জনন বলতে কী বোঝ? বংশগতি কাকে বলে? ২
জনন: জনিতৃ জীব থেকে একই প্রকার বৈশিষ্ট্যযুক্ত অপত্য জীব সৃষ্টির জৈবনিক প্রক্রিয়াকে জনন বলে।
বংশপতি: যে প্রক্রিয়ায় পিতামাতার চারিত্রিক গুণাবলি বংশপরম্পরায় সন্তান-সন্ততির দেহে সমাবিত হয়, তাকে বংশগতি বলে।
জয়া ও মৃত্যু বলতে কী বোঝ? ২
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবদেহের শারীরবৃত্তীয় ক্ষমতা হ্রাস পায়। এই অবস্থাতে জরা বলে। একসময় জীবনের
সমস্ত লক্ষনগুলি লুপ্ত হয়, একে মৃত্যু বলে।
সন্ধীৰ বস্তু বা জীব কাকে বলে? ২
যেসব বন্ধু জননের মাধ্যমে নতুন অপত্য জীব সৃষ্টিতে সক্ষম এবং বৃদ্ধি, বিপাক, উত্তেজিতা, ক্ষয়পুরণ ইত্যাদি প্রাণ বা জীবনের ধর্ম প্রকাশ করতে পারে, তাদের সজীব বস্তু বা জীব বলে। যেমন-উদ্ভিদ, প্রাণী ইত্যাদি।
জড় বস্তু কাকে বলে? ২
যেসব বস্তুর চেতনা নেই, স্বেচ্ছায় নড়চড়া করতে পারে না, বৃদ্ধি হয় না, উত্তেজনায় সাড়া দেয় না এবং বংশবিস্তার করে না অর্থাৎ, প্রাণের ধর্মগুলি যাদের মধ্যে প্রকাশ পায় না, তাদের জড় বস্তু বলে। যেমন- টেবিল, পাথর ইত্যাদি।
চলন ও গমন কাকে বলে? ২
চলনঃ যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করে না, তাকে চলন বলে।
গমন: যে প্রক্রিয়ায় জীব উদ্দীপকের প্রভাবে অথবা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্মলনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করে, তাকে গমন বলে।
বিবর্তন বা অভিব্যক্তি কাকে বলে? ২
যে অতি মন্থর কিন্তু অবিরাম গতিশীল পরিবর্তনের ফলে উর্দুবংশীয় (পূর্বপুরুষ) সচল জীব থেকে নতুন প্রকারের
জটিলতর জীবের উদ্ভব ঘটে, তাকে বিবর্তন বা অভিব্যক্তি বলে।
প্রকরণ কাকে বলে? অভিযোজন কাকে বলে? ২
প্রকরণ: কোনো জীব প্রজাতির অন্তর্গত সমস্ত জীবে জিনগত বৈচিত্র্যের কারণে যে বাহ্যিক গঠনগত বিভিন্নতা দেখা যায়, তাকে প্রকরণ বলে।
অভিযোজন: কোনো বেঁচে থাকা ও সাফল্যের সাথে প্রজননের জন্য জীবের অঙ্গসংস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় যে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে, তাকে অভিযোজন বলে।
মিউটেশন বা পরিব্যক্তি কাকে বলে? পরিব্যক্তিতা কী? ২
মিউটেশন বা পরিব্যক্তি : ক্রোমোজোমস্থিত কোনো জিনের আকস্মিক ও স্থায়ী পরিবর্তনকে মিউটেশন বা
পরিবাক্তি বলে।
পরিব্যক্তিতা: ক্রোমোজোমস্থিত কোনো জিনের পরিবাক্তি ঘটানোর ক্ষমতাকে পরিব্যক্তিতা বলে।
জীবনচক্র কাকে বলে? 2
জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ অবস্থা, বংশবৃদ্ধি এবং মৃত্যু- এই পর্যায়গুলির ধারাবাহিকভাবে চক্রবং আবর্তনকে জীবনচক্র বলা হয়। যেমন—ব্যাঙের জীবনচক্র।
উত্তেজিতা কাকে বলে? উদ্ভিদদেহে উত্তেজিতার একটি উদাহরণ দাও। 2
উত্তেজিতা: বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে জীবদেহে যে প্রতিক্রিয়া বা পরিবর্তন ঘটে, তাকে উত্তেজিতা বলে।
উদাহরণ: লজ্জাবতী গাছের পাতা স্পর্শ করলে পাতাগুলি তৎক্ষণাং মুদে যায়।
উন্নতাকে জীবের জীবনীশক্তির পরিচালক বলা হয় কেন? 2
উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের অন্তর্গত প্রতিটি জীবের জৈবিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নির্দিষ্ট উন্নতার প্রয়োজন হয়। সেই কারণে উন্নতাকে জীবের জীবনীশক্তির পরিচালক বলে।
জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি বুঝিয়ে লেখো। ৫
জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি
সজীব বস্তুর বহিঃপ্রকাশিত বৈশিষ্ট্যগুলিই 'জীবন'-রূপে চিহ্নিত হয়। এই সকল বৈশিষ্ট্য সজীব বস্তুকে জড়বস্তুর থেকে পৃথক করে। এখানে জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হল -
1 প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি : জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল জনন। প্রজননের মাধ্যমে কোনো জীব তার জীবনকালে নিজের মতো নতুন জীব সৃষ্টি করে বংশবৃদ্ধি ঘটায়। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব বজায় থাকে।
2 বিপাক : প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকা ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। শক্তি উৎপাদন ও শক্তি ব্যবহারের এই সমস্ত বিক্রিয়াগুলিকে একত্রে বিপাক বলে। যেমন——সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে শর্করাজাতীয় খাদ্য প্রস্তুত করে। সালোকসংশ্রেষ তাই সামগ্রিকভাবে একটি বিপাক পদ্ধতি।
3 উত্তেজিতা: উত্তেজিতা জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে জীবের সাড়া দেওয়াকে উত্তেজিতা বলা হয়। এই ধর্মের সাহায্যে জীবদেহে তাপ, চাপ, বেদনা প্রভৃতি অনুভূত হয়। যেমন— লজ্জাবতী লতার পাতা স্পর্শ করলে তা মুড়ে যায়।
3 সংগঠন : প্রত্যেকটি জীবের দেহ একটি সুনির্দিষ্ট রীতিতে সংগঠিত হয়। সাধারণত কতকগুলি কোশ একত্রিত হয়ে কলা, কলা একত্রিত হয়ে অঙ্গ, অঙ্গ একত্রিত হয়ে তত্ত্ব এবং অনেকগুলি তত্ত্ব মিলে জীবদেহ গঠন করে।
5 বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ: জীবের আকার, আয়তন এবং শুষ্ক ওজন বেড়ে যাওয়াকে বলে। স্থানীয় বৃদ্ধি জীবদেহের ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে।
পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি কীভাবে ঘটেছে তা সংক্ষেপে আলোচনা করো। অথবা, জীবনের উৎপত্তি সম্বন্ধে ও পারিন এবং হ্যালডেন মতবাদ লেখো। 5
পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তির সংক্ষিপ্ত আলোচনা
পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টি বা জীবনের উৎপত্তি কীভাবে ঘটেছে, এই বিষয়ে নানা মতবাদ প্রচলিত আছে। আলেকজান্ডার ও পারিন 1924 খ্রিস্টাব্দে তাঁর The Origin of Life on Earth' নামক গ্রন্থে জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত প্রকল্পটি প্রণয়ণ করেন। পরবর্তীকালে জে. বি. এস. হ্যালডেন (1928) প্রাণের উৎপত্তি সংক্রান্ত একইরকম মতবাদ প্রকাশ করেন। এই দুই বিজ্ঞানীর প্রস্তাবিত জীবনের উৎপত্তি- সংক্রান্ত তত্ত্বই বর্তমানে সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য। এই তত্ত্বের নাম ‘জীবনের জৈবরাসায়নিক উৎপত্তির তত্ত্ব' বা 'অ্যাবায়োজেনেসিস তত্ত্ব'। জীবনের উৎপত্তির 3টি পর্যায় হল –
[1] পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার প্রাচীন পরিবেশের ক্রমপরিবর্তন, [2] জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি, [3] প্রাণের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনি। প্রাণের উৎপত্তির এই পর্যায়গুলি নীচে আলোচনা করা হল।
১ পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার প্রাচীন পরিবেশের ক্রমপরিবর্তন: প্রায় 5-6 বিলিয়ন বছর পূর্বে প্রচন্ড এক বিস্ফোরণে মা হন। সৃষ্টির শুরুতে পৃথিবী ছিল এক উত্তপ্ত গ্যাসীয় গিও। কয়েকশো মিলিয়ন বছর ধরে গ্যাসগুলি ঘনিভুত হয় এবং বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত হয়। সেই সময়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা ছিল প্রায় 5000-6000°C এই অতি উচ্চ তাপমাত্রায় বিভিন্ন গ্যাস, যেমন-হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, মিথেন ইত্যাদির স্বাধীনভাবে অবস্থান করা অসম্ভব ছিল। তাই মৌলগুলি পরস্পরের সাথে। অথবা কোনো ধাতু বা অধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে অবস্থান করত। এর ফলে পরিবেশে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি থাকলেও মুক্ত অক্সিজেন উপস্থিত ছিল না। পৃথিবীর পরিবেশ ছিল বিজারক প্রকৃতির। ক্রমশ জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এই জলচক্রের আবির্ভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা হ্রাস পায় ও কঠিন উপাদানের উৎপত্তি ঘটে। বৃষ্টিপাতের ফলে জলরাশি সঞ্চিত হয়ে সমুদ্রের উৎপত্তি ঘটে।
2 জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি: জীবন সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য জৈব যৌগের উৎপত্তিকে বিজ্ঞানী ওপারিন ও হ্যালডেন কেমোজেনি বলে অভিহিত করেন। কেমোজেনির ধাপগুলি হল—(A) সরল জৈব যৌগের উৎপত্তি। পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে পৃথিবীর তাপমাত্রাও হ্রাস পেতে থাকে। পরিবেশে উপস্থিত বিভিন্ন যৌগগুলি (যেমন— হাইড্রোজেন, মিথেন, জলীয় বাষ্প) পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তপ্ত বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে সরল জৈব যৌগ (যেমন – অ্যামিনো অ্যাসিড, সরল শর্করা, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি) গঠন করে। বজ্রবিদ্যুৎ, অতিবেগুনি রশ্মি, মহাজাগতিক রশ্মি এই বিক্রিয়ায় শক্তি জোগান দেয়। [B] জটিল জৈব যৌগের উৎপত্তি বিভিন্ন সরল যৌগগুলি ঘনীভবনের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, লিপিড, নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদির সৃষ্টি করে। [C] কোয়াসারভেট-এর উৎপত্তি: আদিন পৃথিবীতে সমুদ্রের উত্তপ্ত জলে শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন, লিপিড প্রভৃতি জৈব যৌগ যুক্ত। বিজ্ঞানী হ্যালডেন একেই তপ্ত লঘু সুপ (hot dilute soup) নামে অভিহিত করেন। এই তপ্ত লঘু স্যুপের জৈব যৌগগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একপ্রকার বিভাজনে সক্ষম কোলয়েড গঠন করে। বিজ্ঞানী ওপারিন এর নাম দেন কোয়াসারডেট। ওপারিনের মতে কোয়াসারভেট অস্থায়ী আকৃতি ও আয়তনবিশিষ্ট গঠন। কিন্তু বিজ্ঞানী সিডনি ফন্স-এর মতে দ্বি-লিপিড পর্দাবৃত বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন যে যৌগ থেকে প্রাণের উৎপত্তি হয়, তা নির্দিষ্ট আকার ও আয়তনবিশিষ্ট। বিজ্ঞা… 2 জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি: জীবন সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য জৈব যৌগের উৎপত্তিকে বিজ্ঞানী ওপারিন ও হ্যালডেন কেমোজেনি বলে অভিহিত করেন। কেমোজেনির ধাপগুলি হল—(A) সরল জৈব যৌগের উৎপত্তি। পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে পৃথিবীর তাপমাত্রাও হ্রাস পেতে থাকে। পরিবেশে উপস্থিত বিভিন্ন যৌগগুলি (যেমন—
হাইড্রোজেন, মিথেন, জলীয় বাষ্প) পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তপ্ত বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে সরল জৈব যৌগ (যেমন – অ্যামিনো অ্যাসিড, সরল শর্করা, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি) গঠন করে। বজ্রবিদ্যুৎ, অতিবেগুনি রশ্মি, মহাজাগতিক রশ্মি এই বিক্রিয়ায় শক্তি জোগান দেয়। [B] জটিল জৈব যৌগের উৎপত্তি বিভিন্ন সরল যৌগগুলি ঘনীভবনের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, লিপিড, নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদির সৃষ্টি করে। [C] কোয়াসারভেট-এর উৎপত্তি: আদিন পৃথিবীতে সমুদ্রের উত্তপ্ত জলে শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন, লিপিড প্রভৃতি জৈব যৌগ যুক্ত। বিজ্ঞানী হ্যালডেন একেই তপ্ত লঘু সুপ (hot dilute soup) নামে অভিহিত করেন। এই তপ্ত লঘু স্যুপের জৈব যৌগগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একপ্রকার বিভাজনে সক্ষম কোলয়েড গঠন করে। বিজ্ঞানী ওপারিন এর নাম দেন কোয়াসারডেট। ওপারিনের মতে কোয়াসারভেট অস্থায়ী আকৃতি ও আয়তনবিশিষ্ট গঠন। কিন্তু বিজ্ঞানী সিডনি ফন্স-এর মতে দ্বি-লিপিড পর্দাবৃত বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন যে যৌগ থেকে প্রাণের উৎপত্তি হয়, তা নির্দিষ্ট আকার ও আয়তনবিশিষ্ট। বিজ্ঞানী ফক্স এর নাম নেন মাইক্রোস্ফিয়ার ।
৩ প্রাণের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনি: কোয়াসারভেটগুলি আদিম সমুদ্র থেকে নিউক্লিক অ্যাসিড, প্রোটিন ইত্যাদি একাধিক কোয়াসারভেট পরস্পর মিলিত হয়ে বিপাকীয় ধর্মযুক্ত প্রোটোবায়ন্ট গঠন করে। প্রোটোবায়ন্টগুলি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব যৌগ গঠন করে। জৈব যৌগযুক্ত, প্রতিলিপির মাধ্যমে জননে সক্ষম রূপান্তরিত প্রোটোবারন্টগুলিকে ইয়োবায়ন্ট বা প্রোটোসেল বলে। এই প্রোটোসেলগুলি হল পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রথম সঙ্গীর বস্তু। পরবর্তীকালে
সাইটোপ্লাজমের উৎপত্তি হওয়ায় প্রোটোসেল থেকে আদি কোশ বা প্রোক্যারিওটিক কোশ সৃষ্টি হয়।
জীববৈচিত্র্য কাকে বলে? জীববৈচিত্রের উৎস সম্বন্ধে আলোচনা করো। 2+3
জীববৈচিত্র্য
নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকারের জীবের আকৃতি, গঠন ও প্রকৃতির বিভিন্নতার বৈচিত্র্যকে জীববৈচিত্র্য বলে।
জীববৈচিত্র্যের উৎস
বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে বর্তমান মোট জীবিত প্রজাতির সংখ্যা সঠিকভাবে ধারণা করা বেশ কঠিন। এখনও পর্যন্ত প্রায় 1.9 মিলিয়ন প্রজাতির সম্বন্ধে জানা গেছে। এর মধ্যে, বিভিন্ন অণুজীব, ছত্রাক, পতঙ্গ, গৃহপালিত পশুপাখি অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এদের প্রকৃত সংখ্যা সম্বন্ধে ধারণা করা কঠিন। বিজ্ঞানী টেরি আরউইন (1982)-এর মতে পৃথিবীতে উপস্থিত মোট প্রজাতির সংখ্যা প্রায় 30 মিলিয়ন। জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল জনন। এর মাধ্য জনিতৃ জীব থেকে অপত্য জীব সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক সঞ্জীব বস্তুই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে একে অপরের থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন হয়। এই ভিন্নতার জন্য দায়ী হল জীবকোশে উপস্থিত বংশগতীয় বস্তু বা জিন। এই জিনগত বৈচিত্র্য বা বিভিন্নতার ফলে একই প্রজাতিভুক্ত বিভিন্ন জীবে কিংবা এক প্রজাতির সঙ্গে অন্য প্রজাতির মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়। এই জিনগত বৈচিত্র্য সম্ভব হয় জিনের গঠনগত পরিবর্তন বা পরিব্যক্তির মাধ্যমে, যার ফলে প্রকরণ দেখা যায়। এই প্রকরণগুলির জীবের এক জনু থেকে অপর জনুতে স্থানান্তরণ ঘটে। প্রকরণের উপস্থিতির দ্বারাই জীব নিজেদের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে অভিযোজিত করে। যার ফলে, জীবের প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে। এর ফলে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয় অর্থাৎ, জীববৈচিত্রা বৃদ্ধি পায়। এর থেকে বলা যায় যে প্রকরণ হল জীববৈচিত্র্যের উৎস।
প্রকরণের বিভিন্ন প্রকারভেদ ও তাদের গুরুত্ব উল্লেখ করো। 2+3
প্রকরণের প্রকারভেদ : কোনো জীব প্রজাতির অন্তর্গত একটি জীব থেকে অন্য জীবের বাহ্যিক, গঠনগত পার্থক্যকে প্রকরণ বলে। প্রকরণ প্রধানত দুই প্রকার -[1] অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ এবং [2] বিচ্ছিন্ন প্রকরণ।
1 অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ (Continuous varlation): একটি নির্দিষ্ট জীবগোষ্ঠীর বিভিন্ন জীবের মধ্যে যে ছোটো ছোটো এ ব্রামিত গুণগত পার্থক্য দেখা যায়, তাকে অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ বলে। অবিচ্ছিন্ন প্রকরণের ফলে জিনগত বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়।
>>উদাহরণ: দুটি মানুষের উচ্চতা, গায়ের রং, পায়ের দৈর্ঘ্য এগুলি সমান হয় না। তাই এগুলি অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ।
>> গুরুত্ব: অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ একই প্রজাতির বিভিন্ন জীবের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। এই বৈচিত্র্যগুলির মধ্যে যেগুলির প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে, সেই বৈচিত্র্যগুলিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
2 বিচ্ছিন্ন প্রকরণ (Discontinuous variation): কোনো নির্দিষ্ট জীবগোষ্ঠীর মধ্যে হঠাৎ কোনো বড়ো গঠন বিচ্যুতি দেখা দিলে, তাকে বিচ্ছিন্ন প্রকরণ বলে। বিচ্ছিন্ন প্রকরণের ফলে প্রজাতি বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
>>উদাহরণ: মানুষের হাতে বা পায়ে চটি আঙুল। এটি হল বিচ্ছিন্ন প্রকরণের উদাহরণ।
>>গুরুত্ব: মিউটেশন বা পরিব্যক্তি হল বিচ্ছিন্ন প্রকরণ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। পরিব্যক্তির ফলে দ্রুত নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, জীবের প্রজাতি বৈচিত্র্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ হল বিচ্ছিন্ন প্রকরণ।
অবিচ্ছিন্ন ও বিচ্ছিন্ন প্রকরণের কারণগুলি উল্লেখ করো। ২+৩
অবিচ্ছিন্ন প্রকরনের মুল কারণ
অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ সৃষ্টির মূল কারণগুলি হল –[1] ক্রোমোজোমের স্বাধীন সঞ্চারণ এবং [2] জিনের ক্রসিং ওভার।
1 ক্রোমোজোমের স্বাধীন সঞ্চারণঃ মিয়োসিস কোশ বিভাজনের সময়ে অ্যানাফেজ -I ও অ্যানোফেজ-II দশায় পিতা বা মাতার যে-কোনো ক্রোমোজোম স্বাধীনভাবে সঞ্চারিত হয়। এর ফলে নতুন নতুন বৈচিত্র্য সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে।
2 জিনের ক্রসিং ওভার: মিয়োসিস কোশ বিভাজনের সময়ে দুটি জিনের অ্যালিলের মধ্যে ক্রসিং ওভার (বা আদনপ্রদান)। ঘটে। এর ফলে নতুন জিন সমন্বয় তথ্য জিন বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
বিচ্ছিন্ন প্রকরণের মূল কারণ
বিচ্ছিন্ন প্রকরণের মূল কারণ হল পরিব্যক্তি বা মিউটেশন। জিনের গঠনগত পরিবর্তন, ক্রোমোজোমের সংখ্যার পরিবর্তন ইত্যাদির ফলে মিউটেশন বা পরিব্যক্তির সৃষ্টি হয়। এই পরিব্যক্তির ফলেই নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে।
জীববিদ্যা কাকে বলে? 2
বিজ্ঞানের যে শাখায় বিভিন্ন প্রকার জীবের আকৃতি, প্রকৃতি, গঠন, উৎপত্তি, শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলী, বিবর্তন প্রভৃতি বিষয়ে অধ্যয়ণ, পরীক্ষানিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা করা হয়, তাকে জীববিদ্যা বলে।
জীববিদ্যার যে-কোনো আটটি শাখার নাম লেখো। 2
জীববিদ্যার আটটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হল—প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, শারীরবিদ্যা, কৃষিবিদ্যা , অণুজীববিদ্যা, জীবরসায়নবিদ্যা, জীবপদার্থবিদ্যা, আণবিক জীববিদ্যা ইত্যাদি।
বায়োইনফরমেটিক্স কী? ২
জীবদেহের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিন, DNA, প্রোটিন ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্যের পর্যালোচনা, সংরক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ থেকে তা লিপিবদ্ধ করার বিশেষ পদ্ধতি হল বায়োইনফরমেটিক্স (bioinformatics) বা জীবতথ্য লিপিবিজ্ঞান।
প্রাণীবিদ্যা কাকে বলে? ২
জীববিজ্ঞানের যে শাখায় প্রাণীদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠন, প্রকৃতি, শ্রেণিবিন্যাস, শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া, ভৌগোলিক বিস্তার, সংরক্ষণ প্রভৃতি বিষয়ে অধ্যয়ন, জ্ঞানার্জন ও আলোচনা করা হয়, তাকে প্রাণীবিদ্যা (zoology) বলে।
শারীরবিদ্যা বলতে কী বোঝ? ২
জীববিজ্ঞানের যে শাখায় জীবদেহের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজের প্রকৃতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা যায়, তাকে শারীরবিদ্যা (physiology) বলে।
শারীরস্থান কাকে বলে? ২
জীববিদ্যার যে শাখায় জীবদেহের অঙ্গ, তন্ত্রের গঠন ও অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা যায়, তাকে
শারীরস্থান (anatomy) বলে।
স্বাস্থ্য বিজ্ঞান কাকে বলে? ২
জীববিজ্ঞানের যে শাখা মানুষের বা অন্যান্য প্রাণীর শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার বিষয়ে
আলোচনা করে, তাকে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বলে।
অণুজীববিদ্যা কাকে বলে? ২
জীববিজ্ঞানের যে শাখায় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি আণুবীক্ষণিক জীব সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা যায়, তাকে অণুজীববিদ্যা (microbiology) বলে।
জীববিদ্যার বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো । ৫
জীববিদ্যার বিভিন্ন শাখা
বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার ন্যায়, জীববিদ্যাকে বিশুদ্ধ জীববিদ্য (classical biology) এবং ফলিত জীববিদ্যা biology) এই প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। এই দুটি ভাগের অন্তর্গত জীববিদ্যার শাখাগুলি সম্পর্কে নীচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
বিশুদ্ধ জীববিদ্যার শাখাসমূহ
(1) অঙ্গসংস্থান (Morphology): বিদ্যার এই শাখায় জীবদেহের আকার ও বাহ্যিক গঠন সমন্ধে তথ্যানুসন্ধান করা হয়। [2] শারীরস্থান (Anatomy) : এই শাখায় জীবদেহ ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে জীবদেহের অন্তাঠিন সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [3] কলাস্থান (Histology): এই শাখায় কলা ও কলাতন্ত্রের আকৃতি, গঠনবৈচিত্রা এবং কার্যাবলি আলোচিত হয়। [4] কৌশতত্ব (Cytology): এই শাখায় জীবের কোশের গঠন ও কার্যকলাপ সম্বন্ধে আলোচন করা হয়।
[5] শারীরবিদ্যা (Physiology): এই শাখায় জীবের বিভিন্ন জৈবনিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [6) বংশগতিবিদ্যা (Genetics): এই শাখায় জীবের বিভিন্ন বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং তাদের বংশানুসরণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। [7] বাস্তুবিদ্যা (Ecology) : এই শাখায় জীবের বাসস্থান, পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক, তাদের অবস্থান এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [8] ভ্ৰূণবিদ্যা (Embryology): এই শাখায় জীবের ভ্রূণের গঠন ও পূর্ণ বিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [9] রোগবিদ্যা (Pathology): এই শাখায় জীবদেহে রোগ ব্যাধির সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। (10) বিন্যাস বিধি
(Taxonomy): এই শাখায় জীবজগতের শ্রেণিবিন্যাসকরণের রীতিনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। (II) বিবর্তনীয় জীববিদ্যা (Evolutionary biology): এই শাখায় জীবজগতের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [12] প্রত্নজীববিদ্যা (Palaeontology): এই শহথায় প্রস্তরীভূত জীব ও জীবের ছাপ নিয়ে প্রাগৈতিহাসিক জীব সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [13] অন্যান্য শাখাসমূহ: অনাক্রম্য (Immunology), জীবরসায়নবিদ্যা (Blochemistry), আণবিক জীববিদ্যা (Molecular biology), আচরণ বিদ্যা (Ethology) ইত্যাদি।
ফলিত জীববিদ্যার শাখাসমূহ
1 ফলিত উদ্ভিদবিদ্যা
[A] কৃষিবিদ্যা (Agriculture) : বিজ্ঞানসম্মতভাবে চাষবাসের প্রণালী ও কৃষির উন্নতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। [B] উদ্ভিদ প্রজননবিদ্যা (Plant breeding) এই শাখায় উন্নতমানের উদ্ভিদ উৎপাদনের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। [C] উদ্যান পালন বিদ্যা (Horticulture): এই শাখায় উদ্যান পালনের ব্যাবহারিক দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। [D] বনপালন বিদ্যা (Forestry): এই শাখায় বন বা অরণ্য সংরক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। [E] ভেষজ বিদ্যা (Pharmacognosy): এই শাখায় ভেষজ উদ্ভিদ প্রতিপালন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
2 ফলিত প্রাণীবিদ্যা
(A) রেশম চাষ (Sericulture): রেশম মথ প্রতিপালন, রেশম উৎপাদন ও রেশম সংগ্রহ ইত্যাদি হল এই শাখার আলোচ্য বিষয়। [B] মৌমাছি পালন (Apiculture) : এই শাখায় মৌমাছি প্রতিপালন, মধু উৎপাদন ও সংগ্রহ ইত্যাদি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়। [C] মৎস্য চাষ বা পিসিকালচার (Fishery or Pisciculture) : মাছ চাষ ও তাদের প্রজনন সম্পর্কে এই শাখায় আলোচনা করা হয়। [D] পোলট্রি (Poultry) হাঁস-মুরগির চাষ ও তাদের উন্নতিসাধন সম্পর্কে এই শাখায় আলোচনা করা হয়।
(E) ডেয়ানি (Dairy): দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রাণী ও দুগ্ধ উৎপাদন ও সংগ্রহ সম্পর্কে এই শাখায় আলোচনা করা হয়।
[F] প্রাণী প্রজননবিদ্যা (Animal breeding): উন্নতমানের প্রাণী উৎপাদন ও সংকরায়ণ প্রণালী সম্পর্কে এই শাখায় আলোচনা করা হয়।[6] মুক্ত চাষ (Pearl farming) মুক্তারী প্রাণী, মুগ্ধ উৎপাদন ও সংগ্রহ সম্পর্কে এই শাসায় আলোচনা করা হয়। (H) চাষ (Sponge farming) নারী প্রাণী ও সংগ্রহ সম্পর্কে এই শাখায় আলোচনা করা হয়। [1] লক্ষ চাষ (Lac culture)। এই শাখায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে লাক্ষা পতঙ্গের চাষ ও লাক্ষা উৎপাদন-
সঙ্ক্রান্ত পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
জীববিদ্যার সঙ্গে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সম্পর্ক সংক্ষেপে আলোচনা করো। ৫
জীববিদ্যার সঙ্গে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার সম্পর্ক
বিজ্ঞানের কোনো শাখাই স্বতন্ত্রভাবে প্রসারিত হতে পারে না। বিজ্ঞানের এক শাখার জ্ঞান অন্য শাখার প্রসারে সহায়তা করে।জীববিদ্যা ও এর ব্যাতিক্রম নয়।
বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সঙ্গে জীববিদ্যার সমন্বয় ঘটিয়ে বহু নতুন নতুন শাখা গড়ে তোলা হয়েছে। নীচে এইরূপ কতগুলি শাখার সম্পর্কে আলোচনা করা হল – [1) জীবপদার্থবিদ্যা (Blophysics): জীববিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার সময়ে এই শাখাটি গড়ে তোলা হয়েছে। যন্ত্রের উন্নতিসাধন পদার্থবিদ্যার কল্যাণেই ঘটেছে। এই অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে জীববিজ্ঞানীরা বিভিন্ন জীবদেহের গঠন সম্পর্কে তাদের ভাণ্ডার আরও বেশি সমৃদ্ধ করতে সক্ষন হারাচ্ছে। [2] জীবরসায়নবিদ্যা (Biochemistry) : বিদ্যার সমন্বয়ে এই শাসাটি গড়ে তোলা হয়েছে। এই শাখাটি জীবের গঠনগত উপালন এবং জৈবনিক ক্রিয়াকলাশের রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে ভূমিকা পালন করে।
(3) জীবপ্রযুক্তিবিদ্যা (Blatechnology): জীব ও প্রযুক্তিবিদ্যা (engineering)-এর সমন্বয়ে এই শাখাটি গড়ে তোলা হয়েছে। এই শাখার জৈববস্তু উৎপাদন ও ব্যবহারে প্রযুক্তির প্রদোগ সম্বন্ধে আলোচনা করা। হয়। [4] জীববৈদ্যুতিনবিদ্যা (Bionics): জীববিদ্যা ও ইলেকট্রনিক্স- এর সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞানের শাখাকে জীববৈদ্যুতিনবিদ্যা বা বায়োনিক্স বলে।
[5] জীবরাশিবিদ্যা (Biostatistics): জীববিদ্যা ও রাশিবিজ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞানের শাখাকে জীবরাণিবিদ্যা বলে। এই শাখায় রশিবিজ্ঞানের প্রয়োগে জীববিদ্যার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। [6] বায়োমেটিক্স (Biomathematics): জীববিদ্যা ও গণিতের সহযোগে সৃষ্ট বিজ্ঞানকে বায়োম্যাথেমেটিক্স বলে [7] জীবভূগোল (Biogeography) : জীববিদ্যা ও ভূগোলের সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞানের শাখাটি জীবভূগোল নামে। পরিচিত। [8] মহাকাশ জীববিদ্যা (Space biology): জীববিদ্যা ও মহাকাশ বিজ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞানের শাখাটি মহাকাশ জীববিদ্যা পানে পরিচিত। [9] নৃতত্ব (Anthropology): পুরাতত্ত্ব বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল প্রভৃতির সঙ্গে জীববিদ্যর সমন্বয় ঘটিয়ে নৃতত্ব শাখাটি সৃষ্টি করা হয়েছে। [10] প্রত্নজীববিদ্যা (Palaeontology): ভূতত্ত্ব এবং জীববিদ্যার সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞানের শাখাটি প্রত্নজীববিদ্যা নামে পরিচিত।
আধুনিক জীববিদ্যার গুরুত্ব ও প্রয়োগ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো। ৫
আধুনিক জীববিদ্যার গুরুত্ব ও প্রয়োগ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির হলো প্রেসার ঘটেছে। বর্তমানে মানুষ বিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে। নীচে আধুনিক জীববিদ্যার গৃত্বে ও প্রয়োগ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।
1 কৃষির উন্নতিসাধন: পৃথিবীর জনসংখ্যার ক্রমাগত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে খান্য সমস্যা ও ব্যাঙ্ক আকার ধারণ করছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য জীববিদ্যার জনকে কাজে লাগিয়ে যথেষ্ট সুফল পাওয়া গেছে। কৃষির উন্নতিলধনের মাধ্যমে জনগণের জন্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। [A] অধিক ফলনশীল বীজ উৎপাদন : বংশগতিবিদ্যার তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে উচ্চ ফলনশীল ধান, গম, ভুট্টা প্রভৃতি দানাশস্যের উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। [B] বীজহীন ফল উৎপাদন : বংশগতিতত্ত্ব ও উদ্যান পালন বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে বীজহীন ফল উৎপাদন, ফলের সংখ্যা ও আকার বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। [C] কীটপতঙ্গ দমন: জীববিদ্যার কল্যাণে কীটপতঙ্গ করে এবং অণুজীব, ছত্রাক, শেষলা প্রভৃতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উদ্ভিদ ও শসাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে খাদ্যোপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে।
[D] গুদামজাত শস্যরক্ষণ : জীববিদ্যার কল্যাণে গুদামজাত শস্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে।
2 ওষুধ প্রস্তুতি: জীববিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ প্রতিপালনের ব্যবস্থা হয়েছে, অন্যদিকে সেইসব উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত উপাদানকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া জীববিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ও জীবজন্তুর বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জীবাণুনাশক ওষুধ (antibiotic), যেমন—পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, টেট্রাসাইক্লিন প্রভৃতি আবিষ্কৃত হয়েছে।
3 মহাকাশ গবেষণাঁ: জীববিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশ গবেষণাতেও সাফল্য পাওয়া গেছে। মহাকাশযানে রক্ষিত ক্লোরেল্লা (Chlorella) নামক শেওলার উপযোগিতার কথা আমরা অনেকেই জানি। এই উদ্ভিদটিকে একদিকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়। আবার অন্যদিকে, এটি সালোকসংশ্লেষের জন্য মহাকাশচারীর শ্বসন উৎপন্ন CO2 শোষণ করে এবং পরিবর্তে অক্সিজেনের জোগান দেয়।
4 জনবিস্ফোরণ রোধ: জনসংখ্যা বৃদ্ধি আজ বিশ্বের একটি প্রধান সমস্যা। এই সমস্যাসমাধানে জীববিদ্যার জ্ঞান বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। জীববিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এর ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
5 শিল্প উৎপাদন: জীববিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে রেশম শিল্প, লাক্ষা শিল্প, বস্ত্রশিল্প, চা শিল্প প্রভৃতিতে যথেষ্ট সাফল্য পাওয়া গেছে।
6 পরিবেশদূষণ রোধ: জীববিদ্যার জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশদূষণ ওষুধ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। অধিক সংখ্যক গাছ লাগিয়ে ভূমণ্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বৃক্ষরোপণ, সামাজিক বনসৃজন ইত্যাদি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যবস্থাতে জীববিদ্যার জ্ঞান অপরিহার্য।
'ট্যাক্সোনমি' শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কী? 2
'ট্যাক্সোনমি' শব্দটি এসেছে 'taxis' অর্থাৎ 'বিন্যাস' এবং 'nomos' অর্থাৎ 'বিধি' বা 'আধান'—এই শব্দ দুটি থেকে। ট্যাক্সোনমি শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল বিন্যাসবিধি।
কোন্ বিজ্ঞানী কত সালে ট্যাক্সোনমি শব্দটি প্রচলন করেন ? 2
> বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী অগাস্তিন পি. ডি ক্যানডোলে 1813 খ্রিস্টাব্দে প্রথম ট্যাক্সোনমি শব্দটি প্রচলন করেন।
ট্যাক্সোনমি বা বিন্যাসবিধি কাকে বলে? 2
জীববিদ্যার যে শাখায় জীবের শ্রেণিবিন্যাস-সংক্রান্ত নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে ট্যাক্সোনমি (taxonomy) বা বিন্যাসবিধি বলে।
ট্যাক্সোনমি বা বিন্যাসবিধির প্রধান উপাদানগুলি কী কী? 2
ট্যাক্সোনমি বা বিন্যাসবিধির প্রধান উপাদানগুলি হল -[1] শনাক্তকরণ, [2] নামকরণ, [3] শ্রেণিবিন্যাস এবং
[ 4 ] প্রামাণ্য দলিল রক্ষণাবেক্ষণ।
শনাত্তকরণ কাকে বলে? 2
বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে, কোনো জীবকে অন্য জীব থেকে পৃথক করার পদ্ধতিকে শনাক্তকরণ
(identification) বলে।
তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণ কাকে বলে? 2
বিশেষ কতকগুলি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীকে দেখে অপরাপর প্রাণী বা উদ্ভিদ থেকে আলাদা করে চিনে নেওয়ার পদ্ধতিকে তাৎক্ষনিক শনাক্তকরণ বলে ।
গোষ্ঠীভূত্তকরণ কাকে বলে? ২
যে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বনের দ্বারা নিকট সম্পর্কযুক্ত জীবগুলিকে এক একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাকে গোষ্ঠীভুক্তকরণ (categorization) বলে।
নামকরণ কাকে বলে? ২
যে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীভূত প্রত্যেকটি উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বিজ্ঞানসম্মত নাম দিয়ে তাদের পৃথক করা হয়, তাকে নামকরণ (nomenclature) বলে।
শ্রেণিবিন্যাস কাকে বলে? ২
পারস্পরিক সাদৃশ্য ও সম্পর্কের ভিত্তিতে সুশৃঙ্খলভাবে জীবের বিজ্ঞানসম্মত গোষ্ঠীভুক্তকরণ পদ্ধতিকেই শ্রেণিবিন্যাস (classification) বলে।
প্রামাণ্য দলিল রক্ষণাবেক্ষণ বলতে কী বোঝ? ২
কোনো প্রকার জীব সংগ্রহ করে, তাকে সংগ্রহশালা বা মিউজিয়ামে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ করার পদ্ধতিকে প্রামাণ্য দলিল রক্ষণাবেক্ষণ (documentation) বলে।
ক্যাটেগোরি বলতে কী বোঝ? ২
উদ্ভিদজগৎ এবং প্রাণীজগতের শ্রেণিবিন্যাসের প্রত্যেকটি একককে ক্যাটেগোরি (category) বলা হয়। যেমন—প্রজাতি, গণ, গোত্র, বর্ণ, শ্রেণি, পর্ব ও রাজ্য হল বিভিন্ন ধরনের ক্যাটেগোরি।
লিনিয়াসের সময় পর্যন্ত আধুনিক ট্যাক্সোননি বিজ্ঞানের বিকাশের সংক্ষপ্তি ইতিহাস আলোচনা করো। ৫
আধুনিক ট্যাক্সোনমি বিজ্ঞানের বিকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
জীবের শ্রেণিবিন্যাসকরণের প্রয়াস যে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষেই শুরু হয়, তা ঋগবেদ, মনু, অগ্নিপুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায়। জিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় 300 বছর আগেই এই প্রয়াস গ্রহণের সূত্রপাত ঘটে। মনু সেইসময় উদ্ভিদগোষ্ঠীকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেন, যেমন—ঔষধ, বনস্পতি, বৃক্ষ, গুল্ম, তৃণ, বল্লি প্রভৃতি। সুশ্ৰুত ভেষজ উদ্ভিদকে 37টি গণ বা ভাগে বিভক্ত করেন।
ট্যাক্সোনমির প্রচেষ্টাকে নিম্নলিখিত কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা হল।
1 গ্রিক যুগ : [A] গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ছিলেন প্রাণীবিদ্যার জনক। তিনি প্রাণীদের গঠন ও জননগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাসকরণের গুরুর উপলব্ধি করেন। তিনি প্রাণীরাজাকে দুটি বিভাগে ভাগ করেন—বিভাগ। আনাইমা (Anaima) এবং বিভাগ-2: ইনাইমা (Enaima)। অ্যানাইমাতে অন্তর্ভুক্ত করেন লাল রংবিহীন রক্তযুক্ত প্রাণীদের (যেমন, সন্দ্বিপদী, কম্বোজ ইত্যাদি) এবং ইনাইমাতে অন্তর্ভুক্ত করেন লাল রক্তযুক্ত সকল মেরুদন্ডী প্রাণীদের। [৪] পরবর্তীকালে, অ্যারিস্টটলের সুযোগ্য ছাত্র, দিওফ্রেন্সটাস (যিনি উদ্ভিদবিদ্যার জনক নামে পরিচিত) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য হিস্টোরিয়া প্ল্যান্টেরাম'-এ 480টি উদ্ভিদকে বৃক্ষ, গুল্ম, বীরুৎ প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত করেন।
2 রোমান যুগ : [A] বিশিষ্ট প্রকৃতি বিজ্ঞানী এলডার (Elder) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া'-তে ভেষজগুে ভিত্তিতে উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস করেন। [B] রোমের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডিসকরডিস (Discordies) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য মেটেরি মেডিকা'-তে প্রায় ৪০০টি প্রজাতির গুণাগুণ উল্লেখ করেন।
3 অন্তর্বর্তী যুগ : (A) বিজ্ঞানী সি (Caesalpino) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্লান্টস'-এ 15000 উদ্ভিদের বর্ণনা দেন। 16টি খণ্ডে প্রকাশিত তাঁর সেই বইয়ে তিনি উদ্ভিদের বৃক্ষ, গুল্ম, বীরুৎ বিভাগ ছাড়াও ফল ও বীজের পদ্ধতিকে হায়ার বৈশিষ্ট্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ সিসালপিনোকেই উদ্ভিদের প্রথম শ্রেণিবিন্যাসবিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। [৪] বিজ্ঞানী গাসপার্ড বাউহিন (Gaspard) Bauhin) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'পিনাক্স'-এ 6000 প্রজাতির উল্লেখ করেন। তাঁর শ্রেণিবিন্যাস থেকে প্রজাতি ও গণের পার্থক্য কতকগু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। [C] বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জন রে (Joba (sapiens), Ray) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'মেথোডাম প্ল্যান্টেরাম'-এ 18,000- অধিক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির শ্রেণিবিন্যাস উল্লেখ করেন। তিনি বীজপত্রের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে গুপ্তবীজী উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাসের ব্যবস্থা করেন।
4 আধুনিক যুগ: ট্যাক্সোনমি বা বিন্যাসবিধির ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন বিশিষ্ট সুইডিশ প্রকৃতি গোত্র বলে। এদে বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus)। তিনি 1751 খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফিলোসোফিয়া বোটানিকা (Philosophia Botanica)-তে সর্বপ্রথম দ্বিপদ নামকরণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি 1753 খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিখ্যাত 'স্পিসিস প্ল্যান্টেরাম' (Species Plantarum)-এ দ্বিপদ নামকরণ পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। তবে আধুনিক ধারায় শ্রেণিবিন্যাস 1758 থেকে প্রচলিত হয়, যখন ক্যারোলাস লিনিয়াস তাঁর 'সিস্টেমা ন্যাচুরি' (Systema Naturae) নামক গ্রন্থটির দশম সংস্করণ প্রকাশ করেন। লিনিয়াস উদ্ভিদ ও প্রাণীর সম্পূর্ণ জৈবিক পদ্ধতিতে শ্রেণিবিন্যাস ও নামকরণ করেন। পরবর্তীকালে ডি ক্যানডোলে ভর্জ বেথাম, জোসেফ ডালটন হুকার, এগুলার, সিম্পসন, মেয়ার প্রমুখ বিজ্ঞানীগণ শ্রেণিবিন্যাসকরণ তত্ত্বের ওপর প্রত আলোকপাত করেন।
লিনিয়ান হায়ারার্কি বলতে কী বোঝ? লিনিয়ান হায়ারার্কিতে কতগুলি ধাপ থাকে? সেগুলির নাম লেখো। তালিকার মাধ্যমে ধাপগুলি দেখাও। ৫
লিনিয়ান হায়ারার্কি
হায়ারাকি হল এমন একটি পদ্ধতি যেখানে একটির পর একটি ধাপ ক্রমানুসারে সাজানো হয়। ট্যাক্সোনমিক হায়ারার্কির ক্ষেত্রে এই ধাপগুলি নিম্নোন্মুখভাবে সাজানো হয়। বিখ্যাত সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস সর্বপ্রথম উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎকে হায়ারার্কি অনুযায়ী সাজানোর চেষ্টা করেন। তাই একে লিনিয়ান হায়ারার্কি বলা হয়।
ধাপ সংখ্যা
লিনিয়াস সর্বপ্রথম হায়ারার্কিতে পাঁচটি ধাপের কথা উল্লেখ করেন। এগুলি হল শ্রেণি, বর্গ, গণ, প্রজাতি এবং প্রকার। পরবর্তীকালে লিনিয়ান হায়ারার্কিতে কিছু পরিবর্তন ঘটানো হয়। 'প্রকার'-এর পরিবর্তে রাজ্য, পর্ব এবং গোত্র-কে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ট্যাক্সোনমির যে ধাপগুলির মাধ্যমে হায়ারার্শিয়াল শ্রেণিবিন্যাস করা হয়, তাদের বাধ্যতামূলক ধাপ বলা হয়। সাতটি বাধ্যতামূলক ক্রমানুসারে সজ্জিত ধাপ হল -
[1] রাজা, [2] পর্ব, [3] শ্রেণি. [4] বর্গ, [5] গোত্র. [6] গণ এবং [7] প্রজাতি। উদ্ভিদ ও প্রাণীদের মধ্যে যে সকল বৈচিত্র্য রয়েছে, তা অন্বেষণ করতে এই ধাপগুলি ব্যবহৃত হয়। [পরবর্তীকালে এই সাতটি ধাপের মাঝে আরও কয়েকটি নতুন ধাপ যুক্ত করা হয়েছে। ওই ধাপগুলিকে অন্তর্বর্তী ধাপ বলা হয়। এগুলি কোনো ধাপের নামের পূর্বে ‘উপ’ অথবা অধিঃ' সংযোজন করে ভূষিত করা হয়। গণ এবং উপগোত্রের মধ্যে সংযুক্ত নতুন ধাপটি হল ট্রাইব।
হায়ারাকীয় গঠন বলতে কী বোঝ? উদাহরণসহ প্রতিটি ধাপের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও। ৫
হায়ারাকীয় গঠন
উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের সবথেকে ছোটো ধাপ থেকে ক্রমশ বড়ো ধাপে বিন্যস্ত করার পদ্ধতিকে হায়ারাকি বলে। একটি প্রাণীর বা একটি উদ্ভিদের সর্বাপেক্ষা নিম্ন ধাপ থেকে সর্বাপেক্ষা ওপরের ধাপটিকে এক সাথে হায়ারাকীয় গঠন বলে। এখানে প্রধান সাতটি ধাপের সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল [1] প্রজাতি (Species): এটি ট্যাক্সোনমির সর্বনিম্ন বা শেষ ধাপ। এটি হল শ্রেণিবিন্যাসের কার্যকারী একক অন্যান্য জীব থেকে জননগতভাবে বিচ্ছিন্ন এবং জিনগতভাবে স্বতন্ত্র এবং যারা নিজেদের মধ্যে জননে সক্ষম, এই ধরনের কতকগুলি জীবকে প্রজাতি বলে যেমন— মানুষের প্রজাতি হল স্যাপিয়েন্স (sapiens), আম গাছের প্রজাতি হল ইন্ডিকা (indica) [2] (Genus) : পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কতকগুলি প্রজাতি-গোষ্ঠীকে গণ বলা হয়।
যেমন—মানুষের গণ হোমো (Home), আম গাছের গণ ম্যাঙ্গিফেরা (Mangifera) ।
[3] পোত্র (Family) : পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কতকগুলি গণ-গোষ্ঠীকে একত্রে গোত্র বলে। এদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে জননাঙ্গ-সংক্রান্ত প্রধান চরিত্রগুলির সাদৃশ্য বর্তমান। যেমন—মানুষের গোত্র হোমিনিডি (Hominidae), আম গাছের গোত্র অ্যানাকারডিয়েসি (Anacardiaceae)। [4] বৰ্গ (Order): পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি গোত্র-গোষ্ঠীকে বর্গ বলা হয়। যেমন— মানুষের বর্গ হল প্রাইমেটস্ (Primares) বা প্রাইমাটা (Primata), আম গাছের বর্গ হল স্যাপিনডেলিস (Sapindales) | [5] শ্রেণি ( Class): একইরকম বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি বর্গের সমন্বয়ে শ্রেণি গঠিত হয়। যেমন—মানুষের শ্রেণি হল ম্যামেলিয়া (Mammalia), আম গাছের শ্রেণি হল দ্বিবীজপত্রী (Dicotyledoneae)। [6] পর্ব (Phylun) / বিভাগ (Division) : একই প্রকারের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণির সমন্বয়ে পর্ব গঠন করা হয়। উদ্ভিদের ক্ষেত্রে 'পূর্ব'-এর পরিবর্তে 'বিভাগ' কথাটি ব্যবহার করা হয়। যেমন—মানুষের পর্ব হল কর্ডাটা (Chordata)। আম গাছের বিভাগ হল গুপ্তবীজী (Angiospermae)। [7] রাজ্য (Kingdom) : শ্রেণিবিন্যাসের একেবারে ওপরের ধাপে এটি অবস্থিত। সমস্ত প্রকার প্রাণী এবং উদ্ভিদ এর অন্তর্গত। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আর. এইচ. হুইটেকার (R. H. Whittaker, 1969)
জীবজগতের পাঁচটি রাজ্য চিহ্নিত করেছিলেন। ওই পাঁচটি রাজ্য হল—মোনেরা, প্রোটিস্টা, ফাংগি, প্ল্যান্টি এবং অ্যানিম্যালিয়া।
যেমন—মানুষের রাজ্য হল অ্যানিম্যালিয়া (Animalia) এবং আম গাছের রাজ্য হল প্ল্যান্টি (Plantae)।
প্ল্যানটি রাজ্যের তিনটি শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য লেখো। উদাহরণ দাও। 5
প্ল্যানটি রাজ্যের তিনটি শনাওকারী বৈশিষ্ট্য
1 কোশ ও কোশীয় সংগঠনের প্রকৃতি: এরা এককোশী বা বহুকোশী, উন্নত নিউক্লিয়াসযুক্ত ইউক্যারিওটিক
জীব। এদের কোশগুলি উন্নত নিউক্লিয়াসযুক্ত এবং পর্দাবৃত বিভিন্ন কোশীয় অঙ্গাণুযুক্ত। এদের কোশপ্রাচীর সেলুলোজ ও অন্যান্য বহুশর্করাজাতীয় উপাদান দ্বারা গঠিত। এদের কোশে ক্লোরোপ্লাস্ট ও বড়ো কোশগহ্বরের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এদের দেহে কলা গঠিত হয়।
2 বিপাক ক্রিয়া (পুষ্টি প্রক্রিয়া): এরা স্বভোজী। এরা নিজেদের দেহে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য প্রস্তুত করতে সক্ষম।
3 বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা : এরা বাস্তুতন্ত্রে উৎপাদকরূপে কাজ করে। বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত অন্যান্য জীবদের খাদ্যের জোগান দেয়।
উদাহরণ: [A] আম গাছ : ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica), [B] রিকসিয়া : রিক্সিয়া রোবাস্টা (Riccia robusta), [C] সূর্যমূখী : হেলিঅ্যানথাস অ্যানাস (Helianthus annus)।