফলাফল ভালো না খারাপ হবে তা লেখক ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ আনায়াসেই আরবি-ফারসি ভাষা মিশিয়ে লিখেছেন, “আব্রু দিয়ে ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।” আবার নজরুল ইসলামও 'ইনকিলাব', 'শহিদ' প্রভৃতি শব্দ বাংলায় ব্যবহার করেছেন। বিষয়ের গাম্ভীর্য, আভিজাত্য এবং চটুলতার ওপর ভাষার ব্যবহার নির্ভর করে। ফলে বিদেশি শব্দের প্রয়োগও ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম যদি তা বিষয়বস্তুর প্রতিফলন ঘটাতে পারে ।

সৈয়দ মুজতবা আলী ‘নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধে ভাষায়। বিদেশি শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে হিন্দি ভাষার। সাহিত্যিকদের একটি প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন। হিন্দি ভাষাকে আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য। নিয়ে হিন্দি সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছেন বেশ কিছু হিন্দি সাহিত্যিক। তাঁদের এই চেষ্টার ফল ভালো না খারাপ হবে, তা বিচার করার চেয়ে বড়ো কথা এই যে তাঁরা চেষ্টা শুরু করেছেন। বাংলা সাহিত্যিকরা অবলীলাক্রমে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। সাহিত্যের নতুন নতুন সৃষ্টি দিয়ে ঐশ্বর্যশালী সাহিত্যসম্ভার গড়ে তুলতে ভাষা বিষয়বস্তু কেন্দ্রিক হবে এটাই মূল কথা। তাই রবীন্দ্রনাথ খুব স্বচ্ছন্দেই আরবি-ফারসি ভাষার সংমিশ্রণে লিখেছেন ।"আব্রু দিয়ে  ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে বুকের রক্ত " জবুল ইসলামও ‘ইনকিলাব' বা 'শহিদ' শব্দ সহজেই বাংলা ভাষার মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছেন। বিদ্যাসাগরও তাঁর চলিত ভাষায় লেখা রচনার মধ্যে আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরবি-ফারসি শব্দের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করাকে মূর্খামী বলে মনে করতেন ।

উদ্ধৃতাংশটি সৈয়দ মজুতবা আলীর নব নব সৃষ্টি পাঠ্য প্রবন্ধ থেকে নেওয়া। রচনার গাম্ভীর্য, আভিজাত্য, চটুলতার সঙ্গে ভাষার ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। নতুন শব্দ তৈরি বা বিষয়ের মধ্যে দিয়ে নতুন চিন্তা ও অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে গেলে বিদেশি ভাষার প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি। বর্জনের ফলে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ আরও বেশি করেই। প্রবেশ করেছে। তবে বিদেশি শব্দ কোনোভাবেই লেখার মাধুর্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে না যদি তা বিষয়কেন্দ্রিক হয়। রবীন্দ্রনাথ আরবি-ফারসিকে স্বাগত জানিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দেই লিখেছেন, “আৰু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।” নজরুল ইসলাম ও ইনকিলাব', শাহদ', প্রভৃতি শব্দ করেছেন। শংকরদর্শনের বাংলায় অনায়াসেই ব্যবহার আলোচনায় যে গাম্ভীর্য ও আভিজাত্য রয়েছে, তা সংস্কৃত শব্দ ব্যবহারেই যথার্থরূপ লাভ করে। 'বসুমতী' পত্রিকার সম্পাদকীয় প্রকাশের ভাষাও গম্ভীর ভাব বহন করে। কিন্তু 'বাঁকা চোখে' পত্রিকার ভাষায় চটুলতা তার বিষয়-উপযোগী। আবার রেলের ইঞ্জিন কীভাবে চালাতে হয় বা বিজ্ঞানচর্চা ও দর্শনের বিষয়। জানতে ইংরাজি ভাষার বিকল্প নেই। সুতরাং ভাষা প্রয়োগের যথার্থতাই বিষয়বস্তুর নির্যাস তুলে ধরতে সক্ষম।

লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর নব নব সৃষ্টি। রচনাংশে জানিয়েছেন যে বাংলায় যেসব বিদেশি শব্দ প্রবেশ করেছে সেগুলির মধ্যে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি ভাষার শব্দই প্রধান।  একসময়ে ভারতবর্ষে তথা বাংলা দেশে সংস্কৃত ভাষ্য ব্যাপক চর্চা ছিল। এখনও স্কুল কলেজে সংস্কৃত চর্চা হয়।  বাংলা ভাষায় সংস্কৃত ভাষার প্রভাব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক সংস্কৃত শব্দ বর্তমানেও সামান্য হলেও বাংলা ভাষায় প্রবেশ করছে। সংস্কৃত ভাষাকে বাংলার মাতৃসম ভাষা বলাই হয়, সংস্কৃত চর্চা বন্ধ করে দিলে বাংলা ভাষা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা সান্নিধ্য হারাবে। লেখক বলেছেন, “আমরা অন্যতম প্রধান কর থেকে বঞ্চিত হবো।" আধুনিক শিক্ষার অগ্রগতিতে দর্শনশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা এবং বিজ্ঞানচর্চায় ইংরেজি ভাষা বিকল্প নেই। উদাহরণস্বরূপ লেখক বলেছেন যে রেলের ইতি কী করে চালাতে হয়, সে বিষয়ে বাংলার কোনো বই নেই ফলে বাঙালিকে ইংরেজি ভাষারই শরণাপন্ন হতে হয়। সু ইংরাজী চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি।