সপ্তম পাঠ

উঃ-এখানে বর্ষামঙ্গল উৎসব উপলক্ষ্যে গানের কথা বলা হয়েছে।

কলকাতা শহরের মতো ব্যস্ত এবং ইট-কাঠের জঙ্গলে গান জমে না। কারণ ভালো গান পরিবেশনের জন্য ভালো পরিবেশের দরকার। তাই কবির মতে, শান্তিনিকেতনে যেভাবে বর্ষামঙ্গল জমে ওঠে, কলকাতা শহরে তা জমে ওঠা সম্ভব নয়।

উঃ-রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা রাণুর উদ্দেশে কবি এ কথা লিখেছেন।

‘ওখানে’ বলতে শান্তিনিকেতনের কথা বলা হয়েছে।

উঃ-শান্তিনিকেতনের মাঠ প্রশস্ত, বিরাট। সেখানে বৃষ্টির ছায়ায় আকাশের আলো করুণ হয়, ঘাসেরা আনন্দ পায়, গাছেরা মাথা পেতে বৃষ্টির আনন্দ অনুভব করতে চায়। |

উঃ-‘আজ’ বলতে যে দিনটির কথা বলা হয়েছে সেটি হল ২৯ আষাঢ়, ১৩২৯ বঙ্গাব্দ।

‘সে’ বলতে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলা হয়েছে।

কলকাতার বদ্ধ পরিবেশ দিনেন্দ্রনাথের একেবারে পছন্দ নয়। তাই তিনি কলকাতা শহর ত্যাগ করে চলে যেতে চান। কলকাতার বর্ষার চেয়ে শান্তিনিকেতনের বর্ষাকাল তাঁর কাছে অনেক বেশি প্রিয়। তাই তিনি শান্তিনিকেতন চলে যেতে চান।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলাদেশের আত্রাই নদীর উপর দিয়ে বোটে করে যাচ্ছিলেন তখন তার সৌন্দর্য কবির ভালো লাগে। আত্রাই নদীটির স্রোত আছে, শ্যাওলা ভেসে চলে জলের সঙ্গে। নদীর দু-পাশে গ্রাম। এই গ্রামগুলির ঘরের উঠোন পর্যন্ত নদীর জল পৌঁছে গিয়েছে। গ্রামগুলি ঘন বাঁশের ঝাড়ে ঢাকা। আম, কাঁঠাল, তেঁতুল, কুল, শিমুল গাছের জঙ্গল গ্রামগুলিকে আচ্ছন্ন করেছে। নদীর দুই তীর বরাবর সবুজ ধানের খেত, নতুন ধান গাছের মাথা জেগে থাকে জলের উপরিতলে। নদীর দু-পাশের ঘন সবুজের আভা কবির চোখকে স্পর্শ করে তাঁর দেহে-মনে প্রবেশ করেছে। এই সবুজের রাজ্যের মধ্য দিয়ে ছোট্ট গেরুয়া আত্রাই নদীটি বয়ে চলেছে এবং এই সমস্ত পরিবেশের উপর সন্ধ্যাকালীন ঘন কালো বর্ষার মেঘ আধো আলো, আধো অন্ধকারে জেগে থেকে ছায়া ফেলেছে রবীন্দ্রনাথের মনে।

উঃ-কলকাতায় না এলে কবি-লেখক রবীন্দ্রনাথের খাতায় অনেক নতুন নতুন বর্ষার গান লেখা হত।

কলকাতায় এসে রবীন্দ্রনাথের গান লেখা কমে গিয়েছে। কারণ গান লিখতে গেলে যে মনোরম পরিবেশ দরকার, প্রকৃতির সাহচর্য দরকার, কলকাতার ইট-কাঠের জঙ্গলে তা নেই। তাই রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় এলে নতুন গান লিখতে পারেন না। যদি তিনি শান্তিনিকেতনে থাকতেন তবে তিনি অনেক নতুন নতুন বর্ষার গান লিখতে পারতেন। তাই তিনি বলেছেন কলকাতায় না এলে তাঁর গানের খাতায় নতুন বর্ষার গান অনেক বেশি জমে উঠত।

উঃ-এখানে রবীন্দ্রনাথ যখন আত্রাই নদীতে নৌকা করে যাচ্ছিলেন তখনকার কথা বলা হয়েছে।

আত্রাই নদীর কোল বর্ষার মেঘে অন্ধকার হয়ে আসে। নদীর দুই পাশে কাঁচা ধানের খেত জলে ডুবে আছে, কচি ধানের মাথা জেগে আছে জলের উপরিতলে। সূর্যাস্তের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে বৃষ্টির মাঝে। এইরকম বৃষ্টির দিনে রবীন্দ্রনাথের একটি গান লেখার জন্য ইচ্ছা হয়, কিন্তু বাইরের প্রকৃতির সৌন্দর্য তাঁকে এতটা আকৃষ্ট করে যে, তিনি খাতার দিকে চেয়ে গান লিখতে রাজি নন। তাই তিনি বলেছেন যে, খাতার দিকে তাকানোর সময় তাঁর নেই।

উঃ-শান্তিনিকেতন : শান্তিনিকেতন বীরভূম জেলায় অবস্থিত। রবীন্দ্রনাথ এখানে ব্রহ্মচর্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে পড়ানোর পদ্ধতি ছিল উদার এবং শিক্ষার্থীদের মনের উন্মীলনের পক্ষে সহায়ক। রামকিঙ্কর বেইজ, সত্যজিৎ রায়, প্রমথনাথ বিশী, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ বহু বিদগ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তি বিভিন্ন সময় এখানে শিক্ষার্থীর পদ অলংকৃত করেন। শান্তিনিকেতনের পাশে হাতের কাজ শেখার জন্য রবীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন।

দিনু : দিনু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের পৌত্র। তিনি রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের পুত্র দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের প্রধান স্বরলিপিকার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ফাল্গুনী’ নাটক দিনু ঠাকুরকে উৎসর্গ করেন।

বর্ষামঙ্গল : ঠাকুরবাড়িতে বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে বর্ষামঙ্গল অন্যতম। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠিত হয়। এই উপলক্ষ্যে নতুন বৃক্ষরোপণ এবং নতুন গান তৈরি করে গাইবার চল ছিল। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনেও বর্ষামঙ্গল এবং হলকর্ষণ উৎসবের সূচনা করেন।

আত্রাই : আত্রাই নদী বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার উপনদী। রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই এই নদীর বুকে নৌকা বা বোটে করে ভ্রমণ করতেন। নদীর দু-পাশের স্থলভাগ ছিল তাঁর জমিদারির অন্তর্গত। তাঁর ‘ছিন্নপত্র’-এর বহু চিঠিও এই নদীর বোটে বসে রচিত হয়।

উঃ-কলকাতায় বর্ষা কলুষতাময়। রবীন্দ্রনাথের মনে হয় যেন ইট-কাঠের এক বিশাল জন্তু তাঁকে গ্রাস করতে আসছে। বাড়ির ছাদে ঠোকর খেতে খেতে বৃষ্টি যেন খোঁড়া হয়ে যায়। তার নাচ-গানের সৌন্দর্য বাধা পায়। তাই বর্ষার কলকাতা শহরকে কবির বিশেষভাবে অপছন্দ।

উঃ-‘নববর্ষা’ হল নতুন বর্ষা। নববর্ষা বলতে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের প্রথম বৃষ্টি অর্থাৎ নতুন বৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ বৃষ্টি আসে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের পরে।

উঃ-বর্ষাঋতু নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের দুটি কবিতা ‘নববর্ষা’ এবং ‘আষাঢ়’। দুটি গান হল 'শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ এবং ‘এসো শ্যামল সুন্দর'।

উঃ-উত্তরীয় হল চাদর বা ওড়না। সবুজ রঙের উত্তরীয় বলতে কবি দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ঘাসের তৃণভূমিকে বুঝিয়েছেন। সবুজ ওড়নার মতো ছড়ানো মাঠে যখন বৃষ্টি পড়ে তার যে সৌন্দর্য, তা সত্যিই মনোরম।

উঃ-হাট হল জিনিসপত্র কেনাবেচার জায়গা। স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষের সমাগমে সেখানে হইহুল্লোড়, হট্টগোল হয়। কলকাতা কর্মব্যস্ত, জনবহুল শহর। তাই লেখক কলকাতা শহরের হাট বলতে কলকাতার ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতাকে বুঝিয়েছেন।

উঃ-আষাঢ় মাসের বর্ষাকে কলকাতা শহরে মানায় না  বলে কবি মনে করেছেন, কারণ নগর কলকাতার শ্যামলিমা ইট-কাঠ-পাথরের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে। এখানে সবই বানানো-যান্ত্রিক, তাই নতুন প্রাণের সাড়া এখানে মেলে না। আষাঢ় মাসের বৃষ্টি ইট-কাঠের বাড়ির ছাদে ঠোকর খেতে খেতে হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর, তা লেখক রবীন্দ্রনাথের মনে নতুন গান জাগাতে অক্ষম। তাই কবির এরকম মনে হয়েছে।

উঃ-আত্রাই নদী বাংলাদেশে।

আত্রাই নদীর বুকে বোটে যেতে যেতে কবি রবীন্দ্রনাথ ২ শ্রাবণ ১৩২৯ বঙ্গাব্দে পত্রটি লিখেছেন।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই জমিদারির কাজ দেখাশোনার জন্য বাংলাদেশের নদীর বুকে বোটে করে ভ্রমণ করতেন। এই সময় নদীর দু-পাশের গ্রামগুলির সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করত। এইসব গ্রামের অনেক মানুষই পরবর্তীকালে তাঁর গল্পের চরিত্র হয়ে উঠেছে। এখানেও রবীন্দ্রনাথকে আত্রাই নদীর বুকে নৌকা করে যেতে দ্যাখা যায়। এই সময় তিনি ওই নদীর তীরের দু-পাশের গ্রামগুলিকে দেখেছেন। বর্ষার নদীর জল দু-পাশের পল্লিগ্রামের উঠোন পর্যন্ত উঠে আসে। গ্রামগুলি বাঁশঝাড় দিয়ে ঢাকা; আম, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল,কুল, শিমুল প্রভৃতি বড়ো বড়ো গাছ নিবিড়ভাবে ঘিরে ধরে নদীর দু-পাশ। নদীর দুই তীরে কচি কচি সবুজ ধানের খেত জলের উপরিতলে মাথা তুলে থাকে। এই দিগন্তবিস্তৃত সবুজের সমারোহ কবির চোখ এবং মনকে বিস্মিত করে, আরাম দেয়।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিপ্রেমিক কবি। তাই প্রকৃতি তাঁকে আকৃষ্ট করেছে বার বার। শান্তিনিকেতনে যখন প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয়, তখন রবীন্দ্রনাথ নতুন গান বাঁধতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি যে নতুন নতুন গান লেখেন তার সুর করার দায়িত্ব পড়ে দিনু ঠাকুরের উপর। শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি এলে ঘাস, গাছপালা যেভাবে আনন্দিত হয়ে মাথা নাড়তে থাকে, সেই আনন্দ এসে পৌঁছোয় কবি রবীন্দ্রনাথের মনেও। তাই কলকাতা শহরের নোংরা, আবর্জনাময় বর্ষাকাল তাঁর আদৌ পছন্দ হয় না। আত্রাই নদীর উপর দিয়ে বোটে করে যেতে যেতে রবীন্দ্রনাথ দেখেন সমস্ত আকাশ কালো হয়ে ঘন মেঘে ঢাকা পড়েছে। বৃষ্টি নেমে এলে দূরে মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে গড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সমস্ত জল-স্থল মিলিয়ে একধরনের শ্যামলতা রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগে, মনে নতুন গান তৈরির ইচ্ছে জাগে। কিন্তু বাইরের প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে, তিনি ঘরের খাতার দিকে তাকিয়ে সময় ব্যয় করতে চান না। শান্তিনিকেতনের ডাঙা ছাপিয়ে নদীর বুকে ঝরে পড়া বৃষ্টি তাঁর আরও বেশি ভালো লাগে। নদী-আকাশের চমৎকার মিলন ঘটে, রঙে রঙে আলো-ছায়াময়তায় যেন পৃথিবী-আকাশের মিলন ঘটেছে। এভাবে নদীর প্রতি, বর্ষার প্রতি কবির গভীর ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে।

উঃ-শান্তিনিকেতনের মাঠে বৃষ্টি নামার পর সেই বৃষ্টির ছায়ায় আকাশের আলো করুণ হয়ে পড়ে এবং সেখানকার ঘাসে ঘাসে পুলক জাগে আর তখন কবির মনের মধ্যে গান বেজে ওঠে। এই গানের সুর দিনুর ঘরে গিয়ে পৌঁছোয়।

উঃ-প্রতি বছর বর্ষাকালে ঠাকুরবাড়িতে বর্ষার সময় বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠিত হয়। এই উপলক্ষ্যে নতুন বৃক্ষরোপণ এবং নতুন গান তৈরি করে গাইবার চল ছিল।

উঃ-এখানে বর্ষামঙ্গল গানের কথা বলা হয়েছে।

কলকাতা শহরের ভীড়ে এই গান জমবে না। রবীন্দ্রনাথকে অন্যের অনুরোধে গান গাইতে হয়, তবু বৈঠকখানায় গান জমে ওঠে না।

উঃ-রবীন্দ্রনাথের মতে, শান্তিনিকেতনের বর্ষাকাল তাকে যে শান্তি দেয়, তার ফলে তিনি বহু নতুন নতুন বর্ষার গান লিখতে পারেন। কিন্তু কলকাতায় চলে আসার ফলে সেই লেখায় ছেদ পড়েছে। নতুবা অনেক নতুন নতুন গান খাতায় জমে উঠত।

উঃ-দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা থেকে পালাবেন। কলকাতায় থাকতে তাঁর ভালো লাগে না, তাই তিনি বর্ষায় শান্তিনিকেতনে ফিরে যাবেন।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের আত্রাই নদীর উপর দিয়ে বোটে ভেসে চলেন।

এই নদীর জল গেরুয়া, নদীর স্রোত অত্যন্ত বেশি, জলে শ্যাওলা ভেসে থাকে। দু-পাশে ধানখেত এবং ছোটো-বড়ো গ্রাম।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ যখন আত্রাই নদীর বুকে বোটে ভেসে বেড়ান, তখন বর্ষার সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করে। বর্ষার এই শান্ত সজলতার মধ্যে তাঁর গান তৈরি করতে ইচ্ছে করছে।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ আত্রাই নদীর বুকে বোটে যাওয়ার সময় গান লিখতে চান, কিন্তু গান লেখা হয়ে উঠবে না। কারণ কবির খাতার দিকে তাকানোর সময় নেই, তিনি বাইরের প্রকৃতির রূপসৌন্দর্য উপভোগ করতে বেশি আগ্রহী।

উঃ-এখানে রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টির নৃত্যের বা নাচের কথা বলেছেন। শান্তিনিকেতনের খোলা প্রান্তরে বৃষ্টিধারা যেমন বাধাহীনভাবে ঝরে পড়ে, কলকাতায় তা হয় না। এখানে বড়ো বড়ো বাড়ির ছাদে বাধা পেয়ে বৃষ্টি যেন খুঁড়িয়ে চলতে থাকে। তার অবিশ্রাম ধারা বাধা পায়। তাই বৃষ্টিপাতকে রবীন্দ্রনাথ নৃত্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

উঃ-‘এখানকার’ বলতে শহর কলকাতার কথা বলা হয়েছে।

শহরের সাজানো বৈঠকখানায় স্বাভাবিকতা নেই। কেয়ারি করা কাননে সাজানো গাছ মানালেও বুনোফুলের সবুজ সৌন্দর্য অধরা থাকে তেমনি শহর কলকাতায় সাজানো বৈঠকখানার ঘরে নববর্ষায় গানের স্বতঃস্ফূর্ত সহজ সুর বেসুরো মনে হয়।

উঃ-দিনুবাবু হলেন রবীন্দ্রনাথের নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তিনি কলকাতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। কারণ কলকাতার বদ্ধ আবহাওয়া, ইট-কাঠের জঙ্গলের মতো বড়ো বড়ো বাড়ি তাঁর পছন্দ নয়। তাই দাঁত তোলার জন্য কলকাতায় এলেও তিনি তাড়াতাড়ি কলকাতা ছেড়ে যেতে চান।

উঃ-কবি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আত্রাই নদীর বুকে বোটে করে ভেসে চলেছেন।

আত্রাই পদ্মার উপনদী। বর্ষায় এ নদী কানায় কানায় পরিপূর্ণ—নদীতে প্রচুর স্রোত, স্রোতের সাথে সাথে শ্যাওলা ভেসে চলেছে। এই নদীর জলের রং গেরুয়া। নদীর দু-পাশে তিনি দেখেছেন প্রচুর গ্রাম। সবুজে মোড়া ছোটো ছোটো গ্রামগুলির সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথের মনকে আকর্ষণ করেছে। নদীতে রবীন্দ্রনাথের নৌকো ছাড়া আর কোনও নৌকো নেই। বর্ষার খোলা নদীটি যেন ব্যস্ত হয়ে বয়ে চলেছে।

উঃ-রবীন্দ্রনাথ আত্রাই নদীর বুকে বোটে করে ভেসে চলেছেন। বর্ষার মেঘে সমস্ত আকাশ ঢেকে দিয়েছে। প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া বইছে। তাই তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য মাঝিরা পাল তুলে দিয়েছে। কারণ পালে বাতাস লাগলে নৌকোর গতিবেগ বেড়ে যাবে এবং তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে।

উঃ-আত্রাই নদীতে বোটে করে যাওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথ দু-পাশের গ্রাম দেখেছিলেন। সেখানে বর্ষাকালে পল্লির উঠোনের কাছ পর্যন্ত জল পৌঁছে গিয়েছে। ঘন বাঁশের ঝাড়, আম, জাম, তেঁতুল, কুল, শিমুল নিবিড়ভাবে গ্রামগুলিকে ঘিরে রেখে দিয়েছে। গ্রামের দু-পাশে ধানের খেত বর্ষার জলে ডুবে আছে। বাংলাদেশের এক সাধারণ গ্রামের ছবি রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছে।

উঃ-রবীন্দ্রনাথের নতুন গান লেখা হয়ে উঠবে না।

রবীন্দ্রনাথ আত্রাই নদীর বুকে নৌকো করে ভেসে যেতে যেতে দু-পাশের শ্যামল-সুন্দর গ্রামগুলি দেখে আনন্দিত হন। গ্রামগুলির মাথায় বর্ষার কালো মেঘ স্তরে স্তরে নেমে এসেছে। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে রৌদ্রের ছায়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে - এই  মনোরম পরিবেশ নতুন বর্ষার গান লেখার পক্ষে আদর্শ। কিন্তু তবুও রবীন্দ্রনাথ গান লিখতে পারছেন না, কারণ বাইরের সৌন্দর্য থেকে তিনি চোখ ফেরাতে পারছেন না। তাই খাতার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গান লেখা সম্ভব হবে না।

উঃ-'ভানুসিংহের পত্রাবলি’ রচনায় আত্রাই নদীর বুকে বোটে করে যাওয়ার সময় লেখক রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন, ঝোড়ো বাতাস বইছে, কুলে কুলে পরিপূর্ণ নদীটির স্রোত খরতর এবং সেই স্রোতের ঢেউ-এ দলে দলে শৈবাল ভেসে আসছে, রবীন্দ্রনাথ কেবল আত্রাই নদীর বর্ণনাই দেননি, নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের নিখুঁত ছবিও তিনি তাঁর রচনায় তুলে ধরেছেন। তিনি দেখেছেন বর্ষায় পল্লির উঠোন পর্যন্ত জল উঠেছে, পল্লি অঞ্চলে ঘন বাঁশের ঝাড়, আম, কাঁঠাল, তেঁতুল, কুল, শিমুল অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিস্তৃত হয়ে গ্রামগুলিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। কবি দেখেছেন, নদীতীরবর্তী কাঁচা ধানের খেত জলমগ্ন এবং কচি ধানের মাথাগুলো সেই জলের উপর ভাসমান। নদীর দুই তীর সবুজের বাহারে সেজে ওঠে এবং সেই সবুজের মাঝখান দিয়ে আত্রাই নদী তার ‘গেরুয়া রঙের, ধারা বহন করে ব্যস্ত হয়ে চলেছে’। সব কিছুর উপর বাদল সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে, যেন একটা ক্যানভাসের ছবি। এই জল-স্থল ও আকাশের ছায়াময় শ্যামলতার ছবি দেখে কবির মনে গানের উদয় হয়েছে।