Chapter-1⇒শাস্ত্ররুপে ভূগোল

ভূগোল বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক ব্যাখ্য করে বলে ভূগোলকে বিজ্ঞান বলা হয়।

1950 সালে রাশিমাত্রিক বিপ্লবের সূচনার সময় থেকে ভূগোল প্রকৃত বিজ্ঞানরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ভূগোলের যে শাখায় জনসংখ্যার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যেমন— জনসংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি, জন্ম ও মৃত্যুহার, কাঠামো ও গঠন পরিব্রাজন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাবে জনসংখ্যা ভূগোল বলে ৷

রাজনৈতিক ভূগোলে রাষ্ট্রকে দৈশিক একক (Spatial Unit) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রের সম্মিলিত প্রভাবে ভূগোলের মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যা শাখাটি বিকাশলাভ করেছে।

জীবভূগোলের আলোচ্য ক্ষেত্রগুলি হল উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ ও পরিবেশ।

পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) পরিবেশ ভূগোল শাখায় আলোচনা করা হয়।

খাদ্যশৃঙ্খল ভূগোলের জীব ভূগোল শাখার আলোচ্য বিষয় ।

ভূগোলের সাম্প্রতিকতম তিনটি শাখা হল চিকিৎসা ভূগোল, পর্যটন ভূগোল এবং বাণিজ্যিক ভূগোল ।

প্রাণীবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে ভূগোলের প্রাণী ভূগোল শাখাটি গড়ে উঠেছে।

কৃষি-সংক্রান্ত ও গ্রামীণ (Rural) বা শহুরে (Urban) ভূগোল, ভূগোলশাস্ত্রের মানবীয় ভূগোল শাখার অন্তর্গত।

সাংস্কৃতিক ভূগোল ও রাজনৈতিক ভূগোল, ভূগোলের মানবীয় ভূগোল শাখার অন্তর্গত।

কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়ের পদ্ধতিকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা GPS বলে।

বর্তমানে মানচিত্র অঙ্কনের জন্য GPS, GIS, রিমোট সেনসিং প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়।

বর্তমান সময়ে গাণিতিক ভূগোলের সর্বাধুনিক ক্ষেত্র হল GPS Global Positioning System

GIS হল একটি কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা যেখানে বিভিন্ন ভৌগোলিক বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ, ব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়।

মানবীয় ভূগোলের একটি শাখা হল সাংস্কৃতিক ভূগোল।

প্রাকৃতিক ভূগোলের ভূমিরূপবিদ্যা শাখায় ভূমির ক্ষয় ও সঞ্চয় প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়।

পতিত জমির বণ্টন ও ব্যবহার, ভূগোলের অর্থনৈতিক ভূগোল শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্র হতে পারে।

" হেরোডোটাস সর্বপ্রথম দ্রাঘিমারেখা অঙ্কন করেন।

রাসায়নিক সারের স্বল্প ব্যবহার ও জমির উর্বরতা রক্ষা— ভূগোলের মৃত্তিকা ভূগোল শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্র হতে পারে।

লিঙ্গ পক্ষপাতিত্ব—ভূগোলের জনসংখ্যা ভূগোল শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্র হতে পারে ।

নৃতত্বের ওপর ভিত্তি করে ভূগোলের সাংস্কৃতিক ভূগোল শাখাটি বিস্তারলাভ করেছে।

স্বতন্ত্র শাস্ত্ররূপে ভূগোলের বিকাশ

প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত এরাটোসথেনিস (Eratosthenis) 234 খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম ‘ভূগোল' শব্দটি ব্যবহার করেন। তখন ভূগোল বলতে পৃথিবী পৃষ্ঠের উপাদানসমূহের বর্ণনাকে বোঝাত। তবে সে সময় ভূগোলের নিজস্ব স্বত্তা (Entity) গড়ে ওঠেনি। তাই ভূগোল পৃথক শাস্ত্ররূপে বিকাশলাভ করেনি। ভূপৃষ্ঠের বৈচিত্র্যময় চরিত্রের বর্ণনা ছিল প্রাচীনকালের ভূগোলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ওই সময়ে পৃথিবীর আকার, গতি প্রভৃতি জ্যোতির্বিদ্যার বিষয়গুলিও খুব ভালোভাবে ভূগোলে স্থান পেয়েছে। রোমান যুগের গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্র্যাবো (খ্রি. পূ. 60 থেকে 20 খ্রি.) এবং ক্লোদিয়াস টলেমি (90-168 খ্রি.) ভূগোল বিষয়ে লেখা তাঁদের গ্রন্থে এই মত প্রকাশ করেন যে, ভূগোল হল সেই মহান বিষয় যা পৃথিবীর আকৃতি, ভূমি ও ভূমিরূপের বৈশিষ্ট্য, বারিমণ্ডল এবং জল ও স্থানের সমস্ত জীবের বৈশিষ্ট্য সমীক্ষা করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে আধুনিক ভুগোলের জয়যাত্রা শুরু হয়। ভূগোলে বর্ণনার বদলে কী (What), কোথায় (Where) ও কেন (Why)—এই তিন প্রশ্নের দ্বারা ব্যাখ্যার কথা বলা হয়েছে। জার্মানির দুই পণ্ডিত আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ট ও কার্ল রিটার-এর নেতৃত্বে ভূগোল তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেতে শুরু করে এবং বিজ্ঞানের একটি শাখারূপে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। হামবোল্ট-এর মতে, ভূগোলই হল আদি বিজ্ঞান (Original Science)। এই বিজ্ঞানে পৃথিবীতে যা কিছু পাওয়া যায় তার সমীক্ষা ও বর্ণনা করা হয়। রিটার-এর মতে সে ভূগোল হল বিজ্ঞানের সেই শাখা যা পৃথিবীর সমস্ত বিষয়ের বৈশিষ্ট্য ও সম্পর্কসহ তাকে পৃথক একটি একক হিসেবে বিচার করে।

হামবোল্ট ও রিটারের বক্তব্য গ্রহণ করে ভৌগোলিকরা। খুব মেনে নিয়েছেন যে “ভূগোলই হল আদি, মাতৃসম শাস্ত্র” (Geography is the mother of all disciplines) যা থেকে াস সৃষ্টি হয়েছে ভূ-আকৃতি বিজ্ঞান, আবহবিজ্ঞান, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, এই উদ্ভিদবিজ্ঞান, আঞ্চলিকবিজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিশেষীকরণ শাখা। স্ত্রীর ভূগোল যেন সর্বদাই নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত, তা সে ধারণা যে-কোনো শাস্ত্র থেকে আসুক না কেন”। এই বহুশাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ভূগোলকে অন্য শাস্ত্র থেকে
পৃথক ও শ্রেষ্ঠ করে তুলেছে। 1950 সাল থেকে মাত্রিক বিপ্লবের সূচনা দিয়ে অর্থাৎ সংখ্যাগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই শাস্ত্র বিজ্ঞানের একটি প্রধান শাখারূপে অন্যান্য শাস্ত্রের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। এজন্য ভূগোল হল একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র।

সমষ্টিভূত বা সামগ্রিক দৃষ্টিসম্পন্ন বিষয় হিসেবে ভূগোল

ভূগোল হল পৃথিবীর বর্ণনা অর্থাৎ পার্থিব উপাদানগুলির কার্যকারণ সম্পর্কিত সমস্ত ঘটনাবলির আলোচনা, বর্ণনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি। উপাদানগুলি মুখ্য দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথমটি হল, প্রাকৃতিক উপাদান যেখানে প্রকৃতিই একমাত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয়টি হল, মানবিক উপাদান যেখানে প্রকৃতির সন্তানরূপে মানুষই হল মুখ্য। আবার মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর নিজের জন্ম রহস্যই বা কী, এর অবস্থান কোথায় এবং কীরূপ এও এক প্রাকৃতিক সত্ত্বা। সুতরাং প্রতিটি মূল উপাদান যেমন নিজেদের সত্ত্বা নিয়ে এককভাবে বিরাজ করছে তেমনি পারস্পরিক বোঝাপড়া, লেনদেন বা বিনিময় ও মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে থাকা ঘটনাগুলি বহু বিশেষীকরণ শাখায় পর্যবসিত হয়েছে বা হচ্ছে। যেহেতু ভূগোলের সমস্ত ঘটনাই কার্যকারণ সম্পর্কিত এবং যুক্তিগ্রাহ্য, তাই ভূগোল হ'ল আদি বিজ্ঞান। প্রকৃতি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং মানুষের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে সমাজবিজ্ঞান। সুতরাং, এই দুই বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার সমন্বয়ে সৃষ্ট প্রণালীবদ্ধ ও আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভূগোল সুপ্রতিষ্ঠিত।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছে ভূমিরূপবিজ্ঞান, আবহবিজ্ঞান, জলবিজ্ঞান, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, প্রাণী ও উদ্ভিদবিজ্ঞান প্রভৃতি। এসব শাখায় প্রকৃতি তার নিজস্ব সত্ত্বা ও সমন্বয় ফুটিয়ে তোলে এবং গড়ে তোলে সুসংহত প্রাকৃতিক পরিবেশ। এই প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবগোষ্ঠী আলাদাভাবে নিজেদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তাই এক বিশেষ মুখ্য উপাদান হিসেবে প্রাকৃতিক ভূগোলের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে জীব ভূগোল।

মানুষ প্রকৃতির একমাত্র উন্নততর জীব হওয়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশকে সর্বোতভাবে কাজে লাগিয়ে কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে নিজের কর্তৃত্ব  সুতরাং পৃথিবীর সামগ্রিক বর্ণনায় অর্থাৎ ভূগোলে নিবিড় আত্মসম্পর্কযুক্ত বহু শাখাপ্রশাখায় প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়। তাই, শুধু একটি বা দুটি বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানের শাখায় ভূগোলের বিষয়বস্তু বা পরিধি সীমাবদ্ধ নয়। এতে ভূগোলের আংশিকরূপ পাওয়া যায়, সম্পূর্ণ ধারণালাভ হয় না। এজন্য ভূগোলকে একক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে সামগ্রিক বা সমষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবা হয়। প্রকৃতপক্ষে, ভূগোল একটি আন্তঃসাংশ্লেষিক বিষয় (Interdisciplinary Subject) হওয়ায় শাস্ত্ররূপে একে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়।

উপরোক্ত ছকটি লক্ষ করলে ভূগোলের সামগ্রিক বা সমষ্টিভূত পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।

মানবীয় ভূগোলের শাখাসমূহ

মানবসমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে সমাজ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, যেমন—ইতিহাস, অর্থশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, জনসংখ্যাবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি। এই শাখাগুলির ওপর ভিত্তি করে মানবীয় ভূগোলের যেসমস্ত শাখাগুলি গড়ে উঠেছে, সেগুলি হল— [1] অর্থনৈতিক ভূগোল, [2] জনসংখ্যা ভূগোল, [3] রাজনৈতিক ভূগোল, [4] ঐতিহাসিক ভূগোল, [5] সামাজিক ভূগোল, [6] সাংস্কৃতিক ভূগোল।
মানবীয় ভূগোলের বিভিন্ন শাখার বিষয়বস্তু

ভূগোলের যে অংশে মানুষের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের স্থানগত পার্থক্য ও সংগঠন (Spatial Differentiation and Organi sation of Human Activity) এবং সেই সমস্ত বিষয়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে বলে মানবীয় ভূগোল (Human Geography)। মানবীয় ভূগোলের চারটি শাখার বিষয়বস্তু নীচে আলোচিত হল

অর্থনৈতিক ভূগোল : মানবীয় ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হল অর্থনৈতিক ভূগোল (Economic Geography), যার সঙ্গে অর্থনীতি (Economics)-এর একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। এর কারণ, অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক ভূগোল উভয়ের বিষয়বস্তুর মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। মানুষের বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক চাহিদা এবং সেই চাহিদাগুলি পুরণের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে অর্থনীতি। আর এজন্য অর্থনীতিকে পণ্যদ্রব্যের উৎপাদন, কটন, বিনিময় ও ভোগ সম্পর্কে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু পণ্যদ্রব্য সংক্রান্ত এইসব সুযোগসুবিধা ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র সমানভাবে পাওয়া যায় না অর্থাৎ এগুলির দৈশিক রা স্থানগত দিক (Spatial Aspect) আছে, যা অর্থনীতির পরিধির বাইরেই থাকে। এখানেই অর্থনৈতিক ভূগোলের ভূমিকা। অর্থনৈতিক ভূগোল এইসব বিষয়গুলি অর্থাৎ পণ্যদ্রব্যের (কৃষিজ, খনিজ, শিল্প প্রভৃতি) উৎপাদন, বণ্টন, বিনিময়, ভোগ ইত্যাদি ভূপৃষ্ঠের কোথায় কী পরিমাণে পাওয়া যায় সে সম্পর্কে বিশেষ আলোচনা করে এবং তারই ফলে অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক ভূগোলের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিরাজ করে।

জনসংখ্যা ভূগোল: জনসংখ্যা ভূগোলে জনসংখ্যার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, যথা—জনসংখ্যার জন্মহার, মৃত্যুহার, জনসংখ্যার কাঠামো ও গঠন, অভিবাসন বা পরিব্রাজন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তত্ত্বগতভাবে আলোচনা করা হয়। আর এইসব বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য কোন্ দেশে কীরকম অর্থাৎ এগুলির দৈশিক বা স্থানগত পরিচয় সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয় জনসংখ্যা ভূগোল। ( Population Geography)।

[3] রাজনৈতিক ভূগোল: সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science)-এর মূল আলোচ্য বিষয় হল রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের অধিবাসী এবং তাদের সার্বভৌমত্ব বা রাজনৈতিক অধিকার প্রভৃতি। এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক ভূগোল (Political Geography)। তাই এরও কেন্দ্রে থাকে রাষ্ট্র, তবে এখানে রাষ্ট্রকে দৈশিক একক (Spatial Unit) হিসেবে বিবেচনা করা হয় অর্থাৎ রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট স্থান বা এলাকা, অধিবাসী এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকে। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে রাজনৈতিক ভূগোলের একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

4 ঐতিহাসিক ভূগোল: ভৌগোলিক দেশ-এর ওপর কালের পটভূমিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলি মানবীয় ভূগোলের যে শাখার আলোচনা করা হয় তাকে ঐতিহাসিক ভূগোল (Historical Geography) বলে। বিখ্যাত ভূগোলবিদ হার্টশোন-এর মতে সময়ের পটভূমিতে ঘটনার বিবরণ হল ইতিহাস, আর সেটাই যখন স্থানের পটভূমিতে হয় তখন সেটি হল ভূগোল। প্রকৃতপক্ষে যে-কোনো স্থানের উন্নতির শিকড় নিহিত থাকে সেখানকার অতীত তথা ইতিহাসের মধ্যে অর্থাৎ ভূগোলের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে ইতিহাস। ঐতিহাসিক ভূগোলে ভৌগোলিক ঘটনাগুলিই মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়। যেমন বলা যায়, সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা — এই তিনটি ছোটো গ্রাম্য বসতি কীভাবে ভৌগোলিক দেশ বা স্থান জুড়ে মহানগররূপে এক বিশাল পৌর বসতিতে পরিণত হয়েছে, তোর ব্যাখ্যাই হল ঐতিহাসিক ভূগোল। অর্থাৎ ভৌগোলিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মানবীয় ঘটনাবলি হল এই ভূগোলের আলোচ্য বিষয়।

মহাকাশে প্রেরিত কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের যে-কোনে স্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ ও সমুদ্র থেকে ভাতা দে সেই স্থানের অবস্থান নির্ণয়ের যে সহজ পদ্ধতি বর্তমানে হয়েছে, তাকে বলে GPS (Global Positioning System) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রেরিত 24টি কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে বর্তমানে এই GPS পদ্ধতিতে সহজেই যে-কোনো জায় অবস্থান নির্ণয় ও অন্যান্য কাজ করা যায়।

প্রাকৃতিক ভূগোলের বিভিন্ন শাখার ভবিষ্যৎআলোচনার ক্ষেত্র প্রাকৃতিক ভূগোলের বিভিন্ন শাখার সম্ভাব্য আলোচনার ক্ষেত্রগুিএই শাখায় সর্বাধিক সম্ভাবনাময় আলোচনার দুটি ক্ষেত্র (1) GPS (Global Positioning System) (1) সংবেদন ব্যবস্থা (Remote sensing) এবং ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা বা GIS (Geographic Informatics System)।

মহাকাশ গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ থেকে গ্রহ-নক্ষত্রে উৎপত্তি-সংক্রান্ত নতুন মতবাদের প্রতিষ্ঠা, ভিন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের অনুসন্ধান, সৌরজগতে নতুন কোনো গ্রহে আবিষ্কার ইত্যাদি জানা ও সে সম্বন্ধে আলোচনা। বায়ুমণ্ডলের ভৌত ও রাসায়নিক অবস্থার পরিবর্তন সংক্রান্ত সম্ভবা আলোচনা। সৌর বিকিরণ ও বিভিন্ন রকমের তড়িৎ চুম্বকীয় তরে চরিত্র ও তার প্রভাব বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার ইত্যাদি নিয় সম্ভাব্য আলোচনা।

ভূমিরূপ বিদ্যা এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল
1ভূমিকম্প, ধস, সুনামি প্রভৃতি কারণে ভূমিরূপের পরিবর্ত সম্পর্কে অনুসন্ধান।
2 ভূমিরূপের ওপর জলবায়ুর প্রভাব দেখে অতীত ইতিহা জানা।
3 শিলাম্বরের অসংগতি, পুরাতন আবহবিকারের অবশিষ্ট ইত্যাদি দেখে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান।
4 ভূমি ঢালের স্থায়িত্ব দেখে বাঁধ, সেতু, রাস্তা নির্মাণ কাে সঠিক পথ প্রদর্শন।
5 ভূমিরূপগত বিপর্যয় মোকাবিলা-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্র ইত্যাদি।

জলবায়ুবিদ্যা এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল
1 জলবায়ুগত দুর্যোগের ব্যবস্থাপনা করা।
2 আবহাওয়া ও জলবায়ুর সাম্প্রতিক আচরণের পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান।
3 বিশ্ব উন্নায়নের (Global warming) সামগ্রিক প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা।
4 কৃষিকাজে জলবায়ুর প্রভাব ও শস্য ক্যালেন্ডার প্রস্তুত ও বিভিন্ন কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ।
5 জলবায়ুর পরিবর্তন এবং উদ্ভিদ ও প্রাণী জীবনের ওপর তার প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা ইত্যাদি।

4 সমুদ্রবিদ্যা: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—
1 শক্তির উৎস হিসেবে সমুদ্রের ব্যবহার, যথা—সামুদ্রিক ঢেউ, সমুদ্রের স্রোত, সমুদ্রজলের লবণতা, সমুদ্রজলের উন্নতা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন।
2 অ্যাকোয়াকালচারের মাধ্যমে সমুদ্রজলে উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পদের বিশেষত মাছ প্রতিপালনের দ্বারা খাদ্যদ্রব্যের জোগান অব্যাহত রাখা।
3 বাণিজ্যিকভিত্তিতে সমুদ্রের লবণাক্ত জল থেকে মিষ্ট জলের

উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা।
5 মৃত্তিকা ভূগোল: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—

1 মৃত্তিকার সংরক্ষণের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ।

2 মৃত্তিকাক্ষ নিবারণের নতুন পদ্ধতি নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা ।

3 মাটির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য পদ্ধতি।

4 রাসায়নিক সারের স্বল্প ব্যবহার ও জমির উর্বরতা রক্ষা।

5 লবণাক্ত ও ক্ষারকীয় মৃত্তিকার যথাযথ ব্যবহার ইত্যাদি।

জীব ভূগোলের বিভিন্ন শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্র

উদ্ভিদ ভূগোল: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—
1 অরণ্য সংরক্ষণের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ।
2 অতিরিক্ত উয়তা ও খরা প্রতিরোধকারী উদ্ভিদসৃজন।
3 কৃষি ও সামাজিক বনসৃজন।
4 পতিত জমিতে বনসৃজন ইত্যাদি।

2. প্রাণী ভূগোল: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—
1 বিভিন্ন ধরনের প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা।
2 আধুনিক পদ্ধতিতে প্রাণী প্রতিপালন।
3 প্রাণী সম্পদের উন্নত ব্যবহার ইত্যাদি।

3 মানব বাস্তুবিদ্যা: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—
1 পরিবর্তনশীল বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের ওপর তার প্রভাব এবং ফলাফল।
2 স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের যথাযথ সংরক্ষণ ইত্যাদি।

4 পরিবেশ ভূগোল: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—

1 বহতা উন্নয়নের (Sustainable Development) ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান
2 উন্নয়নমূলক পরিকল্পনায় EIA (Environmental Impact Assessment)-এর আবশ্যিকতা নির্ধারণ।
3 প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় ও হ্রাসরোধে পরিবেশ সংরক্ষণের নতুন নতুন নীতি নির্ধারণ ও প্রয়োগ ইত্যাদি।

মানবীয় ভূগোলের বিভিন্ন শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্র 1 অর্থনৈতিক ভূগোল: এর ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল
1 ভূমি ব্যবহারের মডেল নির্মাণ ও ভূমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।
2 নতুন নতুন কৃষি বিপ্লব ও খাদ্যসুরক্ষা বিষয়ক ভাবনাচিন্তা।
3 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় কর্মধারার রূপান্তর ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক ভাবনাচিন্তা।
4 আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের উপায় নির্ধারণ ও পরিকল্পনা গ্রহণ-সংক্রান্ত বিষ…
আয়ুবৃদ্ধি ও জনসংখ্যা সমস্যা (যেমন উন্নত দেশগুলিতেআত্মহত্যার প্রবণতা)। ও লিঙ্গ পক্ষপাতিত্ব, বিশেষত অনুন্নত দেশে ও এর থেকেসৃষ্ট সামাজিক সমস্যা।

ও নারী-পুরুষ ভেদাভেদে কর্মে অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত বিষয়। • সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কর্মরতা অধিকাংশ মহিলাদের সন্তান ধারণক্ষমতা হ্রাসের প্রবণতা ইত্যাদি।

3 রাজনৈতিক ভূগোল: এই শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল - কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন সম্পর্ক, ও রাজ্যগুলির পারস্পরিক সীমানা, ও মিলিটারি ভূগোলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ইত্যাদি।

4. ঐতিহাসিক ভূগোল: এই শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল—যে-কোনো স্থানের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঐতিহ্যের ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ ইত্যাদি।

5 সামাজিক ভূগোল এই শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল— বিশ্বায়ন ও সামাজিক বিবর্তন, সামাজিক মূল্যবোধ ও সম্পদ সৃষ্টি ইত্যাদি।

6 সাংস্কৃতিক ভূগোল এই শাখার ভবিষ্যৎ আলোচনার ক্ষেত্রগুলি হল- বিশ্বায়ন ও সংস্কৃতির বিবর্তন, ও মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদি।

 ভূগোলশাস্ত্র পাঠের মুখ্য উদ্দেশ্য

বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা ভূগোল হলেও এই শাস্ত্রপাঠের মুখ্য উদ্দেশ্যগুলি সম্পর্কে সব ভূগোলবিদ একমত নন।

বিভিন্ন অঞ্চলের পার্থক্য অনুধাবন করা: ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশের প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিবেশ একরকম নয়। এইসব বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন বিষয়ের পার্থক্য ও পার্থক্যের কারণ অনুধাবন করাই ভূগোল পাঠের উদ্দেশ্য।

2 দৃশ্যমান ভূচিত্রকে জানা ও বোঝা ইংরেজ ভূগোলবিদ রজার মিনশূল-এর মতে, প্রাকৃতিক ও মানবিক উপাদান সমুহের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে আমাদের চারপাশে গড়ে ওঠা দৃশ্যমান ভূচিত্রকে (Visible Landscape) জানা ও বোঝাই হল ভূগোল শাস্ত্র পাঠের প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্য ভূগোলের মধ্যে ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি অংশের প্রতিটি বিষয়ের বৈচিত্র্য সমীক্ষা করে সেই বৈচিত্র্য ও সমাহারগুলিকে যথাসম্ভব ব্যাখ্যা ও বর্ণনা করা হয়।

3. প্রাকৃতিক ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি অখণ্ড বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা: ভূগোলবিদগণের মতে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানবগোষ্ঠীর পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সমীক্ষা করা ভূগোল পাঠের অন্যতম উদ্দেশ্য। লুকারম্যান-এর মতে, বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতাকে বোঝাই ভূগোল শাস্ত্র পাঠের মূল উদ্দেশ্য। ভূগোলবিদদের উল্লিখিত বিভিন্ন ধারণা বিশ্লেষণ করে ভূগোল শাস্ত্র পাঠের মুখ্য উদ্দেশ্যগুলি নির্ধারণ করা যায়। এগুলি হল—

1 মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা অর্থাৎ মানুষের ওপর প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব এবং একই সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মানুষের প্রভাব জানা ও বোঝা।

2  বিভিন্ন অঞ্চলের অবস্থান নির্ণয় এবং ওইসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক পরিবেশের বর্ণনা।

3 সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার রূপায়ণ ।

4 বিভিন্ন বিষয় এবং অবস্থার সমন্বয় কীভাবে হয়, তা বুঝে নেওয়া।

5  বিভিন্ন উপাদানের স্থানিক বণ্টন (অর্থাৎ জনসংখ্যা, কৃষিজ ফসল, খনিজ দ্রব্য ইত্যাদির বণ্টন কোথায় কম, কোথায় বেশি) জানা ও বোঝা।

6 যে-কোনো স্থানের বৈশিষ্ট্য ও আচরণ- সংক্রান্ত কারণ বা সূত্র নির্ণয় ইত্যাদি।
ভূগোলকে সংশ্লেষণমূলক বিজ্ঞান বলার কারণ

পৃথিবীর সমস্ত ঘটনাবলিকে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত প্রাকৃতিক ভূগোল ও মানবীয় ভূগোলের সব শাখায় কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে যুক্তিনির্ভরভাবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও বর্ণনা করা হয় বলে ভূগোলকে সংশ্লেষমূলক বিজ্ঞান বলা হয়।

GIS-এর সম্পূর্ণ কথাটি হল Geographic Information System। এটি হল এমন এক কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা বা পদ্ধতি যার সাহায্যে পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কিত ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ, ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষানিরীক্ষা ও প্রদর্শন করা হয়।

প্রাকৃতিক ভূগোলের শাখাসমূহ

ভূগোলের যে অংশে প্রাকৃতিক বিষয়সমূহ, যেমন—শিলা, ভূমিরূপ, সাগর, মহাসাগর, নদনদী, হ্রদ, আবহাওয়া, জলবায়ু, মৃত্তিকা প্রভৃতি আলোচনা করা হয় তাকে বলে প্রাকৃতিক ভূগোল (Physical Geography)। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক উপাদান ও প্রক্রিয়াসমূহের স্থানগত ও সময়গত বৈচিত্র্যের পর্যবেক্ষণ তথা অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করে যথাযথ তত্ত্ব ও তথ্য বিবৃত করাই প্রাকৃতিক ভূগোলের মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রাকৃতিক উপাদানসমূহের প্রকৃতি, উৎস, বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক ভূগোলকে আবার পাঁচটি প্রধান শাখায় বিভক্ত। এগুলি হল—

জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় ভূগোল ও মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যা:

আদি বিজ্ঞানরূপে প্রাকৃতিক ভূগোলের নিজস্ব ভূগোল মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যা শাখা হল জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় 13 (Astronomical Geography and Cartography)। এদের চর্চা, ব্যাখ্যা, বর্ণনা করা হয় গণিত শাস্ত্রের, বিশেষত গোলকীয় ত্রিকোণমিতির ওপর ভিত্তি করে। এই শাখাটির মধ্যে মহাশূন্যে পৃথিবীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বিশেষত আবর্তন ও পরিক্রমণ গতি নিরূপণ, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়, দ্রাঘিমা ও সময়ের সম্পর্ক, বিশেষ ধরনের আকৃতিবিশিষ্ট (Geoid) ত্রিমাত্রিক পৃথিবীকে কাগজে সঠিকভাবে দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে পরিণত করা প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়।

2. ভূগাঠনিক ও ভূমিরূপবিদ্যা:ভূতত্ত্ব (Geology)-এর ওপর ভিত্তি করে প্রাকৃতিক ভূগোলে ভূগাঠনিক (Geotechtonic) ও ভূমিরূপবিদ্যা (Geomorphology) শাখাটির বিকাশ ঘটেছে।এই শাখার মধ্যে ভূমিরূপের উদ্ভব, নানাপ্রকার রূপ এবং তার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হয় যেমন—ভূপৃষ্ঠে আবহবিকার, ভর সঞ্চালন, নদী, বায়ু, হিমবাহ, সমুদ্র তরঙ্গ প্রভৃতির মাধ্যমে ভূমির ক্ষয়, ক্ষয়িত পদার্থসমূহের বহন ও সঞ্চয় প্রক্রিয়া এবং এদের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে উৎপন্ন নানাপ্রকার ভূমিরূপের বিষয়ে ভূমিরূপবিদ্যায় আলোচিত হয়।

3 . জলবায়ুবিদ্যা: বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদান ও স্তরবিন্যাস

(বিশেষত নিম্ন বায়ুমণ্ডল বা ট্রপোস্ফিয়ার), আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপাদান (যেমন— বায়ুর উয়তা, চাপ, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ ও মেঘ), বিভিন্ন প্রকার জলবায়ু, জলবায়ু অঞ্চল প্রভৃতি বিষয় জলবায়ুবিদ্যায় (Climatology) অনুশীলন করা হয়।

সমুদ্রবিদ্যা: প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা জলবিজ্ঞান বা উদকবিদ্যা (Hydrology)-এর ওপর ভিত্তি করে প্রাকৃতিক ভূগোলে সমুদ্রবিদ্যা (Oceanography) শাখাটি গড়ে উঠেছে। ভূপৃষ্ঠের প্রায় তিনভাগ স্থান অধিকার করে থাকা সাগর, মহাসাগর প্রভৃতি এবং তাদের নানা ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই শাখায় আলোচনা করা হয়।

5. মৃত্তিকা ভূগোল : বিভিন্ন মৃত্তিকার উৎপত্তি প্রক্রিয়া, তাদের উর্বরতা, বণ্টন, ব্যবহার প্রভৃতি মৃত্তিকা ভূগোলের মূল আলোচ্য বিষয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের শাখা মৃত্তিকাবিজ্ঞান (Pedology)-এর ওপর ভিত্তি করে মৃত্তিকা ভূগোল (Soil Geography) শাখাটি বিকাশ লাভ করেছে।