পঞ্চম পাঠ ➤ হারিয়ে যাওয়া কালি কলম

● লেখক শ্রীপান্থ ছেলেবেলায় বাঁশের কলম, মাটির দোয়াত, ঘরে তৈরি কালি আর কলাপাতা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন।অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি আলোচ্য প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন।
● লেখক ভেবেছেন, তাঁর যদি প্রাচীন মিশরে জন্ম হত, তাহলে তিনি নীলনদের তীর থেকে নল-খাগড়া ভেঙে নিয়ে এসে সেটিকে ভোঁতা করে তুলি বানিয়ে লিখতেন। আবার বাঙালি না হয়ে প্রাচীন সুমোরিয়ান বা ফিনিসিয়ান হলে বনপ্রান্ত থেকে একটা হাড় কুড়িয়ে এনে কলম বানাতেন | আবার ভেবেছেন, রোমসম্রাজ্যের অধীশ্বর হলে তিনি জুলিয়াস সিজারের মতো ব্রোঞ্জের শলাকা বা স্টাইলাস ব্যবহার করতেন। সিজার যে কলমটি দিয়ে কাসকাকে আঘাত করেছিলেন, সেটি আসলে ছিল ব্রোঞ্জের ধারালো শলাকা। চিনাদের কলম অবশ্য তুলি। এইভাবে লেখক কলম আবিষ্কারের প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে যেতে চেয়েছেন।

হারিয়ে যাওয়া কালি-কলম' রচনায় সময়ের অগ্রগতিতে কলমের পরিণতি দেখে লেখক নিখিল সরকার এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি করেছেন।

আধুনিকতার পথে কলম ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে
মানুষের হাত থেকে। সময়ের ধারায় বাঁশের পেন, পালকের পেন ক্রমশ হারিয়ে গিয়ে ফাউন্টেন পেন, সম্ভার বল পেন বাজারে আসে।তাই পকেটমারও কলম চুরি করে না—‘কলম তাদের কাছে আজ অস্পৃশ্য।
• একসময়ে মানুষের লেখার একমাত্র অবলম্বন ছিল বাঁশের কলম |শৈশবে লেখকরা এরূপ কলম নিজেরাই বানাতেন। সময়ের অগ্রগতিতে বাঁশের কলম উধাও হয়ে এল পালকের কলম । তারপর ফাউন্টেন পেন এবং বল পেন বাজার দখল করল। ক্রমশ ফেরিওয়ালারাও কলম বিক্রিকে পেশা করলে। লেখক দেখেছেন অতি আধুনিক ছেলেরা কলম বুকপকেটে রাখার পরিবর্তে কাঁধের ছোটো পকেটে সাজিয়ে রাখে। এমনকি ভিড় ট্রামে-বাসে মহিলাদের মাথার খোঁপাতেও কলম গুঁজে রাখতে দেখা গিয়েছে।“বিস্ফোরণ! কলম বিস্ফোরণ।” কলম একসময় সর্বভোগ্য এবংসার্বজনীন হয়ে উঠল। শিক্ষা বা বিদ্যাবুদ্ধি আর কলমের যে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল তা মুছে যেতে থাকল | কলম সুলভ এবং সর্বভোগ্য হওয়ার ফলে তার কদরও হারিয়েছে। ফলে যে পকেটমার একসময় কলম হাতসাফাই করত তার কাছেও এখন কলম অস্পৃশ্য।

আলোচ্য অংশটি শ্রীপান্থর লেখা ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম নামক প্রবন্ধটি থেকে গৃহীত। পুরোনো দিনের নানা ধরনের কলম,কালি ও দোয়াতকেই কমপিউটার জাদুঘরে পাঠাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে।
● লেখক শ্রীপান্থ কালিকলমের ভক্ত ছিলেন। ছোটোবেলায় নানা ধরনের কলম তিনি ব্যবহার করতেন | কালি তৈরির পদ্ধতিও ছিল বিচিত্র। তারপর বাজারে এল নানা ধরনের ফাউন্টেন পেন।অতীতের প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা এই কালি-কলম দিয়েই তাঁদের অমর রচনাগুলি লিখে গেছেন। কিন্তু পুরোনো দিনের সেই কালিকলম এবং দোয়াত এখন অবলুপ্তির পথে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে কম্পিউটার | বোতামের ওপর চাপ দিয়ে এখন অক্ষর বিন্যাস করা যায়। লেখকের মতে, এই পদ্ধতি তো যান্ত্রিক। এতে মনের সংযোগ খুবই কম | হাতের লেখার একটি আলাদা মূল্য আছে,যার মাহাত্ম্য কমপিউটার কখনও ক্ষুণ্ন করতে পারে না। লেখক মনে করেছেন, এই জন্যই ইতিহাসে কলমের স্থান চিরকাল গৌরবের।উদ্ধৃতিটির মধ্যে দিয়ে কালি ও কলমের প্রতি তাঁর অটুট ভালোবাসার কথাই ব্যক্ত হয়েছে

হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' রচনায় লেখক জানিয়েছেন কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটি নামি দোকানে তিনি ফাউন্টেন পেন কিনতে গিয়েছিলেন।

ফাউন্টেন পেন আবিষ্কার পেনের জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে এক অফুরন্ত কালির ফোয়ারা খুলে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কোনো একদিন তিনি কলেজ স্ট্রিটের একটি নামি দোকানে ফাউন্টেন পেন কিনতে গিয়েছিলেন। দোকানদার তাঁকে পার্কার, শেফার্ড, ওয়াটারম্যান, সোয়ান, পাইলট হরেক রকম পেনের নাম ও তাদের দামের কথাও বলেন। লেখকের মুখের অবস্থা দেখে আর তাঁর পকেটের অবস্থা বুঝতে পেরে দোকানদার তাঁকে একটা সম্ভা জাপানি পাইলট কলম কিনতে বলেন।দোকানদার পেনটির ঢাকনা খুলে একটি কাঠের বোর্ডের ওপর ছুঁড়ে দেন। সার্কাসে যেমন জীবন্ত মানুষের দিকে ছুরি ছুঁড়ে দেওয়ার পরও সে অক্ষত থাকে, বোর্ড থেকে খুলে দোকানদারও দেখান পেনটার নিব অক্ষত আছে। তারপর তিনি দু-এক ছত্র লিখেও দেখান।আনুমানিক পনেরো-ষোলো বছরের কিশোর লেখকের কাছে পেনটি জাদুপেন বলেই মনে হয়। লেখক পরবর্তীতে অনেক ফাউন্টেন পেন কিনলেও দীর্ঘদিন ওই জাপানি পাইলটটি তিনি যত্ন করে রেখেছিলেন। এই প্রসঙ্গেই লেখক জানিয়েছেন যে ফাউন্টেনপেন সংগ্রহের নেশা অনেক লেখকের মধ্যেই তিনি দেখেছেন।“আশ্চর্য সবই আজ অবলুপ্তির পথে।”— লেখকের আশ্চর্য হওয়ার কারণ বুঝিয়ে দাও।‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম' রচনায় লেখক আধুনিকতার কালপ্রবাহে কলম কীভাবে অবলুপ্ত হতে চলেছে সেই বিষয়েই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।