Chapter-16, বাক্যতত্ত্ব

বাক্য বানানোর পালনীয় নিয়ম দুটি হল — (১) পদের ক্রম, (২) এক পদের সঙ্গে অন্য পদের সম্পর্ক।

বাক্যে যার সম্বন্ধে কোনো কিছু বলা হয় বা ভাব প্রকাশ করা হয়, তাই উদ্দেশ্য।

বাক্যের উদ্দেশ্যকে অবলম্বন করে যা কিছু বলা হয়, অর্থাৎ উদ্দেশ্যসম্বন্ধে যা বলা হয়, তা-ই হল বাক্যের 'বিধেয়' অংশ।

"বিশেষ্যখণ্ড' অংশে যেমন বিশেষ্যপদ থাকে, তেমনি সর্বনামও থাকতে পারে। এরা কর্তৃস্থানীয় (অর্থাৎ, বিশেষ্য বা সর্বনাম কর্তার স্থান দখল করে)। বিশেষণ, বিশেষণের বিশেষণ, নির্দেশক এবং সংযোজক পদও থাকতে পারে।

ক্রিয়াখণ্ডে অবশ্যই ক্রিয়াপদ থাকে। এ ছাড়া এর সঙ্গে গৌণ কর্ম, মুখ্য কর্ম, ক্রিয়াবিশেষণ, কালবাচক পদ ইত্যাদি থাকতে পারে।

চমস্কির মতে বাক্যের অধোগঠনের অর্থ অপরিবর্তনীয়। এই অপরিবর্তনীয়তাই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

চমস্কির মতে, বাক্যের অন্বয়গত গঠনের স্তরটিই হল অধিগঠন যাকে পরিবর্তন করা যায়। এ ছাড়া তিনি অধিগঠনকে বাক্যের ‘প্রকাশভঙ্গি' রূপে অভিহিত করেছেন ।

বাক্যবিধির প্রধান দুটি দিক হল — (১) বাক্যের মধ্যে শব্দগুলিকে সাজাবার বা বিন্যাসের নিয়ম এবং (২) বাক্যের প্রয়োজন অনুসারে শব্দের রূপপরিবর্তনের নিয়ম ।

ফেদিনা দ্য সোস্যুর ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন।

বাক্যের অন্তর্গত নামশব্দের সঙ্গে যুক্ত বিভক্তিকে বলা হয়। শব্দবিভক্তি এবং ক্রিয়াশব্দের সঙ্গে যুক্ত বিভক্তিকে বলা হয় ক্রিয়াবিভক্তি |

ফেদিনা দ্য সোস্যুর জেনিভা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন।

মানুষের মস্তিষ্কে ল্যাড (ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস) থাকার ফলে ভাষার বিশ্বজনীন, নির্বিশেষ নিয়মতন্ত্র তার করায়ত্ত থাকে। ফলে ভাষা বলার যে ক্ষমতার অধিকারী হয় সে, সেই ক্ষমতাই হল কমপিটেন্স ।

মার্কিন গ্রন্থনবাদী ঘরানায় ভাষার অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছিল।

বাক্যের অব্যবহিত উপাদান চিহ্নিত করার জন্য জোটের ভেতরের পদগুলির মধ্যে যে উপাদানগত ঐক্য থাকা প্রয়োজনীয়, তাই হল অভ্যন্তরীণ ঐক্য।

বাক্যে অবস্থিত শব্দগুলির বিন্যাস (অর্থাৎ বাক্যের মধ্যে কোন্ শব্দ কোথায় বসবে) এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় আলোচনা করা হয়, তাকে বলে বাক্যতত্ত্ব।

বাক্যের প্রধান দুটি অংশ হল উদ্দেশ্য এবং বিধেয়।

বাক্যের উদ্দেশ্য হল কর্তা অর্থাৎ বিশেষ্য বা সর্বনাম এবং বিধেয় হল সমাপিকা ক্রিয়া

পদক্রমের নিরিখে বাংলা ভাষাকে 'এস-ও-ভি' ভাষা অর্থাৎ 'কর্তা কর্ম-ক্রিয়া' ভাষা এবং ইংরেজিকে 'এস-ভি-ও' ভাষা অর্থাৎ 'কর্তা-ক্রিয়া কর্ম' ভাষা বলে।

গঠনগত দিক দিয়ে বাক্য তিন প্রকার—সরল বাক্য, জটিল বাক্য এবং যৌগিক বাক্য।

বাংলা বাক্যের পদসংস্থানের স্বাভাবিক ক্রম সাবজেক্ট-অবজেক্ট ভার্ব অর্থাৎ কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া হওয়ায় এ ভাষাকে বলে এস-ও-ত্তি ভাষা ।

ইংরেজি বাক্যের পদসংস্থানের স্বাভাবিক ক্রম সাবজেক্ট-ভাব অবজেক্ট অর্থাৎ কর্তা-ক্রিয়া-কর্ম হওয়ায় এ ভাষাকে বলে এস-ডি-ও ভাষা।

অর্থগত দিক থেকে বাংলা বাক্যকে নির্দেশক, প্রশ্নবাে । বিস্ময়বাচক এবং অনুজ্ঞাবাচক এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ।

যে সাধারণ ভাষাজ্ঞান ভাষার ধ্বনি ও অর্থের সংগতি সাধনের মাধ একজন মানুষকে কোনো ভাষা শিখতে সাহায্য করে, তাকে বলে 'পাড় ।

সাধারণ ভাষাজ্ঞানের নিয়ম মেনে মানুষ যখন তার ভাষা উপাদান নির্বাচন ও প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে নিজস্ব একটি বাচনক্রিয়া তৈরি করে, তখন তাকে বলে পারোল।

ভাষাবিজ্ঞানী ফেমিনা দ্য স্যোসুর (১৮৫৭-১৯১৩) 'লা' "পারোল" ধারণার উদ্ভাবক।

‘কমপিটেন্স' ও 'পারফরমেন্স' ধারণার উদ্ভাবক হলেন নোয়াম চমি ।

নোয়াম চমস্কির মতে, মানুষের মাথায় যে 'ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস' থাকে, যা মানুষের ভাষা বলার সহজাত ক্ষমতাকে উসকে দেখ সেটাই সংক্ষেপে 'ল্যাড'।

বাক্যে অবস্থিত ঠিক আগে বা ঠিক পরে যে পদ বা পদগুচ্ছ থাকে, তাকে অব্যবহিত উপাদান বলে ।

বাক্যতত্ত্বের আলোচনায় বাক্যের অব্যবহিত উপাদান বিশ্লেষে কথা প্রথম বলেন লেওনার্দ ব্লুমফিল্ড।

বাক্যে বিশেষা এবং সর্বনাম পদ দিয়ে বিশেষ্যজোট তৈরি হে সঙ্গে গৌণ পদ হিসেবে অন্য পদ থাকতেও পারে।

বাক্যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের পর অনুসর্গ বা পরসর্গ বসে তৈরি অনুসর্গজেট, যে জোটের প্রধান পদ অনুসর্গ

যে পদজোটে একাধিক মাথা (Head) থাকে, তাকে বলে যৌগিক অন্তর্মুখী সংগঠন।

অব্যবহিত উপাদান বিভাজনের প্রয়োজনীয় প্রধান নীতি তিনটি -(১) অভ্যন্তরীণ ঐক্য, (২) অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য এবং (৩) স্বাধীনতা।

অব্যবহিত উপদান চিহ্নিত করার জন্য জোটের মধ্যে পদগত ঐক্য থাকা প্রয়োজনীয়।

বাক্য বর্ণনার সুযোগ নেই এই বিশ্লেষণে এবং দ্ব্যর্থক বাক্য বিশ্লেষণে অক্ষম এই পদ্ধতি।

একটি বাক্যকে অব্যবহিত উপাদানের সর্বশেষ পর্যায়ে ভাঙলে যে পদ পাওয়া যায়, সেই পদ-এর ব্যাকরণগত পরিচয়কেই বলে পদবর্গ।

যেসব প্রক্রিয়া বাক্যের চেহারা বদলে দেয়, সেই প্রক্রিয়াগুলিকেই বিলে সংবর্তন।

 

সমস্ত বাক্য কীভাবে সঞ্জাত হয়, তার সংবাদ যে ব্যাকরণ দেয়, তাকে বলা হয় 'সঞ্জননী ব্যাকরণ"।

চমস্কি প্রবর্তিত গবেষণারীতিতে বাক্য সঞ্জননের জন্য সংবর্তনকেও কাজে লাগানো হয়, সে কথা জানাতে 'সঞ্জননী ব্যাকরণ-এর আগে 'সংবর্তনী' কথাটা জোড়া হয়।

সরল বাক্যে একটি উদ্দেশ্য এবং একটি বিধেয় থাকে।

অন্তর্মুখী সংগঠন বলতে বিশেষ্যজোট ও ক্রিয়াজোটকে বোঝায়।

বহির্মুখী সংগঠন বলতে অনুসর্গজোটকে বোঝায় |

যে গঠন-এ একটি মাথা বর্ধক-সহ থাকে তাকে বলে অন্তর্মুখী সংগঠন।

যে গঠন-এ একাধিক মাথা থাকে তাকে বলে বহিমুখী গঠন।

বাক্যের অব্যবহিত উপাদান চিহ্নিত করার জন্য জোটের ভেতরের পদগুলির মধ্যে যে উপাদানগত বৈচিত্র্য থাকা প্রয়োজনীয়, তাই-ই হল অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য।

অনুসর্গ জোটকে পরসর্গ জোট নামে অভিহিত করা হয়।

বিশেষ্যজোটে মাথা হিসেবে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ থাকতে পারে।

ক্রিয়াজোট বাক্যের বিশেষ্যজোটের পর অবস্থান করে।

কালবাচক ও পুরুষবাচক পদ ক্রিয়াজোটের সঙ্গে থাকে।

যে বহুপদী ক্রিয়ার শেষ ক্রিয়াপদটি আপাতভাবে অর্থহীন হলেও প্রথম ক্রিয়া। ক্রিয়াপদের অর্থটা সেই ক্রিয়াপদকে উসকে দেয়, তাকে বলে যৌগিক

ক্রিয়াপদ, বিশেষণ এবং অধস্তন কোনো ক্রিয়াবিশেষণ জোটকে বর্ধিত করে।

বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানে বাক্যকে ভাষার বৃহত্তম একক ধরা হয়। এরপর তাকে ধাপে ধাপে ক্রমশ বৃহত্তর থেকে ক্ষুদ্রতর উপাদানে বিশ্লেষণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে বাক্য বিশ্লেষণ করতে হলে যেসব মূল ধারণা থাকা জরুরি তার মধ্যে অন্যতম হল 'গঠন'। খণ্ডিত বা পূর্ণ অর্থসমন্বিত যে-কোনো পদসমষ্টিকে বলা হয় গঠন (Construction)। যেমন— "আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন।" এই বাক্যটির মধ্যে একটি সম্পর্কের কখন আছে এবং এরও একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থ আছে। তাই এটি একটি বাক্য। আর এই সমগ্র বাক্যটি হল একটি গঠন।

আবার, “আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম” – এই পদসমষ্টির অর্থ পূর্ণাঙ্গ নয়। কিন্তু এরও একটা অর্থ আছে যদিও তা খণ্ডিত এবং এর পদগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আছে। এই পদসমষ্টি একটি উপবাক্য (Clause) । এরকমের খন্ডিত অর্থযুক্ত পদসমষ্টিও বাক্যের একটি গঠন।

উপবাক্যের চেয়ে ছোটো পদসমষ্টি হল "ফুটবল খেলছিলাম"-এরও কিছু অর্থ আছে, যদিও তা আরও খণ্ডিত। এই রকমের পদসমষ্টিকে বলা হয় পদগুচ্ছ (Phrase) | এটাও বাক্যের একধরনের গঠন।

সুতরাং ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় বাক্যের গঠন' কথাটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। একাধিক শব্দ বা রূপ নিয়ে যখনই কোনো খণ্ডিত বা পূর্ণ অর্থযুক্ত একক গড়ে ওঠে, তখনই তাকে গঠন বলে।

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড ক্রিস্টাল উপরে আলোচিত বাক্যের তিনটি গঠন স্তর ছাড়াও আরও দুটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন “ফুটবল খেলছিলাম" পদসমষ্টিকে ভাঙলে পাওয়া যাবে দুটি শব্দ 'ফুটবল' ও ‘খেলছিলাম' | আবার 'ফুটবল' শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যাবে দুটি রূপিম বা রূপমূল, যেমন— ফুট +বল = ফুটবল। ক্রিস্টালের মতে, বাক্যের গঠনের শেষ সীমায় আছে রূপমূল । তবে 'শব্দ' ও 'রূপমূল' কখনই বাক্যের গঠন নয়, এরা বাক্যের এক একটি উপাদানমার।।

বাক্যের গঠন ও গঠনগত উপাদানের তুলনা: আমরা জানি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত যে-কোনো অর্থপূর্ণ শব্দসমষ্টিই হল গঠন অন্যদিকে যখন কোনো একটি গঠন একটি বৃহত্তর গঠনের অংশ, তখন সেইটাই সেই বৃহত্তর গঠনের গঠনগত উপাদান।

বাক্যের গঠন ও গঠনগত উপাদানের এই ধারণার নিরিখে বাক্যের অন্তর্গত উপবাকা ও পদগুচ্ছ একদিকে যেমন এক একটি গঠন, অন্যদিকে এরা বাক্যের এক-একটি গঠনগত উপাদানও বটে। কিন্তু একটি বাক্য শুধুই গঠন, কারণ সমগ্র বাক্যটি সেই বাক্যের অংশ নয়। তাই সমগ্র বাক্যটিকে বাক্যের। গঠনগত উপাদান বলা যায় না। আমরা যেমন একজন মানুষকে তার অঙ্গ বলতে পারি না, তেমনি একটা গোটা বাক্যকে তার গঠনগত উপাদান বলা যায় না।

→ 'অব্যবহিত উপাদান'-এর স্বরূপ: বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানে বাক্যকে ধাপে ধাপে ক্রমশ বড়ো থেকে সবচেয়ে ছোটো উপাদানে ভাগ করা হয়। যে কোনো গঠনকে প্রথম ধাপে আমরা যে দুটি বা যে কটি বৃহত্তম অর্থপূর্ণ উপাদানে ভাগ করতে পারি তাদের অব্যবহিত উপাদান' (Immediate Constituent) বলে। যেমন— "আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন।” বাক্যটিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে একে আমরা প্রথম ধাপে সবচেয়ে বড়ো যে দুটি অংশে ভাগ করতে পারি তা হল

(৯) আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম

(২) তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন।

এই বৃহত্তম উপাদান দুটি হল সমগ্র বাক্যের 'অব্যবহিত উপাদান'। এখন আমরা যদি ১নং গঠনটিকে দুটি বৃহত্তম উপাদানে ভাঙি, তাহলে আমরা পাব (১.১) আমরা (১.২) যখন ফুটবল খেলছিলাম

এখানে এই দুটি হল ১নং গঠন বা উপবাক্যের অব্যবহিত উপাদান। ১.২ নং পদসমষ্টিকে ভেঙে তারও দুটি অব্যবহিত উপাদান পাওয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, 'আমরা' বা 'যখন ফুটবল খেলছিলাম' সমগ্র বাক্যের গঠনগত উপাদান হলেও এরা সমগ্র বাক্যের 'অব্যবহিত উপাদান' নয়, শুধুমাত্র ১নং উপবাক্যের অব্যবহিত উপাদান।

প্রকৃতপক্ষে 'অব্যবহিত উপাদান' বলতে বোঝায়, যে গঠনটি বিশ্লেষণ করা হয় তার বৃহত্তম উপাদান শুধু তারই অব্যবহিত উপাদান, তার চেয়েও বৃহত্তর কোনো গঠনের অব্যবহিত উপাদান নয়।

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে বাক্যবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বাক্যের ‘অব্যবহিত 'উপাদান'-এর ধারণাটি বছুদিন যাবৎ প্রচলিত আছে। কিন্তু উত্তর-আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা বলেন যে, ভাষায় এমন অনেক বাক্য আছে বা হতে পারে যেগুলিকে 'অব্যবহিত উপাদান -এর সাহায্যে বিশ্লেষণ করা যায় না। যেমন "আমি তো দিঘায় গিয়ে অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ দেখেছি।"

এই বাক্যের “অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ দেখেছি” অব্যবহিত উপাদানে ভাঙা যায় না, কারণ তাহলে উপবাক্যের অর্থটি মুগ্ধ হবে। যেমন— অনেক ঝাউ / আর কাজু গাছ দেখেছি। এভাবে ভাঙলে অনেক ঝাউগাছ দেখার কথা বোঝালেও কাজুগাছ দেখার পরিমাণটা অস্পষ্ট থাকে। বাক্যের উপাদান নির্ণয়ে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেন উত্তর আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি। তিনি এক্ষেত্রে ‘পদগুচ্ছ সংগঠনতত্ত্বকেই গুরুত্ব দেন। আধুনিক ধারণা অনুযায়ী ‘পদগুচ্ছ সংগঠনের' সাহায্যে বাক্যের প্রধান দুটি ভাগ দেখানো হয়। বিশেষাখণ্ড ও ক্রিয়াখণ্ড। যেমন—উপরের বাক্যটিরও দুটি ভাগ—

(১) বিশেষাখণ্ড – আমি
(২) ক্রিয়াঘণ্ড- দিঘায় গিয়ে তো অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ দেখেছি।

এই ধরনের বিশ্লেষণের দ্বারা সবধরনের বাকাকেই যাতে ভাঙা যায় বা বাক্যের উপাদানগুলিকে চিহ্নিত করা যায়, তার জন্য চমস্কি একটি সূত্রেরও আবিষ্কার করেন। একেই বলা হয় পদগুচ্ছের সংগঠনসূত্র ( Phrase Structure Rules) |
নোয়াম চমচ্ছি তাঁর 'Syntactic Structure (1957) গ্রন্থে এই পদগ্রাহ সংগঠনের সূত্রগুলির বিষয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা নীচে সহজ করে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল
সূত্র-১: একটি বাক্যে থাকবে একটি বিশেষ্যখণ্ড ও একটি ক্রিয়াখণ্ড। যেমন—আমি তো দিঘায় গিয়ে অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ দেখেছি।
থাকা

বিশেষাগত

আমি

ক্রিয়াপড

দিঘায় গিয়ে তো অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ দেখেছি

সূত্র-২: ক্রিয়াখণ্ডে থাকবে একটি সমাপিকা ক্রিয়া এবং একটি বিশেষ্যখণ্ড । যেমন— “দিঘায় গিয়ে তো অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ দেখেছি।"

বিশেষাখণ্ড

সমাপিকা ক্রিয়া

দিঘায় গিয়ে তো অনেক ঝাউ আর কাজু গাছ

দেখেছি

সূত্র-৩: বিশেষাখণ্ডে থাকবে নির্দেশক, বিভক্তি বা প্রত্যয় এবং একটি বিশেষ্য । যেমন—“আমি তো”

বিশেষ্য

আমি

বিশেষ্য খণ্ড

নির্দেশক/প্রভাষ/বিষি

আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের চর্চায় বাকাবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দু'টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল বাক্যের (১) অধোগঠন বা অন্তর্গঠন এবং (২) অধিগঠন বা বহিগঠন। অধোগঠনকে ইংরেজিতে বলা হয় Deep Structure এবং অধিগঠনকে বলা হয় Surface Structure

বাক্যের গঠনের এই ধারণা দুটির প্রবক্তা হলেন নোয়াম চমস্কি। তাঁর মতে প্রতি বাক্যের দুটি স্তর থাকবেই, একটি অন্বয়গত গঠনের স্তর এবং অন্যটি অর্থের দূর বা অন্তলীন স্তর। অন্নয়গত গঠনের স্তরটি হল অধিগঠন এবং অর্থের ধরটিকে তিনি অধোগঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করলে এরকম দাঁড়ায় যে, বাক্যের রূপান্তরের পূর্ববর্তী স্তরে থাকে অধোগঠন বা অন্তর্লীন অর্থের স্তর। এরপর বাক্যের রূপান্তরিত ধাপটি হল তার অধিগঠন। নীচে দুটি বাক্যের সাহায্যে অধোগঠন ও অধিগঠনের ধাপটি দেখানো হল

(১) আমরা জিতব বলে খেলতে নেমেছি। (২) আমরা জেতার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বলে খেলতে নেমেছি।

বাক্য দুটির মধ্যে ২নং বাক্যটি ১নং বাক্যের মূল অর্থটি বহন করছে তাই এটি একটি অধোগঠন (Deep Structure) | বিপরীতক্রমে ১নং বাক্যটি সময়গত গঠনের বহিঃস্তর, তাই এটি একটি আধোগঠন।

অনেক সময় আমরা যে বাক্য বলি তাতে অনেক অস্পষ্টতা থাকে। সেক্ষেত্রে বাক্যের অধিগঠন ও অধোগঠনের স্তরটি নির্ণয় করতে পারলে এই বোধের অস্পষ্টতা দূর হয় বলে মনে করেন ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমক্কি। যেমন— স্বর গায়ে ডাক্তার স্কুলে যেতে বারণ করেছেন।"

এটা যদি একটি অধিগঠন হয়, তবে এই বাক্যের মূল ভাব বা অর্থ নিয়ে একটা দোলাচল থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে এর দু-রকম অধোগঠন হতে পারে। যেমন—

(১) জ্বরটি ছোঁয়াচে বলে ডাক্তার স্কুলে যেতে বারণ করেছেন।

(২) স্বর আরও বেড়ে যেতে পারে বলে ডাক্তার স্কুলে যেতে বারণ করেছেন।

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, বাক্যের অধিগঠন দেখেই তার মূল অর্থ বোঝা যায় না। কিন্তু আমরা যদি বাক্যের অধোগঠন বা বাক্যের অন্তলীন অর্থটি সম্বন্ধে অবহিত থাকি, তাহলে বাক্যের অধিগঠন বা বাইরের রূপটি যেমনই হোক না কেন বাক্যের মূল বক্তব্যটিকে ধরতে পারি। সেদিক থেকে বলা যায় যে, ভাব প্রকাশের সময় আমরা বিশেষ ভাবটিকে অক্ষুণ্ণ রেখে নানারকম । রূপে তাকে প্রকাশ করতে পারি। আমরা মনের বিশেষ ভাব অর্থাৎ বাক্যের অধোগঠনটি সেক্ষেত্রে অপরিবর্তিতই থাকে।

নিগত দিক থেকে বাক্যকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যথা- (১) সরল বাক্য (২)যৌগিক বাক্য (৩)যৌগিক বাক্য

• সরল বাক্য : যে বাক্যে উপস্থিত বা উহা একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে। (১) বিরাট ব্যাট করছে। (২) আমার নাম শচীন।
১নং বাক্যের সমাপিকা ক্রিয়াটি হল করছে এবং ২নং বাক্যের উহা সমাপিকা ক্রিয়াটি হল 'হয়'। তাই এ দুটি বাক্য হল সরল বাক্য।

যৌগিক বাক্য : একাধিক সরল বাক্য যখন স্বাধীন অর্থপ্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রেখে উপস্থিত বা উহা এক বা একাধিক সংযোজক অব্যয়ের দ্বারা মিলিত হয়ে একটি মাত্র বাক্য গঠন করে, তখন সেই বাক্যকে যৌগিক বাক্য বলা হয়। যেমন—

(১) আমরা পুরী যাব এবং কোনারকের মন্দির দেখব।

(২) তুহিন তাড়াতাড়ি গেল কিন্তু বাসটা পাবে না।

(৩) খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো।

১নং বাক্যে 'এবং' সংযোজক অব্যয়ের দ্বারা এবং ২নং বাক্যে 'কিন্তু' সংযোজক অব্যয়ের দ্বারা প্রতিক্ষেত্রে দুটি করে স্বাধীন বাক্য একটি যৌগিক বাক্যের আকার ধারণ করেছে। আবার দ্যাখো ৩নং বাক্যে কোনো সংযোজক অব্যয় নেই অথচ দুটি স্বাধীন বাক্য পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যৌগিক বাক্যের রূপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে বিরামচিহ্ন কমা (,) সংযোজক অব্যয়-এর ভূমিকা নিয়েছে বা সংযোজক অব্যয় উহা থেকে স্বাধীন বাক্য দুটি যৌগিক বাক্যের রূপ লাভ করেছে।

জটিল বাক্য: একটি প্রধান খন্ডবাক্য এবং এক বা একাধিক অপ্রধান খণ্ডবাক্য দ্বারা যে বাক্য গঠিত হয়, তাকে বলে জটিল বাক্য। সুতরাং প্রতিটি জটিল বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্য এবং এক বা একাধিক অপ্রধান বা আশ্রিত বা অধীন খণ্ডবাক্য থাকে। যেমন

(১) বারান্দা থেকে দেখলাম যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।

(২) তুমি যদি হাস, তাহলে আমি রেখে যাব।

উপরের দুটি বাক্যে স্বাধীন খণ্ডবাক্য দুটি হল যথাক্রমে—
বারান্দা থেকে দেখলাম তাহলে আমি রেগে যাব

আর মূল বাক্য দুটির অধীন খণ্ডবাক্য দুটি হল যথাক্রমে

যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে তুমি যদি হাস

আমরা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করার সময় নানা ধরনের বাক্য করি। নানাধরনের মানে নানা ভঙ্গিতে বা নানা অর্থে সেই বাক্যগুলিকে ব্যবহার করি। দরকারমতো আমাদের বলার ধরন বা ভগ্নি বা অর্থ দলে যায়। যেমন, কখনও আমরা প্রশ্ন করি, কখনও বিস্ময় প্রকাশ করি বা উচ্ছ্বা দেখাই, আবার কখনও আদেশ ও নির্দেশের ভঙ্গিতে কথা বলি। আমাদের মনের ভাব আমাদের বাকোর তাঁর উপরই নির্ভর করে, আর যেদিক থেকে বাকাকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। নীচে সংক্ষেপে গুলির সম্পর্কে আলোচনা করা হল
১. নির্দেশক বা উত্তিবাচক বাক্য : যে বাক্যের দ্বারা কোনো বিষয় বর্ণনা করা হয়, অথবা কোনো তথ্য বা সংবাদ স্বীকার বা অস্বীকার করা হয়, তাকে বলা হয় নির্দেশক বা উক্তিবাচক বাকা। বৈশিষ্ট্য: এই বাক্যের শেষে অবশ্যই পূর্ণচ্ছেদ বা পাড়ি চিহ্ন  থাকবে। এই ধরনের বাক্যের কোনোটা সদর্থক, আবার কোনোটা নর্থক হতে পারে। যেমন—
সদর্থক বাক্য: সত্যবাদীকে সকলেই বিশ্বাস করে।
নর্থক বাক্য: আমার শরীরটা আজ ভালো নেই।

২. প্রশ্নবাচক বাক্য : যে বাক্যের সাহায্যে আমরা কোনো কিছু জানতে চাই বা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি, তাই প্রশ্নবাচক বাক্য। বৈশিষ্ট্য: প্রশ্নবাচক বাক্যের প্রাথমিক শর্ত হল প্রশ্নচিহ্ন (?)। সাধারণভাবে বাক্যের শেষে প্রশ্নচিহ্ন দেখেই বোঝা যায় যে, বাক্যটিতে প্রশ্ন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নবাক্যে প্রশ্নসূচক সর্বনাম বা অব্যয় বা বিশেষণ থাকে।
কী-কি-কেন-কোথায়:-কোন কখন—এইসব শব্দ ব্যবহারে বাক্যকে প্রশ্নবাচক করে তোলা হয়। যেমন- " তো ?" তবে কখনো-কখনো প্রশ্নচিহ্ন ছাড়াই প্রশ্নবাচক বাক্য তৈরি হতে পারে। একে বলা হয় ছদ্ম প্রশ্নবাচক বাক্য। যেমন— "সবই তো শেষ করেছ। এখন আমাকে বলে কী লাভ।" প্রশ্নবাচক বাক্য দুই প্রকার- (১) হ্যানা প্রশ্নবাচক বাক্য (যেমন তুমি যাবে কি? একেই কি বলে সভ্যতা?) (২) বস্তুগত প্রশ্নবাচক বাক্য (যেমন—তুমি কী খাবে? কোথায় যাচ্ছে এখন?)

৩. বিস্ময়বাচক বা উচ্ছ্বাসবাচক বাক্য : যে বাক্যের দ্বারা আমরা আমাদের মনের বিস্ময়, রাগ, দুঃখ, অভিমান, ভালোলাগা, মন্দলাগা ইত্যাদি আবেগ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি, তাকেই বিস্ময়বাচক বা উচ্ছ্বাসবাচক বাক্য বলে। বৈশিষ্ট্য: অনুভূতি প্রকাশ অনুযায়ী এই ধরনের বাক্য বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন ইচ্ছাবাচক বাক্য: ইস! যদি পাখির মতো হতে পারতাম! আবেগবাচক বাক্য: মরি মরি! এ কী অপরূপ দৃশ্য! সন্দেহবাচক বাক্য: হয়তো এবার গরমের ছুটিতে বেড়াতে যাব! শর্তবাচক বাক্য: মন দিয়ে না পড়লে ভালো ফল হয় না।

৪. অনুজ্ঞবিতিক বাক্য : যে বাক্যে শ্রোতাকে আদেশ, হুকুম, উপদেশ, অনুরোধ, অনুনয়, নির্দেশ ইত্যাদির কোনো-একটি করা হয়, তাকে বলে অনুজ্ঞাবাচক বাক্য ।

বৈশিষ্ট্য: এই ধরনের বাক্যের অনুজ্ঞামূলক ক্রিয়াটি শুধুমাত্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের জন্যই প্রযোজ্য। আর সেক্ষেত্রে অনুজ্ঞামূলক ক্লিয়ার কর্তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধ্যম পুরুষ হয়। যেমন—তুমি, তুই, আপনি, তোমরা ইত্যাদি। কিছুক্ষেত্রে প্রথম পুরুষও অনুজ্ঞাবাচক বাক্যের কর্তা হয়। যেমন— সে, তারা, কেউ কেউ ইত্যাদি। যাই হোক, অনুজ্ঞামূলক ক্রিয়ার কালের উপর নির্ভর করেই অনুজ্ঞাবাচক বাক্য দু-ধরনের হয়। যেমন—

বর্তমান অনুজ্ঞা: তুমি একটা গান করো তো। ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা: কাল একবার কলকাতায় এসো।

বাক্য হল কতকগুলি ব্যাকরণগত উপাদান দিয়ে গঠিত ভাষার বৃহত্তম স্বয়ংসম্পূর্ণ একক। এই বাক্যের উপাদানগুলিকে চিহ্নিত করাই হল বাক্যের বিশ্লেষণ।
প্রথাগত ব্যাকরণে বাক্যের প্রধান দুটি উপাদানের কথা বলা হয়— (১) উদ্দেশ্য এবং (২) বিধেয় ।

(১) আমি বাংলা সাহিত্য পড়তে ভালোবাসি ।

(২) আমার বাবাও ভালোবাসেন।

উপরে বাক্যের উদাহরণ দুটি থেকে দেখা যাচ্ছে, বাক্যের উদ্দেশ্য এবং বিধেয় এক বা একাধিক পদ নিয়ে গঠিত হতে পারে। সেই সঙ্গে এও বোঝা যাচ্ছে যে, বাক্যে যার সম্বন্ধে কিছু বলা হচ্ছে, সেই পদ বা পদসমষ্টি উদ্দেশ্য অংশে আছে, যেমন—'আমি' ও 'আমার বাবাও। আর এই উদ্দেশ্যগুলি সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা আছে বিধেয় অংশে, যেমন— বাংলা সাহিত্য পড়তে ভালোবাসি' এবং 'ভালোবাসেন' |

কিন্তু আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, বাক্যের এই পুরোনো উদ্দেশ্য-বিধেয় বিভাজন পদ্ধতি অনেকসময়ই বাক্য বিশ্লেষণে ঠিকমতো সাহায্য করে না। বাক্যের অন্তর্গত পদগুলোর সংস্থান ও বাক্যের বিভিন্ন পদের পারস্পরিক সম্পর্কও এতে ধরা পড়ে না। এই জন্য এখন বাকাকে 'বিশেষাখণ্ড' বা 'কর্তা' (Noun phrase) এবং 'ক্রিয়াখণ্ড' (Verb) phrase)—এই দুটি অংশে ভেঙে বিশ্লেষণ করার চল শুরু হয়েছে।

বাক্যের 'কর্তাখণ্ডে' থাকে বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, সর্বনামীয় বিশেষা, নির্দেশক, বিভক্তি ও প্রত্যয়। তবে কোনো একটি বাক্যে কর্তাখণ্ডের এইসব উপাদান একসঙ্গে থাকবে এমন কোনো নিয়ম নেই।

অন্যদিকে, বাক্যের ক্রিয়াখণ্ডের' মূল উপাদান হল ক্রিয়াপদ। আর সঙ্গে থাকতে পারে স্থানবাচক ও কালবাচক ক্রিয়াবিশেষণ, গৌণকর্ম ও মুখ্যকর্ম। এই ক্রিয়াখণ্ডের আবার দুটি ভাগ। যার একদিকে থাকে একটি বিশেষ্যখণ্ড। এই বিশেষ্যখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে অসমাপিকা ক্রিয়া ক্রিয়াখণ্ডের অন্য বা মূল উপাদানটি হলো সমাপিকা ক্রিয়া। নীচের একটি বাক্যে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানসম্মতভাবে বাক্য বিশ্লেষণের উদাহরণ দেওয়া হল— "আমরা কাল ফুটবল খেলতে মণ্ডলপাড়ায় যাব।”

গঠন অনুসারে বাক্যকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হল সরল বাকা,যৌগিক বাক্য এবং জটিল বাক্য ।

দৃষ্টান্তঃ

১। সরল বাক্য: এসব কথা শুনে উচ্ছব বুকে বল পায়।

২। যৌগিক বাক্য: উচ্ছব এসব কথা শোনে এবং বুকে বল পায়।

৩।জটিল বাক্য: যখন উচ্ছব এসব কথা শোনে তখন সে বুকে বল পায়।

ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় বাক্যে পদের সঙ্গে পদের সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের সৌজন্যে জোটবদ্ধ হয়ে একাধিক পদ কীভাবে একটা বাক্য তৈরি করে—সেই প্রক্রিয়ার নানান দিক ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে বলে বাক্যতত্ত্ব । , জেনিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেদিনা দ্য সোস্যুর (১৮৫৭-১৯১৩) | বিশ শতকের গোড়ায় বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানচর্চায় বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেন। ভাষাবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সোস্যুর প্রথম ধরিয়ে দেন যে, ভাষার খন্ড খন্ড উপাদান মিলে যে অখন্ড রূপের সৃষ্টি হয়, সেই অখণ্ড রূপেই ভাষার সামগ্রিক তাৎপর্য রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে ভাষাখণ্ডগুলি সার্থকতাহীন। ভাষা-বিশ্লেষণে এই অখণ্ড ভাষাদৃষ্টির প্রতিষ্ঠাই সোস্যুরের মৌলিকতম অবদান।

ভাষাবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সোস্যুরের বিগ্রহী-প্রতিগ্রাহী (সিনট্যাগম্যাটিক— প্যারাডিগম্যাটিক) সম্পর্কটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ভাষাবিশ্লেষণ করতে। গেলে দেখা দরকার উপাদানগুলো কোন সম্পর্কে অবস্থান করছে। বাক্যের মধ্যে উপাদানগুলো যদি পরপর অবস্থান করে, তবে তারা বিগ্রহী সম্পর্কযুক্ত। বিগ্রহী প্রকৃতপক্ষে অনুভূমিক অক্ষ। অন্যদিকে, প্রতিগ্রাহী সম্পর্ক হল উল্লম্ব অক্ষ। বাক্যে একটা বিকল্পকে অন্য একটা বিকল্প দিয়ে পরিবর্তন করলে তার বিগ্রহী ক্রমেও পরিবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নোয়াম চমক্কি তাঁর সংবর্তনী-সঞ্জননী (বা রূপান্তরমূলক-সৃজনমূলক) (Transformational Generative) ব্যাকরণ সোনারেরই উত্তরাধিকার।

গঠনগত দিক থেকে বাক্য তিনপ্রকার—সরল বাক্য, জটিল বাক্য এবং যৌগিক বাক্য।

সরল বাক্য উপস্থিত বা উহা একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া দ্বারা যে বাক্য তৈরি হয়, তা-ই সরল বাক্য (Simple sentence) | আমার নাম রাম। আমি বাড়ি গিয়ে তোমাকে ফোন করব। প্রথম বাক্যটিতে হয় সমাপিকা ক্রিয়া উহা আছে। আর দ্বিতীয় বাক্যটিতে 'দিয়ে' এবং 'ফোন দরব'--এই দুই ক্রিয়া থাকলেও দ্বিতীয়টিই কেবল সমাপিকা ক্রিয়া। তাই ও দুটিই সরল বাক্য।

'হওয়া' বা 'থাকা' ক্রিয়ার অতীত বা বর্তমান কালের রূপগুলি সমাপিকা ক্রিয়া হলেও অনেক সময় সরল বাক্যে এগুলি উহ্য থাকতে পারে। সরল বাক্যে অসমাপিকা ক্রিয়া নাও থাকতে পারে, আবার এক বা একাধিকও থাকতে পারে। আর, সরল বাক্যের কর্তা উহ্য থাকতে পারে। যেমন, “ওকে কথাটা বলো।” আবার, সংযুক্ত বিশেষ্য অর্থাৎ অব্যয় দ্বারা বিভক্ত বা অব্যয়হীন পদগুচ্ছও সরল বাক্যের কর্তা হতে পারে। যেমন—“তর্পণ ও স্মৃতি দুই ভাইবোন।” “রাম, লক্ষ্মণ, সীতা বলে গেলেন।” প্রথম উদাহরণটি 'ও' অব্যয়যুক্ত হলেও দ্বিতীয়টি অব্যয়হীন।

বাক্যকে ধাপে ধাপে ক্রমশ বড়ো থেকে ছোটো উপাদানে ভাগ করা হয় বাক্যবিশ্লেষণ করতে গিয়ে। বাক্য, উপবাক্য (Clause), পদগুচ্ছ (Phrase) কে আমরা যদি একাধিক বৃহত্তম, অর্থপূর্ণ উপাদানে ক্রমশ ভাগ করি, তবে সেই ভাগগুলিকে বলা হয় বাক্যের 'অব্যবহিত উপাদান' (Immediate Constituent)। যেমন— “আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম, তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন।” এই বৃহৎ বাক্যটিকে যে দুটি অব্যবহিত উপাদানে

ভাগ করা যায়, তা হল

((১) আমরা যখন ফুটবল খেলছিলাম (২) তখন বাইচুং দর্শকাসনে বসেছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে এই দুই অব্যবহিত উপাদান এক একটি উপবাক্য। এবার (২) নম্বর উপবাক্যটি তথা অব্যবহিত উপাদানটি বিশ্লেষণ করলে আমরা যে দুটি অব্যবহিত উপাদান পাই, তা হল বাইচুং তখন দর্শকাসনে বসেছিলেন। ওপরের অংশ দুটিও অব্যবহিত উপাদান। তবে তা সমগ্র বাক্যের নয়, উপবাক্যের অব্যবহিত উপাদান। দ্বিতীয় অব্যবহিত উপাদানকে ( তখন দর্শকাসনে বসেছিলেন) আবার (১) তখন, (২) দর্শকাসনে (৩) বসেছিলেন—এই তিনটি অব্যবহিত উপাদানে ভাগ করা যায়। লেওনার্দ ব্লুমফিল্ড বলেন যে, বাক্য যদি পদ-পরম্পরা হয়, তবে বাক্যের অন্তর্গত পদগুলির অন্বয়ের প্রকৃতিও নির্দেশ করতে পারে তার অব্যবহিত উপাদান। পারস্পরিক জোটও তৈরি করে।

বাক্যের গঠন (construction)-এর প্রকৃতি দুই প্রকার— (১) অন্তর্মুখী গঠন বা অন্তঃকেন্দ্রিক গঠন (Endocentric Construction) এবং (২) বহির্মুখী গঠন বা বহিঃকেন্দ্রিক গঠন (Exocentric Construction) |

১. অন্তর্মুখী সংগঠন: যে গঠন (অর্থসম্বন্ধযুক্ত পদসমষ্টি)-এর অন্তর্গত এক বা একাধিক পদ সেই গোটা গঠনটির পরিবর্তে বসলেও বাক্যটি ব্যাকরণগতভাবে নির্ভুল হয়, সেই গঠনকে বলে অন্তর্মুখী গঠন।

যেমন—“লাল বাড়িতে আমি থাকি।”—এই বাক্যে 'লাল বাড়িতে একটি গঠন। এই গঠন-এর অন্তর্গত 'বাড়িতে' পদটি 'লাল বাড়িতে'র বদলে যদি ব্যবহার করি, তবে বাক্যটি কিন্তু ব্যাকরণগতভাবে ভুল হবে না। আবার, 'লাল বাড়িতে' গঠন-এর 'লাল'— এই বর্ধক (subordinate) অংশ-এর পরিবর্তে 'লাল পাকা' অংশও ব্যবহার করা যায় ব্যাকরণসম্মতভাবে তা-ই অন্তর্মুখী সংগঠন জোট গঠন করে। বাক্যতাত্ত্বিকভাবে বর্ধক-সহ মাথা (Head) (যেমন বাড়িতে) এবং কেবলমাত্র মাথা-এর গুরুত্ব এক। অন্তর্মুখী সংগঠনের উদাহরণ হল বিশেষ্যজোট, ক্রিয়াজোট।

অন্তর্মুখী সংগঠক দুই প্রকার—(১) অধীনস্থ বা অধীনতাজ্ঞাপক Sub-ordinative) এবং (২) যৌগিক বা সমানাধিকারজ্ঞাপক (Co >rdinative)। যখন কোনো অন্তর্মুখী গঠন-এর অন্তর্গত উপাদানগুলির একটি প্রধান, অন্যটি তার অধীনস্থ উপাদান, তখন তাকে বলে অধীনস্থ গঠন। যেমন—'লাল বাড়িতে' হল অধীনস্থ গঠন। এক্ষেত্রে একটি মাত্র বর্ধক-সহ থাকে আবার, যখন কোনো অন্তর্মুখী গঠন-এর অন্তর্গত উপাদানগুলি সমগুরুত্বসম্পন্ন, তখন তা যৌগিক গঠন। এই ঠনে একাধিক মাথা থাকে। যেমন—“ শচীন ও সৌরভ ওপেন রছে।” বাক্যের ‘শচীন ও সৌরভ' হল যৌগিক গঠন |

হির্মুখী সংগঠন: যে গঠন-এর অন্তর্গত এক বা একাধিক পদ সেই পাটা গঠনটির পরিবর্তে বসলে বাক্যটি ব্যাকরণগতভাবে ভুল বাক্য য়ে যায়, তাকে বলে বহির্মুখী গঠন। যেমন—“আমি যাব।” এই ক্যটি অথবা “বাড়িটার সামনে আমি থাকি” বাক্যের 'বাড়িটার মনে' গঠনটি। বাক্যটিতে দুটি মাথা থাকলেও গঠনটিতে মাথা াড়িটার’ নয়, ‘সামনে’ এই দুই ক্ষেত্রেই কোনো পরিবর্তন ঘটালে বাক্য ট অশুদ্ধ বাক্য হয়ে পড়বে। দুই পদের সরল বাক্য বা অনুসর্গ জোট ইর্মুখী গঠন-এর উদাহরণ।

বাক্যের প্রধান চারটি জোট বা গুচ্ছ হল- (১) বিশেষ্যজে (২) অনুসর্গজোট, (৩) ক্রিয়াজোট এবং (৪) ক্রিয়াবিশেষণজোট |

১. বিশেষ্যজোট: বিশেষ্যজোট বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ ঘিরে জোট বেঁধে কর্তা, কর্ম ইত্যাদির ভূমিকা পালন করে। এই জোটে বিশেষণ অসমাপিকা ক্রিয়া, ক্রিয়া-বিশেষ্য ইত্যাদি পদবর্ধক হিসেবে থাকে। যেমন—একদল ছাত্র বেরিয়ে গেল। ভাগীরথীতে নৌকাডুবি হওয়ার ঘটনাটা আমাকে ভাবাচ্ছে। আমাকে এখন চলে যেতে বলছ?

২. অনুসর্গজোট : একপদী বা বহুপদী বিশেষ্য-সহ অনুসর্গ দিয়ে তৈরি হয় অনুসর্গ জোট। যেমন—বড়ো পুকুরের পাশে ক্লাবঘর তৈরি হয়েছে। শচীন আর সৌরভকে দিয়ে ওপেন করাতে হবে।

৩. ক্রিয়াজোট: ক্রিয়াজোট একপদী এবং বহুপদী—এই দুরকমই হতে পারে। একপদী ক্রিয়াজোটের উদাহরণ হল—তুমি তখন খাচ্ছিলেন। এক্ষেত্রে ‘খা' ধাতুর সঙ্গে ‘চ্ছ" প্রকার বিভক্তি, ‘ইল্’ কাল বিভক্তি এবং 'এ' পুরুষ বিভক্তি যুক্ত হয়েছে। এই বিভক্তিগুলিকে সহচর বা দিশারী বলা হয়। বহুপদী ক্রিয়াজোট তিনপ্রকার—(১) যুক্ত ক্রিয়াজের (যেমন—মাথাটা ব্যবহার করো।) (২) যুক্ত-যৌগিক ক্রিয়াজের (যেমন—ও হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।) (৩) যুগ্ম ক্রিয়াজোট বা যৌগিক ক্রিয়াজোট (যেমন— আমি উঠে পড়লাম। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় ক্রিয়া আপতভাবে অর্থহীন এবং প্রথম ক্রিয়ার অর্থ দ্বিতীয় ক্রিয়াকে। উসকে দেয়।

৪. ক্রিয়াবিশেষণজোট: এই জোট ক্রিয়াপদ ও বিশেষণপদকে বিশেষিত করে। সাধারণত সময়, স্থান, প্রকার, কারণ, প্রকৃতি বোঝাতে জোট ব্যবহৃত হয়। যেমন— ছেলেটা ভালো খেলছে। ছেলেটি প্রাণ বাজি রেখে দৌড়চ্ছে। এমন করে বোলো না। বানানটা বার বার লেখো।