সপ্তম পাঠ ⇒ নোঙর

যে স্বপ্নময় রূপকথার দেশের কল্পনা কবির মনকে প্রতি মুহূর্তে চঞ্চল করে তোলে, বাস্তবে কবির পক্ষে সেখানে পৌঁছোনো সম্ভব হয় না। তবু কবির সুদূরের পিয়াসি মন আশায় বুক বেঁধে সারারাত ধরে কল্পনার জাল বুনে চলে। কিন্তু কবির সচেতন সত্তা জানে, 'নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে'। জীবনের নৌকা দায়দায়িত্বপূর্ণ কর্মমুখর সংসারে বাঁধা পড়েছে। সে নৌকা আর চলবে না। তাই দাঁড় টানা বৃথা।

কখনমুক্ত জীবনের খোঁজে কবি দূর সিন্ধুপারে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনভর কর্মময় বাস্তবতার নোঙরে বাঁধা পড়েছে। জোয়ারের ঢেউগুলি কবির নৌকায় যা দিয়ে সমুদ্রের দিকে চলে যায়। সেই সমুদ্রের দিকে কবিও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সংসারের কখনে তিনি আবদ্ধ। কবির স্থিতিশীল জীবনে গতিশীল ঢেউগুলি নানা স্বপ্ন -ইচ্ছে-কল্পনার প্রতীক। কবির জীবন-নৌকাকে কখন মুক্ত করতে চেয়ে তারা ব্যর্থ হয়ে মাথা ঠুকে সমুদ্রের দিকে ছুটে চলে।

জোয়ারের ফলে নদীর জল ফুলে ওঠে আর ভাটা এলে সেই জল নেমে যায়। জোয়ারের স্রোতের প্রবল শক্তিকে দুর্বল করে ভাটার টান। কবির জীবনতরি বাঁধা সংসারের ঘাটে। তাঁর আকুল হৃদয় চায় সাতসাগরে পাড়ি জমাতে। কবির বুকে এক কখনমুক্ত উদ্দাম জীবনের আশা জাগে। সে আশা জোয়ারের ঢেউয়ের মতো ফুলে ফুলে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবের অভিঘাতে ভাটার শোষণের মতো কবির আশা-উৎসাহ দমিত হয়।।

বাণিজ্য বা ব্যাবসার সঙ্গে লাভলোকসানের বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। জীবিকার জালে আটকে পড়েছে আমাদের জীবন। প্রাচীন ও মধ্য যুগে সওদাগররা বাণিজ্যতরি নিয়ে পাড়ি দিতেন দূর দেশে। পণ্যের আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে | সংস্কৃতিরও আদানপ্রদান চলত। কবি সাধারণ সদাগর নন, তাই তাঁর তরিতে রয়েছে সাহিত্যসম্ভার। সেই স্বপ্ন-কল্পনা-সাহিত্য ভরা তরি নিয়ে কবি পাড়ি দিতে চান সাতসমুদ্র পারে, দূরদূরান্তে ছড়িয়ে দিতে চান তাঁর সৃষ্টিকে। তাই এখানে বাণিজ্যতরির প্রসঙ্গ এসেছে।

মানুষ মূলত সামাজিক ও সাংসারিক জীব। সমাজ সংসারের কর্তব্য ও দায়িত্বের বন্ধনে সে সবসময় জড়িয়ে থাকে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন কর্মময়। বাস্তবের সংঘাতে জীবনের অনেক স্বপ্ন-কল্পনাই অপূর্ণ থেকে যায়। কবির জীবন ও বাস্তব সংসারের বন্ধনে চিরকাল বাঁধা। কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষের একটা কল্পনাপ্রবণ মন থাকে যে মন বারবার বাস্তবের বখ ছিন্ন করে দূর অজানায় পাড়ি দিতে চায়। কবির জীবনতরি সংসারের তটের কিনারে বাস্তবের দায়িত্ব-কর্তব্যের নোত্তরে চিরকাল বাঁধা।

কবি নৌকা নিয়ে দূর সমুদ্রপারে পাড়ি দিতে চান। কিন্তু তাঁর সেই নৌকো তটের কিনারে নোঙরে বাঁধা পড়ে গেছে। কবির মন বাধা অগ্রাহ্য করে দাঁড় নিক্ষেপ করে চলে। প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে যে শব্দ ওঠে তা যেন স্রোতের ঠাট্টা-উপহাস। স্রোত গতিশীল, কিন্তু কবির জীবনতরি আটকা পড়ে আছে। কবি চাইলেও সাংসারিক বন্ধন ছিন্ন করে সুদুরের আহ্বানে নৌকা ভাসাতে পারছেন না। তাই স্রোত কবির স্থিতিশীলতাকে বাবিদ্রূপে বিদ্ধ করে চলে।

প্রতিটি সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রেই নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিরোনামের মাধ্যমে লেখাটি সম্পর্কে পাঠকের মনে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়। শিরোনামে কবিতার মূলভাব বা ব্যঞ্জনার আভাস পাওয়া যায়। বেশিরভাগ কবিতার নামকরণ ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে থাকে। অজিত দত্তের 'নোঙর' কবিতাটির নামকরণও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ফারসি শব্দ ‘লঙ্গর’ থেকে আগত 'নোঙর' শব্দটির অর্থ নৌকা বেঁধে রাখার ভারী বস্তুবিশেষ। শিকল বা কাছির সঙ্গে লোহার নোঙর বেঁধে জলের নীচে ফেলে কাছির আর এক প্রান্ত দিয়ে নৌকা প্রভৃতি জলযান বেঁধে রাখা হয় ।

আলোচ্য কবিতাটিতে কবি নৌকা নিয়ে সুদূর সমুদ্রে পাড়ি দিতে চান, কিন্তু কখন যেন তাঁর নৌকার নোঙর পড়ে গেছে তটের কিনারে

“পাড়ি দিতে দূর সিন্ধুপারে

নোঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে।”

তাই মাস্তুলে পাল বেঁধে দাঁড় টানলেও নৌকা এগোয় না। মানুষের জীবনও নৌকার মতো—সম্পর্কের, কর্মের, দায়িত্ব কর্তব্যবোধের নোঙরে তা বাঁধা পড়ে থাকে। যাঁরা ভাবুক, সৃষ্টিশীল, রোমান্টিক, তাঁরা সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে চলে যেতে চান বাস্তব থেকে অনেক দূরের জগতে। কিন্তু তা সম্ভব না হলে মনের মধ্যে বাস্তব আর কল্পনার জগতের সংঘাত শুরু হয়। কবির সৃষ্টিশীল মনেও এমন সংঘাত চলে আজীবন। তাঁর কবিসত্তা মেনে নিতে চায় না দৈনন্দিন জীবনযাপনের সীমাবদ্ধতা, সীমা থেকে বেরোনোর জন্য ছটফট করে। সাংসারিক কখন থেকে মুক্তি সম্ভব নয় জেনেও কবি হার মানেন না----

" সারারাত নিছে দাঁড় টানি

মিছে পাড় টানি।”

আলোচ্য কবিতাতে এভাবেই 'নোঙর' হয়ে উঠেছে জীবনের যখনের প্রতিশব্দ। তাই শিরোনামটি অত্যন্ত বাঞ্ছনাধর্মী এবং যথাযথ ।

শাদা মেঘ কালো পাহাড়' কাব্য সংকলনের অন্তর্গ 'নোঙর' কবিতায় অজিত দত্ত তাঁর কবিজীবনের অতৃপ্তির কথা বলেছেন। কবি তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে পূর্ণ নৌকা নিয়ে সাতসাগর পেরিয়ে পাড়ি দিতে চেয়েছেন সুদূর কোনো দেশে। সাতসাগরের পারে কোন অচেনা-অজানা বিস্ময় হয়তো তাঁর অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু তটভূমির কাছে তাঁর নৌকার নোঙর পড়ে গেছে তাঁর অজান্তে। কবির জীবনের নানা স্বপ্ন ইচ্ছে-কল্পনার প্রতীকস্বরূপ জোয়ারের ঢেউগুলি তাঁর নৌকায় আঘাত করে সমুদ্রের দিকে ছুটে চলে যায়। সেই সমুদ্রে কবিও যাত্রা করতে চেয়েছিলেন। ভাটার টানে খানিক বাদেই সেই প্রবল স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবরূপী তটের কাছে এই জীবনটাও যেন জোয়ারভাটায় বাঁধা। কখনও আশার জোয়ার, কখনও নিরাশার ভাটা। কবি তবু সারারাত অবিরত দাঁড় টেনে চলেন। বৃদ্ধা এই দাঁড় টানা জেনেও কবি নিজের মনকে নিরস্ত করতে পারেন না।

কবির স্বপ্ন-কল্পনা-উদাসী মন এক জায়গায় বাঁধা পড়ে থাকতে চায় না। এক বন্ধনমুক্ত জীবনের খোঁজে সে পাড়ি দিতে চায় দূর সমুদ্রে। কিন্তু কবি সাংসারিক মানুষ। জীবন-জীবিকার শর্তে তাঁকে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে থাকতে হয়। নানা ধরনের সম্পর্কের কখন, কাজের কখন, দায়িত্ব-কর্তব্যের বেড়াজাল কবির জীবননৌকাকে নোঙরের কাছিতে বেঁধে রেখেছে। তবু সুদূরের হাতছানি তাঁকে উতলা করে, বৃথা চেষ্টার বিফলতা তাঁকে হতাশ করে। এভাবেই সৃষ্টিশীল মানুষ বাস্তব ও কল্পনার সংঘাতে নিরন্তর ক্ষতবিক্ষত হন। সীমা-অসীমের, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির, বন্ধনমুক্তির এই খেলায় কবির জীবনের মুহূর্ত তথ্য দিনগুলি পার হয়ে যায়।

বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকে 'কল্লোল' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে আবির্ভূত কবিগোষ্ঠীর অনেকের কবিতায় ছিল পাশ্চাত্যের প্রভাব এবং মূঢ় বাস্তবের ছবি। সেই সময়ের কবি অজিত দত্তের ছিল বাস্তব জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূরপিয়াসি স্বপ্ন-কল্পনাময় এক রোমান্টিক মন। বাস্তবের সীমাবদ্ধ জীবনে কবি পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাননি। অচেনা-অজানা সুদুর তাঁকে হাতছানি দেয়, আকুল করে তোলে। কবি পাড়ি দিতে চান সাতসাগরের পারে, কিন্তু তাঁর নৌকা তটের কিনারে নোত্তরে বাঁধা পড়েছে। সংসারের বিভিন্ন দায়িত্ব কর্তব্যে তাঁর দৈনন্দিন জীবন বাঁধা। কবির রোমান্টিক মন সমস্ত কখন ছিঁড়ে ছুটে যেতে চায় স্বপ্ন-কল্পনার মায়াবী জগতে, কিন্তু পারে না। তাই কবির আক্ষেপ------

পাড়ি  দিতে নুর সিন্ধুপারে

নোঙর গিয়েছে পড়ে অটো কিনারে।

জোয়ারের ঢেউগুলি যেন কবির স্বপ্ন ইচ্ছে-কল্পনার প্রতীক হয়ে নৌকায় মাথা ঠুকে সমুদ্রে চলে যায়, যে সমুদ্রে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন কবিও। প্রতিবার নীড়ের নিক্ষেপে কবি শোনেন 'স্রোতের বিদ্রূপ'। বাস্তবের তটে জীবিকার তাগিদ, সম্পর্কের মায়া আর হাজার প্রয়োজনীয় কাজের কখনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা তাঁর এই জীবননৌকা। তাই মন চাইলেও সাংসারিক বন্ধন ছিন্ন করে সুদুরের আহবানে নৌকা ভাসাতে পারেন না কবি। তাই কবি বেদনাতুর কণ্ঠে বলে ওঠেন—

যতই না দাঁড় টানি যতই মালে বালি পাল,

নোত্তরের কাছি বাঁধা তবু এ নৌকা চিরকাল।”

কবিমনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রাপ্তির এই ফারাক, জীবনের অপূর্ণতার বেদনা আলোচ্য কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে।

সারারাত নিয়ে দাঁড় টানি

মিছে দাঁড় টানি।