প্রথম অধ্যায় ➤ ইতিহাসের ধারণা

আধুনিককালে ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্য
ভূমিকা: একদা ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে মূলত রাজা- মহারাজদের কাহিনি, রাজবংশের উত্থান-পতন, সেনাপতি বা দিগ্‌বিজয়ী বীরদের সাফল্য-ব্যর্থতার কাহিনি, সমাজের উচ্চবর্ণের জীবনচর্চা প্রভৃতি আলোচনাই গুরুত্ব পেত। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বহু নতুন বিষয় ইতিহাসচর্চার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ইতিহাসচর্চা বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন—
[1] রাজাদের কার্যকলাপ : বিগত শতাব্দীর বর্তমানকালেও যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্যজয়, শান্তিপ্রতিষ্ঠা, সন্ধি, রাজবংশের উত্থান-পতন প্রভৃতি বিষয়ের ইতিহাসচর্চা
অব্যাহত আছে।
[2] উচ্চবর্ণের আলোচনা : বিগত শতকের সাম্প্রতিককালেও অভিজাত, ভূস্বামী, জমিদার, সামন্তপ্রভু প্রভৃতি সমাজের উচ্চবর্ণের আলোচনা
ইতিহাসচর্চার অন্যতম বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
[3] সাধারণ মানুষের আলোচনা: বিগত শতক পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক- পরিচ্ছদ, শিল্প-সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়ের ইতিহাসচর্চা অনেকটা উপেক্ষিত থাকলেও সাম্প্রতিককালে এসব বিষয়ের চর্চা ও গুরুত্ব যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
[4] স্থানীয় ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে আঞ্চলিক ও স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে চর্চাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মহাদেশ থেকে দেশ, দেশ থেকে স্থানীয় অঞ্চলের শহর। ও গ্রাম, শহর ও গ্রাম থেকে ব্যক্তি, মানুষ প্রভৃতি সবকিছুই ইতিহাসের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।
[5] বিজ্ঞানের ইতিহাস: প্রাচীনকাল থেকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার যে ধারাবাহিক অগ্রগতি ঘটেছে সে বিষয়ের ইতিহাসচর্চাও সাম্প্রতিককালে বৃদ্ধি পেয়েছে।

[6] নারী ইতিহাস: একদা ইতিহাসচর্চায় নারীরা যথেষ্ট উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমানেও বিভিন্ন ইতিহাসবিদ নারী- ইতিহাসচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন।

নতুন সামাজিক ইতিহাসের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামাজিক ইতিহাস। আগে সামাজিক ইতিহাস শুধু রাজা-মহারাজা,
অভিজাতবর্গ ও উচ্চবর্গের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানকালে এই আলোচনার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে এবং সমাজের সাধারণ, নিম্নবর্গ ও প্রান্তিক মানুষের আলোচনাও এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সামাজিক ইতিহাস 'নতুন সামাজিক ইতিহাস' রূপে পরিচিত হয়েছে।

নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি

ভূমিকা: ১৯৬০-৭০-এর দশকে নতুন সামাজিক ইতিহাসের আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। এই সময় থেকে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেসব মানুষের ইতিহাসচর্চা শুরু হয়।
[1] নীচ থেকে ওপর দিকে দৃষ্টিপাত: নতুন সামাজিক ইতিহাসের আলোচনায় ওপর থেকে নীচের দিকে দেখার পরিবর্তে নীচে থেকে ওপরের দিকে দেখার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ সমাজের মুষ্টিমেয় উচ্চবর্গের মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজের বৃহত্তর ক্ষেত্রে সাধারণ ও নিম্নবর্গের মানুষের ভূমিকার ভিত্তিতে সমাজকে দেখার চেষ্টা করা হয়।
[2] বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য নতুন সামাজিক ইতিহাসে মুষ্টিমেয় উচ্চবর্গকে নয়, বৃহত্তর সাধারণ, নিম্নবর্গের ও প্রান্তিক মানুষকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সমাজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবদান নতুন সামাজিক ইতিহাসে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা
করা হয়।

ভূমিকা: খেলাধুলার ইতিহাস খুবই প্রাচীন। মানুষের জীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রোমান কবি জুভেনাল বলেছেন, “মানুষ দুটো জিনিসের জন্য আকুল হতে পারে -রুটি ও খেলাধুলো।"
(1) খেলাধুলার জনপ্রিয়তা : বিগত শতক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলাধুলা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক হবসৰম উল্লেখ করেছেন যে, বিংশ শতকে ইউরোপীয় জীবনধারার অন্যতম প্রধান সামাজিক অভ্যাস হল খেলাধুলা।
[2] খেলাধুলার গুরুত্ব কোনো সমাজের খেলাধুলা সেই সমাজের স্বরূপ প্রকাশ করে থাকে। খেলাধুলায় কোনো। সমাজের মেয়েদের অংশগ্রহণ সেই সমাজে নারী স্বাধীনতার প্রমাণ দেয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের হারিয়ে বাংলার মোহনবাগান দল আই এর এ শিল্ড জিতে যে আনন্দে মেতে ওঠে তা ছিল প্রকৃতপক্ষে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের বাংলা ভাগের জবাব।
[3] জাতীয় আবেগ : খেলাধুলা বর্তমানকালে জাতীয় আবেগে পরিণত হয়েছে। খেলাধুলা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সমাজ-বিবর্তন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতিকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে চলেছে।
[4] পাশ্চাত্যে খেলার ইতিহাসচর্চা: সাম্প্রতিককালে পাশ্চাত্যে খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা শুরু হয়। জেএ ম্যাসান, রিচার্ড হোল্ড প্রমুখ গবেষক এই বিষয়ে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠে 'ব্রিটিশ সোসইটি অব স্পোর্টস হিস্ট্রি'।
(5) ভারতে খেলার ইতিহাসচর্চা: সাম্প্রতিককালে বাংলা তথা ভারতে খেলাধুলার ইতিহাসচর্চায় যাঁরা বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বোরিয়া মজুমদার, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রূপক সাহা, গৌতম ভট্টাচার্য প্রমুখ।

চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসচর্চা
ভূমিকা: বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাচীনকালেই চিকিৎসাবিদ্যার সূত্রপাত ঘটেছে। প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ পেরিয়ে চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
[1] বিবর্তন: প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যুগে চিকিৎসাবিদ্যার নানা পরিবর্তন, উন্নতি ও বিবর্তন ঘটেছে। ফলে আয়ুর্বেদিক, কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি,
অ্যালোপ্যাথি, আকুপাংচার প্রভৃতি চিকিৎসাবিদ্যার নানা শাখার উদ্ভব ঘটেছে।
[2] ভারতে অগ্রগতি : ভারতে প্রাচীনকাল থেকেই।চিকিৎসাবিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল বলে জানা যায়। কুষাণ যুগ, গুপ্ত যুগ এবং তার পরবর্তীকালে বিভিন্ন
উল্লেখযোগ্য ভারতীয় চিকিৎসকদের নাম জানা যায়।তবে মধ্যযুগে এসে ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি থমকে যায়।
[3] প্রাচ্যে পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যা: আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি প্রথম ইউরোপে শুরু হয়। ইউরোপের বিভিন্নঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে তা প্রাচ্যের  বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে মধ্যযুগীয় পিছিয়ে পড়া চিকিৎসাবিদ্যা ঔপনিবেশিক আমলে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।
[4] ইতিহাসচর্চা : সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা- বিদ্যার ইতিহাসচর্চা যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে ইতিহাসচর্চার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘প্রাচীন ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞান’, পার্থসারথি চক্রবর্তী রচিত ‘চিকিৎসা বিজ্ঞানের আজব কথা’, তপন চক্রবর্তী রচিত ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস' প্রভৃতি।

নারী ইতিহাস চর্চা:
ভূমিকা: ইতিহাসের বিষয়বস্তু সমগ্র মানবজাতি, যার অর্ধেক অংশ হল নারী। অথচ বিগত শতাব্দীতেও ইতিহাসচর্চায় নারীজাতিকে পুরুষের সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হত না।ইতিহাসে নারী কী ভূমিকা পালন করেছে তা নিয়ে বর্তমানকালে চর্চা শুরু হয়েছে। এই চর্চাই হল নারী ইতিহাস।
(1) ইতিহাসে নারীর ভূমিকা:
যুগে যুগে ইতিহাসে নারীর আসামান্য অবদান রয়েছে। নেফারতিতি, ক্লিওপেট্রা, রাজিয়া, নূরজাহান, দুর্গাবতী প্রমুখ নারী নিজেরযোগ্যতার দ্বারা প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজনৈতিক ক্ষমতার অসীম আধারে পরিণত হয়েছিলেন। বিংশ-একবিংশ
শতকেও বিভিন্ন দেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির ওপর বিশ্বের বিভিন্ন নারী প্রাধান্য বিস্তার করেছেন।
[2] ইতিহাসে নারীর বঞ্চনা:
ইতিহাসের আলোচনায় পুরুষের আন্দোলন, যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি প্রভৃতি গুরুত্ব পেলেও নারীদের নেতৃত্ব, অধিকার, দাবিদাওয়া,
মর্যাদা, শিক্ষাসংস্কৃতি প্রভৃতির যথেষ্ট আলোচনা ইতিহাসে করা হত না।আন্দোলন
[3] নারী ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত: ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা নিয়ে আধুনিককালে গবেষকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটছে এবং পুরুষের সঙ্গে নারী ইতিহাসের চৰ্চাও গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে নারী ইতিহাচর্চার সূত্রপাত ঘটেছে।
[4] পাশ্চাত্যে নারী ইতিহাসচর্চা : সম্প্রতি পাশ্চাত্যে নারীবাদী ইতিহাসচর্চাবিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলি লিখেছেন জোয়ান কেলি, গের্ডা লার্নার, বেটি ফ্রিডান, কেটলিন মোরান, জেসিকা ভ্যালেন্টি,জুডিথ বাটলার প্রমুখ গবেষক।
[5] ভারতে নারী ইতিহাসচর্চা: ভারতে নারী ইতিহাসচর্চা করেছেন নীরা দেশাই, জেরাল্ডিন ফোর্বস, বি আর নন্দ, কমলা ভাসিন প্রমুখ ইতিহাসবিদ এবং বাংলায় দীনেশচন্দ্র সেন, রামেন্দ্র চৌধুরী, শ্রীমন্মথনাথ সরকার, রাজশ্রী বসু, চিত্রা দেব, জোহরা পারুল, মালেকা বেগম, মাহমুদ শামসুল হক প্রমুখ ইতিহাসবিদ এই ব্যাপারে চর্চা করেছেন।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র:
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ভারতে সংবাদপত্রের প্রকাশ শুরু হয়। আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সমসাময়িক বিভিন্ন সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র।
[1] বিভিন্ন সংবাদপত্র: যেসব সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্ররূপে স্বীকৃত ঐতিহাসিক উপাদান যেমন 'বেঙ্গল গেজেট’, ‘দিগদর্শন’, ‘সমাচার দর্পণ', 'সম্বাদ কৌমুদী', ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’, ‘সম্বাদ প্রভাকর', 'বঙ্গদর্শন',‘সোমপ্রকাশ', হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘সঞ্জীবনী’, ‘সন্ধ্যা', ‘কেশরী’, ‘মারাঠী’ প্রভৃতি।
[2] রাজনীতি: ব্রিটিশ শাসনকালে প্রকাশিত সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রগুলিতে সমসাময়িক বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলি, যেমন—ব্রিটিশদের শাসননীতি, ভারতীয়দের মনোভাব প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব তথ্য আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার সময় যথেষ্ট সহায়তা করতে পারে।
[3] সমাজ: সমকালীন ভারতীয় সংবাদপত্রগুলিতে উচ্চবিত্ত থেকে সাধারণ মানুষের সমাজ, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ক ঘটনার খবরাখবর নিয়মিত ছাপা হত। এসব তথ্যাদি থেকে ব্রিটিশ ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে নানা ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।

[4] শোষণ : আধুনিক ভারতের ইতিহাসে ব্রিটিশ শোষণ ওঅত্যাচারের নানা ঘটনাবলি সমসাময়িক সংবাদপত্রগুলিতে নিয়মিত ছাপা হত। এসব তথ্যাদি শোষণ ও অত্যাচারের ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

[5] অসন্তোষঃ ব্রিটিশ সরকার, জমিদার ও মহাজনদের শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতীয়রা বিভিন্ন বিদ্রোহ আন্দোলন শুরু করে।এসব খবর নিয়মিত সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত হত। এসব খবরের তথ্যাদি আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনায় খুবই সাহায্য করে।
[6] জনমতের প্রতিফলন: বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কী তা সমকালীন সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত হয়। ফলে সংবাদপত্রগুলিতে সমকালীন সাধারণ মানুষের মতামতেরও প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেৰে ‘বঙ্গদর্শন' পত্রিকা:
ভূমিকা: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সমসাময়িক যেসব সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হল অত্যন্ত জনপ্রিয়
‘বঙ্গদর্শন' পত্রিকা।
[1] পত্রিকার প্রকাশ: 'বঙ্গদর্শন' ছিল ব্রিটিশ শাসনকালে প্রকাশিত একটি বিখ্যাত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
‘বঙ্গদর্শন' পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রকাশের প্রথম থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন এর সম্পাদক, লেখক ও প্রধান পরিচালক।
[2] শিক্ষিত সমাজের মুখপত্র: 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজের প্রধান মুখপত্র হয়ে ওঠে। এই পত্রিকাতেই বাঙালি জাতির আধুনিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটত।বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়াও গঙ্গাচরণ, রামদাস সেন, অক্ষয়
সরকার, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ প্রতিভাবন লেখক এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।
[3]সময়কালীন তথ্য : 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় সমাজ, সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ ও বিভিন্ন উপন্যাস প্রকাশিত হত।এইসব রচনা থেকে সেই সময় বাংলায় ইংরেজ সরকার ও জমিদারের শোষণ ও অত্যাচার সামাজিক পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের অবস্থা, সাহিত্য,  রাজনীতি , দর্শন , ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়।

[4] প্রভাব: (1)'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার দ্বারা সমকালীনভারতীয় জাতীয়তাবাদ যথেষ্ট প্রভাবিত হয়।
(2) বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা 'বন্দেমাতরম' সংগীতটি প্রথম 'বাদর্শন' পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। 'বন্দেমাতরম' পরবর্তীকালে ভারতীয় বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল মন্ত্রে পরিণত হয়।

[3] 'বঙ্গদর্শন'-এ প্রকাশিত 'সাম্য'সহ বিভিন্ন প্রবন্ধ বাঙালি সমাজে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসারে যথেষ্ট সহায়তা করে।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা:
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘সোমপ্রকাশ' পত্রিকার পাতায় পাতায় আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার নানা উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে। মহেন্দ্রনাথ বিদ্যানিধি তাঁর 'বাঙালা সংবাদপত্রের ইতিহাস' নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, “যাহার আবির্ভাবে ও প্রভাবে সংবাদপত্র মহলে হুলুস্থুল পড়ে, তাহাই 'সোমপ্রকাশ'।”

[1] পত্রিকার প্রকাশ : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় কলকাতা সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (১৮১৯-১৮৮৬ খ্রি.) ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ করেন। তিনিই ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সোমপ্রকাশ পত্রিকায় ব্রিটিশ শাসনের প্রায় ৩০ বছরের বিভিন্ন সংবাদ, তৎকালীন বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে নানা তথ্য পরিবেশিত হয়েছে।
[2] রাজনৈতিক চেতনা : বাংলায় ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকাতেই প্রথম রাজনৈতিক খবরাখবর পরিবেশন শুরু হয়। পত্রিকায় নিয়মিত ব্রিটিশ সরকার ও জমিদারদের শোষণ ও অত্যাচার, সামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা প্রভৃতি ঘটনাগুলি তুলে ধরে পাঠকদের সচেতন করে তোলা হয়।
[3] দরিদ্র চাষিদের সমর্থন: 'সোমপ্রকাশ' দরিদ্র চাষিদের সমর্থনে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ করে। এই পত্রিকা কৃষকদের দিয়ে জোর করে নীল ও চা চাষের প্রতিবাদ করে। এর ফলে শিক্ষিত বাঙালি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়।
[4] সামাজিক সচেতনতা : বাল্যবিবাহ, বহু বিবাহ, কৌলিন্য প্রথা, মদ্যপান প্রভৃতির বিরুদ্ধে এবং ইলবার্ট বিল, নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ প্রভৃতির পক্ষে নিয়মিত রচনা
প্রকাশ করে 'সোমপ্রকাশ' পত্রিকা এসব বিষয়ে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
[5] সংবাদপত্র আইনের প্রতিবাদ: ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বড়োলাট লর্ড লিটন ‘দেশীয় সংবাদপত্র আইন' পাস করে। ভারতীয় সংবাদপত্রগুলির ওপর হস্তক্ষেপ করলে ‘সোমপ্রকাশ’ এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।আইনের দ্বারা পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হলেও কিছুদিন পর তা আবার চালু হয়।

আধুনিক ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্য:
ভূমিকা: ‘ইতিহাস’ বলতে বোঝায় অতীতের কথা। বিগত শতক পর্যন্ত ইতিহাসের আলোচনায় মূলত রাজারাজড়া, অভিজাত সম্প্রদায়সহ সমাজের উচ্চবর্গের বিভিন্ন মানুষকে নিয়ে আলোচনা করা হত। কিন্তু বর্তমানকালে বহু নতুন নতুন বিষয়ের
ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছে। ফলে আধুনিক ইতিহাসচর্চা যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

[1] নতুন সামাজিক ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে সমাজের দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর প্রমুখের আলোচনা ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। এই ধরনের ইতিহাসচর্চা ‘নতুন সামাজিক ইতিহাস' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক ফার্নান্দ ব্রদেল, নাদুরি জেনোভিস, রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, শাহিদ আমিন, সুমিত সরকার, গৌতম ভদ্র প্রমুখ এই ধারার ইতিহাসচর্চা করছেন।

[2] খেলার ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদ, দেশ বা জাতির সম্পর্কও খেলাধুলার মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। খেলাধুলার ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন গবেষক চর্চা করছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন।বোরিয়া মজুমদার, রূপক সাহা, গৌতম ভট্টাচার্য, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ধারণ করেছে।
[3] খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস : বিভিন্ন দেশ বা জাতির খাদ্যাভ্যাস যুগে যুগে অন্য কোনো জাতির খাদ্যাভ্যাস বা কোনো বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এর ফলে সেই দেশ বা জাতির খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিককালে শরিফউদ্দিন আহমেদ, কে টি আচয়, প্যাট চ্যাপম্যান প্রমুখ গবেষক চর্চা করছেন।
[4] পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস: প্রতিটি সমাজে সামাজিক স্তরভেদে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ পৃথক হয়। তা ছাড়া যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বা অন্য কোনো জাতির প্রভাবেও কোনো দেশ বা জাতির মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদের পরিবর্তন ঘটে। সাম্প্রতিককালে যারা পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মলয় রায়, কাল কোহলার, এম্মা টারলো প্রমুখ।

[5] শিল্পচর্চার ইতিহাস: সংগীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রাঙ্কন, ফোটোগ্রাফি প্রভৃতি শিল্পকলা আধুনিক যুগে মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। এসব শিল্পকলার পরিবর্তন ও বিবর্তন চলেছে ধারাবাহিকভাবে।সমকালীন ঐতিহাসিক ঘটনাবলিও এসব শিল্পকলার বিষয়বস্তুতে স্থান করে নেয়। সাম্প্রতিককালে যাঁরা শিল্পের ইতিহাসচর্চায় খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ক্যারল ওয়েলস, সুধীর চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজীবন মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিক কুমার ঘটক, সত্যজিৎ রায়, ফার্গুসন, লালা দীনদয়াল, অশোক মিত্র প্রমুখ।
[6] যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাস : যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে সভ্যতারও অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। আধুনিক যুগে রেল, সড়ক, বিমান, জাহাজ প্রভৃতি পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতির ফলে দেশ-বিদেশের মানুষ খুব কম সময়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে যাতায়াত করতে পারছে। এসবের ইতিহাস নিয়ে সাম্প্রতিককালে জন আর্মস্ট্রং, ইয়ান কের, সুনীল কুমার মুন্সি, নীতি সিন্‌হা প্রমুখ চর্চা করছেন।
[7] স্থানীয় ও শহরের ইতিহাস: সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ক্ষুদ্র অঞ্চল নিয়ে স্থানীয় ইতিহাস এবং বিভিন্ন শহরের ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছে। এসব বিষয়ের ইতিহাসচর্চায়
যাঁরা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কুমুদনাথ মল্লিক, সতীশচন্দ্র মিত্র, রাধারমন সাহা, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুধীরকুমার মিত্র, পূর্ণেন্দু
পত্রী, রাধারমন মিত্র, নারায়ণী গুপ্ত প্রমুখ।
[8] বিজ্ঞানের ইতিহাস: প্রাচীনকাল থেকে বিজ্ঞানের যেসব শাখায় গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন ও অগ্রগতি ঘটেছে সেগুলির মধ্যে অন্যতম হল যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র ও কৌশল, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি। এর ফলে বিশ্ববিজ্ঞান আজ চরম উৎকর্ষতার শিখরে পৌঁছেছে বিজ্ঞানের এসব শাখার অগ্রগতি সম্পর্কে যাঁরা ইতিহাসচর্চা করেছেন ও করছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বার্নেট, যদুনাথ সরকার, জে ডি বার্নাল, ডেভিড আরনল্ড, কৌশিক রায় প্রমুখ।
[9] পরিবেশের ইতিহাস : যুদ্ধ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন প্রভৃতির ফলে বর্তমানকালে বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমাগত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিককালে পরিবেশ সম্পর্কে মানুষ ক্রমে সচেতন হয়ে উঠছে এবং পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনে দিকে দিকে আন্দোলন, প্রচারাভিযান প্রভৃতি শুরু হয়েছে। এসব
উদ্যোগ নিয়ে আলফ্রেড ক্রসবি, রিচার্ড গ্রোভ, ইরফান হাবিব, মাধব গ্যাডগিল, রামচন্দ্র গুহ, মহেশ রঙ্গরাজন প্রমুখ গবেষক সাম্প্রতিককালে ইতিহাসচর্চা করেছেন।
[10] নারী ইতিহাস : পুরুষের মতো নারীর ভূমিকাও ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ব্যক্তির উদ্যোগে নারীর ইতিহাসচর্চা বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীদের কার্যকলাপ এবং ভূমিকাও ইতিহাসে সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হচ্ছে। নারী ইতিহাস নিয়ে জোয়ান কেলি, জোয়ান স্কট, নীরা দেশাই, জেরাল্ডিন ফোর্বস, বি আর নন্দ, কমলা ভাসিন প্রমুখ গবেষক যথেষ্ট চর্চা করেছেন।
উপসংহার: বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইতিহাসে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন বিষয়ের চর্চা স্থানলাভ করছে। ফলে ইতিহাসচর্চা ক্রমে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বৈচিত্র্যের ফলে রাজকাহিনির গন্ডি পেরিয়ে ইতিহাস আজ প্রকৃতপক্ষে সর্বস্তরের মানুষের ইতিহাস হয়ে উঠেছে। ফলে ‘সামগ্রিক ইতিহাস' (Total History) চর্চার বিষয়টিও সম্পন্ন হচ্ছে।

স্থানীয় ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চা:
ভূমিকা: জাতি, দেশ বা মহাদেশের অতীত ঘটনাবলির আলোচনা ও বিশ্লেষণ বিগত শতকেও ইতিহাসচর্চার প্রচলিত ও স্বীকৃত প্রথা ছিল। দেশ বা জাতির অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থানীয় অঞ্চলের ইতিহাসচর্চা তখন বিশেষ গুরুত্ব পেত না।
[1] স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্ব: ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন স্থান, অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের ইতিহাস একত্রিত হয়ে কোনো দেশের জাতীয় ইতিহাস গড়ে ওঠে। তাই বিংশ শতকে স্থানীয় ইতিহাস ও ইতিহাসচর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
[2] স্থানীয় ইতিহাসের বিষয়: বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্থানীয় ইতিহাসের চর্চা হয়ে থাকে। স্থানীয় অঞ্চলের আর্থসামাজিক বিবর্তন, শিল্প স্থাপত্য, লোকসংস্কৃতি, স্থানীয় শাসকের ইতিবৃত্ত প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় স্থানীয় ইতিহাসের আলোচনায় উঠে আসে।
[3] সাবধানতা: স্থানীয় ইতিহাসচর্চার বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে অন্যতম হল মৌখিক উপাদান। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৌখিক উপাদানে বহু কল্পনা ও অতিকথার প্রবেশ ঘটে। তাই যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে মৌখিক উপাদানগুলি যাচাই করে তারপর সেগুলি ইতিহাসের তথ্য হিসেবে ব্যবহার
[4] জেলাস্তরের ইতিহাসচটা : স্থানীয় ইতিহাসচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য ধারা হল জেলাস্তরের ইতিহাসচর্চা। বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষক এই বিষয়ে চর্চা করছেন।এই বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম কালীকমল সার্বভৌম রচিত 'সে ইতিহাস বগুড়ার বৃত্তান্ত, কুমুদনাথ মল্লিক রচিত 'নদীয়া কাহিনি', নিখিলনাথ রায়
রচিত ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনি', সতীশচন্দ্র মিত্র রচিত ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস', এ কে এম গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ রচিত ‘নোয়াখালীর ইতিহাস-ঐতিহ্য’, কালীনাথ চৌধুরী রচিত ‘রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস', শ্রীকেদারনাথ মজুমদার ময়মনসিংহের রচিত ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস বিবরণ’ প্রভৃতি।
[5] ক্ষুদ্র অঞ্চলের ইতিহাসচর্চা: জেলাস্তর থেকে ক্ষুদ্রস্তর নিয়েও আজকাল ইতিহাসচর্চা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এরুপ ইতিহাসচর্চার কয়েকটি দৃষ্টান্ত হল ড. রতনলাল চক্রবর্তী রচিত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস', ড. খগেন্দ্রনাথ বসু রচিত ‘দৌলতপুরের বিবরণ', বিপুলরঞ্জন সরকার রচিত ‘চাকদহ রামলাল একাডেমি পট ও পটভূমিকা' প্রভৃতি।