Chapter-11, ওশিয়ানিয়া

নিউজিল্যান্ডকে দক্ষিণ গোলার্ধের ব্রিটেন বলে, কারণ—1 গ্রেট ব্রিটেনের প্রতিপাদস্থানে নিউজিল্যান্ডঅবস্থিত, 2 উভয়ই দ্বীপরাষ্ট্র, 3 নিউজিল্যান্ডে গ্রেট ব্রিটেন থেকে আসা বহু মানুষ বাস করে, 4 উভয় দেশেরই খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সংস্কৃতির মিল রয়েছে।

ধারণা: পৃথিবীর দ্বীপ মহাদেশ ওশিয়ানিয়া অসংখ্য দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত। এইসব দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জসমূহের কিছু অংশ সামুদ্রিক মৃত প্রবালকীটের দেহ সঞ্চয়ের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রবাল দ্বীপ নামে পরিচিত। যেমন—মাইক্রোনেশিয়া ও পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত মার্শাল, গিলবার্ট, ক্যারোলাইন প্রভৃতি হল প্রবাল দ্বীপের উদাহরণ।
সৃষ্টির পদ্ধতি : সমুদ্রের গভীরে দলবদ্ধভাবে বসবাসকারী মৃত প্রবালকীটের দেহ ও দেহনিঃসৃত চুনজাতীয় পদার্থ ক্রমান্বয়ে হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্র তলদেশে সজ্জিত হয়ে এবং কালক্রমে উচ্চতায় বৃদ্ধি পেয়ে সমুদ্রের ওপর প্রবাল দ্বীপ গঠন করেছে।

উদাহরণ : অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূল বরাবর প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ও প্রায় 2300 কিমি দীর্ঘ গ্রেট বেরিয়ার রিফ বা বৃহৎ প্রবাল প্রাচীর হল এরূপ প্রবাল দ্বীপের উদাহরণ। বৃহৎ দৈর্ঘ্যের জন্য একে দ্বীপ না বলে প্রাচীর বা রিফ বলা হয়।

তাসমানিয়াকে দক্ষিণ গোলার্ধের বাগান রাজ্য বলা হয়। এর কারণ—এটি

অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র দ্বীপরাজ্য যেখানে অসংখ্য জাতীয় উদ্যান (ওয়ালস অব জেরুজালেম, ফ্র্যাঙ্কলিন-গর্ডন ওয়াইল্ড রিভারস প্রভৃতি) গড়ে উঠেছে, যাদের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক শোভা দেশ-বিদেশের বহু পর্যটককে আকর্ষণ করে। এই রাজ্যের প্রায় অর্ধাংশই জাতীয় উদ্যান দ্বারা অধিকৃত হওয়ায় তাসমানিয়াকে 'দক্ষিণ গোলার্ধের বাগান রাজ্য' বলে।

সেন্ট ডিনসেন্ট উপসাগরের তীরবর্তী অ্যাডিলেড শহরটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী, শিল্পকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। এই শহরটি 1836 সালে স্থাপিত হয়। এটি অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম শহর এবং এর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় 12 লক্ষ 56 হাজার (2015 সাল)।

গ্রেট অস্ট্রেলিয়ান বাইট হল এটি একটি উপসাগর। এই উপসাগরের তিনদিক ঘেরা এবং একদিক উন্মুক্ত। প্লেট অস্ট্রেলিয়ান বাইট-এর উত্তরে নান্নারবার উপকূল সমভূমি, পশ্চিমে ডার্লিং পর্বত এবং পূর্বে অস্ট্রেলিয়ান আরস পর্বত অবস্থিত। এই তিনটি স্থলভাগের মধ্যবর্তী ধনুকের মতো আকৃতিবিশিষ্ট উপসাগর হল গ্রেট অস্ট্রেলিয়ান বাইট (Great Australian Bight)

নিউজিল্যান্ডের জলবায়ু মূলত নাতিশীতোয় প্রকৃতির। তবে উত্তর দ্বীপের উত্তরাংশে উপক্রান্তীয় জলবায়ু এবং দক্ষিণ দ্বীপের দক্ষিণাংশে শীতল জলবায়ুও দেখা যায়। এখানকার উন্নতা আরামদায়ক। এখানে বছরে চারটি ঋতু—গ্রীষ্মকাল (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি), শরৎকাল (মার্চ-মে), শীতকাল (জুন আগস্ট), বসন্তকাল (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) দেখা যায়। তবে এখানে নির্দিষ্ট কোনো বর্ষাকাল নেই। পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে সারাবছরই বৃষ্টিপাত হয় | নিউজিল্যান্ডে মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাত 65-150 সেমির মধ্যে হয়। শীতকালে নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ অংশে প্রচুর তুষারপাতও হয় |

সমগ্র ওশিয়ানিয়া মহাদেশের ক্ষেত্রফল প্রায় 90.08 লক্ষ বর্গকিমি। ক্ষেত্রফল অনুসারে ওশিয়ানিয়া বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মহাদেশ | ভূপৃষ্ঠের মোট আয়তনের প্রায় 6 শতাংশ স্থান এই মহাদেশ দ্বারা অধিকৃত ।

ওশিয়ানিয়ার বৃহত্তম ভূখণ্ড অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রফল প্রায় 76 লক্ষ 87 হাজার বর্গকিমি (অর্থাৎ মহাদেশটির প্রায় 7/8 ভাগই অস্ট্রেলিয়ার অন্তর্গত)। এরপর যথাক্রমে পাপুয়া নিউগিনি (প্রায় 4 লক্ষ 61 হাজার বর্গকিমি) এবং নিউজিল্যান্ডের (প্রায় 2 লক্ষ 68 হাজার বর্গকিমি) স্থান।

নিউজিল্যান্ডের প্রধান দুটি দ্বীপ হল—উত্তর দ্বীপ এবং দক্ষিণ দ্বীপ । উত্তর দ্বীপের তারানাকি সমভূমি, অকল্যান্ড অঞ্চল, ওয়েলিংটন সমভূমি এবং দক্ষিণ দ্বীপের ক্যান্টারবেরি সমভূমি পশুপালনের জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলগুলির মধ্যে উত্তর দ্বীপ গবাদিপশু পালনের জন্য এবং দক্ষিণ দ্বীপ মেরিনো মেষ পালনের জন্য বিখ্যাত। উত্তর দ্বীপে মাংসম্প্রদায়ী এবং দুগ্ধপ্রদায়ী উভয় প্রকার গবাদিপশুই সমান গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। নিউজিল্যান্ডের রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশই পশুজাত পণ্য ।

হিমবাহ ও ভূ-আলোড়নজাত কার্যাবলির প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সব হ্রদের জলই লবণাক্ত প্রকৃতির। অস্ট্রেলিয়ার আয়ার হ্রদের অববাহিকা অঞ্চলে অনেক লবণাক্ত জলের হ্রদ দেখা যায়, যেমন—আয়ার, টরেন্স, গার্ডনার ইত্যাদি এদের মধ্যে আয়ার হল এ দেশের বৃহত্তম হ্রদ যেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 15 মিটার নীচে অবস্থিত।

ডাউনস্; ডাউনস্ হল অস্ট্রেলিয়ার একপ্রকার তৃণভূমি। গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের পশ্চিম দিকে অবস্থিত মারে ডার্লিং অববাহিকায় ছোটো ছোটো ঘাসের জমি ডাউনস্ নামে পরিচিত। কম বৃষ্টিপাতের জন্য এখানে এই তৃণভূমির সৃষ্টি হয়েছে এবং এই অঞ্চলেই অস্ট্রেলিয়ার সর্বাধিক পশুপালন করা হয়।

জ্যাকোস; মারে-ডার্লিং অববাহিকার পশুখামারগুলি আয়তনে খুব বড়ো। এইসব বৃহৎ পশুখামারের কর্মীদের জ্যাকোস (Jackaos) বলে। এরা মূলত পশুদের প্রতিপালন, দেখাশোনা, চরানো ইত্যাদি কাজ করে।

অবস্থান: নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের পূর্বভাগে অবস্থান করছে বিখ্যাত ক্যান্টারবেরি সমভূমি। দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল বরাবর সংকীর্ণ এই সমভূমিটি গড়ে উঠেছে।

ববরণ: স্বল্প বৃষ্টিপাতের জন্য এখানে বিস্তীর্ণ ঘাসের জমি সৃষ্টি হয়েছে। এই সমভূমিটি পশুপালনের জন্য বিখ্যাত। ক্যান্টারবেরি সমভূমির তৃণের ওপর নর্ভর করে এখানে দুগ্ধ, চামড়া, মাংস প্রভৃতি শিল্পের উন্নতিসাধন ঘটেছে। এই অঞ্চলের নাতিশীতোয় জলবায়ু পশুপালনের পক্ষে আদর্শ। ক্যান্টারবেরি সমভূমি নিউজিল্যান্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি অঞ্চল।

আটেজীয় কূপ: কার্পেন্টারিয়া নিম্নভূমি অঞ্চলে শিলান্তরের আকৃতি এমনই (গামলার মতো) যে কূপ খুঁড়লে মাটির নীচের জল পাম্পের সাহায্য ছাড়াই বেরিয়ে আসে। এই ধরনের কূপকে আর্টেজীয় কূপ বলে। প্লায়া: অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমে পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গায় যে মরুভূমি আছে তার মাঝে মাঝে লবণাক্ত জলের হ্রদ দেখতে পাওয়া যায়। সূর্যোদয় একেই প্লায়া বলে |

আয়ার রকের বৈশিষ্ট্য: লাল বেলেপাথরে গঠিত আয়ার রক অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম মালভূমির একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দর্শনীয় বস্তু। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিনের বিভিন্ন সময়ে এর বর্ণ পরিবর্তন হয়। কখনো এটিকে লালচে বাদামি, কখনো হলদে, কখনো বা হালকা বেগুনি দেখতে লাগে ।

ওশিয়ানিয়া মহাদেশের বৃহত্তম দেশ অস্ট্রেলিয়া। এই দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে গড় বিস্তার প্রায় 3500 কিমি এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে গড় বিস্তার প্রায় 3800 কিমি। সমগ্র মহাদেশটির মোট ক্ষেত্রফলের প্রায় 76 লক্ষ 87 হাজার বর্গকিমি জুড়ে অস্ট্রেলিয়া অবস্থান করে। আয়তনের নিরিখে অস্ট্রেলিয়া গোলার্ধে পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া-নিউগিনি, মার্শালসহ স্বাভাবিক প্রায় দশ হাজার দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এই মহাদেশ গঠিত। অসংখ্য দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত অস্ট্রেলিয়া দেশটিকে এর সুবৃহৎ আয়তনের গোলার্ধে কারণে মহাদেশের সঙ্গে তুলনা করে দ্বীপ মহাদেশ বলে।

মৌনালোয়া আগ্নেয় পর্বতটি সমুদ্র তলদেশ থেকে উপরে উঠেছে। সমুদ্রতল থেকে এই পর্বতের উচ্চতা 9170 মিটার। অন্যদিকে, হিমালয় পর্বতের এভারেস্ট শৃঙ্গের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 8848 মিটার। অর্থাৎ, মোট উচ্চতার বিচারে মৌনালোয়া পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত। কিন্তু উচ্চতার হিসাব করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে। যৌনালোয়ার 5000 মিটার রয়েছে সমুদ্র সমতলের নীচে আর বাকি 4170 মিটার রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে। যৌনালোয়ার উচ্চতা অধিক হলেও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এটি হার 4170 মিটার ওপরে রয়েছে। যেখানে এভারেস্ট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 8848 মিটার উঁচুতে অবস্থিত। তাই মাউন্ট ঝড়ঝঞ্জা এভারেস্টই পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ।

প্রকৃতপক্ষে নিউজিল্যান্ডে অসংখ্য হিমবাহ থেকে সৃষ্ট নদীগুলি নিত্যবহ কিন্তু মানচিত্র অনুযায়ী । নিউজিল্যান্ডের দ্বীপগুলি উত্তর-দক্ষিণে বেশি, কিন্তু পূর্ব-পশ্চিমে খুব কম বিস্তৃত। 2 এই দ্বীপগুলির প্রায় মাঝবরাবর টারারুয়া, রুয়াহাইন, সাদার্ন, আল্পস প্রভৃতি পর্বতগুলি রয়েছে। তাই নদীগুলি পর্বতের ওপর থেকে নেমে খুব কম পথ প্রবাহিত হয়ে সাগরে পড়েছে। ফলে এদের দৈর্ঘ্য খুব কম। নদীগুলি বিভিন্ন পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে পর্বতের ঢাল বেয়ে দ্রুত নেমে আসে এবং মহাসাগরে গিয়ে পড়ে। তাই নদীগুলি অসম্ভব খরস্রোতা নদীগুলি এরকম হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে আদর্শ।

আয়ার রকটি লাল বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। এটি একটি দর্শনীয় বস্তু। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত—দিনের বিভিন্ন সময় এই শিলাখন্ডের রঙের পরিবর্তন ঘটে। কখনো এটিকে লালচে বাদামি, কখনো হলদে, আবার কখনো বা হালকা বেগুনি রঙের দেখতে লাগে। তাই এই আয়ার রক দেখার জন্য অসংখ্য পর্যটক ছুটে আসেন।

ঋতুর এই তারতম্য হয় মূলত গোলার্ধগত অবস্থানের জন্য। আমরা উত্তর গোলার্ধে বসবাস করি। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড দক্ষিণ গোলার্ধের দেশ। স্বাভাবিকভাবেই উত্তর গোলার্ধে যখন সূর্যের আলো তির্যকভাবে পড়ে তখন উত্তর গোলার্ধে শীতকাল বিরাজ করে এবং ঠিক একই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে বলে ওই সময় দক্ষিণ গোলার্ধে প্রখর গ্রীষ্মকাল অনুভূত হয়। অর্থাৎ ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে উত্তর গোলার্ধে আমরা যখন শীতে কাঁপতে থাকি তখন দক্ষিণ গোলার্ধের অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে মানুষ প্রচন্ড গরমে ঘামতে থাকে ।

অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বে প্রায় 2300 কিমি দীর্ঘ প্রবাল প্রাচীরটি পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রবাল প্রাচীর। এটি নিছক একটি প্রবাল প্রাচীর নয়। বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে – (1) প্রবালগুলি মহাসাগরের নীচে বিভিন্ন ধরনের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রেখেছে।  (2) এই প্রাচীরটি সামুদ্রিক ঝড়ঝঙ্কা থেকে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলকে রক্ষা করে। (3) এমনকি এই প্রবাল প্রাচীরটি থাকায় সুনামির হাত থেকেও উপকূলভাগ রক্ষা পায়।

অস্ট্রেলিয়ার পশুপাখি সম্পর্কে আলোচনা করো। 3 4 উত্তর মারে ডার্লিং অববাহিকায় রেলপথ ও সড়কপথে পরিবহণ ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত। আন্তর্মহাদেশীয় ট্রান্স-অস্ট্রেলিয়ান রেলপথের পূর্বাংশ এর ওপর দিয়ে প্রসারিত হয়েছে। সিডনি, অ্যাডিলেড, মেলবর্ন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলি সড়ক ও রেলপথে দেশের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়াও মারে ডার্লিং চী? নদী অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত তৃণভোজী প্রাণীটি হল ক্যাঙারু। এ ছাড়া, এখানে ওয়ালবি, প্ল্যাটি প্লাস (হাঁস ও ছুঁচোর মিশ্রিত গড়ন), ডিঙ্গো (বুনো কুকুর), উড়ন্ত কাঠবিড়ালী, কোয়ালা (ছোটো ভালুকের মতো, কিন্তু গাছে থাকে), ওয়াঘাট প্রভৃতি প্রাণী দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ার মারে ডার্লিং অববাহিকা মেষপালনে বিখ্যাত । অস্ট্রেলিয়ায় এমু, কিউই প্রভৃতি পাখি দেখা যায়।

অস্ট্রেলিয়ার নাতিশীতোয় তৃণভূমির নাম ডাউনস। এই তৃণভূমি দক্ষিণ গোলার্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পশুচারণ ক্ষেত্র। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব ভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি বলে দীর্ঘকায় তৃণ জন্মায়। এজন্য দক্ষিণ-পূর্বে ভিক্টোরিয়া, নিউ সাউথওয়েলস প্রভৃতি রাজ্যে বেশি সংখ্যক গবাদিপশু পালন করা হয়। মধ্য ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কিছুটা শুষ্ক অঞ্চলে মেষপালন করা হয়। এই অঞ্চলে পশুপালনের প্রধান অন্তরায় ছিল জলের অভাব। কিন্তু বহু সংখ্যক আর্টেজীয় কূপ খননে সেই অসুবিধা বর্তমানে দূর হয়েছে। এই অঞ্চলের তৃণভূমিতে প্রধানত উন্নত প্রজাতির মেরিনো মেষ পালন করা হয়।

মারে ও ডার্লিং নদীর মধ্যে মারে-কে মূলনদী এবং ডার্লিং-কে উপনদী বলার কারণ: 1 দৈর্ঘ্যে ডার্লিং নদী ( 1163 কিমি) মারে নদীর (2589 কিমি) অর্ধেকেরও কম, অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে মারে সুদীর্ঘ নদী এবং ডার্লিং ক্ষুদ্র নদী। 2 ডার্লিং-এর তুলনায় মারে নদীর উৎস অঞ্চল অপেক্ষাকৃত আর্দ্র ও শীতল হওয়ায় মারে নদী প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টির জল ও বরফগলা জল বহন করে। কিন্তু ডার্লিং নদী প্রধানত বৃষ্টির জল বহন করে। এজন্য ডার্লিং-এর তুলনায় মারে নদীর জলপ্রবাহ অনেক বেশি। ও মারে নিত্যবহ নদী, কিন্তু শুষ্ক ঋতুতে ডার্লিং নদীতে জলের অভাব দেখা দেয়। 4 ডার্লিং-এর তুলনায় মারে নদীর খাত অনেক গভীর ও প্রশস্ত। 5 সুউচ্চ অস্ট্রেলিয়ান আল্পস পর্বতের প্রাথমিক ঢাল অনুসারে মারে নদীর সৃষ্টি তুলনামূলকভাবে আগে হয়েছে। সুতরাং, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা, স্রোত, জলের পরিমাণ প্রভৃতি বিবেচনা করে বলা যায় যারে প্রধান নদী এবং এর উপনদী ডার্লিং ।

মারে ডার্লিং অববাহিকা অস্ট্রেলিয়ার কৃষিতে উন্নত এলাকা হলেও বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার জন্য মারে ডার্লিং অববাহিকায় জলসেচের প্রয়োজন হয়। অস্ট্রেলিয়ার মোট সেচসেবিত জমির 85 শতাংশই মারে ডার্লিং অববাহিকায় অবস্থিত। এখানে জলসেচ দু-ভাবে করা হয়–1  খালের সাহায্যে এবং 2 আর্টেজীয় কূপের সাহায্যে। মারে ডার্লিং নদীতে সারাবছর জল থাকে বলে সেচকার্যে এই জল ব্যবহৃত হয়। মারে নদীর ওপর হিউম বাঁধ ও জলাধার এবং এর উপনদী মারামবিজির ওপর ব্যারিনজাক বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে। কৃষির পক্ষে ক্ষতিকারক ডার্লিং নদীর লবণাক্ত জলকে আটকানোর জন্য প্রায় 20 কিমি দীর্ঘ একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া, স্লো নদীর জলকে স্লো-পার্বত্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে মারে ও মারামবিজি নদীপথে প্রবাহিত করার ফলে বর্তমানে সেচের জন্য জলের জোগান প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমদিকের অধিকাংশ অঞ্চল মরুভূমির অন্তর্গত হওয়ায় শুষ্ক মরু প্রকৃতির জলবায়ু লক্ষ করা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব ভাগে কেবল মারে-ডার্লিং নদী ছাড়া আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ নদী নেই। এ ছাড়া, অভ্যন্তরীণ হ্রদগুলিও  লবণাক্ত জলের হওয়ায় জলাভাব এই দেশের একটি বড়ো সমস্যা। তাই একমাত্র পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল ছাড়া অন্যর জনঘনত্ব খুবই কম। মারে ডার্লিং অববাহিকায় খুব বেশি খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় না। এর মধ্যে পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত ব্রোকেন ছিল শহরটি রূপো উত্তোলনের জন্য ব বিখ্যাত। তাই ব্রোকেন হিলের আর এক নাম 'রূপোর শহর'। যদিও ব্রোকেন ছিল শহরে সিসা, দস্তা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থও পাওয়া যায় ।

অস্ট্রেলিয়ার মধ্য-উত্তরাংশে অবস্থিত বিস্তীর্ণ ক্রান্তীয় তৃণভূমিকে পার্কল্যান্ড সাভানা তৃণভূমি বলে। এই তৃপক্ষেত্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে দীর্ঘাকৃতি তৃপ জন্মাতে দেখা যায় এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের সংলগ্ন অংশে বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হয় বলে দু-একটি বড়ো বড়ো গাছও (যেমন—বাওবাব, ওয়াটল) জন্মায়। ইতস্ততভাবে এখানে-ওখানে ছড়ানো কয়েকটি বড়ো বড়ো গাছসহ বিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্রকে দেখতে অনেকটা পার্কের মতো লাগে। পার্কের মতো দেখতে বলেই একে 'পার্কল্যান্ড' বলে।

রিভেরিনা মারে ও মারামবিজি নদীর মধ্যবর্তী দোয়াব অঞ্চলকে রিভেরিনা বলে। এই অঞ্চল গম চাষের জন্য প্রসিদ্ধ এবং এখানে মারামবিজি সেচ প্রকল্পের সাহায্যে নানা ধরনের লেবু ও আঙুরেরও চাষ করা হয়। এ ছাড়া, রিভেরিনা অঞ্চল মেষপালনেও গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাডিলেড মারে ডার্লিং অববাহিকার প্রধান শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র হল অ্যাডিলেড। এ ছাড়াও এটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী। টরেন্স নদীর তীরে অবস্থিত অ্যাডিলেড মারে ডার্লিং অববাহিকার প্রধান গম রপ্তানী কেন্দ্র। অ্যাডিলেড-এ সামান্য পরিমাণ কয়লা পাওয়া যায়। এখানে প্রায় 12.7 লক্ষ লোক বসবাস করে। অ্যাডিলেড-এ প্রতিরক্ষার সাজ-সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্প গড়ে উঠেছে।

অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশগত অবস্থান: অক্ষাংশ অনুসারে মারে ডার্লিং অববাহিকা প্ৰায় 24° দক্ষিণ থেকে39° দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমা অনুসারে এই অঞ্চলটি প্রায় 138° পূর্ব থেকে 149° পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলটি সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার প্রায় 20 শতাংশ স্থান জুড়ে আছে | অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাংশে মারে-ডার্লিং অববাহিকা অবস্থিত। এই অববাহিকার উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমায় গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জ, পশ্চিম সীমায় লফটি রেঞ্জ, বেরিয়ার রেঞ্জ, গ্রে রেঞ্জ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সীমায় সেন্ট ভিনসেন্ট উপসাগর ও এনকাউন্টার উপসাগর রয়েছে।  ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য: মারে ডার্লিং অববাহিকার ভূমিরূপ সমতল এবং এর উচ্চতা 200 মিটারের কম। মারে ডার্লিং নদী দীর্ঘকাল ধরে পলি সঞ্চয় করে এই সমভূমির সৃষ্টি করেছে। এই সমভূমির তিনদিকে (পূর্ব-পশ্চিম-উত্তরে) আছে উচ্চভূমি বা পর্বত এবং একদিকে (দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে) মহাসাগর। সুতরাং এখানকার ভূপ্রকৃতিকে কিছুটা মুখখোলা বোতলের মতো বলা যেতে পারে | অর্থাৎ মারে-ডার্লিং অববাহিকার মধ্যভাগের ভূমি সমতল এবং ওই মধ্যভাগ থেকে ভূমি ধীরে ধীরে পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দিকে উঁচু হয়ে গেছে। আর, অববাহিকার দক্ষিণ-পশ্চিম দিক খোলা বা উন্মুক্ত। নদীর গতিপথ ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, এই অঞ্চলটি উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে ক্রমশ ঢালু।

মারে ডার্লিং অববাহিকার জলবায়ু: 'মারে ডার্লিং অববাহিকার জলবায়ু প্রধানত নাতিশীতোয় প্রকৃতির। তবে দক্ষিণ অংশের সমুদ্রতীরর্তী এলাকায় ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দেখা যায়। এখানকার গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় 25 °সে এবং শীতকালীন গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় 10 °সে। অববাহিকাটি গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের পশ্চিম দিকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে অবস্থিত বলে এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম, বছরে মাত্র 50-75 সেমি | উপকূল অঞ্চলে শীতকালেই বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এই অববাহিকার অ্যাডিলেড অঞ্চলে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রভাব লক্ষ করা যায় | স্বাভাবিক উদ্ভিদ: মারে-ডার্লিং অববাহিকায় নাতিশীতোয় জলবায়ুর স্বল্প তাপমাত্রা ও স্বল্প বৃষ্টিপাতের জন্য অপেক্ষাকৃত ছোটো ঘাসের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি সৃষ্টি হয়েছে। একে বলে ডাউনস্ তৃণভূমি। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত অঞ্চলে জারা, কারি প্রভৃতি চিরসবুজ গাছের বিক্ষিপ্ত বনভূমি লক্ষ করা যায়। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ডিভাইডিং রেঞ্জের উচ্চ অংশে সরলবর্গীয় গাছের বনভূমি লক্ষ করা যায় |

মারে ডার্লিং অববাহিকার কৃষিকাজ : মারে ডার্লিং অববাহিকা অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চল | এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল গম | এ ছাড়া, এখানকার অন্যান্য কৃষিজ ফসলগুলির মধ্যে যব, ওট, তামাক, তিসি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য । অববাহিকার দক্ষিণাংশে নদী তীরবর্তী ও মোহনার কাছাকাছি অঞ্চলে আপেল, আঙুর, পিচ, অ্যাপ্রিকট, কমলালেবু, নাসপাতি প্রভৃতি নানাপ্রকার ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। মারে-ডার্লিং অববাহিকার পশুপালন: ↑ মারে-ডার্লিং অববাহিকার ডাউনস্ তৃণভূমি অঞ্চল পশুচারণ ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত। এই অঞ্চলে মেরিনো, লিঙ্কন, মার্স প্রভৃতি উৎকৃষ্ট জাতের মেষ বা ভেড়া পালন করা হয়। এখানে 7 কোটিরও বেশি মেষ প্রতিপালিত হয়। এগুলির মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মেরিনো প্রজাতির মেষ, যেগুলিকে শ্রেষ্ঠ পশম উৎপাদক মেষবলা হয়। তাই এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎকৃষ্ট মানের পশম উৎপাদিত হয়। এজন্য অস্ট্রেলিয়া পশম উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে। 2 এই অববাহিকার উত্তরের কুইন্সল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্বের নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশে গবাদিপশু প্রতিপালন করা হয়। তাই গোরুর মাংস ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদনেও এই অঞ্চল উন্নত। 3 গো-মাংস উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে পঞ্চম স্থান অধিকার করে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম বলে অস্ট্রেলিয়া যথেষ্ট পরিমাণে গোমাংস রপ্তানিও করে। @ প্রকৃতপক্ষে, অস্ট্রেলিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বহুলাংশে মেষপালন ও পশম উৎপাদন এবং গো-মাংস উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল।

রে-ডার্লিং অববাহিকা কৃষিকাজে যথেষ্ট উন্নত কারণ— বিস্তৃত সমতলভূমির অবস্থান, 2 নদী দ্বারা বাহিত এবং সঞ্চিত উর্বর পলিমাটি, নাতিশীতোষ জলবায়ু, 4 জলসেচের সুব্যবস্থা, ও কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও সর্বাধুনিক পদ্ধতিতে চাষের সুবিধা,উন্নতমানের রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ওষুধের প্রয়োগ, 7 জাপান ও ইউরোপীয় দেশগুলিতে কৃষিজ ফসল, বিশেষত গম রপ্তানির সুবিধা প্রভৃতি। এইসব সুবিধাগুলির কারণে মারে ডার্লিং অববাহিকা অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে । এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল গম। এ ছাড়া এখানকার অন্যান্য কৃষিজ ফসলগুলির মধ্যে যব, ওট, তামাক, তিসি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অববাহিকার দক্ষিণাংশে নদী তীরবর্তী ও মোহনার কাছাকাছি অঞ্চলে আপেল, আঙুর, পিচ, অ্যাপ্রিকট, কমলালেবু, নাসপাতি প্রভৃতি নানাপ্রকার ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় |

মারে হল অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘতম নদী (2589 কিমি) এবং ডার্লিং হল মারের উপনদী। মারে ও ডার্লিং নদী যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেই অঞ্চলটিকে মারে ডার্লিং অববাহিকা বলে। মারের উৎপত্তি হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান আল্পস পর্বত থেকে। ডার্লিং নদীর দৈর্ঘ্য হল 1163 কিমি এবং এর উৎপত্তি হয়েছে নিউ ইংল্যান্ড রেঞ্জ থেকে। ওয়েন্টওয়ার্থ শহরের কাছে উভয় নদী মিলিত হয়েছে। এই মিলিত নদীপ্রবাহ দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রবাহিত হওয়ার পর এনকাউন্টার উপসাগরে মিশেছে। মারে নদীটি অস্ট্রেলিয়ান আল্পস পর্বতের বরফগলা জলে পুষ্ট হওয়ায় সারাবছরই জলে পূর্ণ থাকে। ডার্লিং ছাড়াও মারের আর একটি বড়ো উপনদী এই অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তার নাম মারামবিজি | আবার লাচলান নামে মারামবিজির একটি উপনদী অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এইসব নদী ছাড়া ডার্লিং-এর কয়েকটি উপনদী আছে। সেগুলি হল—পারু, ওয়ারেগো, বারওয়া প্রভৃতি।

মারে ডার্লিং অববাহিকা অঞ্চলের খনিজ সম্পদ : প্রধানত সমভূমি বলে এখানে খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য কম। তবে অববাহিকার প্রান্তবর্তী এলাকাসমূহ থেকে 1 রুপো, 2 সিসা, 3 দস্তা, 4 সোনা, 6 তামা ও টিন প্রভৃতি কয়েকটি খনিজ দ্রব্য আহরণ করা হয়। এর মধ্যে পশ্চিম সীমায় অবস্থিত ব্রোকেনহিল রুপো উত্তোলনের জন্য বিখ্যাত । তাই ব্রোকেনহিল -এর আর এক নাম ‘রুপোর শহর' (silver city)। এ ছাড়া, কোবার আকরিক তামা উত্তোলনের জন্য বিখ্যাত । ম্যাকিনটায়ার ও নামোই নামে ডার্লিং নদীর যে দুটি উপনদী আছে তাদের অববাহিকায় স্বাভাবিক গ্যাস ও খনিজ তেল  উত্তোলিত হয়। এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ান আল্পস ও ব্লু পার্বত্য অঞ্চলের কিছু উন্ন অংশে কয়লা পাওয়া যায়। মারে-ডার্লিং অববাহিকা অঞ্চলের শিল্প: কৃষিকাজ ও পশুপালনে উন্ন হলেও মারে ডার্লিং অববাহিকা শিল্পে উন্নত নয়। এই অববাহিকায় কেবল 1 ইঞ্জিনিয়ারিং, 2 খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ, 3 রাসায়নিক, 4 মাং চা 5 দুগ্ধ, 6 পশম, 7 ফল থেকে সুরা উৎপাদন প্রভৃতি শিল্প গড়ে উঠেছে বি স্থানীয় অঞ্চলে উৎপন্ন আঙুর থেকে কিসমিস, মনক্কা, সুরা প্রভৃতি তৈরি হয় মিলডুরায়। এ ছাড়া, ® ধাতু শিল্প, 9 গম পেষাই শিল্প, ii) বেকারি শি প্রভৃতি গড়ে উঠেছে কোবার, সোয়ান ছিল, উইলক্যানিয়া, ব্যারিং আস বেনডিগো, গ্রিফিথ, এচুকা, বেরি, ওয়েন্টওয়ার্থ প্রভৃতি স্থানে।

মেষপালনে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে। এখানে 7 কোটিরও বেশি মেষ প্রতিপালিত হয়। এগুলির মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মেরিনো প্রজাতির মেষ, যেগুলিকে শ্রেষ্ঠ পশম উৎপাদক মেষ বলা হয়। এজন্য পশম উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে। পশুপালনে অর্থাৎ গো-পালন ও মেষপালনে অস্ট্রেলিয়ার এরূপ উন্নতির কারণগুলি হল—
1 বিস্তীর্ণ তৃণভূমির অবস্থান : দেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে বিস্তৃত নাতিশীতোর তৃণভূমির (যাকে ডাউনস্ তৃণভূমি বলা হয়) অবস্থান পশুপালনে সহায়ক হয়েছে।

2 পরিমিত বৃষ্টিপাত: পরিমিত বৃষ্টিপাতের জন্য এখানকার তৃণভূমিতে প্রচুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তৃণ জন্মায়। এই কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে পশমপ্রদায়ী মেষ পালিত হয়ে থাকে ।

3 জমির প্রাচুর্য: স্বল্প জনসংখ্যার জন্য এখানে বেশি কৃষি জমির প্রয়োজন হয় না, ফলে মেষপালনের জন্য বিস্তীর্ণ তৃণভূমি পাওয়া যায় ।

4 পর্যাপ্ত জলের জোগান: এই অববাহিকায় বহু আর্টেজীয় কূপ থাকায় শুষ্ক তৃণভূমিতে মেষপালনের প্রয়োজনীয় জল পাওয়া যায়।
5 উন্নত প্রজাতির মেষপালন: উন্নতমানের পশম উৎপাদনের জন্য এখানে মেরিনো প্রজাতির মেষপালনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একইসঙ্গে উপযুক্ত পশু চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় এবং উৎকৃষ্ট পশুখাদ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

6 চাহিদা: আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ট্রেলিয়ায় উৎপন্ন উৎকৃষ্ট পশমের বিপুল চাহিদা অধিক সংখ্যায় মেষপালনে উৎসাহ দেয়। 7 পশুজাত অন্যান্য দ্রব্য: কেবল পশমই নয়, এদেশে গো-মাংস ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, কৌটোজাতকরণ এবং রপ্তানিরও যথেষ্ট সুবিধা আছে। এইসব সুবিধাও এই দেশে পশুপালনের উন্নতিতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।

অস্ট্রেলিয়া খুব বেশি ঘনবসতিপূর্ণ না হলেও মারে ডার্লিং অববাহিকা অঞ্চলটি মাঝারি ঘনবসতিপূর্ণ। মারে এবং ডার্লিং নদীর অববাহিকার নানা অংশে খনিজ দ্রব্য পাওয়া যায়। এর ওপর নির্ভর করে এখানে কয়েকটি শিল্প গড়ে উঠেছে। এসব কারণে মারে ডার্লিং অববাহিকায় লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করে। মারে ডার্লিং অববাহিকার প্রধান শহরগুলি হল— অ্যাডিলেড: এই অববাহিকার প্রধান শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র অ্যাডিলেডে প্রায় 12.7 লক্ষ লোক বাস করে। এখানে প্রতিরক্ষার সাজসরঞ্জাম উৎপাদন শিল্প গড়ে উঠেছে। 2 ব্রোকেন ছিল: নিউ সাউথওয়েলস প্রদেশের অন্তর্গত এই শহরটি সিসা ও দস্তা উত্তোলনে খ্যাত। এখানে প্রায় 18856 জন লোক বাস করে। 3) মিলডুরা: ভিক্টোরিয়া প্রদেশের এই শহরে প্রায় 31000 লোক বাস করে। এখানে সুরা উৎপাদন শিল্প গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া, কোবার, সোয়ান ছিল, গ্রিফিথ, বেরি প্রভৃতি এখানকার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শহর।

পশুপালন এবং পশুনির্ভর শিল্পোৎপাদনে সমৃদ্ধির কারণ: মারে-ডার্লিং অববাহিকা পশুপালন ও পশুনির্ভর শিল্পোৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রচুর পরিমাণে উৎকৃষ্ট মানের পশম, মাংস, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য প্রভৃতি উৎপাদিত হয় । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বের সর্বাধিক মেষ প্রতিপালন করা হয় এবং দেশটি পশম উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম এবং গো-মাংস উৎপাদনে পঞ্চম স্থান অধিকার করে। পশুপালন ও পশুনির্ভর শিল্পোৎপাদনে মারে-ডার্লিং অববাহিকার এহেন উন্নতির কারণ— 1 বিস্তীর্ণ তৃণভূমি: মারে-ডার্লিং অববাহিকার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে আছে নাতিশীতোয় তৃণভূমি, যার নাম ডাউনস্ ।

2 উৎকৃষ্ট মানের তৃণ: এখানে স্বল্প বৃষ্টিপাতের জন্য কৃষিকাজ করা সম্ভব না হলেও পশুখাদ্যের উপযোগী উৎকৃষ্ট মানের তৃণ জন্মায় ।

3 কৃষিভূমির কম চাহিদা: জনসংখ্যার জন্য বেশি কৃষিভূমির প্রয়োজন হয় না। ফলে বেশিরভাগ তৃণভূমি পশুপালনে ব্যবহার করা যায়।

4 অসংখ্য আচেঁজীয় কূপ: বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য আটেজীয় কৃপ থাকায় শুষ্ক ভূগভূমিতে পরপালনের জন্য নির্মল জগ পেতে অসুবিধা " না ।

5 নাতিশীতোয় জলবায়ু: এখানকার নাতিশীতোর জলবায়ু উৎকৃষ্ট মানের পশম প্রদায়ী ভেড়া এবং সুস্বাদু মাংস উৎপাদনে উপযোগী গো পালনের পক্ষে আদর্শ।

6  উন্নত প্রজাতির মেষ বা ভেড়া ও গোরু: এখানে উন্নত মানের পরাম উৎপাদনের উপযোগী মেরিনো মেঘ প্রতিপালনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া লিঙ্কন, মার্স প্রভৃতি উন্নত প্রজাতির মেষ এবং জার্সি, আয়ারশায়ার প্রভৃতি উৎকৃষ্ট প্রজাতির গোরু প্রতিপালন করা হয়।

7  হিংস্র জন্তুর কম প্রাদুর্ভাব : এখানে হিংস্র জন্তুর প্রাদুর্ভাব কম বলে পশুপালনে রক্ষনাবেক্ষণ ব্যয়ও কম হয়।

8  দ্রুত রপ্তানির সুবিধা: বিদেশে এখানকার পশম, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাংস প্রভৃতি পশুজাত দ্রব্যের বিপুল চাহিদা আছে। ডাউনস্ তৃণভূমি সমুদ্র উপকূল থেকে দূরে নয় বলে বিভিন্ন প্রকার পশুজাত দ্রব্য দ্রুত বিদেশের বাজারে রপ্তানি করার সুবিধা হয়।

ওশিয়ানিয়া মহাদেশের একমাত্র মারে ডার্লিং অববাহিকায় সর্বাধিক কৃষিকাজ হয়। নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য মারে-ডার্লিং অববাহিকায় (i) ভূপ্রকৃতি: ভূপ্রকৃতিগতভাবে মারে-ডার্লিং অববাহিকা অঞ্চলটি একটি অবতল সমভূমি। তাই এখানে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজের সুবিধা রয়েছে। 2 উর্বর মাটি: মারে ও ডার্লিং নদী এবং তাদের অসংখ্য উপনদী বাহিত পলিমাটি দিয়ে এই অববাহিকা গঠিত বলে সমগ্র অঞ্চলটি উর্বর। 3 জলসেচ: অস্ট্রেলিয়ার মোট সেচসেবিত জমির প্রায় 85 শতাংশ জমি মারে-ডার্লিং নদী অববাহিকায় অবস্থিত। বৃষ্টিপাত কম হলেও জলসেচের সুবিধা এই অঞ্চলকে কৃষিসমৃদ্ধ করে তুলেছে। জলসেচ পদ্ধতি: এখানে খাল ও কূপের সাহায্যে জলসেচ করা হয়। মারে নদীর ওপর হিউম জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে যা থেকে খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে জল সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে, মারে-ডার্লিং অববাহিকায় প্রচুর আর্টেজীয় কূপ রয়েছে। যা থেকে ভৌমজল উত্তোলন করে কৃষিকাজ ও পশুপালনের প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করা হয়। 5 উন্নত চাষ পদ্ধতি: মারে ডার্লিং নদীর অববাহিকা অঞ্চলে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে কৃষিকাজ করা হয় বলে এখানে প্রচুর ফসল ফলে। এ ছাড়া, এখানকার নাতিশীতোয় জলবায়ু, পরিমিত বৃষ্টিপাত, উন্নত মানের বীজ ও সারের ব্যবহার একে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করেছে।