ষষ্ঠ অধ্যায় ➤ দূর্যোগ ও বিপর্যয়

প্রাকৃতিক ও মানবীয় কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী অথবা ক্ষণস্থায়ী যেসকল ঘটনাবলি মানবজীবনকে বিঘ্নিত করে জীবন ও ধনসম্পত্তির প্রভূত ক্ষতি করে এবং অপরের সাহায্য ছাড়া যা প্রতিরোধযোগ্য নয়, তা হল বিপর্যয়।

(প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্টি হওয়া যেসকল ঘটনাবলি মানবজীবনকে বিপর্যস্ত করে তাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে। যেমন—2004 সালে বার্মা পাতের নীচে ভারতীয় পাত প্রবেশ করায় তীব্র ভূমিকম্প ও সুনামি হয়।

যে দুর্যোগ সৃষ্টিতে প্রকৃতির সাথে সাথে মানুষের অবিবেচনামূলক ভূমিকা বর্তমান থাকে, তাদের আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ) যেমন—ধস, অধিক বৃষ্টিপাতের ফলেও যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কার্যকলাপের ফলেও ঘটে থাকে।

একটানা কয়েকদিন অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো কারণে নদীর জলস্তর বিপদসীমা ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ অববাহিকাকে জলমগ্ন করলে, তখন তাকে বন্যা বলে।

প্রাকৃতিকভাবে অল্পসময়ে প্রচুর বৃষ্টির ফলে হঠাৎ করে। বিশাল আয়তনের জলের প্রবাহ হল হড়পা বন্যা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় 2006 সালে ইথিওপিয়ায় এইধরনের বন্যায় 120 জনের মৃত্যু হয়।

নদীপথে নির্মিত অতিকায় বাঁধ থেকে অতিরিক্ত জল নিষ্কাশন অথবা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে নিম্ন অববাহিকায় সংঘটিত বন্যা হল বাঁধ-সংক্রান্ত বন্যা। যেমন—দামোদর অববাহিকায় নির্মিত বাঁধের (DVC বাঁধ ) ফলে এইধরনের বন্যা দেখা যায়।

উচ্চ কোনো এলাকায় দীর্ঘকাল বৃষ্টির অভাবে অথবা পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে যে শুষ্ক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তা হল খরা IMD মতানুসারে কোনো অঞ্চলে স্বাভাবিকের থেকে 75%-এর কম বৃষ্টি হলে খরার সৃষ্টি হয়।

দৈনিক, মাসিক অথবা বাৎসরিক ক্ষেত্রের বিচারে স্বাভাবিকের থেকে কম বৃষ্টি হলে যে খরা সৃষ্টি হয় তা হল জলবায়ুগত খরা ।

 

দীর্ঘকাল বৃষ্টির অভাবে জলের পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে কমে যাওয়ার ফলে এই খরার সৃষ্টি হয়।

বৃষ্টির অভাবে মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে শস্যের বৃদ্ধির জন্য জল না পাওয়া গেলে শস্যের বৃদ্ধি ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্থ হলে, তাকে বলে কৃষিগত খরা।

ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোয়মণ্ডলে উন্নতা বেশি হলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়, ফলে পার্শ্ববর্তী উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু ওই অঞ্চলে ছুটে এসে ঘূর্ণীয়মান অবস্থায় ক্রমান্বয়ে উন্ন ও ঊর্ধ্বমুখী হয়। এইধরনের কেন্দ্রমুখী ও উর্ধ্বগামী বায়ুকে ঘূর্ণিঝড় বলে।

ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রস্থল হল ঘূর্ণিঝড়ের চক্ষু। এই অংশের আবহাওয়া মেঘমুক্ত ও শান্ত থাকে।

মানুষ যখন দুর্যোগ বা বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করতে না পেরে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করে, তখন সেই অবস্থা হল বিপন্নতা। অনুন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রযুক্তির অভাব, সামাজিক সচেতনতার অভাবে বিপন্নতা সৃষ্টি হয়।

 

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশের মালভূমি অঞ্চলে (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিমাংশ) খরার প্রকোপ বেশি।

 

পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, বীরভূম, জলপাইগুড়ি, পূর্ব মেদিনীপুর, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনা প্রভৃতি জেলায় বন্যার প্রকোপ বেশি।

প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক কারণে ভূপৃষ্ঠের ঢাল বরাবর শিলাস্তূপ বা শিলাচূর্ণের আকস্মিক নিম্নগমন হল ভূমিধস। পার্বত্য ঢালে ভূমিধস বেশি ঘটে। যেমন – পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস বেশি দেখা যায়।

তুষারঝড় হল একধরনের প্রবল, অতিশীতল বায়ুপ্রবাহ যার মধ্যে তুষারকণা থাকে এবং এটি বরফাবৃত ভূভাগের ওপর অধিক ক্রিয়াশীল হয়। প্রধানত শীতপ্রধান দেশে তুষারঝড়ের প্রকোপ বেশি।

অ্যান্টার্কটিকা, উত্তর আমেরিকার উত্তরাংশ, কানাডা, | ইউরোপিও এশিয়ার উত্তরভাগ, অস্ট্রেলিয়ার নিউসাউথ ওয়েলস্, এ ছাড়া উচ্চ পার্বত্য অংশেও (বরফাবৃত) তুষারঝড় দেখা যায়।

প্রাকৃতিক ও মানবীয় বিভিন্ন কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থার পরিবর্তনই হল দুর্যোগ (hazard)।

ক্ষণ বা দীর্ঘস্থায়ী যেসকল ঘটনাবলি প্রাকৃতিক বা মানবীয় কারণে সৃষ্টি হয়ে, মানব জীবনকে বিপন্ন করে জীবন ও ধনসম্পত্তির প্রভূত ক্ষতিসাধন করে, তাকে বিপর্যয় (disaster) বলে। অর্থাৎ, বিপর্যয় হল দুর্যোগের পরিণতি।জনবসতিহীন পার্বত্য ঢালে ধস নামলে তা দুর্যোগ কিন্তু বসতিপূর্ণ অঞ্চলে ওই ধস যখন প্রাণ ও সম্পত্তিহানি ঘটায় তখন তা বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

দুর্যোগের বৈশিষ্ট্যগুলি হল- দুর্যোগ হল একটি আকস্মিক ঘটনা, পূর্বপরিকল্পিতভাবে দুর্যোগের আবির্ভাব হয় না। [2] এটি প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানের সম্মিলিত ক্রিয়াপদ্ধতি। 13) এটি ক্ষুদ্র পরিসরে ঘটে, এর বিস্তারও কম। [4] দুর্যোগ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করে, কিন্তু ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে না। এ দুর্যোগ হল বিপর্যয়ের কারণ, দুর্যোগের পথ ধরেই বিপর্যয় আসে। [6] এর ফলে প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের ক্ষতি হয়।

সাধারণত যেসব কারণে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল

[1] অবৈজ্ঞানিক কার্যকলাপ: মানুষের

অবৈজ্ঞানিক কার্যকলাপ অনেকসময় মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের সৃষ্টি করে। যেমন—পাহাড়ের ঢালে বাড়ি নির্মাণ, অথবা পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ করলে ভূমিধসের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
অশিক্ষা: অশিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তির পরিধিকে সীমিত করে দেয়। ফলে অজ্ঞানতা, কুসংস্কার মানুষের মনে বাসা বাঁধে এবং এদের থেকে সৃষ্টি হয় ধর্মীয় দালা। যা প্রচুর সম্পত্তি এবং জীবনহানি ঘটিয়ে দুর্যোগের সৃষ্টি করে যা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত করে যায়।

[3] জনসংখ্যার অতিরিক্ত বৃদ্ধি : জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক বৃদ্ধি ও অনেকসময় দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—কোনো অঞ্চলে জনসংখ্যার অতিরিক্ত বৃদ্ধি যেখানে খাদ্য সমস্যার সৃষ্টি করে যা পরবর্তীকালে দুর্যোগের আকার ধারণ করে, আবার অন্ন স্থানে অতিরিক্ত জনসংখ্যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করে যা ফলে বহু মানুষের মৃত্যুও হয়।

 

হড়গা বন্যাঃ নদীর উচ্চ অববাহিকায় যখন অল্প সময়ে অত্যন্ত তীব্র জলপ্রবাহ নদীঘাতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন। নদীর দু-পাড় জলমগ্ন হয়ে যায়, একে হড়পা বন্যা (flash flooding) বলে।

সৃষ্টির কারণ: [1] অগ্ন্যুৎপাতের সময় প্রচণ্ড উত্তাপে আগ্নেয় পর্বতের ওপর সজ্জিত তুষারের গলন হলে এই বন্যা সৃষ্টি হয়। [2] নদীর গতিপথে যদি কোনো কারণে ধস নামে তাহলে নদীপথ রুদ্ধ হয়ে যায় তখন বিপুল পরিমাণে জল বন্যার আকারেপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। [3] প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অথবা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে যে বৃষ্টিপাত হয় তার ফলেও হড়পা বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।মরু অঞ্চলের ক্ষণস্থায়ী নদীগুলিতে এই জাতীয় বন্যা হয়। এই জাতীয় বন্যাকে 'পাতের আকারে বন্যা' বলা হয়।

দাবানলের ফলাফলগুলি হল—017 বনভূমিতে আগুন লাগলে বনভূমির বাস্তুতন্ত্রের প্রভূত ক্ষতি হয়। [2] বনভূমির মধ্য যদি কোনো বনভূমি অবস্থান করে তাহলে অনেক সময় দাবানলে সেই গ্রাম ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। [3] দাবানলের ফলে বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2)-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা বায়ুদূষণ ঘটায়।) [4] দাবানল সন্নিহিত অঞ্চলে বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। [5] দাবানলের ছাই, স্থানীয় নদী ও পুকুরের জলে পড়ে জলের গুণমান হ্রাস করে।

সাধারণত দুটি কারণে খরার সৃষ্টি হয়, যথা—

[1] প্রাকৃতিক কারণ, ও [2] মনুষ্যসৃষ্ট কারণ। [1] প্রাকৃতিক কারণ: [a] দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে দেরিতে প্রবেশ করলে অথবা সময়ের আগে প্রত্যাবর্তন করলে, [b] গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে বাতাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণে খরার সৃষ্টি হয়।[2] মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: [a] অতিরিক্ত বৃক্ষচ্ছেদনের কারণে বাতাসে জলীয়বাষ্প হ্রাস পেলে, [b] অতিরিক্ত নগরায়ণ ইত্যাদি মনুষ্যসৃষ্ট কারণে খরার সৃষ্টি হয়।

ভূমিকম্পের প্রভাবগুলি হল— [1] মাঝারি থেকে ভারী ভূমিকম্পে বাড়িঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। [2] নদীপর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। [3] পাহাড়ের ঢালে ধস নামে। [4] রাস্তাঘাট, সেতু, রেললাইন প্রভৃতি ধ্বংস হয়, অনেকক্ষেত্রে বেঁকে যায়।[5] বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। [6] মাটির তলা থেকে জল, বালি, কাদা, ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে।

[1] দার্জিলিং হিমালয় অঞ্চল: এই পাহাড়ি এলাকায় মূলত ধস, বন্যার প্রকোপ বেশি। [2] সুন্দরবন অঞ্চল: পশ্চিমবঙ্গের একেবারে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রকোপ অধিক। [3] মালভূমি অঞ্চল: সমগ্র পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম জেলার পশ্চিমাংশ হল মালভূমি অঞ্চল। এই এলাকায় বৃষ্টিপাতের স্বপ্নতার জন্য খরার প্রকোপ বর্তমান। [4] সমভূমি অঞ্চল: পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সমগ্র অংশ সমভূমির অন্তর্গত। এই এলাকা গাঙ্গেয় সমভূমির অন্তর্গত হওয়ার বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বন্যারপ্রবণতা বেশি।

উৎপত্তির কারণ অনুসারে দুর্যোগ তিন প্রকার, যথা—

[1] প্রাকৃতিক দুর্যোগ: কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে যখন মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণে মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়, তখন তাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (natural hazards) বলে। যেমন—ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্তর্গত। এই ধরনের দুর্যোগে মানুষ অসহায়।

[2] আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ : প্রকৃতি এবং মানুষের যৌথ কার্যকলাপে যখন দুর্যোগ ঘটে তখন তাকে আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ (quasi natural hazards) বলে। বন্যা ও নদীর পাড় ভাঙন যখন প্রাকৃতিক উপায়ে না ঘটে যখন মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কার্যকলাপের ফলে সংঘটিত হয়, তখন সেটি আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ ও নগরায়ণ ভূমিধসের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যা আধাপ্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অংশবিশেষ ।

[3] মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ : কোনো রকম প্রাকৃতিক কারণ কেবলমাত্র মানুষের অবৈজ্ঞানিক, চিন্তাভাবনা, অসেতনতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ইত্যাদি কার্যকলাপের ফলে যে দুর্যোগ ঘটে তাকে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ বলে। জনসংখ্যার বৃদ্ধি, অশিক্ষা, দারিদ্রতা ইত্যাদি মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের অন্তর্ভুক্ত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ও সুষ্ঠ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে দাবানল ঘটে থাকে।
[1] প্রাকৃতিক কারণ : [a] ব্রজপাতের ফলে বনভূমির
শুকনো পাতা বা কাণ্ডে আগুনের ফুলকি সৃষ্টি হতে পারে।
[b] শুষ্ক ঋতুতে, পার্বত্য ঢালে পাথরের টুকরো গড়িয়ে
নামার সময় আগুনের ফুলকি সৃষ্টি হতে পারে।
[c] আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে বনাঞ্চলে দাবানল সৃষ্টি হতে পারে।
[2] মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: [a] 'ঝুমচাষ' (জাল পুড়িয়ে)
পদ্ধতিতে কৃষিকার্যের যখন জঙ্গল পুড়িয়ে কৃষিক্ষেত্রে
তৈরি করা হয় সেই সময় বনভূমিতে দাবানল সৃষ্টি হতে পারে। [b] পর্বতারোহী, শ্রমিকদের অস্থায়ী তাবু এবং রান্নার জন্য বা নিরাপত্তার জন্য জ্বালানো আগুন থেকেও বনভূমিতে আগুন লাগতে পারে। [c] অসতর্কভাবে বনভূমিতে জ্বলন্ত বিড়ি বা সিগারেটের টুকরো ফেললে তা দাবানল ঘটতে পারে।

অগ্নুৎপাতের ওপর মানবীয় প্রভাব সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল।
[1] জীবনহানি : অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ব্যাপক হারে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের জীবনহানি ঘটে। যেমন–1883 সালে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয় বিস্ফোরণে জাভার উপকূলে প্রায় 3600 মানুষের মৃত্যু হয়।
[3] ধনসম্পদের বিনাশ : অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বাড়িঘর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্প তথা কোনো এলাকার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে ব্যাপক ধনসম্পদের ক্ষতি করে।
[4] কৃষির ক্ষতি : অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকায় উত্তপ্ত ম্যাগমা ছড়িয়ে পড়লে সেই অঞ্চলের কৃষি ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উদাহরণ - ভারতের বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি মান্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ব্যারেন। এ ছাড়া নারকোনডাম মূল উল্লেখযোগ্য আগ্নেয়গিরি।

অগ্ন্যুৎপাতের কোনো নির্দিষ্ট সময় হয় না। তাই ম্যাগমার তিবিধি পর্যবেক্ষণের দ্বারা অগ্ন্যুৎগম সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া
গলে ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অনেকাংশে তা ক্রতির মান কমায়।

প্রকৃতির ওপর অগ্নুৎপাতের প্রভাবগুলি নিম্নরূপ —
[1] ভূমিরূপ গঠন: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ, যেমন—ক্যালডেরা, সিন্ডার শঙ্কু, ল্যাকোলিথ, ডাইক, সিল প্রভৃতি ভূমিরূপ গঠিত হয়।
[2] বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন: ব্যাপক হারে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সেই এলাকার বিভিন্ন জীবের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটে।
3] মৃত্তিকার গঠন পরিবর্তন: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে যে
ম্যাগমা প্রবাহের সৃষ্টি হয়, তার ফলে মৃত্তিকার গঠনের
পরিবর্তন ঘটে থাকে।
4] স্থানীয় পরিবেশের পরিবর্তন: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উত্থিত বিষাক্ত, দূষিত গ্যাস বাতাসে মেশে। যার ফলে অ্যাসিড বৃষ্টি সংঘটিত হয় এবং স্থানীয় পরিবেশের ব্যাপক হারে পরিবর্তন ঘটে।
5] ভূমিকম্প: অগ্ন্যুৎপাতের সময় ব্যাপক হারে ম্যাগমা নির্গমনকালে বিস্ফোরণ ঘটলে কখনো কখনো ভূত্বক আন্দোলিত হয়ে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
6] বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রার পরিবর্তন : অগ্ন্যুৎপাতের সময় ম্যাগমা
নির্গমনের ফলে পার্শ্ববর্তী এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।

পাত সঞ্চালন ছাড়া অগ্নুৎপাতের অন্যান্য কারণগুলি হল
[1] ভূত্বকের গঠন: ভূত্বকের গঠন সর্বত্র সমান নয়। কোথাও বেশি পুরু আবার কোথাও খুব কম পুরু। যার ফলে বিভিন্ন আলোড়নকালে যে চ্যুতি বা ফাটলের সৃষ্টি হয়, তার মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।
2] ভূ-অভ্যন্তরস্ত চাপ: ভূ-অভ্যন্তরে গভীরতা বৃদ্ধির
সাথে সাথে উন্নতা বৃদ্ধি পায়। যার ফলে পদার্থসমূহ
কঠিন অবস্থায় থাকতে পারে না। তরল অবস্থায়
পদার্থের আয়তন তথা চাপ বৃদ্ধি পায় এবং এই চাপের
অসাম্যতার দরুন অগ্ন্যুৎপাত হয়।
[3] ভূগর্ভের তেজস্ক্রিয় পদার্থ : ভূগর্ভে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয়
পদার্থ, যেমন—ইউরেনিয়াম, রেডিয়াম থাকে। এরা তাপ
বিকিরণ করে, ফলে ভূ-অভ্যন্তরে তাপের মাত্রা বৃদ্ধি
পেলে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।
[4] ভূগর্ভের গ্যাসীয় চাপ: ভূপৃষ্ঠের ফাটল বরাবর জল
ভূগর্ভে প্রবেশ করে অধিক উয়তায় বাষ্পে পরিণত হয়।
সেই বাষ্প বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য ঊর্ধ্বমুখী চাপ
দেয়। যার ফলে ভূত্বকে ফাটল ধরে এবং অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।
[5] প্লিউম প্রবাহ: ম্যাগমার ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহকে প্লিউম বলে।
যার ফলে ম্যাগমা ভূত্বকের কোনো অংশে চাপের সৃষ্টি।
করে এবং এই চাপের ফলেই ক্রমে সেই অংশে ফাটলের
সৃষ্টি হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।

ভূত্বক প্রধানত কতকগুলি ছোটোবড়ো পাতের সমন্বয়ে গঠিত। এই পাতগুলির সঞ্চরণের ফলে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে।
যেমন—
[1] অভিসারী পাত সীমানায় অগ্ন্যুৎপাত : অভিসারী পাত সীমানায় দুটি পাতের পরস্পরমুখী চলনের ফলে দুটি পাতের মধ্যে সংঘর্ষ হলে অগ্ন্যুৎপাত হয়। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলার সৃষ্টি হয়েছে।
[2] প্রতিসারী পাত সীমানায় অগ্ন্যুৎপাত : দুটি পাতের
বিপরীতমুখী চলনের ফলে দুটি পাতের মাঝখানে যে
ফাঁকের সৃষ্টি হয়, সেখানে ভূ-অভ্যন্তর থেকে ম্যাগমা
নির্গত হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। একে বিদার অগ্ন্যুৎপাত
বলে। এই ধরনের অগ্ন্যুৎপাতের ফলেই মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা সৃষ্টি হয়েছে।
[3] নিরপেক্ষ পাত সীমানায় অগ্ন্যুৎপাত : নিরপেক্ষ পাত সীমানায় অর্থাৎ দুটি পাতের পাশাপাশি সংঘর্ষবিরোধী চলনের অনেক সময় ফাটল বা চ্যুতি সৃষ্টি হয়। সেই চ্যুতি বরাবর অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।

রিজার্ডের উপস্থিতি অনেকসময় দুর্যোগ বা বিপর্যয়
ডেকে আনে। একটানা দীর্ঘসময় ধরে অতি শীতল বায়ুপ্রবাহের (তুষারকণা বহনকারী) ফলে বিভিন্নভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যেমন—
[1] শারীরিক অসুস্থতা: তীব্র শীতল বায়ুপ্রবাহের ফলে
মানুষের দৈহিক কষ্ট বৃদ্ধি পায়, উয়তা হ্রাস পাওয়ায়
শারীরিক অসুস্থতা দেখা যায়।
[2] পরিবহণ ব্যবস্থা: ভূপৃষ্ঠে বিস্তীর্ণ অংশে পুরু তুষারের স্তর জমা হয়, ফলে পরিবহণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।যেমন–1888 সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ও কানাডায় 1 থেকে 1.3 মিটার পুরু বরফের আস্তরণ। পড়েছিল, নিউ ইয়র্কে প্রায় 400 জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। 1972 সালে ইরানে রিজার্ড-এর প্রভাবে প্রায় 4000 মানুষ প্রাণ হারিয়ে ছিলেন।
[3] বন্যা : এই ঝড়ের পর সঞ্চিত পুরু বরফের আস্তরণ গলে গেলে জলপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। সেই জলপ্রবাহ থেকে বন্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা যায়।
[4] জনজীবন স্তব্ধ : দীর্ঘদিন ধরে পরিবহণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, পানীয় জল সরবরাহ প্রভৃতি অতি প্রয়োজনীয় পরিসেবাগুলি স্তব্ধ হয়ে পড়ায় জনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসে।

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, ব্লিজার্ড (blizzard) হল একধরনের প্রবল অতিশীতল বায়ুপ্রবাহ, যার মধ্যে তুষারকণা থাকে এবং বরফাবৃত ভূভাগের ওপর এটি অধিক ক্রিয়াশীল হয়। ব্লিজার্ড বা তীব্র তুষারঝড়ের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায়—
[1] বায়ুপ্রবাহের গতিবেগ: এই ঝড় চলাকালীন ঘণ্টায় 56 কিমি বেগে অতিশীতল বায়ু প্রবাহিত হয়।
[2] দৃশ্যমানতা : এই সময় 400 মিটারের বেশি দূরত্বের কিছুই দেখা যায় না।
[3] ঝড়ের স্থায়িত্ব: অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর স্থায়িত্ব কমপক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা হয়ে থাকে। অ্যান্টার্কটিকা, উত্তর আমেরিকার উত্তরাংশ, কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়ার উত্তরভাগ, অস্ট্রেলিয়ার নিউসাউথ-ওয়েলশ্, ভিক্টোরিয়া, তাসমানিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে, ব্লিজার্ড দেখা যায়। এ ছাড়াও বরফাবৃত উচ্চ পার্বত্য অংশে ব্লিজার্ড দেখা যায়।