Chapter-1, কে বাঁচায়, কে বাঁচে

নিখিল মাঝেমধ্যে যখন মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক শক্তির কাছে কাবু হয়ে পড়ে, তখনই সে মৃদু ঈর্ষার সঙ্গে ভাবে।

মৃদু ঈর্ষার সঙ্গে তখন নিখিল ভাবে যে, সে যদি নিখিল না হয়ে।মৃত্যুঞ্জয় হত, তাহলে খারাপ হত না।

নিখিল অনুমান করতে পারল যে, মৃত্যুঞ্জয় বড়ো একটা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এবং সেই সংকটের অর্থহীন কঠোরতায় সে শার্শিতে আটকে পড়া মৌমাছির মতো মাথা খুঁড়ছে।

: প্রশ্নোদ্ভূত উক্তিটি মৃত্যুঞ্জয় অন্যমনস্কভাবে, অস্ফুট বাক্যে আর্তনাদের মতো করে নিখিলকে বলেছিল।

মৃত্যুঞ্জয়কে আরও কয়েকটি প্রশ্ন করে নিখিলের মনে হয়েছিল যে,মৃত্যুঞ্জয়ের মনের ভেতরটা যেন সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

ফুটপাথের অনাহার-মৃত্যুর মতো সাধারণ এবং সহজবোধ্য ব্যাপারটা যে মৃত্যুঞ্জয় ধারণায় আনতে পারছে না, নিখিলের কাছে তা আশ্চর্য নয়।

নিখিল মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি অবজ্ঞা এবং ঈর্ষা—এই দুই নেতিবাচক মনোভাব মৃদুভাবে পোষণ করত।

আদর্শবাদ হল মানবসভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে পচা ঐতিহ্য—গল্পটিতে আদর্শবাদ সম্বন্ধে এমন কথাই বলা হয়েছে।

'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পে লেখক মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে বলেছেন যে, তা শ্লথ, নিজে নয়।

মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শ্লথ হলেও নিস্তেজ নয় বলে মনে করে নিখিল।

মৃত্যুঞ্জয় নিরীহ, শান্ত, সহজসরল এবং সৎ হওয়ার পাশাপাশি মানবসভ্যতার প্রাচীনতম বস্তাপচা ঐতিহ্য আদর্শবাদের কল্পনা -তাপস বলে নিখিল মৃত্যুঞ্জয়কে পছন্দ করত ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পে মৃত্যুঞ্জয়কে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুপা হেঁটে ট্রামে উঠতে হত।

মৃত্যুঞ্জয় বাড়ি থেকে ভাজা, ডাল, তরকারি, মাছ, দই আর ভাত খেয়ে এসেছিল।

মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মোটেও শ্লথ বা নিস্তেজ ছিল না, শক্তির একটা উৎস ছিল তার মধ্যে।

মৃত্যুঞ্জয় মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে পচা ঐতিহ্য আদর্শবাদের কল্পনা-তাপস বলে নিখিল তাকে হয়তো মৃদু একটু অবজ্ঞার সঙ্গে ভালোও বাসে।

মৃত্যুঞ্জয় বেঁচে থাকা সত্ত্বেও একটা লোক না খেতে পেয়ে ফুটপাথে মারা গেল | প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে সেই অপরাধের কথাই বলা হয়েছে।

“কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের চোখে প্রথম ফুটপাথে অনাহারে মৃত্যুর দৃশ্য ধরা পড়ল ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'কে বাঁচায় কে বাঁচে গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের বমি করা ও শরীর খারাপ দেখে সহকর্মী নিখিল তাকে এ কথা বলেছিল।

মৃত্যুঞ্জয় নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিল কারণ দেশের লোকের অনাহারজনিত মৃত্যুর কথা জেনেশুনেও সে চারবেলা পেটপুরে খেয়েছে। ৩৫. 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পটি প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়? উত্তর: 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো' গল্পটি ১৩৫০ বঙ্গাব্দে প্রথম সারদাকুমার দাস সম্পাদিত ভৈরব পত্রিকার প্রথম শারদসংখ্যায় প্রকাশিত হয় ।

এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পের অনাহার মৃত্যুর কথা শুধু শুনে আর পড়ে এসেছিল

'কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পের মুখ্য চরিত্র মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়িটা শহরের নিরিবিলি এবং ফুটপাথহীন অঞ্চলে হওয়ায় এর আগে ফুটপাথের অনাহার মৃত্যু তার চোখে পড়েনি।

“কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মৃত্যুঞ্জয় ফুটপাথে একদিন অনাহার মৃত্যু দেখার পর অফিসে গিয়ে রীতিমতো কাবু হয়ে পড়েছিল।

মৃত্যুঞ্জয় কলঘরে উঠে যায় সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসা ভাজা, ডাল, তরকারি, মাছ, দই, জাত সব খাবার বমি করে দেওয়ার জন্য।

নিখিল যখন মৃত্যুভয়ের খবর নিতে এল তখন মৃত্যুঞ্জয় কলঘর থেকে বমি করে ফিরে কাচের মাসে জল খাচ্ছিল।

মৃত্যুক্ষয়ের সহকর্মী বন্ধু নিখিল পাশের কুঠুরি থেকে মৃত্যুঞ্জয়ের খবর নিতে এসেছিল।

গ্লাসটা খালি করে নামিয়ে রেখে মৃত্যুঞ্জয় শূন্যদৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল।

মৃত্যুস্ক্রয়ের অফিসের সহকর্মী-বন্ধু নিখিল তাকে পছন্দও করে এবং মৃদু অবজ্ঞার সঙ্গে ভালোও বাসে।

মৃত্যুঞ্জয়ের অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে যখন নিখিল তাকে জিজ্ঞাসা করে, যে তার কী হয়েছে, তখনই সে কথাগুলি জানায়।

'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পটি পঞ্চাশের দশকে মন্নস্তরের পটভূমিকায়। রচিত হয়েছে বলেই লেখক ফুটপাথের অনাহার মৃত্যুর ঘটনাকে সাধারণ, সহজবোধ্য বলেছেন।

মৃত্যুওয় একদিন অফিস যাওয়ার পথে ফুটপাথে অনাহার মৃত্যুর মতো। এক বীভৎস দৃশ্য দেখে ফেলে। সেটাই তার অসুস্থতার কারণ ছিল।

কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের ছোটোভাই ও তার বাড়ির চাকর তাদের বাড়ির বাজার এবং কেনাকাটা করত।

এখানে ফ্রুটপাথে মৃত্যুঞ্জয়ের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে অনাহারে মৃত্যু দর্শনের কথা বলা হয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্পে একদিন বাড়ি থেকে অফিস যাওয়ার পথে মৃত্যুঞ্জয় প্রথম অনাহারে মৃত্যু দেখেছিল।

নিজের চোখে অনাহারে মৃত্যু দেখার আগে পর্যন্ত মৃত্যুঞ্জয় শুধু খবরের কাগজ পড়ে আর লোকের মুখে শুনেই সেই ব্যাপারে জেনেছিল।

মৃত্যুঞ্জয়দের বাড়ি ছিল কলকাতা শহরের এক নিরিবিলি পাড়ায়, যেখানে ফুটপাথ বেশি ছিল না এবং লোকও বেশি মরতে দেখা যেত না।

মৃত্যুঞ্জয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু-পা হেঁটে রাস্তায় গিয়ে ট্রামে উঠত এবং ট্রাম থেকে অফিসের দোরগোড়ায় নামত ।

মনে আঘাত পেলো মৃত্যুঞ্জয়ের শরীরে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।মনঃকষ্টের সঙ্গে সে শারীরিক কষ্টও অনুভব করে।

অনাহারে মৃত্যু দেখার দিন শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যন্ত মৃত্যুঞ্জয় অফিসে পৌঁছে বাড়ি থেকে খেয়ে আসা খাবারের সমস্তটাই বমি করে দিয়েছিল।

নিখিল বই পড়ে এবং নিজস্ব একটা চিন্তাজগৎ গড়ে তুলে তার অবসরজীবনটা কাটাতে চায়।

একটা বাড়তি কর্মডারের জন্য নিখিলের সমপদস্থ মৃত্যুঞ্জয় থেকে পঞ্চাশ টাকা বেশি মাইনে পায়।

নিখিলের চেহারা ছিল রোগা। প্রকৃতিগত দিক থেকে সে ছিল প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন এবং একটু অলস।

নিখিল মৃত্যুঞ্জয়ের দুবছর আগে বিয়ে করলেও সংসারে তার মন ছিল না। বরং তার মন বইপত্র এবং চিন্তাজগতেই ডুবে থাকত |

আদর্শবাদী মৃত্যুওয়কে মৃদু হিংসা এবং মৃদু অবজ্ঞা করলেও নিখিল তাকে শুধু পছন্দই করত না, ভালোও বাসত।

নিখিল প্রশ্ন করলে মৃত্যুঞ্জয় উত্তরে পালটা প্রশ্ন করে যে, সে বেঁচে থাকতে লোকটা যে না খেয়ে মরে গেল, তার সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কী।

অনাহার-মৃত্যু দেখার পর দুঃখে এবং অপরাধবোধে জর্জরিত মৃত্যুঞ্জয় অনাহারী মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করত। তার রাতে ঘুম হত না এবং খেতে বসলে সে খেতে পারত না।"

মন্বন্তরগ্রস্ত লোকদের খাবার বিলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বক্তা মৃত্যুঞ্জয় সম্ভীক এক বেলা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল।

সে না খেলে তার অসুস্থ স্ত্রী যে অন্ন গ্রহণ করে না, বক্তা মৃত্যুঞ্জয় তাকেই অন্যায় এবং অত্যাচার বলেছে।

মৃত্যুঞ্জয় না খেলে তার অসুস্থ স্ত্রী অন্ন গ্রহণ করত না। তার আচরণে ক্ষুদ্ধ এবং তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে উৎকণ্ঠায় মৃত্যুঞ্জয় এ কথা বলেছিল

ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ জেনেও চারবেলা পেটপুরে খাওয়া এবং ত্রাণকার্যে লোকাভাব থাকলেও সে কাজে অংশ না নিয়ে অবসর কাটানোর চিন্তায় মশগুল হয়ে থাকার জন্য মৃত্যুঞ্জয় নিজেকে ধিক্কার জানিয়েছিল।

নিখিল প্রতিমাসে তিন জায়গায় যে অর্থসাহায্য করে, সেই তিনটি সাহায্য পাঁচ টাকা করে কমিয়ে দেবে কি না- সে কথাই ভাবছিল নিখিল ।

দুর্ভিক্ষের জন্য নিখিল তার খাওয়াদাওয়া যতদূর সম্ভব কাটছাঁট করে কনিয়ে নিয়েছিল।

মৃত্যুঞ্জয় নিখিলকে 'পাশবিক স্বার্থপর' এবং 'বন্ধ পাগল' বলে তিরস্কার করেছিল

ভিক্ষা দেওয়ার মতো অস্বাভাবিক পাপ আজও পুণ্য বলে পরিগণিত হয় বলেই 'জীবনধারণের অন্নে মানুষের দাবি জন্মাচ্ছে না বলে মনে করে নিখিল

অনাহারী মানুষদের এক কাপ অখাদ্য স্ক্যান দেওয়ার বদলে যদি তাদের স্বার্থপর করে তোলা যেত, তবে নিখিলের মতে 'অন্ন থাকতে বাংলায় না খেয়ে কেউ মরত না ।

ফুটপাথে যেদিন মৃত্যুভয় অনাহারে মৃত্যু দেখেছিল, সেদিনের পর থেকেই সে বিষা, গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।

অনাহারীরা স্বার্থপর হলে অন্ন হাজার মাইল দূরে থাকলেও অথবা একত্রিশটা তালা লাগানো গুদামে থাকলেও অম্ল না পেয়ে মরত না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো গল্পের মুখ্য চরিত্র মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়িতে ন-জন লোক ছিল।

প্রশ্নে উদ্ধৃত উত্তিটি মৃত্যুঞ্জয়ের অফিসের সহকর্মী-বন্ধু নিখিলের।

দশজনকে খুন করার চেয়ে নিজেকে না খাইয়ে মারা বড়ো পাপ এই বক্তব্যকে মৃত্যুঞ্জয় একধরনের পানবিক স্বার্থপরতা বলে উল্লেখ করেছে এখানে।

নিখিল সংবাদপত্রে চোখবুলিয়ে দেখতে পেল ভালোভাবে সদ্‌গতির ব্যবস্থা করে গোটা কুড়ি মৃতদেহকে স্বর্গে পাঠানো হয়নি বলে একস্থানে তীক্ষ্ণধার হাহুতাশ করা মন্তব্য করা হয়েছে।

মৃত্যুত্তয় অফিসের মাইনের দিন নিখিলের হাতে একতাড়া নোট দিয়ে। সেগুলি রিলিফ ফান্ডে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। এখানে সেই কাজের কথাই বলা হয়েছে।

ভিক্ষা দিয়ে মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্রোর সমস্যাকে বাইরে থেকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে নিখিল ভিক্ষা দেওয়াকে 'অস্বাভাবিক 'পাপ' বলে ভেবেছিল।

মন্নস্তরে বা স্বাভাবিক অবস্থায় ভিক্ষা দিয়ে রুঢ় বাস্তব নিয়মকে উলটে যে মধুর আধ্যাত্মিক নিয়ম তৈরি করা হয়, তাকেই নিখিল অনিয়ম বলে ভেবেছে।

নিখিল প্রতি মাসে তিন জায়গায় কিছু কিছু করে যে অর্থসাহায্য পাঠাত সেই সাহায্যের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

মৃত্যুঞ্জয় যে সস্ত্রীক একবেলা খাবার না খেয়ে সেই খাবার দুর্ভিক্ষপীড়িতদের বিলিয়ে দেয়, তা করে দেশের লোককে বাঁচানো যায় না বলে মনে করে নিখিল ।

জলে সেদ্ধ করা তরল খাদ্য বা ভাতের ফ্যানই হল 'গ্রুয়েল'।

দুর্ভিক্ষপীড়িতদের এক কাপ করে গ্রুয়েল দেওয়ার বদলে তাদের | স্বার্থপর করে তুললেই তাদের ভালো করা হত নিখিল এমনটাই মনে করে।

অফিসে মাইনের দিনে সহকর্মী নিখিলের সঙ্গে আদর্শগত মতবিরোধের পর থেকে মৃত্যুঞ্জয় দিন দিন কেমন যেন হয়ে যেতে লাগল ।

মাইনের দিনের পর থেকে মৃত্যুঞ্জয় অফিসে দেরি করে আসত এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেরিয়ে যেত, কাজে ভুল করত, আর প্রায়সময়েই অফিসে বসে বসে ভাবত।

অনাহারীরা সারাদিন খোলা ফুটপাথে বা বড়ো কোনো গাছের তলায় বা ডাস্টবিনের ধারে পড়ে থাকত।

আশ্রয়হীন অনাহারীরা অনেক রাতে শহরের দোকানপাট কধ হলে হামাগুড়ি দিয়ে নিকটবর্তী রোয়াকে উঠে আশ্রয় গ্রহণ করত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পে অনাহারীরা ভোর চারটে থেকে লঙ্গরখানায় অন্নের প্রত্যাশায় লাইন দিত।

পথে পথে ঘুরে বেড়ানো বন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়ির লোকেদের খোঁজখবর নিতে নিখিলকে মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়িতে বার বার আসতে হয়।

টুনুর মা নিখিলকে সকাতর অনুরোধ জানায় যে, নিখিল যেন মৃত্যুঞ্জয়ের খেয়াল রাখে, সে যেন যতটা সম্ভব মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে থাকে।

টুনুর মার অনুরোধে নিখিল তাকে জানায় যে, সে যদি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠে পরিবারের বাকি সকলের দেখভাল করে তবেই সে মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে থাকবে ।

: টুনুর মার মতে অনাহারীদের জন্য কিছুই কি করা যায় না— সেই ভাবনাতেই মৃত্যুঞ্জয়ের মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে ।

যথাসর্বস্ব দান করেও সে অনাহারীদের কিছুমাত্র ভালো করতে পারবে না—মৃত্যুভয়ের এই ধারণার কথাই এখানে বলা হয়েছে।

মৃত্যুঞ্জয় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের হৃদয়ে অভিযোগ ও প্রতিবাদের অনুপস্থিতি লক্ষ করে।

ফুটপাথবাসী হয়ে যাওয়ার আগে মৃত্যুওয় ধুতি এবং সিল্কের জামা পরত।

পাকাপাকিভাবে ফুটপাথবাসী হলে মৃত্যুঞ্জয়ের ধুতির বদলে ছেঁড়া কাপড় জোটে, নিজের জামা অদৃশ্য হয়ে গায়ে মাটি জমা হয়, তার মুখ দাড়িগোঁজে ভরে যায়।

ফুটপাথবাসী হয়ে যাওয়ার পর খালি গায়ে ঘুরে বেড়ানোর ফলে মৃত্যুঞ্জয়ের সারা গায়ে মাটির স্তর পড়ে যায় এবং তার মুখ গোঁফ-দাড়িতে ভরে যায়।

সুস্থ থাকলে টুনুর মা যে তার স্বামী মৃত্যুগুয়ের সঙ্গে ফুটপাথে ঘুরে বেড়াত, সেকথাই সে নিখিলকে জানায়।

'কে বাঁচায়, কে বাঁচে পরে প্রশ্নোদ্ধৃত এই উত্তিটি মৃত্যুঞ্জয়ের স্ত্রীর (অর্থাৎ টুনুর মার।

ফুটপাথে পড়ে থেকে আর দশজন ভিখিরির মতো মৃত্যুঞ্জয় বলে— গা থেকে এইছি। খেতে পাইনে বাবা। আমায় খেতে দাও।

দুর্ভিক্ষপীড়িত সকলে অভিযোগহীন এবং প্রতিবাদহীনভাবে ঝিমানো সুরে তাদের দুর্ভাগ্যের কথা, দুঃখের কাহিনি বলে।

মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়ির অন্য সবাই মৃত্যুগুয়ের স্ত্রীকে এই খবর দেয় যে, মৃত্যুঞ্জয় খানিক পরেই আসছে।

মৃত্যুঞ্জয় বেশ কিছুদিন ধরে শহরের দুর্ভিক্ষপীড়িতদের দুর্বিষহ জীবনের যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, সেই অভিজ্ঞতার কথাই এখানে বলা হয়েছে।

ফুটপাথে অনাহার মৃত্যু দেখার পর অনাহারক্লিষ্ট মানুষদের সঙ্গে দিন কাটাতে কাটাতে ক্রমে তাদের দলে যোগদান করায় মৃত্যুঞ্জয়ের গায়ের জামা ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের একঘেয়ে অভিযোগ শুনে শুনে বিরক্ত হয়ে মৃত্যুত্তর তাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করা বন্ধ করে দিয়েছে।

মৃত্যুওয়ের চোখ দেখে নিখিল টের পায় যে তার কোনো কথার মানেই মৃত্যুঞ্জয় বুঝতে পারছে না। তার অভিজ্ঞতার কাছে কথার মারপ্যাচ অর্থহীন হয়ে গেছে।

অনাদরে অবহেলায় এবং ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুঋয়ের ছেলেমেয়েগুলি চেঁচিয়ে কাঁদে।

মৃত্যুক্ষয় কলকাতা শহরের ফুটপাথে ও লঙ্গরখানাগুলিতে ঘুরে বেড়ায়।

নিখিল অনেক বুঝিয়েও বিকারগ্রস্ত মৃত্যুভয়ের পরিবর্তন ঘটাতে অক্ষম হয় ও হাল ছেড়ে দেয়।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র মৃত্যুঞ্জয় অফিস যাওয়ার পথে একদিন ফুটপাথে অনাহারে মৃত্যুর দৃশ্য দেখে। মন্বন্তরের সময়ে এমনটা আকছার ঘটলেও তা ছিল মৃত্যুঞ্জয়ের জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। আবেগপ্রবণ আদর্শবাদী মৃত্যুঞ্জয় তাই করুণ এই দৃশ্যটি দেখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রচন্ড মানসিক আঘাতের ফলে শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। রীতিমতো কাহিল অবস্থায় অফিসে পৌঁছে সে অফিসের বাথরুমে বাড়ি থেকে খেয়ে আসা তৃপ্তির খাবার বমি করে বের করে দেয়। পাশের কুঠরি থেকে খবর নিতে আসে তার সহকর্মী বায়ু নিখিল। নিখিল দেখে মৃত্যুঞ্জয় ভাবলেশহীন চাহনিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে, সামনে টেবিলের ওপর শূন্য কাচের গ্লাস রাখা। তাকে দেখে নিখিলের মনে হয় যে, নিশ্চয়ই কোনো এক বড়ো সমস্যায় পড়েছে মৃত্যুন্তর। সেই সমস্যার নিরর্থক, অন্যায্য কঠোরতায় শার্শিতে আটকে পড়া মৌমাছির মতো মৃত্যুঞ্জয় মাথা খুঁড়ছে। লেখক নিখিলের এই দেখার মধ্যে দিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার একটা স্বচ্ছ ধারণা সুন্দরভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। এককথায় মৃত্যুঞ্জয়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল হতাশার, যন্ত্রণার এবং অস্থিরতার।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্পে অনাহারে মৃত্যু দেখার পর মৃত্যুভয় যখন সাময়িক অসুস্থ অবস্থায় অফিসে নিজের চেয়ারে বসেছিল, তখনই সেই ঘরে তার সহকর্মী বন্ধু নিখিল প্রবেশ করে। মৃত্যুঞ্জয়ের সংকটাপন্ন চোখ-মুখ এবং দেহভঙ্গি দেখে কৌতূহলী নিখিল তাকে কী হয়েছে প্রশ্ন করলে অন্যমনস্কভাবে, আর্তনাদের মতো সে বলে ওঠে, “মরে গেল। না খেয়ে মরে গেল!"। আরও কিছু আনুষঙ্গিক প্রশ্ন করে নিখিল বুঝতে পারে যে, ফুটপাথে অনাহার-মৃত্যুর ব্যাপারটা মৃত্যুঞ্জয় কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। তার মাথার মধ্যে ঘুরছে নানা কথা, নানা প্রশ্ন। ফুটপাথে অনাহার-মৃত্যুর কদমতা, ক্ষুধার কষ্ট ও মৃত্যুর কষ্টের মধ্যে কোনটা বেশি যন্ত্রনাদায়ক সেই ভাবনা তার মনকে আলোড়িত করছে। ছলছল চোখে মৃত্যুঞ্জয় জানায় যে, সে বেঁচে থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষ যে না খেতে পেয়ে মারা গেল সে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত সে কীভাবে করবে। এতদিন ধরে সব জেনেশুনেও নিতান্ত স্বার্থপরের মতো সে চারবেলা পেটপুরে খেয়ে এসেছে। কাজের লোকের অভাবে শিকায় যেখানে ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না, সেখানে এতদিন ধরে সে নির্লজ্জের মতো তার অফুরন্ত অবসর কাটানোর কথা ভেবেছে। নিখিলকে এসব কথা বলে মৃত্যুঞ্জয় আসলে দুর্ভিঙ্গপীড়িত মানুষগুলোর প্রতি নিজের উদাসীনতাকেই ধিক্কার জানিয়েছে।

এখানে মৌমাছি বলতে 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পের মুখ্য চরিত্র মৃত্যুঞ্জয়কে বোঝানো হয়েছে।

> মন্বন্তরের সময় একদিন বাড়ি থেকে অফিস যাওয়ার পথে ফুটপাথে একটি অনাহারজনিত মৃত্যুদৃশ্য দেখে আবেগপ্রবণ মৃত্যুঞ্জয় মানসিকভাবে বিপর্যন্ত হয়ে পড়ে। এই মানসিক আঘাতের ফলে মৃত্যুঞ্জয় শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। অফিসে গিয়ে নিজের কাজের ঘরে ঢুকে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে সে। তারপর বাথরুমে গিয়ে বাড়ি থেকে খেয়ে আসা যাবতীয় খাবার বমি করে ফেলে। বাথরুম থেকে ফিরে এসে কাচের গ্লাসে জল খেতে খেতে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দেয়ালের দিকে। পচা ঐতিহ্য আদর্শবাদের কল্পনা তাপস' মৃত্যুঞ্জয়ের এই মৃত্যুদৃশ্য দেখার পর থেকেই বিবেক দংশন শুরু হয়। তার মনে অনাহার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জাগে। সে ভাবতে চেষ্টা করে খিদের জ্বালা আর মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে কোনটা বেশি কষ্টকর। সে আরও ভাবে যে, দরিদ্র মানুষের জীবনপ্রণালী সম্পর্কে তার উদাসীনতাই হয়তো এইরকম মৃত্যুর কারণ। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান বা প্রায়শ্চিত্তের কোনো যথাযথ উপায় সে খুঁজে পায় না। কঠোর বাস্তবের সমাধানহীন এক প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে বিভ্রান্ত মৃত্যুঞ্জয় শার্লিতে আটকে পড়া মৌমাছির মতো মাথা খুঁড়তে থাকে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্প থেকে সংকলিত এই উদ্ধৃতিটিতে মৃত্যুঞ্জয়ের সহকর্মী বন্ধু নিখিলের কথা বলা হয়েছে।

* মৃত্যুঞ্জয় ছিল ন্যায়নীতিবোধসম্পন্ন, ধীরস্থির, নির্বিরোধী, সহানুভূতিশীল এক সাদাসিধে যুবক । কিন্তু শুধু তার এইসব ইতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্যই যে নিখিল তাকে পছন্দ করত, তা নয়। মানবসভ্যতার নষ্ট হয়ে যাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন যে ঐতিহ্য – আদর্শবাদ, তার কল্পনায় এবং সাধনায় মৃত্যুঞ্জয় নিজেকে সঁপে দিয়েছিল বলেই নিখিল তাকে খুব পছন্দ করত। অবশ্য মৃত্যুঞ্জয় যদি দুর্বল-মনের কল্পনাবিলাসী আদর্শবাদী যুবক হত, তাহলে তাকে পছন্দ করার প্রসঙ্গ আসত না। দুটো কথার দ্বারা তাকে উত্ত্যক্ত করলেই তার মনের রাশি রাশি অন্ধকার বেরিয়ে এসে তাকে অবজ্ঞার পাত্র করে তুলত। মৃত্যুঞ্জয়ের মনের গঠন-প্রকৃতি তেমন নির্জীব বা শিথিল নয়। তার হৃদয় ও মস্তিষ্ক যথেষ্ট গতিশীল। তার হৃদয়ে শক্তির একটা ফোয়ারা রয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত অপরিবর্তনীয়কে পরিবর্তিত করতে যে শক্তির প্রয়োজন হয়, বর্তমান জগতে যে শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে, তেমনই এক শক্তির অধিকারী ছিল সে। এই বিশেষ শক্তির অধিকারী বলেই মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি নিখিল মৃদু হিংসা পোষণ করত, ভারত, সে নিজে মৃত্যুঞ্জয় হলে খারাপ হত না। নিখিল যে মৃত্যুঞ্জয়কে খুব পছন্দ করে এবং ভালোও বাসে, তার কারণ সম্বন্ধে লেখক এ কথাগুলিই পাঠকদের জানিয়েছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পে ফুটপাথে অনাহার মৃত্যু দেখে মৃত্যুঞ্জয়ের মধ্যে এক তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। এই দৃশ্য তাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে বিধবস্ত করে তুলেছিল। সমস্ত বিষয়টা খতিয়ে দেখে নিখিলের মনে হয়েছিল, ফুটপাথে অনাহারে মৃত্যুর বিষয়টি সম্পর্কে মৃত্যুঞ্জয় আসলে স্পষ্ট ধারণা করতেই পারছে না। মৃত্যুঞ্জয় হয়তো ফুটপাথের মানুষগুলোর জীবনযাপনের বীভৎসতা, ক্ষুধা অথবা মৃত্যুর রূপ বোঝার চেষ্টা করছে।“না খেয়ে মরা কী ও কেমন?”— এ প্রশ্নের উত্তরও সে খুঁজে চলেছে। তাই সমস্ত বিষয়টি ভালোভাবে জেনে নেওয়ার জন্যই নিখিল মৃত্যুঞ্জয়কে প্রশ্ন করেছিল।

→ নিখিল যখন এই প্রশ্নগুলো মৃত্যুঞ্জয়ের সামনে রাখে, তখন জবাবে সে অন্য কথা' বলে। সে পালটা নিখিলকে জিজ্ঞাসা করে যে, সে নিজে দিব্যি খেয়েপরে বেঁচে রয়েছে অথচ একটা লোক না খেয়ে মরে গেল—এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কী। সে নিজে চারবেলা খাচ্ছে আর কিছু মানুষ একবেলাও খেতে পাচ্ছে না—এই বৈষম্য তাকে কাতর করে তোলে। একদিকে সে তার ধরাবাঁধা জীবনে দৈনন্দিন কাজ শেষ করে নিশ্চিন্ত অবসর কাটায়, অন্যদিকে লোকের অভাবে ত্রাণকার্য সঠিকভাবে চালানো যায় না— এ কথা মনে হতেই মৃত্যুঞ্জয় নিজেকে ধিক্কার দেয়।

" মৃত্যুঞ্জয়ের এই ভাবনাসূত্র তার মানবিক দায়বদ্ধতারই প্রমাণ দেয়। সে দুর্ভিক্ষকে উপর থেকে দেখে না, নিজেকে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড় করায় এবং সেখানে নিজের ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা ভাবতে চায়।

[2:31 pm, 24/09/2022] Anju: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে ছোটোগল্পে আমরা দেখি যে, ফুটপাথে অনাহার মৃত্যু দেখার পর অফিসের মাইনের দিন মৃত্যুঞ্জয় সব টাকা নিখিলের হাতে দেয় প্রাণ তহবিলে দান করার জন্য। বিস্মিত নিখিলের প্রশ্নের উত্তরে সে জানায় যে তারা সস্ত্রীক একবেলার ভাত দান করে দিচ্ছে। টুনুর মা অসুস্থ বলে মৃত্যুন্তয় তাকে খেতে বললেও পতিব্রতা স্ত্রী তা শোনে না। এই প্রসঙ্গেই নিখিল এমনটা ভেবেছিল।

* মৃত্যুভয়ের সহকর্মী নিখিল একজন হৃদয়বান, সামাজিক মানুষ। তত্ত্ব পঞ্চাশের মন্বন্তর'-এর অনাহার মৃত্যুগুলি তার কাছে ছিল 'সাধারণ সহজবোধ্য ব্যাপার। অনাহার মৃত্যু দেখে ভেঙে পড়া মৃত্যুঞ্জয়কে লক্ষ করে তার মনে হয়েছে যে, সব মানুষের সব সহানুভূতি অনাহারীদের খিদের আগুনে ভাললেও তা নিভবে না, উলটে তা ইখনই পাবে। তার মতে ভিক্ষাদানের মতো পাপকর্ম সাধারণ মানুষের কাছে সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় বলেই মানুষের অন্নের দাবি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। রাগের ফলে কিছু লোক খেতে পেলেও আড়ালে থাকা আরও অনেক মানুষ না খেতে পেয়েই মারা যায়। তার মতে, এই অবস্থায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের আকন্ঠ আহার অন্যায় হলেও উপোস করে মারা যাওয়াটাও একান্তই অনুচিত। কারণ, নীতিধর্ম নয়, সমাজধর্মের দিক থেকেই নিখিল মনে করে, দশজনকে খুন করার থেকে বড়ো অপরাধ হল নিজে না খেয়ে মরা। মৃত্যুঞ্জয় একে 'পাশবিক স্বার্থপরতা' বললে নিখিল জানায় যে, অনাহারীরা যদি এমন স্বার্থপর হতে পারত, তবে “অন্ন থাকতে বাংলায় না খেয়ে কেউ মরতনা। তা সে অন্ন হাজার মাইল দূরেই থাক বা একত্রিশটা তালা লাগানো গুদামেই থাক।" এই ভাবনার মাধ্যমে নিখিলের চরিত্রের বাস্তববাদী বৈশিষ্ট্যই প্রকাশিত হয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র মৃত্যুজ্জয় মন্বন্তরের সময়কালে যেদিন বাড়ি থেকে অফিস যাওয়ার পথে ফুটপাথে একটি অনাহার-মৃত্যুর বীভৎস দৃশ্য দেখেছিল, সেই দিনটির কথাই প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে বলা হয়েছে।

* এতকাল অবধি মৃত্যুন্তয় না খেতে পেয়ে মরার কথা কেবল শুনেছিল বা পড়েছিল। মান্তরের সময় প্রায়শই ফুটপাথে অনাহার মৃত্যু ঘটলেও তা ছিল মৃত্যুঞ্জয়ের জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। মৃত্যুঞ্জয় ছিল ন্যায়নীতিবোধসম্পন্ন, অনুভূতিশীল, সাদাসিধে ভালোমানুষ। মানবসভ্যতার নষ্ট হয়ে যাওয়া যে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য – আদর্শবাদ, তার কল্পনায় এবং সাধনায় মৃত্যুদয় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছিল। জীবনে প্রথম ফুটপাথে অনাহার মৃত্যুর বীভৎস দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পরে মৃত্যুগুয়ের মনে এই অনাহার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জেগে ওঠে। খিদের যন্ত্রণা না মৃত্যুযন্ত্রণা কোনটা বেশি কষ্টকর তা নিয়েও তার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তার মনে হয় তার মতো স্বচ্ছল মধ্যবিত্তদের দরিদ্র মানুষের জীবনযন্ত্রণা। সম্পর্কে উদাসীনতাই হয়তো এর কারণ। এই মৃত্যুর ঘটনাটা মৃত্যুওয়কে এমন আহত করেছিল, অপরাধবোধে দীর্ণ করে দিয়েছিল যে, তারপর থেকেই সে বিষম ও তার হয়ে গিয়েছিল।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্প থেকে সংকলিত এই উদ্ধৃতিটির বক্তা হল মৃত্যু কয় ।

• পঞ্চাশের মন্বন্তরকালে হঠাৎই একদিন ফুটপাথে অনাহার মৃত্যু দেখে মৃত্যুঞ্জয় অপরাধবোধে দীর্ণ হয়ে পড়ে। তার প্রিয় বন্ধু নিখিলের এতে মন খারাপ হয়। তবুও সে ভাবে যে, সব মানুষের সকল সহানুভূতি একত্রিত করে। অনাহারীদের খিদের আগুনে চাললেও তা নিভবে না, উলটে তা ইখনই পাবে। তার মতে, ভিক্ষাদানের মতো পাপকর্ম সাধারণ মানুষের কাছে সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় বলেই মানুষের অন্নের দাবি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এরপর মাইনের দিন মৃত্যুঞ্জয় যখন তার মাইনের সব টাকা নিখিলের মাধ্যমে প্রাণ তহবিলে দান করে দেয়, তখন আর নিখিল স্থির থাকতে পারে না। পরিবারের প্রতি মৃত্যুঞ্জয়ের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে সে মৃত্যুঞ্জয়কে জানায় যে, মহন্তরকালে ভূরিভোজ অন্যায় হলেও উপোস করে মৃত্যুবরণ করাও একেবারেই উচিত নয়। তাই বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু খাদ্যের প্রয়োজন, ততটুকুই সে গ্রহণ করে। নিখিল আরও জানায় যে, যতদিন অবধি আত্মরক্ষার উপযোগী ন্যূনতম খানা সে জোগাড় করতে পারবে, ততদিন অবধি সে সেই খাদ্য গ্রহণ করবে। দেশের সমস্ত লোক মরে গেলেও সে অনাকে সেই আত্মরক্ষার উপযোগী বাবার দিতে পারবে না। সমাজধর্মের দিক থেকেই বলা যায় যে, দশজনকে হত্যা করার চেয়ে নিজে উপোস করে। মৃত্যুবরণ করা আরও বেশি অপরাধ। নিখিলের এই কাজকেই মৃত্যুঞ্জয় 'পাশবিক স্বার্থপরতা' বলে অভিহিত করেছে।

ফুটপাথে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক ও শারীরিক কষ্টের কারণ হয়েছে। নিখিলের কাছে এই ঘটনা সাধারণ ও সহজবোধ্য বলে মনে হলেও মৃত্যুস্কয়ের তা মনে হয়নি। সে এতদিন এই ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে ভূরিভোজ করে নিশ্চিন্তে দিন কাটিয়েছে। নিজের এই উদাসীনতার জন্য সে বেদনাহত এবং অনুতপ্ত। সে নিজেকে অপরাধী বলে মনে করে। ওই অপরাধের কী প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে, সে-ভাবনা তাকে আলোড়িত করে। এই নির্লজ্জ অমানবিক আচরণের জন্য নিজেকে ধিক্কার জানাতেও মৃত্যুঞ্জয় পিছপা হয় না | মানসিকভাবে বিষণ্ন মৃত্যুঞ্জয়ের অনুতাপে চোখ ছল ছল করে।

* মৃত্যুঞ্জয়ের ছল ছল চোখ দেখে নিখিল চুপ করে থাকে। কিন্তু মৃত্যুব্জয়ের দরদের ছোঁয়ায় তারও মন খারাপ হয়। তার মনে হয় দুর্ভিক্ষের দেশে সমস্ত দরদ, সব সহানুভূতি উজাড় করে ঢেলে দিলেও অপরিসীম ক্ষুধার আগুন নিভবে না। বরং তা ক্ষুধার আগুনকে ইন্ধন জোগাবে। নিখিলের মতে ভিক্ষে দেওয়া অস্বাভাবিক পাপ কাজ, কিন্তু তাকে পুণ্যকাজের পর্যায়ে উন্নীত করার ফলে মানুষের জীবনধারণের অম্লের প্রতি ন্যায্য দাবি জন্মায় না। ভিক্ষে দিয়ে দেশব্যাপী ক্ষুধার অন্ন জোগানো যায় না। এই রুঢ় বাস্তবকে আধ্যাত্মিক নীতি করে মধুর প্রলেপ দেওয়া আসলে অনিয়মের নামান্তর। চিতার আগুনে কোটি কোটি মৃতদেহ পোড়ানো হলেও পৃথিবীতে যত জ্যান্ত মানুষ আছে, তাদের পুড়িয়ে ছাই করার ক্ষমতা চিতার আগুনের আছে। আসলে মানুষের সীমাহীন খিদে সেই আগুনে জ্বালানি রূপেই কাজ করে।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কে বাঁচায়, কে বাঁচে গল্পে মৃত্যুঞ্জয় ও নিখিল একই অফিসের কর্মী। প্রতি মাসে নিখিলকে তিন জায়গায় কিছু কিছু টাকা পাঠাতে হয়। টাকা পাঠানোর জন্য মানি-অর্ডারের ফর্ম লিখতে গিয়ে নিখিল ভাবল যে, এবার তিনটে সাহায্যই পাঁচ টাকা করে কমিয়ে দেবে। কিনা। এমন সময় মৃত্যুঞ্জয় নিখিলের ঘরে এসে বসল। ফুটপাথে অনাহারে মৃত্যুর দৃশ্য দেখার পর থেকে মৃত্যুঞ্জয় কেমন যেন বিষম ও গম্ভীর হয়ে আছে । এমনকি নিখিলের সঙ্গেও বেশি কথা বলে না। মৃত্যুঞ্জয় নিখিলের সামনে একতাড়া নোট বের করে। টাকাটা দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য কোনো রিলিফ ফান্ডে দিয়ে আসার অনুরোধ জানায়। নিখিল ধীরে ধীরে গুনে দেখে মৃত্যুঞ্জয় সমস্ত মাসমাইনেই দান করেছে। কধু হিসেবে নিখিল তাকে বোঝায় যে তার ওপর সংসারে ন-জন লোকের দায়িত্ব রয়েছে। মাইনের টাকায় মাস চলে না। প্রতি মাসেই তাকে ধার করতে হয়। সেই পরিস্থিতিতে সারা মাসের বেতন রিলিফ ফান্ডে দেওয়া মোটেই সমীচীন নয়। মৃত্যুঞ্জয় জানায় যে সে কিছু একটা করতে চায়। তার রাতে ঘুম হচ্ছে না। খেতে বসলে খেতে পারছে না। তারা স্বামী-স্ত্রী একবেলা খায়, আর-এক বেলার খাবার ক্ষুধার্তদের বিলিয়ে দেয়।

একথা শুনে নিখিল বলে মৃত্যুঞ্জয়ের স্ত্রী টুনুর মায়ের যা স্বাস্থ্য তাতে একবেলা না খেয়ে পনেরো-কুড়ি দিনই কাটাতে পারবে। নিখিলের মন্তব্য শুনে মৃত্যুঞ্জয় ঝাঁঝিয়ে ওঠে। মৃত্যুঞ্জয়ের বক্তব্য যে স্ত্রীকে নিষেধ করেছে, বুঝিয়েছে । স্ত্রী তার কথা শোনে না। মৃত্যুঞ্জয় না খেলে সেও খাবে না। মৃত্যুঞ্জয়ের মতে এ অন্যায় ও অত্যাচার।

নিখিল ভাবছিল সে মৃত্যুঞ্জয়কে বোঝাবে যে এভাবে দেশের লোককে বাঁচানো যায় না। রিলিফ বা ত্রাণকার্য প্রকৃতপক্ষে একজনের খাবার আর এক জনকে খাওয়ানো। এতে চোখের সামনে যারা আছে তারাই বাঁচবে, দূরের মানুষ খাবার না পেয়ে মরবে। কিন্তু এসব কোনো কথাই তার মুখ থেকে বেরোল না। নিখিল জানায় যে ভূরিভোজ করে খাওয়া অন্যায়। তা বলে না খেয়ে মরাও উচিত নয়। সে নিজেও কাটছাঁট করে খাওয়া কমিয়েছে। তবে সে মনে করে, বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যেটুকু দরকার তা সে অপরকে বঞ্চিত করে হলেও নিজের জন্য রাখবে। নীতিধর্মের দিক থেকে নয়, সমাজধর্মের দিক থেকে বিচার করলে দশজনকে খুন করার পাপের চেয়ে না খেয়ে নিজেকে মেরে ফেলা বড়ো পাপ |

নিখিলের এই মনোভাব ও বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের জানায় যে এরূপ আচরণ পাশবিক স্বার্থপতার পরিচয়। প্রত্যুত্তরে নিখিল জানায় যে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের অখাদ্য ফ্যান দেওয়ার পরিবর্তে স্বার্থপর করে তোলার প্রয়োজন বেশি ছিল। তাহলে কেউই মরত না। হাজার মাইল দূরে খাবার থাকলেও কিংবা গুদামে একত্রিশটা তালা লাগানো থাকলেও তারা বাঁচার জন্য খাদ্যসংস্থান ঠিক করে নিত। এই কথার উত্তরে মৃত্যুষ নিখিলকে বন্ধ পাগল বলে অভিহিত করে উঠে যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পে উপযুক্ত মন্তব্যটিতে গল্পের মূল চরিত্র মৃত্যুওয়ের কথা বলা হয়েছে।

, ফুটপাথবাসী দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের সহমর্মী মৃত্যুঞ্জয় তাদের দুঃখকষ্ট, জীবনযাপনকে একেবারে কাছ থেকে দেখতে দেখতে নিজেও ফুটপাথের বাসিন্দা হয়ে যায়। সে অফিস যাওয়া কখ করে, এমনকি নিশ্চিত গৃহকোণও আগ করে। প্রথমদিকে শহরের আদি-অন্তহীন ফুটপাথ ধরে ঘুরে বেড়ালেও কালক্রমে সে ফুটপামেরই বাসিন্দা হয়ে যায়। তার মধ্যে এইসময় চেতনাগত পরিবর্তন ঘটে, মৃত্যুঞ্জয়ের স্ত্রীর মন্তব্যের মধ্যে যার আভাস মেলে। সে বলে গল্প কে বাঁচায়, কে বাঁচে

“কেমন একটা ধারণা জন্মেছে, যথাসর্বস্ব দান করলেও কিছুই ভাল করতে পারবেন না। দারুণ একটা হতাশা জেগেছে ওর মনে। একেবারে মুষড়ে যাচ্ছেন দিনকে দিন।” দুর্ভিক্ষের রূঢ় বাস্তবতা মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক শৃঙ্খলাকে সম্পূর্ণ বিপর্যন্ত করে দেয়। এর কোনো যথাযথ সমাধান বা প্রতিকারের উপায় তার কাছে না থাকায় সে হতাশ হয়ে পড়ে। নিখিল চেষ্টা করে মৃত্যুঞ্জয়কে বুঝিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, কিন্তু তার চোখ দেখলেই বোঝা যায় যে, তার কথার অর্থ মৃত্যুঞ্জয় বুঝছে না। একদিন ফুটপাথবাসী বুভুক্ষু মানুষদের সাথে কাটিয়ে যে বিপুল অভিজ্ঞতা সে সঞ্চয় করেছে সেখানে মানসিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলা সম্ভব হয় না। কোনো তত্ত্বকথাই তার সেই ভয়ংকর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে ভুলিয়ে দিতে পারে না। আর তার ফলেই নিখিলের বলা কথাগুলো মৃত্যুভয়ের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র হল মধ্যবিত্ত, বিবাহিত যুবক মৃত্যুঞ্জয়।

মৃত্যুঞ্জয় ফুটপাথে অনাহার-মৃত্যুর দৃশ্য দেখার পর থেকে ভেতরে-বাইরে ক্রমশ পালটে যেতে থাকে । অপরাধবোধে দীর্ণ হয়ে সে বাড়িতে ভালো করে খেতে ও ঘুমোতে পারে না। একবেলা সস্ত্রীক না খেয়ে সেই খাবার সে অভুক্তদের বিলোনো শুরু করে। এমনকি, মাইনের দিন নিখিলের মাধ্যমে পুরো বেতনটাই সে প্রাণ তহবিলে দান করে দেয়। এদিকে অফিসে তার আসা যাওয়ারও ঠিক থাকে না। কাজে ভুল করে, প্রায়ই চুপচাপ বসে থেকে ভেবে চলে সে। বাড়িতেও বিশেষ না থেকে শহরের গাছতলায়, ডাস্টবিনের ধারে বা ফুটপাথে পড়ে থাকা মহন্ডর প্রস্ত মানুষগুলিকে দেখতে সে ঘুরে বেড়াতে থাকে। মৃত্যুঞ্জয়ের এমন অবস্থার জন্যই তার বাড়ির শোচনীয় অবস্থা হয়েছিল।

মৃত্যুঞ্জয়ের এই অবস্থায় তার স্ত্রী শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। শুয়ে থেকেই সে বাড়ির সদস্যদের মৃত্যুঞ্জয়ের খোঁজ করার জন্য বাইরে পাঠায়। তারাও মৃত্যুঞ্জয়ের খোঁজে বাইরে বেরিয়ে তাকে না পেয়ে ফিরে আসে এবং মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে জানায় যে, মৃত্যুঞ্জয় কিছু পরেই বাড়ি ফিরবে। এই স্তোকবাক্য বলে তারা হয় গম্ভীর হয়ে থাকে, নতুবা কাঁদো কাঁদো মুখে বসে থাকে। মৃত্যুঞ্জয়ের ছেলেমেয়েরা খিদের জ্বালায় মাঝেমধ্যেই চিৎকার করে কাঁপতে থাকে। মৃত্যুঞ্জয়ের অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের লোকেদের এমন শোচনীয় অবস্থাই হয়েছিল।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' ছোটোগল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয় একদিন বাড়ি থেকে অফিস যাওয়ার পথে অনাহার মৃত্যু দেখে। নিজেকে চরম বলে ভাবতে শুরু করে। দুর্ভিক্ষের দেশে চারবেলা পেট ভরে খাওয়া এবং অবসরযাপনের সুখকল্পনায় দিন কাটানোর মানিতে তার মন ভরে ওঠে। বাড়িতে ভালো করে যেতে ও ঘুমোতে পারে না সে। সঙ্গীক একবেলা না খেয়ে ওই খাবার সে অভুকদের বিলোনো শুরু করে। কিন্তু এতেও তার হতাশা দূর হয় না। নিখিলের মাধ্যমে পুরো মাসের মাইনেটা সে প্রাণ তহবিলে দান করে দেয়।

ক্রমশ সে অফিসে অনিয়মিত হয়ে পড়ে, কাজে ভুল করে, প্রায়ই চুপচাপ বসে ডাবে। শহরের গাছতলায়, ডাস্টবিনের ধারে বা ফুটপাথে পড়ে থাকা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষগুলিকে দেখতে ঘুরে বেড়ায়। এভাবে ধীরে ধীরে ফ্রন্টপার্থই হয়ে ওঠে তার আস্তানা। এরপর তার গা থেকে ধূলিমলিন সিক্ষের জাযা ও ধুতি অদৃশ্য হয়ে তার পোশাক হয়ে দাঁড়ায় ছেঁড়া কাপড়। আদুল পায়ে জমে মাটির স্তর, দাড়িতে মুখ ঢেকে যায়। একটি ছোটো মগ হাতে আরও দশজন অনাহারীর মতো সেও লঙ্গরখানায় লাইন দিয়ে কাড়াকাড়ি

করে খিচুড়ি খায়, গ্রাম থেকে আসা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষগুলির মতো একঘেয়ে সুরে সেও বলা শুরু করে—“গাঁ থেকে এইছি। খেতে পাইনে বাবা। আমায় যেতে দাও!" এভাবেই মধ্যবিত্ত যুবক মৃত্যুঞ্জয় মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তার পেশা. পরিবার ও সমাজকে ত্যাগ করে ফুটপাথের জীবনে মিশে যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র

নিখিলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নলিখিতভাবে আলোচনা করা যায়। সংসার-উদাসীন: ছোটোগল্পটির নায়ক মৃত্যুঞ্জয়ের অফিসের সহকর্মী বন্ধু ছিল নিখিল । প্রখর বুদ্ধিমান, রোগা চেহারার এই যুবকটি ছিল কিছুটা অলস প্রকৃতির। দুই সন্তানের পিতা নিখিলের সংসারে বিশেষ মন ছিল না বলে কেউ কেউ মনে করতেন। বইপত্র পড়ে এবং নিজের ভাবনার জগতে বিচরণ করেই অবসর সময় কাটাত এই অন্তর্মুখী যুবকটি।

বন্ধু বৎসল অফিসের সমপদস্থ সহকর্মী মৃত্যুঞ্জয়ের মাইনে নিখিলের থেকে সামান্য কিছু বেশি হলেও অন্য সকলের মতো নিখিলও তাকে বেশ পছন্দই করত। হয়তো তাতে কিছুটা অবজ্ঞামিশ্রিত ভালোবাসাও জড়িয়ে থাকত। তবে মৃত্যুঞ্জয়ের মানসিক শক্তির কাছে নিখিল কিছুটা যেন নিস্তেজ ছিল। মাঝেমাঝে তার এই ভেবে আপশোশ হত যে সে যদি নিখিল না হয়ে মৃত্যুঞ্জয় হত, তাহলে মন্দ হত না। এর থেকে মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি তার সহকর্মী নিখিলের মৃদু ঈর্যার পরিচয়ও পাওয়া যায়।

হৃদয়বান: তবে নিখিল স্বার্থপর ছিল না। সে প্রতিমাসে তিন জায়গায় অর্থসাহায্য পাঠাত। তা ছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে সে মৃত্যুঞ্জয়কে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট থেকেছে। সে মৃত্যুভয়ের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছে এবং মৃত্যুঞ্জয় অফিস যাওয়া কখ করলে তার ছুটির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে।

সৎ এবং বাস্তববাদী: হৃদয়বান, সামাজিক যুবক নিখিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে দুঃখ হলেও প্রিয় বন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ের মতো একেবারে ভেঙে পড়েনি। সে মৃত্যুঞ্জয়ের মতো একেবারে বাস্তব জ্ঞানহীন ছিল না। মৃত্যুঞ্জয় মাইনের পুরো টাকা প্রাণ তহবিলে দান করলে সে তার প্রতিবাদ করেছে এ কথা ভেবে “এ ভাবে দেশের লোককে বাঁচানো যায় না।" মৃত্যুঞ্জয়ের পরিবারের প্রতি আন্তরিক ভাবনাও তার কথায় প্রতিফলিত হয়েছে। সহৃদয় সাধারণ মানুষের মতোই সে এই যুক্তিপূর্ণ কথাই জানিয়েছে—"নিজেকে না খাইয়ে মারা বড়ো পাপ" |

সুতরাং, নিখিল চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলি পর্যালোচনা করে বলা যায় যে, সে এ গল্পের হৃদয়বান এক বাস্তববাদী চরিত্র

'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' ছোটোগল্পে টুনুর মা চরিত্রটি অতি সামান্য পরিসরে আলোচিত হলেও গল্পের বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে চরিত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী অন্ত প্রাণ: মৃত্যুঞ্জয়ের স্বামী অন্ত প্রাণ সহধর্মিণী হল মমতাময়ী নারী টুনুর মা। নামহীন এই চরিত্রটি শারীরিকভাবে শীর্ণা ও রুগ্‌ণা তবুও মহন্তরের বীভৎসতায় নিজের পরিবার সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যাওয়া স্বামীর অস্থিরতাকে সে কেবল মেনেই নেয়নি, মনেও নিয়েছে।।

মমতাময়ী: সে যে তার স্বামীকে ভালোবাসত এবং তার আদর্শকে সম্মান করত—তা-ই নয়, সে নিজেও ছিল উদার হৃদয়ের অধিকারিণী এবং মমতাময়ী। শয্যাশায়ী অবস্থায় সে বারবার স্বামীর খোঁজখবর করেছে, স্বামীর সহকর্মী-কধু নিখিলকেও সকাতর অনুরোধ করেছে তার স্বামীর খেয়াল রাখতে, সঙ্গে থাকতে। দু-তিনবার সে স্বামীর সঙ্গে ফুটপাথের দুর্ভিক্ষপীড়িত অনাহারক্লিষ্ট মানুষগুলোকে দেখেও এসেছে। সে নিখিলকে জানিয়েছে, “উঠতে পারলে আমিই তো ওর সঙ্গে ঘুরতাম ঠাকুরপো।"

আদর্শবাদী: মৃত্যুঞ্জয়ের ব্যাপারে টুনুর মা আরও জানিয়েছে, “একেবারে মুষড়ে যাচ্ছেন দিনকে দিন।” নিখিলকে সে বলেছে, “উনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন, আমারও মনে হচ্ছে যেন পাগল হয়ে যাব। ছেলেমেয়েগুলির জন্য সত্যি আমার ভাবনা হয় না। কেবলি মনে পড়ে ফুটপাথের ওই লোকগুলির কথা।” এভাবেই টুনুর মা মৃত্যুঞ্জয়ের আদর্শবাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে। সুতরাং, টুনুর মা এ গল্পের এক অপ্রধান চরিত্র হলেও গল্পের প্রধান চরিত্র মৃত্যুঞ্জয়কে উজ্জ্বল করে তুলতে চরিত্রটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন মৃত্যুঞ্জয়।

→ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' ছোটোগল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয়ের চরিত্রটি পর্যালোচনা করতে গেলে নীচের বিষয়গুলি চোখে পড়ে। ন্যায়নীতিপরায়ণতা: মৃত্যুঞ্জয় একজন সৎ, মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী। নিরীহ, শান্ত, দরদি, ভালোমানুষ এই যুবকটি ন্যায়নীতিবোধের অবক্ষয়ের যুগেও বুকের ভেতরে আদর্শবাদের প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্য পুষে রাখে। আবেগপ্রবণতা: মৃত্যুঞ্জয় একদিন অফিস যাওয়ার পথে হঠাৎই ফুটপাথে অনাহারে মৃত্যুর দৃশ্য দেখে ফেলে। দুর্ভিক্ষের সময় এমন দৃশ্য খুব স্বাভাবিক হলেও আবেগপ্রবণ মৃত্যুঞ্জয় এই দৃশ্য দেখে প্রচন্ড আঘাত পায়। তারপর থেকে সে ক্রমে ক্রমে ভিতরে-বাইরে পালটে যেতে শুরু করে। অপরাধবোধে অস্থির মৃত্যুঞ্জয় ও তার স্ত্রী একবেলা না খেয়ে সে খাবার দুর্ভিক্ষপীড়িতদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। এমনকি, মাসের পুরো মাইনেটা সে স্লাগ-তহবিলে দান করে দেয়। বিকারগ্রস্ততা: কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় অচিরেই বাস্তব চিত্রটা বুঝতে পারে যে, যথাসর্বস্ত্র দান করলেও অনাহারী মানুষগুলোর কিছুমাত্র ভালো করতে পারবে না সে। এই ব্যর্থতাই তাকে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। দিন দিন মুষড়ে যেতে থাকে মৃত্যুঞ্জয়। এরপর তাই সে অন্নপ্রার্থীদের ভিড়ে ঘুরতে ঘুরতে একসময় তাদেরই একজন হয়ে যায়। অফিসে এবং ধীরে ধীরে বাড়িতে যাওয়াও বন্ধ করে দেয় মৃত্যুঞ্জয়। ছেঁড়া ন্যাকড়া পরে, খালি গায়ে সে অনাহারীদের সঙ্গে ফুটপাথে পড়ে থাকে এবং লঙ্গরখানার খিচুড়ি কাড়াকাড়ি করে খেতে শুরু করে। সুতরাং, মৃত্যুঞ্জয় চরিত্রটি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের প্রতিবাদে, প্রতিরোধে বা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলেও সে যে মধ্যবিত্তের খোলস ত্যাগ করে সর্বহারা শ্রেণির মধ্যে বিলীন হতে পেরেছে, এটাও কম কৃতিত্বের নয়।

উত্তর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে ছোটোগল্পটি কলকাতার এক চাকুরিজীবী সংসারী যুবক মৃত্যুঞ্জয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পঞ্চাশের (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের) মন্ত্রস্তরকালে একদিন অফিস যাওয়ার পথে ফুটপাধে মৃত্যুঞ্জয় অনাহার-মৃত্যুর এক বীভৎস দৃশ্য দেখে ফেলে। এই দৃশ্য দেখে সে এতটাই আঘাত পায় যে, এরপর থেকে ভিতরে বাইরে পালটে যেতে শুরু করে সে। অপরাধবোধে দীর্ঘ মৃত্যুঞ্জয় ভালো করে খেতে ঘুমোতে পর্যন্ত পারে না। সে ও তার স্ত্রী একবেলা না খেয়ে সে খাবার অনাহারীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করে। এমনকি, মাইনের দিন পুরো মাইনেটা মৃত্যুঞ্জয় তার সহকর্মী-বন্ধু নিখিলের মাধ্যমে প্রাণ তহবিলে দান করে দেয়। অনেক চেষ্টা করেও নিখিল তাকে নিরস্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে অফিস এবং সংসারের কথা ভুলে গিয়ে সে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের পর্যবেক্ষণ করতে কলকাতা শহর চষে বেড়াতে থাকে। তাদের সঙ্গে কথাও বলে মৃত্যুঞ্জয়। এরপর ক্রমে ক্রমে অফিসে, তারপর একসময় বাড়িতে যাওয়াও কধ করে দেয় সে। শেষপর্যন্ত মৃত্যুঞ্জয় ছেঁড়া কাপড়ে, খালি গায়ে, মগ হাতে লজ্জারখানায় গিয়ে কাড়াকাড়ি করে খিচুড়ি যায় এবং বাকি সময় ফুটপাথে পড়ে থেকে অনাহারক্লিষ্ট সঙ্গীদের মতোই একঘেয়ে সুরে বলতে থাকে, “গাঁ থেকে এইছি। খেতে পাইনে বাবা। আমায় খেতে দাও!” এভাবেই মধ্যবিত্ত যুবক মৃত্যুঞ্জয় তার পরিবার, পেশা ও সমাজকে ত্যাগ করে অনাহারী সর্বহারাদের ভিড়ে মিশে যায়।

১৩৫০ সালে (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে) অবিভক্ত বঙ্গদেশে যে মর্মান্তিক মন্বন্তর হয়েছিল, তা 'পঞ্চাশের মরন্তর' নামে পরিচিত। সেই মন্বন্তরের পটভূমিতেই রচিত হয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে। গল্প কে বাঁচায়, কে বাঁচে বাড়ি থেকে অফিস যাওয়ার পথে ফুটপাথে অনাহার মৃত্যুর দৃশ্য দেখার মতো সাধারণ সহজবোধ্য ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না মৃত্যুঞ্জয়। তার সেদিনের উদ্ভ্রান্ত আচরণ বলে দিচ্ছিল যে, একজন মানুষ না খেতে পেয়ে। মরলে কীরকম কষ্ট পায়, সেকথা সে ক্রমাগত ভেবেই চলেছে । খিদের যন্ত্রণা না মৃত্যুযন্ত্রণা কোনটা বেশি কষ্টদায়ক—সে প্রশ্নও তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার সহকর্মী-বন্ধু নিখিলকে সে বলেছিল যে, একজন মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেল, সেটা আসলে তারই অপরাধ। কারণ মন্বন্তরকালে সব জেনেশুনেও প্রতিদিন সে চারবেলা করে খেয়েছে। তা ছাড়া, ত্রাণকার্যে লোকাভাব থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুঞ্জয় এতদিন তার অফুরন্ত অবসর কাটানোর চিন্তায় মশগুল ছিল। এসব কারণে নিখিলের সামনে নিজেকে ধিক্কার দিয়েছে সে। টুনুর মার বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারি, দুঃসহ মন্বন্তর থেকে মানুষকে বাচানোর চিন্তাতেই মৃত্যুঞ্জয়ের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, যথাসর্বস্ব দান করলেও এই অনাহারক্লিষ্ট মানুষগুলোর কিছুই ভালো করতে পারবে না সে| এসব চিন্তা করেই হতাশ মৃত্যুঞ্জয় অনাহারক্লিষ্ট মানুষের ভিড়ে ক্রমে ক্রমে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছে।

পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয় অফিস যাওয়ার পথে একদিন ফুটপাথে অনাহার মৃত্যুর এক বীভৎস দৃশ্য দেখে ফেলে। এই দৃশ্য তাকে এমনই বিপর্যন্ত করে। দেয় যে, ক্রমে ক্রমে সে ভেতরে-বাইরে পালটে যেতে থাকে। প্রথমে নিজের খাবারের বরাদ্দ কমিয়ে এবং তারপর মাইনের পুরোটা প্রাগ-তহবিলে দান করেও তার হতাশা কাটে না। এরপর ক্রমে ক্রমে সে নিজের পেশা, পরিবার ও সমাজ সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে পড়ে কলকাতা শহরের ফুটপাথ ও লঙ্গরখানাগুলিতে ঘুরে ঘুরে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের লক্ষ করতে থাকে। এইভাবে একদিন সে জীবনের সবকিছুকে ত্যাগ করে ফুটপাথবাসীতে পরিণত হয়। সিল্কের জামা ও ধুতির বদলে ছেঁড়া ন্যাকড়া পরে, খালি গায়ে, একমুখ দাড়ি-গোঁফ নিয়ে সে মগ হাতে লঙ্গরখানায় যায়। সেখানে কাড়াকাড়ি করে সে খিচুড়ি খায় এবং বাকি সময়টা ফুটপাথে পড়ে থাকে। অনাহারী ফুটপাথবাসীদের মতোই সেও একদিন একঘেয়ে সুরে বলতে শুরু করে—"গাঁ থেকে এইছি। খেতে পাইনে বাবা। আমায় খেতে দাও!"

সুতরাং গল্পটিতে নায়ক মৃত্যুঞ্জয় মধ্যবিত্তের খোলস ত্যাগ করে অনাহারক্লিষ্ট মানুষদের সঙ্গে যে মিশে যেতে পেরেছে—এটি চরিত্রটির ইতিবাচক দিক | কিন্তু ওইসব মানুষগুলিকে প্রতিরোধ-সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে সে যে সচেষ্ট হয়নি—এটি চরিত্রটির নেতিবাচকতা। নিজের পেশা-সংসার ত্যাগ করলেও মৃত্যুঞ্জয় কিন্তু প্রতিবাদহীনতার গড্ডলিকা-প্রবাহেই গা ভাসিয়ে দিয়েছে। সুতরাং গল্পটি 'মৃত্যুঞ্জয়ের বিকারেরই সার্থক শিল্পরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচো ছোটোগল্পে আমরা দেখি যে, এর প্রধান চরিত্র মৃত্যুঞ্জয় পঞ্চাশের (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে) মন্বন্তরকালে অফিস  23যাওয়ার পথে একদিন ফুটপাথে অনাহার মৃত্যুর এক বীভৎস দৃশ্য দেখে ফেলে। এই দৃশ্য দেখে সে এতটাই আঘাত পায় এবং অপরাধবোধে পড়ে যে, তারপর থেকে ভালো করে খেতে ও ঘুমোতে পারে না । অনাহারীদের বাঁচানোর জন্য সে ও তার স্ত্রী তাদের একবেলার আহার বিলিয়ে দিতে থাকে। মাইনের দিন সে মাইনের পুরো টাকাটা সহকর্মী বন্ধু নিখিলের মাধ্যমে ত্রাণ তহবিলে দান করে দেয়। শহরের ফুটপাথে কিছুদিন যাবৎ ঘুরে ঘুরে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের লক্ষ করতে থাকে সে। এরপর ক্রমে ক্রমে একদিন সে অফিস এবং শেষে বাড়ি যাওয়াও কম করে দেয় এবং অনাহারীদেরই একজনে পরিণত হয়। মৃত্যুঞ্জয় ছেঁড়া ন্যাকড়া পরে, সুখ ভরতি দাড়ি নিয়ে, মগ হাতে লঙ্গরখানায় গিয়ে মারামারি করে খিচুড়ি খায় আর ফুটপাথে পড়ে থেকে দুর্ভিক্ষপীড়িত সঙ্গীদের মতো একঘেয়ে সুরে বলতে থাকে—"গাঁ থেকে এইছি। খেতে পাইনে বাবা। আমায় খেতে দাও!"

মন্বন্তরের কলকাতাকে কেন্দ্র করেই এই কাহিনিটি গড়ে উঠেছে। এই কাহিনিতে দেখা যায় দু-তিন মাসের স্বল্প পরিসরে মধ্যবিত্ত, সংসারী যুবক মৃত্যুঞ্জয় ক্রমে ক্রমে স্বেচ্ছায় ফুটপাথ জীবনকে গ্রহণ করেছে। ছোটো আয়তনের এ গল্পে স্থান-কাল-ঘটনাগত ঐক্য ভালোভাবেই রক্ষিত হয়েছে। তিনটি চরিত্রের এই গল্পে 'ঘটনার ঘনঘটা', 'অতিকথন', 'তত্ত্ব' বা 'উপদেশ' অনুপস্থিত। গল্পশেষে মৃত্যুঞ্জয়ের বলা ছোটো বাক্য তিনটি পাঠককে চমকিত করে দ্রুত গল্পটিকে ক্লাইম্যাক্সের চরমে পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' নিঃসন্দেহে একটি শিল্পসার্থক ছোটোগল্প।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কে বাঁচায়, কে বাঁচে' গল্পে নিখিল গল্পের মুখ্য চরিত্র।

মৃত্যুঞ্জয় সম্পর্কে এরকম ভেবেছে।

→ অফিসে মৃত্যুঞ্জয় এবং নিখিল প্রায় সমপদস্থ। দুজনেরই মাইনে সমান হলেও একটা বাড়তি দায়িত্বের জন্য মৃত্যুঞ্জয় পঞ্চাশ টাকা বেশি পায় । নিখিল মৃত্যুঞ্জয়কে খুব পছন্দ করে, “হয়তো মৃদু একটু অবজ্ঞার সঙ্গে ভালোও বাসে।” এর কারণ মৃত্যুঞ্জয় শুধু নিরীহ, শান্ত, দরদি এবং ভালোমানুষ বলে নয়, এমনকি মৃত্যুঞ্জয় অত্যন্ত সৎ ও সরল বলেও নয়, আদর্শের প্রতি তার যে প্রবল আকর্ষণ—মৃত্যুঞ্জয় চরিত্রের এই বিশেষ গুণটিই তার প্রতি নিখিলকে আকৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গেই প্রশ্নোদ্ভূত মন্তব্যটি করা হয়েছে।

মৃত্যুঞ্জয় সম্পর্কে নিখিলের এই ভাবনা যে অত্যন্ত যথার্থ ছিল তা গল্পের কাহিনি থেকেই স্পষ্ট হয়। দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যু মৃত্যুঞ্জয়কে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে সে প্রথম পর্যায়ে তার মাইনের সব টাকা দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য গঠিত ত্রাণ তহবিলে দান করে দিতে চায়। পরবর্তীকালে তাদের সঙ্গে আরও একাত্ম হবে বলে সে নিজের নিশ্চিন্ত জীবনযাপন ছেড়ে ফুটপাথেই দিন কাটানো শুরু করে। এভাবে তার জীবন দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় সহমর্মিতা এবং আদর্শের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিয়ে যায়।