ষষ্ঠ অধ্যায় ➤ ভারতের অর্থনৈতিক পরিবেশ

আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বৃহদায়তন খামারে যখন কোনো বাণিজ্যিক ফসল চাষ করা হয়, তখন সেই ফসল উৎপাদন পদ্ধতিকে বাগিচা কৃষি এবং উৎপাদিত ফসলটিকে বাগিচা ফসল বলে। উদাহরণ—ভারতে চা, কফি, মশলা ও রবার চাষ। বাগিচা কৃষির মাধ্যমে এগুলি উৎপাদিত হয় বলে চা, কফি, মশলা ও রবার বাগিচা ফসল নামে পরিচিত।

প্রধানত বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের জন্য কৃষকেরা যেসব ফসল চাষ বা উৎপাদন করে, সেইসব ফসলকে অর্থকরী ফসল বলে। উদাহরণ— ভারতে আখি, পাট, তুলো প্রভৃতি অর্থকরী ফসল।

উত্তর ভারতে বেশি গম চাষের কারণগুলি হল—

[1] উত্তর ভারতের পাঞ্জাব সমভূমি, উচ্চ-গঙ্গা সমভূমি ও মধ্য গঙ্গা সমভূমি অঞ্চলে শীতকালীন উষ্ণতা 14-20°সে থাকে, যা গম চাষের পক্ষে আদর্শ।

[2] উত্তর ভারতের গম চাষের এলাকাগুলিতে শীতকালে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে যে বৃষ্টিপাত হয় তা গম চাষের পক্ষে উপকারী। এখানে জলসেচ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটায় চাষের প্রয়োজনীয় জল জলসেচের মাধ্যমেও মেটানো যায়।

[3] উর্বর ভারী দোআঁশ ও কাদামাটি দিয়ে গঠিত পলল মৃত্তিকা উত্তর ভারতে গম চাষের পক্ষে অনুকূল।

[4] উত্তর ভারতের সমতল ভূপ্রকৃতিও গম চাষে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

[5] বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশ থেকে আগত কৃষি শ্রমিকরা পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে গম চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণ কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং তামিলনাড়ু ও কেরলের পার্বত্য অঞ্চলে কফি উৎপাদনের পরিমাণ খুব বেশি হওয়ার কারণগুলি হল –

[1] এই অঞ্চলের আবহাওয়া সারাবছরই উয় ও আর্দ্র থাকে। উন্নতা গড়ে 20-30 °সে ও বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাত 150-250 সেমি পর্যন্ত হয়, যা কফি চাষের পক্ষে আদর্শ।

[2] এই অঞ্চলে কফি চাষের পক্ষে উপযুক্ত লাভাজাত উর্বর দোআঁশ মাটি দেখা যায়।

[3] এই অঞ্চলে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি থাকায় ঢালু পাহাড়ি ঢালে প্রায় 800-1600 মিটার উচ্চতা পর্যন্ত কফির বাগিচাগুলি গড়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢালে বৃষ্টির জল জমতে পারে না বলে কফির চাষ খুব ভালো হয়।

স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভারতে কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে ছয়-এর দশকের শেষের দিক থেকে কৃষিকাজে অত্যন্ত আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়। এই সময় উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দ্রব্যের প্রয়োগ, ট্র্যাক্টর, হারভেস্টর প্রভৃতি আধুনিক কৃষি-যন্ত্রের ব্যবহার, জলসেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ প্রভৃতি বৃদ্ধি পায়। এইসব ব্যবস্থা অবলম্বন করায় 1968 সাল থেকে 1978 সালের মধ্যে ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে, বিশেষত পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় গম উৎপাদনে এবং তামিলনাড়ু রাজ্যে ধান উৎপাদনে যে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে তাকেই সবুজ বিপ্লব আখ্যা দেওয়া হয়। যেমন – 1960-61 সালে সমগ্র ভারতে যেখানে গমের উৎপাদন হয়েছিল 1 কোটি 10 লক্ষ টন, 1980-81 সালে তা তিনগুণেরও বেশি বেড়ে হয় 3 কোটি 63 লক্ষ টন।

◉ ভারতের কৃষির সমস্যা: ভারতের কৃষির অনেকগুলি সমস্যা আছে এবং এর সমাধানকল্পে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

➀ হেক্টর প্রতি ফসল উৎপাদন কম: ভারতে কৃষিতে হেক্টর প্রতি শস্যের উৎপাদন কম। সীমিত জলসেচ, উচ্চ ফলনশীল বীজের অভাব, কৃষি যন্ত্রপাতির সীমিত ব্যবহার, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণার অভাব এর কারণ।

সমাধান: স্বাধীনতা লাভের পর বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকার কৃষি উন্নয়নের অনেকগুলি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এতে হেক্টর প্রতি উৎপাদন খানিকটা বেড়েছে।

➁ মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ কম: ভারতে মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ মাত্র 0.3 হেক্টর, কিন্তু উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় 11 হেক্টর। ছোটো ছোটো কৃষিজমিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির প্রয়োগ অসুবিধাজনক। ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়।

সমাধান: এইসব ছোটো খণ্ড খণ্ড জমিকে একত্রিত করে। সমবায় কৃষিপদ্ধতি প্রয়োগ করে কৃষিকাজ করলে উৎপাদন বাড়ে।

➂ ভূমিক্ষয়: অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশুচারণ, অনিয়ন্ত্রিত ভাবে গাছ কাটার জন্য প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ উর্বর মাটি কৃষি জমি থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপসারিত হচ্ছে। এতে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে, কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

সমাধান: সমোন্নতি রেখা বরাবর চাষ, ধাপ চাষ, গালি চাষ, ফালি চাষ ও অন্যান্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষ করলে ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করার জন্য শস্যাবর্তন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ, কৃষিক্ষেত্রে জৈব সার ও ভার্মি কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় মৃত্তিকা সংরক্ষণ বোর্ড ভূমিক্ষয় রোধ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

➃ কৃষি শিক্ষার অভাব ও দারিদ্র্য: কৃষকদের কৃষি শিক্ষার অভাব, কুসংস্কার প্রভৃতি কারণে অধিকাংশ কৃষক অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে। কৃষিজমির প্রকৃতি, প্রয়োজনীয়তা বিচার না করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করায় মাটি দুষিত হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও অধিকাংশ কৃষক অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয় না ফলে কৃষি উৎপাদন কম হয়।

সমাধান: কৃষি শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, সমবায় প্রথায় চাষ, কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি ব্যবস্থার মাধ্যমে এইসব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা চলছে।

➄ ত্রুটিপূর্ণ জমি বিলি ব্যবস্থা: ভারতে জমি বিলি ব্যবস্থায় ত্রুটির জন্য বহু ক্ষুদ্র এবং দরিদ্র চাষির উদ্ভব ঘটেছে।

সমাধান: সরকার আই করে ভূমি সংস্কার নীতি প্রণয়ন করেছে। এর মাধ্যমে ভূমিহীন, বর্গাদার কৃষকদের মধ্যে জমির বিলি বণ্টনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

➅ মহাজন শ্রেণিনির্ভর বিনিয়োগ: ভারতীয় কৃষকরা বেশিরভাগই দরিদ্র। তাই মহাজনদের থেকে ঋণ নিয়ে কৃষিকাজ করে। এতে কৃষকেরা ঋণে জর্জরিত থাকে ফলে ঋণ শোধের জন্য অল্প দামে ফসল বিক্রি করে দেয়।

সমাধান: সরকার বিভিন্ন কৃষি ব্যাংক এবং অন্যান্য ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া, সরকার ন্যায্য মূল্যে ফসল কেনার ব্যবস্থাও করেছে।

ধান উৎপাদনের উপযোগী ভৌগোলিক অবস্থা: ভারতের প্রধান কৃষিজ ফসল ধান। ধান উৎপাদনের জন্য নিম্নলিখিত ভৌগোলিক অবস্থার প্রয়োজন—

❶ প্রাকৃতিক পরিবেশ—

[i] জলবায়ু : ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর উয়-আর্দ্র পরিবেশে ধানের চাষ হয়।

➀ উষ্ণতা : ধান চাষের জন্য গড়ে 20-30 °সে উষ্ণতা প্রয়োজন।

➁ বৃষ্টিপাত : ধান চাষের জন্য বার্ষিক 100 থেকে 200 সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত বাঞ্ছনীয়। ধানের চারা বড়ো হওয়ার সময় প্রতি মাসে 12.5 সেন্টিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি হলে ধানের ফলন ভালো হয়। ধান পাকা ও কাটার সময় শুষ্ক ও রোদ-ঝলমলে আবহাওয়া প্রয়োজনীয়।

[ii] মৃত্তিকা : উর্বর দোআঁশ মাটি এবং নদী- উপত্যকার পলিমাটি ধান চাষের পক্ষে আদর্শ। পলিমাটির নীচে অপ্রবেশ্য কাদামাটির স্তর থাকলে জমিতে জল জমে থাকে, যা ধান চাষের পক্ষে সহায়ক হয়।

[iii] ভূমির প্রকৃতি : জমিতে জল জমে থাকলে ধান সবচেয়ে ভালো জন্মায়। তাই নদী উপত্যকা ও বদ্বীপের সমতলভূমি ধানচাষে বিশেষ উপযোগী।

[iv] ভূমির উচ্চতা : সাধারণত সমুদ্র সমতলে বা, সমুদ্র সমতলের সামান্য উঁচুতেই ধানের চাষ হয়। তবে, কেরলের আলাপুঝা জেলাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার চেয়ে নীচুতেও ধানের চাষ হয়। আবার, দেরাদুন (435 মি), কাশ্মীর উপত্যকা (1850 মি) এবং মুসৌরিতেও (2006 মি) ধানের চাষ করা হয়।

❷ অর্থনৈতিক পরিবেশ—

[i] শ্রমিক : জমি কর্ষণ করা, আগাছা পরিষ্কার করা, চারা লাগানো, শস্য ঝাড়াই করা প্রভৃতি কাজের জন্য প্রচুর সুলভ ও দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।

[ii] অন্যান্য : উচ্চফলনশীল বীজ, সার (জৈব ও রাসায়নিক), কীটনাশক, জলসেচ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি প্রভৃতি ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া গেলে ধানের উৎপাদন বাড়ে। এসবের জন্য প্রচুর মূলধনেরও প্রয়োজন হয়। সর্বোপরি, চাহিদা বা বাজারও ধান চাষকে প্রভাবিত করে। এ ছাড়া, বর্তমানে ধান ভারতের অনেক স্থানে বাণিজ্যিক ফসল হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। তাই উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা ধানচাষকে আরও লাভজনক চাষে পরিণত করতে পারে।

যেসব ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে অন্যান্য শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয় এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক্স ভোগ্যপণ্য প্রস্তুত করা হয়, তাকে হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প বলে। ক্যামেরা, রেডিয়ো, টেলিভিশন, টাইপরাইটার, ঘড়ি, বৈদ্যুতিক পাখা প্রভৃতি এই শিল্পে উৎপাদিত দ্রব্য।

লোহা ও ইস্পাত কারখানা স্থাপনের জন্য নিম্নলিখিত সুবিধাগুলি থাকা প্রয়োজন—

লোহা ও ইস্পাত শিল্পের জন্য কাঁচামাল হিসেবে আকরিক লোহা, কয়লা, চুনাপাথর, ডলোমাইট, ম্যাঙ্গানিজ প্রভৃতি দ্রব্যের প্রয়োজন হয়। সেজন্য খনি অঞ্চলের কাছাকাছি কারখানাগুলি স্থাপন করা হয়।

এই শিল্পে প্রচুর পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়। সেজন্য নদী বা হ্রদের নিকটবর্তী স্থান এই শিল্পস্থাপনের পক্ষে আদর্শ।

পর্যাপ্ত বিদ্যুতের সুবিধাযুক্ত স্থান শিল্পস্থাপনের সহায়ক।

ইস্পাত উৎপাদনে প্রচুর দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। তাই সুলভে প্রচুর দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায় এমন স্থানই শিল্পটি স্থাপনের পক্ষে আদর্শ।

কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানির জন্য উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাযুক্ত স্থান প্রভৃতি।

জার্মানির বিখ্যাত রাইন নদীর ডানতীরের ক্ষুদ্র উপনদীর নাম রুর। রুর উপত্যকায় উন্নতমানের কয়লা পাওয়া যায়। এই কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে রুর উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চলে বড়ো বড়ো লোহা ও ইস্পাত, ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন প্রভৃতি কারখানা গড়ে উঠেছে। এই সমগ্র অঞ্চলটি রুর শিল্পাঞ্চল নামে খ্যাত। ভারতেও একইরকমভাবে দামোদর উপত্যকার নিকটবর্তী রানিগঞ্জ, অণ্ডাল, দিশেরগড় প্রভৃতি খনিকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুরে লোহা ও ইস্পাত, ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সার প্রভৃতির কারখানা নির্মিত হয়েছে। এজন্য দুর্গাপুরকে ‘ভারতের রুর’ বলা হয়।

কাঁচামালের উৎস অনুসারে শিল্পকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—

➀ কৃষিভিত্তিক শিল্প : এই ধরনের শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হল বিভিন্ন কৃষিজ ফসল। বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্য যেমন—পাট, তুলো, শন, মেস্তা প্রভৃতি থেকে পাটশিল্প, বস্ত্রবয়ন শিল্প গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া, আখ থেকে চিনি শিল্প এবং ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পও কৃষিভিত্তিক শিল্পের উদাহরণ।

➁ প্রাণীজভিত্তিক শিল্প : এই শিল্প নির্মাণের জন্য বিভিন্ন প্রাণীজ দ্রব্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেমন— মাংস সংরক্ষণ শিল্প, দুগ্ধ শিল্প, চামড়া শিল্প এই জাতীয় শিল্প।

➂ বনজভিত্তিক শিল্প : বিভিন্ন বনজ সম্পদকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে এই শিল্প গড়ে ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ বনজভিত্তিক শিল্পগুলি হল—কাগজ শিল্প, আসবাবপত্র নির্মাণ শিল্প, রেশম শিল্প ইত্যাদি।

➃ খনিজভিত্তিক শিল্প : খনি থেকে উত্তোলিত নানা ধরনের খনিজ পদার্থকে যে শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাকে খনিজভিত্তিক শিল্প বলে। যেমন—লোহা ও ইস্পাত শিল্প, সিমেন্ট শিল্প, তামা নিষ্কাশন শিল্প অ্যালুমিনিয়াম শিল্প প্রভৃতি।

► পৃথিবীর সর্বত্র শিল্প গড়ে তোলা যায় না। শিল্পস্থাপনের কারণগুলি হল—

◉ প্রাকৃতিক কারণ :

➀ কাঁচামাল : কাঁচামালের ওপর নির্ভর করেই শিল্পজাত পণ্য তৈরি হয়। অধিকাংশ শিল্পের ক্ষেত্রে কাঁচামালের প্রাপ্তির ওপর শিল্পস্থাপন নির্ভর করে। কাঁচামাল দু-ধরনের হতে পারে। যথা—

[i] অবিশুদ্ধ কাঁচামাল : যেসব কাঁচামাল শিল্পজাত দ্রব্যে রূপান্তরিত করলে তার ওজন কমে যায় তাকে অবিশুদ্ধ কাঁচামাল বলে। যেমন—আখ থেকে চিনি, লোহার আকরিক থেকে ইস্পাত তৈরির পর তার ওজন কমে। তাই অবিশুদ্ধ কাঁচামালনির্ভর শিল্পকেন্দ্রগুলি কাঁচামালের উৎসের কাছে গড়ে ওঠে।

[ii] বিশুদ্ধ কাঁচামাল : যেসব কাঁচামাল শিল্পজাত দ্রব্যে রূপান্তরিত করলে তার ওজন কমে যায় না তাকে বিশুদ্ধ তাই বিশুদ্ধ কাঁচামালনির্ভর কাঁচামাল বলে। যেমন— তুলো, পাট। এক টন তুলো বা পাট থেকে 1 টন বস্তু বা পাটজাত দ্রব্য প্রস্তুত করা হয়। কাঁচামালের উৎস থেকে দূরবর্তী স্থানেও গড়ে ওঠে।

➁ জল : শিল্পের প্রয়োজনে প্রচুর জল দরকার হয়। লোহা ও ইস্পাত, বস্ত্রবয়ন ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক শিল্পে প্রচুর জলের প্রয়োজন। 1 কিলোওয়াট/ঘণ্টা তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য 36400 লিটার জলের প্রয়োজন। সেকারণে পৃথিবীর বেশিরভাগ শিল্পাঞ্চলগুলি কোনো বড়ো হ্রদ, নদী বা খালের পাশে গড়ে উঠেছে। যেমন—হুগলি নদীর তীরে হুগলি শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে।

➂ বিদ্যুৎ : শিল্পে যেসব শক্তিসম্পদ ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ এবং জলবিদ্যুতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এজন্য ইউরোপ, আমেরিকার শিল্প কারখানাগুলি কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ভারতের বহু শিল্পকারখানা কয়লাখনি ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে।

◉ কৃত্রিম কারণ :

➀ পরিবহণ : শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও শক্তিসম্পদ সংগ্রহ, শ্রমিকদের যাতায়াত, উৎপন্ন শিল্পজাত দ্রব্য বাজারে পাঠানোর জন্য উন্নত ও আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থার প্রয়োজন। শিল্পের পরিবহণ ব্যয় যেখানে কম সেখানে শিল্প গড়ে উঠলে তা লাভজনক হয়। যেমন— দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে পরিবহণ ব্যবস্থা ভালো নয় বলে তেমন শিল্প গড়ে ওঠেনি। অপরপক্ষে, সমতল অঞ্চলে উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার উপস্থিতিতে শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠে।

➁ শ্রমিক : শিল্পস্থাপনের জন্য দক্ষ, আধুনিক ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন, সুলভ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। জনবিরল অঞ্চলে একারণে শিল্পস্থাপন করা যায় যেমন—অস্ট্রেলিয়ায় শিল্পস্থাপনের অনুকূল পরিবেশ থাকলেও শ্রমিকের অভাবে সেখানে শিল্পের তেমন বিকাশ ঘটেনি। আবার পূর্ব ভারতের হুগলি শিল্পাঞ্চলে প্রচুর শ্রমিক পাওয়া যায় বলে শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।

[3] বাজার : শিল্পজাত দ্রব্যের বাজার না থাকলে শিল্প গড়ে তোলা লাভজনক হয় না। জনবহুল অঞ্চলে মানুষের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেশি বলে সেখানে বাজার সৃষ্টি হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ভারতের থেকে কম হলেও তাদের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেশি বলে ওইসব দেশের শিল্পজাত দ্রব্যের বাজার উৎকৃষ্ট।

➃ মূলধন : শিল্প গড়ে তুলতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। শিল্পের প্রয়োজনীয় জমির ব্যবস্থা, কারখানা স্থাপন, কাঁচামাল ক্রয়, শ্রমিকের মজুরি, শক্তিসম্পদের জোগান প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক মূলধনের প্রয়োজন হয়। ভারতের মহারাষ্ট্রে বয়ন শিল্পের উন্নতির অন্যতম কারণ পারসি ধনী। ব্যবসায়ীদের মূলধন বিনিয়োগ।

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প না গড়ে ওঠার কারণ:

➀ কাঁচামালের অভাব : ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের জন্য প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। কিন্তু হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে এর যথেষ্ট অভাব আছে।

➁ জল এবং বিদ্যুতের অডাব : এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল এবং বিদ্যুৎ পাওয়ার অসুবিধা রয়েছে।

➂ দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন শ্রমিকের অভাব : বন্ধুর পার্বত্য অঞ্চলে স্বল্প জনবসতির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যায় শ্রমিক পাওয়া যায় না। এ ছাড়া, যেসব শ্রমিক পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে অধিকাংশ উন্নত কারিগরী জ্ঞানসম্পন্ন না হওয়ায় এই অঞ্চলে দক্ষ শ্রমিকের অভাব লক্ষ করা যায়।

➃ অনুন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা : প্রাকৃতিক দুর্গমতার কারণে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে পরিবহণ ব্যবস্থা অনুন্নত। এ ছাড়া, ভূমিধসের (landslide) কারণে অনেক অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকে।

➄ স্বল্প চাহিদা : স্বল্প জনবসতির কারণে শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদাও সীমিত।

➅ মুলধনের অভাব : কাঁচামালের অভাবসহ অন্যান্য অসুবিধার জন্য এই অঞ্চলে শিল্পস্থাপন অনেকক্ষেত্রে লাভজনক হয় না। তাই এই অঞ্চলে শিল্পস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রায়ই মূলধন বিনিয়োগ করার অভাব দেখা যায়।

➆ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সন্ত্রাসবাদ সমস্যা : হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পশ্চিম হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসবাদ সমস্যা শিল্পস্থাপনের ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

ভারতের সব রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে অরুণাচল প্রদেশের জনবসতির ঘনত্ব সবথেকে কম। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে 17 জন লোক বসবাস করে। এই রাজ্যটির জনঘনত্ব এরূপ কম হওয়ার পিছনে বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও আর্থ- সামাজিক কারণ বর্তমান। যেমন—

➀ বন্ধুর ও পর্বতময় ভূপ্রকৃতি: এখানকার বেশিরভাগ ভূমিই বন্ধুর এবং পর্বতময়। ফলে যে-কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কাজকর্ম গড়ে তুলতে অসুবিধা হয়।

➁ অনুর্বর মৃত্তিকা: পর্বতময় ঢালু ভূপ্রকৃতির জন্য বেশিরভাগ জায়গায় মৃত্তিকা অগভীর এবং অনুর্বর। ফলে কৃষিকাজ ভালো হয় না।

➂ প্রতিকূল জলবায়ু: এখানকার জলবায়ু শীতল এবং আর্দ্র প্রকৃতির। এই আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে জলবায়ু জীবনধারণের জন্য অনুপযুক্ত।

➃ গভীর অরণ্য: এখানকার ভূমির বেশিরভাগ অংশই গভীর অরণ্যে ঢাকা। গভীর অরণ্য মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিকূল প্রভাব ফেলে।

➄ শিল্পের কাঁচামাল ও শক্তিসম্পদের অভাব: কৃষি- ভিত্তিক ও খনিজভিত্তিক কাঁচামাল ও শক্তিসম্পদের অভাবে এখানে শিল্পের বিকাশ সম্ভব হয়নি।

➅ অনুন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা: এই অঞ্চলটি সড়ক কিংবা রেলপথ পরিবহণে তেমন উন্নত নয়। তেমনি বিমান ও জলপথে পরিবহণ ব্যবস্থাও খুবই অপ্রতুল।

ভৌগোলিক হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিরল এবং অতিবিরল জনবসতি অঞ্চলের অন্তর্গত। এখানকার গড় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিমিতে 100 জনেরও কম। এই অঞ্চলটি জনবিরল হওয়ার কারণগুলি হল—

➀ উঁচুনীচু পর্বতমর ভূপ্রকৃতি: হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের বেশিরভাগ স্থানের ভূপ্রকৃতি পর্বতময় ও বন্ধুর প্রকৃতির। মানুষের পক্ষে এখানে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজকর্ম গড়ে তোলা অসুবিধাজনক।

➁ অনুর্বর মৃত্তিকা: এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মৃত্তিকা অনুর্বর এবং অগভীর। তাই কৃষিকাজের পক্ষে উপযুক্ত নয়।

➂ শীতল জলবায়ু: হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের শীতকালীন জলবায়ু জীবনধারণের পক্ষে সুবিধাজনক নয়।

➃ অরণ্যের অবস্থান: এই অঞ্চলের 90% ভূমিই অরণ্যে ঢাকা থাকে। গভীর অরণ্য জীবনধারণ করার উপযুক্ত নয়।

➄ অনুন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: বন্ধুর ভূপ্রকৃতির জন্য এখানে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা একদমই উন্নত নয়। পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার জন্য অঞ্চলটি জনবিরল হওয়া স্বাভাবিক।

➅ শিল্পের কাঁচামাল ও শক্তিসম্পদের অড়ান: অঞ্চলটি বনজ ও বিভিন্ন খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। কিন্তু, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে ওই সম্পদগুলি সংগ্রহ করা যায় না। এ ছাড়া, অঞ্চলটিতে কৃষিকাজ বিশেষ না হওয়ায় কৃষিজ কাঁচামাল তেমন পাওয়া যায় না। শক্তিসম্পদেরও অভাব থাকায় শিল্পের বিকাশও সম্ভব হয়নি।

গাঙ্গেয় সমভূমি ভারতের সবথেকে জনবহুল অঞ্চল। এখানকার গড় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিমিতে 500 জনের বেশি। যেসব কারণগুলির জন্য অঞ্চলটি অত্যন্ত জনবহুল সেগুলি হল—

➀ সমতল ভূপ্রকৃতি: গাঙ্গেয় সমভুমিটিতে ভূমির বন্ধুরতা একেবারেই নেই। সমতল সমভূমি কৃষিকাজ, পরিবহণ ও শিল্পস্থাপনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।

➁ অনুকূল জলবায়ু: এই অঞ্চলটির উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাত মধ্যম প্রকৃতির। এইরূপ জলবায়ু কৃষিকাজ ও অধিবাসীদের জীবনধারণের পক্ষে অনুকূল।

➂ উর্বর মৃত্তিকা: এখানকার মৃত্তিকা খুব উর্বর। এই মৃত্তিকায় ধান, গম, পাট, আখ, তৈলবীজসহ বিভিন্ন শস্যের উৎপাদন খুব বেশি হয়।

➃ উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: ভূমি যথেষ্ট সমতল বলে সড়ক এবং রেল পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত। সমগ্র অঞ্চলটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থারও যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে যা অধিক জনবসতি গড়ে তোলার পক্ষে সহায়ক।

➄ শক্তির প্রাচুর্য: এই অঞ্চলটিতে বেশ কয়েকটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই শক্তি কেন্দ্রগুলি কৃষি ও শিল্পের প্রসার ঘটাতে সাহায্য করেছে। যার কারণে সমগ্র অঞ্চলটি জনবহুল।

ভারতে দ্রুত বেড়ে চলা নগরায়ণের জন্য নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্তরায় এই সমস্যাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—

[1] অপরিকল্পিত নগরায়ণ: ভারতের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার জন্য শহর-নগরগুলি অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠে। ফলে কৃষিজমি, জলাভূমি, বনভূমির পরিমাণ কমে যায়। নগর তাদের গ্রাস করে। অপরিকল্পিত নগরায়ণে নগরে বস্তির বাড়বাড়ন্ত হয়। সরু রাস্তা, জলনিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা, পানীয় জলের অভাব, ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রধান সমস্যা।

[2] মানুষের শহরমুখী পুরণতা: শহর এবং গ্রামের উন্নয়নের পার্থক্যের জন্য ভারতে গ্রাম থেকে শহরে আসার প্রবণতা বাড়ে। শহর, নগরে স্বচ্ছল জীবনযাপন, কর্মক্ষেত্র বেশি থাকায় কাজের চাহিদাও বাড়ে। তাই গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত দেখা যায়।

[3] বাসস্থানের অভাব: মানুষের জীবিকার খোঁজে শহরে চলে এলে এখানে বাসস্থানের অভাব সৃষ্টি হয়।বাসস্থানের অভাবের জন্য রেললাইনের পাশে, রাস্তার ধারে, খালপাড়ে বস্তিতে মানুষ আশ্রয় নেয়। মুম্বাই, কলকাতায় এই ধরনের বস্তি সমস্যা প্রবল।

[4] পরিবহণের সমস্যা: শহর-নগরে রাস্তায় যানবাহন বেশি। অথচ অপরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য রাস্তাগুলি সরু। এর সাথে ফুটপাথ দখল হওয়ার কারণে যানবাহনের গতি অত্যন্ত মন্থর বা যানজট একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

[5] স্বাস্থ্য সমস্যা: শহর ও নগরে শিল্পকারখানা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও যানবাহনের ধোঁয়া বায়ুদূষণ ঘটায়। আবর্জনা, জলাভূমি, নর্দমা থেকে নানা পতঙ্গবাহিত রোগ, বস্তিতে জলবাহিত রোগ, পুষ্টি সমস্যা শহরের মানুষকে ভোগায়। সেকারণে ভারতের নগরগুলি পৃথিবীর অন্যতম দূষিত নগরে পরিণত হয়েছে।

[6] শিক্ষা সমস্যা: শহরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত। কিন্তু দরিদ্র, বস্তিবাসীর পক্ষে শিক্ষার সব সুযোগসুবিধা নেওয়া সম্ভব হয় না ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে অসাম্যতা সৃষ্টি হয়।

[7] বিদ্যুৎ সমস্যা: অপরিকল্পিত নগরায়ণে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা বিদ্যুতের ঘাটতি সৃষ্টি করে। বিদ্যুতের উৎপাদন ও বণ্টনের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়। এতে শিক্ষা, বাণিজ্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।

[৪] জলনিকাশি সমস্যা: বেশিরভাগ শহরে জলনিকাশি ব্যবস্থা অনুন্নত। এ ছাড়া, জলনিকাশি ড্রেনগুলিতে প্লাসটিক এবং অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ নিক্ষেপ করার জন্য নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একটু বেশি বৃষ্টি হলে শহর জলপ্লাবিত হয়।ড্রেনে জমে থাকা নোংরা জলে নানাবিধ কীটপতঙ্গ বাসা বাঁধে। যা থেকে জঞ্জালের সমস্যা তৈরি হয়।

যেসব নির্দিষ্ট কোম্পানি বা সংস্থার জাহাজ সমুদ্রে চলাচল করে ওইসব সংস্থা বা কোম্পানিকে শিপিং লাইন বলে।

[1] আকাশপথ পরিবহণ খুব ব্যয়বহুল। তাই সবার পক্ষে এর পরিসেবা নেওয়া সম্ভব নয়।
[2] আকাশ পথে স্বল্প দূরত্বে পরিবহণ করা যায় না।

[1] রেল পরিবহণ ব্যবস্থা সর্বত্র চালু করা সম্ভব নয়। নদীবহুল অঞ্চল অথবা উচ্চ পার্বত্য অংশে রেলপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন।
[2] একটি নির্দিষ্ট পথেই রেল চলাচল করে। বলে প্রয়োজনে পথ পরিবর্তন করতে পারে না।

সড়কপথে অনেক সুবিধা থাকলেও নানা অসুবিধাও দেখা যায়-

[1] নির্মাণ ব্যয় বেশি: সড়কপথ নির্মাণ যথেষ্ট ব্যয়বহুল এবং সময়ও বেশি লাগে। তাই দেশের অর্থনীতি উন্নত না হলে সড়ক ব্যবস্থা ভালো হয় না।

[2] রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি: বৃষ্টি, বন্যা, তুষারপাত প্রভৃতি রাস্তাকে নষ্ট করে দেয়। এ ছাড়া, মাত্রাতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচল রাস্তাকে নষ্ট করে। সে কারণে সবসময় সড়কপথকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়।

[3] সেতুর অভাবে পরিবহণ ঘাটতি: নদীবহুল অঞ্চলে যথেষ্ট সংখ্যক সেতু না থাকায় সড়ক পরিবহণে অসুবিধার সৃষ্টি হয়।

[4] পরিবহণ ব্যয় বেশি: রেল এবং জলপথ পরিবহণের তুলনায় সড়কপথের পরিবহণ ব্যয় বেশি। সেজন্য মালপত্র পরিবহণে এখনও রেল এবং জলপথ এগিয়ে।

[5] যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য কম: সড়কপথে দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করা বেশ কষ্টসাধ্য। যাত্রীদের শারীরিক স্বাচ্ছন্দের ন্যূনতম ব্যবস্থা করাও সড়ক পরিবহণে সম্ভব হয় না।

রেলপথ ভারতের শ্রেষ্ঠ পরিবহণ মাধ্যম। ভারতের মতো দেশে আর্থসামাজিক পরিবর্তনে এর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

[1] যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ : প্রচুর যাত্রী এবং পণ্য পরিবহণে রেলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। অতিদ্রুত এবং খুব কম খরচে এই পরিবহণ করা সম্ভব। রেলই দেশের অভ্যন্তরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ সর্বাধিক মাত্রায় করে।

[2] কৃষির উন্নতি : ভারতে কৃষি উন্নতির জন্য রেলপথের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। রেলপথে কৃষিতে প্রয়োজনীয় সার, কীটনাশক, বীজ, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি খুব কম খরচে দেশের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো হয়। আবার রেলপথের মাধ্যমেই উদ্ভূত ফসল খাদ্য ঘাটতি অঞ্চলে দ্রুত পাঠানো যায়।

[3] শিল্পের উন্নতি : ভারতে শিল্পের উন্নতিতে রেলের ভূমিকা অত্যন্ত বেশি। রেল শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, যেমন—কারখানাগুলিতে পাঠায় তেমনি রেলপথের মাধ্যমেই উৎপাদিত পণ্য সারাদেশের বিভিন্ন বাজারগুলিতে পাঠানো হয়। রেলপথের মাধ্যমেই শিল্প আরও উন্নত হয়ে ওঠে।

[4] তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন : কয়লা খনি থেকে কয়লা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে রেলপথের মাধ্যমে সরবরাহ হয়। সুতরাং, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে রেলপথের ভূমিকা কম নয়।

[5] বহির্বাণিজ্যে উন্নতি : রেলপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্বৃত্ত পণ্য বন্দরগুলিতে পাঠানো হয়। রেলপথ ছাড়া এটা সম্ভব হত না। ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশগুলির কয়েকটিতে ভারতীয় রেল সরাসরি পণ্য রপ্তানি করে। এভাবেই রেল বহির্বাণিজ্যে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করে।

[6] দেশরক্ষা : দেশরক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য, যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম, রসদ দ্রুত পৌঁছে দিতে রেলের ভূমিকা সদর্থক। সেদিক থেকে ভারতীয় রেল দেশরক্ষার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

[7] অন্যান্য : ভারতীয় রেল অতিদ্রুত মানুষ এবং পণ্যকে এক শহর থেকে অন্য শহরে পৌঁছে দেয়। বন্যা এবং খরায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে রেলের ভূমিকা খুব বেশি। গ্রাম থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক রেলপথে শহর ও নগরে কাজ করে দিনের শেষে রেলে করে বাড়ি ফিরে যায়। তাই রেল ভারতের ধর্মনিস্বরূপ।

No Content