ষোড়শ পাঠ ⇒ চন্দ্রনাথ

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'চন্দ্ৰনাথ' গল্পাংশ থেকে প্রশ্নোধৃত মন্তব্যটি নেওয়া হয়েছে। চন্দ্রনাথ স্কুলের পরীক্ষায় জীবনে প্রথমবার দ্বিতীয় হওয়ার ঘটনাকে মেনে নিতে পারেনি। পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকারী হীরুর সাফল্যের পেছনে সে অসাধু চক্রান্তের গন্ধ পায়। পাশাপাশি অঙ্ক  পরীক্ষায় তারই সাহায্য নেওয়া হীরু কীভাবে প্রথম হল সেই প্রশ্নও তোলে সে। এই কারণে সে দ্বিতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে স্কুলে দেয়, যা নিয়ে স্কুলে শোরগোল পড়ে যায়।

চন্দ্রনাথ বাড়িতে বসে নিজের মতো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার সম্ভাব্য ফলাফল তৈরি করে। চন্দ্রনাথের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সে  যদি পরীক্ষায় সাড়ে পাঁচশো বা তার বেশি পায় তবে স্কুলে ফেল করবে। আর সে নিজে যদি পাঁচশো পঁচিশের নীচে পায় তাহলে দশজন ফেল করবে এবং সেক্ষেত্রে কথক নরেশ থার্ড ডিভিশনে পাস করবে। একথা শুনে কথক অত্যন্ত রেগে যান এবং দাম্ভিক চন্দ্রনাথ যেন ফেল করে এই কামনা করেন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'চন্দ্রনাথ' গল্পাংশে চন্দ্রনাথ নিজের পাওয়া সম্ভাব্য নম্বরের অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে  পরীক্ষায় অন্য সকলের নম্বর হিসাব করেছিল। তার তৈরি করা পরীক্ষার ফলাফল নরেশের পছন্দ হয়নি। কারণ সেখানে চন্দ্রনাথ তার থার্ড ডিভিশনে পাস করার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। এ কথায় কথক ক্রুদ্ধ হলে চন্দ্রনাথ বলে যে অনুপাতের আঙ্কিক নিয়মে যার মূল্য যতবারই কষে দেখা যাবে তা একই হবে। এটি ম্যাথম্যাটিক্স বা অঙ্ক বলে চন্দ্রনাথ মন্তব্য করে।

স্কুলের পরীক্ষায় বরাবর প্রথম হওয়া চন্দ্রনাথ দ্বিতীয় পুরস্কার গ্রহণে অসম্মতি জানিয়ে স্কুলে চিঠি দেয়। তার দাদা নিশানাথবাবু ভাইকে ক্ষমা প্রার্থনা করে তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল চন্দ্রনাথ সেই নির্দেশ অমান্য করে। এর জন্য দাদার  সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন করে।
এই ব্যবহারে নির্বিরোধী শান্তপ্রকৃতির মানুষ নিশানাথবাবু নীরবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। বেদনা এবং ক্রোধ মেশানো তাঁর সেই দৃষ্টির কথাই বলেছেন গল্পকথক।

চন্দ্রনাথ স্কুলের পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয় এবং দ্বিতীয় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করায় হেডমাস্টারমশাই গল্পকথক নরুকে তার বাড়িতে পাঠান। ক্ষমা চেয়ে চিঠি প্রত্যাহারের জন্য নিশানাথের দেওয়া নির্দেশ অমান্য করে চন্দ্রনাথ। দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কে ছেদ পড়ে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন দাদা নিশানাথ। এই খবর কথকের মুখে শুনে প্রধান শিক্ষক বলেন যে চন্দ্রনাথের দাদাকে এই বিষয়টি জানানোই তাঁর ভুল হয়েছে।

চন্দ্রনাথ স্কুলের পরীক্ষায় জীবনে প্রথমবার দ্বিতীয় হওয়ার পরে বিদ্যালয়ের সম্পাদক এবং প্রথম স্থানাধিকারী হীরুর কাকা হীরুর মাধ্যমে চন্দ্রনাথকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার কথা বলে পাঠান। কিন্তু চন্দ্রনাথ তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে পাঠায় যে তার পক্ষে তা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে, যে
হীরুকে যথার্থ প্রথম স্থানাধিকারী বলে চন্দ্রনাথ মনে করে না, তারই কাকা তাকে সান্ত্বনা পুরস্কার' দিচ্ছেন –এই অপমান সহ্য করা চন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্ৰনাথ’ কথকের স্কুলজীবনে সহপাঠী ছিল চন্দ্রনাথ। স্কুলের পাঠ শেষ করার দীর্ঘ বছর পরে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কথকের চন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। কিশোরদৃষ্টিতে দেখা কিশে চন্দ্রনাথের ছবি ভেসে ওঠে তাঁর চোখের সামনে। চন্দ্রনাথ ছিল এক দীর্ঘাকৃতি সবল সুস্থদেহের নির্ভীক কিশোর। তা মুখাবয়বের মধ্যেও ছিল অসাধারণত্ব। অদ্ভুত মোটা নাক, সামনা চঞ্চলতাতেই সেই নাকের সামনের দিক ফুলে উঠত। বড়ো বড়ে চোখ, চওড়া কপাল আর কপালের মাঝখানে শিরা ফুলে তৈরি হওয়া এক ত্রিশূল চিহ্ন। সামান্য উত্তেজনাতেই রক্তের চাপ প্রবল  হয়্কয পালের সেই ত্রিশূল চিহ্ন মোটা হয়ে ফুলে উঠত। বৈশিষ্ট্য ছিল। সে তার শ্রেষ্ঠত্বের গরিমাকে কখনও বিসর্জন চেহারার মতো আচরণের ক্ষেত্রেও চন্দ্রনাথের কিছু  রাজি ছিল না। প্রতিভা তার মধ্যে যেমন বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল তেমনি অহংকারেরও প্রকাশ ঘটিয়েছিল। বিদ্যালয়  জ্ঞানের উদাহরণ হয় তাহলে হেডমাস্টারমহাশয়কে ‘গুরুদক্ষিণার  সম্পাদকের বিশেষ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান যদি তার আত্মমর্যাদা যুগ নেই আর বলার মধ্যে এক ধরনের ঔদ্ধত্য কাজ করে  না  চন্দ্রনাথ। সে হীরুর বাড়িতে আয়োজিত প্রীতিভোজে হাজির বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায়ও হীরুর প্রথম হওয়া মানতে পারে।  হয় না বরং চিঠি লিখে জানিয়ে যায় যে হীরু স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য উৎসব না করলেই পারত। আসলে শ্রেষ্ঠত্বের যে অহংকারকে সে মনের মধ্যে লালন করত সেখান থেকে পরে আসা চন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ তার কপালের মাঝখানে শিরা দিয়ে তৈরি হওয়া ত্রিশূলে তেজ সঞ্চারিত করার যথেষ্ট উপকরণ চন্দ্রনাথের স্বভাবের ও চরিত্রের মধ্যেই নিহিত ছিল।