Chapter-17, শব্দার্থতত্ত্ব

কোনো শব্দ যখন তার ব্যুৎপত্তিগত অর্থে অর্থাৎ আদি অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে অন্য কোনো উন্নত অর্থে প্রচলিত হয়ে যায়, তখন তাকে বলা হয়। শব্দার্থের উৎকর্ষ বা শব্দার্থের উন্নতি। যেমন 'সম্ভ্রান্ত' শব্দের আদি অর্থ " সমাকরূপে ভ্রান্ত', কিন্তু প্রচলিত অর্থ 'মর্যাদাসম্পন্ন'।

শব্দ যখন তার আদি বা ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে, অন্য কোনো অবনত বা নিম্নমানের অর্থে প্রচলিত হয়, তখন তাকে বলে শব্দার্থের অপকর্ষ বা শব্দার্থের অবনতি। যেমন— 'মহাজন' শব্দের আদি অর্থ 'মহৎ ব্যক্তি, কিন্তু প্রচলিত অর্থ "সুদখোর ঋণদাতা"।

'মুনিশ' (< মনুষ্য) শব্দটির আদি ও পরিবর্তিত অর্থ যথাক্রমে 'মানুষ' ও মজুর'। তাই এটি শব্দার্থের সংকোচ।

'সন্দেশ' শব্দের আদি অর্থ 'সংবাদ' এবং বর্তমান অর্থ মিষ্টান্ন-বিশেষ। 'পাষণ্ড' শব্দের আদি অর্থ 'বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী' এবং প্রচলিত অর্থ "পাপী"।

'থিসরাস' শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল রত্নাগার।

পিটার মার্ক রজেট (Peter Mark Roget) ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে মিসরাস রচনা ও সংকলন করলেও তা প্রকাশিত হয় ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে।

একটি বাংলা থিসরাস হল, অশোক মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ও সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত ‘সমার্থ শব্দকোষ'।

শব্দের অর্থ ও তার প্রয়োগের তত্ত্ব বিশ্লেষণের প্রকৃতি অনুসারে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের তিনটি তাত্ত্বিক ধারণা হল— (১) উপাদানমূলক তত্ত্ব, (২) সত্যসাপেক্ষ তত্ত্ব এবং (৩) বিষয়মূলক তত্ত্ব।

যখন আমরা কোনো বাক্যকে সত্য বলে জ্ঞান করি বা বাস্তব সত্যের ভিত্তিতে রচিত বলে মনে করি, তখন সেই বাক্যের অন্তর্গত শব্দগুলি সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একটি অর্থের বোধ গড়ে ওঠে। এটাই হল সত্যসাপেক্ষ তত্ত্বের কথা।

শব্দের মূর্ত প্রতিরূপ ছাড়াও তার সাধারণ ধর্মটিকে কল্পনা করাই হল উপাদানমূলক তত্ত্বের দার্শনিক ভিত্তি ।

শব্দের অর্থ দু-রকম হতে পারে (১) সুস্পষ্ট নির্দিষ্ট অভিধানিক অর্থ বা মুখ্য অর্থ। (২) মুখ্য অর্থ থেকে জাত আলংকারিক ব্যবহারে প্রযুক্ত গৌণ অর্থ বা ব্যাঙ্গা।

শব্দের সঙ্গে শব্দের যে অর্থ সম্পর্ক তা মূলত তিনটি রূপে হতে পারে। এগুলি হল— (১) সমার্থকতা, (২) বিপরীতার্থকতা এবং (৩) ব্যাপকার্যকতা।

সমান অসমান, জয়-পরাজয়, আদর-অনাদর ইত্যাদি শব্দজোড়ের মধ্যে গঠনগত সাদৃশ্য আছে, অথচ অর্থের দিক থেকে এরা একে অন্যের বিপরীত।

বক্তার কখনভঙ্গি ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে তার বক্তব্যকে বুঝতে পারার ক্ষমতা অর্জনই প্রয়োগবাদের মূল উদ্দেশ্য।

শব্দার্থতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় মানবভাষায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দের অর্থ এবং তার ক্রিয়াকর্ম।

শব্দার্থকে সাধারণ এবং নিদর্শন— এই দুইভাগে ভাগ করা যায়।

সাধারণ শব্দার্থ বলতে শব্দের প্রকৃত অর্থ অর্থাৎ অভিধানগত অর্থকেই বোঝায়।

কোনো বিশেষ শব্দ এবং শব্দটি যে-বিশেষ বস্তুর নির্দেশকারী, তার মধ্যেকার সম্পর্ককে বলা হয় নির্দেশন। স্বাভাবিকভাবেই সব শব্দের নির্দেশন থাকে না।

সময়ের সঙ্গে ভাষার শব্দার্থের পরিবর্তন যে শব্দার্থতত্ত্বে আলোচিত হয়, তাকে বলে ঐতিহাসিক শব্দার্থতত্ত্ব।

স্বতন্ত্র শব্দের অর্থবিশ্লেষণ এবং একাধিক শব্দের অর্থভিত্তিক সম্পর্ক যে শব্দার্থতত্ত্বে আলোচিত হয়, তা শব্দভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব।

ভাষার অর্থের ওপর তার প্রসঙ্গের প্রভাব আলোচিত হয়। যে শব্দার্থতত্ত্বে, তাকে বলে প্রয়োগমূলক শব্দার্থতত্ত্ব বা প্রয়োগতত্ব।

 

কোনো শব্দের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানগুলিকে বিশ্লেষণ করে সেই শব্দ এবং অন্যান্য শব্দের সঙ্গে তার সম্পর্কের যথাযথ ধারণা পাওয়া যায় যে শব্দার্থতত্ত্বে, তাই-ই উপাদানমূলক শব্দার্থতত্ত্ব।

শব্দের অর্থ আলোচনা করার সময় শব্দের অর্থকে ভেঙে যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অর্থ উপাদানে ভাগ করা হয়, তার প্রতিটিই হল শব্দার্থ উপাদান বা শব্দার্থগত বিষয়শ্রেণি।

বিষয়মূলক শব্দার্থতত্ত্বের মূল বিষয় হল ভাষার অর্থের আলোচনার ক্ষেত্রে তার প্রসঙ্গ বা পরিপ্রেক্ষিতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একাধিক নন্দের মধ্যে অর্থগত অভিজ্ঞতা বা সাদৃশ্য থাকলে, সেই শব্দগুলিকে একসঙ্গে সমার্থক শব্দ বলা হয়। যেমন—চোখ, চক্ষু, নয়ন ।

দুটি শব্দের মধ্যে অর্থের বৈপরীত্য থাকলে তাদের একসঙ্গে বিপরীতার্থক শব্দ বলা হয়। যেমন— দিন-রাত, ভালো-মন্দ।

নেতিবাচক উপসর্গ যোগে (যেমন—বৃষ্টি-অনাবৃষ্টি), ইতিবাচক ও নেতিবাচক উপসর্গযোগে (যেমন— সচল-অচল) এবং স্বতন্ত্র শব্দপ্রয়োগে (যেমন—ভালো-মন্দ) বিপরীতার্থক শব্দ সৃষ্টি হয়।

কোনো শব্দের মধ্যে অন্য একাধিক শব্দের অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকলে তাকে বলা হয় ব্যাপকার্থকতা বা অর্থান্তরভুক্তি।

ব্যাপকার্থকতা বা অর্থান্তরভুক্তি তত্ত্বে বাঁদিকে থাকা ব্যাপকতর অর্থযুক্ত শব্দগুলিকে অধিনাম এবং ডানদিকের ক্ষুদ্রতর অর্থযুক্ত শব্দগুলিকে উপনাম বলা হয়।

একটি সংস্কৃত থিসরাসের উদাহরণ হল 'অমরকোষ'।

সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার ভাষা এবং অন্যান্য বচনের অর্থের ওপর যে প্রভাব ফেলে, তা-ই প্রয়োগতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

নির্দেশক ভাবের বাক্য সত্যসাপেক্ষ তত্ত্বের দ্বারা নিরূপিত হয়, আর অনুজ্ঞা ভাবের বাক্য প্রয়োগতত্ত্বের দ্বারা নিরূপিত হয়।

শব্দার্থ পরিবর্তনকে শব্দার্থের প্রসার, শব্দার্থের সংকোচ এবং লেদার্থের রূপান্তর—এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

: সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শব্দের পূর্বতন অর্থের সাথে নতুন অর্থ যুক্ত হলে তাকে বলে অর্থের বিস্তার বা প্রসার। যেমন—'পরণ' শব্দের অর্থ (পেরণ) আগামীকালের পরদিন ছিল, কিন্তু পরে গতকালের আগের দিনা যুক্ত হয় এই অর্থের সঙ্গে।

কোনো শব্দের অর্থ-পরিবর্তনে আদি অর্থের সঙ্গে পরিবর্তিত  অর্থের কোনো যোগসূত্র পাওয়া না গেলে তাকে বলে শব্দার্থের রূপান্তর। যেন 'দারুণ'-এর শব্দের আদি অর্থ 'কাঠনির্মিত হলেও বর্তমান অর্থ 'অন্ত'।

দুটি শাখা হল — ঐতিহাসিক পদা শব্দভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব।

মিসরাস হল শব্দার্থের এমন এক রেফারেন্স বই, যেখানে এই সম্পর্কযুক্ত (সমার্থক বা বিপরীতার্থক) শব্দগুলিকে বর্ণানুক্রমে তালিকাখ করা হয়।

'লন্দার্থের রূপান্তর'-এর অন্য নাম হল শব্দার্থ সংশ্লেষ বা শব্দার্থের আমূল পরিবর্তন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের অর্থের যে পরিবর্তন ঘটে, তাকেই বলা হয় শব্দার্থের পরিবর্তন।

'দারুণ' শব্দের আদি অর্থাত্ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ 'কাষ্ঠনির্মিত। এর অর্থ প্রসারণের ফলে হয় কাষ্ঠনির্মিত বস্তুর মতো শতা এবং তারপর হয় "অত্যন্ত শক্ত'। এরপর অর্থ সংকোচনের ফলে প্রচলিত অর্থ দাঁড়ায় অবান ।

'সহসা' শব্দের আদি বা ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল “সবলে'। এরপর অম প্রসারিত হয়ে দাঁড়ায় 'সবলে এবং চিন্তাহীনভাবে। তারপর আরও প্রসারিত হয়ে দাঁড়ায় সরলে এবং চিন্তাহীনভাবে বা আকস্মিকভাবে। এরপর অ্য সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় 'আকস্মিকভাবে'।

উপাদানমূলক শব্দার্থতত্ত্ব শব্দের স্বাভাবিক শ্রেণি-নির্ধারণে আলোচনায় এবং বিন্যাসের আলোচনায় বিশেষভাবে উপাযোগী।

সমার্থক শব্দগুলির মধ্যে তৎসম-অতৎসম শব্দভেদে (যেমন— পাখি), মান্য-আঞ্চলিক শব্দভেদে (যেমন— জল-পানি) এবং ব্যাবহারিক কাব্যিক শব্দভেদে (যেমন—আনন্দ হরষ) পার্থক্য দেখা যায়।

আবশ্যক-অনাবশ্যক (অন), কারণ-অকারণ (অ)-এই দুটি হল নেতিবাচক উপসর্গযোগে বিপরীতার্থক শব্দসৃষ্টির উদাহরণ।

ইতিবাচক ও নেতিবাচক উপসর্গযোগে সৃষ্ট দুটি বিপরীতার্থ শব্দজোড়ের উদাহরণ হল – সক্ষম (স) অক্ষম (অ), সঠিক (স)-বেতিক (বে)।

সম্পূর্ণ নতুন শব্দযোগে তৈরি দুটি বিপরীতার্থক শব্দের উদাহনা হল—সুখ-দুঃখ এবং ভালো-মন্দ।

শব্দার্থ পরিবর্তনের প্রধান তিনপ্রকার ধারা আছে। সেগুন - (১) শব্দার্থের প্রসার (২) শব্দার্থের সংকোচ এবং (৩) শব্দার্থের রূপান্তর। নীচে শব্দার্থের প্রসার এবং শব্দার্থের রূপান্তর— এই দুটি ধারার উদাহরণসহ পরিচয় দেওয়া হল।

শব্দার্থের প্রসার: কোনো শব্দ যদি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার আদি অর্থ অপেক্ষা ব্যাপকতর অর্থ লাভ করে, তখন তাকে শব্দার্থের প্রসার বা অর্থের প্রসার বলা হয়। গাও' শব্দের আদি অর্থ ছিল “গঙ্গা', কিন্তু পরবর্তীকালে এর অর্থ হয়েছে, "যে-কোনো নদী'। 'তৈল' শব্দের মৌলিক অর্থ ছিল "তিলের নির্যাস, কিন্তু এখন 'তৈল' বলতে বোঝায় যে-কোনো তেল'। ওপরের দুটি উদাহর শব্দের অর্থের প্রসার ঘটেছে। এ দুটি তাই শন্দার্থের প্রসার এর উদাহরণ।

শব্দার্থের রূপান্তর: কোনো শব্দের আদি অর্থের সঙ্গে পরিবর্তিত নতুন অর্থের কোনো যোগসূত্র যদি পাওয়া না যায়, তবে সেই শব্দার্থ পরিবর্তনকে বলে শব্দার্থের রূপান্তর বা অর্থসংক্রম।

পামত' শব্দের মৌলিক অর্থ 'ধর্ম-সম্প্রদায়', পরবর্তী প্রসারিত অর্থ হল অন্য ধর্ম-সম্প্রদায়', তার পরবর্তী অর্থ বিরুদ্ধ ধর্ম-সম্প্রদায়" | "পাষণ্ড" শব্দের (বর্তমান অর্থ হল 'অত্যাচারী'। 'পাত্র' নন্দের মূল অর্থ "পান করার আধার", পরবর্তী অর্থ 'কন্যা সম্প্রদানের আধার', বর্তমান অর্থ 'বর। ওপরের এই দৃষ্টি ক্ষেত্রে মৌলিক এবং বর্তমান অর্থের যোগসূত্র দুর্লক্ষ্য বলে ঐ দুটি শব্দার্থের রূপান্তরের উদাহরণ।

শব্দার্থ পরিবর্তনের প্রধান তিনপ্রকার ধারা আছে। সেগুন - (১) শব্দার্থের প্রসার (২) শব্দার্থের সংকোচ এবং (৩) শব্দার্থের রূপান্তর। নীচে শব্দার্থের প্রসার এবং শব্দার্থের রূপান্তর— এই দুটি ধারার উদাহরণসহ পরিচয় দেওয়া হল।

শব্দার্থের প্রসার: কোনো শব্দ যদি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার আদি অর্থ অপেক্ষা ব্যাপকতর অর্থ লাভ করে, তখন তাকে শব্দার্থের প্রসার বা অর্থের প্রসার বলা হয়। গাও' শব্দের আদি অর্থ ছিল “গঙ্গা', কিন্তু পরবর্তীকালে এর অর্থ হয়েছে, "যে-কোনো নদী'। 'তৈল' শব্দের মৌলিক অর্থ ছিল "তিলের নির্যাস, কিন্তু এখন 'তৈল' বলতে বোঝায় যে-কোনো তেল'। ওপরের দুটি উদাহর শব্দের অর্থের প্রসার ঘটেছে। এ দুটি তাই শন্দার্থের প্রসার এর উদাহরণ।

শব্দার্থের রূপান্তর: কোনো শব্দের আদি অর্থের সঙ্গে পরিবর্তিত নতুন অর্থের কোনো যোগসূত্র যদি পাওয়া না যায়, তবে সেই শব্দার্থ পরিবর্তনকে বলে শব্দার্থের রূপান্তর বা অর্থসংক্রম।

পামত' শব্দের মৌলিক অর্থ 'ধর্ম-সম্প্রদায়', পরবর্তী প্রসারিত অর্থ হল অন্য ধর্ম-সম্প্রদায়', তার পরবর্তী অর্থ বিরুদ্ধ ধর্ম-সম্প্রদায়" | "পাষণ্ড" শব্দের (বর্তমান অর্থ হল 'অত্যাচারী'। 'পাত্র' নন্দের মূল অর্থ "পান করার আধার", পরবর্তী অর্থ 'কন্যা সম্প্রদানের আধার', বর্তমান অর্থ 'বর। ওপরের এই দৃষ্টি ক্ষেত্রে মৌলিক এবং বর্তমান অর্থের যোগসূত্র দুর্লক্ষ্য বলে ঐ দুটি শব্দার্থের রূপান্তরের উদাহরণ।

ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় ভাষার ভেতরকার ভাব বা অর্থ (Content Aspect সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে বলা হয় শব্দার্থতত্ত্ব (Semantics)। শব্দার্থতত্ব অধ্যায়ে মানবভাষায় ব্যবহৃত পদাবলির অর্থ এব কার্যকারিতা আলোচিত হয়। সাধারণত শব্দার্থ' বলতে আমরা বুঝি এক শব্দের সঙ্গে আর-এক শব্দ বা শব্দগুচ্ছের সম্পর্ক। অবশ্য শব্দার্থতত্ত্বে একটি শব্দ একটি অর্থ ছাড়াও আরও বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন সর্দির জন্য নাক দিয়ে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ওকে দেখে নাক বাঁকাচ্ছ কেন? সব ব্যাপারে নাক গলিও না। তোমার মতো নাক কাটা লোক আমি আর দেখিনি। ওপরের বাক্য চারটিতে 'নাক' শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম বাক্যে 'নাক' শব্দটি শব্দার্থের অর্থে ব্যবহৃত হলেও বাকি তিনটি বাক্যে প্রসঙ্গত বা বিষয়গত অর্থ (Contextual Meaning) নানারকম। এইভাবে একটি শব্দের যেমন বিভিন্ন ভাবে বা বিষয়ে বা প্রসঙ্গে বিবিধ অর্থ হতে পারে, তেমনই কালডেদেও একটি শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন "মন্দির' শব্দের আদি অর্থ হল গৃহ বা ঘর, কিন্তু বর্তমানে মন্দির বলতে দেবালয়কেই বোঝানো হয়।

শব্দার্থতত্ত্ব শুধু শব্দের অর্থের আলোচনাতেই শেষ নয়। মানুষের ব্যবহৃত ভাষার যে-কোনো অর্থযুক্ত অংশই এই বিষয়ের অন্তর্গত। অর্থাৎ শব্দার্থতত্ত্বে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শব্দ, উপসর্গ, অনুসর্গ, বিভক্তি, প্রতায় ইত্যাদি যেমন আলোচ্য বিষয়, তেমনই এই বিষয়ের অন্তর্গত হল কোনো বাক্যের অর্থ বা একাধিক বাক্যে নির্মিত কোনো বচন বা উত্তির অর্থের আলোচনা। তাই, মানবভাষায় উচ্চারিত, অর্থযুক্ত যে-কোনো বিষয়ই শব্দার্থতত্ত্বের আলোচ্য।

কোনো শব্দ সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা পেতে এবং তার সঙ্গে অন্যান্য শব্দের যথার্থ সম্পর্ক খুঁজে পেতে শব্দটিকে ভেঙে তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অর্থপূর্ণ অংশকে বিশ্লেষণ করতে হয়। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শব্দার্থ-উপাদানকে 'শব্দাধগত বিষয়শ্রেণি' বা 'শব্দার্থ উপাদান' বলা হয়। শব্দার্থের উপাদানমূলক তত্ত্বে শব্দের 'শব্দার্থ উপাদানগুলিকে নির্ণয় করে সেইসব উপাদানের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শব্দকে কতকগুলি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। যেমন—

পুরুষ: বৃষ, মোরগ নারী: গাভি, মুরগি

শিশু : : বাছুর, মোরগছানা

ওপরের শব্দগুলির মধ্যে নারী-শিশু, গাড়ি বাছুর এবং মুরগি-মোরগছানার মধ্যেকার অর্থগত সম্পর্ক অনুরূপ। আবার পুরুষ-নারী, বৃদ্ধ-গাড়ি এবং মোরগ-মুরগির মধ্যেকার অর্থগত সম্পর্ক অনুরূপ। প্রথম পর্যায়টির (পুরুষঃ বৃষ, মোরগ) মধ্যেকার সাধারণ অর্থ-উপাদান— 'পুরুষ-জাতীয় ও প্রাপ্তবয়স্ক, দ্বিতীয় পর্যায়টির 'স্ত্রী-জাতীয় ও প্রাপ্তবয়স্ক এবং তৃতীয় পর্যায়টির 'কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক'। শব্দার্থের উপাদানমূলক তত্ত্ব অনুযায়ী এই উপাদানগুলির সমষ্টিই শব্দের অর্থের সৃষ্টি করে। ওপরের প্রথম সারির শব্দ তিনটিকেও এইভাবে কয়েকটি অর্থ-উপাদানের সমষ্টি হিসেবে দেখানো যায়

পুরুষ = + মানব জাতীয় + প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ জাতীয়

নারী = + মানব-জাতীয় + প্রাপ্তবয়স্ক - পুরুষ জাতীয় শিশু = + মানব জাতীয় প্রাপ্তবয়স

এভাবেই এই পদ্ধতিতে এই তত্ত্বের মাধ্যমে শব্দার্থ উপাদান এর পের ভিতি করে বিভিন্ন শব্দের মধ্যেকার অন্তনিহিত সাধারণ উপাদানকে শান্ত করা হয় এবং শব্দগুলিকে প্রেণিভুক্ত করা হয়। শব্দের স্বাভাবিক শ্রেণি-নির্ধারণ এবং বিন্যাসের আলোচনায় এই তত্ত্বটি বিশেষভাবে উপযোগী।

* তবে শব্দার্থের উপাদানমূলক তত্ত্বের কিছু সীমাবন্ধতাও আছে। প্রথমত, এই তত্ত্বটি সবরকম শব্দের অর্থের ব্যাখ্যায় । শব্দের শব্দার্থ উপাদান গুলি হল হয় কেবলমাত্র বহুল প্রচলিত নতুবা একেবারে নতুন। তৃতীয় বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী সর্বজনগ্রাহ্য 'শব্দার্থ উপাদান বিরল ।

ভাষাবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ডেভিডসন তাঁর Sementics of Logic (1967) গ্রন্থে শব্দার্থ বিশ্লেষণের সত্য সাপেক্ষ তত্ত্বটির কথা প্রথম বাস্ত করেন। শব্দার্থের সত্য-সাপেক্ষ তত্ত্বটির মূল কথা হচ্ছে যে, যখন আমরা কোনো বাকাকে সত্য বলে জ্ঞান করি বা বাস্তব সত্যের ভিত্তিতে রচিত বলে মনে করি, তখন সেই বাক্যের অন্তর্গত পদগুলি সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একট অর্থের বোধ গড়ে ওঠে। অর্থাৎ, এই তত্ত্বানুসারে বাক্যের সত্যাসত্যের উপরই শব্দের অর্থ নির্ভর করে। যেমন"পাহাড়ের গায়ে সাদা বরফ জমেছে।

এখন যদি উপরের বাক্যটি সত্য হয় বা বাক্যটি বাস্তব সত্যের ভিত্তিতে রচিত হয় তাহলে আমরা বরফের রং সাদা। বরফ জমে যেতে পারে। পাহাড়ে বরফ দেখা যায়। ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের সাহায্যে বরফ শব্দের অর্থটিকে সুস্পষ্টভাবেই অনুধাবন করতে পারি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, শব্দের অর্থ-বিশ্লেষণে সত্য সাপেক্ষ তত্ত্বটিকে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে ভাষার প্রাকৃতিক রূপটিকে গ্রহণ করতে হবে। অর্থাত্ ভাষায় উচ্চারিত বাক্যের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার বা বৃহত্তর বা গভীরতর সত্যের ইঙ্গিত থাকা চাই। কোনো কৃত্রিম বাক্য বা মনগড়া ভাষা দিয়ে শব্দের অর্থ বিশ্লেষণের চেষ্টা এই তত্ত্বের পরিপন্থী। যেমন— “বরফ হয় কালো।"

এই অবাস্তব বাক্যের অন্তর্গত বরফ' শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করে আমরা যদি বলি বরফ কালো রঙের হয়, তাহলে 'বরফ' এর অর্থটি বাস্তবের সঙ্গে সংগতিহীন এবং অর্থহীন হয়ে পড়ে।

শব্দের অর্থ বিশ্লেষণের তত্ত্ব হিসেবে বিষয়মূলক তত্ত্বটি বহু পুরোনো। বিখ্যাত অস্ট্রীয় দার্শনিক ডিগেনস্টাইন বলেছেন, "The meaning of a word is its use in the language: । অর্থাৎ, একটা শব্দের অর্থ বোঝা যায় ভাষায় তার প্রয়োগ প্রসঙ্গে। ভাষাবিজ্ঞানী ব্লুমফিল্ডও context বা বিষয় প্রসঙ্গের কথা বলেছেন, তবে একটু অন্যভাবে। তাঁর মতে, ভাষার বক্তব্য বিষয় থেকেই শব্দের অর্থ বোঝা যায়।এই মতের অনুসরণকারী ভাষাবিজ্ঞানীরা শব্দের অর্থ বিশ্লেষণে বির তত্ত্বটিকে বেশি গুরুত্ব দেন। আমরা জানি বোধগম্য শব্দের 'অর্থ' (a meaning) থাকা বাধ্যতামুলক। বিষয়মূলক শব্দার্থ তাত্ত্বিকদের মতে শব্দের সেই অর্থ দু-রকম হতে পারে (১) সুস্পষ্ট নির্দিষ্ট আভিধানিক অর্থ—যাকে বলা যায় মুখ্য অর্থ। (২) অর্থ থেকে জাত আলংকারিক ব্যবহারে সৃষ্ট গৌণ অর্থ বা ব্যাঙ্গার্থ। যেমন ধরা যাক, 'হাত' শব্দটির মুখ্য অর্থ মানবশরীরের একটি অঙ্গ-বিরে এটি হল 'হাত'-এর আভিধানিক অর্থ। কিন্তু যখন বলি, “ছেলেটির হাত আঁকায় হাত আছে—তখন 'হাত' শব্দের অর্থ হয় 'দক্ষতা' 'দক্ষতা' হ 'হাত'-এর গৌণ অর্থ। শব্দটি বিশেষ বিষয়ে ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ল আভিধানিক অর্থও বদলে যাচ্ছে। ক্রিয়াপদ, বিশেষণ পদেরও এরকম ভিন্নার্থক ব্যবহার হতে পারে। যেমন সভা ভাঙা, প্রতিজ্ঞা ভাঙা, ঘাড় ভাঙা, কাঁচা ইট, কাচা আম, অর্ধেক ব ইত্যাদি। অনেক সময় এই রকম কোনো কোনো শব্দের মুখ্য অর্থ লুপ্ত হয়ে গিয়ে যৌগ অর্থটাই প্রধান হয়ে ওঠে। যেমন 'ভাঙা' বা 'কাঁচা' ক্রিয়াপদের গৌণ অর্থের ব্যবহার বেশি। এক্ষেত্রে বক্তা কোন্ অর্থটা বোঝাতে চান, তা নির্ভর করে বড় এবং শ্রোতার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং মনোভাবের ওপর। এই যে শব্দের অর্থ বিশ্লেষণে এরকম বিষয়নির্ভরতা— এটাই শব্দার্থের বিষয়মূলক হচ্ছে আলোচ্য বিষয়। কিন্তু আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, আধুনিক শব্দার্থতত্ত্বে প্রসঙ্গের (Context) উল্লেখকে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। বরং প্রাধান্য দেওয়া হয় বাক্যের তথা বাক্যের অন্তর্গত শব্দের নির্মিত (অর্থকে (Sense) |

‘সমার্থকতা' শব্দের অর্থ হল অর্থের অভিন্নতা। দুই বা ততোধিক শব্দের মধ্যে অর্থগত সাদৃশ্য থাকলে সেই শব্দগুলিকে সমার্থক শব্দ বলা হয়। ভাষাবিজ্ঞানী ব্লুমফিল্ড বলেন যে, প্রতি রূপ বা শব্দের বিশেষ অর্থ আমে অর্থাৎ তাঁর মতে, ভাষাতে কোনো সমার্থক শব্দ থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা হামেশাই একটি শব্দকে অন্য শব্দের সমার্থক রূপে ব্যবহ করি। যেমন- রামরাবণে যুদ্ধ বেধেছে। বাক্যের 'যাব' শব্দটির ক আমরা সমার্থক 'লড়াই' শব্দটি ব্যবহার করতে পারি। অভিধানে মুখ ব্যাখ্যা করতে যে শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়, তারা সমার্থকতার ভিত্তিে নির্বাচিত হয়। যেমন ঝগড়া দ্বন্দ্ব, বিরোধ। জল পানি, বারি, নীর, সলিল। আনন্দ: হর্ষ, হরষ, পুলক। ছাতা ছাতি, হ পাখি: পক্ষী, বিহগ, খেচর, বিহতাম। তবে, ব্লুমফিল্ডের মতকে কিছুটা সমর্থন করে আমরা বলতে পারি যে, শব্দের অর্থ এবং এক হয় না কখনোই। সমার্থক শব্দগুলির মধ্যে সা অর্থপার্থক্য থাকেই। এই পার্থক্যটা ব্যাবহারিক পার্থক্য। যেমন, কোনো আনুষ্ঠানিক, কোনো শব্দ কাব্যিক, কোনো শব্দ তৎসম, কোনো অতৎসম, কোনো শব্দ মানা ভাষার শব্দ, কোনো শব্দ আৰু ইত্যাদি। যেমন 'আনন্দ' আনুষ্ঠানিক শব্দ হলেও 'হরম' কাব্যিক শব্দ, অতৎসম শব্দ হলেও 'পক্ষা' তৎসম শব্দ, 'জল' মান্য ভাষার শব্দ আঞ্চলিক শব্দ। তা ছাড়া, একথাও ঠিক যে সমার্থক শব্দগুলি সব প্রসঙ্গে সমার্থক ও নয়। যেমন- ছাতা হাতছাড়া কোরো না। ছত্রহীন মস্তক তপ্ত হয়। ছাতি বেচে হাতি পেল। ফলে ছাতির জায়গায় 'ছত্র' বা ছাতা ব্যবহার করা যায় না সব প্রসঙ্গে। সুতরাং সমার্থক শব্দের 'বিশেষ অবস্থান'-ও থাকে।

বিপরীতার্থকতা: দুটি শব্দের মধ্যে অর্থের বৈপরীত্য ফুটে উঠলে আমরা এক শব্দকে অন্য শব্দের বিপরীতার্থক শব্দ বলি ।
ইতিবাচক শব্দের সঙ্গে নেতিবাচক উপসর্গ যোগ করে বিপরীতার্থক শব্দ সৃষ্টি হয়। যেমন—আবশ্যক-অনাবশ্যক (অন), বৃষ্টি-অনাবৃষ্টি (অনা), কারণ অকারণ (অ)। আবার ইতিবাচক শব্দের শুরুতে ইতিবাচক উপসর্গ এবং নেতিবাচক শব্দের আগে নেতিবাচক উপসর্গ বসিয়েও বিপরীতার্থক শব্দের সৃষ্টি হয়। যেমন—সক্ষম (স)-অক্ষম (অ), সবল (স)-দুর্বল (দুঃ বা দুর), সঠিক (স)-বেঠিক (বে) সম্পূর্ণ নতুন শব্দযোগেও বিপরীতার্থক শব্দ সৃষ্টি করা হয়। যেমন—সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, উত্তর-দক্ষিণ।
ব্যাপকার্থকতা: কোনো একটি শব্দে যদি একাধিক শব্দের অর্থকে একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়, তবে সেই নির্দিষ্ট শব্দটির ব্যাপকার্যকতা হয়। এক্ষেত্রে একটি শব্দের মধ্যে একাধিক শব্দের অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই একে "অর্থান্তরভুক্তি'ও বলে। যেমন—
ফুল— গোলাপ, জুঁই, পলাশ, পদ্ম, টগর ইত্যাদি।
আসবাব— টেবিল, চেয়ার, খাট, আলমারি ইত্যাদি। পাখি—কাক, কোকিল, চড়ুই, শালিখ, দোয়েল ইত্যাদি।
ওপরের ফুল, আসবাব এবং পাখি শব্দের অর্থ ব্যাপকতর এবং প্রতিটি লাইনের ডানদিকের শব্দগুলি বাঁ দিকের ব্যাপকতর শব্দের অর্থের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

'থিসরাস' (Thesauras) (= রত্নাগার) শব্দটি (ইংরেজি) এসেছে গ্রিক শব্দ thesauros' (= ভাণ্ডার) থেকে। থিসরাস হল 'প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দের কোশল্ল্যা। সাম্প্রতিক অভিধানকারদের মতে মিসরাস হল 'জাবানুক্রমে বিন্যস্ত সমার্থ শব্দকোশ"। থিসরাস শব্দটি জনপ্রিয়তা পায় পিটার মার্ক রজেট (Peter Mark Roget) সংকলিত Thesaurus of English Language words and Phrases (1852) গ্ৰন্থসূত্রে। সংস্কৃত ভাষায় লেখা অমরকোশ বিসরাজের উদাহরণ হলেও রজেট-এর ফিসরাসই প্রথম আধুনিক সিরাজ। ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে লিখিত এই বইটিতে যাবতীয় শব্দকে কতকগুলি হচ্ছে। ভাগ করে অভিধানবস্ত্র করেছিলেন। ধরা যাক, Apple' শব্দটি কেউ। খুঁজছেন। ফলটার ছবি তার মনে আসলেও শব্দটা তাঁর মাথায় আসছে ন তখন বিসরাসে "Fruits গুচ্ছে তিনি শব্দটা পেয়ে যাবেন। বিরল সাধার অভিধানের মতো শব্দার্থ বলেই ক্ষান্ত হয় না, আবার, সাধারণ অভিধানের জন রেফারেন্স বই, যেখানে রেে করা মিসরাসে শব্দগুলি বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানোও থাকে না। বিমানে থাকে। ফলে সাধারণ অভিধানের তুনা অনেক সহজত সঙ্গে বিসরাস সম্বন্ধে রকেট এর হতবাতি প্রতিষ্ঠাদ-ে To find the word, or words, by which idea may be most fitly and aptly expressed

সম্পর্কগত প্রত্যক্ষ বা পরিমণ্ডলই অর্থের জন্য শেষ করা নয়। আসলে স শব্দ ও তার অর্থই শেষপর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে উদ্ভাবিত হয়। রূপান্তর ও সৃজনমূলক ব্যাকরণে শব্দার্থতত্ত্বের ক্ষেত্রে অর্থ এবং অক্ষয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা যে বাকারার করি না কেন, শেষপর্যন্ত তা আমরা বুঝতে পারলাম কি না বা অন্যকে বোঝাতে পারলাম কি না, তার উপরই বাক্যটির স্বীকৃতি নির্ভর করে। ই বোধগম্যতা ব্যাকরণের প্রত্যেকটি প্রকরণ নির্ণয়ের নিম্নণের ওপর নির্ভরশীল। ভাষাবিজ্ঞানী চমস্কি সেই জন্য তাঁর 'Aspects of the Theory of Syntax প্রশে নন্দার্থকে ব্যাকরণের একটি প্রধান অঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন। চমস্কি প্রবর্তিত বাক্যতত্ত্বে অক্ষয় সম্বধীয় স্তর থেকে বাক্যগুলি রূপান্তর বিধি দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে ধ্বনিতাত্ত্বিক রূপ গ্রহণ করে। কিন্তু অধয় সম্বন্ধীয় স্তরের বিমূর্ত উপাদানগুলি যখন প্রকৃত শব্দ গ্রহণ করে, তখন তাকে শব্দার্থের নিয়মাবলি মানতে হয়। তাই শব্দার্থ হল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণের একি অন্যতম অঙ্গ। প্রথাগত ব্যাকরণ মেনে শব্দের দ্ব্যর্থকতা বা অসংগতি নিয়েও আমরা শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারি, যেমন— “আনিয়াছে তব স্বামী বাঁধি নিজ গুলো" এই বাক্যে ‘গুণে' শব্দটি দুটি অর্থ প্রকাশ করে—ধনুকের ছিলা' 'চারিত্রিক উৎকর্ষ'। ফলে বাক্যটি দুটি অর্থে প্রতিভাত হয়। কিন্তু বাক্যে প্রযুক্ত এতসব শব্দের অর্থ বোঝাতে আমাদের বহু ক্ষেত্রেই ব্যাকরণের জগতের বাইরে যেতে হয়। অর্থাৎ আমরা সব শব্দেরই ব্যাকরণসম্মত অর্থ জেনে তাকে ভাষায় বা বাক্যে প্রয়োগ করি না। সেইজন্য কোনো কোনো ভাষাবিজ্ঞানী প্রয়োগতত্ব বা Pragmatics নামে একটি শাখার কথা ভেবেছেন, যার লক্ষ্য হল ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্কের বাইরের জ্ঞান ও বিশ্বাসের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক আবিষ্কার। তাঁদের মতে, কোনো বক্তার কখনভঙ্গি ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে তার বক্তব্যকে বুঝতে পার ক্ষমতাই হল প্রয়োগমূলক দক্ষতা। প্রয়োগতত্ত্বের দ্বারা দেখা হয়, শব্দার্থের পরিবর্তন শুধু ভাষার জ্ঞান ও গঠনের ওপর নির্ভর করে না। ভাষা-বিশেষ সম্পর্কে বক্তা এবং শ্রোতার পূর্বধারণা, ভঙ্গি, উদ্দেশ্য বা আরও অন্যান্য কারণের ওপরও শব্দার্থের পরিবর্তন নির্ভর করে। প্রয়োগতত্ত্ববাদীরা মনে করেন, স্থান-কাল-পাত্র বুদ্ধি-স্বভাব ইত্যাদি প্রত্যক্ষণ দ্বারাও ভাষাজ্ঞান অর্জন বা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের অর্থবোধ হতে পারে।

শব্দের অর্থ ও তার প্রয়োগের তত্ত্ব বিশ্লেষণের প্রকৃতি অনুসারে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে বেশ কয়েকটি ধারণা প্রচলিত আছে। তার মধ্যে বন্ধু আলোচিত ধারণা তিনটি হল— (১) শব্দার্থের উপাদানমূলক তত্ত্ব (২) শব্দার্থের সাপেক্ষ তত্ত্ব এবং (৩) শব্দার্থের বিষয়মূলক তত্ত্ব।

১. শব্দার্থের উপাদানমূলক তত্ত্ব: গঠনমূলক শব্দার্থতত্ত্বের খাতায় উপাদানমূলক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শব্দার্থকে ভেঙে তাকে জাতি অংশে অর্থাৎ শব্দার্থ-উপাদানে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করা হয়।

করার ফলে শব্দটির অর্থ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা এবং অন্যান্য শব্দের সঙ্গে তার সম্পর্কের একটি যথার্থ রূপ পাওয়া যায়। যেমন—'মা' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ থেকে সাধারণ অর্থ সমাধানের পথটি হবে নিম্নরূপ একবচন বিশেষা মনুষ্যবাচক। নোয়াম চমকিও তাঁর রূপান্তরমূলক ব্যাকরণে অর্থ বিশ্লেষণের এই তত্ত্বটিকে মডেল রূপে গণ্য করেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি নন্দার্থের বয়া ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক দিকগুলিও নির্দেশ করেন।

২. শব্দার্থের সত্য-সাপেক্ষ তত্ত্ব শব্দার্থের সত্য-সাপেক্ষ তত্ত্বটির মূল কথা হল, যখন আমরা কোনো বাক্যকে সত্য বলে জ্ঞান করি বা বাক্যটি বাস্তব সত্যের ভিত্তিতে রচিত বলে মনে করি, তখন সেই বাক্যের অন্তর্গত শব্দগুলি সম্পর্কেও আমাদের মধ্যে একটি অর্থের বোধ গড়ে ওঠে। অর্থাৎ, এই তত্ত্বানুসারে বাক্যের সত্যাসত্যের উপরই শব্দের অর্থ নির্ভর করে। যেমন বরফ হয় সাদা। এই বাক্যটি যদি সত্য হয়, তবে বরফ যে সাদা রঙের হয় এই অর্থটি প্রতীয়মান হবে।

৩. শব্দার্থের বিষয়মূলক তত্ত্ব বা প্রাসঙ্গিক অর্থতত্ব: বিষয়মূলক তাত্ত্বিকরা মনে করেন, শব্দের অর্থ বোঝা যায় ভাষায় ব্যবহৃত শব্দটির বক্তব্য বিষয় থেকে। যেমন—আমার হাতে আঘাত লেগেছে। তুমি হাত চালিয়ে কাজটা সেরে নাও। বিদ্যাসাগর কখনও কারও কাছে হাত পাতেননি। উপরের বাক্যগুলিতে 'হাত' শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বাক্যের 'হাত' তার মূল অর্থ (অঙ্গ-বিশেষ) বজায় রেখেছে। কিন্তু অন্য বাক্য দুটিতে 'হাত' শব্দের অর্থটি বাক্যের বিষয় অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে। এইভাবে বক্তব্যের বিষয় অনুযায়ী অর্থাৎ প্রসঙ্গা এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী শব্দের অর্থ বিশ্লেষণের ধারাটি বিষয়মূলক তত্ত্ব বা Contextual theory হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

শব্দের সঙ্গে শব্দের যে অর্থগত সম্পর্ক, তার ভিত্তিতে মূলত তিনভাবে শব্দার্থকে বিন্যস্ত করা যায়। যেমন— (১) সমার্থকতা, (২) বিপরীতার্থকতা এবং (৩) ব্যাপকার্থকতা। এখানে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিয়ে এই লব্দার্থগত বর্গের বিষয়টা বোঝানো হল—

১. সমার্থকতা (Synonymy):শরীর → দেহ, অঙ্গ, বপু, তনু বায়ু বাতাস, অনিল, পবন দিন দিন, দিবস, অহঃ শীতল ঠান্ডা, হিম, হিমেল সমার্থকতা হল শব্দার্থের সমতা। সেই অর্থসাম্য অনুসারেই সাজানো হয়েছে উপরের শব্দগুলি। প্রত্যেক গুচ্ছের শব্দগুলি অর্থের দিক থেকে কাছাকাছি বা প্রায় সমার্থক। ছারা বাংলা শিক্ষক দ্বারা প্রাণ
বিপরীতার্থকতা (Antonymy): দুটি শন্দের মধ্যে অর্থের সম্পর্ক যেখানে ফুটে ওঠে, তা-ই হল বিপরীতার্থকতা। যেমন উত্তম অধম, সুখ-দুঃখ, জীবন মরণ, আদর অনল বিপরীতজ্ঞাপক শব্দ দু-রকমের হতে পারে— (২) মাত্রাহীন। মাত্রাগত শব্দ হল যেগুলিকে তারতম্য প্রকাশ করা হয়। যেমন— বেশি কম
অন্যদিকে মাত্রাহীন বিপরীতার্থক শব্দ বলতে আমরা বুঝি, কোনো পরিমাণ অনাধিক্য সূচক কোনো কিছু পরস্পরের মধ্যে বিপরীত সম্পর্ক প্রকাশ করে। তবে তাদের ধ্বনিতাত্ত্বিক সাদৃশ্য থাকে না। যেমন— ছেলে, যাও এসো
৩. ব্যাপকার্থকতা (Hyponymy): একটি বড়ো আয়তনের মধ্যে আয়তনের বস্তুর অবস্থানের মতো ঘটনা হল ব্যাপকার্থকতা। এ 'ফুল' বললে যেমন তার মধ্যে গোলাপ, জুঁই, জবা, ইত্যাদি থাকছে তেমনি আসবাব বললে তার মধ্যে আসবে টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যের নিরিখে আসবাব হল টেবিলের ব্যাপকার্যকতা হল গোলাপের ব্যাপকার্থকতা।

প্রধানত তিনটি ধারায় অর্থ পরিবর্তন হয়ে থাকে। যেমন— (১) অর্থপ্রসার(২) অর্থসংকোচ এবং (৩) অর্থের রূপান্তর বা অর্থসংশ্লেষ।

শব্দার্থের রূপান্তর: শব্দের অর্থ পরিবর্তন কতকগুলি ধাপের মধ্যে দিয়ে হয়। অনেক সময় অর্থ পরিবর্তনের ধারায় শেষ ধাপে এসে শব্দের অমন নতুন অর্থ দাঁড়িয়ে যায় মূল অর্থের সঙ্গে তার আর কোনো যোগ খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন মনে হয় শব্দটির অর্থ এক বস্তু থেকে একেবারে অন্য বন্ধুরে। রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এই ধরনের পরিবর্তনকে অর্থের রূপান্তর অর্থসংক্রম বলে। যেমন

সংস্কৃত শব্দ 'ধর্ম' মূল অর্থ প্রথমে ছিল 'গরম'। পরে তার অর্থ শরীরের ওপর গরমের ফল'। আর এখন আমরা 'ঘর্ম' বলতে বুঝি ঘামা 'স্বেদ'। তেমনি পাষণ্ড' শব্দের মৌলিক অর্থ 'ধর্ম সম্প্রদায় অর্থের ঘটে তা হল 'অন্য ধর্ম সম্প্রদায়, তারপর বিরুদ্ধ ধর্ম সম্প্রদায়। পাষণ্ড' শব্দের রূপান্তরিত অর্থ হল 'অত্যাচারী'। 'পান্ন' শব্দের মূল করার আধার', অর্থ প্রসারে হল 'কন্যা সম্প্রদানের আধার। শেষে শব্দের রূপান্তরিত অর্থ হল 'বর'।

'সন্দেশ' শব্দেও অর্থ পরিবর্তনের একাধিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে। শব্দের মূল অর্থ ছিল 'খবর', 'সংবাদ'। যখন ডাকব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তখন আত্মীয়দের বাড়িতে যে খবরাখবর নিয়ে যেত, সে কিছু মিষ্টান্ন নিয়ে যেত। এই অনুষঙ্গের সূত্র ধরে 'সন্দেশ' শব্দের অর্থ দাঁড়ায় 'মিষ্টান্ন। থেকে 'মিষ্টান্ন'—এটাও একধরনের অর্থের 'রূপান্তর'।