ষষ্ঠ অধ্যায় ➤ চল তড়িৎ

(i) দৈর্ঘ্যের ওপর রোধের নির্ভরতা :  উপাদান, প্রস্থচ্ছেদ এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো পরিবাহীর রোধ ওর দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক হয়। অর্থাৎ, Rox / যখন, A স্থির থাকে।
(ii) প্রস্থচ্ছেদের ওপর নির্ভরতা : উপাদান, দৈর্ঘ্য, উন্নতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে পরিবাহীর রোধ ওর প্রস্থচ্ছেদের ব্যাস্তানুপাতিক হয়। অর্থাৎ, Rx 1/A  যখন, I স্থির থাকে।

(ii) রোধাঙ্ক : স্থির উদ্ধৃতায় কোনো পদার্থের একক দৈর্ঘ্য এবং একক প্রদক্ষেণযুক্ত তারের বোলাকে ওই পদার্থের রোধাঙ্ক বলে।

(ii) রোধাঙ্কের একক : CGS পদ্ধতিতে রোধাঙ্কের একক এহন সেন্টিমিটার SI পদ্ধতিতে রোসাঙ্কের এক ওহন মিটার।

প্রাত্যহিক জীবনে অন্তরক পদার্থের ব্যবহার :
(i) বিদ্যুৎ কর্মী বিদ্যুতের লাইনে কাজ করার সময় রবারের গ্লাভস ব্যবহার করেন। রবার একটি অন্তরক বলে বিদ্যুতের শক্ লাগে না। (ii) গৃহ তড়িৎ বর্তনীতে কেবিলের তিনটি তার অন্তরক পদার্থ দিয়ে আবৃত থাকে যাতে বাড়ির দেওয়ালের মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ না হয়। (iii) তড়িৎ বর্তনীতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সুইচ, প্লাগ, সকেট অন্তরক পদার্থ এবোনাইট দিয়ে তৈরি হয় এবং ফিউজ তারের হোল্ডার অন্তরক পদার্থ চিনামাটি দিয়ে তৈরি হয়। (iv) বিদ্যুৎ সরবরাহকারী তার বিদ্যুতের স্তম্ভের সঙ্গে অন্তরক পদার্থ পোর্সিলেন কাপের সাহায্যে যুক্ত থাকে।

দৈনন্দিন জীবনে তড়িৎ পরিবাহীর ব্যবহার :  রূপা, তামা, অ্যালুমিনিয়াম তড়িতের সুপরিবাহী, এদের রোধ খুব কম। তড়িৎ পরিবহণকারী বৈদ্যুতিক তার তামা অথবা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি হয়। যে সব পদার্থের রোধ বেশি, তাদেররোধক (Resistor) বলে। নাইক্লোম, ম্যাঙ্গানিন, কনস্ট্যানট্যান প্রভৃতির রোধ বেশি। বৈদ্যুতিক তাপ-উৎপাদক যন্ত্র যেমন—বৈদ্যুতিক হিটার, বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি প্রভৃতিতে নাইক্লোম তারের কুণ্ডলী  বৈদ্যুতিক বাল্বে উলফ্লেমাইট (টাংস্টেন + আয়রন + ম্যাঙ্গানিজ), রিওস্ট্যটি যন্ত্রে কনস্ট্যানট্যান ব্যবহার করা হয়।

কারণ. : কোনো পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল এক রেখে দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করলে পরিবাহীর মধ্যে তড়িতের বাহক মুক্ত ইলেকট্রনগুলি আরও বেশি সংখ্যক ধাক্কার সম্মুখীন হয়, তাই রোধ বৃদ্ধি পায়। আবার দৈর্ঘ্য অপরিবর্তিত
অবস্থায় প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল বেশি হলে পরিবাহীর মধ্যে তড়িতের বাহক মুক্ত ইলেকট্রনগুলি চলাচলের জন্য বেশি জায়গা পায়, তাই কম সংখ্যক ধাক্কার সম্মুখীন হওয়ায় কমে রোধ হয়।

বর্তনী সমীকরণ: তড়িৎচালক বল এবং অভ্যন্তরীণ রোধবিশিষ্ট একটি তড়িৎকোশের মধ্যে একটি রোধ
যুক্ত করে একটি তড়িৎবর্তনী গঠিত হয়েছে।
এক্ষেত্রে E=1R+r)
:: I=E/R+r.....এই সমীকরণকে বর্তনী সমীকরণ বলে।

পরিবাহিতার সংজ্ঞা :যে পদার্থের রোধ খুব কম তার ভিতর দিয়ে তড়িৎ সহজে চলাচল করে। এই কারণে রোধের অন্যোন্যক গুণকে পরিবাহিতা বলে।
সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো তারের রোধ R [=V/I, V = তারের প্রান্তীয় বিভবপ্রভেন এবং I তারের  প্রবাহমাত্রা। সুতরাং ওই তারের পরিবাহিতা S = I/R=I/V আবার R=p.I/a অতএব ,  I/R=a/p.I ।

সংজ্ঞা : সাধারণত ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস যে-কোনো অবস্থায় নিজে থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভাজিত হয়ে অবিরাম বিভিন্ন রশ্মি বিকিরণ করে এবং সেই সঙ্গে নিজে নতুন মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। মৌলটির এই ধর্মকে তেজস্ক্রিয়তা বলে। ওইসব ভারী মৌলগুলিকে তেজস্ক্রিয় মৌল বলে।

কারন : যেসব মৌলের নিউক্লিয়াসের নিউটন এবং প্রোটন সংখ্যার অনুপাত। 5-এর চেয়ে বেশি সেই নিউক্লিয়াসগুলি অস্থায়ী হয়। এগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ করে স্থায়ী হতে চেষ্টা করে। যেসব মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা 82-এর বেশি অথবা পারমাণবিক গুরুত্ব 206-এর বেশি (লেড), সেগুলি তেজস্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে।

তেজস্ক্রিয়তার বৈশিষ্ট্যগুলি :

(i) তেজস্ক্রিয়তা একটি নিউক্লিয়া ঘটনা। এর সঙ্গে  পরমাণু মধ্যস্থ নিউক্লিয়াসের বাইরের ইলেকট্রনের কোনো সম্পর্ক নেই ।

(ii) বাহ্যিক চাপ, উন্নতা, রাসায়নিক বিক্রিয়া, তড়িৎ বা চৌম্বকক্ষেত্র, রাসায়নিক গঠন ইত্যাদি তেজস্ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে না।

(iii)  যেসব মৌলের পারমাণবিক গুরুত্ব 206-এর বেশি তারা তেজস্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে।।

(iv) তেজস্ক্রিয় বিকিরণে তিন ধরনের রশ্মি থাকে – আলফা, বিটা এবং গামা।

(v) তেজস্ক্রিয়তা হল একটি নিউক্লিয়াসের ভাঙন বা বিঘটন। এর ফলে একটি মৌল সম্পূর্ণ ভিন্ন  রাসায়নিক এবং ভৌত ধর্মবিশিষ্ট নতুন মৌলে পরিণত হয়।

 

(i) স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয় মৌল ও স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা  সংজ্ঞা : প্রকৃতিতে প্রাপ্ত কিছু ভারী মৌলের নিউক্লিয়াস স্বাভাবিকভাবেই তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিক্রিবস ম স্বাভাবিক করে, তাদের স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয় মৌল বলে এবং স্বাভাবিক মৌল কর্তৃক প্রদর্শিত তেজস্ক্রিয়তাকে স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা বলে। যেমন- ইউরেনিয়াম (U), পোলোনিয়াম (Po) ইত্যাদি।

(ii)ব্যাখা : কার্বোনের 12/6C আইসোটোপটি তেজস্ক্রিয় নয়, কিন্তু 14/6C আইসোটোপটি তেজস্ক্রিয়। আবার

235/92U ও 238/92U  ইউরেনিয়ামের এই আইসোটোপ দুটির তেজস্ক্রিয়তা একইরকম নয়, তাই বলা যায় তেজস্ক্রিয়তা কোনো নির্দিষ্ট মৌলের বৈশিষ্ট্য নয় বরং কোনো মৌলের নির্দিষ্ট আইসোটোপের বৈশিষ্ট্য।

B-কণার নির্গমণ : তেজস্ক্রিয় বিভাজনকালে পরমাণুর নিউক্লিয়াসস্থিত একটি নিউট্রন বিভাজিত হয়ে একটি প্রোটন, একটি ইলেকট্রন ও শক্তি নির্গত হয়। ওই উৎপন্ন ইলেকট্রনই নিউক্লিয়াস থেকে B-কণারূপে নির্গত হয়। I\àn - I/Ip+ 0le+y
কারণ:প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় মৌল ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে a,b Bকণা নির্গত করে অতেজস্ক্রিয় লেড (82Pb)-তে পরিণত হয়। অতেজস্ক্রিয় লেড থেকে a, B-কণা আর নির্গত হয় না। তাই তেজস্ক্রিয় ধাতুর খনিতে লেড ধাতু পাওয়া যায় ।

তেজস্ক্রিয়তা একটি নিউক্লিয় ঘটনা : একটি মৌলের রাসায়নিক ধর্ম উহার পরমাণুর মধ্যে থাকা ইলেকট্রনের উপর নির্ভর করে। রাসায়নিক পরিবর্তন, উন্নতা, চাপ, তড়িৎ এবং চৌম্বক ক্ষেত্র প্রভৃতি একটি তেজস্ক্রিয় মৌলো তেজস্ক্রিয়তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। পরমাণুর মধ্যে কক্ষস্থিত ইলেকট্রনের উপর তেজস্ক্রিয়তা নির্ভর করে না।

তেজস্ক্রিয়তার ফলে একটি মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন এবং নিউট্রিন  সংখ্যার পরিবর্তন হয়। এর ফলে নিউক্লিয়াসের শক্তির পরিবর্তন ঘটে। সুতরাং তেজস্ক্রিয়তা হল একটি নিউক্লিয় ঘটনা।

তেজস্ক্রিয় শ্রেণি :  কোনো তেজস্ক্রিয় পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে আলফা বা বিটা কণা নির্গত হলে যে নতুন মৌজার পরমাণু সৃষ্টি হয়, সেটিও যদি তেজস্ক্রিয় হয় তাহলে আবার বিঘটিত হয়ে মৌলের পরমাণু উৎপন্ন করে। এই রূপান্তর চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো অতেজস্ক্রিয় সুন্দির পরমাণু (যেমন, সিসার  একটি সুস্থিত আইসোটোপ  82Ph206) উৎপন্ন হয়। এই পরিবর্তনের  ক্রমকে  তেজস্ক্রিয় শ্রেণি বলে।

তেজস্ক্রিয় শ্রেণির সংখ্যা : প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় মৌলগুলির মধ্যে তিনটি তেজস্ক্রিয় শ্রেণি দেখা যায়,

(i) ইউরেনিয়ান শ্রেনি।

(ii) থোরিয়াম শ্রেণি এবং

(iii) অ্যাকটিনিয়াম শ্রেণি।

 

ফ্যাজান  ও সডির গ্রুপ সরণ সূত্র :

(i) কোনো তেজস্ক্রিয় মৌলের পরমাণু থেকে একটা a কণা নির্গত হলে নতুন উৎপন্ন মৌল পর্যায় সারণিতে অবস্থান হবে আদি মৌলের দু -ঘর বামদিকে। (ii) কোনো তেজস্ক্রিয় পরমাণু থেকে একটি b- কনা নির্গত হলে উৎপন্ন নতুন মৌলটির পর্যায় সারণিতে অবস্থান হবে  আদি মৌলটির এক ঘর ডানদিকে।

এই সূত্র থেকে জানা যায় :

(i) একটি তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে a কনা নির্গত হলে উৎপন্ন মৌল পর্যায় সারণিতে মৌলের দু-ঘর বামদিকে অবস্থান করে। (ii) একটি তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে b  কনা নির্গত হলে  উৎপন্ন মৌল পর্যায় সারণিতে আদি মৌলের একঘর ডানদিকে অবস্থান করে। (iii) একটি  তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে  1 টা a ও  2 টি b কনা নির্গত  হলে উৎপন্ন মৌল মূল মৌলের সাথে পর্যায় সারণিতে একই ঘরে অবস্থান করে। (iv) আইসোটোপের ধারণা জানা যায়।

কুরি : কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে প্রতি সেকেন্ডে 3.7×10 সাখ্যক পরমাণু বিভাজিত হলে এই তেজস্ক্রিয় মৌলটির তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণকে এক কুরি  বলে।

বেকারেল : কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে প্রতি সেকেন্ডে 1 টি পরমাণু বিভাজিত হলে ওই তেজস্ক্রিয় মৌলটিলা তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণকে 1 বেকারেল বলে। 1 বেকারেল হল তেজস্ক্রিয়তার SI একক ।