Chapter-1⇒শিক্ষার ধারণা ও লক্ষ্য

1972 সালে ইউনেস্কো কর্তৃক আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশনের বিবরণীতে (Learning to be the world of Education today and tomorrow) জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে। শিক্ষা পুনর্গঠনে যে সাতটি মূল বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল জীবনস্তূপী শিক্ষা। জীবনব্যাপী শিক্ষার ধারণাকে আরও স্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করতে গেলে এর বৈশিষ্ট্যাবলি উল্লেখ করা প্রয়োজন।
জীবনব্যাপী শিক্ষার বৈশিষ্ট্যাবলি
জীবনব্যাপী শিক্ষার বৈশিষ্ট্যাবলি নিম্নে উল্লেখ করা হল—
1. ব্যক্তির ইচ্ছাধীণ: এই শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির ইচ্ছার  ওপর নির্ভর করে। কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই শিক্ষা স্ব-নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যক্তির প্রেষণার ওপর নির্ভরশীল।
2. লক্ষ্যভিত্তিক: নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জন—যেমন কোনো বিষয়ে জ্ঞানার্জন, পেশাগত দক্ষতা অর্জন, উচ্চতর
শিক্ষার্জন ইত্যাদি এই শিক্ষায় শ্রেষণা সঞ্চার করে।
3. সময়কাল নির্দিষ্ট নয় : যে সময় থেকে ব্যক্তি শিক্ষা গ্রহণে সমর্থ, সেই সময় থেকে আমৃত্যু তিনি শিক্ষা অর্জন
করতে পারেন।
4. নির্দিষ্ট কোনো পাঠক্রম নেই: নির্দিষ্ট এবং বাঁধাধরা কোনো পাঠক্রম নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠক্রষ
থাকলেও তা নমনীয়।
5. শিক্ষার্থী স্বাধীনতা: এখানে ব্যক্তি অর্থাৎ শিক্ষার্থী যথেষ্ট স্বাধীন। তার ইচ্ছা, সামর্থ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার স্বাধীনতা পায়।
6. নমনীয় মূল্যায়ণ: কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলেও তা যথেষ্ট নমনীয়।
7. জীবনব্যাপী শিক্ষার কোর্স: প্রথাগত শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সের বিষয়বস্তুকে জীবনব্যাপী শিক্ষার উপযোগী করে এই শিক্ষার কোর্স রচিত হয়। এ ছাড়া বৃত্তি শিক্ষার বিভিন্ন কোর্সও অন্তর্ভুক্ত হয়।
8. ব্যাবহারিক মূল্য: জীবনব্যাপী শিক্ষা কেবলমাত্র জ্ঞানার্জনের শিক্ষা নয়। ব্যক্তির ব্যাবহারিক জীবনেও এর বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়।
9. শির বিভিন্ন সংস্থার সংযোগসাধন : প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দূরশিক্ষা ও মুক্তশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে জীবনব্যাপী শিক্ষা নেটওয়ার্কের দ্বারা সংযুক্ত থাকে।
জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা
জ্যাক ডেলরসের নেতৃত্বে ইউনেস্কো কমিশনের প্রতিবেদনে (Learning throughout life: Challenges for the twenty-first century 1996) বলা হয়েছে, একবিংশ শতাব্দীর জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। শিক্ষার ব্যাক্তি জীবনবাদী হওয়ার পিছনে পাঁচটি প্রয়োজনের উল্লেখ করা যায়।
1. পরিবর্তনশীল জীবন: আধুনিক জীবন পরিবর্তনশীল।বর্তমানে প্রযুক্তির এবং তথ্য পরিবর্তনের যুগের সঙ্গে
সার্থক অভিযোজনের জন্য প্রয়োজন হল প্রবহমান শিক্ষা, যা জীবনব্যাপী শিক্ষার পক্ষেই সম্ভব।
2. বৃত্তি জগতের পরিবর্তন : প্রযুক্তির উন্নতি, নতুন প্রব্যের উৎপাদন, উৎপাদনের নতুন কৌশল এবং নতুন জ্ঞান বৃত্তি জগতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বর্তমান বৃত্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রকৃতির শিক্ষার প্রয়োজন যা জীবনব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থার সাহায্যে অর্জন করা সম্ভব।
3. সামাজিক পরিবর্তন : দ্রুত সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার বিশেষ
প্রয়োজন।
4. সমাজের দুর্বল অশ: সমাজের দুর্বল অংশের শিক্ষার চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে জীবনব্যাপী শিক্ষাব্যথা সাহায্য
করে।
5.জনসংখ্যার চরিত্রের পরিবর্তন। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের বয়স ষাট বছর।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে অনেকেই কর্মক্ষম। এদের কর্মক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতা জাতীয় উন্নয়নে ব্যবহার করা যায়। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। জীবনব্যাপী শিক্ষ ব্যাপারে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, আধুনিক বিশ্বে জীবনব্যাপী শিক্ষার প্রয়োজন যে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে শুধু তাই নয়, অপরিহার্যও হয়ে উঠছে।

শিক্ষার প্রধান প্রধান লক্ষ্য
শিক্ষা হল একটি নিরবচ্ছিন্ন, সচেতন ও ক্রমবিকাশমান সামাজিক প্রক্রিয়া। শিক্ষার লক্ষ্য বহুমুখী। তবে এগুলির মধ্যে প্রধান কয়েকটি হল- (1) ব্যক্তিগত বিকাশ, (2) সামাজিক বিকাশ, (3) জাতীয় বিকাশ এবং (4) ব্যক্তির বৃত্তিমূলক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, অভিযোজনমূলক এবং আন্তর্জাতিক সচেতনতার বিকাশের মধ্য দিয়ে বিশ্বনাগরিক সৃষ্টি করা।
শিক্ষার সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য
যে-কোনো একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিক্ষার পরিকল্পনা করলে, তা শিক্ষার ধারণার পরিপন্থী হবে। তবে আলোচ্ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে যে লক্ষ্যটিকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় তা হল ব্যক্তিগত বিকাশ।
ব্যক্তিগত বিকাশের গুরুত্ব
এই মতবাদের সমর্থকদের মতে, ব্যক্তির প্রয়োজনে সমাজের উৎপত্তি ঘটেছে।ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে সমাজের পৃথক কোনো তাৎপর্য নেই। ব্যক্তিই হল শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। তাই ব্যক্তির সুপ্ত সম্ভাবনার যথাযথ বিকাশ ঘটানোই হল শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে ব্যক্তিগত বিকাশের পক্ষে প্রধান যুক্তিগুলি হল-
1. গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিগত যুক্তি : গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বাক্তির সুপ্ত সম্ভাবনাগুলির পূর্ণ বিকাশই হল  শিক্ষার লক্ষ্য। ব্যক্তি যেটুকু ক্ষমতা নিয়ে এসেছে তার পূণ বিকাশ ঘটানোই হবে শিক্ষার লক্ষ্য।
2. ভাববাদী দর্শনের যুক্তি ব্যক্তির মধ্যে সুপ্ত ব্রহ্মসত্তার বিকাশসাধনই হল ভাববাদী দর্শন শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্য।
3. প্রকৃতিবাদী দর্শনের যুক্তি: শিক্ষা সম্পন্ন হবে উন্মুক্ত পরিবেশে ব্যক্তি তথা শিশুর চাহিদা, রুচি এবং আগ্রহ
অনুযায়ী। অর্থাৎ ব্যক্তিকেই এখানে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
4. প্রয়োগবাদী দর্শনের যুক্তি: প্রতিভাশালী ও বিশিষ্ট গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের দ্বারাই মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটে।
প্রয়োগবাদীরা তাই তাদের দার্শনিক চিন্তাধারায় শিশুর ব্যক্তিগত সামর্থ্য, ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও প্রবণতার প্রাধান্যের
কথা স্বীকার করেছেন।
5. জীববিজ্ঞানের যুক্তি: জিনতত্ত্ব অনুসারে প্রতিটি ব্যক্তির অন্তর্নিহিত স্বকীয়তা এবং পরিবেশের সঙ্গে তার
অভিযোজনের প্রবণতা একটি স্বীকৃত সত্য। এই স্বকীয়তার যথাযথ বিকাশ ঘটানোই শিক্ষার কাজ।
6. মনোবিজ্ঞানের যুক্তি: মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি ব্যক্তিই অনন্য সত্তার অধিকারী। শিক্ষর লক্ষ্য হবে ব্যক্তিগত পার্থক্যকে ভিত্তি করে ব্যক্তির বিকাশে সহায়তা করা।
7. ব্যক্তিগত বিকাশ অন্যান্য বিকাশকে সম্ভব করে তোলে: সমাজ, জাতি, সংস্কৃতি সবের মূলে হল ব্যক্তি। ব্যক্তির বিকাশের ফলেই সমাজ, জাতি এবং সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। বিকাশপ্রাপ্ত ব্যক্তিই সমাজ, জাতি এবং সংস্কৃতির বিকলে সক্রিয় অংশগ্রহণ বিকাশকে আরও সার্থক করে তোলে।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, শিক্ষার প্রধান প্রধান লক্ষ্যের মধ্যে 'ব্যক্তিগত বিকাশ বা ব্যক্তিতান্ত্রিক
লক্ষটিরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য
শিক্ষার লক্ষ এক নয়, বহু। যুগে যুগে বিভিন্ন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এবং সমাজতন্ত্রবাদী—এই দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছেন। যে শিক্ষাবিদ শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিকাশকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, তাঁদের বলা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের মত অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য হল ব্যক্তির সম্ভাবনাময় ব্যক্তিত্বের যথাযথ বিকাশসাধন। শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের সমর্থকদের মধ্যে রয়েছেন স্যার পার্সি নান, বার্ট্রান্ড রাসেল, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ।
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষের যোব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় সেগুলি হল— (1) শিক্ষার লক্ষ্য নিরূপণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি হল কেন্দ্রবিন্দু, (2) ব্যক্তিগত পার্থক্যকে গুরুত্ব দেওয়া, (3) শিক্ষার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির চাহিদা পূরণ করা এবং (4) ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে তার বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা।
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের সুবিধা
ব্যাক্তিতরে বিশ্বাসী চিন্তাবিদরা এই লক্ষ্যের কিছু সুবিধার কথা তুলে ধরেন-
i. মানবশিশু পৃথিবীতে জন্মলাভ করে কতকগুলি বৈশিষ্ট নিয়ে। এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কতকগুলি সাধারণ এবং প্রকৃতির হয়। কতকগুলি বিশেষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাই বিশেষ প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিকশিত করতে এবং সংরক্ষণ করতে সমর্থ হয়।
ii. শিশু পৃথিবীতে আবির্ভাবের মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিষ্স্ক্লু অবস্থায় থাকে। পরিবেশই তকে কলুষিত করে। তাই
সমাজ-পরিবেশের বাইরে তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষিত করলে সে উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারে।
iii. প্রতিটি বাত্তিই একক সত্তা।দলগত পদ্ধতিতে সকলকে একসাথে না পড়িয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতির সাহায্যে
পাঠদান করলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বকীয়তা বজায় থাকে এবং তারা নিজ নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী শেখার সুযোগ পায়।
iv. মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল আত্মোপলব্ধি। আত্মোপলদ্ধি দ্বারাই ব্যক্তির মধ্যে পরিপূর্ণতা আসে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে এই কাজটি (আত্মোপনস্থি) সহজেই সম্পন্ন করা যায়।
v. ব্যক্তির দ্বারা সমাজ গঠিত হয়। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির উন্নতি ঘটলে সমাজেরই উন্নতি হবে।
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্যের অসুবিধা বা ত্রুটি
এই সুবিধাগুলি সত্ত্বেও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর অনেক ত্রুটিও আছে। এগুলি হল-
i. অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যক্তিকে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। ব্যক্তি তখন সমাজের
কল্যাগের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কল্যাণকে বড়ো করে দেখে।
ii. ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষায় ব্যক্তিকে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তি অনভিজ্ঞতার
কারণে কি করণীয় বা করণীয় নয় তা বুঝে উঠতে পারে। না বা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে ব্যক্তির ক্ষতি হয়।
iii. সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা অসম্ভব ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা সমাজের মধ্যেই ঘটে, তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা
পরোক্ষভাবে সমাজের ওপর নির্ভরশীল।
iv. ব্যক্তিকেন্দ্রিক লক্ষ্যের সমর্থনে মনোবিজ্ঞানের যে তত্ত্ব রয়েছে তা ত্রুটিমুক্ত নয়। কারণ ব্যক্তি ও সমাজ-পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ফলেই ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব হয়।
v. প্রত্যেকের জন্য পৃথক শিক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং শিক্ষার ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিকাশের সুবিধা ও অসুবিধাগুলির
সাপেক্ষে এই কথা বলা যায় যে, কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক লক্ষ্যের মাধ্যমে শিক্ষার আধুনিক লক্ষ্যপূরণ তথা জাতীয় বিকাশ সম্ভব নয়।

শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য
শিক্ষার লক্ষ্য এক নয়, বহু। যুগে যুগে বহু দার্শনিক এবং শিক্ষাবিদ শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এবং সমাজতন্ত্রবাদী— এই দুই গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছেন। যেসব শিক্ষাবিদ শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে সামাজিক দিকের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁদের বলা হয় সমাজতন্ত্রবাদী। তাঁরা মনে করেন সমাজের বাইরে ব্যক্তির পৃথক কোনো অস্তিত্ব নেই।
শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
i. সমাজকে বাদ দিয়ে ব্যক্তির পৃথক কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই সমাজের লক্ষ্য এবং ব্যক্তির লক্ষ্য এক হবে।
ii. সমাজের কল্যাণ হলেই ব্যক্তির কল্যান হবে।
iii. সমাজই ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিতে পারে।
iv. সামাজিক চাহিদা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষ পূরণ করাই হবে শিক্ষার কাজ।
শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সুবিধা
সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সুবিধাগুলি হল—
i. সমাজজীবন ব্যক্তিকে সবধরনের নিরাপত্তার আশ্বাস দেয় এবং তার সামনে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।
ii. সমাজ পরিবেশই বংশানুক্রমে অর্জিত অতীতের সুন্দর ও সফল অভিজ্ঞতাগুলি ব্যক্তির সামনে অনুশীলনের জন্য তুলে ধরে।
iii. সামাজিক রীতিনীতি এবং অনুশাসনগুলি ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজের কল্যান  সাধন করে।
iv. সমাজের সভ্য হিসেবে প্রতিটি ব্যক্তি সমাজের যাবতীয় সুযোগসুবিধা ভোগ করে। শুধু তাই নয়, এই সুযোগসুবিধাকে ব্যক্তি তার আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তির কাজে ব্যবহার করে।
v. সমাজ দুর্বল এবং সবল সব ধরনের ব্যক্তিকেই আশ্রয় দেয় এবং সবারই মঙ্গলকামনা করে।
vi. এমন কতকগুলি দায়িত্ব থাকে যা এককভাবে কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্র ওই কাজের দায়িত্ব নেয়। ফলে সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যই বলবৎ হয়।
শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের ত্রুটি বা অসুবিধা
সমাজতান্ত্রিক লক্ষের অনেক ত্রুটি আছে। নীচে এগুলির সংক্ষেপে আলোচনা করা হল-
i. শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক সমাজের চাহিদা, আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যক্তির সামর্থ্য, চহিদা, ইচ্ছা-অনচ্ছিা অবহেলিত হয়। শিক্ষার ধরণা ও লক্ষ্য এর ফলে বাস্তবে যেমন ব্যক্তির কল্যান হয় না, তেমনি সমাজেরও কল্যাণ সাধিত হয় না। কারণ ব্যক্তিদের নিয়েই সমাজ গঠিত হয়।
ii. শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রাধান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বেচ্ছাচারিতা করার সুযোগ করে দেয়,
গণতন্ত্র অবহেলিত হয়। এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক, ছাত্র—সকলের মধ্যেই স্বেচ্ছাচারিতার মানসিকতা
তৈরি হয়।
iii. শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে সমাজতান্ত্রিকতার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় ব্যক্তিস্বাধীনতা যুগ্ম হয়। ব্যক্তির সৃজনশীলতা বিকাশের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।
iv. পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যক্তির আত্মবিকাশের পথ রুখে হয়, ফলে ব্যক্তির মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। সমস্ত মানুষের মধ্যের পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভ পরে বিদ্রোহের আকার ধারণ করতে পারে।

ওপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, শিক্ষার সমাক্ততান্ত্রিক লক্ষ্যে ব্যক্তি অপেক্ষা সমাজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ব্যক্তির ওপর সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে তা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের ক্ষতি করে। তাই আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য স্থির করার সময় ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বিবেচনা করতে হবে।

শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য
ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার যে লক্ষ্য নির্ধারিত হয় তাকে শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য বলে। ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোত্তিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিকাশ ব্যক্তিতান্ত্রিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্য। এই সমস্ত দিকের সুষ্ঠু বিকাশের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির জীবনকে সার্থক করাই হল বাণিকেন্দ্রিক শিক্ষার লক্ষ্য। বিশ্বের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদদের মধ্যে অনেকেই এই লক্ষ্যের সমর্থক। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্যার পাসি নান, বাট্রান্ড রাসেল, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ।শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য শিক্ষার যেসব লক্ষ্য সমাজকে কেন্দ্র করে স্থির করা হয়।সেগুলিকে শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য বলে। সমাজতান্ত্রিক লক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হারবাট স্পেনসার, ব্যাগলি, গান্ধিজি প্রমুখ। সমাজতন্ত্রবাদীরা মনে করেন, সমাজকে বাদ দিয়ে ব্যক্তির কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের মধ্য দিয়েই ব্যক্তিকল্যাণ সম্ভব। তাঁরা সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের কাছে ব্যক্তিগত স্বার্থকে মূল্যহীন বলে মনে করেন।এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সমাজতন্ত্রবাদীরা শিক্ষার যে লক্ষ্য স্থির করেছেন প্রকৃতপক্ষে তা-ই হল শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য।
শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সমন্বয়
ব্যক্তি এবং সমাজ পরস্পরের পরিপূরক এবং একে অন্যের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। অনুকূল সামাজিক পরিবেশ ছাড়া যেমন ব্যক্তির বিকাশ সম্ভব হয় না, তেমনি প্রতিটি ব্যক্তির প্রবণতা, সামর্থ্য ও সক্রিয়তার মাধ্যমেই সামাজিক অগ্রগতি ঘটে থাকে। এই কারণে আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য স্থির করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়কে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে যখন ব্যক্তির বিকাশের কথা বিবেচনা করা হবে তখন লক্ষ রাখতে হবে এই বিকাশ সমাজের পক্ষে কল্যাণকর কি না। একইভাবে সমাজের উন্নয়ন বা কল্যাণের কথা বিবেচনা করার সময় লক্ষ রাখতে হবে, ব্যক্তির স্বাধীনতা বা তার আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে কি না।
শিক্ষার লক্ষ্য হল ব্যক্তিকে সামাজিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে সমাজ-উন্নয়নকে সার্থক করে তোলা।এজন্য ব্যক্তির মধ্যে এমন সব দক্ষতা সৃষ্টি করার প্রয়োজন যা সামাজিক উৎপাদনে কাজে লাগে। বর্তমান শিক্ষার বিভিন্ন কার্যসূচির মধ্যে অন্যতম হল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিকাশে প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন করা। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, গান্ধিজি তাঁর বুনিয়াদি শিক্ষার পরিকল্পনায় এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কোঠারি কমিশনের সুপারিশেও সমাজের প্রয়োজনীয় উৎপাদনশীল কাজের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার কার্যসূচির মধ্যে এমন সব প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা দরকার যাতে আঞ্চলিক সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে তার সমাধানের পথ নির্দিষ্ট করা যায়। যেমন—পুকুর পরিষ্কার, আবর্জনা মুক্ত পরিবেশ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি। ডিউই তাঁর প্রকল্প পদ্ধতিতে এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ওপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তির বিকাশের সঙ্গে সামাজিক বিকাশের সুসমঞ্জস মেলবন্ধন। প্রকৃত অর্থে শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, বরং একটি অপরটির পরিপূরক।

শিক্ষার লক্ষ্য ব্যক্তিগত বিকাশ
“শিক্ষার লক্ষ্য ব্যক্তিগত বিকাশ”—এই বক্তব্যে ব্যক্তিকেই শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ব্যক্তির বিকাশকে কেন্দ্র করেই শিক্ষার কর্মসূচি পরিকল্পিত এবং বাস্তবায়িত হয়। এই মতবাদ অনুযায়ী আগে ব্যক্তি, পরে সমাজ। ব্যক্তির বিকাশ ঘটলেই সমাজের বিকাশ ঘটবে। নান, রুশো, বার্ট্রান্ড রাসেল, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ শিক্ষাবিদ শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
1. ব্যক্তিগত বিকাশের গুরুত্ব: শিক্ষার লক্ষ হিসেবে ব্যক্তিগত বিকাশ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান শিক্ষা পরিকল্পনায় বাক্তির দৈহিক বিকাশের জন্য পাঠক্রনে শরীরচর্চা, ব্যায়াম প্রভৃতি সহপাঠক্রমিক কাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর মানসিক, বৌদ্ধিক, প্রাক্কোত্তিক, সামাজিক, নৈতিক প্রভৃতি দিকের বিকাশের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিষয়কে পাঠক্রমে স্থান দেওয়া হয়।
2. ব্যক্তিগত বিকাশে শিক্ষার ভূমিকা: ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা হল—
i. ব্যক্তির সুপ্ত সম্ভাবনাগুলিকে শনাক্ত করা এবং তার যথাযথ বিকাশে সহায়তা করা।
ii. পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তির সংযোগসাধন ও সামঞ্জস্যবিধান করা।
iii. ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করা।
iv. ব্যক্তির চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকাশে এবং প্রকাশে সাহায্য করা।
v. বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে ব্যক্তিকে যুক্ত করা।
vi. ব্যক্তিকে সমাজের উপযুক্ত সদস্যে পরিণত করা।
vii. ব্যক্তিকে দেশের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা।
vil. সর্বোপরি, ব্যক্তিকে প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করা।
শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য অবশ্যই কস্তিগত বিকাশ। তবে এর ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিলে ব্যক্তি স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে, সামাজিক প্রত্যাশাগুলি পূরণ হবে না, সমাজ পিছিয়ে পড়বে, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হবে। ব্যক্তির ওপরেও তার অবান্বিত প্রভাব পড়বে। তাই কোনো একটি বিশেষ দিককে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যক্তির সমন্বিত এবং সুসংহত বিকাশসাধনই হবে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য।

ব্যক্তিগত বিকাশে শিক্ষার ভূমিকা
শিক্ষার লক্ষ্য নিরূপণ করতে গেলে যে তিনটি বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া হয়, তাদের প্রথমটি হল ব্যক্তিগত বিকাশ।ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা হল--
1. ব্যক্তির সুপ্ত গুলিকে শান্ত করা এবং বিকাশে সহায়তা করা: শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল শিশুর সম্ভাবনাগুলিকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলির পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করা।
2. পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তির অভিযোজনে সাহায্য করা : বক্তিজীবনের লক্ষ্য হল পরিবর্তনশীল
পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া। শিক্ষা এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে সাহায্য করে।
3. ব্যক্তিকে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া : বিভিন্ন পাঠক্রম ও
সহপাঠক্রমিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শিক্ষা ব্যক্তিকে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
4. ব্যক্তির চিন্তাভির বিকাশ এবং তাঁর প্রকাশে সহায়তা করা: শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ব্যক্তির স্বাধীন
চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়তা করা।
5. সামাজিক কাজের সঙ্গে ব্যক্তিকে যুক্ত করা: ব্যক্তির সমাজিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে হলে ব্যক্তিকে সমাজের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রেও শিক্ষা বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
6. ব্যক্তিকে সমাজের উপযুক্ত সদস্যে পরিণত করা: ব্যক্তি যাতে সমাজের একজন উৎপাদনশীল এবং সক্রিয়
নাগরিক হতে পরে, সমাজকে কিছু দিতে পারে সে ব্যাপারে শিক্ষা ব্যক্তিকে সাহায্য করে।
7. ব্যক্তিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা: শিক্ষার অন্যতম কাজ হল বাস্তিকে জাতির অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে দেশের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো।
8. ব্যক্তিকে 'প্রকৃত' মানুষ হতে সাহায্য করা: প্রকৃত মানুষ হতে গেলে শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু গুণের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যত্তিকে সেইসব গুণ অর্জনে সাহায্য করে।
ওপরের বিষয়গুলির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, শিক্ষা বিভিন্নভাবে ব্যক্তির সুপ্ত সম্ভাবনাগুলির বিকাশে সাহায্য করে এবং ব্যক্তিকে প্রকৃত মানুষ করে তোলে।

ব্যক্তিগত বিকাশের উপযোগিতা
শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে ব্যক্তির বিকাশ চুবই তাৎপর্যপূর্ণ।বিকাশের উপযোগিতা নীচে আলোচনা করা হল।
1. দৈহিক বিকাশ: শিক্ষা শুধুমাত্র পুথিগত বিদ্যার্জনেই সীমাবদ্ধ নয়। দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয় এবং
পেশিসমূহের সঠিক গঞ্চালনও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর ফলেই ব্যক্তি বিভিন্ন কাজে দক্ষ হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তির দৈহিক বিকাশ।
2. মানসিক বিকাশ : ব্যক্তির মানসিক প্রক্রিয়াগুলি যেমন— স্মৃতি, কল্পনা, চিন্তন, যুক্তি নির্ণয়, প্রবণতা, মনোযোগ, আগ্রহ প্রভৃতি সমস্ত বৈশিষ্ট্য পুথিগত বা কর্মমূলক সমস্ত ধরনের শিক্ষার ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। এই বৈশিষ্ট্যগুলির বিকাশ শিক্ষাকে সফল করে তুলতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
3. বৌদ্ধিক বিকাশ: ব্যক্তির জ্ঞান ও বৌদ্ধিক বিকাশ শিক্ষার লক্ষ্যপূরণে সাহায্য করে। জ্ঞান ও বৌদ্ধিক বিকাশের ফলে শিক্ষার্থী পরিবেশকে আরও ভালো করে বুঝতে পারে, জীবনের সমস্যার দিক বিশ্লেষণ করে তার
সমাধানের পথ খুঁজে নিতে পারে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করা এবং সেইভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা তার
পক্ষে সম্ভব হয়।
4. প্রাক্ষোডিক বিকাশ: শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, শিখনের প্রতি ভালোবাসা, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, ধৈর্য,
জ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা সবই প্রাঙ্কোভিক বিকাশের পরিচয় যা শিক্ষার ফলেই ঘটে। এইভাবে ব্যক্তির প্রান্ধোজিক বিকাশ শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।
5. নৈতিক বিকাশ: ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, জীবনসংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস প্রভৃতি শিক্ষার বিশেষ লক্ষ্য।
6. সামাজিক বিকাশ: সমাজে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা, সমাজের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান মেনে
চলা ইত্যাদি ব্যক্তির সামাজিক বিকাশের বৈশিষ্ট্য। শিক্ষার লক্ষপূরণে ব্যক্তির মধ্যে এই বিকাশ বিশেষভাবে
প্রয়োজন।
7.কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বিকাশ: দেশ ও জাতির কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুভূতিশীল হওয়া, কৃষ্টি ও সংরক্ষণ, সঞ্চালন ও উন্নয়নে সার্থকভাবে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়েই শিক্ষার কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্য অর্জিত হয়।
8. কর্মদক্ষতার বিকাশ: ব্যক্তিকে কর্মদক্ষ করে তুলে জাতীয় উৎপাদনে তাকে শামিল করা শিক্ষার অন্যতম
লক্ষ্য। এর মধ্য দিয়েই ব্যক্তি তথা জাতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
9. সুনাগরিকতার বিকাশ: সুনাগরিকের দায়িত্ব ७ কর্তব্যপালন, নাগরিক জীবনে সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ, নাগরিক জীবনের সমস্যার প্রতি সচেতনতা, অন্ধ- কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব হওয়া, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
গঠন সবই হল সুনাগরিকের বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যগুলি গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই শিক্ষার লক্ষ্য অর্জিত হয়।
10 গণতান্ত্রিক বিকাশ: ব্যক্তির মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটিয়ে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা শিক্ষার অন্যতম লক্ষ। তাই শিক্ষার লক্ষ্যকে সার্থক করে তুলতে ব্যক্তির মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে হবে।
ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ব্যক্তির অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাগুলির যথাযথ বিকাশ ঘটলে ব্যক্তি পূর্ণতা লাভ করে এবং প্রকৃত মানুষে পরিবর্তিত হয়, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামাজিক ও জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।

শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য বলতে বোঝায় সামাজিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ, সঞ্চালন এবং সমাজপ্রগতিকে সার্থক করে তোলা। শিক্ষার এই লক্ষ্যে সমাজের সর্বপ্রকারের কল্যাণের কথাই বলা হয়।

‘শিক্ষার লক্ষ্য হল সামাজিক বিকাশ’—এই মতের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সমর্থকের নাম হল হারবার্ট স্পেনসার,
ডিউই, হেগেল, হবস্, রেমন্ট, অধ্যাপক ব্যাগলি প্রমুখ চিন্তাবিদ।

ব্যাগলির মতে ‘সামাজিক সামর্থ্য’ সৃষ্টি করা শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। প্রত্যেক ব্যক্তির কার্যক্ষমতার যথাসম্ভব বিকাশ ঘটিয়ে তাকে সামাজিক সামর্থ্যযুক্ত করে গড়ে তোলাই শিক্ষার উদ্দেশ্য।

হারবার্ট স্পেনসার সমাজকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, দেহ ছাড়া কোশের যেমন মূল্য থাকে না, তেমনি সমাজ ছাড়া ব্যক্তিরও কোনো মূল্য নেই।অর্থাৎ শিশুকে যদি সমাজের মধ্যে রেখে শিক্ষা দেওয়া না যায়, তা হলে তার সামাজিক বিকাশ ঘটবে না।

পারস্পরিক ভাবের আদানপ্রদান, সচেতনতা এবং কার্যকলাপের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে অবস্থানগত নৈকট্যের
কারণে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাকে এককথায় বলে সমাজ।

শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সপক্ষে একটি যুক্তি হল–শিক্ষা এমন একটি সংগঠিত সমাজ সৃষ্টিতে সহায়তা করে যা খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা, বিচার, বৃত্তি এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুযোগসুবিধা প্রদান করে।

ভারতের জাতীয় বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা
ভারতের মতো বিশাল দেশে জাতীয় বিকাশের পথে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। যেমন—
1. বিভিন্ন ধর্মের সমাবেশ: ভারত বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দেশ। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ। এর ফলে তাদের মধ্যে বিরোধ বা বিভেদ দেখা যায়, যা জাতীয় জীবনে অনৈক্য সৃষ্টি করে।
2.ভাষার ভিন্নতা: ভাষার ভিন্নতাও জাতীয় বিকাশের অন্তরায়।হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হলেও
ভাষাসমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি।
3. জাতিভেদপ্রথা অনুসরণ: প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে কঠোরভাবে জাতিভেদপ্রথা মেনে চলা হত। শূদ্র
প্রভৃতি নিম্নবর্ণের সমাজের মানুষদের শিক্ষার অধিকার ছিল না। এর ফলে সমাজব্যবস্থায় বিরাট এক ব্যবধান সৃষ্টি। হয়েছিল, যা আজও আমাদের দেশের জাতীয় বিকাশের ক্ষেত্রে এক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
4. অর্থনৈতিক বৈষম্য: দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন বর্তমানে যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেলেও জনগণের মধ্যে
ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য জাতীয় বিকাশের পথে বাধার সৃষ্টি করছে।
5. বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ: ভারত হল বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলির অন্যতম।এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে অসহিমৄতা অনেক সময় জাতীয় বিকাশের পথে বাধার সৃষ্টি করে।
6. অশিক্ষা: ভারতের মোট জনসংখ্যার একটা বড়ো অংশ এখনও নিরক্ষর।শিক্ষার আলো থেকে এরা বঞ্চিত। যতদিন না এইসব মানুষের কাছে জ্ঞানের আলো পৌঁছোবে ততদিন জাতির সুষম বিকাশ ও উন্নতি সম্ভব নয়।
7. মূল্যবোধের অভাব: ভারতে বিভিন্ন কারণে জনগণের মধ্যে মূল্যবোধের অভাব দেখা দিয়েছে।
8. সমাজসচেতনতার অভাব: সমাজ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে মানুষ স্বার্থপর হয়ে উঠছে।আর এর ফলেই ভারতে জাতীয় বিকাশ প্রত্যাশানুযায়ী হচ্ছে না।

9. বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব: বিজ্ঞানমনস্কতার অভাবের ফলে আমাদের দেশের বহু মানুষ আজও অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, যার ফলে প্রতি মুহূর্তেই জাতীয় বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আশু প্রয়োজন হল, জাতীয় বিকাশের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত বাধাগুলি দূর করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

No Content