সপ্তম পাঠ ➤ অভিষেক

লঙ্কার প্রমোদ কাননে অবস্থানকালে ইন্দ্রজিতের কাছে ছদ্মবেশী লক্ষ্মীর উপস্থিতি ছিল আকস্মিক। কেন না, এমন সময় ও স্থানে তাঁর আগমন ইন্দ্রজিতের অভিপ্রেত ছিল না। সেই কারণেই মেঘনাদের মনে আশঙ্কা জাগে যে, হয়তো কনকলঙ্কার কোনো বিপদ হয়েছে। তা না হলে লক্ষ্মীর আগমন ঘটত না। কৌতূহলী ইন্দ্রজিৎ তাই ধাত্রীর চরণে প্রণাম জানিয়ে লঙ্কার কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন।

মেঘনাদের ধাত্রী রার ছদ্মবেশে এসে রা শুনিয়েছিলেন স্বর্ণলঙ্কার করুণ পরিণতির কথা। রামচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধে নিহত হয়েছেন মেঘনাদের অগ্রজ বীরবাদ। তাঁর শোকে আকুল হয়ে লঙ্কাধিপতি রাবণ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বা কারনই বাঁশূন্য দশা যে আজ স্বয়ং রাজাকে যুদ্ধের জন্য যাত্রা করতে হয়। এইভাবে আক্ষেপের মতো করেই প্রকার দুরবস্থার বর্ণনা দিয়েছিলেন ছদ্মবেশী রমা বা লক্ষ্মী।

রামচন্দ্রের হাতে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ইজিকে দেন। ইন্দ্রজিতের কাছে এ ঘটনা ছিল অবিশ্বাস্য, কারণ এর আগেই যুদ্ধে শত্রুদলের উপরে প্রবল পর নিক্ষেপ করে ইন্দ্রজিৎ র করে কেটে ফেলেছেন। যুদ্ধ জয় করার আনন্দে তিনি প্রমান সে সবে বিলাসে মত্ত হয়েছিলেন। হঠাৎ এই খবর তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত। তাই লক্ষ্মীর কথা তাঁর 'অদ্ভুত' লেগেছে এবং তিনি বিস্মিত হয়েছেন।

, বীরচূড়ামণি বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদের কথাই এখানে বলা হয়েছে। * ইতিপূর্বেই ইন্দ্ৰজিৎ নিশারণে রঘুপতি রামচন্দ্রকে হত্যা করেছেন। অথচ ধাত্রীরূপী লক্ষ্মী রামচন্দ্রের হাতে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ এনেছেন। মৃত মানুষ কখনও বেঁচে উঠতে পারে না। তাই মৃত রামচন্দ্রের পক্ষে বীরবাহুকে হত্যা করা সম্ভব নয়। এই কারণেই বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ইন্দ্রজিতের কাছে 'অদ্ভুত' মনে হয়েছে।

রামচন্দ্র পুনর্জীবন লাভ করে তাঁরই ভাই বীরবাহুকে বধ করেছেন, ফলে পিতা রাবণের শোকাকুল অবস্থা আর তিনি। প্রমোদবিলাসে মত্ত – এই কথা মনে করে মেঘনাদ নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন। হাতের ফুলরাশি ছিঁড়ে ফেলেছেন, সোনার বালা দূরে ফেলে দিয়েছেন, পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে কুণ্ডল। এভাবে ক্রোধের মধ্য দিয়ে ইন্দ্রজিৎ রাক্ষসকুলের অপবাদ দূর করার জন্য শপথ গ্রহণ করেন।

আলোচ্য পত্তিটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' পদ্যাংশটি থেকে উদ্ধৃত। 'কুমার' বলতে এখানে ইন্দ্রজিৎকেই বোঝানো হয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ লঙ্কার প্রমোদকাননে বিলাসকলায় মত্ত ছিলেন। এই অবসরে রঘুপতি রামচন্দ্র বীরবাহুকে যুদ্ধক্ষেত্রে হত্যা করেছেন। যখন শত্রুসেনা লঙ্কাকে ঘিরে ফেলেছে তখন তিনি বিলাসকলায় মত্ত—এই কথা ভেবেই ইন্দ্রজিৎ নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন।

বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ লঙ্কার প্রমোদকাননে বিলাসকলায় মত্ত ছিলেন। এই অবসরে রঘুপতি রামচন্দ্র বীরবাহুকে হত্যা করেন। শত্রুদল লঙ্কাপুরীকে ঘিরে ফেলেছে, অথচ ইন্দ্রজিৎ প্রমোদ-উদ্যানে সুখবিলাসে মত্ত। নিজের এই আচরণকেই তিনি অপবাদ মনে করেছেন। এই অপবাদ দূর করার জন্য ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়েছেন। যেঘরণ রথ, যার চাকায় বিদ্যুতের ছটা: ইন্দ্রধনুর মতো স্বপ্নভ রাক্ষস পতাকা এবং অশ্ববাহিনী নিয়ে ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছেন।

ইন্দ্রজিতের যুদ্ধসজ্জার প্রস্তুতিকে কবি তুলনা করেছেন উমার পুত্র দেবসেনাপতি কার্তিকের তারকাসুর বধকালে কিংবা বিরাটরাজের গৃহে বিরাটপুরকে সঙ্গে নিয়ে বৃহন্নলারূপী অর্জুনের ঘোষন উত্থারের জন্য কৌরবদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতির সঙ্গে। ইন্দ্রজিতের রম ছিল মেঘবর্গ, চক্রে ছিল বিজলির ছটা, জ ইন্দ্রধনুর মতো আর অশ্বেরা ছিল দ্রুতগতি। সেই রথের উড়ে চলা যেন মৈনাক পর্বতের মতো। ইন্দ্রজিতের ধনুকের চীৎকারে সারা পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত 'অভিষেক' পদ্যাংশ থেকে গৃহীত আলোচামান উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন ইন্দ্রজিতের পত্নী প্রমীলাদেবী। » বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদে ইন্দ্রজিৎ চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। তিনি যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত। এতক্ষণ তিনি প্রমোদকাননে প্রমীলার কাছেই ছিলেন। রণক্ষের ভয়ানক, সেখানে প্রাণহানির আশরা থাকে। তাই প্রমীলা ইন্দ্রজিৎকে যুগ্মযাত্রায় বাধা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গেই প্রমীলা মন্তব্যটি করেছেন।

বীরবাহুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধযাত্রা করলে প্রমীলা বলেন, “তবে কেন তুমি, গুণনিধি, তাজ কিঙ্করীরে আজি?" এর উত্তরে ইন্দ্রজিৎ বলেন যে, ভালোবাসার যে দৃঢ় কখনে প্রমীলা তাঁকে বেঁধেছেন, তা কেউ খুলতে পারবে না। প্রমীলার কল্যাণেই ইন্দ্রজিত যুদ্ধ জয় করে আবার ফিরে আসবেন। হাসির মাধ্যমে ইন্দ্রজিত বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রমীলার অভিযোগ বা আশঙ্কা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আর তিনি নিবিজয়ী বীর, তাই সামান্য মানব রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করাটা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়।

অনুজ বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ শুনে মেঘনাদ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নেন। তাঁর রথ সোনার পাখা বিস্তার করা মৈনাক পর্বতের মতো আকাশকে উজ্জ্বল করে বায়ুপথে প্রবল শব্দে চলতে থাকে। ধনুকের ছিলায় টান দিতেই টংকারধ্বনি ওঠে, অনেকটা মেঘের মধ্যে পক্ষীন্দ্রের চিৎকারে মতোই আওয়াজ হয়। অর্থাৎ আকাশপথে উড়ে চলতে চলতে গরুড় যেন গর্জন করে উঠেছে বলে মনে হচ্ছিল। আর তাতেই লঙ্কা এবং সমুদ্রে কম্পন সৃষ্টি হয়।

 

পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে শোকাকুলতা কাটিয়ে রাবণ যুদ্ধসজ্জার প্রস্তুতি নেন, বীরমদে মত্ত হয়ে ওঠেন। যুদ্ধের বাজনা বেজে ওঠে, হাতিরা গর্জন করে, অশ্বেরা হ্রেষাধবনি করে, পদাতিক, রখী ইত্যাদি রাবণের চতুরঙ্গ বাহিনীও হুংকারধ্বনি করে, রেশমবস্ত্রের রাজপতাকা আকাশে উড়তে থাকে, সঙ্গে দীপ্তি, ছড়ায় স্বর্ণবর্ণের আভা। সব মিলিয়ে চারিদিকে এক বীরোচিত পরিবেশ | সেখানে যুদ্ধসাজে সবাই সজ্জিত হয়ে উঠেছে।

লঙ্কার রাক্ষসবাহিনীকে 'করদল' বলা হয়েছে। » লঙ্কেশ্বর রাবণ যুদ্ধসজ্জায় সজ্জিত হচ্ছেন। তাঁর সৈন্যবাহিনীও রণমদে মত্ত। এই সময় ইন্দ্রজিৎকে দেখে তারা উল্লসিত হয়েছে। করাণ ইন্দ্রজিতের রণকৌশল এবং বীরত্ব সম্পর্কে তারা অবহিত। স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকে তিনি পরাজিত করেছেন। লঙ্কার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা তিনি। তাই তাঁকে পেয়ে রাক্ষসবাহিনী উৎসাহ এবং গর্ববোধ করেছে।

 

মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত 'অভিষেক' শীর্ষক কবিতায় রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশে আসা ‘লোকমাতা' রমা, অর্থাৎ লক্ষ্মীকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্যটি করেছেন।

বীরবাহুর মৃত্যুর পরে লঙ্কার যে বিপর্যয় ঘনিয়ে এসেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণলঙ্কায় ইন্দ্রজিৎকে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে লক্ষ্মী প্রমোদ-উদ্যানে যান। তখনই প্রমীলার সঙ্গে বিহারে রত ইন্দ্রজিৎ ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে আসা লক্ষ্মীকে দেখে মন্তব্যটি করেন। তিনি জানতে চান, এমন কী ঘটনা ঘটল, যার ফলে ইন্দ্রজিতের কাছেই তাঁকে স্বয়ং আসতে হল।

→ ছদ্মবেশী লক্ষ্মী ইন্দ্রজিৎকে জানান যে, স্বর্ণলঙ্কার দশা বর্ণনার অতীত। ঘোর যুদ্ধে তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং এই মৃত্যুতে রাক্ষসাধিপতি রাবণ গভীরভাবে শোকগ্রস্ত রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তিনি সৈন্য-সহ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর কাছে পরাজিত ও নিহত রামচন্দ্র কীভাবে পুনর্জীবন লাভ করে বীরবাহুকে নিহত করল—এ কথা ভেবে ইন্দ্রজিৎ যখন বিস্মিত তখন লক্ষ্মী তাঁকে বলেন যে, রামচন্দ্র ‘মায়াবী মানব'। রাক্ষসকুলের মর্যাদা রক্ষার জন্যই তাঁর শীঘ্র লঙ্কায় যাওয়া উচিত। বস্তুত, এখানে এই লক্ষ্মী স্বয়ং স্বর্ণলঙ্কার প্রতিষ্ঠাতা দেবী, রাজলক্ষ্মী। তাই লঙ্কার ঘোর দুর্দিনে তিনি লঙ্কার বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিতের কাছে এসেছেন, ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে পাঠানোর অভিপ্রায়ে |

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য থেকে সংকলিত 'অভিষেক' নামক কাব্যাংশে প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশ ধারণ করে লক্ষ্মী প্রমোদকাননে ইন্দ্রজিতের কাছে এসে তাকে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ জানান। এই বার্তাকেই ইন্দ্ৰজিৎ 'অদ্ভুত' বলে অভিহিত করেছেন। ইন্দ্রজিতের কাছে রামচন্দ্রের হাতে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। কারণ, এর আগে দু-বার রামচন্দ্র তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছেন। নিশা-রণে তিনি রামচন্দ্রকে বধ করেছেন। শত্রুসৈন্যে শরনিক্ষেপ করে রামচন্দ্রকে হত্যার পরেও কীভাবে সেই রামচন্দ্রই বীরবাহুকে হত্যা করেছিলেন, তা ইন্দ্রজিতের কাছে চরম বিস্ময়ের মনে হয়েছে। তাই এই ঘটনাকে তিনি 'অদ্ভুত' বলেছেন। > “নিজদোষে মজে রাজা লঙ্কা- অধিপতি” – এই যুক্তিতে লক্ষ্মী লঙ্কা ত্যাগ করে বৈকুণ্ঠধামে ফিরে যেতে চান। তার আগে তিনি ইন্দ্রজিৎকে লঙ্কায় ফেরত নিয়ে আসতে চান। 'প্রাক্তনের ফল'অর্থাৎ নিয়তির বিধান কার্যকর করার জন্যই এই উদ্যোগ। এই উদ্দেশ্য নিয়েই মেঘনাদধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে লক্ষ্মী প্রমোদ উদ্যানে মেঘনাদের কাছে যান এবং তাঁকে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দেন। তাঁর লক্ষ ছিল লঙ্কার দুর্দশা এবং পিতা রাবণের শোকে ইন্দ্রজিৎকে অস্থির করে তাঁকে লঙ্কায় আসতে বাধ্য করা।

মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ 'অভিষেক'-এ ইন্দ্ৰজিৎ যখন প্রমোদকাননে বিলাসে মত্ত তখনই লক্ষ্মী সেখানে আসেন এবং তাঁকে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দেন। ইন্দ্রজিতের মনে হয়, রাক্ষসবংশের গৌরবকে বিনষ্ট করে রামচন্দ্রের সৈন্যরা যখন লঙ্কাকে বেষ্টন করে রয়েছে, তখন নারীসান্নিধ্যে সময় কাটানোর ঘটনা গ্লানিকর। উপরন্তু, তিনি লক্ষ্মীর মুখ থেকে এ-ও জানতে পারেন যে, তিনি প্রমোদকাননে মত্ত থাকায় তাঁর পিতা স্বয়ং যুদ্ধসজ্জা করছেন। তাঁর মতো উপযুক্ত এবং বীর পুত্র বেঁচে থাকতেও রাজা রাবণকেই যদি যুদ্ধযাত্রা করতে হয়, তবে তা অত্যন্ত মানহানিকর। রাবণের পুত্র হিসেবে তাঁর নিজের এই আচরণ ইন্দ্রজিৎ মেনে নিতে পারেননি। তাই একেই তিনি 'অপবাদ' বলেছেন। শত্রুসৈন্যদের বধ করে ইন্দ্রজিৎ এই অপবাদ দূর করতে উদ্যোগী হন। বীরের সজ্জায় তিনি সজ্জিত হয়ে ওঠেন। মেঘবর্ণ রথ, চক্রে বিজলির দীপ্তি, ইন্দ্রধনুর ন্যায় উজ্জ্বল রথের পতাকা, দ্রুতগতির অশ্ববাহিনী—এইসব নিয়েই সেজে উঠেছিলেন ইন্দ্রজিৎ। তীব্র রোষে যখন ধনুকে টংকার দিয়েছিলেন, মনে হয়েছিল যেন মেঘের মধ্যে গড়ুর পাখি চিৎকার করে উঠছে। বীরভাবের এই আদর্শ তুলে ধরার মধ্যেই ইন্দ্রজিতের অপবাদ ঘোচানোর প্রয়াস লক্ষ করা যায় ।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশে বীরবাহুর মৃত্যুর পরে লঙ্কার মর্যাদা পুনরুদ্ধারে ইন্দ্রজিৎ বীরসজ্জায় সজ্জিত হয়ে ওঠেন।

ইন্দ্রজিতের যুদ্ধসজ্জার বর্ণনা দিতে গিয়ে দুটি পৌরাণিক প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন কবি—

প্রসঙ্গ ১ : কার্তিকেয় কর্তৃক তারকাসুর বধের প্রসঙ্গ। তারকাসুরের অত্যাচারে বিপন্ন দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে ব্রহ্মা বিধান দেন যে, শিবের ঔরসজাত সন্তানই তাকে বধ করতে পারবে। ছ-জন কৃত্তিকার গর্ভে শিবের ছয় সন্তানের জন্ম হলেও তাঁদের মিলিত করে এক পুত্র সৃজিত হয়, নাম হয় কার্তিকেয় | দেবী বসুন্ধরা তাঁকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তিনি দেবসেনাপতি পদে নিযুক্ত হন ও তারকাসুরকে নিহত করেন ।

প্রসঙ্গ ২ : অর্জুনের গোধন উদ্ধারের প্রসঙ্গ। পাণ্ডবেরা যখন বিরাটের গৃহে অজ্ঞাতবাসে ছিলেন, সেই সময় কৌরবরা বিরাটের গোধন হরণের জন্য তার রাজ্য আক্রমণ করেন। বিরাট যুদ্ধে। পরাজিত এবং বন্দি হলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন বিরাটপুত্র উত্তরের রথের সারথি হয়ে গোধন রক্ষা করতে যান। কুরুসৈন্যের সংখ্যা দেখে ভীত উত্তর পালাতে চাইলে অর্জুন তাকে ছদ্মবেশ নেওয়ার সময়ে যে শমীবৃক্ষে অস্ত্রাদি গোপনে রেখেছিলেন সেখানে নিয়ে যান। এবং সেগুলি গ্রহণ করে ক্লীববেশ ত্যাগ করে বীরবেশে সজ্জিত হয়ে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যান।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত 'অভিষেক' নামক কাব্যাংশে ছদ্মবেশী লক্ষ্মীর কাছে রামচন্দ্রের দ্বারা বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ শুনে ইন্দ্রজিৎ ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে লঙ্কার রাজসভার উদ্দেশে যাত্রা করেন। ইন্দ্রজিৎ যখন রথে আরোহণ করছেন তখনই সেখানে তাঁর স্ত্রী প্রমীলার আবির্ভাব ঘটে। তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য তিনি ইন্দ্রজিতের প্রতি অনুযোগ করেন। ইন্দ্রজিৎ-বিহনে তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকাই যে সম্ভব নয়, তাও বলেন। গহন অরণ্যে হাতির পায়ে লতা বাঁধলে মাহুত তাতে মন না দিলেও হাতি তাকে ত্যাগ করে না। অথচ, লতা অতি ক্ষুদ্র, পরজীবী, নেহাৎ তুচ্ছ। তবু হাতি তাকে পা থেকে সরিয়ে ফেলে না। তার পায়ে সেই লতার কখন জড়িয়ে থাকে। এভাবেই ইন্দ্রজিতের তাঁকে ছেড়ে যাওয়াকে অনুচিত কর্ম বলে বোঝাতে চান প্রমীলা।

→ প্রমীলাকে সান্ত্বনা দিতে ইন্দ্রজিৎ বলেন যে, প্রমীলা যে দৃঢ় কখনে তাঁকে বেঁধেছেন তা খোলার ক্ষমতা কারোরই নেই। একই সঙ্গে। ইন্দ্রজিৎ বলেন যে প্রমীলার কল্যাণের জন্যই রাঘবকে নাশ করে তিনি শীঘ্র প্রমীলার কাছে ফিরে আসবেন। এই বলে ইন্দ্রজিৎ প্রমীলার কাছে বিদায় প্রার্থনা করেন।