প্রথম পাঠ

উঃ-নদীর স্রোতের চলাচলে যে ছন্দপূর্ণ ‘ছড়া’ লুকিয়ে আছে,সেই ছন্দ অন্য কারোর নেই। এই নদীর স্রোতের ছন্দ মন দিয়ে অনুভব করলে বোঝা যাবে, এমন ছন্দময় ‘ছড়া’ ইতিপূর্বে কেউ কখনো কোথাও লেখেনি।

উঃ-এই ভুবন বিশাল ও বিপুল। এর চারদিকে যে ছন্দ ছড়িয়ে আছে, সেই ছন্দকে মন ও কান পেতে শুনলে—ভুবনটা কে যথার্থ চেনা সম্ভব হয়। কেন-না ছন্দের সাহায্যেই জগৎ ও জীবনের সফল ইঙ্গিত অনুভব করা যায় এবং ভুবনটাকে সহজে চিনতে পারা যায়।

উঃ-জীবন ছন্দময়, জীবনের সেই ছন্দে কান দিতে হবে, মন দিতে হবে। জীবনের ছন্দ সঠিকভাবে অনুভব করতে পারলে জীবন পদ্যময় হয়ে উঠবে। আর তখনই পদ্য লেখা সহজ হবে বলে কবি মনে করেন।

উঃ-সকল প্রকার দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে মন না দিলে ছন্দ শোনা যায় না বলে কবি মনে করেন। অর্থাৎ ছন্দ শুনতে হলে দ্বন্দ্ব ভুলে একাগ্রচিত্ত হতে হবে।

উঃ-প্রকৃতির সকল ক্রিয়াকলাপেই ছন্দ আছে। এমন চারটি দৃষ্টান্ত হল—ঝড়-বাদল, চাঁদের জোছনা, নদীর স্রোত ও রাত্রি-দিন।

উঃ-যানবাহনকে ছন্দ মেনেই চলতে হয়। মোটরের চাকায় ছন্দ ধ্বনিত হয়, রেলগাড়িও চলে ছন্দের জাদুতে। জলের ছন্দে তাল মিলিয়ে নদী বা সাগরে নৌকো বা জাহাজ পাড়ি দেয়। এভাবেই যানবাহনের উপর ছন্দ প্রভাব ফেলে।

উঃ-প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি কবি অজিত দত্তের 'ছন্দে শুধু কান রাখো' নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। বিশাল ভুবনকে চেনার কবি নির্দেশিত অর্থ হল; তার ভাব, চলাচল, ছন্দময়তা ও সৌন্দর্যকে নানাভাবে উপলব্ধি করা। কবি বলতে চেয়েছেন মন ও কান পেতে প্রকৃতির ছন্দ অনুভব করতে পারলেই ভুবনকে চেনা সহজ হবে।

উঃ-কবি অজিত দত্তের লেখা ‘ছন্দে শুধু কান রাখো' কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে।

চাঁদের যে মিষ্টি আলো রাতের পৃথিবীকে সৌন্দর্যময়ী করে তোলে তাকেই আমরা জোছনা বলে থাকি। এই সুমধুর জোছনা আমাদের মনে আনন্দের প্রকাশ ঘটায়; আমরা আবেগে মত্ত হয়ে পড়ি জোছনার মাধুর্যে। জোছনার প্রভাবে যেহেতু আমরা প্রভাবিত হই, তাই বলা যায় জোছনারও নিজস্ব ছন্দ আছে, নাহলে তা এমনভাবে মানুষকে মত্ত করতে পারত না।

উঃ-কবি অজিত দত্তের ‘ছন্দে শুধু কান রাখো' কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে। নদী আপন বেগে বয়ে চলে সাগরের উদ্দেশে। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নৌকো চলে, মাঝি গান গায়। নদীর স্রোতের কলতান আমাদের মনে আনন্দের সঞ্চার করে। অনুভবের মাধ্যমে স্রোতের ছন্দ বা স্রোতের গান শুনতে পেলে বোঝা যাবে যে, তার মতো মধুর সুর আর কিছুতেই থাকতে পারে না। স্রোতের মাঝে যে ছন্দ আছে, তাই যেন সুন্দর কবিতা।

উঃ-কবি অজিত দত্তের 'ছন্দে শুধু কান রাখো’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে। প্রকৃতি ছন্দময়, অর্থাৎ প্রকৃতির সকল কাজের মধ্যেই রয়েছে ছন্দ। ছন্দ ছাড়া জীবন অতিবাহিত হতে পারে না। নদী বা সাগরের তীরে বসলে দেখা যায় ঢেউ এসে পাড়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছে। সেই ধ্বনি ছন্দময়, তা রসিক মানুষের মনে সুরের জাগরণ ঘটায়। নৌকো বা জাহাজ ঢেউয়ের তালে তাল মিলিয়ে দূরে যাত্রা করে, সেক্ষেত্রেও ছন্দের চেতনা মনের মধ্যে প্রভাব ফেলে। মন দিয়ে অনুভব করতে না পারলে ছন্দকে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

উঃ-কবি অজিত দত্তের 'ছন্দে শুধু কান রাখো’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতি ছন্দময়, প্রকৃতির সব কাজেই রয়েছে ছন্দ। ঝড়-বাদল,জোছনা, পাখির কাকলি, ঝিঁঝির ডাক, নদীর কলতান, মোটর বা রেলগাড়ির চাকা, জলের স্রোত—সবেতেই ছন্দ বিরাজ করে।জীবনে ছন্দ থাকলে জীবন পদ্যের মতো সুন্দর ও আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে। ভুবনটাই চলছে ছন্দ-সুরের সংকেতে। অর্থাৎ বিশ্বপ্রকৃতিতে কোনো কিছুই ছন্দহীন নয়।

উঃ-কবি অজিত দত্তের ‘ছন্দে শুধু কান রাখো’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে। জীবন ও জগৎ ছন্দময়। সর্বত্রই ছন্দ বিরাজমান। বস্তুজগতের ছন্দ যদি জীবনের প্রতিটি কাজে অনুভব করা যায় তবে জীবন হয়ে ওঠে সহজ ও সুন্দর। কবিতা বা পদ্য হল মধুর। জীবনে আনন্দ আসলে মধুর কবিতা লেখা সহজ হয়ে ওঠে। তাই মন দিয়ে কান পেতে প্রকৃতির সকল উপাদান থেকে ছন্দের স্বাদ অনুভব করতে হবে। এইভাবে জীবনে ছন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারলে জীবনে মজা অর্থাৎ আনন্দ আসবে।আর আনন্দের আগমনেই জীবন পদ্যময় হয়ে উঠবে।

উঃ-কবি অজিত দত্ত ‘ছন্দে শুধু কান রাখো’ নামক কবিতা য়বলতে চেয়েছেন যে, প্রকৃতির সকল প্রকারের কর্মকাণ্ডেই ছন্দ রয়েছে। এই ছন্দ যেমন জড়জগতে প্রভাব ফেলে তেমনই মানবজীবনেও ছন্দের প্রভাব বর্তমান।

প্রকৃতি ছন্দময়, আর প্রকৃতির বুকেই মানুষ পরিপুষ্টি লাভ করে, ফলে মানুষের জীবনেও ছন্দের প্রভাব পড়তে বাধ্য। মানুষ যদি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রেখে প্রকৃতির ছন্দকে অনুধাবন করতে পারে, তবে মানুষের জীবন হয়ে উঠতে পারে আনন্দময় ও পদ্যের মতোই লালিত্যময়।অর্থাৎ ছন্দ মনের মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে, মনকে করে তোলে প্রাণময় ও গতিপ্রবণ। প্রকৃতির ছন্দ মানবমনে ধরা পড়লে জীবন হয়ে ওঠে সরস ও পদ্যময়। মানুষের মনকে সৃষ্টিশীল করে তোলে ছন্দ এবং মনের চেতনা শক্তির জাগরণ ঘটাতেও সাহায্য করে প্রকৃতির ছন্দ। এভাবে মানুষের জীবনে ছন্দ প্রভাব ফেলে।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি কবি অজিত দত্তের 'ছন্দে শুধু কান রাখো' নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এই কবিতায় কান পাততে বলা হয়েছে বিশ্বচরাচরে। কান হল শ্রবণেন্দ্রিয়, যা দিয়ে আমরা শুনে থাকি। কবি এই শোনার ক্ষেত্রে একমুখী হওয়ার কথা বলেছেন। আর শোনার ব্যাপারটি হল জগৎময় ছড়িয়ে থাকা নানা বিষয়ের ছন্দ।

পৃথিবীর সর্বত্রই ছন্দ রয়েছে; ছন্দ রয়েছে ঝড়-বাদলে, ছন্দ রয়েছে চাঁদের জোছনায়; এমনকি দিনের বেলায় যে পাখির কাকলি বা গভীর রাতে যে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যায়, তার মধ্যেও ছন্দের অবস্থান রয়েছে। নদীর স্রোতের ছন্দ অনুভব করতে পারলে বোঝা যাবে যে, তার মতো কবিতা আর হতেই পারে না।ছন্দের প্রভাবে মোটর বা রেলগাড়ি চলমান হয়, আবার নৌকো বা জাহাজ সাগর পাড়ি দেয় জলের ছন্দেই; পৃথিবীতে দিনরাত্রি হয় ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে—এখানেও সময় বাঁধা পড়েছে ঘড়ির কাঁটার ছন্দে। এই ছন্দ অনুভব করার ক্ষমতা না থাকলে কোনো কিছু থেকেই আনন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ কান পেতে শুনলে আমরা বুঝতে পারব যে পৃথিবী ছন্দময়, সব কিছুতেই রয়েছে ছন্দের অবস্থান, ছন্দহীন জীবন সুন্দর হতে পারে না। এই কারণেই কবি প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি কবি অজিত দত্তের ‘ছন্দে শুধু কান রাখো' নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। ‘ছন্দ’ বলতে সুমিত শব্দের কাব্যময় প্রকাশকে বোঝানো হয়, যা কানের মাধ্যমে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে।

পৃথিবী ছন্দময়, অর্থাৎ প্রকৃতির সকল কর্মকাণ্ডেই রয়েছে ছন্দের ছোঁয়া। ছন্দ না থাকলে জীবনটা আনন্দহীন অর্থাৎ গদ্যময় হয়ে উঠবে। কবিতা বা পদ্য সাহিত্যের এক কোমল অংশ। বলাযায় মনের কোমল ও সুন্দর অনুভূতির প্রকাশ ঘটে কবিতায়।মনে যদি আনন্দ না থাকে অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে যদি ছন্দের অনুভূতি আমাদের দেহে-মনে সঞ্চারিত না হয়, তবে জীবন সুন্দর হয় না, মন হয়ে ওঠে কঠিন বা গদ্যের মতোই লালিত্যহীন। যারা কান পেতে আর মন দিয়ে সকল ছন্দকে শুনতে পারবে, তারাই ছন্দের সুর-সংকেত অনুভব করতে পারবে, নাহলে ছন্দ অধরাই থেকে যাবে। গভীর মনোযোগের মাধ্যমে ছন্দকে গ্রহণ করতে পারলে তা থেকে আনন্দ পাওয়া যাবে, তবেই জীবন হবে পদ্য ময়।আর কান না দিলে অর্থাৎ ছন্দকে যদি অনুভূতির জগতে না আনা যায়,তবে পদ্যের মতো লালিত্যময়, কোমল, সুন্দর জিনিস রচনা করা যাবেনা বলে কবি মনে করেছেন। তাই তিনি প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি করেছেন।

উঃ-‘ভুবন’ বলতে বিশ্বপ্রকৃতি অর্থাৎ মহাবিশ্বকে বোঝানো  হয়েছে।

‘তারা’ বলতে বোঝানো হয়েছে তাদের, যারা কান পেতে ও মন দিয়ে পৃথিবীর সকল ঘটনার মধ্য থেকেই ছন্দ শুনতে পায়।

এই বিশ্বপ্রকৃতি হল ছন্দময়, প্রকৃতির সব কিছুই চলে ছন্দের  মাধ্যমে। পাখির কাকলি, ঝিঁঝির ডাক, নদীর স্রোত, গাড়ি বা  জলযানের এগিয়ে চলা সবেতেই বিরাজ করছে ছন্দ। তবে এই ছন্দ  ধরতে হবে, অর্থাৎ অনুভূতির মাধ্যমে তাকে গ্রহণ করতে হবে। এর  জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হল আত্মোপলব্ধি; এই বোধ না থাকলে  প্রকৃতির ছন্দকে মানুষ বুঝতে পারে না। এই ছন্দ অনুভব করার  জন্য দরকার মন্দ কথায় কান না দেওয়া, আর মনের মাঝে কোনো  দ্বন্দ্ব না রাখা। যারা এমন কাজ করতে পারবে, তারাই প্রকৃতির ছন্দ  অনুভব করতে পারবে ছন্দকে মনের মধ্যে গ্রহণ করার মাধ্যমে  তারা ছন্দের সংকেত বুঝতে পারবে এবং এভাবেই তারা ভুবন  বা জগৎকে চিনবে।

উঃ-শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ' গল্পটি একটি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি। আলোচ্য গল্পে ৩৫৮৯ সাল নাগাদ পৃথিবীতে কেমন অবস্থা তৈরি হতে পারে তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখক। উক্ত সময়ে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ঘটবে পৃথিবীতে। যেমন- ওই সময়ের মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ প্রতিরোধকারী মলম আবিষ্কৃত হবে, যার ফলে পৃথিবীতে নানারকম উড়ানযন্ত্র আবিষ্কারের হিড়িক পড়ে যাবে। মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী টনিক আবিষ্কার করবে, সূর্যের আরও দুটি গ্রহ আবিষ্কৃত হবে এবং জানা যাবে যে সূর্যের আর কোনো গ্রহ নেই। ইতিমধ্যে চাঁদ, মঙ্গল, শুক্র গ্রহে মানুষ ল্যাবরেটরি স্থাপন করবে।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ’ নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। ‘অনাবশ্যক ভাবাবেগ’ বলতে কিছু শিল্পসৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। যেমন—কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমা প্রভৃতির চর্চা।

আলোচ্য গল্পে লেখক ৩৫৮৯ সালের যে সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, সেই সময়ে মানুষ বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কিছুর চর্চাই করবে না হয়তো, তাই তাদের কাছে মনের আবেগের কোনো মূল্য থাকবে না। তাই শিল্পেরও কোনো মর্যাদা থাকবে না। কিন্তু আমার মনে হয় মনের আবেগ হারিয়ে গেলে পৃথিবীটা মরুভূমির মতোই রুক্ষ হয়ে পড়বে। পৃথিবীকে তথা মানুষকে তো বাঁচিয়ে রাখবে মনের আবেগ। কবিতা, গান, ছবি আঁকা প্রভৃতি চর্চা করলে, এগুলির মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে পাবে। তাই কবিতা, গান, আঁকা প্রভৃতির চর্চাকে ‘অনাবশ্যক’ মনে করি না।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি ‘পাগলা গণেশ' থেকে নেওয়া হয়েছে। মানুষের মন থেকে হারিয়ে গেছে সৌন্দর্য, দয়া-মায়া-করুণা প্রভৃতির অনুভূতি। এইসব অনুভূতিগুলির আর প্রয়োজন না থাকায়, মানুষের জীবনে এসবের চর্চাও আর হয় না। |

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ’ নামক কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে ব্যতিক্রমী মানুষটি হলেন স্বয়ং পাগলা গণেশ।

গল্পে বর্ণিত ৩৫৯৮ সালেরও ১৫০ বছর পূর্বে যখন ‘মৃত্যুঞ্জয় টনিক’ আবিষ্কৃত হয়, তখন অন্য অনেকের মতো গণনাও তার ৫০ বছর বয়সে তা পান করেন এবং তার আর মৃত্যু হয় না। প্রায় সমসময় থেকেই শিল্পবিরোধী আন্দোলনও শুরু হয়। মানুষের কাছে তখন থেকেই বিজ্ঞান হয়ে ওঠে চর্চার একমাত্র বিষয়। চর্চার বিষয় থেকে অনিবার্যভাবে বাদ পড়ে যায় সাহিত্য, শিল্প, সংগীত। বিষয়গুলিকে মানুষ অনাবশ্যক বলে বিবেচিত করে। সমকালীন ঘটনার এই গতিপ্রকৃতি গণেশের পছন্দ হয় না। বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িরও যে একটা সীমা থাকা দরকার এ তার মনে হয়। তাই একক প্রচেষ্টায় কালের গতিকে উলটো দিকে ফেরানোর ব্যর্থ চেষ্টা না করে গণেশ আশ্রয় নেন সভ্যসমাজ থেকে দূরে হিমালয়ের গিরিগুহায়। একান্ত নির্জনে ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টায় গণেশ করতে শুরু কবিতাচর্চা, গান গাওয়া, ছবি আঁকার সাধনা। এভাবেই তিনি বেগের যুগে আবেগনির্ভরতার পথে, যুগবিরুদ্ধ কাজ করে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠেন।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ’ নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। কথাগুলি বলা হয়েছিল পাগলা গণেশের উদ্দেশে। দুটি পাখাওয়ালা লোক কথাগুলি বলেছিল।

পাগলা গণেশের গানের গলা ভালোই ছিল। একদিন সন্ধেবেলা তিনি গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করেন। সেইসময় দুটো লোক আকাশযানে চড়ে লাসা থেকে ইসলামাবাদ উড়ে যাচ্ছিল, যেতে যেতে তাদের কানে পাগলা গণেশের গানের শব্দ পৌঁছোয়। তারা গণেশের গানের কোনো অর্থ বা আবেগ বুঝতে পারে না, তাই তারা বিরক্ত হয়। তাদের মনে হয় ওই গানের আওয়াজ বিকট শব্দ ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থাৎ ব্যতিক্রমী মানুষ পাগলা গণেশের গলা ছেড়ে গান গাওয়াকেই মানুষরা মনে করে ‘বিকট শব্দ’।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ' নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। গণেশের তিন ছেলে ও এক মেয়ে আছে। তাদের মুখশ্রী তিনি একেবারে ভুলে গেছেন।

গণেশ নিজে যেমন কৃতী মানুষ, তেমনই তার ছেলেমেয়েরাও প্রত্যেকেই এক-একজন কৃতী বিজ্ঞানী। বিগত একশো বছর ধরে ছেলেমেয়েদের দেখতে না পাওয়ার জন্যই পাগলা গণেশ ছেলেমেয়েদের মুখশ্রী ভুলে গেছেন।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ' নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। একজন পুলিশম্যান গণেশকে সম্ভ্রমের সঙ্গে অভিবাদন জানিয়ে বলেছিল—তিনি যে পাহাড়ময় এত কাগজ ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তার কারণ কী? এটা কী নতুন কোনো বিষয়ে গবেষণা?

একদিন গণেশ যখন আপন মনে কবিতা লিখে বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন আকাশ থেকে একটা পিপে মাটিতে নেমে আসে। তার মধ্য থেকে একজন পুলিশম্যান বেরিয়ে এসে গণেশকে ‘স্যার’ বলে অভিবাদন জানায়। গণেশ যখন কলকাতার সায়েন্স কলেজে মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স পড়াতেন, তখন তার ছাত্র ছিল ওই পুলিশম্যান। তাই মাস্টারমশাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই সে সসম্ভ্রমে তাকে ‘স্যার’ অভিবাদন জানিয়ে সম্মান জানিয়েছে।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ' নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। উক্তিটির বক্তা হলেন গণেশ নিজেই। গণেশ ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, গান গেয়ে পৃথিবীকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন।

গণেশের প্রয়াস যে শেষপর্যন্ত সফল হয়েছিল, গল্পশেষে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব গণেশের একক প্রচেষ্টার খবর পেয়ে তাঁর বিমান থেকে গনেশের ডেরায় নেমে যে উক্তি করেছিলেন, তাতেই সেই ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেছিলেন—‘লোকে গান গাইতে লেগেছে, কবিতা মকসো করছে, হিজিবিজি ছবি আঁকছে।' অর্থাৎ গণেশের প্রয়াস যে ব্যর্থ হয়নি, তা নিঃসন্দেহে বোঝা যায়।

উঃ-শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ’ গল্পের উদ্ধৃত অংশে ‘লোকটা’ অর্থাৎ পুলিশম্যানের কথা বলা হয়েছে, যে একসময় পাগলা গণেশের ছাত্র ছিল।

সে গণেশের কবিতা পড়ে অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলল যে, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কোনোদিনই সে এ জিনিস পড়েনি এবং তাদের সময়ে শিক্ষানিকেতনে এসব পড়ানো হত না।

আসলে উক্ত পুলিশম্যানের আমলে শিক্ষানিকেতনে কবিতা পড়ানো হত না। ফলে কবিতার সঙ্গে পুলিশম্যানের কোনো সম্পর্কই ছিল না। গণেশের কবিতা পড়ে সে কিছুই বুঝতে পারেনি। গণেশের কবিতার ভাব বা আবেদন তার মাথাতেই ঢোকেনি। এই কারণেই সে অসহায়ভাবে মাথা নেড়েছিল।

উঃ-প্রশ্নোক্ত অংশটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ’  নামক কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য অংশের তিনজন হলেন গণেশের প্রাক্তন ছাত্র পুলিশম্যান, পুলিশম্যানের মা এবং স্ত্রী। ।

পুলিশম্যান গণেশের কবিতা পাঠ করে কিছুই বুঝতে না পেরে চলে গেলেও পরের দিনই সে তার স্ত্রী এবং মা-কে নিয়ে আসে। গণেশের কাছে, গণেশের কবিতা শোনার জন্য। গণেশ তাদের দেখে খুশি হয় এবং তাদের কবিতা শোনায়। তবে শুধু তাই নয়, গণেশ তাদের গান শোনায় এবং ছবিও দেখায়। গণেশের এই শিল্পকর্মে পুলিশম্যান, তার মা ও স্ত্রী মোহিত হয়ে পড়ে। তারা যেন কোনো অনাস্বাদিত বস্তুর রস আস্বাদন করতে থাকে। তাই তারা গণেশের কবিতা, গান শুনে এবং ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

উঃ-প্রখ্যাত কথাশিল্পী শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ‘পাগলা গণেশ' গল্পে গণেশ মুখ্য তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি একাধারে অসাধারণ এবং ব্যতিক্রমী একটি চরিত্র। মৃত্যুঞ্জয় টনিক গণেশকে অমরতা দান করেছে। তিনি নিজে বিজ্ঞানের অধ্যাপক, অথচ কেবল যুগের হুজুগে না চলে, নিছক বিজ্ঞানকর্মে নিজেকে ব্যাপৃত না রেখে, মানুষের মধ্যে উপ্ত মানসবৃত্তিগুলির বিকাশে তিনি আন্তরিক সচেষ্ট হয়েছেন। যুগধর্ম অনুযায়ী তখন পৃথিবীর সর্বত্র বিজ্ঞান ছাড়া আর যেন ভাবনার কোনো বিষয়ই নেই। গত ১৫০ বছরে বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। আবার পাশাপাশি ‘সুকুমার শিল্পবিরোধী আন্দোলন’-ও চলছে। তাই মানবমন থেকে আবেগ, স্নেহ-মায়া-মমতার মতো অনুভূতিগুলি যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনই শিল্প-সাহিত্যসংস্কৃতির পাঠও চুকে যাচ্ছে। তার তখন মনে হয়েছিল—‘বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা দরকার।' এমতাবস্থায় প্রায় একক প্রচেষ্টায় কবিতা-গান-আঁকা ইত্যাদির চর্চার জন্য গণেশ হিমালয়ের গিরিগুহায ডেরা বাঁধেন। সেখানে কবিতা লিখে তিনি ভাসিয়ে দেন বাতাসে, ভাবেন যদি কারও কাছে পৌঁছোয়, যদি কেউ পড়ে। কখনও তিনি গান করেন, ছবি আঁকেন। এমন সৃষ্টিছাড়া কীর্তিকলাপ যার, তাকে তো ‘পাগলা’ বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু গণেশ ‘পাগলা’ নন, তিনি আন্তরিক। যান্ত্রিক পৃথিবীর হৈ-হল্লার মাঝে নিঃসঙ্গ হলেও তিনি মানবতার পূজারি। বিজ্ঞাননির্ভর মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই পারস্পরিক আবেগের সূত্রে মানুষকে বাঁধতে তিনি বিজ্ঞানের পাশে মানুষের সৃষ্টিশীলতা ও মানসবৃত্তিকে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছেন। একক যুদ্ধের সার্থক সৈনিক গণেশ তাই এক সার্থক মানবচরিত্র হিসেবে এ গল্পে আত্মপ্রকাশ করেছেন। গল্পশেষে তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব যখন 'জানান লোকে গান গাইতে লেগেছে, কবিতা মকসো করছে, হিজিবিজি ছবি আঁকছে।' তখন গণেশের প্রাণময় উক্তি—“যাঃ তাহলে আর ভয় নেই। দুনিয়াটা বেঁচে যাবে..."

উঃ-আলোচ্য ‘পাগলা গণেশ' নামক কল্পবিজ্ঞানধর্মী গল্পে দেখা যায়, মানবসভ্যতা বিজ্ঞানের হাত ধরে সুদূর ভবিষ্যতে উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানের বাড়াবাড়ি এবং মানবমনের সৃষ্টিশীলতার মৃত্যু হওয়ার সমস্যাটিকে ইঙ্গিতবাহী করে তোলা হয়েছে।

উঃ-'পাগলা গণেশ' গল্পে মাধ্যাকর্ষণ প্রতিরোধী মলম আবিষ্কারের ফলে নানারকম উড়ানযন্ত্র আবিষ্কারের হিড়িক পড়ে যায়। সেগুলি হল-ডাইনিদের বাহন ডান্ডাওলা ঝাঁটার মতো, নারদের ঢেঁকির মতো, কার্পেটর মতো, কার্তিকের বাহন ময়ূরের মতো সব উড়ানযন্ত্র।

উঃ-ঘরে ঘরে মানুষ বিজ্ঞান নিয়ে এমন বুঁদ হয়ে আছে যে, প্রতি ঘরের প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো বিজ্ঞানী। ফলে বিজ্ঞান- চর্চা ছাড়া অন্য কোনো চর্চায় কেউ মাথা ঘামায় না। কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক সিনেমা এসব নিয়ে মাথা ঘামানো মানে খামোখা সময় নষ্ট করা। কারণ চারদিকে বিজ্ঞানচর্চার মধ্যে এসব চর্চা কোনো কাজে লাগে না।

উঃ-বিজ্ঞানের চরমতম সাফল্য ও প্রসারের যুগেও খেলাধুলোর বল থাকতেই পারে, কেন-না বিজ্ঞান মস্তিষ্কের বিষয়, খেলাধুলো শরীরচর্চা ও বিনোদনের ব্যাপার। তবুও যখন ‘পাগলা গণেশ' গল্পে ৩৫৮৯ সালের প্রেক্ষাপটে দেখা গেল—মানুষ বিজ্ঞানে বুঁদ, খেলাধুলোর সের-জনপ্রিয় আসরগুলি, অর্থাৎ অলিম্পিক-বিশ্বকাপ উঠে গেছে, তখনই বোঝা যায় খেলাধুলোর পাট চুকে গেছে।

উঃ-বিজ্ঞান মানুষের কাজে এক আশীর্বাদস্বরূপ শক্তির উৎস সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজ্ঞানই যে মানুষের জীবনের একমাত্র বিষয়, তা কখনো হতে পারে না। মানবমনের সুকুমার শিল্পবোধের নান্দনিক প্রকাশ কবিতা-গান-কবির মতো বিষয়গুলিও তাই মানবসভ্যতার অঙ্গ হওয়ার কথা ছিল। সেইসঙ্গে ক্রীড়া ও দয়া- মায়া-করুণা-ভালোবাসার মতো আবেগ-অনুভূতিও থাকা জরুরি৷

উঃ-দুশো বছর বয়সি পাগলা গণেশের পঞ্চাশ বছর বয়সে যে মৃত্যুঞ্জয় টনিক আবিষ্কার হয়েছিল, তা সে সেবন করায় তার অমর হয়ে যায়। আর দেড়শো বছর আগে যে সুকুমার শিল্পবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা পাগলা গণেশের পছন্দ হয়নি। এইভাবেই তার জীবনের প্রতি বিরক্তি গড়ে ওঠে।

উঃ-একটা ঢেঁকি আর একটা ভেলায় চড়ে আসা লোক দুটো গণেশের কাজের ফিরিস্তি থেকে জেনেছিল, গণেশ কবিতা লিখছে, কবিতার পাতা বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে—যদি কেউ কুড়িয়ে পায় আর পড়তে ইচ্ছে হয় তো পড়বে। এরপর লোক দুটো গণেশের কাজের প্রতি অবহেলার ভাব প্রকাশ করে।

উঃ-গণেশ কবিতা লিখে দুটো লোকের কাছ থেকে অবহেলা পেয়েছে, আর গান গাওয়ায় দুটো পাখাওয়ালা ভদ্রলোকের কাছ থেকে কথার খোঁচা খেয়েছে এবং ছবি খোদাই করতে গিয়ে এক ভদ্রমহিলার কাছ থেকে সে উপেক্ষা লাভ করেছে। তারপরেই তার মনে হয়েছে, পৃথিবীর গতিপ্রকৃতি সে একা উলটে দিতে পারবে না।

উঃ-পৃথিবীর গভীর থেকে গভীরতর অসুখ এখন। এই অসুখে পৃথিবী বিষণ্ণ। বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িতে গার্হস্থ্যধর্মের মায়া-মমতার সবরকম পথ নষ্ট হয়ে গেছে। তাকে ফেরত পাওয়ার ওষুধ হল সুকুমার শিল্প। সুতরাং পৃথিবীর প্রকৃতপক্ষে গভীর অসুখ করেছে।

উঃ-গণেশের এই হাসিতে যে উচ্চধ্বনি আছে তাতে সাফল্যের আনন্দ প্রকাশিত। গণেশের বিশ্বাস পৃথিবীর লোক তার সঙ্গে আছে, তাই দুনিয়াটা সত্যিই বেঁচে যাবে।

উঃ-শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কল্পবিজ্ঞান-গল্প ‘পাগলা গণেশ'- এর পটভূমিতে উল্লিখিত সালটি সুদূরতম ৩৫৮৯। স্বভাবতই কল্পনা করে নিতে হয় বিজ্ঞানের অকল্পনীয় উন্নতির যুগ সেটা। সে-যুগে মানুষ পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদে ছাড়াও অন্য দুই গ্রহ মঙ্গল ও শুক্রে ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে। আবিষ্কার করেছে সূর্যের আরও দুটি গ্রহ এবং নিশ্চিত হয়ে গেছে সূর্যের আর কোনো গ্রহ অনাবিষ্কৃত নেই। হাজার হাজার মানুষ মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে আলোর চেয়েও দ্রুতগতির মহাকাশযানে ১০০-১৫০ বছর আগে রওনা হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। কাছেপিঠে যাওয়া মানুষেরা ফিরবে ফিরবে করবে। তবে তাদের আসার সময়টি নিশ্চিত নয়। এ পৃথিবীতে মানুষ মরণশীল নয় । পুরাণ কালের মানুষেরা আজও জীবন্ত। তাই মহাকাশগামী মানুষেরা ফিরে এলে সেই আমলের লোকেদের দেখতে পাবে। নতুন মানুষেরও আর জন্ম হচ্ছে না, তাই নবজাতকের কান্নাও আর শোনা যায় না। ঘরে ঘরে বিজ্ঞানী, মানুষ বিজ্ঞানে বুঁদ হয়ে আছে।

উঃ-‘পাগলা গণেশ' নামক কল্পবিজ্ঞান গল্পে সালটি তখন ৩৫৮৯। অভাবনীয় উন্নতিতে বিজ্ঞান মানুষের মনের সবটুকু আবিষ্কার করে নিয়েছে। ঘরে ঘরে মানুষ এত বেশি বিজ্ঞান নিয়ে। বুঁদ হয়ে আছে যে, ‘প্রতিঘরের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বিজ্ঞানের বিজ্ঞানী।' তাই বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের বিজ্ঞানচর্চায় বিজ্ঞান বিষয়টি সর্বক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। চারদিকে শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান।

বিজ্ঞান ছাড়া অন্য যে যে বিষয়গুলি চর্চাহীন হয়ে পড়েছে, সেগুলির মধ্যে মূলত পড়ে কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথাসাহিত্য, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি। এসব নিয়ে কেউ যেমন মাথা ঘামায় না, তেমনই কোনো কাজে লাগে না বলে এসব বিষয়কে মানুষ ‘অনাবশ্যক ভাবাবেগ’ বলে মনে করে। অন্যদিকে খেলাধুলোর পাটও চুকে গেছে। ‘অলিম্পিক’ ও ‘বিশ্বকাপ’-এর মতো জনপ্রিয় ক্রীড়াবাসর অবলুপ্ত, দয়া-মায়া-করুণা-ভালোবাসা এসবের প্রয়োজন না থাকায় বা চর্চার অভাবে মানুষের মন থেকে এই আবেগ-অনুভূতিগুলিও মুছে গেছে।

উঃ-২০০ বছর বয়সি গণেশ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগে বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িকেই ‘সভ্যতার সংকট’ বলে মনে করেছিলেন। তাই অনেক চেষ্টা করেও তিনি যখন দেখলেন কালের চাকার গতি উলটো দিকে ঘোরানো যাবে না, তখন তিনি সভ্যসমাজ থেকে দূরে থাকার জন্য হিমালয়ের এক গিরিগুহায় আশ্রয় নেন। তাই গল্পে হিমালয়ের প্রসঙ্গ এসেছে।

আপাতদৃষ্টিতে হিমালয়কে খুব নির্মল জায়গা বলে মনে হলেও গণেশ জানেন তা সহজ সত্য নয়। কেন-না তখন এভারেস্টের চূড়া চেঁছে সেখানে হয়েছে অবজার্ভেটরি। রূপকুণ্ডে বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি তৈরি হয়েছে, নামকরা অনেক নির্জন জায়গাই এখন মানুষের চলাচলে নির্জনতা হারিয়েছে। কে টু, কাঞ্চনজঙ্ঘা, যমুনেত্রী, গঙ্গোত্রী, মানসসরোবর সব জায়গাতেই কোনো-না-কোনো গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমুদ্রতলেও চলেছে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা। তাই পরিষ্কার বোঝা যায়, ভূপৃষ্ঠে-ভূগর্ভে-অন্তরীক্ষে কোথাও নিবিড়-নির্জনতা নেই।

উঃ-খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা গণেশ’ নামক কল্পবিজ্ঞান গল্পে দেখা যায়, বিজ্ঞানের সর্বগ্রাসী কামড় থেকে গণেশ দুনিয়াটাকে বাঁচানোর চেষ্টায় রত। তাই তার এক সময়ের ছাত্র পুলিশম্যানের কাছে তার সহজ স্বীকারোক্তি—‘আমি পৃথিবীটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি।' হিমালয়ের নিভৃত কোলে তিনি কবিতা লেখেন, উদাত্ত কণ্ঠে গান গেয়ে থাকেন, পাথর কেটে ছবি আঁকেন। অনেকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করলেও, ওই পুলিশম্যান একদিন তার মা ও স্ত্রীকে নিয়ে এসে গণেশের কবিতা শুনিয়ে নিয়ে গেল। পরদিন ওই পুলিশের সঙ্গে তার চার সহকর্মী গণেশের দ্বারস্থ হয় কবিতা-গান-ছবি বুঝতে। পরদিন আরও জনাদশেক ব্যক্তি উপস্থিত হয়। অবশেষে একদিন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব গণেশের ডেরায় এসে খেদ প্রকাশ করেন—‘এ আপানি কী কাণ্ড করেছেন? পৃথিবী যে উচ্ছন্নে গেল!’ গণেশ জানতে পারলেন, লোকে আবার গান গাইছে, কবিতা চর্চা করছে, হিজিবিজি ছবি আঁকছে। তখনই গণেশ নিশ্চিত হলেন ‘দুনিয়াটা বেঁচে যাবে...’।

উঃ-মৃত্যুঞ্জয় টনিক গণেশকে অস্বাভাবিক দীর্ঘজীবন দান করেছিল, তিনি অমরতা লাভ করেছিলেন। পাশাপাশি দীর্ঘজীবনে বিজ্ঞানের অস্বাভাবিক বাড়াবাড়িও তার মনকে পীড়া দিতে শুরু করে। বিশেষত, তিনি যখন লক্ষ করেন, বিজ্ঞানের বেগধর্মী যোজনায় মানুষের জীবন থেকে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে দয়া-মায়া-করুণা-ভালোবাসার মতো আবেগ-অনুভূতি এবং সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির পাটও চুকে যাচ্ছে, তখন তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। তা ছাড়া হিমালয়ের নির্জন-পরিসরে, একান্তে, এককভাবে যে একটু চারুকলা অর্থাৎ সৃষ্টির চর্চায় তিনি ডুবে থাকবেন—তাও তিনি পারছিলেন না, সেখানেও তাকে মাঝেমধ্যে মানুষের ব্যঙ্গাত্মক উক্তি শুনতে হচ্ছিল। জীবনের এই পরিস্থিতিকে তাই গণেশ যন্ত্রণা বলে মনে করেছেন।

বিজ্ঞান যখন সর্বগ্রাসী হয়ে সমগ্র পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন সে বিষয়ে নিতান্ত বিব্রত হয়েই যোদ্ধার মতো গণেশ সভ্যসমাজ থেকে দূরে হিমালয়ের গিরিগুহায় আশ্রয় নেন। সেই নির্জনতার অবকাশে চলতে থাকে তার একক শিল্পচর্চা। তিনি গান গেয়ে তৃপ্তি পান, পাথর কেটে বানান ছবি, কবিতা লিখে ছড়িয়ে দেন বাতাসে—যদি কেউ পড়ে এই ভেবে। কিন্তু গণেশের ওই নিভৃত শিল্পসংগ্রাম অন্য অনেকের ভালো লাগে না। একদিন ঢেঁকি ও ভেলা-যাত্রী দুই ব্যক্তি গণেশের কবিতাচর্চাকে তীব্র ব্যঙ্গ করে। অন্য একদিন দুটো পাখাওয়ালা লোক তাকে এসে রীতিমতো ধমক লাগিয়ে জিজ্ঞাসা করে—“ও মশাই, এমন বিকট শব্দ করছেন কেন?” গণেশ তার গানচর্চার ব্যাখ্যা দিলে, তারা তার গানকে ‘বিটকেল শব্দ’ আখ্যা দেয়। অন্য একদিন গণেশ যখন যান্ত্রিক বাটালি দিয়ে পাথর কেটে ছবি আঁকছিল, ধামায় আরোহিণী এক মহিলা তাঁর সেই চর্চা দেখে ব্যঙ্গোক্তি করে—“খেয়েদেয়ে কাজ নেই ! ছবি হচ্ছে ! হুঁঃ!” এসব ঘটনা গণেশের মনে তীব্র হতাশার জন্ম দেয়। তাই গণেশ এমন মনে করতে বাধ্য হন।