ষষ্ঠ পাঠ

জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি কবিমনকে আলোড়িত এবং বিষণ্ণ করেছে।পাড়াগাঁয়ের দুপুরগুলি হারিয়ে যাওয়ায় সেগুলির স্মৃতি বেদনাময় স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সেইসব দুপুরের নানান পর তাঁর হৃদয়ের মণিকোঠায় সংরক্ষিত রয়েছে। পাড়াগাঁয়ের সেই মাঠ, সেখানে উড়ে বেড়ানো শঙ্খচিল কবির গ্রাম্য স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে। শুকনো পাতা ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেছে শালিকের ঘর। দুপুরের রোদে নকশাপেড়ে শাড়ি পরা মেয়েটি হলুদ পাতার মতো হারিয়ে গেছে । দুপুরের স্মৃতি রোমন্থন করার মুহূর্তে কবির চেতনায় ভেসে ওঠে জলসিড়ি নদীর পাশে ঘাসের ওপর নুয়ে- পড়া বুনো চালতা গাছটির ছবি। পুরোনো একটি ডিঙিনৌকা নদীর তীরে হিজল গাছে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে, হয়তো-বা সেই ভিত্তির মালিক কোনোদিনও ফিরবে না। দুপুরের সেই স্মৃতি কবির মনে যে স্মৃতিমেদুরতার জন্ম দিয়েছে তাই যেন বেদনাময় স্বপ্নের অনুভূতি নিয়ে ফিরে এসেছে।

কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' শীর্ষক কবিতায় পাড়াগাঁয়ের এক অলস, শান্ত, স্নিগ্ধ, রৌদ্রজ্জ্বল দুপুরের চিত্র অঙ্কন করেছেন। সেই রৌদ্রজ্জ্বল দুপুরের নির্জনতা কবিমনে যে বিষণ্নতার সৃষ্টি করে তার আভাস আলোচ্য কবিতায় পাওয়া যায়। প্রকৃতির অনাড়ম্বর, সাজসজ্জাহীন, নিঃসঙ্গ রূপবর্ণনার সূত্রে কবি জানাতে ভোলেন না যে, গ্রামের বাধাহীন সবুজ প্রান্তর আর সেখানকার শঙ্খচিলের কাছেই তাঁর মনের খবর রয়েছে। তাদের কাছেই যুগ যুগ ধরে যেন কথা শিখেছে কবির অন্তরাত্মা। যে স্বপ্নে ব্যথা আছে, যন্ত্রণা আছে, দুপুরের রোদে কবি সেই স্বপ্নেরই গন্ধ পেয়েছেন। শুকনো পাতা, পালিকের কন্ঠস্বর, ভাঙা নির্জন পরিতাক্ত মঠ, দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া মেয়েটির নকশাপেড়ে শাড়ি, যত্নহীন বুনো চালতার নুয়ে পড়া ডাল, হিজলে বেঁধে রাখা, নদীর জলে ভাসমান মালিকানাহীন ভাঙাচোরা নৌকো সেই বিষয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কবিতার শেষাংশে কবি বলেছেন- “রৌদ্রে যেন ভিজে বেদনার গন্ধ লেগে আছে।" সেই রোদ, সেই দুপুর এই বেদনার গুণেই কবির কাছে এমন অসামান্য ভালোলাগায় পরিণত হয়েছে। কবির কল্পনায় দুপুরের সেই ভরা রোদ্দুরের মধ্যেও আকাশের নীচে যেন সেই ডিঙিটি কেঁদে কেঁদে ভাসছে। তার নিঃসঙ্গতাই তার কান্নার কারণ। সেই মালিকহীন ভাঙা ডিঙিটির নিঃসঙ্গতা কবির মনকে বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।

জীবনানন্দ দাশ রচিত 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' শীর্ষক কবিতা থেকে উদ্ধৃত আলোচ্য পঙক্তিটিতে হিজল গাছে বাঁধা, নদীর জলে ভেসে থাকা মালিকহীন ভাঙাচোরা ডিঙিনৌকোটির কথা বলা হয়েছে। তার মালিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। কবির মনে হয় এই ঝাঁঝরা-ফোঁপরা পরিত্যক্ত ডিঙিটির মালিক আর কোনোদিনই তাকে নিয়ে যেতে ফিরে আসবেন না। এই দৃশ্যটি কবির মনে অপরিসীম করুণার উদ্রেক ঘটায়। ডিভিটির একাকিকে তিনি নিজের একাকিত্বেরই প্রতিফলন লক্ষ করেন। জরাজীর্ণ ডিঙিটির এমন অবহেলায়, উপেক্ষায় ও অনাদরে পড়ে থাকার কারণেই কবির মনে হয় সে যেন “কেঁদে-কেঁদে ভাসিতেছে আকাশের তলে"।

“পাড়াগাঁর দু পহর ভালোবাসি' শীর্ষক কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থের পঁচিশসংখ্যক কবিতা।

গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাস কবির মনে যে প্রভাব বিস্তার করেছে, 'রূপসী বাংলা'র প্রতিটি কবিতায় তারই চিত্র ফুটে উঠেছে। 'পাড়াগার দু-শহর ভালোবাসি কবিতায় কবি গ্রামবাংলার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার কথা অকপটে জানিয়েছেন। দুপুরের স্বপ্নালু রোদ, খোলা প্রান্তর, ভাঙা মঠ, শঙ্খচিল, শালিক, নকশাপেড়ে শাড়ি, বুনো চালতার নুয়ে-পড়া ডাল, জলসিড়ি নদী, জলে ভাসার ডি খন্ডচিত্রের মধ্য দিয়ে কবি গ্রাম্যপ্রকৃতির এক সমগ্রতার আভাস দিয়েছেন। এই প্রতিটি বিষয়ই কবির মনে অপরিসীম বেদনার সঞ্চার করে। নির্জন, স্তদ্ধ দুপুরে কবির মনে যখন একাকিত্বের অনুভূতি, নিঃসঙ্গতার চেতনা নিবিড় হয়ে এসেছে, তখন সমস্ত প্রকৃতিজুড়ে কবি সেই বেদনারই সম্প্রসারণ ও ব্যাপ্তি লক্ষ করেছেন। প্রকৃতি যেমন কবিকে তার আপন মহিমায় ভাবিয়ে তোলে, কবিও তেমনি প্রকৃতির মধ্যেই নিজের ভাবনার প্রতিফলন দেখতে পান।

 

কবি জীবনানন্দ দাশ রচিত 'রূপসী বাংলা' (১৯৫৭) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত পঁচিশসংখ্যক কবিতা 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' একটি সনেটধর্মী কবিতা।

গীতিকবিতার একটি বিশেষ শাখা হল সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা।কবি এ ধরনের কবিতায় তাঁর আবেগকে মাত্র চোদ্দোটি পঙক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন।বাংলা সনেটের প্রখ্যাত শিল্পী প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়— “ভালবাসি সনেটের কঠিন বন্ধন,

শিল্পী যাহে মুক্তি লভে, অপরে ক্রন্দন।"

অর্থাৎ অপরিসর বা সীমিত আয়তনের মধ্যে রচিত হলেও সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতায় রচয়িতার ভাবগভীরতার পরিচয় পাওয়া যায়। সনেটধর্মী বাংলা কবিতায় সাধারণত চোদ্দোটি পত্তি এবং প্রতিটি পঙক্তিতে চোদ্দোটি বর্ণের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সমগ্র কবিতায় ডাবের অখন্ডতা, গভীরতা, সংযম, ভাষার ঋজুতা লক্ষ করা যায়। পাঠ্য 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি” কবিতাটিও চোদ্দো পত্তির কবিতা। এতে অন্ত্যমিলের ধরনটি হল প্রথম ৮ পঙক্তিতে  ক খ খ ক ক খ খ ক এবং শেষ ৬ পঙক্তিতে চ ছ চ ছ চ ছ।

জীবনানন্দ দাশের 'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতায় কবি উল্লেখ করেছেন—জলসিড়ি নদীর পাশে ঘাসের মধ্যে বহুদিন পরিচর্যাহীন অবস্থায় পড়ে থাকা বুনো চালতার শাখাগুলো যেন নীরবে নুয়ে আছে।

ডিডিটি হিজল গাছে বাঁধা আছে।

ডিডিটি ঝাঁঝরা-ফোপড়া অর্থাৎ জীর্ণ ও ভাঙাচোরা।

 

এখানে বুনো চালতা গাছের শাখার কথা বলা হয়েছে।

শাখাগুলি জলসিড়ি নদীর পাশে ঘাসের ওপর নুয়ে আছে।

এই কবিতায় উল্লিখিত একটি পাখির নাম শঙ্খচিল।

'পাড়াগাঁর দু-পহর ভালোবাসি' কবিতার দ্বিতীয় ধবকে গ্রামবাংলার দুপুরবেলার প্রকৃতির মধ্যে কবি বেদনার আভাস খুঁজে পেয়েছেন। জলসিড়ি নদীর পাশে নকশাপেড়ে শাড়ি পড়া একটি মেয়ে রোদের ভেতরে সরে যায়। জলে তার মুখ দেখা যায়। সেই জলে ভাঙাচোরা একটা নৌকো বাঁধা থাকে হিজল গাছের ডালে। সেই নৌকোর মালিক আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। দুপুর রোদে সেই ফিরে না আসার বেদনা যেন কেঁদে কেঁদে ভেসে বেড়ায়।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত "ঘরোয়া" গ্রন্থ থেকে সংকলিত 'নাটোরের কথা গদ্যাংশে লেখক আলোচ্য উদ্ধৃতিটির অবতারণা করেছেন। স্বদেশি যুগের সময়কালে, ভূমিকম্পের বছরে প্রভিনশিয়াল কনফারেন্স হয়েছিল নাটোরে। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ছিলেন তার রিসেপশন। কমিটির প্রেসিডেন্ট। রবীন্দ্রনাথ-সহ ঠাকুর পরিবারের প্রায় সকলেই সেই কনফারেন্সে নিমন্ত্রিত ছিলেন। নাটোরে উপস্থিত হয়ে নাটোর মহারাজের আতিথেয়তায় সকলেই মুগ্ধ। এরই মধ্যে যখন 'রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স' বসল, আগের সিদ্ধান্তমতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রস্তাব করলেন যে, কনফারেন্স হবে বাংলা ভাষায়। উপস্থিত তরুণরা সেই প্রস্তাব সমর্থন করল। অনুষ্ঠানের প্রধানেরা আপত্তি করলে দুটি দল তৈরি হয়ে গেল। একদল বলবে বাংলাতে, একদল ইংরেজিতে। প্যান্ডেলে অনুষ্ঠান শুরু হতেই রবীন্দ্রনাথ বাংলায় গাইলেন। এরপর প্রেসিডেন্ট বক্তব্য রাখবার সময় ইংরেজি বলতে শুরু করতেই তরুণরা ‘বাংলা, বাংলা' বলে সমন্বরে চিৎকার করে উঠল। শুধু প্রেসিডেন্ট নন, কোনো বক্তাই আর ইংরেজিতে ভালোভাবে বক্তৃতা দিতে পারলেন না। কিন্তু লালমোহন ঘোষের মতো পার্লামেন্টারি বক্তা ইংরেজিপুরম্ভ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাতেই বক্তৃতা দিলেন। এইভাবেই কনফারেন্সে বাংলা ভাষা চালু হল। লেখকের নিজের ভাষায়—“সেই প্রথম আমরা পাবলিকলি বাংলা ভাষার জন্য লড়লুম।"

লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনা অনুযায়ী, তখনকার নাটোরের মহারাজার নাম ছিল জগদিন্দ্রনাথ।

নাটোরের রাজা জগদিন্দ্রনাথ নাটোরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক সম্মেলনে রিসেপশন কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

'নাটোরের কথা' শীর্ষক পাঠ্যাংশে লেখক অবনীন্দ্রনাথ নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়কে নাটোর নামে উল্লেখ করেছেন। স্বদেশি যুগের সময়কালে ভূমিকম্পের বছরে অর্থাৎ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে নাটোরে অনুষ্ঠিত সেই প্রাদেশিক সম্মেলনে আমন্ত্রিতদের মধ্যে লেখক তাঁর বাড়ির ছেলেদের কথা, দীপুদা অর্থাৎ দ্বীপেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবিকাকা অর্থাত্ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অনেক নেতা ও ন্যাশনাল কংগ্রেসের চাইদের কথা স্মরণ করতে পেরেছিলেন। সেই তালিকায় ন-পিসেমশাই জানকীনাথ ঘোষাল, ডব্লিউ সি রোনার্জি, মেজো জ্যাঠামশায় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালমোহন ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিও ছিলেন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ঘরোয়া' গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত ‘নাটোরের কথা' শীর্ষক পাঠ্যাংশে লেখক ও অন্যরা নাটোরে প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে রওনা হলেন।

স্বদেশি যুগের সময় এক প্রাদেশিক সম্মেলনে তাঁদের উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন স্বয়ং নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ-সহ ঠাকুরবাড়ির ছেলেরা তৈরি হলেন নাটোরে যাওয়ার জন্য। যাতায়াতের হাঙ্গামার কথা প্রকাশ করতেই মহারাজাই তাঁদের আশ্বস্ত করলেন। বললেন, “কিছু ভাবতে হবে না দাদা।" অতিথিদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেনের বন্দোবস্ত হল। সেই ট্রেনে চেপেই তাঁরা নাটোর অভিমুখে রওনা হলেন।

'নাটোরের কথা' গদ্যাংশের লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর সঙ্গীরা সারাঘাট থেকে পদ্মা নদীতে স্টিমার চড়েছিলেন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ঘরোয়া' গ্রন্থ থেকে সংকলিত নাটোরের কথা' শীর্ষক গদ্যাংশে সারাঘাট থেকে পদ্মার বুকে স্টিমারে নাটোর অভিমুখে যাত্রার সময়কালে ডেকের ওপর খাওয়াদাওয়ার এক মনোজ্ঞ বর্ণনা রয়েছে। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথের ব্যবস্থাপনায় সেই স্টিমারের ভোজসভায় লেখকরা অনেকে মিলে এক লম্বা টেবিলে যেতে বসেছিলেন। টেবিলের একদিকে বসেছিলেন হোমরাচোমরা কর্তাব্যাক্তিরা, আর অন্যদিকে যুবকরা। দীপুদা বসেছিলেন লেখকের পাশে। খাওয়া শুরু হওয়ার পর লেখকরা সকলে লক্ষ করলেন, 'বয়'রা খাবার নিয়ে কর্তাব্যক্তিদের ওদিকে চলে যাচ্ছে, ওদিকে খাবার দিয়ে তারপর তাঁদের দিকে আসে। কিন্তু মাঝখানে বসে থাকা একজন কর্তাব্যক্তির কাছে খাবারের ডিশ এসে পৌঁছোলেই তা প্রায় শেষ হয়ে যায়। কাটলেট বলে তিনি একবারেই ছ-সাতখানা কাটলেট তুলে নেন। স্বাভাবিকভাবেই, লেখকদের কাছে খাবারের ডিন এলে সেখানে বিশেষ কিছুই আর পড়ে থাকে না। লেখকরা ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতেও পারছেন না। এরই মধ্যে যখন পুডিং, দীপুদা লেখককে বললেন যে বারে পুডিং এসেছে, বেশ করে খাওয়া যাবে। পুডিং হাতে বা টেবিলের একপাশ থেকে ঘুরে সেই মানুষটির কাছে পৌঁছোতেই তিনি অর্ধেকের বেশি পুডিং প্লেটে তুলে  নিলেন। লেখক আর দীপুদা পরস্পরের মুখ চাওয়াওয়ি করতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত দীপুদার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতিটা বদলায় খাবারটা যাতে আগে লেখকদের দিকেই আনা হয়. বয়কে এমন ইঙ্গিত করায় দেখা গেল একসঙ্গে দু-প্লেট করে খাবার এল। একজন বয় ওদিকে খাবার দিতে যায়। আর একজন লেখকদের দিকে খাবার দিতে লাগল।

উপরের ঘটনায় যুবক অবনীন্দ্রনাথের এক অদ্ভুত অসহায়তার ছবি বর্ণিত হয়েছে। লেখক সেই 'চাই' ভদ্রলোকের খাওয়াকে জাইগ্যানটিক' আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন অয়ন খাওয়া তাঁরা কেউ কখনও দেখেননি। ওইরকম খাওয়া খেয়েই ভদ্রলোক যে তাঁর শরীরকে 'বেশ' রেখেছিলেন, সেই তথ্যটুকুও লেখক হাসির ছলে উল্লেখ করতে ভোলেননি।

'নাটোরের কথা' শীর্ষক গদ্যাংশে নাটোরের মহারাজের বাড়ি এবং বৈঠকখানা দেখে লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটিকে ইন্দ্রপুরী'র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ইন্দ্রপুরী' হল দেবরাজ ইন্দ্রের আবাসস্থল। বিলাসে, আড়ম্বরে, সম্পদে অতুলনীয় অর্থেই লেখক নাটোর মহারাজার সুসজ্জিত বাড়ি-বৈঠকখানার সঙ্গে ইন্দ্রপুরীর তুলনা করেছেন। সেই প্রাসাদের ঝাড়লণ্ঠন, তাকিয়া, ভালো ভালো দামি ফুলদানি—এসবই লেখকের কাছে অতুলনীয় বলে মনে হয়েছিল। এর সঙ্গে মহারাজার আন্তরিকতা, আদরযত্ন, সমাদর যুক্ত হয়ে তাকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ঘরোয়া' গ্রন্থের অন্তর্গত 'নাটোরের কথা? শীর্ষক রচনাংশে নাটোরের মহারাজার বাড়িতে যে অভ্যর্থনা ও সমাদর লেখক এবং তাঁর সঙ্গীরা পেয়েছিলেন, তাকেই এখানে 'রাজসমাদর' আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ঠাকুরবাড়ির সকলকে নাটোররাজ প্রভিনশিয়াল কনফারেন্স উপলক্ষ্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার জন্য বিশেষ ট্রেন এবং স্টিমারের বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে, স্টিমারে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা, তাঁরা নাটোরে পৌঁছোনোর পর আন্তরিক আদরযত্ন, বিপুল সমারোহে, অভ্যর্থনায় লেখকরা সকলে অভিভূত হয়ে যায়। সবকিছুই সকলের হাতের কাছে তৈরি নতুন জায়গায় বা ভিড়ে বিন্দুমাত্র অস্বাচ্ছন্দ্য কোথাও নেই। ধুতি-চাদর সমস্ত গোছানো, ব্যবহারের জন্য তৈরি | চাওয়ার আগেই ভৃত্যেরা প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের কাছে এনে উপস্থিত করে। এই বিপুল অভ্যর্থনা ও অতিথিবাৎসল্যকেই লেখক সংগত কারণে প্রকৃত অর্থেই 'রাজসমাদর' আখ্যা দিয়েছেন।

নাটোরের কনফারেন্সে একটি বাংলা গান গাওয়া হয়েছিল। সম্ভবত গানটি ছিল রবীন্দ্রনাথের 'সোনার বাংলা'। অধিবেশনের শুরুতেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি নিজের কন্ঠে পরিবেশন করেছিলেন।

নাটোরের রাজবাড়িতে রাজকীয় সাজসজ্জার খাওয়াদাওয়ারও এলাহি ব্যবস্থা ছিল। অতিথিদের জন্য নাটোরের রানিমা স্বয়ং নিজের হাতে পিঠেপায়েস তৈরি করেছিলেন। সেখানকার খাদ্যতালিকা থেকে মাছ-মাংস, ডিম কিছুই বাদ যায়নি। হালুইকর বাড়িতে বসেই এবেলা- ওবেলা নানারকম মিষ্টি তৈরি করছিল। লেখকের আবদারে খাওয়ার ঘরের সামনে বসে হালুইকর খাওয়ার সময় গরম গরম সন্দেশও তৈরি করে দিয়েছিল।

নাটোরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক সম্মেলনে আগত সদস্যরা খেয়ালখুশিমতো নাটোরের মহারাজের কাছে আবদার করছিলেন। আর মহারাজও তৎক্ষণাৎ তা পূরণ করতে সচেষ্ট হচ্ছিলেন। এরকম অবস্থায় ফুর্তির চোটে লেখকের মাথায় অদ্ভুত খেয়াল আসে। তিনি মহারাজকে বলেন, “কী সন্দেশ খাওয়াচ্ছেন নাটোর, টেবিলে আনতে আনতে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। গরম গরম সন্দেশ খাওয়ান দেখি। বেশ গরম গরম চায়ের সঙ্গে গরম গরম সন্দেশ খাওয়া যাবে।"—এই কথা শুনেই টেবিলসুদ্ধ সবাই হো-হো করে হাসতে থাকেন।

নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের 'অবনদা' অর্থাৎ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহারাজকে তাঁর কথার উত্তরে জানিয়েছিলেন যে, সাঁতার না জেনে পুকুরে স্নান করতে গিয়ে ডুবে মরতে তিনি চান না। তা ছাড়া পুকুরের জল ঠান্ডা, তাই তিনি ঘরে তোলা জলেই স্নান করতে চান।

আলোচ্য উদ্ধৃতিটি পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত 'সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যগ্রন্থের অংশবিশেষ গড়াই নদীর তীরে' শীর্ষক পাঠ্যাংশ থেকে গৃহীত।

পল্লিকবি জসীমউদ্দীন আলোচা পদ্যাংশটিতে গড়াই নদীর পাশে অবস্থিত এক সুন্দর, ছায়া-সুশীতল পল্লিপ্রকৃতির সুন্দর ছবি এঁকেছেন। সেখানে একটি কুটিরকে ঘিরে থাকা বুনো ফুল, মাচার সিম-লতা বা লাউ-কুমড়োর ঝাড়, নানান ফুলের সমারোহ, লাল নটে শাকের আয়োজন সেই কুটিরটিকে অপরূপ করে তুলেছে। কবি গ্রামবাংলার এই চিরপরিচিত দৈনন্দিন রূপটিকে ভুলতে পারেন না। তাঁর মনে হয়েছে, গাছপালা, বুনো ফুল, লতাপাতা-ও সবই যেন পরম মমতায় কুটিরটিকে ঘিরে রেখেছে।

 

পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'গড়াই নদীর তীরে' কবিতা থেকে উদ্ধৃত আলোচ্য পঙত্তিটিতে 'ডাহুক মেয়ে' বলতে স্ত্রী ডাহুক পাখির কথা বোঝানো হয়েছে।

স্ত্রী-ডাহুক মেয়েরা তাদের ছানাদের নিয়ে কুটিরের উঠোনে এসে ঘুরে যায়।

পল্লীবাংলার এই নির্জন প্রকৃতির রাজ্যে, কবির মনে হয়, ডাহুকেরা পরস্পরের মধ্যে নির্ভয়ে গান গেয়ে কথা বলে।

'আখর' শব্দের অর্থ 'অক্ষর'।

পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের গড়াই নদীর তীরে পদ্যটিতে পরিপ্রকৃতির নানা ছবি উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। সেখানে একটি কুটিরকে ঘিরে থাকা সবুজ গাছপালা, লতাপাতা, বুনো ফুলের ছবি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে উঠোনের নটে শাক, এঁদো ডোবা থেকে বেড়াতে আসা ছোটো ছোটো ছানা-সহ মা ডাহুক পাখি, গাছের ডালে পাখি, উঠোনে শুকোতে দেওয়া নানারঙের মশলা এবং ডালের সমারোহের ছবি। মটর, মসুর, কালোজিরে, ধনে, লংকা—এ সবের রং যেন গ্রামের নানা রঙের জীবনচিত্রকেই ফুটিয়ে তুলছে। কবির মনে হয়েছে এই নানান 'আখরে' যেন সেই গৃহস্থ পরিবারটির সুখের কাহিনিটিই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমারও মনে হয়, গড়াই নদীর পাড়ের সেই কুটির সংলগ্ন উঠোনের ছবিটিই সবচেয়ে সুন্দর, যার মধ্য দিয়ে পরিবারটির আনন্দ, সুখ ও স্বচ্ছলতার ছবি ফুটে উঠেছে।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন রচিত 'গড়াই নদীর তীরে' শীর্ষক পাঠ্যাংশ থেকে উদ্ধৃত এই পঙক্তিটিতে নদীতীরের কুটিরের ওপর দিয়ে সবসময় ভেসে যাওয়া মেঘেদের এখানে কিছুক্ষণ থেমে থাকার কথা বলা হয়েছে।

কুটিরটির শান্ত, সুন্দর, স্নিগ্ধ রূপ যেন আকাশের মেঘেরও মনকে হয় করেছে। মেঘের দল যেন আজ নদীতীরের এই ছায়াঘেরা কুটিরের দিকেইত তাকিয়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কবির মুগ্ধতাই যেন মেঘের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

 

জসীমউদ্দীন রচিত 'গড়াই নদীর তীরে' কবিতায় নদীতীরের এই কুটিরটি যেন প্রকৃতির মমতায়, অসীম স্নেহে লালিত। জীবনের সব চাঞ্চল্য, অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব এখানে যেন থেমে গেছে। গাছপালার ছায়ায়, বুনো ফুলের আয়োজনে, সিম-লাউ-কুমড়ো ফুলের দোলায়, নটে শাকের লাল রঙের চেউয়ে সেই কুটিরটি সহজেই সকলের চোখে পড়ে। কুটিরের নির্জন উঠোনে নোংরা ডোবা থেকে ছোটো ছোটো ছানা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মেয়ে ডাহুকেরা। বনের পাখিরা মানুষের বসতির খবর না রেখেই পরম আনন্দে গান শোনার। উঠোনের নরম রোদে মটর, মসুরের ডাল শুকোয়, কালোজিরে, ধনে, লংকা, মরিচ যত্নে সাজানো থাআ,।এইসব বিচিত্র রঙের আলপনা কবিকে মুগ্ধ করে। আকাশের মেঘও তার চলার পথে দুচোখ ভরে এই আশ্চর্য-সুন্দর দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ায়।

‘গড়াই নদীর তীরে' কবিতায় কবি পরম মমতায় গ্রামীণ কুটিরে ছবি এঁকেছেন। তাকে ঘিরে থাকা গাছপালা, বুনো ফুল, পাখি, ডোবায় থাকা ডাহুক পাখি কিংবা সেই কুটিরটির উঠোনের অপূর্ব ছবি যেন চোখের সামনে ফুটে ওঠে। কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার নিজের বাড়ির কথা বারবার মনে পড়ে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার প্রত্যন্ত গ্রাম পরশমণি থেকে কলকাতায় চলে এসেছি কোন্ ছোটোবেলায়। তবু এখনও তার স্মৃতি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে আছে। খড়ে ছাওয়া মাটির ছোটো কুটির। পাশে গোরু-বাছুর থাকার গোয়াল ঘর। পাশে বড়ো মাঠ। সেই মাঠে বর্ষার জল-কাদায় দাপিয়ে ফুটবল খেলা, শীতের দুপুরে ক্রিকেট আর রাতে ব্যাডমিন্টন। মাঠের পাশে দিঘি। দিঘির পাড়ে অনেক খেজুর গাছ। বাড়ির পাশ দিয়েই মাটির সরু রাস্তা। বাড়ি থেকে কিছু দূরে আমাদের পানের বরজ। কত পাখি দেখা যেতো সেখানে। জানি না, আবার কখনও সেই গ্রামে ফিরে যেতে পারবো কি না! এই শহরটাকে কি আমাদের গ্রামের মতো নির্মল করে তোলা যায় না?