প্রথম অধ্যায় ➤ গ্রহরূপে পৃথিবী

মহাকাশে যেসব বৃহৎ জ্যোতিষ্কের নিজস্ব আলো ও তাপ আছে, যাদের কেন্দ্র করে গ্রহ ও উপগ্রহসহ মহাজাগতিক বস্তুসমূ নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে, তাদের নক্ষত্র বলে। যেমন—সূর্য।

উপগ্রহ হল কোনো গ্রহ থেকে সৃষ্ট ক্ষুদ্র কঠিন পিণ্ড। উপগ্রহের নিজস্ব আলো ও তাপ নেই, নির্দিষ্ট কক্ষপথে উৎস গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে। যেমন—পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ।

সৌরজগতের গ্রহগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা – [1] গ্রহ ও [2] বামন গ্রহ।

গ্রহ হল মহাকাশে কোনো নক্ষত্র থেকে সৃষ্ট কঠিন পিণ্ড। গ্রহের নিজস্ব আলো ও তাপ নেই, এরা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয়। এরা নির্দিষ্ট কক্ষপথে উৎস নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকরে। যেমন—পৃথিবী।

সৌরজগতের গ্রহগুলি হল – [1] বুধ, [2] শুক্র, [3] পৃথিবী, [4] মঙ্গল, [5] বৃহস্পতি, [6] শনি, [7] ইউরেনাস, [8] নেপচুন।

মহাকাশে এমন কিছু গ্রহ আছে, যারা তাদের কক্ষপথের সন্নিহিত অঞ্চল থেকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকার মহাজাগতিক বস্তুকে সরিয়ে দিতে পারে না, এরাই বামন গ্রহ। যেমন—প্লুটো।

জিওডেসি (geodesy) বিজ্ঞানের এমন একটি শাখা, যা সমীক্ষা ও গণনার সাহায্যে পৃথিবীর আকৃতি (shape) ও আকার (size) পরিমাপ করে।

1970-এর দশকে আমেরিকায় GPS-এর ব্যবহার প্রথম শুরু হয়েছিল। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রথম এর ব্যবহার শুরু করে।

| গ্রিক শব্দ Geoeides থেকে Geoid কথাটির উৎপত্তি। Geo অর্থ পৃথিবী এবং Oeides অর্থ মতো বা সদৃশ। সুতরাং GEOID শব্দের অর্থ হল পৃথিবীর মতো।

GPS-এর প্রধান অংশগুলি হল – [1] মহাকাশ অংশ, [2] ভূপৃষ্ঠীয় অংশ, [3] ব্যবহারকারী অংশ।

মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে সাদা ও নীল রঙের দেখায়। বায়ুমণ্ডলের মেঘে সূর্যালোক পড়ে সাদা দেখায় এবং জলভাগকে নীল দেখায়। যেহেতু পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশই সমুদ্রবেষ্টিত, তাই মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে নীল দেখায় ৷ সেইজন্য পৃথিবীকে নীল গ্রহ বলে।

উত্তর | পৃথিবীর আবর্তনের জন্য নিরক্ষীয় অঞ্চলে কেন্দ্রবহির্মুখী শক্তির প্রভাবে নিরক্ষীয় প্রদেশটি বেশি স্ফীত এবং মেরু প্রদেশে কেন্দ্রমুখী শক্তির কারণে দুই মেরুপ্রদেশ চাপা হয়েছে।

| GPS হল মহাকাশে ঘুরতে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ পরিচালিত একটি ব্যবস্থা। GPS-এর মাধ্যমে বর্তমানে জল, স্থলে ও আকাশের নানা ধরনের তথ্য এবং কোনো স্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, উচ্চতা ও সময় নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা হয়।

সমুদ্রের ধারে বা কোনো ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকালে মনে হয় আকাশ ও ভূমি যেন একটি বৃত্তরেখায় মিশেছে। এই বৃত্তরেখাকে দিগন্তরেখা বলে। ভূপৃষ্ঠ থেকে যত ওপরে ওঠা যায় দিগন্তরেখার পরিধিও তত বাড়ে।

| পর্তুগিজ নাবিক ম্যাজেলান পূর্ব থেকে পশ্চিমে জাহাজ চালিয়ে যেখান থেকে সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিলেন তিন বছর পর ঠিক সেখানেই ফিরে এসেছিলেন। পৃথিবী গোল না হলে তিনি ওই একই স্থানে ফিরতে পারতেন না। এতে প্রমাণিত হয়, পৃথিবী গোলাকার।

কোনো নমনীয় গোলাকার বস্তুকে অনবরত ঘোরানো হলে তার মধ্যে একসঙ্গে পরস্পরবিরোধী দুটি বল ক্রিয়াশীল হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে আবর্তন বেগ বেশি হওয়ায় কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে বস্তুসমূহ বাইরের দিকে বেরিয়ে আসতে চায়। সেইজন্য পৃথিবী অভিগত গোলাকৃতি।

আমাদের সৌরজগতের বামন গ্রহ প্লুটো ছাড়িয়ে আরো দূরে হিমশীতল প্রান্তটিকে কুইপার বেল্ট বলে।

অক্ষাংনির্ণয় করা হত, বর্তমানে GPS রিসিভারে কয়েক মিলিমিটার ব্যবধানে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা নির্ণয় করা হয়। GPS রিসিভার স্ক্রিনে কোনো স্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, উচ্চতা ও সময় সম্পর্কে জানা যায়। আগে 10 মিটার অন্তর শ ও দ্রাঘিমা নির্ণয় করা হয়।

বিভিন্ন অনুকূল কারণে সৌরজগতের গ্রহগুলির মধ্যে একমাত্র পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। যেমন- [1] সূর্যলোক ও উন্নতা: পৃথিবীতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও উন্নতা থাকায় মানুষের জীবনধারণের পক্ষে উপযুক্ত। পৃথিবীর গড় উয়তা প্রায় 15 °সেন্টিগ্রেড।

[2] জলের প্রাচুর্যতা : জল ছাড়া জীবনধারণ অসম্ভব। পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় 71% জলভাগ হওয়ায় মানুষের বিকাশে তা সহায়ক হয়েছে।

[3] অক্সিজেন: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে 20.94% (প্রায়) অক্সিজেন গ্যাস (O2) রয়েছে, যা মানুষের শ্বসনক্রিয়ার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়।

2006 সালের 24 আগস্ট International Astronomical Union সৌরজগতের প্লুটো গ্রহটিকে বামন গ্রহের শ্রেণিভুক্ত করে। কারণ— [1] আকার : সৌরজগতের গ্রহগুলির মধ্যে প্লুটো ক্ষুদ্রতম। পৃথিবীর মোট আয়তনের মাত্র তিন ভাগ। [2] বৈশিষ্ট্য : ক্ষুদ্র হওয়ায় নিজের কক্ষপথের কাছাকাছি। মহাজাগতিক বস্তুকে সরিয়ে দিতে পারে না। [[3] গুরুত্ব: সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ অপেক্ষা প্লুটোর গুরুত্বও কম।

পৃথিবীর দুই মেরুপ্রদেশ চাপা এবং নিরক্ষীয় প্রদেশ স্ফীত। সেজন্যই নিরক্ষীয় অঞ্চলের বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য কম এবং মেরু অঞ্চলে বেশি হয়। 1737 খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের রয়াল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স কিটো (0°), প্যারিস (49° উত্তর) এবং ল্যাপল্যান্ড (68° উত্তর) এই তিনটি শহরে পৃথিবীর পরিধির একটি নির্দিষ্ট বৃত্তচাপ নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেন। দেখা গেছে, কিটো শহরে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। প্যারিস শহরে তার থেকে বেশি এবং ল্যাপল্যান্ডে এই বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য সর্বাধিক। এথেকে প্রমাণ করা যায়, নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরুর দিকে অগ্রসর হলে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়।

পৃথিবীর কক্ষপথটি উপবৃত্তাকার। সূর্য এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের একটি নাভিতে অবস্থান করে। ফলে পৃথিবী তার কক্ষপথে পরিক্রমণকালে কখনো সূর্যের কাছে আসে আবার কখনো দূরে সরে যায়। পরিক্রমণকালে 4 জুলাই পৃথিবীর সাথে সূর্যের দূরত্ব সর্বাধিক হয় (প্রায় 15 কোটি 20 লক্ষ কিমি) এবং 3 জানুয়ারি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সবচেয়ে কম হয় (প্রায় 14 কোটি 70 লক্ষ কিমি)। পৃথিবীর কক্ষপথটি গোলাকার হত এবং কেন্দ্রে সূর্য অবস্থান করত তাহলে এমনটি ঘটত না। সেজন্য সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব সারাবছর একরকম থাকে না।

উত্তর! পৃথিবী উত্তপ্ত গলিত বা সাল্র অবস্থায় আবর্তনের জন্য পৃথিবীতে দুটি বল ক্রিয়াশীল। এর মধ্যে নিরক্ষীয় অঞ্চলে আবর্তন বেগ বেশি বলে কেন্দ্ৰবহিমুখী বলের কারণে বস্তুসমূহ বাইরের দিকে ছিটকে যেতে চায়। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলে আবর্তন বেগ কম বলে কেন্দ্রমুখী বলের কারণে সবকিছু পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকর্ষিত হয়। অপরপক্ষে, নিরক্ষরেখায় মাধ্যাকর্ষণ বল সবচেয়ে কম কারণ ভূকেন্দ্র থেকে নিরক্ষরেখার দূরত্ব সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে মেরু বিন্দুতে মাধ্যাকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি কারণ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে মেরুর দূরত্ব সবচেয়ে কম। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, মাধ্যাকর্ষণ বল ও কেন্দ্রবহির্মুখী বলের প্রভাবে পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার না হয়ে অভিগত গোলাকার হয়েছে।

ABOU

উত্তর| পৃথিবীর শিলামণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও বারিমণ্ডলের যে অংশ জীবের জন্ম, বৃদ্ধি এবং বসবাসযোগ্য আবাসস্থল রূপে বিবেচিত হয়, তাকেই জীবমণ্ডল বলে। জল, সূর্যলোক, বায়ুমণ্ডলের সুষম বিন্যাসের জন্য এখানে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে এবং বংশবৃদ্ধি ঘটেছে। সমুদ্রের তলদেশের 9 কিমি গভীরতা থেকে ভূপৃষ্ঠের ওপর বায়ুমণ্ডলের 15 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত জীবমণ্ডলের অবস্থান। জীবের সৃষ্টি থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত বহু বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে জীবমণ্ডলের বিকাশ ঘটে চলেছে। সৌর পরিবারের মধ্যে একমাত্র পৃথিবী গ্রহেই এখনও পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

1671 সালে ফরাসি জ্যোতির্বিদ জ্যঁ রিচার পৃথিবীর কয়েকটি স্থানে ঘড়ির দোলন গতির পরীক্ষা করেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার কেইন দ্বীপে (5° উত্তর) ভ্রমণকালে লক্ষ করেন যে, তাঁর ঘড়িটি প্রতিদিন আড়াই মিনিট করে দেরিতে চলছে। অথচ এই ঘড়িটিই প্যারিস শহরে (49° উত্তর) সঠিক সময় দিত। এইসময় তিনি ঘড়ির দোলকের ওপর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, কেইন দ্বীপটি নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত বলে প্যারিস শহরের তুলনায় মাধ্যাকর্ষণ বল কম, তাই ঘড়ির দোলন ধীরগতিতে ঘটছে ও ঘড়িটি আড়াই মিনিট করে সময় কম দিচ্ছে (নিরক্ষীয় অঞ্চল ভূকেন্দ্র থেকে দূরবর্তী হওয়ায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মান কম, তাই ঘড়ির দোলনকাল বেশি)। এর থেকে পৃথিবীর অভিগত গোলাকৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলির মধ্যে পৃথিবীর অবস্থান স্বকীয়। কারণ—[1] সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ গ্রহগুলির মধ্যে পৃথিবীর আয়তন সর্বাধিক। [2] সূর্য থেকে পৃথিবী এমন দূরত্বে অবস্থিত যে এখানকার জলবায়ু এবং আবহাওয়া প্রাণ সৃষ্টির অনুকূল। [3] একমাত্র পৃথিবীতেই জলের অস্তিত্ব রয়েছে এবং এজন্য পৃথিবীকে ‘নীলগ্রহ’ বলে। [4] পৃথিবীর মেরুরেখা 233° কোণে হেলে অবস্থান করে। [5] পৃথিবীর আবর্তন পরিক্রমণ গতি রয়েছে। [6] পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা 15 °সেলসিয়াস এবং অন্যান্য কারণে পৃথিবীতেই বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে।

উত্তর! ধ্রুবতারার উন্নতিকোণের সাহায্যে পৃথিবী যে গোল তা বোঝা যায়। ধ্রুবতারাকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন কোণে লক্ষ করা যায়। নিরক্ষরেখার ওপর একে ০° কোণে, কর্কটক্রান্তিরেখার ওপর 23½° কোণে এবং সুমেরু বিন্দুতে 90°  কোণে দেখা যায়। পৃথিবী গোলাকার বলেই এমন ঘটনা ঘটে। পৃথিবী সমতল হলে পৃথিবীর যে-কোনো স্থানে ধ্রুবতারাকে একই কৌণিক মানে দেখা যেত।

পৃথিবীর আকৃতি নিখুঁত গোলাকার নয়। পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস 12,757 কিমি এবং মেরু ব্যাস 12,714 কিমি। অর্থাৎ পৃথিবীর মেরু ব্যাস ও নিরক্ষীয় ব্যাসের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য প্রায় 43 কিমি। পৃথিবীর দুটি মেরু অঞ্চলের সাথে পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব কম হওয়ায় কেন্দ্রের আকর্ষণ বল মেরুর দিকে বেশি এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে কম।

পৃথিবীর সর্বত্র ঘড়ি সমানভাবে চলে না। 1671 সালে ফরাসি জ্যোতির্বিদ জ্যঁ রিচার এই বিষয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। তিনি দেখেন দক্ষিণ আমেরিকার কেইন দ্বীপে (50 উ:) তার ঘড়িটি 2½ মিনিট দেরিতে চলছে, অথচ ওই ঘড়িটিই ফ্রান্সের প্যারিস (49° উ:) শহরে ঠিক সময় দিত। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের পার্থক্য থাকায় এরকম ঘটনা ঘটে। কেয়েন দ্বীপ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে থাকায় তারওপর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব কম থাকে বলে ঘড়িটি ধীরে ধীরে চলে।

যেসব স্থান পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত, সেইসব স্থানের মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব বেশি। ফলে বস্তুর ওজনও বেশি হবে। পৃথিবীর আকৃতি অভিগত গোলক অর্থাৎ, পৃথিবীর মেরুপ্রদেশ চাপা এবং নিরক্ষীয় প্রদেশ স্ফীত। তাই নিরক্ষীয় অঞ্চলে মাধ্যাকর্ষণ বলের মান মেরু অঞ্চল অপেক্ষা কম হয় ও বস্তুর ওজনও কম হয়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় মেরু অঞ্চলে কোনো বস্তুর ওজন বেশি হবে।

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের আকার অনেক কম। পৃথিবীর তুলনায় চাঁদ অনেক ছোটো— প্রায় পঞ্চাশ ভাগের একভাগ মাত্র। কিন্তু চাঁদের থেকে পৃথিবীর দূরত্ব মাত্র 3 লক্ষ 84 হাজার 400 কিলোমিটার। সেইজন্য চাঁদ আকারে ছোটো হলেও স্বল্পদূরত্বে অবস্থান করায় চাঁদকে বড়ো দেখায়। অন্যদিকে অন্য গ্রহ বা উপগ্রহগুলি চাঁদ থেকে আকারে বড়ো হলেও বেশি দূরত্বের কারণে তাদের ছোটো দেখায়।

গ্রহ হিসেবে পৃথিবী: পৃথিবী সৌরজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রহ। গ্রহ হিসেবে পৃথিবীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলি হল— [1] অবস্থান : সৌরজগতে সূর্য থেকে দূরত্ব অনুসারে পৃথিবীর অবস্থান তৃতীয় অর্থাৎ, বুধ গ্রহের পরে। [2] সূর্য থেকে দূরত্ব : সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব 14 কোটি 96 লক্ষ কিলোমিটার বা প্রায় 15 কোটি কিলোমিটার। [3] আকৃতি : পৃথিবীর আকৃতি অভিগত গোলকের মতো। অর্থাৎ, উত্তর ও দক্ষিণমেরু কিছুটা চাপা এবং মধ্যভাগ স্ফীত। [4] ওজন ক্ষেত্রফল : পৃথিবীর  প্রায় 5.97219 × 1024 কিগ্রা এবং ক্ষেত্রফল প্রায় 51 কোটি 72 হাজার বর্গকিলোমিটার। [5] ব্যাস: পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস 12,757 কিমি এবং মেরু ব্যাস 12,714 কিমি (প্রায়)। [6] পৃথিবীর গতি : পৃথিবীর দুটি গতি আছে। যথা—আবর্তন গতি ও পরিক্রমণ গতি। আবর্তন গতির সময়কাল 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ড এবং পরিক্রমণ গতির সময়কাল 365 দিন 5 ঘণ্টা 48 মিনিট 46 সেকেন্ড। [7] কক্ষপথ: পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার। এর দৈর্ঘ্য 96 কোটি কিলোমিটার (প্রায়)। কক্ষপথের একটি নাভিতে সূর্য অবস্থিত। [৪] উপগ্রহ : পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ, যা পৃথিবীর থেকে প্রায় 3 লক্ষ 84 হাজার 400 কিমি দূরে অবস্থিত। চাঁদের নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়। [9] পৃথিবীর গঠন : পৃথিবীর বাইরের অংশে কঠিন শিলাস্তর এবং ভেতরের অংশে উন্ন, সান্দ্র ম্যাগমার অবস্থান লক্ষ করা যায়। পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় 71% জলভাগ ও 29% স্থলভাগ রয়েছে। পৃথিবী বেষ্টনকারী বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাসের প্রাধান্য রয়েছে। [10] জীবের আবাসস্থল : পৃথিবীই সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ, যেখানে মানুষসহ অন্যান্য জীবের বিকাশ ঘটেছে।

পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোলাকার হওয়ার খুক্তিসমূহ: ষোড়শ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী সমতল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের উপলব্ধির পরিবর্তন ঘটে এবং প্রমাণিত হয় পৃথিবীর আকৃতি পূর্ণ গোলাকার নয়, প্রায় গোলাকার। নীচে এই সংক্রান্ত যুক্তিগুলি ব্যাখ্যা করা হল—

[1] মহাকাশ থেকে গৃহীত আলোকচিত্র : মহাকাশে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণরত বিভিন্ন কৃত্রিম উপগ্রহ এবং মহাকাশযান থেকে গৃহীত পৃথিবীর যেসব আলোকচিত্র পাওয়া গেছে, সেগুলিতে দেখা যায় পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোলাকার।

[2] অন্যান্য গ্রহের আকৃতি পর্যবেক্ষণ : শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখা যায় সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলি প্রায় গোলাকার । পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। তাই পৃথিবীর আকৃতিও প্রায় গোলাকার হওয়াটা স্বাভাবিক।

[3] পৃথিবীর ছায়া পর্যবেক্ষণ : চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর যে ছায়া পড়ে, তা প্রায় গোলাকার হয়। যেহেতু গোলাকার বস্তুর ছায়াও গোলাকার, তাই পৃথিবীর আকৃতিও প্রায় গোলাকার।

[4] সমুদ্রগামী জাহাজ পর্যবেক্ষণ : উপকূলে দাঁড়িয়ে সমুদ্রগামী কোনো জাহাজকে দেখলে, ধীরে ধীরে জাহাজের সমস্ত অংশই একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়। পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোলাকার বলে এভাবে জাহাজ দৃষ্টিরেখার বাইরে চলে যায়। পৃথিবী সমতল হলে জাহাজটি কখনো দৃষ্টিরেখার বাইরে চলে যেত না। দৃষ্টিরেখা গোলাকার পৃথিবী

[5] দিগন্ত পর্যবেক্ষণ: ভূপৃষ্ঠ ও আকাশের আপাত মিলনস্থলকে দিগন্ত বলে। দিগন্তই ভূপৃষ্ঠে আমাদের দৃষ্টির সীমারেখা। পর্বতের ওপরে বা বিমানে যতই ওপরের দিকে আরোহণ করা যায়, দিগন্তের পরিধি ততই বাড়তে থাকে, তাই একে সবসময় গোলাকার দেখায়। পৃথিবী সমতল হলে দিগন্তরেখার পরিধি উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেত না বরং একই থাকত।

[6] বেডফোর্ড খালের পরীক্ষা : 1870 সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (A. R. Wallace) ইংল্যান্ডের স্রোতমুক্ত বেডফোর্ড খালে একটি পরীক্ষা করেন। তিনি তিনটি সমান দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও ভরসম্পন্ন কাঠের খুঁটি সমদূরত্বে একই সরলরেখায় ভেলার সাহায্যে ভাসিয়ে দেন, এবার যন্ত্রের সাহায্যে লক্ষ করেন যে, প্রথম ও তৃতীয় খুঁটির তুলনায় দ্বিতীয় খুঁটিটির উচ্চতা বেশি। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। যে, পৃথিবীর আকৃতি সমতল হলে খুঁটি তিনটির শীর্ষবিন্দু একই সরলরেখায় থাকত, কিন্তু পৃথিবীর আকৃতি যেহেতু প্রায় গোলাকার তাই খুঁটি তিনটির মধ্যে উচ্চতার পার্থক্য হয়েছে।

[7] সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত : পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোলাকার হওয়ায় পশ্চিমের দেশগুলি অপেক্ষা পূর্ব দিকের দেশগুলিতে আগে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয় কিন্তু পৃথিবী যদি সমতল হত তাহলে সর্বত্র একই সময়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হত।

অভিগত গোলক: কোনো গোলকের দুই প্রান্ত চাপা ও মধ্যভাগ স্ফীত হলে, তাকে অভিগত গোলক বলে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণমেরু প্রান্তদ্বয় একটু চাপা ও মধ্যভাগ অর্থাৎ নিরক্ষীয় অঞ্চল একটু স্ফীত, তাই পৃথিবীকে অভিগত গোলক বলা হয়। পৃথিবীর উপবৃত্তাকার আকৃতি বা অভিগত গোলকাকৃতির স্বপক্ষে প্রমাণসমূহ: বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর আকৃতি সম্পূর্ণ গোলাকার নয়, উপবৃত্তের মতো বা অভিগত গোলাকৃতি। বিভিন্ন নিদর্শন থেকে তা বোঝা যায়। যেমন—

[1] মেরু ব্যাস থেকে নিরক্ষীয় ব্যাস বেশি : পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস 12,757 কিমি এবং মেরু ব্যাস 12,714 উত্তরমেরু বডিগত উপবৃত্ত 12,757 কিমি 12,714 কিমিকিমি। পৃথিবী নিখুঁত গোলাকার হলে উভয় ব্যাসের পার্থক্য হত না। ব্যাসের মান থেকে বোঝা যায়, মেরুদ্বয় অপেক্ষা নিরক্ষীয় অঞ্চল একটু স্ফীত বা পৃথিবী অভিগত গোলক।

[2] ঘড়ির সময়ের পার্থক্য: 1671 খ্রিস্টাব্দে জ্যঁ রিচার নামে এক ফরাসি জ্যোতির্বিদ গিয়ানার রাজধানী কেইন দ্বীপে (5° উত্তর অক্ষাংশ) দেখতে পান তাঁর দোলকযুক্ত ঘড়িতে প্রতিদিন 2 মিনিট করে সময় কম হয়, অথচ ঘড়িটি প্যারিস শহরে (49° উ: অক্ষাংশে) ঠিকমত সময় দিত। দোলকযুক্ত ঘড়ির দোলনকাল নির্ভর করে সেই স্থানের মাধ্যাকর্ষণ বলের ওপর। পরবর্তীকালে, স্যার আইজ্যাক নিউটন এই ঘটনার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন যে স্থান পৃথিবীর কেন্দ্রের যত কাছে সেই স্থানের ওপর মাধ্যাকর্ষণ বলও তত বেশি। অর্থাৎ, নিরক্ষীয় অঞ্চলে ঘড়ির দোলনকাল বেশি এবং মেরু অঞ্চলে কম কারণ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে মেরু অঞ্চলের দূরত্ব নিরক্ষীয় অঞ্চল অপেক্ষা কম। যা পৃথিবীর অভিগত গোলাকৃতির প্রমাণ।

[3] পৃথিবীর আবর্তন গতি : গতিবিদ্যার নিয়ম অনুসারে, কোনো নমনীয় গোলাকার বস্তু তার অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরলে, ওই বস্তুর ওপর ও নীচের অংশ সংকুচিত ও মধ্যভাগ কেন্দ্রবহির্মুখী বলের প্রভাবে স্ফীত হয়। পৃথিবী সৃষ্টিলগ্নে ছিল জ্বলন্ত গ্যাসীয় পিণ্ড এবং তখন থেকেই পৃথিবী নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে। সুতরাং, এই আবর্তন গতির জন্য পৃথিবীর অভিগত গোলাকার রূপ ধারণ করে।

[4] ওজনের পার্থক্য : যেসব স্থান পৃথিবীর যত নিকটে অবস্থিত হবে মাধ্যাকর্ষণ বল সেই স্থানে অবস্থিত বস্তুর ওপর তত বেশি হবে, ফলে বস্তুর ওজনও বাড়বে। তাই দেখা গেছে, কোনো বস্তুর ওজন নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলে বেশি হয়। কারণ পৃথিবীর মেরু অঞ্চল চাপা হওয়ায় পৃথিবীর কেন্দ্রের

কাছে এবং নিরক্ষীয় প্রদেশ স্ফীত হওয়ায় তা দূরে অবস্থান করে। পৃথিবী অভিগত গোলকের মতো বলেই বস্তুর ওজন সর্বত্র সমান না হয়ে মেরু অঞ্চলে বেশি এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে কম হয়।

[5] পৃথিবীর বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য: অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স (Royal Academy of Sciences) কিটো (0°), প্যারিস (49° উ:) এবং ল্যাপল্যান্ড (66½° উ:) শহরে পৃথিবীর পরিধির একটি নির্দিষ্ট বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেন। ওই পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিটো শহরে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, প্যারিস শহরের বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য কিটো শহর থেকে বেশি এবং ল্যাপল্যান্ড শহরে বৃত্তচাপর দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। এই পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যেহেতু পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চল মেরু অঞ্চলের তুলনায় স্ফীত তাই নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।

মহাকাশ থেকে দৃশ্যমান পৃথিবী: পৃথিবী গোলাকার বলে মহাকাশ থেকে অন্ধকারময় অর্ধেক অংশ কালো রঙের দেখায়। অপর আলোকিত অর্ধেক অংশে সমুদ্রকে নীল, পর্বত ও মালভূমিকে বাদামি, বনভূমিকে সবুজ এবং মেঘ ও বরফাবৃত অংশকে সাদা দেখায়। পৃথিবীপৃষ্ঠ প্রায় 71% জল দ্বারা আবৃত বলে মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে অনেকটা নীল রঙের দেখায়। তাই পৃথিবীকে ‘নীল গ্রহ'ও বলা হয়।

পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতো: বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী সৃষ্টির প্রাথমিক পর্বে পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার ছিল। নিজ অক্ষের ওপর ক্রমাগত আবর্তনের ফলে এর মধ্যাংশ বরাবর অতিরিক্ত কেন্দ্রবিমুখ বলের সৃষ্টি হয় এবং পৃথিবীর মধ্যাংশ অর্থাৎ নিরক্ষীয় অঞ্চল কিছুটা স্ফীত হয়ে অভিগত গোলকের রূপ নেয়। তবে পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, পৃথিবীর আকৃতি অভিগত গোলক নয়। তার কারণ— [1] পাহাড়-পর্বত, মালভূমি, সমুদ্রতল প্রভৃতির জন্য পৃথিবীর পৃষ্ঠ উচুনীচু, ঢেউখেলানো এবং বন্ধুর প্রকৃতির। হিমালয় পর্বতের মাউন্ট এভারেস্ট (সর্বোচ্চ উচ্চতা 8,848 মিটার) পৃথিবীর উচ্চতম স্থান আর প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাত (সর্বনিম্ন গভীরতা প্রায় 11,000 মিটার) হল পৃথিবীর নিম্নতম স্থান। এতে বোঝা যায়, পৃথিবীর পৃষ্ঠ যথেষ্ট বন্ধুর। [2] সাম্প্রতিককালে মহাশূন্যে প্রেরিত কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো ছবি ও তথ্যে জানা গেছে— [a] পৃথিবীর শুধু দক্ষিণমেরুই চাপা, উত্তরমেরু চাপা নয়। [b] দক্ষিণমেরু 20 মিটারের অধিক নীচু এবং উত্তরমেরু 20 মিটারের অধিক উচুঁ। [c] দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্য অক্ষাংশ অঞ্চল ৪ মিটার উঁচু এবং উত্তর গোলার্ধের মধ্য অক্ষাংশ অঞ্চল ৪ মিটার নীচু হয়ে আছে।

পৃথিবীর এরূপ বিশিষ্ট আকৃতি পৃথিবীতে উপস্থিত কোনো বস্তুর সাথে তুলনীয় নয়। তাই বলা হয়, পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি পৃথিবীর মতোই বা ‘Geoid |পৃথিবীর

GPS: মহাকাশে মনুষ্যপ্রেরিত একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে, ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়ের কৌশলকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (Global Positioning System) বা সংক্ষেপে GPS বলে।

[1] অবস্থান : বর্তমানে একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহকে বিভিন্ন কক্ষপথে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 20,200 কিমি উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছে। GPS ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করতে ন্যূনতম ওটি কৃত্রিম উপগ্রহের প্রয়োজন হয়।

(12] অংশ:GPS-এর তিনটি অংশ রয়েছে। যথা—la] মহাকাশ অংশ (কৃত্রিম উপগ্রহ বিষয়ক তথ্যাবলি)। [b] নিয়ন্ত্রণ/ ভূপৃষ্ঠীয় অংশ (ভূপৃষ্ঠ থেকে কৃত্রিম উপগ্রহগুলির নিয়ন্ত্রণ)। [c] ব্যবহারকারী অংশ (সংগৃহীত তথ্যবিশ্লেষণ)।

[[3] তথ্য : GPS-এর সাহায্যে কোনো স্থানের চার ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। যথা – [a] 'x' = অক্ষাংশ, [b] 'Y' = দ্রাঘিমাংশ, [c] Z = উচ্চতা, [d] “T” = সময়।

[[4] ব্যবহার : 1970 এর দশকে আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর GPS-এর ব্যবহার শুরু করলেও 1990-এর দশকে এর ব্যবহার প্রসারিত হয়। ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়, ভূমিরূপের আকৃতি অনুধাবন, জাহাজ ও বিমান

চলাচল এবং বিভিন্ন পরিকল্পনায় ভূপৃষ্ঠের মানচিত্র তৈরিতে GPS এর ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পৃথিবীর আকৃতি অনুধাবনে GPS-এর প্রয়োগ: ভূপৃষ্ঠের দুই বা ততোধিক স্থানের মধ্যে উচ্চতার কয়েক সেমি পার্থক্যও GPS-এর সাহায্যে জানা সম্ভব হয়। কোনো ক্ষুদ্র অঞ্চলের আকৃতির পরিবর্তন (উত্থান বা অবনমন) সহজেই জানা যায়। মহাকাশে প্রদক্ষিণরত কৃত্রিম উপগ্রহগুলি থেকে প্রেরিত সিগন্যাল (signal) ভূপৃষ্ঠের সংগ্রাহক (receiver) গুলিতে পৌঁছায় এবং কোনো স্থানের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হল ধরা যাক, একই অক্ষাংশ বরাবর 10 মিটার দূরত্বে তিনটি স্থান A, B ও C সমীক্ষাকারী তিনটি স্থানে GPS-এর সাহায্যে নিম্নলিখিত তথ্যগুলি পেলেন।

স্থান      X                  Y                Z            T

A             22° উ:       86°0'00"   6 মিটার   সকাল 9 টা 10 মিনিট

B             22° উ:       86°0': পু:   7 মিটার সকাল 9 টা 12 মিনিট

C            22° উ:      86°0': পু:  6.7মিটারসকাল 9 টা 14 মিনিট

আমরা জানি, x = অক্ষাংশ, Y = দ্রাঘিমাংশ, Z = উচ্চতা, T  = সময়

ওপরের তথ্য থেকে স্কেলের সাহায্যে লেখচিত্রে মান বসিয়ে ওই স্থান তিনটির মধ্যে ভূমিরূপের পার্থক্য বোঝা যাবে।

∴এরাটোথেনিস-এর পৃথিবী পরিধি নির্ণয়ের পদ্ধতি: গ্রিক পণ্ডিত এরাটোথেনিস, খ্রিস্টের জন্মের প্রায় 200 বছর আগে, মিশরের সিয়েন ও আলেকজান্দ্রিয়া শহরের ওপর মধ্যাহ্ন সূর্যরশ্মির পতনকোণের তারতম্য বিচার করে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেছিলেন। শহর দুটি একই দ্রাঘিমারেখায় অবস্থিত হলেও অক্ষাংশ ছিল পৃথক। সিয়েন (232° উ:) ও আলেকজান্দ্রিয়া (302° উ:)। কর্কটসংক্রান্তির দিন (21 জুন) তিনি লক্ষ করেন, মধ্যাহ্নে (বেলা 12 টায়) সূর্যরশ্মি সিয়েন শহরের ওপর লম্বভাবে পড়ছে কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়া শহরে সূর্যরশ্মির পতনকোণের পার্থক্য 7°12 |

আমরা জানি,

পৃথিবীর মোট কৌণিক মান 360°।

7°12´ কৌণিক দূরত্ব গোলাকার পৃথিবীর মোট কৌণিক দূরত্বের (360° ÷ 7°12 = 50 প্রায়) প্রায়1/50ভাগ। সিয়েন ও আলেকজান্দ্রিয়া শহর দুটির দূরত্ব 5,000 স্টেডিয়া (1 স্টেডিয়া = 185 মি)। সুতরাং পৃথিবীর পরিধি 5,000 স্টেডিয়া × 50 = 2,50,000 স্টেডিয়া বা 46,250 কিমি। (তবে বর্তমানে প্রমাণিত হয়েছে পৃথিবীর গড় পরিধি প্রায় 40,000 কিমি)। মহাকাশে প্রেরিত একাধিক কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থানগত তথ্যসংগ্রহের কৌশলকে Global Positioning System বা সংক্ষেপে GPS বলে। GPS-এর ব্যবহার: GPS-এর ব্যবহারগুলি হল—

[1] শহর পরিকল্পনা : শহরাঞ্চলের বিভিন্ন পরিকল্পনার কাজে (town planning) ব্যবহৃত হয়।

[2] ভূপৃষ্ঠের আকৃতি : ভূপৃষ্ঠের প্রকৃত আকৃতি নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।

[3] দূরত্ব নির্ণয় : ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানের মধ্যে দূরত্ব ও বন্ধুরতা নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

[4] যোগাযোগ ব্যবস্থা : জাহাজ ও বিমান চলাচল ও সড়ক পরিবহণে সহায়ক।

[5] প্রতিরক্ষা: আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীরগতিবিধির ওপর নজরদারি ও উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত হয়।

[6] জ্যামিতিক অবস্থান: যে-কোনো বস্তুর জ্যামিতিক অবস্থান নির্ণয়ে ব্যবহার করা যায়।

[7] আবহাওয়া ও মানচিত্র : আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্যসংগ্রহ এবং কম্পিউটারের সাহায্যে মানচিত্র প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য ব্যবহার আছে।

[৪] উদ্ধারকার্য : জাহাজ ও বিমান দূর্ঘটনাগ্রস্ত হলে তার সন্ধান ও উদ্ধারকার্যে ব্যবহার করা হয়।

[9] পথনির্দেশ : ভূপ্রাকৃতিক মানচিত্র তৈরিতে GPS খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

পৃথিবীতে মানুষসহ অন্যান্য জীবের বাসভূমি গড়ে ওঠার কারণ: সৌরজগতে ছোটো-বড়ো একাধিক গ্রহ থাকলেও একমাত্র পৃথিবীতেই জীবের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। পৃথিবীতে বিভিন্ন অনুকূল পরিবেশগত কারণে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদ বিকাশলাভ করেছে। তাই পৃথিবী মানুষসহ অন্যান্য জীবের বাসভূমিতে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে মানুষসহ অন্যান্য জীবের বাসভূমি গড়ে ওঠার কারণ—

[1] উন্নতা : জীবের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত উন্নতা প্রয়োজন। পৃথিবীর গড় উন্নতা 15°সেন্টিগ্রেড (প্রায়)। পৃথিবীতে পর্যাপ্ত উন্নতা থাকায় জীবের বিকাশ ঘটেছে। সূর্যের কাছের গ্রহগুলিতে (যেমন—বুধ ও শুক্র) বেশি উন্নতা এবং দুরের গ্রহগুলিতে (যেমন–বৃহস্পতি, শনি প্রভৃতি) উয়তা কম হওয়ায় প্রাণের বিকাশ ঘটেনি।

[2] 'জল : জলের অপর নাম জীবন। পৃথিবীপৃষ্ঠ প্রায় 71% জলদ্বারা আবৃত। জীবনধারণের প্রয়োজনীয় জলের প্রাচুর্যতা থাকায় পৃথিবীতে জীবের বিকাশ ঘটেছে। অন্য গ্রহগুলিতে (যেমন শুক্র গ্রহে) জলের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

[3] অক্সিজেন : প্রাণীদের শ্বসনক্রিয়ার জন্য অক্সিজেন (O2) একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসীয় উপাদান। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ 20.94% (প্রায়) যা জীবনধারণের অনুকূল। কিন্তু অন্য গ্রহে এর পরিমাণ সীমিত বলে প্রাণের অস্তিত্ব নেই।

[4] খাদ্যের জোগান : পৃথিবীতে খাদ্য তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন— সৌরশক্তি, জল, বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদান (C, O, N), খনিজ পদার্থ (Fe, Cu) পৃথিবীতে নির্দিষ্ট মাত্রায় পাওয়া যায়, যা খাদ্য তৈরির জোগান হিসেবে কাজ করে। সবুজ উদ্ভিদ ওই উপাদানগুলির সাহায্যে খাদ্য তৈরি করে।

[5] সূর্যালোক : সূর্যালোক ছাড়া জীবের বিকাশ সম্ভব নয়। সূর্যালোকের মাধ্যমে যে সৌরশক্তি পৃথিবীতে আসে তা সকল জীবের কার্যকারিতার উৎস। এই সূর্যালোকের উপস্থিতিতেই সবুজ উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করে থাকে।

[6] অন্যান্য অবস্থা: বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন আনুপাতিক পরিমাণ, আবহমণ্ডলীয় ঘটনা (যেমন— মেঘ, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ) পর্যায়ক্রমে দিন ও রাত্রির সংগঠন, ঋতুপরিবর্তন প্রভৃতি বিষয়গুলি সম্মিলিতভাবেপৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষায় সহায়ক হয়েছে।

ওপরের আলোচনা থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, পৃথিবীই সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ, যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।