প্রথম পাঠ

কোনো মানুষ সারা জীবন ধরে শুধু যে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করে, এমন নয়। তাকে অনেকের কাছ থেকেই নানারকম আঘাত বা জখমও পেতে হয়। 'বোঝাপড়া" কবিতায় কবি বলেছেন, কোনো মানুষই ভাগ্যবলে এই জখম বাঁচিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে যেতে পারে না।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা' গল্পে অতিথিপরায়ণ আরবজাতির প্রতিনিধি আরবসেনাপতি মুরসেনাপতিকে এই কথাটি বলে পাঠিয়েছিলেন। শত্রুপক্ষের সেনাপতি হলেও বিপদগ্রস্ত, খিদে-তেষ্টায় ক্লান্ত
মুরসেনাপতিকে অতিথি হিসেবে আরবসেনাপতি নিজের শিবিরে আশ্রয় দিয়েছিলেন।পারস্পরিক কথাবার্তার সময় আরবসেনাপতি জানতে পারেন, মুরসেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। কিন্তু তারপরেও তিনি তাঁর
অতিথিসেবার ধর্ম থেকে সরে আসেননি।মনের মধ্যে রাগ-হিংসা চেপে রেখে তিনি অতিথির সেবা করেছেন। এমনকি দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি মুরসেনাপতিকে ক্লান্ত ঘোড়ার বদলে সুসজ্জিত, দ্রুত গতিসম্পন্ন ঘোড়া দিয়ে নিরাপদে নিজ শিবিরে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন।

বিদ্যাসাগরের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পে খুব ভোরে মুরসেনাপতিকে বিদায় জানানোর সময় তাঁকে মিষ্ট কথায় সম্ভাষণ করে একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে আরবসেনাপতি এই কথাটি বলেছিলেন। মুরসেনাপতি
বিপক্ষ দলের হলেও একজন বিপদগ্রস্ত অতিথি হিসেবে আরবসেনাপতি তাঁকে নিজের শিবিরে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কারণ, আরবজাতির কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধর্ম হল অতিথিসেবা। কিন্তু কথাবার্তার সময় আরবসেনাপতি জানতে পারেন, এই মুরসেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যাকারী। মনে মনে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, সূর্যোদয় হলে তিনি পিতার হত্যাকারীকে বধ করে প্রতিশোধ নেবেন। তাই তিনি বলেছিলেন যে, এই বিপক্ষ-শিবিরের মধ্যে মুরসেনাপতির সবচেয়ে বড়ো শত্রু স্বয়ং আরবসেনাপতিই।

বিদ্যাসাগরের ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ আরবসেনাপতি আরবজাতির অতিথিপরায়গতার বিষয়ে এই কথাটি মুরসেনাপতিকে বলেছিলেন। আতিথেয়তা বিষয়ে পৃথিবীতে আরবজাতিই শ্রেষ্ঠ। কেউ অতিথিভাবে আরবদের আশ্রয়প্রার্থী হলে তাঁরা সাধ্যমতো ওই ব্যক্তির সেবা করেন। সে ব্যক্তি শত্রু হলেও তার প্রতি এতটুকুও অনাদর, বিদ্বেষ দেখান না। আলোচ্য গল্পে সেই ঐতিহ্য মেনেই আরবসেনাপতি শত্রুদলের সেনাপতিকেও অতিথিরূপে আশ্রয় দিয়েছেন ও তাঁর যথাসাধ্য সেবাযত্ন করেছেন। এমনকি, মুরসেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যাকারী জেনেও তিনি অতিথিসেবার ধর্ম থেকে সরে আসেননি। মুরসেনাপতির বিদায়কালে আরবসেনাপতি আপন জাতির
আতিথেয়তা বিষয়ে ওই মন্তব্যটি করেছিলেন।

‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পটি ইতিহাস-সমর্থিত এমন কথা বলা যায় না। শুধুমাত্র রচনাশৈলীর গুণে গল্পটির মধ্যে প্রাচীন সময়ের ছবি ফুটে উঠেছে। বিদ্যাসাগরের ভাষা তৎসম শব্দযুক্ত সাধুভাষা। এই ভাষার ব্যবহার এখন কমে আসায় প্রাচীন ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে এ ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত যথাযথ। পাশাপাশি আরবদের তাঁবু, পাহারার ছবি, দুই সেনাপতির যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা, লড়াইয়ের খুঁটিনাটি বর্ণনা এ গল্পে আছে। যুদ্ধের অন্যতম অংশ হিসেবে ঘোড়ার ব্যবহার, ঘোড়ায় চড়ে মুরসেনাপতির পালিয়ে যাওয়া ও আরবসেনাপতির পিছু নেওয়া ইত্যাদি বর্ণনার মধ্যে ইতিহাসের একটি পাতাই যেন পাঠকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনন্য রচনাশৈলীর মাধ্যমেই অতীত যেন বর্তমানের মধ্যে প্রকাশিত হয়ে উঠেছে।

উদ্ধৃত অংশটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্প থেকে গৃহীত।
ওই গল্পে দেখা যায় এক মুরসেনাপতি দিক ভুলে বিপক্ষ শিবিরে এসে উপস্থিত হয়েছেন। বিপক্ষ শিবির বলতে এখানে আরবদের শিবিরের কথা বলা হয়েছে। মুরসেনাপতি আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হয় এবং
তিনি সেখানে খাদ্য ও পানীয় সহযোগে বিশ্রাম করেন। তারপর মুর ও আরবসেনাপতির কথাবার্তার সময় যখন একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, মুরসেনাপতি আরবসেনাপতির পিতার হত্যাকারী, তখনও আরবসেনাপতি
তাঁকে কিছু বলেন না। কারণ মুরসেনাপতি ছিলেন তাঁর অতিথি। তবে আরবসেনাপতি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, পরদিন সূর্যোদয়ের পর মুরসেনাপতি শিবির থেকে বেরিয়ে গেলেই তিনি তাঁকে হত্যা করার জন্য চেষ্টা করবেন। পিতার হত্যাকারী জেনেও যথাযথ অতিথিসেবায় কোনো ত্রুটি রাখেননি আরবসেনাপতি | এখানেই উদ্ধৃত মন্তব্যটির সার্থকতা।

উদ্ধৃত অংশটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত 'অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্প  থেকে গৃহীত হয়েছে। এখানে দুই সেনাপতি বলতে আরবসেনাপতি ও  আরবসেনা মুরসেনাপতির পিছু নিলে তিনি দিক ভুল করে আরবশিবিরে এসে হাজির হন। তিনি আরবসেনাপতির কাছে আশ্রয়ভিক্ষা চাইলে আরবসেনাপতি সে প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং মুরসেনাপতিকে নিজের শিবিরে আশ্রয় দেন। এইভাবে দুই সেনাপতির সাক্ষাৎ ঘটে।
খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের ফলে মুরসেনাপতির ক্লান্তি অনেকখানি দূর হলে দুই সেনাপতি বন্ধুর মতো গল্প করতে থাকেন। নিজেদের ও পূর্বপুরুষদের সাহস ও লড়াইয়ে গল্প করতে করতে আরবসেনাপতি জানতে পারেন যে মুরসেনাপতিই তাঁর পিতাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ কথা জানতে পেরেই আরবসেনাপতি তাঁকে আক্রমণ না করে অতিথিধর্ম পালন করে সেখানে থেকে উঠে যান।

উদ্ধৃত অংশটিতে মুরসেনাপতির কথা বলা হয়েছে।
আরবসেনাপতি মুরসেনাপতিকে যে ঘোড়াটি দিয়েছিলেন, তা আরবসেনাপতির ঘোড়ার মতোই সবল এবং দ্রুতগামী ছিল। যেহেতু মুরসেনাপতি কয়েক মুহূর্ত আগে রওনা দিয়েছিলেন, তাই আরবসেনাপতি পিছু নিয়েও তাঁকে ধরতে পারেননি। ফলে তিনি নির্বিঘ্নেই নিজের শিবিরে পৌঁছেছিলেন।
নির্বিঘ্নে নিজের শিবিরে পৌঁছোনোর আগের রাতটা ছিল মুরসেনাপতির জীবনের এক ঘটনাবহুল এবং নিঃসন্দেহে স্মরণীয় রাত | প্রথমত আরব সৈন্যরা তাঁকে তাড়া করলে তিনি প্রাণভয়ে পালান। কিন্তু প্রাণে বাঁচলেও তাঁর দিকভ্রম ঘটে | ভীষণ শ্রান্ত অবস্থায় মুরসেনাপতি এসে হাজির হন বিপক্ষ আরব শিবিরে।
আরবদের আতিথেয়তার কারণেই তাঁকে বন্দি করা হয় না। আরবসেনাপতি নিজে এসে তাঁর সঙ্গে বন্ধুর মতো গল্প করতে থাকেন। এই কথোপকথনের সময়েই মুরসেনাপতি অসতর্কভাবে প্রকাশ করে ফেলেন যে তিনিই
আরবসেনাপতির পিতার হত্যাকারী। কিন্তু তা সত্ত্বেও আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেন না আরবসেনাপতি | পরদিন সূর্যোদয়ের আগে মুরসেনাপতি তাঁর ভুল বুঝতে পারেন । কিন্তু আরবসেনাপতির উদারতায় প্রাণে বেঁচে যান।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশটিতে আরবসেনাপতির কথা বলা হয়েছে।
আরবসেনাপতি মুরসেনাপতিকে অনুসরণ করছিলেন।
আরবসেনাপতি তার আগের রাত্রে বিপন্ন ও ক্লান্ত মুরসেনাপতিকে আশ্রয় দান করেন এবং তাঁর সঙ্গে বন্ধুর মতো গল্প করতে থাকেন। তখনই তিনি জানতে পারেন যে, মুরসেনাপতিই তাঁর পিতার হত্যার জন্য দায়ী। আরবদের আতিথেয়তার রীতি মেনে তিনি পিতৃহত্যাকারীকে আক্রমণ করেননি। কিন্তু মুরসেনাপতি আরব শিবির ছেড়ে বেরোনোর পর আরবসেনাপতি পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুরসেনাপতিকে অনুসরণ করেন।

শত্রু মুরসেনাপতিকে হাতের মুঠোয় পেয়েও আরবসেনাপতি তাঁকে আক্রমণ করেননি, কারণ তিনি ছিলেন তাঁর অতিথি | কেউ অতিথি হিসেবে আরবদের কাছে এলে তাঁরা সাধ্য অনুযায়ী তাঁর সেবা করেন । চরম শত্রুর
প্রতিও কোনোপ্রকার বিদ্বেষ প্রকাশ বা আক্রমণ করেন না।

অদ্ভুত আতিথেয়তা’ গল্পে আমরা দেখতে পাই যে, আরবসেনা মুরসেনাপাতিকে বহুদূর পর্যন্ত অনুসরণ করলে তিনি প্রাণভয়ে দ্রুতবেগে পালিয়ে যান। যুদ্ধে ক্লান্ত মুরসেনা দীর্ঘ পথ ঘোড়ায় চড়ে আসার কারণে খিদে ও তেষ্টায় দুর্বল হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তিনি নিজের শিবিরের দিকে রওনা হলেও পথ ভুলে যান এবং দিক স্থির করতে না পেরে বিপক্ষীয় শিবিরে উপস্থিত হন।

অতিথিসেবার বিচারে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হল আরবজাতি। কোনো অতিথি আরবদের গৃহে উপস্থিত হলে তাঁরা সাধ্যানুসারে সেই অতিথির পরিচর্যা বা আপ্যায়ন করেন। সেই ব্যক্তি তাঁদের শত্রু হলেও তাঁরা তাঁদের প্রতি কোনোরূপ অনাদর বা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেন না।

মুরসেনাপতি আরবসেনাপতির শিবিরে খাদ্যগ্রহণ এবং বিশ্রাম নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হলে উভয় সেনাপতি বন্ধুর মতো কথাবার্তায় মগ্ন হন। নিজেদের পূর্বপুরুষদের সাহস, পরাক্রম ও সংগ্রাম-কৌশল ইত্যাদি বিষয়
নিয়ে তাঁদের কথাবার্তা চলছিল।

বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদেশে থাকার সময় প্রবল অর্থকষ্টে পড়ে বিদ্যাসাগরের শরণাপন্ন হন। বিদ্যাসাগর ঋণ করে মধুসূদনকে বিদেশে টাকা পাঠিয়ে উদারতা ও মানবিকতার পরিচয় দেন।
বিপদে মানুষের পাশে যেভাবে বিদ্যাসাগর দাঁড়িয়েছিলেন তা আমাদের সকলের কাছে শিক্ষণীয়।

আরবসেনাপতি বারবার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, সূর্যোদয়ের পর তিনি পিতার হত্যাকারীর প্রাণনাশের চেষ্টা করবেন এবং পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবেন।

অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি জাতি অতিথিকে নারায়ণরূপে পূজা করে আসছে। এ ছাড়া বাঙালি যেভাবে আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে সকল শ্রেণির মানুষকে কাছে টেনে নিতে পারে, তা অন্য জাতির কাছেও শিক্ষণীয় | তাই আমি মনে করি অতিথিপরায়ণতা, মানবিকতা ও দরদ দিয়ে মানুষকে ভালোবাসাই বাঙালির জাতীয় ধর্ম।

কাহিনিতে আরবসেনাপতির অতিথিসেবা, এবং সততার সঙ্গে জাতীয় ধর্ম পালন আমাকে এক মহৎ শিক্ষা দান করে সমৃদ্ধ করেছে। আশ্রয়প্রার্থী মুরসেনাপতি তাঁর পিতার হত্যাকারী জেনেও আরবসেনাপতি নিজকর্তব্যে অবিচল থেকেছেন। আরবসেনাপতির কর্তব্যনিষ্ঠা এবং অতিথিবৎসলতা তাঁকে আমার চোখে মহৎ করে তুলেছে।

আরবসেনাপতিকে মুরসেনাপতি দেখতে পাননি। কারণ, আরবসেনাপতি মুরসেনাপতির তাঁবুর বাইরে ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়েছিলেন।

চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক শিবিরে প্রবেশ করে গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের কাছ থেকে যুদ্ধের কৌশল শিখে নিচ্ছিলেন। চন্দ্রগুপ্তের এই কার্যকলাপের জন্য সেকেন্দার সাহা তাঁকে গুপ্তচর আখ্যা দিলে তাঁকে বন্দি করার প্রসঙ্গ এসেছে।

সুদূর গ্রিক দেশ থেকে আসা সেকেন্দার সাহা ভারতের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য দেখে বিস্মিত হয়ে যান। তাঁর মনে হয়েছে দিনে সূর্যের প্রচণ্ড তেজ গাঢ় নীল আকাশকে যেন পুড়িয়ে দেয়। আবার রাত্রে চাঁদের স্নিগ্ধ শুভ্র জ্যোৎস্না
যেন আকাশকে স্নান করিয়ে দেয়। বর্ষাকালে ঘন মেঘের দল গুরুগম্ভীর গর্জন করে আকাশ ছেয়ে রাখে। এই ভূখণ্ডের একদিকে হিমালয়ের আকাশচুম্বী বরফের চূড়া তার শান্তরূপ নিয়ে বিরাজ করছে। অন্যদিকে এদেশের নদনদী কুলকুল শব্দে উদ্দামভাবে ছুটে চলেছে | আবার এই ভূখণ্ডেরই অপরদিকে মরুভূমি তার তপ্ত বালুরাশির রুক্ষতা নিয়ে অবস্থান করছে।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশটি থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা।

সুদূর মাসিডন থেকে অর্ধেক এশিয়া জয় করে এসে গ্রিক সম্রাট দিগ্‌বিজয়ী বীর সেকেন্দার সাহা শেষে বাধা পেলেন শতদ্রু নদীর তীরে। সেখানে পুরুরাজের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ বাঁধল। যুদ্ধে পরাজিত পুরুরাজকে যখন
সেকেন্দার সাহার সামনে আনা হয়েছিল, তখন তিনি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, তাঁর কাছে পুরুরাজ কেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন। উত্তরে পুরুরাজ বলেছিলেন যে, রাজার প্রতি রাজার আচরণই তিনি প্রত্যাশা করেন। এই উত্তরের মধ্য দিয়ে পুরুরাজের যে আভিজাত্যবোধ, আত্মসম্মানবোধ, শৌর্য ও সাহসিকতা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতেই গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার চমকিত হন এবং প্রশ্নে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেন।

সেলুকসের প্রশ্নের উত্তরে সেকেন্দার বলেন যে দিগ্‌বিজয় সম্পূর্ণ করতে হলে নতুন গ্রিক সৈন্যের প্রয়োজন। সেকেন্দার সাহা আরও জানান তিনি। সুদূর মাসিডন থেকে দুর্ধর্ষ সৈন্যদলের সাহায্যে সমস্ত প্রতিরোধ অতিক্রম করে ঝড়ের বেগে অর্ধেক এশিয়া জয় করেছেন, কোথাও কোনোরকম বাধার সম্মুখীন হননি। সেই অপ্রতিরোধ্য সৈন্যদল শতদ্রু নদীর তীরে পুরুরাজের সঙ্গে যুদ্ধে ক্লান্ত ও অবসন্ন। পুরুরাজের সঙ্গে যুদ্ধের পর সেকেন্দার সাহা উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতবর্ষের শৌর্যবান ও বীর রাজাদের সঙ্গে লড়াই করে দিগ্‌বিজয় সম্পূর্ণ করতে হলে তাঁর নতুন সৈন্যের প্রয়োজন।

উদ্ধৃত অংশের বক্তা হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র চন্দ্রগুপ্ত৷
চন্দ্রগুপ্তকে আন্টিগোনস গুপ্তচর ভেবে সেকেন্দারের সামনে নিয়ে আসেন। চন্দ্রগুপ্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি শিবিরের পাশে বসে শুকনো তালপাতায় কীসব যেন লিখছিলেন। সেকেন্দার সাহা চন্দ্রগুপ্তের কাছ থেকে
সত্য জানতে চাইলে চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্নে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেন।
চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের কাছ থেকে একমাসের বেশি সময় ধরে গ্রিক সম্রাটের বাহিনী চালনা, সৈন্য সাজানোর কায়দা, সামরিক নিয়ম, এইসব শিখে নিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রিক সৈন্যবাহিনী পরের দিন চলে যাবে শুনে তিনি এতদিন যা শিখেছিলেন তা-ই শুকনো তালপাতায় লিখে রাখছিলেন। এই সত্য ঘটনার কথাই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন।

চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন মগধের রাজপুত্র | তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ তাঁকে নির্বাসিত করায় তিনি প্রতিশোধের উপায় খুঁজছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত যখন শুনলেন যে, সুদূর মাসিডন থেকে অর্ধেক এশিয়া জয় করার পর সেকেন্দার সাহা আর্যগৌরব পুরুকেও পরাস্ত করেছেন, তখন তিনি সেকেন্দারের এই পরাক্রমের রহস্য, তাঁর যুদ্ধজয়ের কৌশল জানার ইচ্ছায় হাজির হন গ্রিক সম্রাটের দ্বারে।
চন্দ্রগুপ্ত তাঁর হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের অভিপ্রায়ে সেনাপতি সেলুকসের কাছে গ্রিক সম্রাটের যুদ্ধজয়ের কৌশল শিখে নিচ্ছিলেন। সেই কৌশলগুলি একটি তালপাতায় লিখে রাখার সময়ই তিনি ধরা পড়েন এবং শেষপর্যন্ত গ্রিক সম্রাট সেকেন্দারের আশীর্বাদ লাভ করেন।

উদ্ধৃতাংশটি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক থেকে গৃহীত | উদ্ধৃতাংশের বক্তা গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা। কোনো এক সন্ধ্যায় সিন্ধুনদের তীরে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সেনাপতি সেলুকসকে রাজা পুরুর
ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার বর্ণনা প্রসঙ্গে এই উপলব্ধির কথা বলেছেন।
মাসিডন থেকে দিগ্‌বিজয়ে বেরিয়ে অর্ধেক এশিয়া জয় করে সেকেন্দার এসেছেন ভারতভূমিতে। এই জয়ের পথে কোথাও তাঁকে কোনো প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি । দুর্বল শত্রুকে পরাস্ত করে বীর সেকেন্দার সাহার বীরহৃদয় তাই তৃপ্তি পায়নি। কিন্তু ভারতীয় শাসকদের অনেকেই তাঁদের শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা সেকেন্দার সাহাকে আকর্ষণ করেছেন। এদেশে এসে সেকেন্দার সাহা তাঁর যোগ্য প্রতিপক্ষ রাজা পুরুর সম্মুখীন হন। তাই এমন বীর প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশের বক্তা গ্রিক সেনাপতি সেলুকস। সেকেন্দার সাহা তাঁকে জানান যে তিনি পুরুর সাহসিকতা ও বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তাঁর হৃত রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গেই সেলুকস গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহার উদ্দেশে এই উক্তিটি করেছিলেন।
এশিয়াবিজয়ে বেরিয়ে সেকেন্দার সাহা প্রথম বাধাপ্রাপ্ত হন শতদ্রু নদের তীরে পুরুরাজের কাছে। সেকেন্দার পুরুকে বন্দি করে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি তাঁর কাছে কীরূপ আচরণ প্রত্যাশা করেন। পুরুরাজ প্রত্যুত্তরে বলেন, “রাজার প্রতি রাজার আচরণ।” এই নির্ভীক উত্তরে মুগ্ধ হয়ে সেকেন্দার সাহা পুরুরাজের সম্মানরক্ষার্থে তাঁর রাজা ফিরিয়ে দেন। সেলুকসের ঘটনাটি শুনে মনে হয়েছে যে সেকেন্দার সাহার মহানুভবতাই পুরুরাজকে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’ থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বত্তা হলেন গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা।
তিনি সেনাপতি সেলুকসের কাছে তাঁর বিজয় অভিযানের পথে প্রথম প্রতিরোধের কথা মনে করে প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন।
সেলুকসের সঙ্গে গ্রিক সম্রাটের কথাবার্তায় জানা যায়, গ্রিক সৈন্যের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে তাঁকে দিগ্‌বিজয় অসম্পূর্ণ রাখতে হচ্ছে। সম্রাট আরও জানান যে, অর্ধেক এশিয়াকে বিনাবাধায় পদানত করে তিনি ভারতবর্ষে
এসে পৌঁছোন। সেখানে তিনি শতদ্রু নদের তীরে পুরুরাজার কাছে প্রথম বাধার সম্মুখীন হন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন চন্দ্রগুপ্ত। তিনি সেকেন্দার সাহার উদ্দেশে এই কথাটি বলেছেন। চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন মগধের রাজপুত্র। মহাপদা ছিলেন তাঁর পিতা।
চন্দ্রগুপ্তের বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ তাঁকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করে রাজসিংহাসনের দখল নেন। এরই প্রতিশোধ নেওয়ার প্রসঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত উপরোক্ত উক্তিটি করেছিলেন।
হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্য চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের কাছ থেকে মাসখানেক ধরে বাহিনী চালনা, সৈন্য সাজানোর কায়দা, সামরিক নিয়ম এইসব শিখছিলেন। এগুলি একটি শুকনো তালপাতায় লিখে নেওয়ার সময় তিনি আন্টিগোনসের কাছে ধরা পড়ে যান। তাঁকে সম্রাট সেকেন্দারের সামনে আনা হয় এবং পত্রে লিখিত বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। সেই সময় চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পারিবারিক বিরোধ ও তাঁর হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার কথা ব্যক্ত করেন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত 'চন্দ্রগুপ্ত' শীর্ষক ঐতিহাসিক নাটকের অন্তর্গত উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা। মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই কথা বলেছেন। চন্দ্রগুপ্ত যখন বীরত্বের সঙ্গে সেকেন্দারকে জানান যে হত্যা না করে তাঁকে বন্দি করা। যাবে না, তখনই সেকেন্দার সাহা এই উক্তিটি করেন।
সেকেন্দার সাহা চন্দ্রগুপ্তের গ্রিক শিবিরে প্রবেশ করাকে গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবেই দেখেছেন। তাই তিনি চন্দ্রগুপ্তকে বন্দি করতে চেয়েছেন। চন্দ্রগুপ্ত তখন তাঁকে বলেন যে এক নিরাশ্রয় হিন্দু রাজপুত্র সেকেন্দার সাহার কাছে ছাত্র হিসেবে উপস্থিত হওয়াতেই তিনি এত ভীত হয়ে পড়বেন, তা চন্দ্রগুপ্ত ভাবতেই পারেননি । চন্দ্রগুপ্ত আরও বলেন যে সেকেন্দারের চন্দ্রগুপ্তকে বন্দি করার ইচ্ছা তাই কাপুরুষতা ছাড়া আর কিছুই নয়। চন্দ্রগুপ্ত আরও জানান যে তাঁকে বধ না করে সেকেন্দার তাঁকে বন্দি করতে পারবেন না। চন্দ্রগুপ্তের এই বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে সেকেন্দার তাঁকে মুক্তি দেন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। নাটকটিতে চন্দ্রগুপ্তের বীরত্ব ও উদ্যমের জয় ঘোষিত হয়েছে। এই নাটকে নানান ঐতিহাসিক ঘটনা ও
চরিত্রের সমাবেশ ঘটায় একে ঐতিহাসিক বলা হয়ে থাকে। পাঠ্য ‘চন্দ্রগুপ্ত নাট্যাংশটি সেই নাটকেরই একটি অংশ। এখানে উপস্থিত রয়েছেন গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা, গ্রিক সেনাধ্যক্ষ সেলুকস, তাঁর কন্যা ছেলেন,
আন্টিগোনস, চন্দ্রগুপ্ত প্রমুখ ঐতিহাসিক চরিত্র। এ ছাড়াও মগধের রাজা চন্দ্রগুপ্তের পিতা মহাপদ্মনন্দ, বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ, বীরচেতা রাজা পুরু প্রমুখ। ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রসঙ্গ এসেছে এই নাটকে। এ ছাড়া এসেছে অনেক
ঐতিহাসিক ঘটনার কথাও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেকেন্দার সাহার ভারত আক্রমণ, তাঁর সঙ্গে পুরুর যুদ্ধ ও পুরুর আত্মমর্যাদা প্রকাশের কথা, নন্দ কেমন করে চন্দ্রগুপ্তকে বঞ্চিত করে মগধের সিংহাসন অধিকার
করেছিলেন সেসব কথা এই নাট্যাংশে উঠে এসেছে। নাট্যাংশের কোথাও প্রচলিত ইতিহাসের কোনো ঘটনা বা চরিত্রকে বিকৃত করা হয়নি। তরবারি চালানোর ঘটনাও এই নাট্যাংশে উঠে এসেছে। তাই বলা যায় নাট্যকার এই নাট্যাংশে যথাযথ ঐতিহাসিক পরিবেশ সৃষ্টিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত পাঠ্য ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশে উল্লিখিত ‘সেকেন্দার’ হলেন গ্রিক সম্রাট এবং ‘সেলুকস’ হলেন গ্রিক সেনাধ্যক্ষ।
গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহার সংলাপে ভারত-প্রকৃতির অতুলনীয় বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপটি সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে। সেকেন্দারের সংলাপে প্রকাশিত হয়েছে দিনের বেলার তীব্র রৌদ্র, রাতের স্নিগ্ন চাঁদের আলো, বর্ষাকালের ঘন মেঘের গর্জন, তুষারাবৃত হিমালয়ের স্থিরতা, নদনদীর উদ্দামতা, মরুভূমির রুক্ষতার কথা। এ দেশের কোথাও সুউচ্চ তালগাছের বন, কোথাও-বা বটের সযত্ন আশ্রয়, কোথাও পাহাড়ের মতো উন্মত্ত হাতির গতিশীলতা, কোথাও আবার জনশূন্য বনের মধ্যে হরিণের মুগ্ধ বিস্ময়ে শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা। সবার উপরে রয়েছে এদেশের শাসক সৌম্য, গৌর, দীর্ঘকান্তি এক জাতি। সেকেন্দার এই সবকিছুর বর্ণনাই মুগ্ধচিত্তে সেলুকস ও তাঁর কন্যা হেলেনকে শুনিয়েছেন।

এখানে বক্তা গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা তাঁর গ্রিক বাহিনীর কাছে পরাজিত পুরুরাজের কথায় চমকিত হয়েছিলেন।
পরাজিত ও বন্দি পুরুরাজের কাছে সেকেন্দার জানতে চান যে তিনি তাঁর কাছে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন। উত্তরে পুরুরাজা তাঁকে বলেন, “রাজার প্রতি রাজার আচরণ।” এই উক্তির মধ্য দিয়ে পুরুরাজের চরিত্রের যে শৌর্য, সাহসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানের প্রকাশ ঘটেছে, তা গ্রিক সম্রাট সেকেন্দারকে চমকিত করে। পুরুরাজের এই সংক্ষিপ্ত উত্তরটিই সমগ্র ভারতীয় জাতি সম্পর্কে সেকেন্দারকে শ্রদ্ধাশীল করে তোলে এবং তিনি তক্ষুনি তাঁকে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’-র প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা জনৈক গ্রিক সেনাপতি সেলুকস।

‘আর্যকুলরবি’ পুরুরাজের কাছে সেকেন্দার জানতে চান তিনি গ্রিক সম্রাটের কাছে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করেন।পুরুরাজ নির্ভীক ও অবিচলিত কণ্ঠে উত্তর দেন যে তিনি ‘রাজার প্রতি রাজার আচরণ’ প্রত্যাশা করেন। সেকেন্দার সেলুকসকে এই কথা প্রসঙ্গে বলেন যে, পুরুরাজের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তিনি সেই মুহূর্তে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রকৃত বীরের প্রতি একজন বীর যোদ্ধার শ্রদ্ধাবোধ ফুটে উঠেছে। গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহার এই আচরণের মধ্যে সেলুকস অশেষ মহানুভবতা লক্ষ করেছেন।

প্রখ্যাত নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে ভারত- ইতিহাসের নানা ঘটনা নাটকের উপযোগী করে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই ঐতিহাসিক নাটক থেকে গৃহীত ‘চন্দ্ৰন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশেও এই ধারাটিই বজায়
রয়েছে | নাট্যকার পরিচিত ইতিহাস থেকে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা, দুই গ্রিক সেনাপতি সেলুকস ও আন্টিগোনস, সেলুকসের কন্যা হেলেন প্রভৃতি চরিত্র গ্রহণ করেছেন।এই নাট্যাংশে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে নাট্যকার মাসিডন থেকে ভারত পর্যন্ত গ্রিক বাহিনীর বিজয় অভিযানের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন। মগধের রাজা মহাপদ্মের পরিচয়, চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিমাতার সন্তান নন্দের বিরোধিতার কথা, পুরুরাজের বীরবিক্রম ও সাহসিকতার কথা, সেলুকসের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের সাক্ষাৎ ও তাঁর কাছে চন্দ্রগুপ্তের  রণকোশল শিক্ষার বিষয়টির মধ্যেও ইতিহাসের কোনো বিকৃতি ঘটেনি। এভাবেই ইতিহাসের নানান খণ্ডচিত্র নাট্যকলেবরে বিধৃত রয়েছে।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে মগধের রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে ‘গুপ্তচর’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।    নাটকের ঘটনা লক্ষ করলে স্পষ্টই বোঝা যায়, ওই যুবক প্রকৃতপক্ষে গুপ্তচর নন। সৌভাগ্যবশত তিনি গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। সেলুকস চন্দ্রগুপ্তের আগ্রহে ও ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হয়ে তাঁকে
বাহিনী পরিচালনা, সৈন্য সাজানোর কায়দা, যুদ্ধের নিয়মকানুনের শিক্ষা দেন। নির্জনে বসে চন্দ্রগুপ্ত সেই শিখে নেওয়া বিষয়গুলি একটি শুকনো তালপাতায় লিখে নেওয়ার সময়েই আন্টিগোনসের কাছে ধরা পড়ে যান। পত্রের অর্থ বুঝতে না পেরেই আন্টিগোনস তাঁকে সম্রাটের কাছে ধরে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে ‘গুপ্তচর’ আখ্যা দেন। কিন্তু আলোচ্য নাট্যাংশে এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, গ্রিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির কোনো ইচ্ছা চন্দ্রগুপ্তের ছিল না।

আন্টিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে ‘গুপ্তচর’ সন্দেহে সম্রাটের কাছে ধরে নিয়ে এলে সম্রাট সেকেন্দার চন্দ্রগুপ্তের কাছে তাঁর রণকৌশল লিখে রাখার বিষয়টি জানতে চান। প্রসঙ্গক্রমে চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পারিবারিক বিরোধের কথা উল্লেখ
করে জানান যে, তাঁর ইচ্ছা শুধুমাত্র হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করা। সে কারণেই তিনি সেলুকসের কাছে বাহিনী-পরিচালনা ও সামরিক নিয়মকানুন শিক্ষা করেছেন। গ্রিক সম্রাট তাঁর অভিযুক্ত সেনাপতির দিকে ক্ষণেক তাকিয়ে চন্দ্রগুপ্তের বক্তব্যের সত্যতা বুঝে নিতে চেয়েছিলেন।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্ত ও একজন গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের প্রসঙ্গ রয়েছে। গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা চন্দ্রগুপ্তের কাছে তাঁর
কাজকর্মের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জানতে চাইলে আত্মপরিচয় দিয়ে চন্দ্রগুপ্ত জানান, “আমার বৈমাত্র ভাই নন্দ সিংহাসন অধিকার করে আমায় নির্বাসিত করেছে। আমি তারই প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছি।” এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তিনি নানান রণকৌশল শিক্ষার জন্য সেলুকসের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। প্রবল শক্তিশালী গ্রিক বাহিনীর সেনানায়ক হয়েও বিপর্যস্ত চন্দ্রগুপ্তকে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে সেলুকসের বীরোচিত মনোভাব ও সহানুভূতির পরিচয়ই মেলে।বিদেশি হয়েও চন্দ্রগুপ্তের প্রতি এরূপ আচরণ তাঁর উদারতারই প্রকাশ। চন্দ্রগুপ্তের আচরণ, কথাবার্তা ও চেহারা দেখে কখনও তাঁকে সন্দেহভাজন বা গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ হয়নি সেলুকসের। তাই তিনি এই ভাগ্যহারা কিন্তু  উদ্যমী যুবকটির সঙ্গে গ্রিক সামরিক প্রথা বিষয়ে আলোচনা করতেন।
নাট্যাংশে দেখা যায়, উদ্ধত, দুর্বিনীত আন্টিগোনস যখন রাগের বশে সেলুকসের মাথা লক্ষ করে তরবারি চালান, চন্দ্রগুপ্ত তাঁর চেয়েও দ্রুতগতিতে নিজের তরবারি দিয়ে সে আঘাতকে আটকে দেন। এভাবেই তিনি শিক্ষাগুরু সেলুকসের ঋণ শোধ করেন।

আলোচ্য অংশটি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশ থেকে গৃহীত।উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্ত।
চন্দ্রগুপ্ত গ্রিক সেনাপতি সেলুকসের কাছে শেখা গ্রিকবাহিনী পরিচালনা সৈন্য সাজানো, সামরিক কৌশল ইত্যাদি একটি শুকনো তালপাতায় লিখে রাখছিলেন।
হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সেইসব কৌশল ব্যবহারের লক্ষ্যেই চন্দ্রগুপ্ত তাঁর শেখা বিদ্যা তালপাতায় লিখে রাখছিলেন। বৈমাত্রেয় ভাই নন্দ মগধের সিংহাসন অধিকার করে তাঁকে নির্বাসিত করেছেন। চন্দ্রগুপ্ত তারই প্রতিশোধ নিতে চান। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি গ্রিক সেনাদলের অন্যতম প্রধান সেনাপতির কাছে রণকৌশল শিখেছিলেন এবং সেই বিষয়টি লিখেও নিয়েছেন।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে আন্টিগোনস সেলুকসকে ‘বিশ্বাসঘাতক' আখ্যা দেন। কিন্তু আমার সেলুকসকে সত্যিই বিশ্বাসঘাতক বলে মনে হয় না।
চন্দ্রগুপ্তকে দেখে এবং তাঁর ব্যবহার ও কথাবার্তায় সেলুকসের মনে কখনোই সন্দেহ বা বিদ্বেষভাব জেগে ওঠেনি।স্বভাবতই তিনি তাঁকে শত্রু বলেও মনে করেননি। সে কারণেই রণকৌশলের শিক্ষা দিতেও তিনি দ্বিধা
করেননি। আর চন্দ্রগুপ্তের কথাতেই স্পষ্ট যে, গ্রিক বাহিনীর ক্ষতিসাধন করা বা গ্রিক সেনাদলকে আক্রমণ করার কোনো উদ্দেশ্যই তাঁর ছিল না। তাই সেলুকসকে কখনোই বিশ্বাসঘাতক বলা যায় না।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহা চন্দ্রগুপ্তকে আক্রমণে উদ্যত আন্টিগোনসকে এই নির্দেশ দিয়েছেন।
চন্দ্রগুপ্তকে গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি করে গ্রিক সেনাপতি আন্টিগোনস তাঁকে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহার কাছে নিয়ে আসেন। সেলুকস চন্দ্রগুপ্তকে বিশ্বাসঘাতক বললে আন্টিগোনস তাঁকে জানান যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন স্বয়ং সেলুকস। সে-কথা সহ্য করতে না পেরে সেলুকস তরবারি বের করলে আন্টিগোনস দ্রুততার সঙ্গে নিজের তরবারি বের করে সেলুকসের যাথা লক্ষ করে নিক্ষেপ করেন। চন্দ্রগুপ্ত নিজের তরবারি দিয়ে সে আঘাত আটকান।তখন আন্টিগোনস সেলুকসকে ছেড়ে চন্দ্রগুপ্তকে আক্রমণ করলে গ্রিক সম্রাট প্রশ্নে উদ্ধৃত নির্দেশটি দেন।

প্রখ্যাত নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত 'চন্দ্রগুপ্ত' ঐতিহাসিক নাট্যাংশটিতে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহার উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। এক সন্ধ্যায় সিন্ধুনদের তীরে দাঁড়িয়ে সেনাপতি সেলুকসের সঙ্গে সম্রাটের কথাবার্তায় তাঁর মহান মানসিকতার পরিচয়ও পাওয়া যায়। তাঁর অনুভূতি থেকে বোঝা যায়, তিনি ভারতে সাম্রাজ্যস্থাপনের উদ্দেশ্যে আসেননি। শুধুমাত্র দিগ্‌বিজয়ের আকর্ষণেই ভারতে ছুটে এসেছেন। এদেশের প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি তিনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল।রাজ্যবিজয়ের পথে পুরুরাজের কাছ থেকে তিনি বাধা পেলেও
তাঁর প্রতি যে ব্যবহার তিনি করেছেন, তা একজন যথার্থ বীরের পক্ষেই সম্ভব। সৈন্যসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে দেশে ফিরে যেতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর মনের আক্ষেপ স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রখর বাস্তববুদ্ধিও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেলুকস ও আন্টিগোনসের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া জটিল পরিস্থিতিও ঠান্ডা মাথায় সামলান। এর মধ্য দিয়েই তাঁর ধীরস্থির চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। চন্দ্রগুপ্তের পরিচয় পেয়ে তাঁকে মুক্ত করে দেওয়ার মধ্যেও গ্রিক সম্রাটের উদারতা এবং যুক্তিশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত 'চন্দ্রগুপ্ত’ নাট্যাংশে গ্রিক সম্রাট সেকেন্দার সাহার সঙ্গে মগধের নির্বাসিত রাজপুত্র চন্দ্রগুপ্তের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে চন্দ্রগুপ্তের প্রতি সেকেন্দারের মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।
আন্টিগোনস চন্দ্রগুপ্তকে সম্রাট সেকেন্দারের কাছে ‘বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে উপস্থিত করলেও এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সেকেন্দার চন্দ্রগুপ্তের প্রকৃত পরিচয় জানতে চান। চন্দ্রগুপ্তের চরিত্রের স্পষ্টবাদিতা, সততা, বীরত্ব, শিক্ষালাভের একান্ত ইচ্ছা তাঁকে আকৃষ্ট করে। চন্দ্রগুপ্তকে আন্টিগোনস আক্রমণ করলে সম্রাটই তাঁকে নিরস্ত করেন এবং ঔদ্ধত্য প্রকাশের জন্য আন্টিগোনসকে সাম্রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন। শেষে সম্রাট সেকেন্দার শত্রুর গুপ্তচর হিসেবে চন্দ্রগুপ্তকে আটক করতে চাইলে চন্দ্রগুপ্ত তীব্র ভাষায় তার প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, গ্রিক সম্রাটকে আগে বাঁর ভাবলেও সামনাসামনি হওয়ার পর তাঁকে কাপুরুষ মনে হচ্ছে। তিনি এরপর আরও বলেন, “সম্রাট আমায় বধ না করে বন্দি করতে পারবেন না।” — এই সাহসী কথায় চমৎকৃত গ্রিক সম্রাট তাঁকে জানান যে, তিনি শুধুমাত্র তাঁকে পরীক্ষা করছিলেন। চন্দ্রগুপ্তকে নিজ রাজ্যে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে সম্রাট তাঁকে আশীর্বাদ করেন—“তুমি হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করবে। তুমি দুর্জয় দিগ্বিজয়ী হবে। এর মধ্য দিয়ে তাঁর উদার মনেরই পরিচয় মেলে।

আলোচ্য অংশটি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘চন্দ্রগুপ্ত’র প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে নেওয়া হয়েছে।
সামরিক প্রথা ও পারস্পরিক সৌজন্য ভুলে আন্টিগোনস অপর গ্রিক সেনাধ্যক্ষ সেলুকসকে বারংবার বিশ্বাসঘাতক অ্যাখ্যা দেন। উত্তেজিত সেলুকস তরবারি বের করলে আন্টিগোনস অধিকতর দ্রুততার সঙ্গে
সেলুকসের মাথা লক্ষ করে তরবারি নিক্ষেপ করেন।সম্রাট সেকেন্দার সাহার সামনে এমন আচরণকে ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। প্রথমে তাঁকে নিরস্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে এবং তারপর তাঁর নাম ধরে সম্বোধন করে সম্রাট সেকেন্দর সাহা যে আন্টিগোনসকে শাসন করেছেন তা বুঝতে পেরে আন্টিগোনস লজ্জায় মাথা নীচু করেন।

কলম্বাস: (১৪৫১-১৫০৬খ্রি) ইতালির জেনোয়া নগরে জন্মগ্রহণ করেন।ইনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ইউরোপীয় নাবিক।কলম্বাস ভারতবর্ষ ও তার নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জের বর্ণনা পেয়ে সেই দ্বীপগুলিতে যাওয়ার সংকল্প নেন। প্যালো বন্দর থেকে সমুদ্রযাত্রা করে ভারতের পথে রওনা দেন। ভারত আবিষ্কার করতে গিয়ে তিনি কিউবা, সেন্ট ডেমেঙ্গো প্রভৃতি দ্বীপে পৌঁছোন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বোঝেননি যে তিনি আসলে ভারত বা এশিয়ার কোনো দেশ নয়, উত্তর আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছেছেন।পরে তাঁর দেখানো পথ ধরেই ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা ও ত্রিনিদাদ আবিষ্কৃত হয়।
লেডিকেনি: ১৮৫৬ থেকে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের বড়েলাটের পদে থাকা লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রী লেডি ক্যানিং-এর নামানুসারেই লেডিকেনি নামক মিষ্টান্নটির নামকরণ করা হয়েছে। ক্ষীরের পুর দেওয়া পানতুয়া
জাতীয় এই মিষ্টিটি লেডি ক্যানিং খেতে খুব পছন্দ করতেন বলেই এটির এরূপ নাম প্রচলিত হয়েছিল।
বিরিয়ানি: ফারসি 'বিরিয়ান’ শব্দ থেকে বিরিয়ানি শব্দটি বাংলায় এসেছে।
এটি একটি সুস্বাদু খাদ্য-বিশেষ, যেটি এমন এক ধরনের পোলাও, যাকে সাধারণত মাংস সহযোগে রান্না করা হয়ে থাকে।আমাদের দেশের লখনউ ও হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানি জগবিখ্যাত। উপাদেয় খাবার হিসেবে কলকাতাতেও এর বিপুল জনপ্রিয়তা ও চাহিদা তৈরি হয়েছে।
ইউরেকা: 'Eureka' শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘heureka' শব্দ থেকে যার অর্থ হল 'I have found it' অর্থাৎ ‘আমি খুঁজে পেয়েছি। প্রচলিত ধারণা অনুসারে ‘ইউরেকা' শব্দটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক গণিতবিদ
আর্কিমিডিস।আর্কিমিডিস প্লবতার সূত্রসন্ধানে যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, সে সময়ে একদিন চৌবাচ্চায় স্নান করতে নেমে তিনি দেখেন যে পরিপূর্ণ চৌবাচ্চাটির অনেকখানি জল উপচে নীচে পড়ে গেল। তিনি বুঝলেন যে, তাঁর শরীরের আয়তনের সমপরিমাণ জল চৌবচ্চাটি থেকে অপসারিত হয়েছে।
তখনই তিনি 'ইউরেকা' শব্দটি উচ্চারণ করে ওঠেন।

বনভোজনের জন্য প্রথমে যে তালিকাটি তৈরি হয়েছিল তাতে ছিল। বিরিয়ানি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, দু রকমের কাবাব ও মাছের চপ।
প্রথম তালিকার খাবারগুলি তৈরি করতে গেলে বাবুচি, চাকর, একটি মোটর লরি, আর দুশো টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু চারজনে মিলে চাঁদা উঠেছিল মাত্র দশ টাকা হু-আনা।তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রথম তালিকাটি বাদ
দেওয়া হয়।

বনভোজনের দ্বিতীয় তালিকায় ছিল খিচুড়ি, আলুভাজা, পোনা মাছের কালিয়া, আমের আচার, রসগোল্লা, লেডিকেনি এবং শেষে যুক্ত হয় রাজহাঁসের ডিমের ডালনা।
রাজহাঁসের ডিম জোগাড়ের দায়িত্ব পড়েছিল প্যালার উপর। ক্যাবলাকে আলুভাজার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পোনামাছের কালিয়া রাঁধার দায়িত্বে ছিল প্যালা। দিদিমার ঘর থেকে হাতসাফাই করে আমের আচার নিয়ে আসার কথা ছিল হাবুলের আর রসগোল্লা ও লেডিকেনি ধারে ম্যানেজ করা হবে এমনটা ঠিক হয়েছিল।

প্যালা রাজহাঁসের ডিম আনতে গিয়েছিল ভন্টার বাড়ি। ভন্টার বাড়িতে রাজহাঁস ছিল। কিন্তু সেই রাজহাঁস ডিম পাড়ে কি না তা জানতে দু- আনার পাঁঠার ঘুগনি আর ডজনখানেক ফুলুরি ঘুষ দিতে হল ভন্টাকে।
তারপর যখন দুপুরবেলায় ভন্টার বাবা-মেজদা অফিস চলে গেছে তখন প্যালাকে ভন্টা উঠোনে নিয়ে গেল। উঠোনে কাঠের বাক্সের ভিতরে সার সার খুপরি। দুটো রাজহাঁস সেখানে ডিমে তা দিচ্ছিল। প্যালা ডিমের জন্য
বাক্সের ভিতরে হাত ঢোকাতেই রাজহাঁস দিল তার হাতে কামড়ে। যন্ত্রণায় প্যালা চিৎকার করে উঠলে ভন্টার মা সেখানে চলে আসে আর হাতে রক্তের ধারা নিয়ে প্যালা কোনোরকমে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে।

ট্রেন থেকে নেমে প্রায় মাইলখানেক হেঁটে গেলে ক্যাবলার মামার বাড়ি। আগের দিন রাত্রে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় এবং রাস্তা কাঁচা এঁটেল মাটির হওয়ায় তা খুবই পিচ্ছিল ছিল। সেই পিচ্ছিল রাস্তায় প্রথমেই আছাড় খেল হাবুল। তার হাতে ছিল ডিমের পুঁটলি।ফলে সমস্ত ডিম ফেটে গিয়ে হলদে রস গড়াতে লাগল।আর তারপরেই প্যালা আমের আচারসমেত আছাড় খেল। সারা গায়ে কাদা আর আমের আচার নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। সবশেষে এল
টেনিদার পালা। টেনিদাও পড়ল আর তার সঙ্গে পড়ল রসগোল্লার হাঁড়ি। কাদায় পড়ে থাকা সাদা ধবধবে রসগোল্লার জন্য বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে চারজনে চলতে লাগল।

টেনিদার আদেশে খিচুড়ি বা অন্যান্য রান্না শুরু হওয়ার আগে প্যালা মাছের কালিয়া রান্না করতে শুরু করল। ক্যাবলার মা আগেই মাছ কেটে নুন মাখিয়ে দিয়েছিলেন। প্যালা কড়াইতে তেল দিয়েই তার মধ্যে মাছ ফেলে
দিল। সঙ্গে সঙ্গে কড়াই-ভরতি ফেনা হয়ে মাছগুলো তালগোল পাকিয়ে গেল।কাঁচা তেলে মাছ দেওয়ার ফলে মাছের কালিয়া আর হল না, হয়ে গেল মাছের হালুয়া।মাছের কালিয়ার এই অবস্থা দেখে তাই ক্যাবলা ঘোষণা
করল, “মাছের কালিয়ার তিনটে বেজে গেল।”

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পে মোট পাঁচটি চরিত্রের সঙ্গে দেখা হল। এই পাঁচজন হল—টেনিদা, প্যালা, হাবুল, ক্যাবলা আর ভন্টা।
[১] টেনিদা: টেনিদা চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি। পটলডাঙার এই ‘চারমূর্তি’র দলে টেনিদা হল দলপতি বা লিডার। সে খেতে ভালোবাসে। খাবারের নাম শুনলেই তার জিভে জল আসে,অস্থির হয়ে পড়ে। নিজে কাজে হাত না দিয়ে একটু তফাতে বসে নির্দেশ দিতে এবং মুখ চালাতেই বেশি পছন্দ করে টেনিদা।আনন্দ, রাগ, বিরক্তি, সাহস বা ভয়ের প্রকাশ— সবেতেই তার একটু বাড়াবাড়ি আছে।

[২] প্যালা: প্যাস্না গল্পের কথক। সে পেট খারাপের রুগি।ফলে হিঞ্চে সেদ্ধ, গাঁদালপাতা আর শিঙিমাছের ঝোল প্রভৃতি মশলা ছাড়া খাবারই তার প্রধান খাদ্য। টেনিদা এ নিয়ে তাকে খোঁটা দেয় এবং তাতে সে বিব্রত বোধ করে।আড্ডার মধ্যে বোকা বোকা কথা বলতে বা কোনো কিছু ভন্ডুল করতে প্যালার জুড়ি নেই।
[৩] হাবুল: হাবুল সেন ঢাকার বাঙাল। তার কথাবার্তায় পূর্ববঙ্গের ভাষার টান। টেনিদাকে নিয়ে সে প্রায়ই ঠাট্টা করে। হাবুল পড়াশোনায় ভালো ও বুদ্ধিমান।
[8] ক্যাবলা: ক্যালোই টেনিদার দলের সবচেয়ে বুদ্ধিমন সদস্য। যথেষ্ট রসবোধ আছে তার।যখন একটার পর একটা খাবার নষ্ট হয়ে চলেছে, তখন বারোটা, একটা, দুটো, তিনটে বেজে গেল বলে ঘোষণা করেছে সে। একমাত্র ক্যাবলাকেই একটু সমঝে চলে দলপতি টেনিদা।
[৫] ভন্টা: এ গল্পে ভন্টা কম গুরুত্ব পাওয়া চরিত্র। অত্যন্ত ধড়িবাজ ছেলে সে।রাজহাঁসের ডিমের সন্ধান দেওয়ার জন্য ঘুষ হিসেবে পাঁঠার ঘুগনি আর ফুলুরি খেয়েও কাজের কাজ সে তো করেইনি, বরং প্যালাকে
বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত টেনিদার গল্প-উপন্যাসগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল হাস্যরস। টেনিদার মুখে বকাঝকা, উপম, তিনজনকে খোঁটা দেওয়া—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে মজার উপাদান।হাবুলের বাঙাল ভাষা
আর ক্যাবলার মুখে হিন্দি শব্দ গল্পের ভাষাকে আরও বেশি মজাদার করে তুলেছে। এ ছাড়াও গল্পের ভাষার মধ্যে নানারকম ছোটো ছোটো মজা লুকিয়ে আছে। যেমন টেনিদা হাবুল সেনের ব্যবহার করা 'পোলাপান'
শব্দটাকে লুফে নিয়ে বলে, “পোলাপান! এই গাড়লগুলোকে জলপান করলে তবে রাগ যায়। এখানে 'পোলাপান’ ও ‘জলপান' শব্দ দুটি নিয়ে মক্তা তৈরি করেছেন লেখক। আবার ক্যাবলা যখন বলে, 'খাট্টা’, তখন তার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যঙ্গের সুরে টেনিদা বলে, “খাট্টা! বেশি পাঁঠামি করবি তো চাট্টা বসিয়ে দেবো।” এ ছাড়াও পাঞ্জাব মেলের স্পিডে পালানো, আছাড় খাওয়ার বর্ণনা, একটার পর একটা খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়া আর সে বিষয়ে ক্যাবলার ঘোষণা—সব মিলিয়ে শুধু ভাষা ব্যবহারের কৌশলেই এক অদ্ভুত হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।

বাংলা সাহিত্যে টেনিদার মতো আরও কয়েকটি ‘দাদা’ চরিত্র দেখতে পাওয়া যায়।আমাদের আলোচ্য বিখ্যাত তিনটি দাদাচরিত্র হল ঘনাদা, ফেলুদা এবং ঋজুদা।
[১] ঘনাদা: ঘনাদা চরিত্রের স্রষ্টা প্রেমেন্দ্র মিত্র।বনমালি নস্কর লেনের একটি মেসবাড়ির ছাদের ঘরে ঘনাদার বাস।বাড়ির নম্বর ৭২।ঘনাদা সেখানে বসেই গল্প বলে যান। সেসব গল্পে ঘনাদাই নায়ক। তাঁর প্রধান শ্রোতা হল শিবু, শিশির, গৌর, সুধীর। এ ছাড়া অন্যরাও অনেক সময় এই গল্পের আসরে যোগ দেয়। পৃথিবীর নানা কোণে নানারকম মানুষদের নিয়ে এসব গল্প বলেন তিনি।কল্পবিজ্ঞান থেকে ইতিহাস সবেরই ছোঁয়া আছে ঘনাদার গল্পে।

[২] ফেলুদা: সত্যজিৎ রায়ের গোয়েন্দা গল্পের প্রধান চরিত্র হলেন ফেলুদা। তাঁর সঙ্গী হলেন তোপসে ও জটায়ু ওরফে লালমোহন গাঙ্গুলি।বাংলা গোয়েন্দা গল্পে ফেলুদা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কলকাতা থেকে হিমালয়ের পাহাড়ে কিংবা বিদেশে সর্বত্র ফেলুদার গতিবিধি। খুন, জখম, চুরি, কিংবা গুপ্তধনের ধাঁধা—ফেলুদা সবেতেই দক্ষ। রহস্যসমাধানের ক্ষেত্রে মগজাস্ত্র বা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিই ছিল তাঁর প্রধান হাতিয়ার। গভীর পর্যবেক্ষণ আর রসবোধ—এই নিয়েই ফেলুদা পুরোদস্তুর বাঙালি চরিত্র আর এটাই তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ।
[৩] ঋজুদা: ঋজুদার স্রষ্টা বুদ্ধদেব গুহ ঋজুদাকে গোয়েন্দা করেননি বা ঘনাদার মতো পৃথিবীর নানা কোণে ঘুরে ঘুরে রহস্যের সমাধান করে বেড়ানো চরিত্র বানাননি। ঘনাদার মতো ইতিহাস বা বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে গতিবিধি নেই তার।ঋজুদার বিষয় হল জঙ্গল।ভারতে তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গলে দেখা গেছে তাকে। জঙ্গলে অ্যাডভেঞ্চার ও শিকার ছিল তার প্রিয় বিষয় | ঋজুদা ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির অন্যতম প্রিয় চরিত্র।

প্রথমে বনভোজনের খাবার লিস্টে বিরিয়ানি, পোলাও প্রভৃতি মোগলাই খাবার স্থির হয়।কিন্তু দশ টাকা ছ-আনা চাঁদায় বাবুর্চি এনে সেই খাবার রান্না করা অসম্ভব ছিল।তাই এই লিস্ট বাতিল হয়।

মোগলাই খাবারের পরিবর্তে প্যালা শুক্তো, বাটিচচ্চড়ি এবং ক্যাবলা পশ্চিমের কুঁদরু ও ঠেকুয়া প্রভৃতি খাবারের কথা তুললে টেনিদা বিরক্তিতে রেগে গিয়ে লাফিয়ে উঠেছিল।

কম খরচে বনভোজন সারার জন্য প্রথম লিস্টের মোগলাই খাবার বাতিল করে শেষমেশ যে লিস্টটা স্থির করা হল তাতে ছিল—খিচুড়ির সঙ্গে রাজহাঁসের ডিম, আলুভাজা, পোনা মাছের কালিয়া, আমের আচার, রসগোল্লা ও লেডিকেনি।

প্যালা বেশ ডাঁটের মাথায় বলেছিল যে, ভদ্রলোকরা হাঁসের ডিম খায়, তাই হাঁসের ডিমের বদলে রাজহাঁসের ডিম খাওয়া হলে তা 'রীতিমতো  রাজকীয় খাওয়া হবে।

রাজহাঁসের ডিম দিয়ে রাজকীয় খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল।
সেই খাবার আনার দায়িত্ব পড়েছিল প্যালার ওপর।

প্যালা ডিম জোগাড় করতে রাজহাঁসের বাক্সে হাত ঢোকাতেই রাজহাঁস প্যালার হাত ঠোঁট দিয়ে কামড়ে ধরে। এই কামড়ও রাজহাঁসের ডিমের মতো ‘রাজকীয় কামড়’ ছিল। ইতিমধ্যে চিৎকার চেঁচামেচিতে ভন্টার মা ঘুম থেকে জেগে উঠলে প্যালা হ্যাঁচকা টানে হাঁসের ঠোঁট থেকে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে পালায়।

রাজহাঁসের ডিম জোগান দেওয়ার বিনিময়ে ভন্টা প্যালার কাছ থেকে পাঁঠার ঘুগনি এবং ফুলুরি আদায় করেছিল। এদিকে নিজে ডিম বের না করে ভন্টা প্যালাকেই রাজহাঁসের ডিম বের করতে বলে। অথচ রাজহাঁস যে এমন কামড় মারতে পারে, সে বিষয়ে ভন্টা প্যালাকে সতর্ক করেনি। তাই রাজহাঁসের কামড় খেয়ে ডিম নিতে না পেরে প্যালা ভন্টার ওপর রেগে গিয়ে এই কথাগুলো বলেছিল।

আলোচ্য বাক্যে পূর্ববঙ্গীয় ভাষা রীতি বা বঙ্গালি উপভাষার ধরন ব্যবহৃত হয়েছে।‘বনভোজনের ব্যাপার’ গল্পে ব্যবহৃত এইরকম অপর একটি বাক্য হল—“এই প্যালা–দ্যাখছস? ওই গাছটায় কীরকম জলপাই পাকছে !”

শ্যামবাজার থেকে মার্টিন রেলে চেপে টেনিদা, প্যালা, ক্যাবলা, হাবুল—এই চারজন মালপত্র নিয়ে ওঠে। তাদের কয়েকটি স্টেশন পরে নামার কথা ছিল।উদ্দিষ্ট স্টেশনে নামার পর বৃষ্টিভেজা পথে একে একে সবাই আছাড় খেয়ে কাদায় পড়লে একে একে ডিম, আচার, রসগোল্লা প্রভৃতি নষ্ট হয়।

কাদামাখা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে হাবুল আছাড় খেয়ে পড়ে এবং ডিমের বারোটা বাজে। টেনিদা যখন হাবুলকে দোষ দিতে লাগল, প্যালা তখন বলতে যাচ্ছিল যে হাবুল চার টাকা চাঁদা দিয়েছে।ঠিক তখনই পা দুটো শূন্যে ছুঁড়ে প্যালা আছাড় খেয়ে পড়ল।কাদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর দেখা গেল প্যালার মাথা মুখ বেয়ে আচারের তেল গড়াচ্ছে।তখনই ক্যাবলা ঘোষণা করল, “আমের আচারের একটা বেজে গেল।”

 বাগানবাড়িতে পৌঁছোল টেনিদা, ক্যাবলা, হাবুল আর প্যালারাম।
বাগানবাড়িটা ছিল নির্জন ও সুন্দর। সেখানে চারিদিকে সুপুরি আর নারকেলগাছের বাগান। একটা পানা ভরতি পুকুর। বাগানের মাঝখানে একটা একতলা বাড়ি।যদিও বাড়িটা ছিল চাবিবন্ধ আর মালিও কাছাকাছি ছিল না।

কথাটি বলেছিল টেনিদা।রাস্তাঘাটের অনেক কষ্ট ও অসুবিধা পেরিয়ে টেনিদা, ক্যাবলা, হাবুল ও প্যালা বনভোজনের জন্য ঠিক করা বাগানবাড়িতে পৌঁছোল। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখল ঘর তালাবন্ধ, মালিকেও
দেখা যাচ্ছে না।তখন টেনিদা এই কথাটি বলেছিল, কারণ তার মনে হয়েছিল।
যে নিজেদের শক্তিতে ভরসা রেখে তারা নিজেরাই উনুন খুঁড়ে রান্না করবে।

প্যালা, ক্যাবলা আর হাবুল সেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর তারা দেখল যে টেনিদা গাছে হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে আর একটা গোদা বানর তার পিঠ চুলকে দিচ্ছে। টেনিদার চারপাশে চার-পাঁচটা বানর মুঠো মুঠো করে চাল, ডাল, আলু সাবাড় করছে আর টেনিদার পিঠ চুলকে দিচ্ছে।

খিচুড়ি না রেঁধে টেনিদা গাছে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই সুযোগে কয়েকটা গোদা বানর চাল, ডাল, আলুর পুঁটুলি নিয়ে গাছের মাথায় উঠে যায়। এর ফলে পিকনিক পণ্ড হয়ে যায় | পুকুরের ঘাটে চারজন এমনভাবে বসে থাকে যেন শোকসভা পালিত হচ্ছে।

বানরের দল খিচুড়ির চাল, ডাল, আলু সাবাড় করলে শোকাহত টেনিদাকে প্যালা বলেছিল যে “বাগানে একটা গাছে জলপাই পেকেছে।”

টেনিদা সঙ্গে সঙ্গে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল এবং “ইউরেকা!” বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল।

পথে ডিম, রসগোল্লা, আচার সবই কাদায় পড়ে নষ্ট হয়। চাল, ডাল, আলু খেয়ে নেয় বানরের দল। তাই খিদে মেটাতে প্যালার প্রস্তাবমতো বাগানের পাকা জলপাই খেতে হয় চারজনকে। এভাবেই বনভোজন ফলভোজনে পরিণত হয়।