Chapter-10, নানা রঙের দিন

“নানা রঙের দিন' নাটকের প্রম্পটারের নাম কালীনাথ সেন।

'নানা রঙের দিন' নাটকের প্রেক্ষাপট ছিল পেশাদারি থিয়েটারের একটি ফাঁকা মঞ্চ।

'নানা রঙের দিন' নাটকে অন্ধকার, ফাঁকা মঞ্চের পিছনের অংশে গ) পূর্বে অভিনীত নাটকের দৃশ্যপট, জিনিসপত্র, যন্ত্রপাতি, মাঝখানে একটা উলটানো টুল দেখানো হয়েছে।

'নানা রঙের দিন' নাটকের শুরুতে সঙ্গে একটি টুল ওলটানো ছিল।

'নানা রঙের দিন' নাটকে দিলদারের পোশাক পরে মঞ্চে প্রবেশ করেছিলেন বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়।

নানা রঙের দিন' নাটকের শুরুতে রজনীকান্তের হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি ছিল।

ফাঁকা হলে, অভিনয়ের পর যখন শাজাহান -জাহানারা-পচ সবাই চলে গিয়েছে তখন একমাত্র দিলদারকেই মঞ্চে দেখা গিয়েছিল।

রজনীবাবু গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

রজনীবাবু অভিনয়ের বেশ কিছুক্ষণ পরে অতিরিক্ত মদ্য পান করেছিলেন বলেই তিনি গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকছিলেন।

বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নিজেই নিজেকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্যটি করেছেন।

অভিনয় শেষে প্রচুর মদ্যপান করে বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের চেয়ারে ঘুমে ঢলে পড়ার কথা বলা হয়েছে।

এখানে আগের রাতে অভিনয়ের শেষে অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মদ্যপান করে গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে থাকার কথা বলা হয়েছে।

রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় মদের ঘোরে সাজঘরে ঘুমিয়ে পড়লে তাঁকে ঘুম থেকে তুলে ট্যাক্সি ডেকে দেওয়ার জন্য রামব্রিজকে তিনি বকশিশ  দিয়েছিলেন।

আগের রাতে রজনীবাবু মদ খেয়ে গ্রিনরুমে পড়ে থাকলে রামব্রিজ তাকে তুলে ট্যাক্সিতে করে বাড়ি পাঠিয়েছিল বলে সেদিন সন্ধ্যায় রজনীবাবু যে তাকে তিন টাকা বকশিশ দিয়েছিলেন, তার ফলের কথাই বলা হয়েছে।

সন্ধ্যায় রজনীবাবুর দেওয়া তিন টাকা বকশিশে রামব্রিজ নিজেই হয়তো মদ খেয়ে কোথায় পড়ে আছে বলে মনে করেন রজনীকান্ত।

মাতালের বিপদ হল, মাতাল মদ ছাড়তে চাইলেও মদের কাছ থেকে ছাড়ান পায় না সে।

রজনীবাবু অর্থাৎ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের বয়স হয়েছিল আটষট্টি।

রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের বয়সের কথা বলা হয়েছে।

লম্বা লম্বা চুলে প্রতিদিন হাফ শিশি কলপ লাগিয়ে প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় যেরকম ইয়ার্কি করেন তাতে তাঁর বয়সটা বোঝা যায় না।

'নানা রঙের দিন' নাটকে উল্লিখিত 'মাঝরাত্তির' আসলে মৃত্যুর প্রতীক। অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় এখানে জীবনের শেষ পর্যায়ে মৃত্যুর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

জীবনে মৃত্যুকালের মুখোমুখি হতে চান না বলেই নাটকের শেষ দৃশ্যে অভিনয় করা থেকে বৃদ্ধ রজনীকান্ত তাঁকে ছেড়ে দিতে বলেছেন।

আটষট্টি বছরের রজনীকান্ত যেহেতু পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে নাট্যাভিনয় করেছেন, তাই বলা যায়, তিনি (৬৮-৪৫) বছর, অর্থাৎ 20 বছর থেকে নাট্যাভিনয় করছেন।

সব মিলিয়ে' বলতে প্রেক্ষাগৃহের গভীর অন্ধকার ব্যালকনি, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির বক্সগুলিকে বোঝানো হয়েছে।

সব থাকা সত্ত্বেও 'নানা রঙের দিন' নাটকে রাতের প্রেক্ষাগৃহে কোনো মানুষ না থাকার কথা বলা হয়েছে।

রাতের অন্ধকারে জনশূন্য প্রেক্ষাগৃহকে বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের 'ভুতুড়ে বাড়ি বলে মনে হয়েছে।

রজনীকান্তের মতো আটষট্টি বছর বয়সের লোকেরা সময়মতো যাপজোখ করে খাওয়াদাওয়া করেন, সকাল-সন্ধে বেড়াতে যান, সন্ধেবেলা কীর্তন শোনেন এবং ভগবানের নাম করেন।

অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের আন্ডরসত্তাই এই মন্ডবাটি করেছে।

প্রবীণ মানুষেরা নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে তাঁদের জীবন অতিবাহিত করলেও আটষট্টি বছর বয়সি রজনীকান্তবাবুর নেশাগ্রস্ত হয়ে বেহিসেবি দিন কাটানোর প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে।

অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় 'শাজাহান' নাটকে দিলদারের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে যে পোশাক পরেছিলেন, এখানে তার কথা বলা হয়েছে।

'নানা রঙের দিন' নাটকে রজনীকান্ত ঔরঙ্গজেব ও মহম্মদের যে দৃশ্যের কথা বলেছিলেন সেটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'সাজাহান' নাটকের অংশ।

অভিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে বৃদ্ধ প্রম্প জানায় সেনের পরনে ছিল ময়লা পাজামা, গায়ে কালো চাদর। আর তার ছুল ছিল এলোমেলো।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন' নাটকে কালীনাথ সেন এপারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

আলোচা প্রশ্নের উত্তরে শ্রোতা কালীনাথ সেন জানান যে, তিনি প্রতিদিন গোপনে জিনরুমে ঘুমান।

বক্তা কালীনাথ গ্রিনরুমে রোজ রাত্রে লুকিয়ে তার ঘুমোনোর কথাটি বলেছিল।

গোয়ার জায়গা না থাকায় প্রম্পটার কালীনাথ সেন যে রোজ রাত্রে লুকিয়ে গ্রিনরুমে ঘুমোন—সেই 'কথা' প্রসঙ্গে মন্তব্যটি করা হয়েছে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে কালীনাথ মাকে প্রিনরুমে ঘুমোতে হত, কারণ তাঁর শোয়ার কোনো জায়গা ছিল না।

রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় দিলদারের চরিত্রে বৃদ্ধ বয়সে অভিনয় করে ক্ল্যাপ আর যে প্রশংসা পেয়েছিলেন সে কারণে মন্তব্যটি করা হয়েছে।

বৃদ্ধঅভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে তাঁর আপনজন—স্ত্রী-সন্তান, সঙ্গীসাথি কেউ না থাকার জন্যই বক্তার এই অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

বৃদ্ধ রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় "নানা রঙের দিন' নাটকে বলেছেন যে, রাড়ের সবচেয়ে প্রাচীন ভদ্র ব্রাহ্মণ বংশে তাঁর জন্ম হয়েছে।

নাটকের লাইনে আসার আগে রজনাকান্ড ইস্পেক্টর অফ পুলিশ পদে সরকারি চাকরি করতেন।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানা রঙের দিনা নাটক রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় অভিনয়ে আসার আগে ইসপেক্টর অফ পুলিশ' পদে কর্মরত ছিলেন।

'নানা রঙের দিন' নাটকে 'ছোকরা ব্যাস'-এ রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের চেহারায় উজ্জ্বলতা, শরীরে শক্তি এবং মনে সাহস থাকায় তিনি কারও তোয়াক্কা করতেন না।

নাটকে অভিনয় নিয়ে জীবন শুরু করার উদ্দেশ্যে রজনীবাবু চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় এখানে তাঁর ইনস্পেকটর অফ পুলিশ'-এর চাকরি ছেড়ে দেবার কথা বলেছেন।

মাঝরাতে একা মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থিয়েটারের পিছনের দেয়ালের দিকে, কখনো-বা সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বক্তা রজনীকান্তের এ কথা মনে হয়েছিল।

যৌবনে রজনীকান্তের অভিনয় দেখে প্রেমে পড়েছিল যে মেয়েটি, তার রাশি রাশি ঢেউখেলানো কালো চুল দেখে বক্তা রজনীকান্তের এ কথা মনে হয়েছিল।

বক্তা রজনীকান্তের একদিন তাঁর প্রেমিকাকে দেখে মনে হয়েছিল যে, ভোরের আলোর চেয়েও সুন্দর সে ।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে রজনীকান্তের অভিনয়ে মুগ্ধ হওয়া মেয়েটি তাকে 'আলমগির'-এর চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছিল।

যৌবনে যখন অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রেমিকাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখনই সে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করে।

বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় বুঝেছিলেন যে, যাঁরা বলেন 'নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প' তাঁরা হয় 'গাধা', না হয় মিথ্যে কথা বা বাজে কথা বলেন।

যেদিন রজনীকান্তের প্রেমিকা তাঁকে বিয়ের শর্ত হিসেবে অভিনয় ছেড়ে দিতে বলেছিলেন, সেদিন রাত্রে মঞ্চে অভিনয়ের সময় বক্তা রজনীকান্তের এ কথা মনে হয়েছিল।

'নানা রঙের দিন' নাটকে নিজে অভিনেতা হয়েও রজনীকান্তের মনে হয়েছিল মানুষের মনোরঞ্জনকারী একজন অভিনেতা হলেন চাকর, জোকার কিংবা ক্লাউনেরই নামান্তর।

অভিনয় ছাড়তে না পারার জন্য প্রেমিকা জীবন থেকে সরে যাওয়ার দিনে রাতের বেলা একটা বাজে হাসির বইয়ে অভিনয়ের দিনের কথা বলা হয়েছে।

দর্শকদের ফাঁকা হাততালি, খবরের কাগজের প্রশংসা, মেডেল, সার্টিফিকেট, 'নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প'-র মতো প্রশস্তিবাক্য— এগুলিকে অভিনেতা রজনীকান্ত 'বাজে কথা' বলেছেন।

বক্তা অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় 'পাবলিক' অর্থাৎ, থিয়েটারের টিকিট কেনা দর্শকদের বিশ্বাস না করার কথা বলেছেন।

থিয়েটার দেখে একদিন যে মেয়েটি অভিনেতা রজনীকান্তের প্রেমে পড়েছিল, রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সেই প্রাক্তন প্রেমিকার কথাই এখানে বলা হয়েছে।

রজনীকান্তের প্রেমিকা ছিলেন ধনী মেয়ে। তাঁর উচ্চতা, রং, মুখশ্রী, শারীরিক গঠন এবং মন ছিল ভালো।

ফরসা, সুন্দর, ধনী পরিবারের যে মেয়েটি থিয়েটার দেখে অভিনেত রজনীকান্তের প্রেমে পড়েছিল, তার বর্ণনা প্রসঙ্গেই মন্তব্যটি করা হয়েছে।

'নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প! প্রচলিত এই ধারণার কথা এখানে বলা হয়েছে।

থিয়েটারে অভিনয়ের কারণে প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ে না হওয়া এবং সেই প্রেক্ষিতে 'পাবলিক'-এর অন্তঃসারশূন্য প্রশস্তিবাক্য এই ভালো না লাগার কারণ ।

প্রেমিকা রজনীকান্তকে অভিনয় ছাড়ার শর্তে বিয়ে করতে রাজি হলে “নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প' কথাটিরজনীকান্তের কাছে মিথ্যা প্রমাণিত হয় । ব্যর্থ প্রেমিক রজনী হতাশ হয়ে ওইসময় আবোলতাবোল পার্ট করা শুরু করেন।

অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় থিয়েটারের দেয়ালে অদৃশ্য হাতে কয়লার মতো কালো অক্ষরে লেখা তাঁর প্রতিভার অপমৃত্যুর করুণ সংবাদ বুঝতে পেরেছিলেন।

প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় অন্ধকারে তাঁরই জীবনের পেরিয়ে আসা আটষটি বছরকে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছেন।

প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে 'শাহাজাদি' বলতে রিজিয়াকে বোঝানো হয়েছে।

আলোচ্য সংলাপটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'রিজিয়া' নাটকে বক্তিয়ারের সংলাপ এটি ।

'নানা রঙের দিন' নাটকে অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় 'সাজাহান' নাটকে ঔরঙ্গজেব আর মহম্মদের দৃশ্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

বক্তা ঔরঙ্গজেবের প্রতি একটা অবিশ্বাসের বীজ পুত্র মহম্মদের মনে বাসা বাঁধতে দেখেছিলেন বলেই মহম্মদকে নিয়ে তিনি ভীত ছিলেন।

ঐতিহাসিক চরিত্র মহম্মদ ছিলেন ঔরঙ্গজেবের পুত্র। মহম্মদের ক্যাচ দিয়েছিলেন প্রম্পটার কালীনাথ সেন।

'নানা রঙের দিন' নাটকের প্রধান চরিত্র রজনীকান্ত তাঁর নিজের অভিনয় সম্পর্কে বলেছেন যে তা খারাপ হচ্ছে না।

‘শাজাহান' নাটকে ঔরঙ্গজেব ভেবেছিল দারার ছিন্ন শির, সুজার রক্তাক্ত দেহ আর মোরাদের কবন্ধের কথা।

বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় বলেছেন যে তাঁর প্রতিভার যে মৃত্যু ঘটেনি তা তিনি বুঝতে পেরেছেন।

অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় শূন্য প্রেক্ষাগৃহে অন্ধকার মঞ্চে পুরোনো দিনে তাঁরই অভিনীত 'সাজাহান' নাটকে ঔরঙ্গজেবের সংলাপ দক্ষতার সঙ্গে উচ্চারণ করে এ কথা বলেছেন।

: পুরোনো অভিনয়ের দৃশ্যগুলোকে যেভাবে দক্ষতার সঙ্গে রজনীকান্ত ফুটিয়ে তুলেছিলেন সে প্রসঙ্গেই এ কথা বলেছেন।

শিল্পীর প্রতিভাকে বয়স হার মানাতে পারে না—বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় এই সত্যের কথাই বলতে চেয়েছেন।

জীবনের শেষ যুদ্ধযাত্রার আগের রাতে সুজা পিয়ারাবানুকে কথাগুলো বলেছিল।

বক্তা কালীনাথ সেন এ কথার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন বয়স হয়ে গেলেও অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিভা আগের মতোই আছে।

রামব্রিজকে অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় সোজা স্টেজের উপরে চলে আসার নির্দেশ দেন।

শিল্পকে যে মানুষ ভালোবেসেছে তার বয়স বাড়লেও বার্ধক্য নেই— এই নিয়মের কথা বলা হয়েছে।

বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের সুদিন হারানোর আক্ষেপ, পুরোনো দিনকে অভিনয়ের মাধ্যমে মনে করার প্রাণপণ চেষ্টা কালীনাথ সেনের চোখে জল এনেছে।

নানা রঙের দিনগুলি' নাটকে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, শিল্পকে যে মানুষ ভালোবেসেছে তার বার্ধক্য নেই, একাকিত্ব নেই, অসুখ নেই, এমনকি মৃত্যুভয়ও নেই।

“Life's but a walking shadow” সংলাপটি ম্যাকবেথ নাটকের।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁর বয়সের ভারে হতাশার শিকার হয়েছেন। আর সে কারণেই স্মৃতির পথ ধরে তিনি ফিরে যেতে চেয়েছেন অতীতে তাঁর অভিনয়ের স্বর্ণযুগে। কখনও 'সাজাহান' নাটকে ঔরঙ্গজেবের চরিত্রে, কখনও 'রিজিয়া'-র বক্তিয়ার চরিত্রে নিজের অভিনয়ের কথা মনে পড়েছে তাঁর। আর বৃদ্ধ বয়সে দর্শকশূন্য অর্থকার প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে সেইসব চরিত্রের সংলাপ উচ্চারণ করেছেন তিনি। এরকমভাবেই তাঁর মনে পড়েছে 'সাজাহান' নাটকের সেই দৃশ্যের কথা যেখানে সবাইকে হত্যা করে ঔরাজের সিংহাসন পেয়েছেন। মধ্যরাতে একা প্রবল আত্মদ্বন্দ্ব আর যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত ঔরঙ্গজেবের সংলাপ উঠে আসে রজনীকান্তের মুখে। আর সেই সংলাপ উচ্চারণ করেই তাঁর মনে হয়েছে বয়সকে হার মানিয়ে তাঁর অভিনয়ের প্রতিভা এখনও স্বমহিমায় আছে। প্রকৃত শিল্পসত্তা কখনওই চাপা পড়ে থাকে না বা বয়সের কাছে হার মানে না — অভিনেতা রজনীকান্তের এই বক্তব্য যথার্থতা পেয়েছে। অতীতে প্রতিভার চরম বিকাশে তিনি নাট্যমঞ্চে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। রক্তে মিশে থাকা অভিনয় প্রতিভার জন্যই পুলিশের চাকরি রজনীকান্তের ভালো লাগেনি। নিজের শিল্পীসত্তার টানেই তিনি থিয়েটারে যোগ দেন। আর তাঁর এই প্রতিভা বৃদ্ধ বয়সেও একইরকম আছে বলেই মনে করেন রজনীকান্তবাবু।

আন্তন চেখভের সোয়ান সং অবলম্বনে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা "নানা রঙের দিন' নাটকটিতে স্মৃতির পথ ধরে একজন অভিনেতার নিজেকে খোজার পটভূমিতে রয়েছে তাঁর বর্তমানের অসহায়তা এবং গ্লানি । এই গ্লানির একদিকে যেমন রয়েছে তাঁর ব্যক্তিজীবনের নিঃসঙ্গতা, অন্যদিকে রয়েছে অভিনয় জীবনের অপ্রাপ্তির হতাশা। পরিবারের কেউ না থাকায় একাকিত্বের কারণে তাঁর মনে জন্ম নেয় তীব্র অবসাদ। বারবার ফিরে আসে অভিনয়ের কারণে যৌবনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার দুঃসহ স্মৃতি। একসময়ের প্রধান চরিত্রাভিনেতা আজ দিলদারের মতো নিতান্তই গৌণ চরিত্রে অভিনয় করেন এবং "তাও আর বছর কয়েক পরে মানাবে না'—এই হতাশাই হয়তো অভিনেতা রজনীকান্তকে নেশার প্রতি আসক্ত করে তোলে। আর এই নেশার ঘোর থেকে মুক্তি পেতেই স্মৃতির পথ ধরে হাঁটেন তিনি। তখন 'রিজিয়া' নাটকে বক্তিয়ারের চরিত্রে কিংবা, 'সাজাহান' নাটকে ঔরঙ্গজেবের চরিত্রে অভিনয়ের স্মৃতি তাকে সেই শূন্য প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারপ্রায় মঞ্চে সাময়িকভাবে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। পরমুহূর্তেই বর্তমানের শূন্যতা ঘিরে ধরে তাঁকে। তাঁর মনে হয় মঞ্চ থেকে নেমে এলে অভিনেতার আর কোনো সামাজিক স্বীকৃতিই থাকে না। এভাবেই ‘নানা রঙের দিন' নাটকে একজন অভিনেতার জীবনের রূপ ও রূপান্তরের ছবিকে স্বার্থকভাবে তুলে ধরেছেন নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়।

অ্যারিস্টাল' নাটক রচনার জন্য যে ছ-টি অঙ্গের উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে একটি হল সংলাপ। বিষয়ের সঙ্গে দর্শকের সংযোগ তৈরি হয় এই সংলাপের মাধ্যমে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানা রঙের দিন' নাটকে নাট্যকার একজন অভিনেতার জীবনের হতাশা এবং অতীতের স্মৃতিচারণার মাধ্যমে রূপ ও রূপান্তরের ছবিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। দর্শকশূন্য প্রেক্ষাগৃহে নেশাগ্রত অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নিজের মুখোমুখি নিজেই। দাঁড়িয়ে বক্তৃতাধর্মী এবং দীর্ঘ সংলাপগুলি বলেছেন। নিজের উপরে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টিই যেন প্রকাশিত হয় দীর্ঘ সংলাপে। অসংলগ্ন, এলোমেলো ও অতিদীর্ঘ সংলাপগুলিকে আরও বাস্তবগ্রাহ্য করেছে মধ্যে।

মধ্যে হিন্দি সংলাপের প্রয়োগ - "বাঃ বাঃ বুঢ়া। আচ্ছাহি কিয়া।" অজিতেশের সংলাপের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল সংলাপের ভিতরে সংলাপ। নির্মাণ। নিজের কথা বলতে বলতেই রজনীকান্তের বিবেকও যেন কথা বলে, উঠেছে। একই সংলাপের মধ্যে তৈরি হয়েছে দুটি সত্তার চেতনাগত বিপরীতধর্মিতা। আবার “মাইরি, এই না হলে অ্যাকটিং!" ইত্যাদি কথাবুলির অসাধারণ প্রয়োগও দেখা যায় নাটকটিতে। আবার রজনীকান্তের যন্ত্রণার প্রকাশে ভাষায় গাম্ভীর্যও সৃষ্টি করেছেন নাট্যকার -"একেবারে নিঃসঙ্গ...... শুধু করা দুপুরে জলন্ত মাঠে বাতাস যেমন একা যেমন সঙ্গীহীন...এভাবেই চরিত্রের অবস্থার পরিবর্তন ও বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নানা রঙের দিন'-এর সংলাপ অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ নাটক 'নানা রঙের দিন'-এ আটষট্টি বছরের প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ই মুখ্য চরিত্র । নাটকটিতে দর্শকশূন্য প্রেক্ষাগৃহে কখনও একা, কখনও প্রম্পটার কালীনাথ সেনের সঙ্গে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রজনীকান্ত যে কথাবার্তা বলেছেন, তা থেকে তাঁর চরিত্রের দুটি দিক উম্মোচিত হয়েছে। কখনও ব্যক্তি রজনীকান্ত, কখনও অভিনেতা রজনীকান্তের জীবন উঠে এলেও শেষপর্যন্ত একই সুতোয় গাঁথা হয়েছে এই দুটি জীবন। ব্যক্কি রজনীকান্ত: রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় পারিবারিক সূত্রে রাতবাংলার সদ্‌বংশজাত ব্রাহ্মণ। যৌবনে সুপুরুষ রজনীকান্ত শুধুমাত্র অভিনয়ের নেশায় পুলিশের চাকরিতে ইস্তফা দেন। অভিনয়ের কারণেই প্রেমিকার সঙ্গেও তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন তিনি একজন নিঃস্ব, রিক্ত, একাকী মানুষ। বিশাল পৃথিবীতে কোনো স্বজন না থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ক্রমাগত বিশ্ব হতে থাকেন তিনি।

অভিনেতা রজনীকান্ত: পঁয়তাল্লিশ বছর থিয়েটারে জীবন কাটানোর পর রজনীকান্ত জীবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে পুরোনো স্মৃতির মধ্যেও আনন্দ খুঁজেছেন। 'রিজিয়া' নাটকের বক্তিয়ার কিংবা 'সাজাহান' নাটকের ঔরঙ্গজেবের সংলাপ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি যেন অভিনেতা রজনীকান্তকে জীবিত রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আবার হতাশা গ্রাস করেছে তাঁকে। ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। তাঁর মনে হয়েছে যে, তিনি আসলে একা, কারণ সমাজজীবনে অভিনেতার কোনো স্বীকৃতি নেই।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ নাটক 'নানা রঙের দিন'-এ কালীনাথ সেন হলেন থিয়েটারের প্রম্পটার, যাঁর বয়স ষাটের কাছাকাছি। গভীর রাতে অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় যখন নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে একা মঞ্চে অসংলগ্ন আচরণ করছেন, তখনই ময়লা পাজামা পরে, কালো চাদর গায়ে এলোমেলো চুলের কালীনাথ সেনের মঞ্চে প্রবেশ ঘটে।

আশ্রয়হান কালীনাথের ব্যক্তিগত জীবনও রজনীকান্তের মতো বা তার থেকেও দুঃখের। কিন্তু সারাজীবনের সমস্ত হতাশা, না-পাওয়া, আক্ষেপের সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। আর এখানেই রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য। গভীর রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যখন রজনীকান্তের গলায় একরাশ হতাশা ঝরে পড়ে, তখন কালীনাথবাবু তাঁকে বারেবারে পুরোনো দিনের কথা না ভাবার পরামর্শ দেন। প্রম্পটার কালীনাথও যে নাটকের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক ব্যক্তিত্ব, তা বোঝা যায় যখন রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি মঞ্চের উপরে অনায়াস দক্ষতায় 'সাজাহান' নাটকে মহম্মদের সংলাপ থেকে শুরু করে দক্ষতার সঙ্গে বলে যান।

কালীনাথের চরিত্রে মানবিকতার প্রকাশ দেখা যায়। হতাশ এবং অবসাদগ্রস্ত রজনীকান্ডের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। গভীর রাতে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতেও চেয়েছেন। “আপনার প্রতিভা এখনও মরেনি...... এই কথার মাধ্যমে তিনি হতাশ রজনীকান্তকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছেন। এককথায় বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ডের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলায় পার্শ্বচরিত্র হিসেবে প্রম্পটার কালীনাথ সেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকটির বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় চরিত্র বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যয়ের স্বগতোক্তি। আর এই স্বগতোক্তির সূত্র ধরেই বেশ কিছু অংশে রজনীকান্তের আন্তরসত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গভীর রাতে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চের উপরে সম্পূর্ণ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাঁর আন্তরসত্তার জাগরণ ঘটে। সেই সত্তাই রজনীবাবুকে অর্থাৎ নিজেকেই শরীরের দিকে নজর দিতে বলে, নিজের বয়সের কথা ভেবে মদের নেশা ছেড়ে দিতে বলে। যখন অন্য প্রবীণ মানুষেরা সংযত জীবন কাটান, পরিমাণমতো খাওয়া-দাওয়া করেন, ঈশ্বরের নাম করেন—তখন মাঝরাতে দিলদারের পোশাক পরে রজনীবাবুর 'পেটভর্তি মদ গিলে' 'থিয়েটারি ভাষায়' 'আবোলতাবোল বকা একেবারেই যুক্তিযুক্ত মনে হয় না তাঁর। কিন্তু এই আন্তরসত্তার অন্যপিঠে আছে আর-এক সত্তার করুণ বাস্তব। সেখানে রয়েছে বয়সের ভারে ক্রমশ জীর্ণ হয়ে আসা এক বৃদ্ধ অভিনেতা। সেই অভিনেতার গলায় একদিকে শোনা যায় ব্যক্তিজীবনের নিঃসঙ্গতার হাহাকার, অন্যদিকে থাকে অভিনেতা হিসেবে ক্রমশ নিজের ক্ষমতা হারানোর যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণা থেকেই রজনীকান্তবাবু স্মৃতির পথে হাঁটেন। নিজের অভিনয় জীবনের স্বর্ণযুগে অভিনীত উল্লেখযোগ্য চরিত্ররা ভিড় করে তাঁর মনে। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও সব হারানোর এই হতাশাই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে অভিনেতা রজনীকান্তের বাহ্যিক চেতনায়।

[8:04 am, 27/09/2022] Anju: অজিতেশ বন্দ্যোপাধায়ের 'নানা রঙের দিন' বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতির সরণি ধরে অভিনয় জীবনের ফেলে আসা দিনগুলিতে প্য হাঁটা | দিলদারের পোশাক পরে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মধ্যরাতে যে মানুষটিকে যন্ত্রের উপরে দেখা যায় তিনি আপাতভাবে নেশার ঘোরে আছেন, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি রয়েছেন স্মৃতির ঘোরে। তাঁর অভিনয় জীবনের স্বর্ণযুগ চলে গেছে, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ—এই অবস্থায় স্মৃতির উত্তাপে নিজেকে সঞ্জীবিত করতে চেয়েছেন রজনীকান্ত। মঞ্চের উপরে
[8:05 am, 27/09/2022] Anju: ফেলে আসা জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর তাঁকে নাড়া দিয়ে গেছে। মনে পড়েছে একদিন এই অভিনয়ের জন্যই ছেড়ে আসা জীবনের একমাত্র প্রেমকে | অভিনেতার সামাজিক স্বীকৃতি না থাকা তাঁকে বেদনাদীর্ণ করেছে। তাঁর মনে হয়েছে যে, যাঁরা বলেন—'নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প', তাঁরা মিথ্যে কথা বলেন। কিন্তু জীবনের সায়াহ্নে সেই অভিনয়েই অহংকারের উপাদান খোঁজেন রজনীকান্ত 'রিজিয়া' নাটকের বক্তিয়ার, ‘সাজাহান’-এর ঔরঙ্গজেব—এইসব চরিত্রে অভিনয়ের স্মৃতি মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে মাঝরাতে মনে পড়ে আটষট্টি বছরের নিঃসঙ্গ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের। শিল্পকে যে মানুষ ভালোবেসেছে তাঁর বার্ধক্য নেই, একাকিত্ব নেই, নেই মৃত্যুভয়ও—এ কথা বলেও দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় বলেন—“আমাদের দিন ফুরিয়েছে।” এই জীবন সায়াহ্নে এসে অতীতের রঙিন দিনগুলিকে আঁকড়ে ধরে স্মৃতির উত্তাপ খোঁজার চেষ্টা করেছেন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ। সেই নিরিখে নাটকের নামকরণ 'নানা রঙের দিন' সার্থক হয়ে উঠেছে।

নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অনুবাদ নাটক 'নানা রঙের দিন'-এর সমাপ্তিতে বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মুখে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণভাবে শেকসপিয়রের নাটকের একাধিক সংলাপ ব্যবহার করেছেন। 'ওথেলো' নাটকের তৃতীয় অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে ইয়েগোর প্ররোচনায় ডেসডিমোনার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ওথেলো উচ্চারণ করেছিলেন—"Farewell the tranquil mind! ব্যক্তিগত বিষণ্ণতায় যুদ্ধক্ষেত্রকে বিদায় জানিয়েছিলেন তিনি। নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্তের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা আর ক্রমশ শেষ হতে চলা অভিনয় জীবনের হতাশাকে মেলাতে চেয়েছেন একইভাবে। অন্যদিকে, 'ম্যাকবেথ' 'নাটকে সেইটেন যখন ম্যাকবেথকে লেডি ম্যাকবেথের মৃত্যুসংবাদ দেয়, তখন তাঁর যন্ত্রণাবিশ্ব উচ্চারণ "Life's but a walking shadow." যেন হারিয়ে যাওয়া অসাধারণ অভিনয়ের দিনগুলিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাওয়া হতাশ রজনীকান্তের যন্ত্রণার সঙ্গে মিলে যায়। কিংবা নেপথ্য থেকে ভেসে আসা রিচার্ড দ্য থার্ড-এর সংলাপ — "A horsel A horsel My kingdom for a horsel" যুদ্ধক্ষেত্রে প্রিয় ঘোড়ার মৃত্যুতে বিষা রিচার্ডের এই উচ্চারণ, অভিনয় জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে অতীতের সোনালি দিনগুলোর জন্য রজনীকান্তের আক্ষেপকেই প্রকাশ করে।

মাত্র একটি অঙ্ক বা সর্গ বা পরিচ্ছেদে সমাপ্ত, দ্রুতসংঘটিত নাটকই হল একাক নাটক। এটি এমন এক ধরনের নাটক যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল একমুখিতা। অবশ্য আদর্শ নাটকের সমস্ত লক্ষ্য একাঙ্ক নাটকেও উপস্থিত থাকে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকটি হল প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ফেলে আসা অভিনয়জীবনের স্মৃতিরোমন্ত্রন। মঞ্চে দেখা যায়, দিলদারের পোশাক পরে মধ্যরাতের শূন্য প্রেক্ষাগৃহে এই মানুষটি নেশার ঘোরে রয়েছেন। তিনি আসলে রয়েছেন স্মৃতির ঘোরে। পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিনয়জীবনের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে এসেছেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ্য এই সু-অভিনেতা। অভিনয়ের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা এই মানুষটি হতাশাদীর্ণ হয়ে বলেছেন, “অভিনেতা মানে একটা চাকর, একটা জোকার, একটা ক্লাউন।" তাঁর মনে হয়েছে, “যারা বলে 'নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প'—তারা সব গাধা-গাধা।” কিন্তু জীবনসায়াহ্নে উপনীত অভিনেতা সেই অভিনয়ের মধ্যেই আত্মতৃপ্তি এবং গর্বের উপাদান খোঁজেন। অতীতকে সম্বল করে, মঞ্চের রঙিন দিনগুলিকে আঁকড়ে ধরে এই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ অনুভব করেন, “স্মৃতি সততই সুখের।"

সুতরাং, এক এবং অভিন্ন বিষয় নিয়েই এই নাটকটি রচিত হয়েছে। আর নাটকের প্রাণ যে দ্বন্দ্ব, সেই নাট্যদ্বন্দ্বও এই নাটকটিতে উপস্থিত রয়েছে। অভিনেতা রজনীকান্ডের অন্তর্দ্বন্দ্ব নাটকটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ‘ঘটনার ঘনঘটা' এখানে অনুপস্থিত। মাত্র দুটি চরিত্রের (কালীনাথ ও রজনীকান্ত) সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। রজনীকান্ত চরিত্রটির দীর্ঘ সংলাপ মাঝেমধ্যেই নাটকটির গতি রুদ্ধ করে দিলেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠক বা দর্শক টানটান অবস্থায় উপভোগ করতে পারেন এর নাট্যরস। সুতরাং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন'-কে আমরা শিল্পসার্থক একাঙ্ক নাটক বলতেই পারি।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানা রঙের দিনা নাটকে বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় স্মৃতির পথ ধরে তাঁর অতীতের অভিনয় জীবনকে মনে করেছেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে একের পর এক তাঁর অতীতের অভিনয়ের চরিত্রের সংলাপগুলি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বলার মধ্য দিয়ে এক ধরনের লুকোনো গর্ব আর অহংকার ধরা পড়েছে তাঁর কথায়। 'রিজিয়া' নাটকে বক্তিয়ারের চরিত্রে অভিনয় তাঁর স্মৃতিকে নাড়া দেয়— "জীবনের ভয় দেখাও সম্রাজ্ঞী? বক্তিয়ার মরিতে প্রস্তুত সদা।" প্রম্পটার কালীনাথকে সামনে রেখে রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'সাজাহান' নাটকের ঔরঙ্গজেবের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন- “যা করেছি ধর্মের জন্য। যদি অন্য উপায়ে সম্ভব হত। —উঃ কী অন্ধকার! কে দায়ী? আমি এ বিচার। –ও কী শব্দ? -না, বাতাসের শব্দ।" — পরিবারের সবাইকে খুন করে সিংহাসনে বসা ঔরঙ্গজেবের চরিত্রে যে প্রবল দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলে রজনীকান্ত ফিরে গেছেন তাঁর সোনালি অতীতে। বৃদ্ধ বয়সের ফুরিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা ভুলে নিজের অভিনয় প্রতিভার অবশেষকে যেন খুঁজে পান রজনীকান্ত। "...আমার প্রতিভা এখনও মরেনি, শরীরে যদি রক্ত থাকে, তাহলে সে রক্তে মিশে আছে প্রতিভা!" — স্মৃতির পথ ধরে এভাবেই বেঁচে থাকার রসদ খোঁজেন বর্তমানে নেহাতই নগণ্য দিলদারের চরিত্রাভিনেতা রজনীকান্ত।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে 'ও' বলতে বক্তা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁর যৌবনের প্রেমিকার কথা বুঝিয়েছেন।

* আটষট্টি বছরের বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নাটকের। অভিনয়ের শেষে অতিরিক্ত মদ্যপান করে গভীর রাতে শূন্য প্রেক্ষাগৃহের মঞ্চের উপরে এসে দাঁড়ান সেই সময় প্রম্পটার কালীনাথের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অতীতের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তাঁর মনে পড়ে ফেলে আসা সোনালি সময় ও প্রেমিকার কথা। 'ইন্সপেক্টর অফ পুলিশ'-এর চাকরি ছেড়ে তিনি তখন প্রবেশ করেছেন থিয়েটারের জগতে আলমগিরের ভূমিকায় রজনীকান্তের অভিনয় দেখে একটি মেয়ে তাঁর প্রেমে পড়ে। ধনী পরিবারের সেই মেয়েটি দেখতেও ছিল বেশ সুন্দর। মনটা ছিল তার সরল, কোনো ঘোরপ্যাঁচ তখনও সেই মনে স্থান করে নিতে পারেনি। রজনীকান্তবাবুর মতে, তার এই অমলিন নারীসত্তার মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে ছিল আগুন। মেয়েটির টানা টানা কালো চোখে রজনীকান্ত দেখতে পেতেন অচেনা দিনের আলো। তার কালো চুলের চেউয়ে ছিল এক আশ্চর্য শক্তি। অভিনয় জগতে সেদিন নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত রজনীকান্ত একসময় সেই মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মেয়েটি শর্ত দেয় যে, একমাত্র থিয়েটার ছাড়লেই তাদের বিয়ে সম্ভব হবে। এখানে মেয়েটির দেওয়া সেই শর্তের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় জীবনের শুরুতে তার অভিনয় দেখে একটি মেয়ের মধ্যে মুখতার সৃষ্টি হয়। প্রম্পটার কালীনাথ সেনের সঙ্গে অনেকটা স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে রজনীকান্তবাবুর মনে পড়ে যায় নিজের যৌবনের সেইসব কথা। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি কালীনাথবাবুকে বলেন যে, ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হলে তিনি তাঁর প্রেমিকাকে বিয়ের প্রভাব দেন। কিন্তু মেয়েটির শর্ত ছিল, শুধুমাত্র থিয়েটার ছাড়লেই তার পক্ষে রজনীকান্তবাবুকে বিয়ে করা সম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মনে প্রতদিনের অভিনয়ের মাধ্যমে অর্জন করা গর্ব, খ্যাতি, মোহ আর অহংকারের প্রাচীর যেন ভেঙে পড়ে। সেসময় প্রেমের সম্পর্কের পরিবর্তে তিনি অভিনয়কেই বেছে নেন।

* সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার রাতে একটি হালকা হাসির নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে রজনীকান্তবাবু অভিনেতার জীবনের সারসত্যটি উপলব্ধি করেন। তার মনে হয় অভিনয়কে যাঁরা পবিত্র শিল্প বলেন, তারা হয় বোঝা কিংবা মিথ্যা কথা বলেন। কারণ, অন্তরে সে-কথা তাঁরা বিশ্বাস করেন না । অভিনেতা শব্দটি জোকার, ক্লাউন কিংবা ভাড়েরই নামান্তর মাত্র, যার কোনো সামাজিক সম্মান বা স্বীকৃতি নেই |

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অভিনেতার সামাজিক অবস্থান নিয়ে গভীর হতাশার শিকার হয়েছেন। একদিন পুলিশের চাকরি ছেড়ে অভিনয়কে সর্বস্ব করে নিয়েছিলেন তিনি। অনেক খ্যাতিও হয়েছিল তাঁর। কিন্তু এই খ্যাতিবা কদর সবই ততক্ষণের জন্য যতক্ষণ একজন অভিনেতা মঞ্চের উপরে থাকেন। সমাজ অভিনেতাকে আপন করে নেয় না। তাই যে অভিনয়সূত্রেই তাঁর জীবনে একমাত্র প্রেম সম্পর্কটি এসেছিল তা পরিণতি পায়নি। কারণ রজনীকান্তকে থিয়েটার ছেড়ে দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল এখান থেকেই তাঁর উপলব্ধি হয় যে, যাঁরা বলেন “নাট্যাভিনয় একটি পবিত্র শিল্প"—তাঁরা মিথ্যে কথা বলেন। অভিনেতাদের একমাত্র কাজ সারাদিনের পরিশ্রান্ত মানুষদের আনন্দ দেওয়া। অর্থাৎ “একটা ভাঁড় কি মোসায়েবের যা কাজ তাই।" জনসাধারণ অভিনয়ের প্রশংসা করে হাততালি দেবে। কিন্তু স্টেজ থেকে নামলেই একজন অভিনেতার পরিচয় সে ‘থিয়েটারওয়ালা', 'নকলনবীশ। দর্শক অভিনেতার সঙ্গে আলাপে আগ্রহী হবে, হয়তো চা-সিগারেটও খাবে, কিন্তু সে-সবই বাইরের দুনিয়ায় এই ১ পরিচয়সূত্রে নিজেকে জাহির করার জন্য। কোনো সামাজিক সম্মান অভিনেতার জন্য নেই। অভিনেতার সঙ্গে কোনো বৈবাহিক সম্পর্কও কেউ স্থাপন করবেনা| নিজের জীবন থেকে এই উপলব্ধিই রজনীকান্তের হয়েছিল।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকে বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় যখন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মাঝরাতে শূন্য প্রেক্ষাগৃহের ফাঁকা মঞ্চে বিলাপ করছেন তখন সেখানে প্রম্পটার কালীনাথের আগমন ঘটে। হতাশ রজনীকান্তকে সে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু তাতে রজনীকান্তের বিলাপ আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে। একদিকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নিঃসঙ্গতা, অন্যদিকে অভিনেতার সামাজিক অবস্থান—এই দুই ও মিলে তাঁর হতাশা গভীরতর হয়। রজনীকান্তের এই দুঃখ কালীনাথকে বিস্মিত করে। আর তার বিস্ময়ের উত্তরেই রজনীকান্ত মন্তব্যটি করেন।

। আটষট্টি বছর বয়সে এসে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিগত এবং অভিনয় জীবন নিয়ে গভীর হতাশার শিকার হয়েছেন। তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা এখনও কুড়োলেও অভিনয়ের সোনালি দিনগুলো এখন অতীত। দ্বিতীয়ত দীর্ঘ অভিনয়জীবনে রজনীকান্ত উপলব্ধি করেছেন যে। অভিনেতার যাবতীয় কদর মঞ্চের উপরেই। তারপরে কেউ তাকে মনে রাখে না। কোনো অভিনেতার এই অবস্থায় একমাত্র আশ্রয় হতে পারে তার পরিবার । কিন্তু রজনীকান্তের সেটাও নেই। “মরবার সময় মুখে দু-কোতা দেয় এমন কেউ নেই আমার।” দর্শক তার জন্য কিছু করবে না, স্ত্রী কেউ নেই। অথচ একদিন এই অভিনয়ের জন্য তিনি পুলিশের চাকরি ছেড়েছিলেন, অভিনয় ছাড়তে পারবেন না বলেই তার জীবনের একনায় প্রেম-সম্পর্কটিও ভেঙে গিয়েছিল। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ঐ এককিছু। এবং হতাশা রজনীকান্তের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নানা রঙের দিন' নাটকটি মূলত কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রবীণ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতির পথ বেয়ে জীবনকে উপলব্ধির প্রয়াস। গভীর রাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর এই আত্মপোলব্ধির দোসর হয়েছেন। প্রম্পটার কালীনাথ সেন | কালীনাথের সঙ্গে রজনীকান্তের দীর্ঘ সংলাপে উঠে এসেছে তাঁর ফেলে আসা জীবনের গল্প। যৌবনের রূপ, আদর্শ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, প্রেম, নারী—সবই যেন ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে উঠেছে তাঁর চোখে।

যৌবনে পুলিশ ইনস্পেকটরের চাকরি ছেড়ে নাটকের জগতে এসেছিলেন তিনি তবে নাটকে এসে তাঁর নামডাক হয়েছিল যথেষ্টই। নাটকের সূত্রেই প্রেম এসেছিল তাঁর জীবনে। ধনী পরিবারের সুন্দরী মেয়ে তাঁর প্রেমে পড়লেও যা পরিণতি পায়নি। প্রেমিকার দেওয়া থিয়েটার ছাড়ার প্রস্তাব মেনে নিয়ে পারেননি রজনীকান্ত। থিয়েটার আর সম্পর্কের দ্বন্দ্বে সেদিন থিয়েটারকেই বেছে নিয়েছিলেন রজনীবাবু। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি উপলব্ধি। করেছিলেন অভিনেতা জীবনের অর্থহীনতা। অভিনেতার যা কিছু মূল্য তা শুধুমাত্র মঞ্চেই, সমাজজীবনে তাঁর কোনো গুরুত্বই নেই। তাঁর ব্যক্তিগত ও অভিনয় জীবনের নিঃসঙ্গতা আর হতাশাই থিয়েটারের দেয়ালে কালো অক্ষরে লেখা আছে বলে মনে করেন রজনীকান্তবাবু।

" আলোচা নাটকে গভীর রাতে অভিনয়ের শেষে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চের ওপরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে। তাঁর হাতে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি, পরনে দিলদারের পোশাক। রজনীকান্তের। ফাতোত্তি থেকে জানা যায় যে, অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য সেদিন অভিনয়ের পর তিনি গ্রিনরুমেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। নিঝুম, অন্ধকার রাতে কেবল । নিজের গলাই কানে আসে রজনীকান্তের। তাই তিনি একটু ভয়ও পেয়ে যান | আগের রাতেও ঠিক একই ঘটনা ঘটলেও রামব্রিজ এসে তাঁকে ঘুম থেকে তুলে ট্যাক্সি ডেকে বাড়ি পৌঁছোনোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এই কাজের জন্য রজনীকান্ত তাকে নগদ তিন টাকা বকশিশও দেন। আর এর ফলেই ঘটে। বিপত্তি। রজনীকান্ডের থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে রামব্রিজ প্রচুর পরিমাণে থেনো থদ খেয়েছে। তাই সে-ও আজ নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন এবং প্রধান ফটকের তালা আটকে অন্য কোথাও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তাই অনেক ডাকার পরও রামব্রিজের দেখা না পাওয়ায় গভীর রাতে রজনীকান্তের পক্ষে বাড়ি যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। আর এই পরিস্থিতিতেই রজনীকান্ত আলোচ্য মন্তব্যটি করেছিলেন।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ নাটক 'নানা রঙের দিন'-এ এক পেশাদারি থিয়েটারের ফাঁকা মঞ্চে অন্ধকার রাতে শূন্য প্রেক্ষাগৃহে দেখা যায় আটষট্টি বছরের বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে। রজনীকান্তের পরনে দিলদারের পোশাক, হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। রজনীকান্তের কথা। থেকে জানা যায়, অভিনয়ের পরে নেশার ঘোরে তিনি গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে। পড়েছিলেন। ঘুম থেকে জেগে উঠে তিনি দেখেন সাজাহান-জাহানারা-সহ বাকি সব চরিত্রাভিনেতা চলে গিয়েছে। গভীর রাতে মঞ্চে তিনি একা রয়েছেন। নিঝুম রাতের শূন্য প্রেক্ষাগৃহে ট্যাক্সি ডেকে দেওয়ার জন্য রামব্রিজকে ডেকেও সাড়া পান না তিনি। তার মনে পড়ে যায় আগের রাতে তাকে বাড়ি যাবার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য রামব্রিজকে তিনি তিন টাকা বকশিশ দিয়েছেন। সেই টাকাতেই 'রামধেনো' কিনে তাঁকে দেড় বোতল । খাইয়ে গেছে রামব্রিজ এবং সে নিজেও হয়তো কোথাও নেশার ঘোরে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। অসহায় প্রবীণ রজনীকান্তের মনে হয় অতিরিক্ত। মদ্যপানে তাঁর বুকের ভেতরটা কাপছে আর শারীরিক কষ্ট হচ্ছে। থিয়েটারে নিবেদিতপ্রাণ রজনীকান্তের অবচেতন মনেও কাজ করে চলে থিয়েটারের দৃশ্যপট। তাই মুখের ভিতরটা শুকিয়ে আসার যে কষ্ট তিনি অনুভব করেছেন, তার সঙ্গে তুলনা করেছেন অডিটোরিয়ামে নাটক চলাকালীন দর্শকদের হাটাহাটির মতো বিশৃঙ্খলার দৃশ্যকে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ নাটক 'নানা রঙের দিন'-এ প্রধান চরিত্র বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থিয়েটার শেষে ফাকা মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে নিজের মুখোমুখি হয়েছেন। জীবনের আটষট্টিটা বছর পার করে যৌবনে অভিনয়ের সোনালি দিনগুলির কথাই তাঁর বারেবারে মনে পড়ে। জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তগুলিকে পেছনে ফেলে আসার যন্ত্রণা অভিনেতা রজনীকান্তকে কষ্ট দেয়। তিনি উপলখি করেন যে, নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন তিনি। এভাবে জীবন সায়াছে দাঁড়িয়ে অভিনেতা রজনীকান্ত চূড়ান্ত হতাশার মুখোমুখি হয়েছেন। এই হতাশা শুধু তাঁর ব্যক্তিজীবনেরই নয়, অভিনয় জীবনেরও। অভিনেতা হিসেবে যখন অতীতই শুধু সম্বল, জীবনের সব স্বপ্নগুলো ক্রমণ মুছে যেতে চলেছে মৃত্যুর অন্ধকারে নেশার ঝোঁকে সেই নির্মম বাস্তবেরই যেন মুখোমুখি হয়েছেন রজনীকান্ত। বৃদ্ধ বয়সে যখন সবাই নিশ্চিত জীবনযাপন করতে চান, নাম সংকীর্তন আর নবানে আশ্রয় খোঁজেন, তখন রজনীকান্তের ভিতরে যে অস্থিরতা তা যেন শিল্পীসত্তার জীর্ণ হৃদয়ের যন্ত্রণা। ভালো কাজের ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ আর বেশিদিন তাঁর কাছে নেই— সেই আক্ষেপ আর আশঙ্কাই রজনীকান্তকে হতাশ করে তুলেছে।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদ নাটক 'নানা রঙের দিন'-এ বুখ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় মধ্যরাতে ফাঁকা মঞ্চে মদ্যপান করে নিজেই নিজেকে উদ্দেশ করে আলোচ্য মন্তব্যটি করেছেন।

* নেশাগ্রস্ত রজনীকান্ত তাঁর বৃদ্ধাবস্থায় উপলব্ধি করেন যে, তাঁর আন্তরসত্তা যেন জেগে উঠেছে। সে তাঁকে শরীরের দিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিচ্ছে।

অন্যদিকে, বাইরের মানুষটা অর্থাৎ তাঁর বাহ্যিক সত্তা অনুভব করে যে, প্রতিদিন অর্ধেক শিশি কলপ লাগিয়ে বয়সকে হয়তো কিছুটা আড়াল করা যায়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে যা চলে যায় তা আর কখনও ফেরে না। এইভাবে রজনীকান্তের দুটি সত্তার অন্তদ্বন্দ্বের মধ্যে তিনি দেখতে পান বয়সের সজো মৃত্যুর দিকে তাঁর স্পষ্ট এগিয়ে চলা - "... জীবনে ভোর নেই, সকাল নেই, দুপুর || নেই সত্ত্বেও ফুরিয়েছে—এখন শুধু মাঝরাত্তিরের অপেক্ষা..." । অচমৃত্যুর প্রান্তে দাঁড়িয়েও তাঁর ভিতরের শিল্পীসত্তা মরতে চায় না। তাই জীবনের শেষ দৃশ্যের অভিনয়ে তিনি রাজি নন। অথচ বাইরের মানুষটা বুঝতে পারে যে, জীবনের অন্তিম পর্যায়ে শ্মশানঘাটের দৃশ্যের অভিনয়ে থাকবে পরিচিত বন্ধুবান্ধবেরা আর উইংসে উপস্থিত হবে পরপারের দূত। নিয়তির অবার্থ বিধান তাই না চাইলেও জীবনের শেষ দৃশ্যে অভিনয় করতেই হবে তাঁকে। মৃত্যুর নিশ্চিত হাতছানিতে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়েই অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় আলোচা মন্তব্যটি করেছেন।