Chapter-15, রূপতত্ত্ব

দুটি মুক্ত রূপমূল সহযোগে একটি মিশ্র রূপমূল গঠিত হলে মুক্ত রূপমৃদ্ধ দুটির পূর্ব অর্থের বদলে একটি নতুন অর্থ প্রকাশিত হয় (যেমন- দা', 'চিল' = গাংচিল)।

দুইয়ের বেশি মুক্ত রূপমূলের সংযোগে যে রূপমূল গঠিত হয়, তাকে জটিল রূপমূল বলা হয়। বাংলায় একটি জটিল রূপমূল হল —বহুবর্ণপাথর।

দুই-এর বেশি রূপমূলের সমবায়কে বলা হয় জটিল রূপমূল। যেমন--- জাতীয়তাবাদ।

একটি মাত্র রূপিম নিয়ে গঠিত শব্দকে মৌলিক শব্দ বলে। 'মা' শব্দটিও একটি মাত্র রূপিম দ্বারা গঠিত (কারণ 'মা'-কে ভাঙলে আমরা পাব 'ম্' + 'অ', যার কোনো অর্থ নেই)। তাই 'মা' মৌলিক শব্দ।

এক বা একাধিক মুক্ত রূপিমের সঙ্গে এক বা একাধিক বখ রূপিমের সংযোগে অথবা শুধুই একাধিক বন্ধু রূপিমের সংযোগে গঠিত শব্দকে জটিল শব্দ বলে। যেমন—ছেলে + মি = ছেলেমি।

আমরা জানি, যে শব্দ একাধিক মুক্ত রূপিম বা একাধিক শব্দ নিয়ে গঠিত, তাকে সমাসবদ্ধ শব্দ বলে। তাই দেশবিদেশ' একটি সমাসবদ্ধ নন।

আলাপ, প্রলাপ, বিলাপ, সংলাপ – ইত্যাদি শব্দের 'লাপ' অধি ক্র্যানবেরি রূপমূলের উদাহরণ।

ভাষাবিজ্ঞানে রূপ হল ভাষার সবচেয়ে ছোটো অর্থপূর্ণ একক।

রূপতত্ত্ব ভাষার ক্ষুদ্রতম অর্থপূর্ণ একক নিয়ে অর্থাৎ রূপ (Morph) নিয়ে কাজ করে।

কোনো রূপ-এর অর্থ না পালটে যদি তার একাধিক বিভিন্ন ৰূপলে দেখা যায়, তবে রূপের সেই বিচিত্র রূপভেদগুলিকে বলে সহরূপ ।

: বাগ্যন্ত্রের একবারের চেষ্টায় উচ্চারিত ধ্বনি বা ধ্বনিসমূহই দল।

রূপতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় হল শব্দের নানা দিক, অর্থাৎ তার গঠন রূপবৈচিত্র্য, রূপবৈচিত্র্য সাধনের বিভিন্ন উপকরণ যেমন—প্রত্যয়, বিভক্তি ইত্যাদি।

এর কারণ, এটি ক্ষুদ্রতম ধ্বনিসমষ্টি নয়। একে ক্ষুদ্রতর দুটি অর্থপূর্ণ ধ্বনিসমষ্টিতে ভাগ করা যায়—আম' ও 'সত্ত্ব'। তাই ‘আমসত্ত্ব' রূপ নয়, সমস্তপদ।

‘বাঘের' শব্দটিকে ভাঙলে দুটি রূপ পাওয়া যাবে। 'বাঘ' ও 'এর' | 'বাঘ' হল যুক্ত রূপ এবং ‘এর’ হল বন্ধ রূপ।

সব শব্দই একা একা ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু সব রূপই একা একা ব্যবহৃত হতে পারে না।

যে অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম ধ্বনিসমষ্টি অন্য ধ্বনিসমষ্টির সঙ্গে যুক্ত না হয়েও স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, তাকে যুক্ত রূপমূল বলে। যেমন—আম |

যে অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম ধ্বনিসমষ্টি কখনও অন্য ধ্বনিসমষ্টির সঙ্গে যুক্ত না হয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না, তাই বন্ধ রূপমূল। যেমন— ‘ছেলেটি'-র 'টি'।

প্রতিটি রূপ (ভাষার ক্ষুদ্রতম, অর্থপূর্ণ একক)-এর মূল ধারণা হল রূপমূল

ভাষার ক্ষুদ্রতম, অর্থপূর্ণ একক (অর্থাৎ রূপ) স্বাধীনভাবে বাক্যে তথা ভাষায় ব্যবহৃত হলে তাকে বলে স্বাধীন রূপমূল।

ভাষার ক্ষুদ্রতম, অর্থপূর্ণ একক (অর্থাৎ রূপ) স্বাধীনভাবে বাক্যে তথা ভাষায় ব্যবহৃত হতে না পারলে তাকে বলে পরাধীন রূপমূল । যেমন—উপসর্গ, প্রতায়, বিভক্তি।

মৌলিক ভাব প্রদান করে এমন অবিভাজ্য ভাষাখণ্ডই হল প্রকৃতি।

প্রকৃতি দু-প্রকার—নামপ্রকৃতি এবং ধাতুপ্রকৃতি |

প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের যোগে যে শব্দ তৈরি হয়, তাকে প্রাতিপদিক। প্রাতিপদিকের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হয়।

যে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে কাজ করার অর্থ প্রকাশিত হয়, তাকে বলা হয় ধাতুপ্রকৃতি। যেমন—যা, চল, বল ইত্যাদি ।

যে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে কাজ করার অর্থ ছাড়া অন্য কোনো অর্থ প্রকাশিত হয়, তাকে বলে নামপ্রকৃতি | যেমন— গাছ, হাত ইত্যাদি ।

(১) একটি রূপের সহরূপগুলোর অর্থগত সাদৃশ্য থাকতে হবে,

(২) সহরূপগুলোকে একে অপরের পরিপূরক হতে হবে বলে এক সহরূপের স্থানে অন্য সহরূপ নেওয়া যাবে না।

যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি নাম শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ তৈরি করে, তাকে বলে প্রত্যয়।

যে প্রত্যয় কেবলমাত্র ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়, তাকে বলে কৃৎ প্রত্যয়। যেমন- পূজ + অনীয় = পূজনীয়। এখানে অনীয় কৃৎ প্রত্যয়।

যে প্রত্যয় নাম শব্দের সঙ্গেই কেবল যুক্ত হয়, তাকে বলে তাখত প্রতায়। যেমন—বাশি + ওয়ালা = বাঁশিওয়ালা। এখানে 'ওয়ালা' ততি । প্রত্যয়।

চালাক + ই= চালাকি । এখানে 'চালাক" এই বিশেষণ নাম শব্দের সঙ্গে উত্থিত প্রত্যয় 'ই' যুক্ত হয়ে 'চালাকি এই বিশেষ্য নাম শব্দ তৈরি করেছে।

শব্দ বা পদের যে অংশ কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যয় বা উপসর্গের ভিত হিসেবে কাজ করে, সেই অংশকে বলে ভিত্তি।

যে ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শব্দকে পদে পরিণত করে এবং বাক্য -মধ্যস্থ পদগুলির পারম্পরিক সম্পর্ক তৈরি করে, তাকে বলে বিভক্তি।

যেসব রূপমূলের অর্থ অভিধান ঘেঁটে বের করা যায়, সেইসব রূপমূলকে বলে আভিধানিক রূপমূল। যেমন মৌলিক শব্দ, উপসর্গ ইত্যাদি |

যেসব রূপমূলের অর্থ অভিধান ঘেঁটে বের করা না গেলেও ব্যাকরণে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাদের বলে ব্যাকরণসম্মত রূপমূল। যেমন—প্রত্যয়, অনুসর্গ ইত্যাদি।

ব্যাকরণসম্মত রূপমূল দুই প্রকারের—পরাধীন এবং স্বাধীন। প্রত্যয়হল পরাধীন ব্যাকরণসম্মত রূপমূল, অনুসর্গ হল স্বাধীন ব্যাকরণসম্মত রূপমূল।

পরাধীন ব্যাকরণসম্মত রূপমূল দু-প্রকারের—সমন্বয়ী রূপমূল এবং নিষ্পাদিত রূপমূল।

যে পরাধীন রূপমূল শব্দকে পদে পরিণত করে এবং তার পর অন্য কোনো রূপমূল তার সঙ্গে বসে না, তাকে বলে সমন্বয়ী রূপমূল। যেমন— বিভক্তি।

যে রূপমূল শব্দকে নতুন শব্দে পরিণত করে তাকে বলে নিষ্পাদক রূপমূল। এতে পদ-পরিবর্তন ঘটতে পারে, না-ও পারে। যেমন—প্রত্যয়, উপসর্গ।

শব্দে উপস্থিত রূপ-এর সংখ্যার তারতম্যের ভিত্তিতে রূপ দুই প্রকার— মিশ্র রূপমূল এবং জটিল রূপমূল।

দুটি স্বাধীন রূপমূলের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া শব্দ বা পদের অর্থ ওই দুটি রূপমূলের অর্থ থেকে আলাদা হলে সেই রূপমূল-সমবায়কে মিশ্র রূপমূল বলে। যেমন—গঙ্গাফড়িং |

যে রূপ আপাত অর্থহীন এবং তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তাকে বলে ফাঁকা রূপ। যেমন—ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি।

যে রূপ কানে শোনা না গেলেও ভাষায় তার পরোক্ষ উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, তাকে বলে শূন্য রূপ। যেমন— শূন্য বিভক্তি।

যে গঠন-প্রক্রিয়ায় একাধিক পদ একত্রে যুক্ত হয়ে একটি বড়ো পদ গঠন করে, সেই গঠন-প্রক্রিয়াকে বলে সমাস।

পদ গঠনের চরিত্রের ভিন্নতা অনুযায়ী সমাসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন—(১) দ্বন্দ্ব সমাস (২) ব্যাখ্যামূলক সমাস (৩) বর্ণনামূলক সমাস ।

যে সমাসে একাধিক পদ যুক্ত হলেও পদগুলির নিজস্ব অর্থ নতুন পদে গিয়ে বজায় থাকে, তাকে বলে দ্বন্দ্ব সমাস। যেমন- বাপ-মা।

যে সমাসে পরপর বসা দুটি পদের মধ্যে একটি পদ অন্য পদকে ব্যাখ্যা করে, তাকে বলে ব্যাখ্যামূলক সমাস। যেমন— মহাকবি

একাধিক পদ মিলে গঠিত সমস্তপদের অর্থ সেই পদগুলির কোনোটিকে না বুঝিয়ে অন্য অর্থ বোঝালে তাকে বলে বর্ণনামূলক সমাস (বহুব্রীহি সমাস)। যেমন—ক্ষুরধার।

দুটি একই পদ মিলে অথবা অর্থসম্বন্ধযুক্ত দুটি ভিন্ন পদ মিলে গঠিত পদকে বলে শব্দদ্বৈত বা পদদ্বৈত। যেমন— দিনদিন, অল্পবিস্তর ইত্যাদি।

যে দ্বিপদী শব্দ বা পদের একটি অর্থযুক্ত এবং অপরটি তার ধ্বনিগত অনুকরণে সৃষ্ট আপাত অর্থহীন, সেই দ্বিপদী শব্দ বা পদকে বলে অনুকার। যেমন—টুপ-টাপ, জল-টল।

কোনো পদ সংক্ষিপ্ত রূপ লাভ করেও মূল পদের অর্থটিই প্রকাশ করলে সেই নতুন পদকে বলে ক্লিপিংস বা সংক্ষেপিত পদ। যেমন— মাইক্রোফোন > মাইক

বন্ধ ও মুক্ত রূপের সমন্বয়ে পদ গঠনের সময় যুক্ত রূপের সঙ্গে বন্ধ রূপের ব্যতিক্রমী রূপটি যুক্ত হলে তাকে বলে বিকল্পন। যেমন – 'go' থেকে 'went'l

দৈনন্দিন ভাষা-ব্যবহারের তালিকায় নতুন শব্দ ঢোকার প্রক্রিয়াকে বলে নবাশব্দ প্রয়োগ প্রক্রিয়া। যেমন—ফেসবুক, সেলফি প্রভৃতি শব্দ শব্দভাণ্ডারে প্রবেশ করেছে।

কোনো বাক্যের একটি পদ অন্য বাক্যে অন্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হলে তাকে বলে বর্গান্তর। যেমন—'নির্মল' বিশেষ্য এবং বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় বাক্যে।

আপাত অর্থহীন যে পরাধীন রূপমূল একটি শব্দকে অন্য শব্দের থেকে পৃথক করতে পারে, তাকে বলে ক্যানবেরি রূপমূল। যেমন— আলাপ, বিলাপ শব্দের 'লাপ' অংশটি।

একটি স্বরের পরিবর্তনে সৃষ্ট দুটি অনুকার শব্দ হল ঘুটঘাচ, টুপটাপ |

একটি ব্যঞ্জনের পরিবর্তনে সৃষ্ট দুটি অনুকার শব্দ হল কাজকাজ।

রূপমূলের দুটি শ্রেপি হল স্বাধীন আর পরাধীন রূপমূল |

উপসর্গ হল একধরনের অব্যয় যা শব্দের শুরুতে বসে পদের মানে পালটে দেয়। যেমন— অনাসৃষ্টি, বিপথ শব্দের অনা, বি |

‘জোড়কলম' শব্দ হচ্ছে একাধিক শব্দের বিভিন্ন রূপমূল জুড়ে তৈরি এক নতুন রূপমূলের শব্দ। যেমন—ধোঁয়া + কুয়াশা = ধোঁয়াশা।

অপরিচিত শব্দ লোকমুখে পরিচিত শব্দের সাদৃশ্যে ধ্বনিপরিবর্তিত হয়ে নতুন শব্দ তৈরি করলে সেই ধ্বনিপরিবর্তনকে বলে লোকনিরুক্তি|| যেমন আর্মচেয়ার > আরামকেদারা।

আমি বাড়িতে যাব। আমি বাড়ি যাব।—এই দুটি বাক্যের অর্থ এক। তবে প্রথম বাক্যে রয়েছে 'বাড়িতে' পদ, দ্বিতীয়তে 'বাড়ি' পদ। প্রথমটিতে আছে 'তে' বিভক্তি, দ্বিতীয়টিতে আছে শূন্য বিভক্তি। শূন্য বিভক্তিই হল শূন্য রূপ। শূন্য রূপ ধ্বনিগতভাবে শূন্য হলেও অর্থগতভাবে এর অস্তিত্ব আছে |

একাধিক রূপের মিশ্রণের ফলেই তৈরি হয় পোর্টম্যানট ওয়ার্ড বা জোড়কলম শব্দ। যখন একটি শব্দ বা শব্দাংশের সঙ্গে অন্য শব্দ বা শব্দাংশ জড়ে একটি নতুন শব্দ তৈরি করা হয়, তখন তাকে বলে জোড়কলম শব্দ। যেমন আরবি 'মিন্নত' শব্দের প্রথমাংশ এবং সংস্কৃত 'বিজ্ঞপ্তি' শব্দের শেষাংশ তৈরি হয়েছে জোড়কলম শব্দ 'মিনতি' | জোড়কলম শব্দ 'ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে তেমনি 'ধোঁয়া' শব্দের প্রথমাংশ এবং 'কুয়াশা" শব্দের শেষাংশ জুড়ে জোড়কলম শব্দসৃষ্টি তাই রূপের মিশ্রণগত নিষ্পাদন প্রক্রিয়া। জোড়কলম শব্দ এমনই এক রূপমূল যা দিয়ে একাধিক রূপ-বাক্যতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট বোঝানো হয়। একাধিক রূপমূলের সমবায় হল জোড়কলম শব্দ। যে মুলি শব্দের যোগসাধন ঘটে, তাদের অর্থ জোড়কলম শব্দে সমানভাবে গুরত্ব পায়।

নদের যে গঠন-প্রক্রিয়ায় একাধিক পদ একত্র জুড়ে একটি বড়ো পদের জন্ম দেয়, সেই গঠন-প্রক্রিয়াকে বলে সমাস। যেমন, 'কাগজ' ও 'পত্র' পদ দুটি একত্র যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে 'কাগজপত্র' পদটি। এই যে 'কাগজপত্র' পদটি। তৈরি হল, তার গঠন-পদ্ধতিটি হল সমাস। সমাসের ফলে যে পদ তৈরি হয়। তাকে বলে সমস্তপদ বা মিলিত পদ। 'কাগজপত্র' তাই মিলিতপদ বা সমস্তপদ । সমাসবদ্ধ পদের গঠনবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সমাসকে তিনভাগে ভাগ করা যায়— (১) সংযোগমূলক সমাস, (২) ব্যাখ্যানমূলক সমাস (৩) বর্ণনামূলক সমাস।

সংযোগমূলক সমাস: যে জাতীয় সমাসে একাধিক পদ সংযুক্ত হয় কিন্তু। পদগুলির নিজস্ব অর্থের কোনোরকম পরিবর্তন ঘটে না, তাকে বলে সংযোগমূলক সমাস দ্বন্দ্ব সমাস হল সংযোগমূলক সমাস । এই সমাসে একাধিক সমার্থক বা প্রায় সমার্থক শব্দ পাশাপাশি বসে অথবা দুই বিপরীতার্থক পদ একসঙ্গে বসে। তবে এ সমাসে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর সমন্বয় বোঝায় না, পরন্তু একই ব্যক্তি বা বস্তুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় বোঝায়। যেমন, জলবায়ু, দীনদরিদ্র, টাকাপয়সা, ছোটো-বড়ো, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ইত্যাদি।

ব্যাখ্যানমূলক সমাস: যে সমাসের পাশাপাশি বসা দুটি পদের মধ্যে প্রথম পদটি দ্বিতীয় পদটিকে ব্যাখ্যা করে, তাকে বলে ব্যাখ্যানমূলক সমাস। যেমন— মহাকবি, মিশকালো, গোলাপ-লাল | কর্মধারয়, তৎপুরুষ সমাস এই জাতীয় | বর্ণনামূলক সমাস: যে সমাসের সমস্তপদের মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো পদের অর্থই প্রাধান্য পায় না, বরং অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অর্থ প্রাধান্য পায়, তাকে বলে বর্ণনামূলক সমাস। যেমন—বহুব্রীহি সমাস। যেমন চন্দ্রমুখী, ক্ষুরধার, হাতাহাতি |

কোনো শব্দগুচ্ছ বা বাক্যাংশ (Phrase)-এর প্রতিটি শব্দ তথা পদের প্রথম ধ্বনি বা দল (Syllable)-এর সমাবেশ ঘটিয়ে যখন একটি নতুন শব্দ তৈরি করা হয়, তখন সেই শব্দকে বলে মুণ্ডমাল শব্দ বা অ্যাক্রোনিম | ইংরেজি ভাষায় এই জাতীয় শব্দের সংখ্যা অগণিত এবং সেগুলি অভিধানসম্মত। যেমন—VIP (< Very Important Person), BBC (

ক্লিপিংস; এই রূপতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় একটি শব্দ আকৃতিতে ছোটো হয়ে যায়, অথচ তার ব্যাকরণগত ও অর্থগত কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন ছোটোকাকা |> ছোটকা, বড়োদাদা > বড়দা। ইংরেজি ভাষায় ক্লিপিংস ওয়ার্ড  বেশি পাওয়া যায়। যেমন—এরোপ্লেন প্লেন,

ক্যানবেরি রূপমূল: যেসব পরাধীন রূপমূলের আভিধানিক অর্থ আপাতভাবে নেই এবং কোনো ব্যাকরণসম্মত অর্থও থাকে না, অথচ তা একটি শব্দকে অন্য শব্দ থেকে পৃথক করে, তাকে বলে ক্র্যানবেরি রূপমূল। যেমন আলাপ, প্রলাপ, বিলাপ, সংলাপ শব্দ গুলির 'লাপ' এই পরাধীন রূপমূল 'লাপ' রূপমূলের আপাত অর্থ না থাকলেও এই তৎসম শব্দের ব্যুৎপত্তি হল, লিপ (কথা বলা ) + ভাববাচ্য অর্থযুক্ত 'সত্ত্ব' (> অ)। 'লাপ'-এর অর্থ তাই 'কথা বলা'।

ভাষার সবচেয়ে ছোটো অর্থপূর্ণ একক হল রূপ (Morph) । আর, নিশ্বাসের এক একটি ধাক্কা (One breath impulse)-তে উচ্চারিত ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ হল দল বা অক্ষর (Syllable) | রূপ-এর অর্থ সর্বদা থাকলেও দল-এর অর্থ থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। মোট কথা, রূপ-এর ক্ষেত্রে অর্থের কদর আছে । কিন্তু দল-এর ক্ষেত্রে অর্থের কদর নেই। তবে, যে দল অর্থপূর্ণ, তা অবশ্যই রূপ এর মর্যাদা পায়। তা দলও বটে, রূপও বটে। যেমন—'বিদেশ' শব্দটির দুটি দল—'বি' এবং 'দেশ'। এই দল দুটি আবার রূপও বটে। কেননা 'বি' উপসর্গ এবং “দেশ'। এই দল দুটি আবার রূপও বটে। কেননা 'বি' উপসর্গ এবং 'দেশ' নাম- শব্দ বলে তারা উভয়েই অর্থপূর্ণ ধ্বনিগুচ্ছ। আবার, যে দল-এর কোনো অর্থ নেই, তা শুধুই দল, রূপ নয়। যেমন 'বাচ্চা' শব্দের দুটো দল—'বাচ্' “চা” দুটিই দল, কিন্তু কোনোটিই রূপ নয়। রূপ কখনও দল-এর মতো ক্ষুদ্র হতে পারে, কখনও নাও হতে পারে। কখনো-কখনো একাধিক দল-এ তৈরি রূপ পাওয়া যায়। যেমন—'হাসপাতাল' শব্দটি। এটি তিনটি দল (হাস্ + পা + তাল) নিয়ে তৈরি হলেও এটি একটি রূপ। কিন্তু একাধিক রূপ দিয়ে তৈরি দল-এর অস্তিত্ব নেই বাংলা ভাষায়। কারণ, দল- এর চেয়ে ক্ষুদ্র একক নয় রূপ। দল হল: উচ্চারণগত অর্থাৎ ধ্বনিগত একক, আর রূপ হল অর্থগত একক।

এক বা একাধিক ধ্বনি দ্বারা গঠিত অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম একক হল রূপমূল (Morpheme) |

• রূপমূল দু-প্রকারের—যুক্ত রূপমূল বা স্বাধীন রূপমূল (Free Morpheme)

এবং বদ্ধ রূপমূল বা পরাধীন রূপমূল (Bound Morpheme) |

যে অর্থপূর্ণ, ক্ষুদ্রতম ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি অন্য ধবনি বা ধ্বনি সমষ্টির সহযোগ ছাড়াই স্বাধীনভাবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে, তাকে বলে মুক্ত বা স্বাধীন রূপমূল। আর, যে অর্থপূর্ণ, ক্ষুদ্রতম ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি সর্বদা অন্য ধবনি বা ধ্বনিসমষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাক্যে ব্যবহৃত হয়, কখনও স্বাধীনভাবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না, তাকে বলে বন্ধ বা পরাধীন রূপ। যেমন— 'বেড়ালগুলো'-র 'বেড়াল' হল মুক্ত রূপমূল এবং 'গুলো' হল বন্ধ রূপমূল ধাতু মৌলিক নাম শব্দ, অনুসর্গ হল মুক্ত রূপমূল। আর, উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি, নির্দেশক ইত্যাদি হল বন্ধ রূপমূল। তবে ধাতু (যেমন— তুই বাড়ি যা) বা মৌলিক নাম শব্দ (যেমন- বাড়ি যাচ্ছি)। কিন্তু শূন্যবিভক্তি অর্থাৎ শূন্য রূপ সহযোগে পদে পরিণত হয়, অর্থাৎ বাক্যে প্রবেশ করে।

এক বা একাধিক ধ্বনি দ্বারা গঠিত অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম একক হল রূপমূল (Morpheme) |

• রূপমূল দু-প্রকারের—যুক্ত রূপমূল বা স্বাধীন রূপমূল (Free Morpheme)

এবং বদ্ধ রূপমূল বা পরাধীন রূপমূল (Bound Morpheme) |

যে অর্থপূর্ণ, ক্ষুদ্রতম ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি অন্য ধবনি বা ধ্বনি সমষ্টির সহযোগ ছাড়াই স্বাধীনভাবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে, তাকে বলে মুক্ত বা স্বাধীন রূপমূল। আর, যে অর্থপূর্ণ, ক্ষুদ্রতম ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি সর্বদা অন্য ধবনি বা ধ্বনিসমষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাক্যে ব্যবহৃত হয়, কখনও স্বাধীনভাবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না, তাকে বলে বন্ধ বা পরাধীন রূপ। যেমন— 'বেড়ালগুলো'-র 'বেড়াল' হল মুক্ত রূপমূল এবং 'গুলো' হল বন্ধ রূপমূল ধাতু মৌলিক নাম শব্দ, অনুসর্গ হল মুক্ত রূপমূল। আর, উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি, নির্দেশক ইত্যাদি হল বন্ধ রূপমূল। তবে ধাতু (যেমন— তুই বাড়ি যা) বা মৌলিক নাম শব্দ (যেমন- বাড়ি যাচ্ছি)। কিন্তু শূন্যবিভক্তি অর্থাৎ শূন্য রূপ সহযোগে পদে পরিণত হয়, অর্থাৎ বাক্যে প্রবেশ করে।

সংজ্ঞা: এক বা একাধিক ধবনির সম্মিলনে যে অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম একক গঠিত হয়, তাকে রূপমূল বলে। কোনো ভাষার রূপমূলগুলি এবং তাদের পরিবেশগত বৈচিত্র্য নির্ণয় করাকে রূপমূলবিজ্ঞান বা রূপিমবিজ্ঞান (Morphemics) বলে রূপমূল দিয়ে কী করে শব্দ গঠিত হয়, শব্দ ও ধাতুর সঙ্গে কী কী শব্দবিভক্তি, ক্রিয়াবিভক্তি ও প্রত্যয় যোগ হয়, যোগ হওয়ার ফলে শব্দরূপ ও ক্রিয়ারূপ কী রকম হয়, ইত্যাদি বিষয় ভাষাবিজ্ঞানের যে বিভাগে আলোচিত হয়, তাকেই রূপতত্ত্ব (Morphology) বলে। আলোচ্য বিষয়: পদ এবং শব্দের গঠন ও রূপবৈচিত্র্যই হল রূপতত্ত্বের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

যে-কোনো ভাষার রূপতত্ত্বের আলোচনায় প্রথম আলোচিত হয় ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের গঠনকৌশল সম্পর্কে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যে, রূপ হল শব্দগঠনের প্রধান উপাদান। এই রূপ কখনও একাই একটি শব্দ, যেমন—মা, এ. ও; কখনও-বা একটা রূপ-এর সঙ্গে অন্য একটা রূপ যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গড়ে ওঠে, যেমন— গড় + অ = গড়ন। আবার কখনও দুটো আলাদা শব্দ পরস্পর যুক্ত হয়েও নতুন শব্দ গঠিত হয়, যেমন—জন + শূন্য = জনশূন্য। এই নবগঠিত শব্দ যখন ভাষায় বা বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন কীভাবে তার রূপবৈচিত্র্য সাধিত হয়, সেটাই হল রূপতত্ত্বের পরবর্তী আলোচনার বিষয় | বাক্যের মধ্যে শব্দ কী ভূমিকা গ্রহণ করে এবং তার সেই ভূমিকা কীভাবে চিহ্নিত হয়, সেটাই এই অংশে আলোচিত হয়। বাক্যে ব্যবহৃত শব্দকে পদ বলে। বাক্যের পদগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকাশ করার জন্য শব্দের অঙ্গ হিসেবে যেসব রূপ যোগ করা হয়, সেগুলিকে বলে বিভক্তি। এই বিভক্তি ছাড়াও প্রত্যয়, উপসর্গ ইত্যাদি রূপ যুক্ত হয়ে শব্দের রূপবৈচিত্র্য সাধন করে।

গঠনপ্রকৃতি ও অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে রূপমূলগুলি প্রধানত চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত যেমন—(১) স্বাধীন বা যুক্ত রূপমূল, (২) পরাধীন বা বদ্ধ রূপমূল (৩) মিশ্র রূপমূল এবং (৪) জটিল রূপমূল |

১.স্বাধীন বা যুক্ত রূপমূল : যে রূপমূল মুক্তভাবে অন্য রূপমূলের সাহায্য ছাড়া এককভাবে ব্যবহৃত হয়, যার নিজস্ব অর্থ বিদ্যমান, যাকে আর ক্ষুদ্রতম অংশে ভাঙা যায় না, তাকে যুক্ত রূপমূল বলে। যেমন- মা, বাবা, হাতি, দেশ ইত্যাদি।

২, পরাধীন বা বদ্ধ রূপমূল : যে রূপমূলের নিজস্ব অর্থ আছে এবং যাকে আর ক্ষুদ্রতম অংশে ভাঙা যায় না, কিন্তু যেগুলো স্বাধীনভাবে ভাষায় ব্যবহৃত হতে না পেরে মুক্ত রূপমূলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়, সেই ধরনের রূপমূলকেই বন্ধ রূপমূল বলা হয়। যেমন- গুলি, রা, এর, টি, টা ইত্যাদি।

৩,মিশ্র রূপমূল : যখন দুটো যুক্ত রূপমূলের সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর রূপমূল গঠন করা হয়, তখন এই শ্রেণির রূপমূলকে মিশ্র রূপমূল রূপে চিহ্নিত করা হয়। দুটো যুক্ত রূপমূল সহযোগে যখন একটি মিশ্র রূপমূল গঠিত হয়, তখন যুক্ত রূপমূলের আগেকার অর্থের বদল হয়ে একটা নতুন অর্থ প্রকাশিত হয়। যেমন—জাম + বাটি = জামবাটি, এখানে 'জাম' বিশেষ ধরনের ফল ও ‘বাটি একধরনের পাত্র, এই দুই মুক্ত রূপিম জুড়ে যে নতুন 'জামবাটি' রুপিমটি তৈরি হল তার অর্থ একটি বিশেষ বাটি বা পাত্র | আরও কয়েকটি মিশ্র রূপমূলের উদাহরণ হল গাং = গাংচিল, পদ্ম + লোচন পদ্মলোচন, সংবাদ + প = সংবাদপত্র + মারি = মহামারি ইত্যাদি।

৪. জটিল রূপমূল: মিশ্র রূপমূলে যেখানে দুটো মুক্ত রূপমূলের সম দেখা যায়, সেখানে জটিল রূপমূলে দুইয়ের বেশি মুক্ত রূপমূলের সাে লক্ষণীয়। বাংলা ভাষায় জটিল রূপমূলের বেশ কিছু উদাহরণ লক্ষ যায়। যেমন—বাউলগানরচয়িতা, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, বহুবর্ণ গাছ দিবারাত্রির কাব্য, ক্রিকেট খেলোয়াড় ইত্যাদি ।

দুই বা তার বেশি রূপমূলের ধ্বনিগত ও অর্থগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আদর ক্ষেত্রে একাধিক রূপমূল একই অর্থ প্রকাশ করে। এই শ্রেণির রূপমূলগুলিকে সহরূপ (Allomorph) বলে।

সেদিক থেকে দেখতে গেলে সহরূপ হল রূপমূলের পরিবর্তনীয়, বৈজির রূপ, যা রূপমূলের বিশেষ পরিবেশে ব্যবহৃত হয়। যেমন— রা, -গুলো, তুমি ইত্যাদি।

-রা, গুলি, গুলো—এই সহরুপমূলগুলির গঠনের ক্ষেত্রে ধ্বনিগত পার্থক্য থাকলেও এগুলো একই ধরনের অর্থ প্রকাশ করে বলে এরা স্বতন্ত্র পর রূপে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়নি।

বিভিন্ন ভাষায় সহরূপমূলগুলো বিভিন্ন রূপমূলক এবং ধবনিতাত্ত্বিক পরিবেশে ব্যবহৃত হতে পারলেও, বাংলায় বহুবচন নির্দেশক সহরূপমূল্যগুলির ধ্বনিতাত্ত্বিক কোনো পরিবেশ নেই, কিন্তু রূপমূলক পরিবেশ বিদ্যমান। যেমন—‘গুলো' ও 'গুলি' এই সহরূপমূল দুটি মানুষ-সহ অন্যান্য প্রাণী বা অপ্রাণীবাচক বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে (লোকগুলো, বইগুলি), কিন্তু 'রা' সহরূপমূলটি শুধুমাত্র মনুষ্যবাচক বিশেষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় (মহিলারা, মেয়েরা, লোকেরা)।

এবার ইংরেজিতে কয়েকটি বহুবচন নির্দেশক পদ নিয়ে আলোচনা করা যাকcats, crosses, oxen, এইসব পদে বহুবচন বোধক প্রতায় যথাক্রমে s, es, en কিন্তু এদের মধ্যে ধ্বনিগত মিল নেই। তা সত্ত্বেও এর একই রূপমূল। কারণ, এদের অর্থ এক এবং পরস্পরের পরিপূরক অবস্থানে রয়েছে বলে এরা একের জায়গায় অন্যটি বসতে পারে না। cat-এর ে যেমন 'en' যোগ হতে পারে না, তেমনি ox-এর সঙ্গে 's' বা 'es' পারে না। এদের অবস্থান শর্তাধীন। এরা তাই একই রূপমূলের বৈচিত্র্য ভাষাবিজ্ঞানীরা এই রকমের বৈচিত্র্যকেই 'সহরূপমূল' বা Allamaiph বলে চিহ্নিত করেছেন।

আমরা অনেক সময় কোনো রূপমূলের বহুবচন নির্দেশ করতে 'রা', 'গুি 'গুলো' ইত্যাদি সংরূপমূলকে রূপমূলের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহার করি। কিছু যেসব ক্ষেত্রে রূপমূলের বহুবচন নির্দেশে রূপমূলের সঙ্গে কোনো প্রকার সহরূপমূল সংযুক্ত হয় না, এই শ্রেণির সহরূপমূল শূন্য রূপমূল রূপে। এই ধরনের শূন্য রূপমূলের ব্যবহার ইংরেজি ভাষায় বেশি দেখতে পাওয়া যায়। REG sheen (azaz রুণ)-put (অতীত কালের রূপ)। এক্ষেত্রে sheep বা put-এর সঙ্গে শূন্য ৰূপমূল যুক্ত করে বহুবচন বা অতীত কালের ক্রিয়ারূপ নির্দেশ করা হয়েছে। বাংলা ভাষায় অনেক ক্ষেত্রে পরিমাণসূচক বিশেষ্যের বহুবচন নির্দেশের ক্ষেত্রে লুনা গ্রুপমূলের প্রয়োগ করা হয়। যেমন এক্ষেত্রে একই শব্দের দ্বিত্ব প্রয়োগ শূ সহরূপমূল-এর ব্যবহার দেখা যায়—হাসাহাসি, বাড়িবাড়ি, ছোটো ছোটো ইত্যাদি অনন্তবাচক, অসীম দিকনির্দেশক রূপমূল

এই শ্রেণির শূন্য রূপমূলগুলি আবার ধ্বনিপরিবর্তন করে বহুবচন নির্দেশও করে। যেমন—mouse—mice, tooth – teeth, man-men ইত্যাদি বাংলায় কর্তৃকারকের প্রথমা বিভক্তির কোনো ধ্বনিগত প্রকাশ নেই। তবে মৃত প্রাচীন ব্যাকরণবিদগণ এসব ক্ষেত্রে একটি রূপের বা সহরূপমূলের অদৃশ্য উপস্থিতি অনুমান করে এর নাম দিয়েছিলেন শূন্য বিভক্তি | আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা এই ধারণাটিকেই শূন্য রূপমূল বা Zero allomorph হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যা রূপহীন রূপভেদ এবং তা ঊহ্য বা শূন্য রূপে অবস্থিত । বাংলা ভাষায় একটা উদাহরণ দিলে শূন্য রূপমূল বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

যেমন—

ছেলেটি ভাত খাচ্ছে।

সোনা গান গাইছে।

ক্ষেত্রে 'ভাতকে খাচ্ছে এবং 'গানকে গাইছে বললে ব্যাকরণের দিক থেকে হয়তো ঠিক হত। কিন্তু বাংলা ভাষার রীতি অনুসারে 'ভাত' এবং "মান" -এর সঙ্গে কোনো বিভক্তি যোগ হয় না। তবু অদৃশ্য 'কে' বিভক্তিটি রয়ে গেছে। এই অদৃশ্য বিভক্তি বা রূপমূলটিকেই শূন্য রূপমূল হিসেবে ভাষাবিদরা চিহ্নিত করেন।

কোনো ভাষার শব্দ যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয়, তখন কীভাবে তার রূপবৈচিত্র সাধিত হয়, সে সংক্রান্ত আলোচনা রূপতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা কোনো শব্দকে যখন বাক্যে ব্যবহার করি, তখন শব্দের এক নতুন ভূমিকা শুরু হয়। বাক্যে ব্যবহারের পর শব্দ আর শব্দ থাকে না, তা পদ-এ পরিণত (Parts of speech) |

বাংলা বাক্যে ভিন্ন ভিন্ন পদের ভূমিকা এবং পদগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করে পদকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যেমন—নামপদ বা বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া এবং অবায়।

বাক্যের পদগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকাশ করার জন্য অথবা বাক্যের মধ্যে পদগুলির ভূমিকা চিহ্নিত করার জন্য শব্দের অঙ্গ হিসেবে যেসব রূপ যোগ করা হয়, সেগুলিকে বলে বিভক্তি। এই রূপগুলি যুক্ত হয়ে থাকার ফলে শব্দের রূপবৈচিত্র্য সাধিত হয়।

অব্যয় পদের কোনো রূপবৈচিত্র্য নেই, কারণ, অবায়ের সঙ্গে কোনো বিভক্তি যোগ হয় না, শুধু বিশেষ্য, সর্বনাম ও ক্রিয়ার রূপবৈচিত্র্য সাধিত হয়। তার মধ্যে বিশেষ্য ও সর্বনামের বিভক্তি একই বিভাগে আলোচন, কারণ সর্বনাম বিশেষ্যের পরিবর্ত পদ। এই বিভাগকে বলা হয় কারক বিভক্তি। বিশেষণ। কখন বিশেষ্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, তখন তার সঙ্গে সাধারণত কোনো আরকবিভক্তিই যুক্ত হয় না। সুতরাং বিভক্তি যোগে ৰূপবৈচিত্র্য সাধিত হয়। প্রধানত নামপদ বা বিশেষ্য ও ক্রিয়া পদের। তাই বিভক্তি হল দু-প্রকার—

(b) নামবিভক্তি এবং (২) ক্রিয়াবিভক্তি। দুধরনের বিভক্তি যোগে যে রূপবৈচিত্র্য সাধিত হয়, তাই রূপতত্ত্বের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

বিশেষ্য ও ক্রিয়ার রূপবৈচিত্র্যই বাংলা রূপতত্ত্বে প্রধান স্থান অধিকার আছে। এদের যথাক্রমে শব্দরূপ ক্রিয়ারূপ বলে।

এই শব্দরূপ ক্রিয়ারূপ ছাড়াও রূপবৈচিত্র্য

ভূমিকা বচন, লিঙ্গ, পুরুষ, কারক, ভাব প্রভৃতি এদেরকে

বলা হয় ব্যাকরণিক সংবর্গ।

এইসব ব্যাকরণিক সংবর্গ ভাষার রূপতত্ত্বকে সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এক সংবর্গের ওপরই ভাষাবিশেষের রূপতত্ত্বের বৈশিষ্ট্যগুলিও নির্ভর করে ।

প্রতায় হল অর্থদ্যোতক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি শব্দ ধাতুর সঙ্গে নতুন গঠন কখনও পদের পরিবর্তনও ঘটায়।

• ব্যাবহারিক প্রয়োগের অবস্থান অনুযায়ী প্রত্যয়ের দুটি ভাগ। —–কৃৎ প্রত্যয় এবং তন্বিত প্রত্যয়। ধাতুর সঙ্গে যেসব প্রত্যয় বলে।

* প্রত্যয়ের উদাহরণ – + তব্য কর্তব্য প্রত্যয়ের উদাহরণ সুমিত্রা স্নি= সৌমিত্রি

যে অর্থপূর্ণ, ক্ষুদ্রতম ধ্বনি ধ্বনিসমষ্টি সর্বদা ধ্বনি বা ধ্বনিসম সহযোগে বাক্যে ব্যবহৃত হয়, এককভাবে বাক্যে ব্যবহৃত তাকে বলে রূপমূল বা পরাধীন রূপমূল। যেমন— 'বেড়ালগুলোর 'গুলো' হল পরাধীন রূপমূল আর সমস্ত পরাধীন রূপমূলের অভিধানে না, ব্যাকরণসিদ্ধ, হল ব্যাকরণসম্মত রূপমূল এই পরাধীন ব্যাকরণসম্মত দুপ্রকারের—(১) সমন্বয়ী রূপমূল, (২) নিষ্পাদিত রূপমূল

সমন্বয়ী রূপমূল পরাধীন, ব্যাকরণসম্মত রূপমূল শব্দকে পদে পরিণত করে অর্থাৎ শব্দের সমন্বয়সাধন তার স্থিরতা তাকেই বলা সমন্বয়ী রূপমূল। বিভক্তি সমন্বয়ী রূপমূল। যেমন— রিমা মেয়েকে স্কুলে দিয়ে এল। এই বাক্যে 'মেয়ে' শব্দের সঙ্গে 'কে' 'ফুল' সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত তারা যথাক্রমে 'মেয়ে' এবং 'স্কুল' শব্দদ্বয়ের সমন্বয়সাধন করল এবং পদে পরিণত করল। এই দুই পদের অন্য কোনো ধবনি বা ধ্বনিগুচ্ছ কখনোই যুক্ত হতে পারে না। সমন্বয়ী শব্দ করতে পারে না। গঠনে সম্পূর্ণতা আনে।

নিষ্পাদিত রূপমূল যে পরাধীন, ব্যাকরণসম্মত রূপমূল বা নাম শব্দের সঙ্গে যুক্ত শব্দ নিষ্পন্ন করে, রূপমূল। রূপমূলের সাহায্যে কখনও শব্দের কার্যগত রূপের পরিবর্তন ঘটে, কখনও কেবলমাত্র অর্থেরই পরিবর্তন হয়। উপসর্গ, হয় নিষ্পাদিত রূপমূল যেমন—নি (উপসর্গ) খোঁজ (বিশেষ্য) = নিখোঁজ (বিশেষণ) মি (প্রত্যয়) পাকামি (বিশেষ্য); (উপসর্গ) (বিশেষণ)