প্রথম অধ্যায় ➤ পরিমাপ

আমরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয় দেখি বা অনুভব করি। কিন্তু এদের মধ্যে সবকটি পরিমাপযোগ্য নয়। যেমন—দয়া, স্নেহ, রাগ প্রভৃতি পরিমাপযোগ্য নয়। যেহেতু এই সমস্ত প্রাকৃতিক বিষয় পরিমাপযোগ্য নয়, তাই এদের ভৌত রাশি বলা হয় না।
আবার দৈর্ঘ্য, ভর, সময় প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিষয় পরিমাপযোগ্য, তাই এদের ভৌত রাশি বলা হয়। সুতরাং, সমস্ত প্রাকৃতিক বিষয়কে ভৌত রাশি বলা যায় না।

বাক্যটিতে আলুর ভর 1kg, অর্থাৎ এটি পরিমাপযোগ্য প্রাকৃতিক রাশি । তাই আলুর ভর হল একটি ভৌত রাশি।
আলু একটি পদার্থ, যা পরিমাপযোগ্য নয় । তাই এটি ভৌত রাশি নয়।

কোনো ভৌত রাশি পরিমাপ করার ক্ষেত্রে, ওই ভৌত রাশির একটি সুবিধাজনক ও নির্দিষ্ট মানকে প্রমাণ ধরে, তুলনামূলকভাবে এই ভৌত রাশির পরিমাপ করা হয়। ওই নির্দিষ্ট মানকে ওই ভৌত রাশির পরিমাপের একক বলে।

কোনো ব্যক্তি যখন কোনো ভৌত রাশি পরিমাপ করতে চায় তখন তাকে কোনো-না-কোনো যন্ত্র বা সমতুল্য কোনো বস্তুর সাহায্য নিতে হয়। যেমন, কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য বা দূরত্ব অনেক সময় হাত মেপে কিংবা গাছের ডাল বা ওই জাতীয় কোনো বস্তুর সাহায্যে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু এইভাবে পরিমাপের দ্বারা প্রাপ্ত সেই মানটি অপর কোনো ব্যক্তির দ্বারা পরিমাপ করা মানের সমান নাও হতে পারে। ফলে পরিমাপ সম্বন্ধীয় তথ্য আদানপ্রদানে অসুবিধা দেখা দেয়। এই অসুবিধা দূর করার জন্য সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত এককের প্রচলন ঘটে।

যে সমস্ত ভৌত রাশির একক পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ স্বাধীনভাবে গঠন করা হয়েছে এবং যাদের সাহায্যে অন্যান্য ভৌত রাশির একক গঠন করা যায়, সেই সমস্ত ভৌত রাশির এককগুলিকে মৌলিক একক বলা হয়।

SI-তে দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, তাপমাত্রা, তড়িৎপ্রবাহ, দীপন প্রাবল্য ও পদার্থের পরিমাণ—এই ভৌত রাশিগুলির মূল বা প্রাথমিক এককগুলি যথাক্রমে মিটার, কিলোগ্রাম, সেকেন্ড, কেলভিন, অ্যাম্পিয়ার, ক্যান্ডেলা ও মোল ।

দৈর্ঘ্য, ভর ও সময়ের একক হল মৌলিক একক, কারণ—
1 দৈর্ঘ্য, ভর ও সময়ের একক পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ স্বাধীনভাবে গঠিত হয়।
2 এই তিনটি ভৌত রাশির একককে বিশ্লেষণ করে সরলতর আকারে প্রকাশ করা যায় না।
(3 এই তিনটি ভৌত রাশির এককের সাহায্যে অন্যান্য ভৌত রাশির একক গঠন করা যায়।

যে সমস্ত ভৌত রাশির একক, এক বা একাধিক মূল এককের সাহায্যে গঠিত হয়, সেই সমস্ত ভৌত রাশির এককগুলিকে লব্ধ একক বলা হয়। যেমন—বেগ, ত্বরণ, ভরবেগ, বল, কার্য প্রভৃতি রাশির একক হল  লব্ধ একক।
বেগ হল কোনো বস্তুর সরণের হার । বেগের একক যে লব্ধ একক তা নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে বোঝা যায়।

: বেগ = সরণ/সময়

:. বেগের একক = সরণের একক/ সময়ের একক = দৈর্ঘ্যের একক/ সময়ের একক
সুতরাং, বেগের একক দৈর্ঘ্য ও সময় এই দুটি মৌলিক এককের সাহায্যে
গঠিত, তাই এটি লব্ধ একক।

মৌলিক এককবিশিষ্ট রাশি: সরণ, ভর, উচ্চতা, তরঙ্গদৈর্ঘ্য, পর্যায়কাল।
লব্ধ এককবিশিষ্ট রাশি : ক্ষেত্রফল, আয়তন, বেগ, ত্বরণ, বল, কার্য, শক্তি, ক্ষমতা, ভরবেগ, ওজন, ঘনত্ব।

দুটি মৌলিক একক দ্বারা গঠিত একটি লব্ধ একক হল দ্রুতির একক।

দ্রুতির একক = অতিক্রান্ত দূরত্বের একক/ সময়ের একক = দৈর্ঘ্যের একক/ সময়ের একক
: দ্রুতির একক হল দৈর্ঘ্য ও সময় এই দুটি মৌলিক রাশির এককের সাহায্যে গঠিত একটি লব্ধ একক।

তিনটি মৌলিক একক দ্বারা গঠিত একটি লব্ধ  একক হল বলের একক।

বল = ভর x ত্বরণ = ভর ×সরন/ সময় 2
.. বলের একক = ভরের একক × সরণের একক/ সময়ের একক2
= ভরের একক ×দৈর্ঘ্যের একক / সময়ের একক2

:: বলের একক হল দৈর্ঘ্য, ভর ও সময় এই তিনটি মৌলিক রাশির এককের সাহায্যে গঠিত একটি লব্ধ একক।

কোনো ভৌত রাশি যদি একই এককবিশিষ্ট দুটি ভৌত রাশির অনুপাত হয়, তাহলে ওই ভৌত রাশির কোনো একক থাকে না। এই ধরনের ভৌত রাশিকে এককবিহীন রাশি বলা হয়।
পারমাণবিক গুরুত্ব, আপেক্ষিক গুরুত্ব, আণবিক গুরুত্ব, বিকৃতি প্রভৃতি হল এককবিহীন রাশি |
কোনো মৌলের পারমাণবিক গুরুত্ব=ওই মৌলের একটি পরমাণুর ভর/ একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভর
আবার, আপেক্ষিক গুরুত্ব =কোনো বস্তুর ভর/4°C উন্নতায় সম- আয়তন জলের ভর
সুতরাং, পারমাণবিক গুরুত্ব ও আপেক্ষিক গুরুত্ব উভয়েই দুটি সমজাতীয়  রাশির (এক্ষেত্রে ভরের) অনুপাত ।তাই এই ভৌত রাশিগুলি এককবিহীন।

মেট্রিক পদ্ধতির সুবিধাগুলি হল-
1 মেট্রিক পদ্ধতিতে কোনো ভৌত রাশির কোনো নির্দিষ্ট একটি একক থেকে অন্য কোনো ছোটো বা বড়ো এককে রূপান্তরের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দশমিক বিন্দু সরালেই চলে, জটিল গ্রুপ বা ভাগ করার দরকার হয় না।
2 কোনো ভৌত রাণির এককের সঙ্গে ডেসি, সেন্টি, ন্যানো, কিলো, মেগা ইত্যাদি উপসর্গগুলি যোগ করে ছোটো বা বড়ো এককগুলি লেখা যায়।
3 এই পদ্ধতিতে আয়তন ও ভরের একটি সুবিধাজনক সম্পর্ক আছে।
যেমন-1cm3 জলের ভর 1 g বা 1L জলের ভর 1kg (4°C উন্নতায়) ।

SI-তে দৈর্ঘ্যের একক হল মিটার (m) ।আলো শূন্যস্থানে 1/ 299792458 সেকেন্ড সময়ে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে 1 মিটার (m) ধরা হয়।

SI-তে ভরের একক হল কিলোগ্রাম (kg)। ফ্রান্সের প্যারিস শহরে, ‘আন্তর্জাতিক ব্যুরো অফ ওয়েট্স অ্যান্ড মেজার্স'-এর দপ্তরে রাখা প্ল্যাটিনাম ইরিডিয়াম সংকর ধাতুর তৈরি একটি নিরেট চোঙের ভরকে 1 কিলোগ্রাম (kg) ধরা হয়।

ধরা যাক, সাধারণ স্কেলের সাহায্যে AB সরলরেখার দৈর্ঘ্য মাপতে হবে। প্রথমে স্কেলটিকে রেখাংশের ওপর এমনভাবে বসানো হল যাতে স্কেলের যেদিকে cm এককে অংশাঙ্কন করা আছে সেই ধার যেন  রেখাংশের সঙ্গে সমাপতিত হয়। রেখাংশের A প্রান্তকে স্কেলের নির্দিষ্ট দাগের সঙ্গে মিলিয়ে বসানো হল। এক্ষেত্রে কোনো cm নির্দেশক দাগের সঙ্গে মেলালে ভালো হয়। এবার লম্বভাবে তাকিয়ে B  প্রান্তের পাঠ নেওয়াহয়। দুই প্রান্তের পাঠের ব্যবধানই হল AB রেখার দৈর্ঘ্য।

= B প্রান্তের পাঠ - A প্রান্তের পাঠ = 4.2 cm = 1cm = 3.2 cm

সাধারণ স্কেলের সাহায্যে প্রত্যক্ষভাবে 1mm অপেক্ষা কম দৈৰ্ঘ্য  পরিমাপ করা সম্ভব নয়। একটি পাতার বেধ 1 mm অপেক্ষা কম, তাই  সাধারণ স্কেলের সাহায্যে একটি পাতার বেধ অপ্রত্যক্ষভাবে নির্ণয় করা হয়। মনে করা যাক, একটি বইতে মলাট বাদে n টি পৃষ্ঠা আছে। মলাট দুটি বাদ দিয়ে, বইটিকে জোরে চেপে ধরে বইটির বেধ পরিমাপ করা হল । এইভাবে কয়েকবার পরিমাপ করে গড় মান নেওয়া হল । বইয়ের গড় বেধ b হলে, প্রতিটি পাতার বেধ = b/n ।

সাধারণ স্কেলের সাহায্যে কোনো রেখাংশের দৈর্ঘ্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, রেখাংশের দুই প্রান্তের পাঠ নেওয়ার সময়, পাঠবিন্দুতে স্কেলের সঙ্গে দৃষ্টিরেখা লম্বভাবে রাখতে হবে, না হলে পাঠের ত্রুটি হবে, অর্থাৎ চোখের
বিভিন্ন অবস্থানে পাঠ বিভিন্ন হবে। এই ধরনের ত্রুটিকে লম্বন ত্রুটি বলা হয় ।

সুতো ও রৈখিক স্কেলের সাহায্যে বক্ররেখার দৈর্ঘ্য নির্ণয়—একটি সুতো নিয়ে সুতোর একটি স্থান কোনো রং দিয়ে (A) চিহ্নিত করা হল। যে বক্ররেখার দৈর্ঘ্য পরিমাপ করতে হবে তার একপ্রান্তে সুতোর চিহ্নিত স্থানটি রেখে, বক্ররেখা বরাবর সুতোটিকে ধীরে রাখা হল। এখানে লক্ষ রাখতে হবে যাতে বক্ররেখা বরাবর সুতোটি খুব আলগা না হয়ে যায়। এবার বক্ররেখার শেষ প্রান্তটি সুতোর যে স্থানে স্পর্শ করেছে সেখানটাও রং দিয়ে চিহ্নিত করা হল (B)। এবার সুতোটিকে টানটান করে একটি সাধারণ স্কেলের সাহায্যে চিহ্নিত স্থান দুটির ব্যবধান (AB) নির্ণয় করা হল।  সুতোর চিহ্নিত স্থান দুটির ব্যবধানই হল বক্ররেখার দৈর্ঘ্য।

সাধারণ স্কেলের সাহায্যে প্রত্যক্ষভাবে 1mm অপেক্ষা কম দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা সম্ভব নয় | একটি সরু তারের ব্যাস 1 mm অপেক্ষা কম, তাই  সরু তারের ব্যাস অপ্রত্যক্ষভাবে নির্ণয় করা হয়। তারটিকে একটি কম  ব্যাসাধের চোঙের ওপর কোনো ফাক না রেখে পরপর অনেকগুলি পাকে জড়ানো হল । এবার একটি সাধারণ স্কেলের সাহায্যে চোঙের ওপর পাকগুলির দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা হল। এইভাবে কয়েকবার দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে গড় নেওয়া হল। মনে করা যাক, পাকগুলির গড় দৈর্ঘ্য = b । মোট
পাকসংখ্যা =n হলে, তারের ব্যাস =b/n ।

ধাতু তাপের সুপরিবাহী। ধাতব স্কেলের উষ্ণতা বৃদ্ধি বা হ্রাস পেলে স্কেলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়, ফলে অংশাঙ্কিত দুটি দাগের ব্যবধানও বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়, অর্থাৎ স্কেলটি যে উয়তায় অংশাঙ্কিত শুধু সেই উষ্ণতাতেই সঠিক পাঠ  দেয়। উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে প্রকৃত পাঠ, স্কেল প্রদর্শিত পাঠ অপেক্ষা বেশি ও  উষ্ণতা হ্রাস পেলে প্রকৃত পাঠ, স্কেল প্রদর্শিত পাঠ অপেক্ষা কম হয়।
কাঠ তাপের কুপরিবাস্নতাতে উষ্ণতার হ্রাসবৃদ্ধিতে কাঠের দৈর্ঘ্য প্রসারণ বা সংকোচন অগ্রাহ্য করা যায় । ফলে যে-কোনো উষ্ণতাতেই প্রকৃত পাঠ ও ফেল প্রদর্শিত পাঠ একই হয় ধরে নেওয়া যায় । তাই সাধারণ স্কেল ধাতুর তৈরি না হয়ে কাঠের তৈরি হয়।

সাঁতার ও দৌড় প্রতিযোগিতায় স্টপওয়াচ ব্যবহার করা হয়।  সাধারণ ঘড়ি যখন ইচ্ছে তখন বন্ধ বা চালু করা যায় না। কিন্তু স্টপওয়াচকে সুবিধামতো চালু বা বন্ধ করা যায়। এ ছাড়া সাধারণ ঘড়িতে
ন্যূনতম 1 সেকেন্ড পর্যন্ত সময় মাপা যায় ।  অপরদিকে আধুনিক ডিজিট্যাল স্টপওয়াচে এর চেয়ে আরও অনেক কম সময়ের ব্যবধানও জানা যায়।

সাধারণ তুলাযন্ত্র (common balance) এর সাহায্যে কোনো বস্তুর ভর পরিমাপ করা হয়।
সাধারণ তুলাযন্ত্রের সাহায্যে বস্তুর ভর পরিমাপ করার সময় বস্তুকে তুলাযন্ত্রের বামদিকের তুলাপাত্রে রেখে ডানদিকের তুলাপাত্রে প্রমাণ বাটখারা চাপানো হয়। এমতাবস্থায় তুলাদণ্ড অনুভূমিক হলে,
বাটখারার ওজন x তুলাদন্ডের বলবাহু
= বস্তুর ওজন × তুলাদণ্ডের রোধবাহু
এটিই ভর পরিমাপের নীতি ।

সাধারণ তুলার সাহায্যে বস্তুর ভর পরিমাপ করা হয়ে থাকে, ওজন নয়। সাধারণ তুলাযন্ত্রের সাহায্যে কোনো বস্তুর ভর পরিমাপ করার সময় বস্তুকে  তুলাযন্ত্রের বামদিকের তুলাপাত্রে রেখে ডানদিকের তুলাপাত্রে প্রমাণ বাটখারা চাপানো হয়। O  হল তুলাদণ্ডের আলম্ব এবং A ও B হল যথাক্রমে তুলাদণ্ডের বাম ও ডান প্রাপ্ত ।  ওই স্থানের অভিকর্ষজ ত্বরণ= g হলে, তুলাদণ্ডের অনুভূমিক অবস্থায়,
বস্তুর ভর × g × AO = বাটখারার ভর x g x OB
বা, বস্তুর ভর = বাটখারার ভর [ AO = OB]

সাধারণ তুলাযন্ত্রের ওজন বাক্সে বাটখারাগুলির ভর 5 : 2 : 2 : 1 অনুপাতে রাখা হয় যাতে 10mg থেকে 211.11g পর্যন্ত যে-কোনো মানের ভর এদের সাহায্যে মাপা যায় ।

যে তুলাযন্ত্র দিয়ে ভরের সামান্যতম পার্থক্যও যত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা যায় সেই তুলাযন্ত্রের সুবেদিতা তত বেশি।
সাধারণ তুলাযন্ত্রের সুবেদিতার শর্তাবলি – (1) বাহু দুটি দীর্ঘ হবে, (2) তুলাদণ্ডটি হালকা হবে, (3) সূচকটি লম্বা হবে, এবং (4) তুলাদণ্ডের ভারকেন্দ্র আলম্বের খুব নিকটবর্তী হবে।