ষষ্ঠ অধ্যায় ➤ বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন : বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রধান ধারাসমূহ

ভূমিকা: বাংলা ছিল ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের পীঠস্থান। ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির শক্তি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ অর্থাৎ বাংলা প্রদেশ দ্বিখণ্ডিত করলে এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা ছিল। যেমন—

[1] বয়কট : বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে বিলাতি সামগ্রী বর্জন ও বিদেশি সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু হয়। এই ধারা ‘বয়কট' আন্দোলন নামে পরিচিত।

[2] স্বদেশি : বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে বিলাতি পণ্য বর্জন করে তার পরিবর্তে স্বদেশি পণ্য ব্যবহার ও প্রসার, স্বদেশি শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ধারা স্বদেশি আন্দোলন নামে পরিচিত।

[3] জাতীয় শিক্ষা : আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ত্যাগ করতে শুরু করে।

[4] বিপ্লবী কার্যকলাপ : বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত-বিপ্লবী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়।

 

ভূমিকা: বিশ শতকে ভারতে কৃষক আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রধান কারণগুলি ছিল নিম্নরূপ-

[1] রাজস্ব বৃদ্ধি : দেশের দরিদ্র কৃষকদের ওপর সরকার বারবার রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করলে কৃষকরা ক্ষুব্ধ হয়।

[2] জমিদার ও তালুকদারদের শোষণ : সরকারের ঘনিষ্ঠ জমিদার ও তালুকদাররা কৃষকদের ওপর বিভিন্নভাবে শোষণ ও অত্যাচার চালায়।

[3] স্বাধীনতার স্বপ্ন: কৃষকরা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখেছিল। বিশ শতকে কৃষক আন্দোলনের সক্রিয়তা বিশ শতকে ভারতের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি জাতীয় আন্দোলন হল –[1] বঙ্গভঙ্গ- বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন (১৯০৫ খ্রি.), [2] অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০ খ্রি.), [3] আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০ খ্রি.), [4] ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২ খ্রি.)। এই চারটি আন্দোলনের সময় ভারতে কৃষক আন্দোলনও যথেষ্ট সক্রিয় বা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তা ছাড়া অহিংস অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের মধ্যবর্তী সময়েও বামপন্থীদের উদ্যোগে কৃষক আন্দোলন চলে।

কৃষক আন্দোলনের কারণ

স্বদেশি আন্দোলনে কৃষকশ্রেণির ভূমিকা

ভূমিকা: ব্রিটিশ শাসক লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলা প্রদেশ দ্বিখণ্ডিত করে ব্রিটিশ-বিরোধিতা দুর্বল করার চেষ্টা করেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া জাতীয় স্তরের আন্দোলনে কৃষকদের মিশ্র ভূমিকা লক্ষ করা যায়।

[1] কংগ্রেসের ভূমিকা :

কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের শামিল করার বা খাজনা প্রদান বন্ধে কৃষকদের উৎসাহিত করার বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি। অরবিন্দ ঘোষ আশঙ্কা করেন যে, কৃষকরা খাজনা বন্ধের আন্দোলন শুরু করলে দেশপ্রেমিক জমিদাররা ক্ষুব্ধ হবেন। এজন্য ড. সুমিত সরকার বলেছেন যে, 'সুনির্দিষ্ট কৃষিভিত্তিক কর্মসূচির অভাবে এই আন্দোলনে কৃষকদের যুক্ত করা যায়নি।

[2] বাংলায় কৃষক আন্দোলন : কংগ্রেস উদ্যোগ না নিলেও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে বাংলার কৃষকরা স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনে সীমিতভাবে শামিল হয়। বহু কৃষক পরিবারে বিলাতি পণ্য বর্জন করা হয়। কৃষক পরিবারের রান্নাঘরে বিলাতি চিনি, লবণ প্রভৃতির ব্যবহার বন্ধ হয়।

[3] মুসলিম কৃষকদের ভূমিকা : বাংলার হিন্দু কৃষকদের একাংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেও পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকরা আন্দোলনে যোগ না দিয়ে বরং বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল। কারণ তারা মনে করেছিল। যে, পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকদের কাছে বঙ্গভঙ্গ মঙ্গলজনক।

[4] দলিত কৃষকদের ভূমিকা : পূর্ববঙ্গের হিন্দু দলিত কৃষকশ্রেণি, বিশেষ করে নমঃশূদ্র কৃষকরা রাজেন্দ্রলাল মণ্ডলের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন

ভূমিকা: নানা পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ-বিরোধী অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

[1] কারণ : অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পিছনে প্রধান কারণগুলি ছিল—— i. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসন লাভে ব্যর্থতা,

  1. দেশজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, খাদ্যাভাব, iii. দমনমূলক রাওলাট আইন পাস, iv. জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, v. ব্রিটিশ শক্তি কর্তৃক তুরস্কের ব্যবচ্ছেদ ও তুরস্কের সুলতানের (খলিফা) ক্ষমতা হ্রাস প্রভৃতি।

[2] আন্দোলনের সূচনা : ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। গান্ধিজি ‘স্বরাজ' অর্জনকে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপরই সারা দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়।

[3] আন্দোলনের প্রসার : অসহযোগ আন্দোলনে ইতিবাচক অর্থাৎ গঠনমূলক এবং নেতিবাচক অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক উভয় ধরনের কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয়। একদিকে বিলিতি পণ্য, সরকারি স্কুলকলেজ, আদালত, আইনসভা প্রভৃতি বর্জন শুরু হয়, অন্যদিকে দেশীয় পণ্যের প্রসার, দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

[4] নেতৃত্ব : চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরু, বিঠলভাই প্যাটেল, বল্লভভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, সীতারামাইয়া প্রমুখ নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলেন।

[5] আন্দোলন প্রত্যাহার : ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি  উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামে

বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমি উত্তেজিত জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশকে হত্যা করলে আন্দোলন সহিংস পথে অগ্রসর হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে গান্ধিজি আন্দোলন প্রত্যাহার (২৫ ফেব্রুয়ারি) করেন।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন পর্বে ভারতের কৃষক আন্দোলন

ভূমিকা: দেশে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দমনমূলক রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড প্রভৃতির প্রতিবাদে গান্ধিজির নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। বহু কৃষক এই আন্দোলনে শামিল হয়।

[1] বাংলা : বাংলার মেদিনীপুর, পাবনা, কুমিল্লা, রাজশাহি, বগুড়া, রংপুর, বীরভূম, দিনাজপুর ও বাঁকুড়া জেলার কৃষকরা কংগ্রেসের অসহযোগ ও বয়কট আন্দোলনকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে। মেদিনীপুরে বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, রাজশাহিতে সোমেশ্বর চৌধুরী, বীরভূমে জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

[2] বিহার : বিহারের ভাগলপুর, মুজফরপুর, পূর্ণিয়া, মুঙ্গের, দ্বারভাঙ্গা, মধুবনী, সীতামারি জেলার কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দিয়ে জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

[3] যুক্তপ্রদেশ : i. কিষান সভার উদ্যোগ: যুক্তপ্রদেশে (উত্তরপ্রদেশ) বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কিষান সভা (১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে) অসহযোগ আন্দোলনের সময় রায়বেরিলি, প্রতাপগড়, সুলতানপুর প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষকরা আন্দোলনকে চরম রূপ দেয়।

  1. একা আন্দোলন: ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপ্রদেশের হরদৈ, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি জেলায় কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে শামিল হয় যা একা আন্দোলন নামে পরিচিত। চৌরিচৌরার ঘটনা: ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে (৫ ফেব্রুয়ারি) উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামে উত্তেজিত কৃষকরা থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশকে পুড়িয়ে মারে।

[4] অন্যান্য রাজ্যে: অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর জেলার কৃষকরা, পাঞ্জাবের আকালী শিখ ও জাঠ কৃষকরা, উড়িষ্যার কৃষকরা অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

[5] অসহযোগ আন্দোলনের পর : গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেও বিভিন্ন স্থানে কৃষক এটি আন্দোলন চলতে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বারদৌলি সত্যাগ্রহ। কংগ্রেস নেতা বল্লভভাই প্যাটেল। গুজরাটের দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এই আন্দোলন সংগঠিত করেন।

 

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন পর্বে বাংলায় কৃষক আন্দোলন:

ভূমিকা: গান্ধিজির নেতৃত্বে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বাংলায় এই আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলার বহু কৃষকও এই আন্দোলনে যোগদান করে।

[1] কংগ্রেসের আন্দোলন: কংগ্রেস নেতারা ‘স্বরাজ বা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলে বাংলার বহু কৃষক এই আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়।

[2] আন্দোলনের প্রসার অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহের প্রসার ঘটে। মেদিনীপুর, পাবনা, বগুড়া, বীরভূম, রাজশাহি, রংপুর, কুমিল্লা, দিনাজপুর, বাঁকুড়া প্রভৃতি জেলায় কৃষকরা কংগ্রেসের অসহযোগ বয়কট আন্দোলনকে সমর্থন জানায়।

[3] মেদিনীপুর : মেদিনীপুরে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের নেতৃত্বে দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, স্বচ্ছল প্রভৃতি সর্বস্তরের কৃষকর আন্দোলনে যোগ দিয়ে জমিদারদের খাজনা ও চৌকিদারি কর দেওয়া বন্ধ করে।

[4] বীরভূম : বীরভূম জেলার জিতেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কৃষকরা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে।

[5] পূর্ববঙ্গ : খিলাফত আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলার মুসলিম কৃষকরা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়। তারা জমিদার-জোতদারদের সামাজিক বয়কট শুরু করে। রাজশাহি জেলায় সোমেশ্বর চৌধুরীর নেতৃত্বে কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দিয়ে খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেয়।

 

একা আন্দোলন

ভূমিকা: মহাত্মা গান্ধির ডাকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২ খ্রি.) শুরু হলে উত্তরপ্রদেশে এই আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। এই রাজ্যের অযোধ্যা অঞ্চলে কৃষকদের নিয়ে একা আন্দোলন গড়ে ওঠে।

[1] 'একা' নামকরণ : ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে কৃষক আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারী কৃষকরা একতাবদ্ধ থাকার শপথ নেওয়ায় এই আন্দোলনের নাম হয় 'একা’ বা ‘একতা’

[3] কারণ : একা আন্দোলনের প্রধান কারণগুলি ছিল— i. কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ নতুন কর

আরোপ, ii. কর আদায়ে চরম অত্যাচার, iii. প্রভুর জমি ও খামারে কৃষককে বিনা বেতনে বেগার শ্রম দিতে আন্দোলন।

[2] নেতৃত্ব : একা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মাদারী পার্শী ও বাবা গরীবদাস। এই আন্দোলন

বাধ্যউত্তরপ্রদেশের উত্তর- পশ্চিম অযোধ্যা অঞ্চলের হরদৈ, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

করা প্রভৃতি।

[4] শপথ: আন্দোলনকারীরা শপথগ্রহণ করে যে, তারা i. অতিরিক্ত কর দেবে না, ii. বেগার শ্রম দেবে না, iii. অপরাধীদের সাহায্য করবে না, iv. জমি থেকে উৎখাত করলেও তারা জমি ছেড়ে যাবে না, তারা পঞ্চায়েতের যাবতীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেবে।

[5] কংগ্রেসের ভূমিকা : প্রথমদিকে কংগ্রেস একা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেও কিছুকাল পর এই আন্দোলনে হিংসার প্রবেশ ঘটলে কংগ্রেস ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে যায়।

[6] আন্দোলনের অবসান : তীব্র সরকারি দমননীতির ফলে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস নাগাদ এই আন্দোলন থেমে যায়।

বারদৌলির কৃষক সমাজ

ভূমিকা: ব্রিটিশ শাসনকালে গুজরাটের সুরটি জেলার বারদৌলি তালুক ছিল দরিদ্র কৃষক-অধ্যুষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।

[1] কালিপরাজ : বারদৌলির প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষই ছিল নিম্নবর্ণের কালিপরাজ সম্প্রদায়ভুক্ত। এই কৃষকরা চরম দারিদ্র্য, সীমাহীন শোষণ এবং উচ্চবর্ণের সামাজিক অবজ্ঞার শিকার হয়েছিল।

[2] দারিদ্র্য : বারদৌলি তালুকের বেশিরভাগ কৃষকই ছিল ভুমিহীন ক্ষেতমজুর। তারা হালি প্রথা অনুসারে উচ্চবর্ণের জমির মালিকদের অধীনে শ্রমিকের কাজ করত। কেউ কেউ অবশ্য ভাগচাষিও ছিল।

[[3] সচেতনতা : ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বারদৌলির গান্ধিবাদী নেতা কল্যাণজি মেহতা ও দয়ালজি দেশাই মদ্যপান, পণপ্রথা, অশিক্ষা, হালি প্রথা প্রভৃতির বিরুদ্ধে কৃষকদের সচেতন করে তোলেন।

[4] গঠনমূলক কর্মসূচি : অসহযোগ আন্দোলনের সময় বারদৌলি অঞ্চলে বিদ্যালয়, সত্যাগ্রহ শিবির প্রভৃতির প্রতিষ্ঠা হয়। পতিদার যুবক মণ্ডল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এখানে সমাজসংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

[4] বারদৌলি সত্যাগ্রহ : দারিদ্র্য, রাজস্ব বৃদ্ধি প্রভৃতির ফলে বারদৌলির কৃষকরা ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে যা বারদৌলি সত্যাগ্রহ নামে। পরিচিত। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বল্লভভাই প্যাটেল।

 

 

 

 

 

 

 

বিশ শতকে ভারতে কৃষক আন্দোলন
ভূমিকা: বিশ শতকে ভারতের কৃষক আন্দোলনে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ে। এই সময় ব্রিটিশ-বিরোধী বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে কৃষকশ্রেণি সক্রিয়ভাবে যোগদান করে।
[1] বৰ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় : কংগ্রেস নেতাদের উদ্যোগের অভাবে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের সময় কৃষকশ্রেণি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেনি। ড. সুমিত সরকার বলেছেন যে, ‘সুনির্দিষ্ট কৃষিভিত্তিক কর্মসূচির অভাবে এই আন্দোলনে কৃষকদের যুক্ত করা যায়নি। তা ছাড়া পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকরা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল।
[2] অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় : অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের (১৯২০-২২ খ্রি.) সময় গান্ধিজির ডাকে সারা দেশের বহু কৃষক এই আন্দোলনে শামিল হয়।
i. বাংলা: বাংলার মেদিনীপুর, পাবনা, কুমিল্লা, রাজশাহি, বগুড়া, রংপুর, বীরভূম, দিনাজপুর, বাঁকুড়া প্রভৃতি জেলার বহু কৃষক আন্দোলনে অংশ নেয়। ii. বিহার: বিহারে ভাগলপুর, মুজফফরপুর, পূর্ণিয়া, মুঙ্গের, দ্বারভাঙ্গা, মধুবনী, সীতামারি প্রভৃতি জেলার কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দিয়ে জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়ে। iii. যুক্তপ্রদেশ: যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশে) বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ রাজ্যের হরদৈ, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি জেলার কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে শামিল হয় যা একা আন্দোলন নামে পরিচিত। iv. অন্যান্য প্রদেশ: অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর জেলার কৃষকরা, পাঞ্জাবের আকালী শিখ ও জাঠ কৃষকরা, উড়িষ্যার কিছু কিছু অঞ্চলের কৃষকরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। অসহযোগ আন্দোলনের বল্লভভাই প্যাটেল পরবর্তীকালে কংগ্রেস গুজরাটের দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে বারদৌলি সত্যাগ্রহ (১৯২৮ খ্রি.) করেন।
[3] আইন অমান্য আন্দোলনের সময় : আইন অমান্য আন্দোলনেও (১৯৩০-৩৪ খ্রিস্টাব্দে) বিভিন্ন প্রদেশের কৃষকশ্রেণি সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ii. উত্তরপ্রদেশ: রায়বেরিলি, আগ্রা, বারাবাঁকি, লক্ষ্ণৌ, প্রতাপগড়-সহ উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানের কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে এখানে আইন অমান্য আন্দোলন প্রকৃত গণ আন্দোলনে পরিণত হয়। ii. বিহার: স্বামী সহজানন্দ, যদুনন্দন শর্মা প্রমুখের নেতৃত্বে গঠিত কিষান সভা বিহারে কৃষকদের আন্দোলনে শামিল করে। iii. বাংলা: বাংলার কাঁথি, মহিষাদল, আরামবাগ, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট প্রভৃতি স্থানে কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দেয়। iv. গুজরটি: গুজরাটের সুরাট, বারদৌলি, খেদা প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকরা সত্যাগ্রহ আন্দোলন চালিয়ে যায়। v. অন্যান্য প্রদেশে: কেরালার কেলাপ্পান এবং অস্ত্রে বাল রামকৃয় কৃষকদের খাজনা বন্ধে উৎসাহিত করেন। মধ্যপ্রদেশ, কর্ণটিক, পাঞ্জাবেও সেচকর ও রাজস্ব কমানোর দাবিতে কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দেয়।
[4] ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় : ভারত ছাড়ো আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে উঠলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকরাও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। বিহার: বিহারের মুঙ্গের, ভাগলপুর, মুজফফরপুর, পূর্ণিয়া, সাঁওতাল পরগনা প্রভৃতি অঞ্চলের আদিবাসী কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দেয়। বিহারের ৮০ শতাংশ থানাই আন্দোলনকারীদের দখলে চলে যায়। ii. বাংলা: বাংলার মেদিনীপুরের তমলুক মহকুমা, পটাশপুর থানা, খেজুরী থানা, দিনাজপুরের বালুরঘাট প্রভৃতি এলাকায় আন্দোলনরত কৃষকরা জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে। iii. গুজরাট: গুজরাটের সুরাট, খান্দেশ, ব্রোচ প্রভৃতি জেলায় কৃষকরা গেরিলা আক্রমণ চালায়। iv. উড়িষ্যা: উড়িষ্যার তালচেরে আন্দোলনকারী কৃষকরা চাষি মল্লা-রাজ প্রতিষ্ঠা করে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে।
উপসংহার: বিশ শতকে কৃষক আন্দোলন যথেষ্ট সক্রিয় হলেও ভারতের সর্বত্র কৃষকদের এই আন্দোলনে শামিল করা যায়নি। কোনো কোনো কংগ্রেস নেতা কৃষকদের খাজনা বন্ধের আন্দোলনে শামিল করে জমিদারদের ক্ষিপ্ত করতে চাননি। কেন- না, জমিদাররা কংগ্রেসের সক্রিয় সমর্থক ছিল। বহু ক্ষেত্রে মুসলিম কৃষকরা কংগ্রেস পরিচালিত আন্দোলন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।

বিশ শতকে ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রগতি

ভূমিকা: বিশ শতকে ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়[2] অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় এসময় ভারতে অন্তত ৪৫০টি শ্রমিক ধর্মঘট হয়। মাদ্রাজ শ্রমিক ধর্মঘটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, রেলওয়ে, ট্রাম, বন্দর, পাটকল, জামশেদপুরে টাটা ইস্পাত কারখানা, রা আন্দোলন শুরু হলে ভারতের শ্রমিকশ্রেণি তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
[1] বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় : বঙ্গভঙ্গ- বিরোধী স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের সময় বাংলা সহ বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিক আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারী শ্রমিকরা প্রতিবাদ মিছিল-মিটিং-এ অংশ নেয়, বিলাতি পণ্য বর্জন করে এবং ধর্মঘটে শামিল হয়। i. মুচিরা বিদেশি জুতো সারাতে, রাঁধুনিরা রান্নায় বিদেশি দ্রব্য ব্যবহার করতে, ধোপারা বিলাতি কাপড় কাচতে অস্বীকার করে। ii. কলকাতার বিভিন্ন কলকারখানা, ছাপাখানা, চটকল, রেলওয়ে, ট্রাম কোম্পানি, হাওড়ায় বার্ন • স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানি, বরিশালে সেটেলমেন্ট, জামালপুরে রেল ওয়ার্কশপ, বাউড়িয়ায় জুটমিল, তুতিকোরিনে বস্ত্র কারখানা, বোম্বাই ও রাওয়ালপিন্ডিতে অস্ত্র কারখানা ও রেলওয়ে ওয়ার্কশপ প্রভৃতিতে শ্রমিক ধর্মঘট হয়।
নিগঞ্জের কয়লাখনি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক শ্রমিক ধর্মঘট হয়। বোম্বাই, কানপুর, শোলাপুর, জামালপুর প্রভৃতি শহরেও ব্যাপক শ্রমিক ধর্মঘট হয়।
[3] আইন অমান্য আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনের সময় শ্রমিক আন্দোলন অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। মহারাষ্ট্র, বাংলা, আসাম, মাদ্রাজ সহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিক ধর্মঘট হয়।।. মহারাষ্ট্রের শোলাপুর, নাগপুর ও বোম্বাইয়ে ব্যাপক শ্রমিক ধর্মঘট হয়। বোম্বাইয়ে রেল শ্রমিকরা রেললাইনে অবরোধ করে।

ii. বাংলায় কলকাতার সত্যাগ্রহ আন্দোলন চালায়। বিভিন্ন চটকল, পরিবহণ ও শিল্পকারখানা, কুলটির লৌহ-ইস্পাত কারখানা, রানিগঞ্জের কয়লাখনি প্রভৃতির শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। iii. করাচি বন্দর, হীরাপুরে লৌহ- ইস্পাত কারখানা, আসামের ডিগবয় তৈলশোধনাগার, মাদ্রাজের শিল্পকারখানার শ্রমিকরাও এই ধর্মঘটে শামিল হয়।
[4] ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় : কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণিকে কংগ্রেস পরিচালিত ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। তা সত্ত্বেও শ্রমিকশ্রেণির একটি বড়ো অংশ এই সময় নানা আন্দোলনে শামিল হয় এবং বিভিন্ন কলকারখানায় ধর্মঘট করে। জামশেদপুরে টাটা ইস্পাত কারখানা শ্রমিক ধর্মঘটে ১৩ দিন বন্ধ থাকে। আমেদাবাদের বস্ত্র-শ্রমিকরা ৩ মাসেরও বেশি সময় ধর্মঘট চালিয়ে যায়। দিল্লি, বোপরিচালিত বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণি অংশগ্রহণ করলেও কংগ্রেস দলের তুলনায় কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিকশ্রেণির ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এজন্য কমিউনিস্টদের দমনের উদ্দেশ্যে সরকার বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতাকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে দেয় এবং কমিউনিস্ট ম্বাই, লক্ষ্ণৌ, কানপুর, নাগপুর, মাদ্রাজ, ব্যাঙ্গালোর প্রভৃতি স্থানের শ্রমিকরা সপ্তাহব্যাপী ধর্মঘট ও হরতাল পালন করে।

উপসংহার: কংগ্রেসের পরিচালিত বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণি অংশগ্রহণ করলেও কংগ্রেস দলের তুলনায় কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিকশ্রেণির ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এজন্য কমিউনিস্টদের দমনের উদ্দেশ্যে সরকার বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতাকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে দেয় এবং কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা (১৯৩৪ খ্রি.) করে।

বামপন্থী রাজনীতি ও আন্দোলনের চরিত্র
ভূমিকা: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় মার্কসবাদী বলশেভিক বিপ্লব সম্পন্ন হলে ভারতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশ শতকে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রাধান্য সত্ত্বেও বামপন্থী ভাবধারা, রাজনীতি ও আন্দোলনের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। এদেশে বামপন্থী রাজনীতি ও আন্দোলনের চরিত্র কংগ্রেসি রাজনীতি ও আন্দোলন থেকে অনেক ক্ষেত্রেই পৃথক ছিল।
[1] প্রতিকূলতা : ভারতে বামপন্থী রাজনীতি আন্দোলনের প্রসারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিকূলতা ছিল। একদিকে কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রতিরোধে সরকার যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। অন্যদিকে সমাজের উচ্চস্তরে কংগ্রেসের প্রাধান্য থাকায় সেখানে বামপন্থী ভাবধারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়। এজন্য মানবেন্দ্রনাথ রায়কে ভারতের বাইরে, রাশিয়ার তাসখন্দে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি'র প্রতিষ্ঠা (১৭ অক্টোবর, ১৯২০ খ্রি.) করেন। মুজাফফর আহমেদও বাংলায় গোপনে কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রচার চালান।
[ 2] দমননীতি : সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করে, বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতাকে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা প্রভৃতিতে ফাঁসিয়ে বামপন্থী ভাবধারা ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়।
[3] কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থা: কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া বিভিন্ন কংগ্রেস নেতার নেতৃত্বে কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও বামপন্থী ভাবধারার প্রসার ঘটে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা লাভের পর ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। জয়প্রকাশ নারায়ণ, অচ্যুত পট্টবর্ধন, ইউসুফ মেহের নিআলি, অশোক মেহতা, মিনু মাসানী প্রমুখ কংগ্রেস নেতা ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল' গঠন করেন। জয়প্রকাশ নারায়ণ ছিলেন কারা এই দলের সম্পাদক।
[4] লক্ষ্য : ভারতের বামপন্থী রাজনীতি ও আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কৃষক ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি ঘটানো। তবে ঔপনিবেশিক শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনই ছিল বামপন্থীদের প্রধান উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। মাদ্রাজের কমিউনিস্ট নেতা সিঙ্গারাভেল্লু চেট্টিয়ার ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে গয়া কংগ্রেসে ঘোষণা করেন আমার যে, “আমি একজন কমিউনিস্ট। আমরা এখনই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই, পরে সমাজতন্ত্র।”
[5] গণভিত্তি : ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি-সহ বিভিন্ন বামপন্থী দলগুলি দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। দেশের কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণিকে জাতীয় আন্দোলনগুলিতে শামিল করার ক্ষেত্রে বামপন্থী দলগুলির সর্বাধিক ভূমিকা ছিল। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলি ছাড়াও বামপন্থীদের উদ্যোগে কৃষক ও শ্রমিকরা বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়ে বামপন্থী রাজনীতির গণভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে।
উপসংহার: কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকারকে সহযোগিতা প্রদানের নীতি গ্রহণ করে, কংগ্রেসের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং দেশভাগের ক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় স্বার্থের বিরোধী নীতি গ্রহণ করে।

ৰামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের প্রসারে মানবেন্দ্রনাথ রায়। 8
ভূমিকা: বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে ভারতে বামপন্থী ভাবধারা জনপ্রিয় হতে থাকে। এই সময় ভারতে বামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের প্রসারের ক্ষেত্রে সর্বাধিক অগ্রগণ্য হলেন মানবেন্দ্রনাথ রায় (১৮৮৭-১৯৫৪ খ্রি.) বা এম এন রায় (আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য)।
[1] বৈপ্লবিক কাজ : নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মি. মার্টিন, মানবেন্দ্রনাথ রায়, হরি সিং, ড. মাহমুদ, মি. হোয়াইট, মি. ব্যানার্জি প্রভৃতি ছদ্মনাম ব্যবহার করে বৈপ্লবিক কাজকর্ম চালান। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিনি 'হাওড়া- শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলা'য় (১৯১০ খ্রি.) অভিযুক্ত হয়ে ও বছর কারাবাসে কাটান। মুক্তিলাভের পর তিনি ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে গিয়ে বার্লিনে 'ভারতীয় বিপ্লবী কমিটি’ গঠন করেন।
[2] কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা : মানবেন্দ্রনাথ লেনিনের আমন্ত্রণে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় যান এবং মস্কোয় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগ দেন। এরপর তিনি অবনী মুখার্জি, মহম্মদ আলি, মহম্মদ সাফিক প্রমুখের সহযোগিতায় রাশিয়ার তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (১৭ অক্টোবর, ১৯২০ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন।
[3] পত্রিকা : মানবেন্দ্রনাথ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন থেকে ‘ভ্যানগার্ড অব ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স' নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করে তা ডাকযোগে ভারতের নানা অঞ্চলে পাঠাতে থাকেন। পত্রিকাটির নাম কয়েকবার পরিবর্তন করলেও ব্রিটিশ সরকার বারবার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করে। ত
[4] ভাবধারা প্রচার : মানবেন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতা ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রচারের কাজে নেমে পড়েন। তাঁর প্রেরণায় মুজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে কলকাতায় এবং এস এ ডাঙ্গের নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতে কমিউনিস্ট আদর্শ প্রচারিত হয়।
[5] কংগ্রেসে যোগদান: মানবেন্দ্রনাথ ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ফিরে এলে সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। তিনি ৬ বছর কারাবাসের পর মুক্তিলাভ করেন। মুক্তিলাভের পর কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার প্রসার ঘটানোর উদ্দেশ্যে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং কংগ্রেসের অভ্যন্তরে লিগ অব র‍্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন (১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসুকে সভাপতি পদে সমর্থন জানান।
[6] র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি গঠন কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারা প্রসারের বিশেষ সম্ভাবনা ना থাকায় মানবেন্দ্রনাথ কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে (১৯৪০ খ্রি.) 'র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ গঠন করেন।
উপসংহার: মানবেন্দ্রনাথ রায় আমৃত্যু বামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের প্রসারে নিরলস লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন’, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও পতন', 'ইসলামের ঐতিহাসিক ভুমিকা', ‘বিজ্ঞান ও কুসংস্কার’, ‘নব মানবতাবাদ: একটি ইস্তেহার’ প্রভৃতি। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দেরাদুনে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মৃত্যু হয়। 'অমৃতবাজার পত্রিকা' তাঁকে ‘সারা বিশ্বে বিচরণকারী নিঃসঙ্গ সিংহ' বলে অভিহিত করেছে।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার অগ্রগতি
কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতে বামপন্থী ভাবধারা ও আন্দোলনের দ্রুত প্রসার ঘটতে শুরু করলে ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
[1] কংগ্রেসে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ: সরকার ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ
ঘোষণা করে। এর ফলে কমিউনিস্ট নেতারা জাতীয় কংগ্রেস ও কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বামপন্থার কাজ চালিয়ে যান। এভাবে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারা ক্রমে প্রবল হতে শুরু করে।
[2] কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের প্রতিষ্ঠা : আচার্য নরেন্দ্র দেব ও জয়প্রকাশ নারায়ণের উদ্যোগে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি বা কংগ্রেস দল-এর মপ্রকাশ নারায়ণ ছিলেন এই দলের সাধারণ সম্পাদক। এই দলের অন্যান্য নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাম মনোহর লোহিয়া, অচ্যুত পট্টবর্ধন, ইউসুফ মেহের আলি প্রমুখ। জয়প্রকাশ নারায়ণ
[3] সমাজতন্ত্রী দলের উদ্যোগ : কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার প্রসার ঘটাতে যথেষ্ট উদ্যোগী হয়। এই দলের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষক ও শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ করে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী করা, ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন, বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় রাজতন্ত্র ও জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি প্রভৃতি। এই দলের প্রভাবে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস কৃষিসংস্কার, ভূমিসংস্কার, শিল্প-বিরোধ সমস্যা প্রভৃতি বিষয়ে নজর দিতে বাধ্য হয়।
[4] কিয়ান কংগ্রেস কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ, কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল ও কমিউনিস্টরা ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে সারা ভারত কিষাণ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। এন জি রঙ্গ এর সভাপতি এবং স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই পাটি জমিদার ও বেগার প্রথার উচ্ছেদ, কৃষিঋণ মকুব, খাজনা হ্রাস প্রভৃতি দাবি জানায়। এই দলের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
[5] তরুণ নেতৃত্ব : তরুণ কংগ্রেস নেতা সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরু মনে করতেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে এদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের অবসান ঘটানো দরকার। এর জন্য তাঁরা ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর এদেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। সুভাষচন্দ্র বসু মনে করতেন যে, এদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন হল ভারতীয়দের দারিদ্র্যের মূল কারণ। এই শাসনের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে তিনি প্রয়োজনে সশস্ত্র বিপ্লবকেও সমর্থন করেন। তিনি ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন।

উপসংহার: কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী ভাবধারার প্রসার কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতাদের বিশেষভাবে খুশি করতে পারেনি। বামপন্থীদের সহায়তায় বামপন্থী ভাবধারার অনুগামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলে গান্ধিজি খুশি হতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে নেহরু গান্ধিজির প্রতি আনুগত্য জানালেও গান্ধি-সুভাষ বিরোধের কারণে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হন। ফলে ফরওয়ার্ড ব্লক ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে একটি পৃথক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।