Chapter-18, বাংলা গানের ইতিহাস – সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

লোকশিল্পের অন্যতম প্রাচীন মাধ্যম পটশিল্প। বাংলাদেশেও পটশিল্পের ইতিহাস প্রাচীন | পটুয়াদের আঁকা ছবি ও সেখানে উল্লিখিত কাহিনি ধর্মপ্রচারে একান্ত সহায়ক হয়েছিল। মঙ্গলকাব্যের পট এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মুসলিম শাসকরাও ইসলাম ধর্মপ্রচারের জন্য পটুয়াদের সাহায্য নিতেন। ষোড়শ শতকে পটচিত্রের সাহায্যেই তুলে ধরা হত চৈতন্যদেবের বাণী। মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে পটের উল্লেখ আছে। পুরাণ এবং লোক কথাকে আশ্রয় করে। একটি বড়ো ক্যানভাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে গল্প বলতেন পটশিল্পীরা—ছবির মাধ্যমেই এই গল্প বলা হত। উনিশ শতকে কালীঘাটের পট বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছিল। প্রথমদিকে কালীঘাটের পটে দেবদেবীর ছবি আঁকা হলেও পরবর্তীকালে পটে উঠে আসে নানা সামাজিক প্রসঙ্গ | সামাজিক অবক্ষয়, নব্য বাবু কালচার এসব পটশিল্পীদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়। ১৮০০ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতার বাবু-কালচারের ক্ষয়িষ্ণু রূপের প্রতিফলন ধরা পড়েছিল এই পটচিত্রে। কালীঘাটের পট বিশ্বজোড়া খ্যাতি পায় । ইন্দ্রমোহন ঘোষ, বলরাম দাস, কার্তিক চিত্রকর প্রমুখ আলাদ আলাদা ধারায় কালীঘাটের পটশিল্পের প্রসার ঘটান।

বাংলা গানের ক্রমবিবর্তনের ধারাটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথমটি প্রাচীন যুগ। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে প্রায় পাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই যুগ বহমান ছিল। বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সৃষ্ট 'চর্যাগীতি', কবি জয়দেব প্রণীত গীতগোবিন্দম্, বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃকীর্তন ও বহু কবির রচিত বিভিন্ন 'হালগীতি এই পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য। এই যুগটিকে আমরা বাংলা সংগীত সৃষ্টির আদিপর্ব' বলেও উল্লেখ করতে পারি । পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত এই পর্যায়ের সময়সীমা। বাংলা সাহিত্যের মতোই বাংলা গানে মধ্যযুগের সূচনাও চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে | এই পর্যায়ে নানক, কবির, তুলসীদাস, মীরাবাঈ প্রমুখের আবির্ভাব ও তাঁদের রচিত ভক্তিভাবনামূলক গান ও দৌঁড়াগুলি অনুবাদের মধ্যে দিয়ে বাংলা গানের মধ্যপর্বটি সমৃদ্ধ হয়েছিল। বাংলা গানে আধুনিক যুগের সূচনা রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, নিধুবাবু, দাশরথি রায়, লালনফকির, হাসনরাজা প্রমুখের হাত ধরে হলেও কারও কারও মতে তা রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই ঘটেছিল। কারণ, রবীন্দ্র-পূর্ববর্তী বেশিরভাগ গীতিকারই মূলত ভক্তিগীতি রচনা করেছিলেন। যদিও কবিওয়ালা এবং বাউল গোষ্ঠীর গীতিকারগণ তাঁদের সৃষ্টিতে মানুষকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সময় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলামের গানে বিষয় হিসেবে মানবতা এবং দেশাত্মবোধই প্রধানত জায়গা পেয়েছে। এই পর্বের সময়সীমা মোটামুটিভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। কবিওয়ালাপর্ব, বাউলগান, রবীন্দ্রপর্ব, স্বদেশিগান, স্বাধীনতার গান, স্বর্ণযুগের গান, গণসংগীত, লোকসংগীত, সিনেমার গান, উচ্চাঙ্গ বা ধ্রুপদি সংগীত, জীবনমুখী গান, বাংলা ব্যান্ডের গান ইত্যাদি বহুধা ধারায় প্রবাহিত আজকের বাংলা গান। ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ যাকে বঙ্গের আদিকবি বলে উল্লেখ করেছেন, সেই মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের হাতে পুষ্পিত পল্লবিত হয়ে আজকের এই উত্তর-আধুনিক বাংলা গানের ধারা সজীব এবং বৈচিত্র্যময়।

সাধারণত চর্যাগীতিকে বাংলা গানের আদি নিদর্শন বলে ধরে নিলেও চর্যার আগেও বাংলায় সংগীতের চর্চা ছিল। গুপ্ত যুগে এবং পাল রাজত্বের প্রথমদিকে বাংলা সংগীত উৎকর্ষ লাভ করেছিল। কিন্তু সেই সংগীত কীভাবে উপস্থাপন করা হত বা তার সাংগীতিক রূপ কেমন ছিল আজ তা জানা যায় না। তবে সেই যুগে অঙ্কিত চিত্র, ভাস্কর্য, স্থাপত্য বা বিভিন্ন খননকার্যে প্রাপ্ত বাদ্যযন্ত্রের নির্দশন থেকে তার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়। আনুমানিক অষ্টম থেকে শুরু করে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে চর্যাগীতির সাথে সাথে নাথগীতি, চাঁচর ও হোলি নামক কতকগুলি গাঁতিরীতির প্রচলন বাংলা দেশে ছিল, যা বর্তমানে হারিয়ে গেছে। এ মুহূর্তে তাই চর্যাগীতিগুলিই বাংলা ভাষায় রচিত আদি বা প্রাচীনতম বাংলা গান। কবি জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দম্ সংস্কৃত ভাষায় লেখা হলেও ভাব, ভাষা, ছন্দ, প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কাছাকাছি। তাই এই বইটি বৈয়ব পদাবলি সাহিত্য ও কীর্তন গানের জনকরূপে পূজিত। বৈয়ব পদাবলির কবি। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরামদাস প্রমুখের হাতে এই পর্বের বাংলা গান সমৃদ্ধ হয়েছিল। বৈয়ব পদাবলি-পূর্ব যুগে বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্মকীর্তন বাংলা গানে সৌন্দর্য, লাবণ্য ও বৈচিত্র্য এনে দিয়েছিল। রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা এই গানগুলির মূল উপজীব্য। এর পাশাপাশি বাংলা গানের যে ধারাটি আবহমানকাল বাংলার প্রাচীন জনজীবনকে মুগ্ধ করে রেখেছিল তা 'মঙ্গলগীতি'। মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, শিবমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, কালিকামঙ্গল প্রভৃতি কাব্যগুলি বিভিন্ন কবি তথা গীতিকারের হাতে। ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। প্রতিটি মঙ্গলগীতিতেই অজস্র রাগরাগিণীর উল্লেখ। পাওয়া যায়। সেই যুগে শ্রোতাদের আনন্দলাভের একমাত্র উপকরণ ছিল মঙ্গলগীত। এক সপ্তাহ থেকে শুরু করে মাসাধিক কাল কোনো-কোনো মঙ্গলকাব্য গীত হত। বিজয়গুপ্ত, নারায়ণ দেব, কবিকঙ্কন মুকুন্দ চক্রবর্তী, রূপরাম চক্রবর্তী, ঘনরাম চক্রবর্তী, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র প্রমুখ এই পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি ও গীতিকার।

'কীর্তন' এর উৎপত্তি কোথা থেকে এবং কীভাবে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অনেকের মতে এর শিকড় রয়েছে বেদের 'অনুকীর্তন' নামক প্রার্থনাসংগীতের মধ্যে। জয়দেবের গীতগোবিন্দ-র সময় থেকে কীর্তনের সূচনা বলে দাবি করেছেন অনেকে। তবে চৈতন্যদেবই তাঁর নামকীর্তন। প্রচারের মাধ্যমে কীর্তন গানকে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

কীর্তন বলতে সাধারণভাবে যশোগাধার প্রচার বোঝালেও গানের ক্ষেত্রে তা কৃষ্ণকে ভিত্তি করে রচিত। কীর্তন দুই ভাগে বিভক্ত নামকীর্তন এবং লীলাকীর্তন নামকীর্তনে শুধু ঈশ্বরের নাম সংকীর্তন করা হয়। এই গান। জনসংগীত, বহু মানুষ বা ভক্তরা মিলিতভাবে নামগান করে থাকে। কখনো চার প্রহর, কখনো আট প্রহর। আবার কখনো বা চব্বিশ প্রহর ধরে বিভিন্ন সুরে নামসংকীর্তন গাওয়া হয়। কৃষ্ণনাম বা কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামই সাধারণত গাওয়া হয়ে থাকে। নামকীর্তন যখন দলবদ্ধভাবে নগরের পথে পরে গাওয়া হয়, সেই ধরনের কীর্তনকে বলা হয় 'নগর কীর্তনা।

অন্যদিকে কৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা নিয়ে যে কীর্তনগান প্রচলিত তার নাম লীলাকীর্তন বা রসকীর্তন। বাল্যলীলা, গোষ্ঠলীলা, পূর্বরাগ, রূপানুরাগ, অভিসার, মান, মাথুর ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায়ে লীলাকীর্তন বিভক্ত। চৌষটি প্রকার রসের বিস্তার ঘটলেও মূল রস শৃঙ্খার বা মধুর। লীলাকীর্তনে একজন থাকেন মূল গায়েন। তিনি একটি লাইন গাওয়ার পরে কয়েকজন 'দোহার' সেই পংক্তিটি পুনরায় গেয়ে থাকেন। জটিল ভাবকে কীর্তনে সহজ সুর ও তালে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এই সকল কথার যোজনাকে বলা হয় 'অলংকার', 'আখর' বা 'কাচা'। কীর্তনের পাঁচটি অঙ্গ যথাক্রমে—কথা, পৌঁছা, আখর, তুক ও হুটা

শ্রীচৈতন্য শ্রীবৎসের গৃহে কীর্তন অনুষ্ঠান করতেন। নীলাচলে রথযাত্রায় চৈতন্য সাতটি সম্প্রদায়কে একত্রিত করে কীর্তন অনুষ্ঠান করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে যেতুরির মহোৎসবে নরোত্তম দাস ঠাকুরের পরিচালনায় গরানহাতি রীতির উদ্ভব হয়। পরে মনোহর দাস মনোহরশাহি রীতির প্রবর্তন করেন। রেনেটি ধারার উদ্ভাবন করেন বিপ্রদাস ঘোষ | এ ছাড়াও আরেক ধারা ছিলো মন্দারিনি ধারা। কীর্তন গানে প্রত্যেক পালা শুরুর আগে সেই বস ও পর্যায়ের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে একটি করে সৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ পেয়ে নেওয়া রীতি। এই পদগুলোকে বলা হয় গৌরচন্দ্রিকা। বিভিন্ন কাজের উল্লেখযোগ্য কীর্তনীয়াগণ হলেন— কমলা ঝরিয়া, রাধারমণ কর্মকার, রাধারাণী দাসী, গীতশ্রী ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, নরোত্তম জানা, নলিতা না প্রমুখ।

অন্নদামঙ্গল-এর কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের মৃত্যু হয় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে। এর অব্যবহিত পর থেকেই বাংলা গানে কবিওয়ালাদের আবির্ভাব। বিশেষত পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭) পরবর্তী সময়ে তা বিশেষ প্রসার লাভ করে। এই ধারা বহমান ছিল ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর বছর পর্যন্ত। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাঙালির বিরাট পরিবর্তন এই পর্বে ঘটেছিল। পুরোনো কলকাতার ধনী সম্প্রদায় ছিলেন এই গানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এক্ষেত্রে মহারাজা নবকৃষ্ণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কবিওয়ালাগণ প্রাচীন বাংলা কাব্যের বিষয় গ্রহণ করলেও কোনো দেবনির্ভরতা বা অলৌকিকতাকে তাঁদের সৃষ্টিতে আনেননি। তাঁরা আধ্যাত্মিকতাকে বর্জন করেছিলেন। পরিবর্তে এনেছিলেন মানবতাবাদ এবং বিভিন্ন সামাজিক বোধকে। তাঁরা আসরে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে। গান রচনা করতেন। বিপক্ষের সাথে ছন্দ এবং সুর বজায় রেখে লড়াইও চালিয়ে যেতেন, থাকে চলিত ভাষায় 'কবির লড়াই' বলা হয়। আসরে উপস্থিত শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করা এবং নিজের তথা নিজের দলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করাই এই গানের মূল উদ্দেশ্য ছিল। আর তা করতে গিয়ে প্রায়শই ভাষা ব্যবহারে সংযম হারাতেন কবিয়ালরা। বেশিরভাগ কবিওয়ালাদেরই প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষা বিশেষ না থাকলেও উপস্থিত বুদ্ধি, পুরাণ সম্পর্কে জ্ঞান, আর সংগীতে অসাধারণ দখল ছিল। ঢোল আর কাসি ছিল কবিগানের বাজনা | বহুলাংশে শ্রোতাদের চাহিদা অনুসারেই কবিওয়ালারা গান বাঁধতেন।।

এই ধারার প্রাচীনতম কবি গোঁজলা পুঁই। তিনি ভারতচন্দ্রের সমসাময়িক । তাঁর শিষ্য রঘুনাথ দাস। রঘুনাথের শিষ্যদের মধ্যে রাসু, নৃসিংহ ও হর ঠাকুর। কবিওয়ালা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। এই হরু ঠাকুরের শিষ্য ছিলেন ভোলাময়রা। অপর শিষ্য রামপ্রসাদ ঠাকুর। অনেকের মতে, কবিগানের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর ছিলেন রামজির শিষ্য রাম বসু। তবে কবিওয়ালা হিসেবে সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়েছিলেন অ্যান্টনি কবিয়াল। পশ্চিমবঙ্গ কবিগানের মূলকেন্দ্র হলেও পূর্ববঙ্গে এর অস্তিত্ব যথেষ্টই ছিল। মৈমনসিংহের রামু মালী, ফরিদপুরের নারায়ণ বালা, বরিশালের বিজয় দত্ত এবং গামণি দাসী, ত্রিপুরার হরি আচার্য এবং বিলাসিনী দাসীর নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে ইংরেজি সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলার শ্রোতাদেরও রুচির পরিবর্তন ঘটে। বিলুপ্ত হয় কবিগানের ধারা।

ভারতীয় রাগসংগীতে ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুংরির সঙ্গে ইরাও একটি। বিশিষ্ট শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। 'টরা' শব্দের অর্থ লক্ষ। এর গতি এবং তান উন্নজনযুক্ত হওয়াতেই এইরূপ নামকরণ বলে অনেকে মনে করেন। ইরার দুটি স্তবক বা তক স্থায়ী ও অন্তরা। এর সঙ্গে দ্রুত শেয়ালের গভীর সাদৃ রয়েছে। উপ্রায় ভৈরবী, খাম্বাজ, দেশ, সিন্ধু, কাফি, ঝিঁঝিট, পিলু, বারোয়া প্রভৃতি রাম ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত করুণরসাত্মক প্রণয়সংগীত ।

বাংলায় অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে উবার প্রচলন। রামनি (নিধুবাবু) বাংলা টপ্পার পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। তবে বাংলা টয়া সর্বতোভাবে পাঞ্জাবি উল্লার অনুকরণ নয়। একে বাঙালির প্রকৃতি ও রুটি অনুযায়ী বিন্যাস করা হয়েছে। এতে দ্রুত তানের পরিবর্তে আন্দোলনমুক্ত তান ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলায় উষার আবেদন অত্যন্ত মধুর ও গভীর। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু সংগীতকে সুললিত, অপূর্ব টপ্পা রচনা করে গেছেন। এদের মধ্যে রাধামোহন সেন, কালীমির্জা, শ্রীধর কথক, দাশরথি রায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও আগমন ाন, শ্যামাসংগীত, ভক্তিরসাশ্রিত গানে উল্লার বিশেষ প্রভাব পড়েছে।

বাংলা দেশে যাত্রাগান-এর উদ্ভব ষোড়শ শতাব্দীতে। 'যাত্রা' শব্দের অর্থ নির্বিঘ্নে দীর্ঘপথ অতিক্রম করা বাংলা ভাষায় শব্দটির একটি বিশেষ যোগরুঢ় অর্থ দাঁড়িয়েছে—উৎসব-অনুষ্ঠানে কোনো প্রথিত কথাবস্তুর গীত নৃত্য সংলাপ সহযোগে অভিনয় বিশেষ এক মণ্ডপে সমবেত হয়ে দেব-মাহাত্ম্যমূলক সংগীত, নৃত্য ও নাট্য। তখন থেকেই যাত্রার পালাগানকে 'যাত্রা' বা 'যাত্রাগান' বলা হয়। গীতগোবিন্দম্ অনেকটা যাত্রাগানের আকারেই রচিত। শ্রীকৃষ্মকীর্তনও সেই যুগের কৃষ্ণযাত্রা পালা। এ ছাড়া চণ্ডীযাত্রা, মনসামঙ্গল, কংসবধ, যযাতি যজ্ঞ ইত্যাদি নিয়েও যাত্রাগান রচিত হয়েছে। কৃষ্ণমাচার ক্ষয়িতা হিসেবে কৃল্পকমল গোস্বামীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গোপাল উড়ে ও মধুসূদন কিন্নর যাত্রাগানের জগতে এখনও প্রসিদ্ধ। রবীন্দ্রনাথের গানেও যাত্রাগানের প্রভাব দেখা যায়। যাত্রাগানের মধ্যে সুসাহিত্যের উপাদান ও অভিজাত সংগীতের নিদর্শন লক্ষ করা যায়। সেই সময় সমাজে কৃষ্ণযাত্রা থেকে শুরু করে সবরকম যাত্রাগানই একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছিল। জনচিত্তে তা গ্রহণযোগ্যও হয়েছিল। বর্তমানে আর যাত্রাগানের প্রচলন নেই।

লবিংশ শতকের মধ্যভাগে কলকাতায় নাচ গানের আসরে সুকণ্ঠ গায়ক | হিসেবে রূপচাঁদ পক্ষীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সংগীতরচয়িতা রুপচাদ তাম্ররসাত্মক সংগীত এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক সংগীত সৃষ্টিতে সমান দক্ষ। ছিলেন। তাঁর রচিত সমস্ত সংগীতই 'পক্ষী' বা 'খারাজ' ভণিতাযুক্ত। তিনি 'পক্ষীর জাতিমালা' নামে শখের পাঁচালি দল তৈরি করেন। সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে তিনি গান বাঁধতেন। আগমনী-বিজয়গান, বাউলগান, দেহতত্ত্বের গান, । গান রচনাতেও তিনি পারদর্শী ছিলেন। তাঁর গানে বাংলা ও ইংরেজি শব্দের মিশ্রন ঘটেছে। তার দলের সদস্যরা নানারকম পাখির স্বর অনুকরণ করে নিজ নিজ নাম গ্রহণ করতেন। তাই তার দলকে পক্ষীর দল" বলা হয়।

রূপচান খুবই আমোদপ্রিয় ও রসিক পুরুষ ছিলেন। পক্ষা' উপাধিকারী বলে তাঁর গাড়িটি কতকটা বাঁচার আকারের ছিল। তিনি সেই গাড়ি চড়ে শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়িতে উপস্থিত হতেন। তিনি প্রচুর সংগীত রচনা করেছেন। গঙ্গার গোল, রেল, বিধবাবিবাহ ইত্যাদি প্রসঙ্গেও তিনি সংগীত। রচনা করেছেন। বাগবাজারের শিবকর মুখোপাধ্যায় এই দলের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রুপচাদ জীবিত ছিলেন।

যাত্রা' শব্দের মধ্যে দিয়ে সাধারণত শোভাযাত্রা বা মিছিলকে নির্দেশ করা হত। বিভিন্ন উৎসব ও পূজা-পার্বনের দিনে, গ্রাম অথবা নগরের একশ্রেণির নৃত্য-গীত জানা লোক সকলকে আনন্দ দেওয়ার জন্য রঙিন পোশাক পরিচ্ছেদ পরে বহু বিচিত্র সমারোহে ও অজ্ঞান্তশি করে পথে পথে ঘুরত। তাদের 'প্রদক্ষিণ' থেকেই 'যাত্রা' শব্দটি এসেছে বলে মনে করা হয়। এই প্রদক্ষিণ ও পরিক্রমার পরে দর্শকদের নাচ-গান-অভিনয় দেখানোই ছিল যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য। রুমে ঘুরে ঘুরে নাচ-গান-অভিনয় কম হয়ে আসর তৈরি হলেও তার নামটি 'যাত্রা'ই থেকে যায়। বিবিধ যাত্রাপালার মধ্যে চণ্ডীযাত্রা.. কৃন্নযাত্রা, ভাসানযাত্রা, মোনাই যাত্রার নাম উল্লেখযোগ্য। কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রী শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত প্রশ্নে বিজয়াদশমী তিথিতে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যের যাত্রাভিনয়ের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। 'যাত্রা' লোকশিক্ষার উল্লেখযোগ্য মাধ্যমরূপে পরিগণিত হয়ে থাকে। সামাজিক নীতি, আদর্শের প্রচারে যাত্রা তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে গনজাগরণের লক্ষ্যে প্রস্তুত যাত্রাপালার মধ্যে মুকুন্দ দাসের রচনা ও অভিনয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আধুনিক বাংলা গানের পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তাঁর হাতেই বাংলা গান বাণী এবং সুরবৈচিত্র্য্যে মাধুর্যময় হয়ে ওঠে। তাঁর সমসাময়িক কালে গীতিকার হিসেবে আরও কয়েকজন কবি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৪-১৯১০), অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭৯-008), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ সহ এই পাঁচজন কবি-গীতিকারের সৃষ্টির মধ্য দিয়েই বাংলা মানে আধুনিক পর্যায়ের সূত্রপাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের মূল বিষয় প্রেম, প্রকৃতি, পূজা ও স্বদেশ। মূলত এই চারটি পর্যায় অবলম্বনেই তিনি প্রায় হাজার দেড়েক কালজয়ী গান রচনা করেন।।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বাজ্ঞা রোধকে কেন্দ্র করে বাংলা দেশে স্বদেশি আন্দোলনের সূত্রপাত। এই ঐতিহাসিক ঘটনা উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করলেন 'বাংলার মাটি, বাংলার জল' গানটি। এই পর্বে দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন 'বঙ্গ আমার, জননী আমার'। রজনীকান্ত সেন ডাক দিলেন মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই। অতুলপ্রসাদ সেন আশ্বাস দিলেন এই বলে বল বল বল সবে, শত বাঁধা বেণু রবো। নজরুল | ইসলাম গাইলেন মুক্তির গান—'কারার ঐ লৌহকপাট' অথবা 'এই শিকল পরা হল সোলের এই.....। তবে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত নজরুলের একহাতে 'বাঁশের বাঁশরি আর একহাতে রণতুয়া। তাই তাঁর প্রেমের গানগুলিও অসাধারণ, যেমন—'মোর প্রিয়া হবে এসো রানি, দিব খোঁপায় তারার ফুল'। কবি-নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রায় সমস্ত গানই রচনা করেছিলেন নাটকের প্রয়োজনে। তার রচিত ঐতিহাসিক নাটকের গানগুলিতে দেশাত্মবোধ উৎসারিত। রজনীকান্ত সেনের সৃষ্ট গানগুলিকে বলা হয়ে থাকে 'কোমল কান্ত পদাবলি'। তাঁর গানের প্রধান বিষয় ভক্তি ও দেশপ্রেম। গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর গানে প্রেম, স্বদেশপ্রীতি এবং ভর্তি—এই তিনটি ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর প্রেমের গানে বেদনা আর বিষাদের প্রাচুর্য। স্বদেশ পর্যায়ের গানে দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের আহবান। আর ভক্তি পর্যায়ের গানে আছে আত্মনিবেদনের রাগিণী। আধুনিক বাংলা গানের কিছুটা ভিন্নধারার গীতিকার চারণকবি মুকুন্দ দাস (১৮৭৮ ১৯৩৪)। তিনি মূলত স্বদেশি গান রচনা করেন। যাত্রাগান রচনাতেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর গান বাঙালির মনে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।

প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই আর তার থেকে উদ্ভূত সুর ও ছন্দই লোকসংগীত। আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে সেই লড়াই যখন কালের নিয়মে অসত মানুষের বিরুদ্ধে সত্ মানুষের সংগ্রামে রূপ নেয়, তখন সেখান থেকে উঠে আসা গানই গণসংগীত। অর্থাত্, লোকসংগীতের আধুনিকতম রূপ গণসংগীত। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এই গান সোচ্চার। মানুষের জীবনের দুঃখ, যন্ত্রণা দূর করে এক সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখায় এই গান।

আমাদের দেশে ‘গণসংগীত' শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছে চল্লিশের দশকের প্রথম দিক থেকে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কথায় “স্বাদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার সাগরে গিয়ে মিলেছে, সেই মোহনায়। গণসংগীতের জন্ম।” এই গানের বিস্তার ঘটে খুব সহজেই। সাধারণ মানুষ এই গানের কথা আর সুরের সঙ্গে একায় হয়ে ওঠে খুব সহজেই। শৃঙ্খলিত জীবন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগায় এই গান। এ গান খুব সহজেই প্রচলিত পথ ছেড়ে নতুন পথ নিতে পারে। চেনা সুরের নতুন প্রয়োগ তাই এ খানে যেমন আছে, তেমনি বিভিন্ন ধরনের সুরের ও গায়নভঙ্গির মিশ্রণও ঘটে এই গানে। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর এদেশে প্রলেতারীয় মতাদর্শের সূচনা হয়। কাজী নজরুলের গানে কবিতায় তা রূপ পায়। নজরুল কলকাতায় আসেন, পরিচিত হন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীদের সাথে। এর আগে অক্টোবর বিপ্লব তাকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৯২৬ সালে কৃল্পনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে 'বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিকদল' তৈরি হয়। সৃষ্টি হতে থাকে মানুষের প্রতিবাদের গান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনাকালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিকাতেই গণসংগীতের জোয়ার আসে।

এই ধারার জনপ্রিয় গীতিকার এবং সুরকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— রমেন শীল, মুকুন্দ দাস, নজরুল ইসলাম, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নিবারণ পণ্ডিত, দিনেশ দাশ, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। গনসংগীত যাদের কছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তাঁরা হলেন- মুকুন্দ দাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ি চৌধুরী, অবিভারত দত্ত, অজিত পাণ্ডে, রুমা গুহঠাকুরতা, মুখোপাধ্যায়, প্রতুল মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

চলচ্চিত্র পুরুতে ছিল নির্বাক, সংলাপহীন এবং সংগীতহীন। প্রেক্ষাগৃহে ছবি প্রদর্শনের সময় প্রোজেক্টর এর আওয়াজ দর্শকদের মনোযোগে ব্যাথার ঘটাত। এ কারণে শুরু হল ছবির সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে পিয়ানো বা বাজানো। যিনি তা বাজাতেন, তিনি ছবি দেখে দেখে নিজের সাংগীতিক বোধ ও কাহিনি অনুযায়ী সুর সৃষ্টি করতেন। এতে বহু অসুবিধাও ছিল। কিন্তু সবাক যুদ্ধে এই অসুবিধা থাকল না। সবাক চলচ্চিত্র জন্ম থেকেই হয়ে উঠল সংগীতনির্ভর। ক্রমে সংগীত নিয়ে চলচ্চিত্রে নানা পরীক্ষা হয়েছে। আজ সংগীতকে বাদ দিয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের কথা ভাবাই যায় না।

১৯৫৪ সাল নাগাদ নির্বাক যুগ শেষ হয়ে সবাক যুগের সূচনা | মোটামুটিভাবে চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলা সিনেমার গানের জগৎ যাঁদের সুর আর কন্ঠের জাদুতে সমৃদ্ধ হল তাঁরা হলেন পঙ্কজ মল্লিক, সায়গল, কানন দেবী, জগন্মায় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ। সেইসঙ্গে ছিলেন শচীন দেববর্মন, রবীন মজুমদার, মান্না দে। পঞ্চাশের শতকের সূচনায় যাদের কন্ঠ বাংলা সিনেমামোদী দর্শকদের হৃদয় পূর্ণ করল তাঁরা হলেন শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অখিলবন্ধু ঘোষ, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, গায়ত্রী বসু, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ভট্টাচার্য ও আরও অনেক শিল্পী। আর ছিলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সুমন কল্যাণপুর। ছিলেন কিশোর কুমার। এঁদের সকলের কন্ঠের জাদুতে বাংলা সিনেমার গান সমৃদ্ধ হয়েছে। ষাটের দশকে এলেন নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য)। তারপর হৈমন্তী শুক্লা, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সনৎ সিংহ, মুগাল চক্রবর্তী, অনুপ ঘোষাল। এঁরা প্রত্যেকেই প্রথম সারির শিল্পী হিসেবে বাংলা সিনেমায় গানের জগৎকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছেন। সত্তরের দশকের শেষ থেকেই বাংলা সিনেমার গানে দৈন্যের ছায়া ঘনায়। ওই পরে বাংলা চলচ্চিত্রে সভা চটুল গান জাকিয়ে বসে। এরপর নয়ের দশকের মাঝামাঝি বাংলা গানে আবার মোড় ফেরে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। তাঁর পরিচালনায় বাংলা সিনেমার গান আবার নতুন প্রাণের স্পর্শ পায়।

আধুনিক জীবনবোধ আসে সিনেমার গানে। তাঁর পরপরই এসেছেন নচিকেতা, ইন্দ্রনীল সেন, লোপামুদ্রা মিত্র, অঞ্জন দত্ত। বর্তমান বাংলা সিনেমার গানে প্রাধান্য পাচ্ছে বিভিন্ন ব্যান্ডের গান এবং লোকসংগীত। তবে মনে হয় আজ পর্যন্ত বাংলা সিনেমায় রবীন্দ্রসংগীতের যত ব্যবহার এবং প্রয়োজন হয়েছে এমন আর কোনো অন্য গীতিকারের গানে হয়নি। গৌরীপ্র মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী প্রমুখ গীতিকার-সুরকার বাংলা সিনেমার গানকে বৈচিত্র্যে ভরিয়ে দিয়েছেন।

আটের দশক এক কথায় আধুনিক বাংলা গানের মধ্যমেধার যুগ। কি কথায় কা সুরে, কী গায়কীতে সর্বক্ষেত্রে একট হয়ে ওঠে উৎকর্ষের অভাব। এই সময়ে বাংলা গানের শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের মাধান হয়ে ওঠে জান অথবা পুরোনো জনপ্রিয় বাংলা গানের রিমেক। এর আগে সাতের লেকের মাঝামাঝি সময়ে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনা মহীনের ঘোড়াগুলি' নামক গানের ধারার মত পরিবেশন । করে। কিন্তু তখন সে গান বাংলা গ্রহণ করেননি সেভাবে।। রপর প্রসাদ কিছুটা পাশ্চাত্য সুরের প্রভাবে আনার চরা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এরকম এক দুরবস্থার পরে নয়ের দশকের গোড়ায় সুমন চট্টোপাধ্যায়ের 'তোমাকে চাই" নামক ক্যাসেট বাংলা গানের জগতে জোয়ার আনে। বাংলা গানের মরা গাঙে আসে কথা ও সুরের চেউ। তার সাথে মন্ত্র উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন আঙ্গিক, অসাধারণ পৌরুষদৃপ্ত সুরেলা কণ্ঠ, রোমান্টিক আবেদন, প্রতিবাদী সত্তা—সব মিলিয়ে সুখনই নয়ের দশকে বাংলা গানকে ঝকঝকে, শ্যার্ট চেহারা দান করেন। বাঙালি শ্রোতার মনন এবং আবেগের কাছে সুমনের গান দারুণভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। তিনি চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা পান।

সুননের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আরও একজাক তরুণ কবি-শিল্পী বাংলা গানে প্রবেশ করেন। বিশেষ করে নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত, মৌসুমী ভৌমিক প্রমুখের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এই পর্বে বাংলা গানে তিনটি ধারা সমান্তরালভাবে বহমান, যার মধ্যে রয়েছে বাংলা গানের ঝোঁকবদলের ফলে সৃষ্ট নতুন ধারার গান যার পরিচিতি জীবনমুখী গান হিসেবে। (৯) নতুন ধারার । বাংলা গান, যেখানে গায়ক নিজেই গান লেখেন, সুর করেন এবং গেয়ে থাকেন। অনেকে এই ধারার গানকে জীবনমুখী গান' হিসেবে অভিহিত করেন। (২) বাংলা ব্যান্ডের গান। (৩) মূলত আটের দশকে তৈরি হওয়া রিমেক গান। পুরোনো দিনের গান আধুনিক ব্যায়োজনে, ডিজিট প্রযুক্তির রেকর্ডিং-এর মাধ্যমে পরিবেশন করাই 'রিমেক'। নয়ের দশকের গানে বহুক্ষেত্রেই কথা ছাপিয়ে গেছে সুরকে। এই সময়ের শিল্পীরা তাদের গানে চারপাশের পরিচিত জগৎ, জীবন, সূক্ষ্ম অনুভূতি, আত্মবোধ, প্রেম, জীবনযন্ত্রণা সমস্ত কিছুই ফুটিয়ে তুলেছেন সমসাময়িক ভাষায়। চল্লিশ পঞ্চাশের দশকের মতন নিছক স্নিগ্ধ রোমান্টিকতা আজকের গানে বিরল। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলা গানের এই নতুন পথে যাত্রা সংগীতশ্রেণী বাঙালিকে আশার আলো দেখিয়েছে।

ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের আলোচনার ক্ষেত্রে মূলত যে পদ্ধতিগুলির পরিচয় পাওয়া যায়, তার মধ্যে রয়েছে (১) ধ্রুপদ, (২) খেয়াল, (৩) EAT, (৪) ঠুংরি, (৫) ধামার প্রভৃতি। এর মধ্যে আবার ধ্রুপদ এবং খেয়াল প্রথম ধরিতে। ভারতীয় রাগসংগীতের সর্বাত্মক প্রকাশ এই দুই পদ্ধতিতেই সম্ভব। তার দৃষ্টির মধ্যে আবার গ্রুপদের গায়নশৈলী অনেকবেশি স গাম্ভীর্যপূর্ণ। মুঘলসম্রাট আকবরের রাজসভার শিল্পী তানসেনের কন্ঠেই প্রপদের বিকাশ। ওই যুগেই ধ্রুপদের সমাদর ছিল সবথেকে বেশি। মুঘল যুগের অবসানে ধ্রুপদশিল্পীরা ভারতবর্ষের নানা প্রদেশে আশ্রয় নিলেন এবং ঐ ধারা প্রতিষ্ঠা করলেন। বেতিয়া, বিষ্ণুপুর, ত্রিপুরা, ঢাকা, মেটিয়াবুরুজ অন্য পদ রুমে রুমে প্রসিদ্ধি পেল। বাংলায় বিষ্ণুপুরী ধ্রুপদধারাই বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। বিদেশে একটা সময় ধ্রুপদ এবং ইয়াই উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রধান উপকরণ ছিল। এ ছাড়াও পেখেয়াল নামে গীতিরীতিরও প্রচলন ছিল। মুঠ লয়ের খেয়াল সে-যুগে কখনো কখনো শোনা যেত। পরবর্তীকালে খেয়ালের উদ্দামতা ধ্রুপদকে প্রায় উচ্ছেদ করেছিল। তবুও ধ্রুপদ গায়নরীতিটাই বাংলা সংগীতের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীনতম পার্ক্সীয় গীতশৈলী। গ্রুপদের মধ্যে যে আভিজাত্য আছে—বাংলা ভাষাতেও রয়েছে সেই আভিজাত্য। এ কারণে বাঙালি সংগীতস্রষ্টা বাংলা গান বৃষ্টিতে গ্রুপদশৈলীকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

রোগরাগিণীর ব্যাপারেও বাংলা গানে দরবারি গ্রুপদের মতন সর্বপ্রকার রাগ। ব্যবহৃত হত। কিন্তু প্রবন্ধ গ্রুপদে ব্যবহৃত হত অসংখ্য 'দেশি' রাগ। এটি বাংলা কীর্তনাদি নাট্য-সমন্বিত গানে ব্যবহৃত হলেও বাংলা কাব্যসংগীতে তার দেখা খুব বেশি মেলেনি | প্রবন্ধ গান বা পদ খান মূলত নাট্যান্নয়ী হলেও দরবারি ধ্রুপদ গান কিন্তু নাট্যাওয়া নয়। বাংলা পদাবলি কীর্তনের পদগুলি শ্রীকৃষ্ণের জীবনালেখ্যকে অবলম্বন করে নানা পালার আকারে রচিত। এগুলিতে গাওয়ার রীতি উল্লেখিত আছে। তবু বাংলা কাব্যসংগীতে এমনটি হয় না। এক্ষেত্রে একটিমাত্র মূল বিষয়কে অবলম্বন করে তা রচিত ও গীত হয়। উনিশ শতকে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার পর ব্রাহ্মধর্মের উপাসনার অজা হিসেবে ব্রাহ্মসংগীতও গাওয়া হত। এই গান প্রধানত ধ্রুপদের আঙ্গিকেই রচিত। ধ্রুপদকেই আরাধনার সংগীতশৈলী রূপে ব্যবহার করা হত। অন্যদিকে খেয়াল, প্রায়, এমনসব গীত অন্য কার ব্যবহৃত হয় যেগুলি ধ্যানধর্মী নয়। এ ছাড়াও চৈতনায়ুগের কীর্তনগান, অষ্টাদশ শতক থেকে শুরু হওয়া বাউলগান এবং তৎপরবর্তী রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গান, আধুনিক বাংলা গানে নানাভাবেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রয়োগ ঘটেছে।

'সংগীতা নব্দটির পাশাপাশি যন্ত্রসংগীত' বলে একটি শব্দও চালু আছে দীর্ঘকাল। এর অর্থ বিভিন্ন সংগীতযন্ত্র থেকে যে শব্দ বা সুর সৃষ্টি করা হয়। বিশ্বের সমস্ত সংগীতই সমৃদ্ধ হয় যন্ত্রসংগীতের সহযোগিতায়। আদিম যুগ থেকে যে তালবাদ্য চলে আসছে অর্থাৎ ঢোল, ঢাক, ধামসা, ान এগুলিও সংগীতযন্ত্র। কোন সংগীতযন্ত্রটির করে উৎপত্তি তা নির্দিষ্ট করে আজ হয়তো বলা সম্ভব নয়। আমরা কিছু দেশি-বিদেশি স্বপ্নের নাম উল্লেখ করতে পারি, যেগুলি দীর্ঘকাল ধরে সংগীতকে প্রকাশের ক্ষেত্রে সহায়তা করে আসছে। যেমন—সেতার, সরোদ, বাঁশি, সানাই, সত্তুর, জলতরঙ্গ, বেহালা, গিটার, হারমোনিয়াম, বীণা, তানপুরা, সারেঙ্গি, একতারা, দোতারা, অ্যাকর্ডিয়ান, স্যাক্সোফোন, তবলা, পিয়ানো, অর্গ্যান ইত্যাদি। এর মধ্যে সেতারে পণ্ডিত রবিশংকর, সরোদে আমজাদ আলি, বাঁশিতে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, সত্তুরে শিবকুমার শর্মা, সানাইতে বিসমিল্লা খান, বেহালায় ভিজি যোগ, তবলায় জাকির হোসেন, পিয়ানো আর অর্থ্যানে ভি বালসারা প্রমুখ প্রথিতযশা শিল্পীরা এই যন্ত্রসংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।

যেসব যন্ত্রসংগীত শিল্পীরা গানের সঙ্গে বাজান, তাঁদের বলা হয় সহযোগী যন্ত্রী বা ইংরেজিতে মিউজিশিয়ান, চলতি কথায় 'হ্যান্ডস' | বাংলা গানে রাধাকান্ত নন্দী, নিখিল ব্যানার্জি, ভি বালসারা, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, তিমিরবরণ, পান্নালাল ঘোষ প্রমুখ যন্ত্রশিল্পী হিসেবে উল্লেখযোগ্য নাম। তবে এঁরা কেউই শুধুমাত্র সহযোগী যন্ত্রী ছিলেন না; বিশিষ্ট সুরকার হিসেবেও প্রত্যেকে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। বাংলা গানের উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রকম যন্ত্রের প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। একটা সময় শুধুমাত্র হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি অথবা ঘাতবাদ্য সহযোগে শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করতেন। পরবর্তীযুগে এল কিবোর্ড, গিটার ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে বিশেষত ব্যান্ডের গানে বিভিন্ন 'হিলেকট্রনিকস যা' ব্যবহৃত হচ্ছে যা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। শিল্পী সু চট্টোপাধ্যায় নয়ের দশকের গোড়ার দিকে সংগীতের মঞ্চ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারা বাংলা গানে নিয়ে আসেন, যেখানে সংগীতশিল্পী নিজেই গানের সাথে সহযোগী একাধিক যা বাজিয়ে যান। পরবর্তীতে এই ধারাই বাংলা গানে চালু আছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা গান ছিল মূলত অর্থসংগীত। বাংলায় নবজাগরণ পর্বে উনবিংশ শতাব্দীতে গানের ক্ষেত্রেও যুগান্তর আসে। বাংলা গান বইতে ার করে বেশ কয়েকটি ধারায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য (১) কবিগান, (২) যাত্রাদান, (c) বাউলগান, (৪) লোকমান, (৫) বাংলা (৬) রবীন্দ্রসংগীত (7) নজরুলগীতি, (৮) দ্বিজেন্দ্রলাল -রজনীকান্ত অতুলপ্রসাদের গান (3) ी (১০) আধুনিক গান, (১১) দেশাত্মবোধক গান (১২) সিনেমার গান, (১৫) ব্যান্ডের গান ইত্যাদি | এই সমস্ত ধারায় বিশিষ্ট গীতিকার এবং সুরকারদের পাশাপাশি শিল্পীদের নামও উজ্জ্বল হয়ে আছে। গীতিকার-সুরকার-শিল্পার ত্রিবেণী সংগমেই বাংলা গান আজ আপন উজ্জ্বলতার বিরাজমান। গ্রামাফোন মুখ, ক্যাসেট যুগ, সি ডি/ডিভিডি যুগ পেরিয়ে আজ 'সেনগ্রহিতা তথা ইন্টারনেটের যুগে বাংলা। গান তার নিজস্বতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পরিচিতি লাভ করেছে। এই যুগান্তর পর্বে আমরা একবার স্মরণ করি নেসের কালজয়ী শিল্পাদের। (১) কবিগানের শিল্পী হিসেবে গোঁজলা ছি র ঠাকুর, ভোলা ময়রা, রাম বসু, অ্যান্টনি কবিয়াল প্রমুখ উল্লেখযোগ্য নাম। (২) মাত্রাগানে কৃষ্ণকমল গোস্বামী, গোপাল উড়ে, মধুসূদন কিন্নর, ব্রজমোহন রায়, প্রমুখের নাম অবিস্মরণীয়, ((৩) বাউলগানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলেন লালন ফকির, গগন হরকরা, হাসন রাজা। (৪) লোক-গানের ধারায় প্রখ্যাতরা হলেন আববাসউদ্দিন, পূর্ণদাস বাউল, নির্মলেন্দু চৌধুরি, অংশুমান রায়, রুনা লায়লা, স্বপন বসু, গোষ্ঠগোপাল, অমর পাল প্রমুখ। (৫) বাংলা উমার রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু), শ্রীধর কথক, কালী মির্জা, রামশংকর ভট্টাচার্য, (৬) রবীন্দ্রসংগীতে পঙ্কজকুমার মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, পীযূষকান্তি সরকার, সুমন চট্টোপাধ্যায়, সুমিত্রা সেন. শান্তিদেব ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুবিনয় রায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য নাম। (৭) নজরুলগীতির ক্ষেত্রে ফিরোজা বেগম, ধীরেন বসু, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল প্রমুখ। (৮) দ্বিজেন্দ্রলালের গানে কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, সবিতারত দত্ত, রবীন ব্যানার্জি, রজনীকান্তের গানে ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপকুমার রায় প্রমুখ, অতুলপ্রসাদের গানে কুন্না চট্টোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। (৯) সংগীত উপস্থাপনার ক্ষেত্রে ক্রেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, প্রতুল মুখোপাধ্যায়। (১০) নতুন ধারার বাংলা গানে সুমন চট্টোপাধ্যায়, এরপর নচিকেতা চক্রবর্তী, অঞ্জন দত্ত, মৌসুমী ভৌমিক, শিলাজিৎ প্রমুখ। (১১) বাংলা ব্যান্ডের সৃষ্টিলগ্নে মহানের ঘোড়াগুলি', এ ছাড়া বর্তমানে ক্যাকটাস, চন্দ্রবিন্দু, ভূমি, ফসিলস্ ইত্যাদি। (১২) সিনেমার গানে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আলা ভোসলে, লতা মঙ্গেশকর, আরতি মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এঁরা একই সাথে বাংলা আধুনিক গানেরও প্রথিতযশা শিল্পী ।

পলাশির যুদ্ধ-পরবর্তী থেকে সিপাহি বিদ্রোহের কাল পর্যন্ত বাংলার রাগ-সংগীতের ব্যাপক প্রসারের সূচনালগ্নে ইয়ার প্রচলন রামনিধি গুপ্ত অর্থাৎ নিম্নবার (১৭৪১-১৮৬৯) রাধ করা। শুধু তাই আধুনিক বাংলা কাব্যসংগীতের প্রথম কাছ দেশে তিনিই প্রথম ইংরেজি কবিয়াল এবং সংগীতের রচয়িতা।

বাংলা গানের ধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭.৫.১৮৬১-৭.৮.১৯৪৯) অবিস্মরণীয় নাম। রবীন্দ্র সময়ের সাথে সাথে সমসাময়িক উঠেছে। বাঙালিসমাজে গানের গ্রহণযোগ্যতা চিরকালীন। মানুষের আনন্দ, দুঃখ, প্রতিবাদ, প্রকৃতিমুগ্ধতা, দেশপ্রেম, ঈশ্বর উপলখি—সমস্ত কিছুর প্রকাশ, যাকে আশ্রয় করে—তা রবীন্দ্রনাথ তার হতাশাপূর্ণ জীবনে আলোর পথ দেখায় তাঁর গান। আর গানের থেকে মান আলাদা, অनনা। স্বাধীন পৃথক রাষ্ট্রের জাতীয় রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত 'জনগণমন-অধিনায়ক এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় | "ভালবাসি"। তার গানের মোট সংখ্যা দেড় হাজারের কিছু বেশি। প্রায় সমস্ত গানের বাণী এবং সুর রবীন্দ্রনাথের। তাঁর দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য রবীন্দ্রনাথের অস্ত্র কিছু মানে সুর দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর গান সম্পর্কে বলেছেন "আমার গানের মধ্যে অতি ে मन দিনের প্রথম রহস্য, আলোকের প্রকাশ, আর সুরি শেষ রসা ভালোবাসার অমৃত"। রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করেছেন বা গানের বিষয়বিন্যাসের প্রচলিত রীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে দিয়ে। নতুনত্ব এনেছেন শুধু বিষয়ে নয়, গানের গঠনেও। যা পুরোপুরি নতুন। গান সৃষ্টির সাথে সাথে তৈরি করেছিলেন পরাবাহী হয়ে আজও তাঁর গানকে উজ্জীবিত রেখেছে প্রথম দিনের মতন। বাঙালি সমাজের গানের রুচিও তৈরি করে দিয়ে গেছেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন, প্রাচীন সংগীতের জড় পুনরাবৃত্তিতে নয়, বাংলা গানকে টিকে থাকতে হবে নিত্য নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে। তবু তাঁর গান পরম্পরাহীন নয়। ভারতীয় প্রাচীন সংগীত ধারার সাথে তা সংযোগবাহী। ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুংরির সাথে পাশ্চাত্যের সুরধারাও এসে মিশেছে তাঁর খানে, আর আছে আমাদের বাউল, কীর্তন। সবটাই উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু বিচ্ছিন্ন করা যাবে না কিছুতেই। সমন্বয়বাদী ঋষির এটাই অনন্যতা। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য এবং গীতিনাট্যগুলিতেও বহু উল্লেখযোগ্য গান রয়েছে যা বিশেষ তাৎপর্যবাহী। বাংলা সিনেমার গান হিসেবে আজও রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা সর্বাধিক।

বাংলার এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে দ্বিজেন্দ্রলাল (১৯.৭.১৮৬০ ১৭.৫.১৯১৩) সৃষ্টি করেছেন তাঁর নাটক এবং গানগুলি। যা আজও বহুলাংশে প্রাসঙ্গিক এবং জনপ্রিয়। সেই যুদ্ধে তাঁর রচিত নাটকগুলি সারা ভারতবর্ষেই প্রদর্শিত হত। ইতিহাসভিত্তিক সেই সমস্ত নাটকগুলির প্রয়োজনে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন প্রচুর গান। যার বেশিরভাগটাই ছিল দেশপ্রেমমূলক। তার সাথে রয়েছে বেশ কিছু প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনার গানও। তাঁর নাটকগুলির বিপুল জনপ্রিয়তার মূলে ছিল আদর্শবাদ এবং যুগের চাহিদা অনুসারী মদ্ধ উপস্থাপন। তাঁর গানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি সেই সময়ের সুর ধরতে পেরেছিলেন। সেই সুর এনেছিলেন তাঁর গানে।

সাজাহান নাটকের 'ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা গানটি প্রায় জাতীয় সংগীত পর্যায়ের হয়ে উঠেছিল। প্রতাপসিংহ নাটকের 'ধাও ধাও সমরক্ষেত্রে, দুর্গাদাস-এর "পাঁচশো বছর এমনি করে অথবা মেবার পতন-এর 'মেবার পাহাড় মেবার পাহাড়' সমস্ত ভারতবাসীর মন জয় করেছে। তাঁর রচিত অন্যান্য দেশাত্মবোধক গান, চিরকালীন যেমন "যেদিন সুনীল জলধি হইতো। অথবা “ভারত আমার ভারত আমার' অপূর্ব। তাঁর গান সেই সময় থেকেই দ্বিজেন্দ্রগীতি' নামে খ্যাত। রবীন্দ্র সমকালে অবস্থান করেও তার গান আপন স্বাস্ত্য বজায় রেখে কালজয়ী হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাঁর গানের ভক্ত ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গানও বিখ্যাত। যা ওই যুগে বাঙালি। প্রাতাদের নির্মল আনন্দের আহাদন এনে দিয়েছিল। তাঁর গানে তিনি দেশজ নূরের সঙ্গে পাশ্চাত্য সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, যা সুরের ক্ষেত্রে নতুনত্ব। জন দিয়েছে। বাংলা গানের এক বিরাট মুক্ত দ্বিজেন্দ্রগীতি।

রজনীকান্ত সেন (২৭.7.1-50..9০) মূলত ভক্তিগীতি এবং দেশপ্রেমমূলক গান রচনা করেছেন। বেশ কিছু হাসির গানও লিখেছিলেন। তাঁর কৈশোরে শ্যামাসংগীত রচনার মাধ্যমে তিনি আপন প্রতিভার প্রকাশ ঘটান। রাজশাহীতে থাকবার সময় তার পরিচয় ঘটে অক্ষয়কুমার মৈত্রের সঙ্গে। অক্ষয়কুমারের বাড়ির গানের আসরে তিনি নিজের তৈরি গানগুলি গাইতেন। এখানেই তিনি কবি দ্বিজেন্দ্রলালের রচিত হাসির গানগুলি শোনেন। তাঁর কবিসত্তা এবং গীতিকারসত্তা একসাথে তাঁর সৃষ্টিকে পূর্ণ করে তুলেছে। অক্ষয়কুমার মৈত্র রজনীকান্ত সম্পর্কে বলেছেন— "কাহারও বাণী ে কাহারও পদে, কাহারও বা সঙ্গীতে অভিব্যক্ত। রজনীকান্তের কান্ত পদাবলী কেবল সঙ্গীতা" তাঁর আধ্যাত্মিক মান—কেন বঞ্চিত হব চরণে', 'তুমি অরূপ, অরূপ, সমুখ, নির্গুণ', 'তুমি আমার অন্তঃস্থলের খবর জানা ইত্যাদি। তাঁর রচিত সংগীতগ্রর কল্যাণী (১৯০৫), অমৃত (১৯১০), আনন্দময়ী (১৯১০), বিশ্রাম (১৯১০), অভয়া (১৯১০), সম্ভারকুসুম (১৯৯৩), শেষদান (১৯২৭) ইত্যাদি। তার মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়া গানটি সহে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি বলেছেন- “ইহাতে মিনতির অনু আছে— নিয়তির বিধান আছে।” বাঙালির মনে রাখা রজনীকান্তের গানগুলি। তাঁর ভক্তিমূলক গানের আত্মনিবেদনের আকৃতি আজও বাঙালি শ্রোতাকে মুগ্ধ করে।

বাংলা গানের ইতিহাসে অন্যতম গীতরচয়িতা এবং সুরকার অতুলপ্রসাদ সেন (২০.০.১১-২৬.৮.৯.০৪)। রবীন্দ্রপ্রভাবিত এই গীতিকার তাঁর সৃষ্টিতে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন প্রাচীন বাংলা গানের ছক্তি এবং প্রেমগীতির ধারার সাথে রবীন্দ্রনশনের। তাঁর ভক্তিমূলক গানগুলি আত্মনিবেদনের আর্তি আর আন্তরিকতায় পূর্ণ। প্লেনের গানে রয়েছে বিরহবেদনা। ভারতীয় সংগীতের ধারা তার গানে ছায়া ফেলেছে। তাঁর ভরি ও প্রেমগীতিগুলি অনুধাবন করলেই এ কথার প্রমাণ মেলে। তাঁর সমস্ত গান সংকলিত রয়েছে গীতি (SES) নামক সংকলনে।

ভক্তি, প্রেম এবং দেশাত্মবোধ—এই তিনটি পর্যায়েই অতুলপ্রসাদ সেনের গান রয়েছে। দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে বল বল বল সবে' অথবা 'হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর ইত্যাদি জনপ্রিয়। তাঁর রচিত 'একা মোর গানের তরী', 'আমারে ভেঙে ভেঙে নাও' অথবা 'কে তুমি নদীকূলে' বাংলা গানের ঐশ্বর্য। হিন্দুস্থানী গানের সুর ও চ৬, কীর্তন ও বাউল সুর তিনি তাঁর গানে এনেছিলেন। তাঁর গানের সংখ্যা দুশোর কিছু বেশি। তাঁর আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান— উঠগো ভারতলক্ষ্মী', 'তোমারি যতনে তোমারি উদ্যানে', “কে আবার বাজায় বাঁশি' অথবা 'বঁধু এমন বাদলে তুমি কোথা প্রভৃতি। তাঁর গানের মধ্যে আছে সৌন্দর্যবোধ, ঈশ্বরানুভূতি আর ব্যক্তি হৃদয়ের আকুতি।

বাংলা গানের চারণকবি মুকুন্দদাস (১৮৭৮-১৫.৫.১৯৩৪) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার বরিশালের অদ্বিতীয় নেতা অশ্বিনীকুমার দত্তের শিষ্য, শুরুর দিকে মুকুল দাস যাত্রার গান লিখতেন। তা শুনে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত মুখ হন। মুরুদাস গ্রামে গ্রামে দেশপ্রেমমূলক গান গেয়ে বেড়াতেন, অভিনয় করতেন যাত্রাপালায়। জমদার সম্পাদিত 'মাতৃপূজা' সংকলনে তার একটি গান ছিল ধান গোলাভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা"। গানের জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকারের হাতে তেন বছর কারাদণ্ডা ও জরিমানা হয়। অসহযোগ এবং আইন অমান্য আন্দোলনের তিন যাত্রাপালা ও গান দিয়ে দেশের মানুষকে মাতিয়ে তোলেন। তাঁর 'মাতৃপূজা' নামক যাত্রাপালাটি ওই যুগে জনপ্রিয় হয় দেশের তরুণদের কাছে। তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থ সাধনসংগীত, চারিণী, পল্লীসেবা, স্বামী প্রভৃতি। বাংলা গানের এই ভিন্ন ধারার গীতিকার সারাজীবনে অজস্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু তা ছাপিয়ে তিনি বাঙালি সংগীত শ্রোতার কাছে আজও প্রিয় হয়ে আছেন তাঁর অপূর্ব গানগুলির জন্য। মুকুন্দ দাস বৈরবধর্মে দীক্ষিত হলেও তাঁর সাধনসংগীতে আছে পদাবলি ও শ্যামাসংগীতের অপূর্ব সমন্বয়। তিনি সারাজীবন কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত হননি । নিয়মিত কীর্তনের আসরেও যোগ: দিতেন। লিখতেন বরিশাল হিতৈষী পত্রিকায়। বিদেশি বর্জন উপলক্ষে রচিত তাঁর গানগুলি প্রতিবাদী মানুষের মনে ঢেউ তোলে। তাঁর গান আজও আধুনিক। বাংলা গানের ইতিহাসে তাঁর আসন চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।

একাধারে প্রেমিক কবি এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (2.5.1897-26.৮.১৯৭৬)। রবীন্দ্র যুগে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রভাববৃত্তের সম্পূর্ণ বাইরে থেকে গান রচনা করেছেন ও সুরারোপ করেছেন। বাংলার সুরের আকাশে অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। তাঁর রচিত গানগুলি 'নজরুলগীতি' নামে পরিচিত।

নজরুলের কবিতা এবং গানগুলিতে তাঁর চিরবিদ্রোহী সত্তার দৃপ্ত ঘোষণা আমরা পাই। অন্যদিকে, আবার গানে তাঁর রোমান্টিকতা, আবেগমুখতার আভাস আছে। তাঁর চিন্তায় আর প্রকাশভঙ্গিতে ছিল এক নতুন বিরুদ্ধবাদ, এক বিদ্রোহের বাণী। তাঁর রচনাগুলি আবির সমাজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধতা শুধু বিষয়ের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছিল প্রকাশভঙ্গি এবং সুরের ক্ষেত্রেও। গানের ভাষাকে গতি আর দ্যুতি দেবার জন্য তিনি শব্দসৃজনের পরীক্ষানিরীক্ষাও করেছেন। তিনি অজস্র আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দ ব্যবহার করেছেন গানে।

রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে এসে সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রায় ভিন্ন মেরুতে পৌঁছেছিলেন। নজরুল। তাতে সবথেকে খুশি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। নজরুলকে “উৎসর্গ' করেছিলেন 'বসন্ত' নাটকটি। জীবনানন্দ দাশ নজরুল সম্পর্কে বলেছেন—“বাংলার এ মাটি থেকে জেলে, এ মৃত্তিকাকে সত্যিই ভালোবেসে আমাদের দেশে ১৯ শতকের ইতিহাস প্রান্তিক শেষ নিঃসংশয়বাদী কবি নজরুল ইসলাম।” তাঁর 'কারার ঐ লৌহ কপাট' অথবা 'দুর্গমগিরি কান্তার মরু' গানগুলি ছিল সে সময়ের বিপ্লবীদের জীবনসংগীত, তিনি মূলত ভাঙার গান গেয়েছেন। যে ভাঙনের পথেই আসবে নতুন দেশ, নতুন জাতি নতুন এক সমাজব্যবস্থা | বাংলা গানের যাত্রাপথে নজরুল ইসলাম নামটি তাই অবিনশ্বর।

বাংলা গানে নতুন আলোর পথযাত্রী খ্যাতনামা সুরকার ও গীতিকার সলিল চৌধুরী (১৯.১২.১৯২২-৫.৯.১৯৯৫)। ভারতীয় সংগীতধারা সম্পূর্ণরূপে  ছায়া বাংলা শিক্ষক দ্বাদশ শ্রেণি আশ্বস্থ করে তাকে নিজের অপূর্ব সৃষ্টি কৌশলে উপস্থাপন করেন তিনি। ছয়-সাত দশকের বাংলা গান তার নতুন নতুন এর আর কার আচ্ছা ছিল। ১৯৪৪-এ তিনি যুক্ত হন না সংঘের সাথে। তার সমকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন আর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার উপলক্ষে তিনি রচনা করেছেন "বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেে সেই জনতা। ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহের সমর্থনে লিখেছেন- 'ঢেউ উঠছে, কারা ছে"। তাঁর রচিত 'আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমে। চাদ ফুল জোছনার গান আর নয়- ওগো প্রিয় মোর, খোলো বাহুডোর। পৃথিবী তোমারে যে চায় গানটির বক্তব্য অনুধাবন করলে তাঁর সমকালের চাহিদা, সমাজ রোধের উজ্জীবন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঐকান্তিক ইচ্ছার কথা বোঝা যায়। তিনি গানের সুরারোপ কথার সাথে উপযুক্ত করে তুলেছিলেন গানের সুরকে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বা সুকান্ত ভট্টাচার্যের বেশকিছু কবিতার সুরারোপ করে সেগুলিকে গান হিসেবে কালজয়ী করে দিয়েছেন সলিল চৌধুরী। হিন্দি আধুনিক গান, সিনেমার গান রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। তাঁর সমকালীন সমস্ত খ্যাতনামা ভারতীয় সংগীতশিল্পীই তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গান গেয়েছেন | বাংলা গানকে একক প্রচেষ্টাতেই তিনি নিয়ে গেছেন সম্পূর্ণ নতুন পথে, যে পথ চির-আধুনিক।

প্রতিকূল প্রকৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আদিম যুগ থেকে মানুষ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই লড়াই থেকে উদ্ভূত ছন্দ আর সুরই লোকসংগীত। তাই এই গান শ্রমজীবী মানুষের অবসর বিনোদনের গান। গায়ে গতরে ঘাটা মানুষই এই গানের স্রষ্টা। সাংস্কৃতিক নৃ-বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতে পারি, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলগুলিতে দৈনন্দিন জীবনযাপনের পাশাপাশি আমোদ-প্রমোদ, উৎসব-অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল। ছিল নৃত্য, অভিনয়, সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন অঞ্চলে লোকনৃত্য-লোকসংগীত-লোকবাদ্যযন্ত্র ইত্যাদির ব্যবহার ছিল। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, পল্লির সমাজজীবনে যে গান বহুযুগ ধরে মুখে মুখে রচিত হয়ে মুখে মুখেই প্রচার লাভ করে, তাই লোকগান।

* পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলা দেশের লোকমানের যতগুলি ধারা আছে, সেগুলিকে আমরা মূলত চারটি অঞ্চলভেদে ভাগ করতে পারি। যেমন (১) পূর্বাঞ্চল বা পূর্ববঙ্গ (২) উত্তরাঞ্চল বা উত্তরবঙ্গ (৩) পশ্চিমাঞ্চল বা মালভূমি অঞ্চল (৪) দক্ষিণাঞ্চল বা দক্ষিণবঙ্গ। এদের মধ্যে পূর্ববঙ্গের মূল। ধারাটি ভাটিয়ালি, তা ছাড়াও সারি, জারি, ধামাইল, বিয়ের গান, মুর্শিদি, মারফতি, পালাগান ইত্যাদি তবে পূর্ববঙ্গের সব গানের মধ্যে মূলত ভাটিয়ালি সুরের প্রাধান্য। উত্তরবঙ্গের প্রধান ধারাটি ভাওয়াইয়া। এ ছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা পাই চটকা, ক্ষিরোল, দীঘলনাশা, জাগগান, মনসার গান, রাজবংশী সম্প্রদায়ের নিজস্ব কিছু আচার অনুষ্ঠানমূলক গান। পশ্চিমাঞ্চল বা মালভূমি অঞ্চলের গানের মূলধারাটি ঝুমুর। তা ছাড়াও ভাদু, টুসু, রাঢ়ের বাউল কুমিগান, হাপু গান, ছড়া গান ইত্যাদির প্রচলন আছে। আর দক্ষিণবঙ্গের ধারাগুলির মধ্যে মূলধারাটি বনবিবির গান। তা ছাড়াও রয়েছে দক্ষিণরায়ের গান, দাঙ্গুরায়ের গান, অষ্টক গান, দক্ষিণবঙ্গের ভাটিয়ালি গান। ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগে মুরশিদাবাদ অঞ্চলে আলকাপ, বোলান গানের চল আছে অঞ্চলভেদে লোকগানগুলি পৃথক হলেও এগুলির মধ্যে এক। সর্বজনীন আবেদন আছে। যেমন- ঝুমুর, ভাওয়াইয়া, ঘাটু পৃথক অঞ্চলের গান হলেও এদের প্রত্যেকের বিষয়বস্তু প্রেম। ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের আŁলিক গান। বাংলাদেশের রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর, কোচবিহার ও আসামের গোয়ালপাড়া ভাওয়াইয়া গানের প্রকৃত অঞ্চল। এই গানগুলিতে স্থানীয় সংস্কৃতি, সাধার খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক ঘটনাবলির পরিচয় পাওয়া যায়। রাজবংশীরা এই গানের ধারক ও বাহক। এই গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। গানের বিষয় মূলত প্রেম । নদী-নৌকা মাঝিকেন্দ্রিক ভাটিয়ালি গান মূলত পূর্ববঙ্গের গান। এ গানের বিষয়বস্তু লৌকিক ও আধ্যাত্মিক প্রেম। এটি অলস মুহূর্তের গান, তাই এর সুর ও লয়। বিলম্বিত। বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার প্রায় নেই। সারি গানও মাঝিদের গান। তারা দাঁড় টানার সময় সারিগান গায়। প্রেমের সঙ্গে যুক্ত বলে এই গানের গতি প্রবাহ বিচিত্রমুখী। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্তজুড়ে ঝুমুর গানের চল। এটি মূলত প্রেমসংগীত। এর সুর সহজসরল। বাংলা দেশের লোকায়ত সম্প্রদায় বাউলরা তাদের গানের মাধ্যমে প্রচার করেছেন মানবতার বাণী। মানবাত্মাকে জানার মধ্যে দিয়ে পরমাত্মাকে জানা, সেই পরমে লীন হয়ে যাওয়া বা আধ্যাত্মিক প্রেমই বাউল গানের মূল উপজীব্য বিষয়। লালন সাঁই ছিলেন জাতীয় গানের প্রধান গীতিকার।

প্রতিকূল প্রকৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আদিম যুগ থেকে মানুষ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই লড়াই থেকে উদ্ভূত ছন্দ আর সুরই লোকসংগীত। তাই এই গান শ্রমজীবী মানুষের অবসর বিনোদনের গান। গায়ে গতরে ঘাটা মানুষই এই গানের স্রষ্টা। সাংস্কৃতিক নৃ-বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতে পারি, বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলগুলিতে দৈনন্দিন জীবনযাপনের পাশাপাশি আমোদ-প্রমোদ, উৎসব-অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল। ছিল নৃত্য, অভিনয়, সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন অঞ্চলে লোকনৃত্য-লোকসংগীত-লোকবাদ্যযন্ত্র ইত্যাদির ব্যবহার ছিল। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, পল্লির সমাজজীবনে যে গান বহুযুগ ধরে মুখে মুখে রচিত হয়ে মুখে মুখেই প্রচার লাভ করে, তাই লোকগান।

* পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলা দেশের লোকমানের যতগুলি ধারা আছে, সেগুলিকে আমরা মূলত চারটি অঞ্চলভেদে ভাগ করতে পারি। যেমন (১) পূর্বাঞ্চল বা পূর্ববঙ্গ (২) উত্তরাঞ্চল বা উত্তরবঙ্গ (৩) পশ্চিমাঞ্চল বা মালভূমি অঞ্চল (৪) দক্ষিণাঞ্চল বা দক্ষিণবঙ্গ। এদের মধ্যে পূর্ববঙ্গের মূল। ধারাটি ভাটিয়ালি, তা ছাড়াও সারি, জারি, ধামাইল, বিয়ের গান, মুর্শিদি, মারফতি, পালাগান ইত্যাদি তবে পূর্ববঙ্গের সব গানের মধ্যে মূলত ভাটিয়ালি সুরের প্রাধান্য। উত্তরবঙ্গের প্রধান ধারাটি ভাওয়াইয়া। এ ছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা পাই চটকা, ক্ষিরোল, দীঘলনাশা, জাগগান, মনসার গান, রাজবংশী সম্প্রদায়ের নিজস্ব কিছু আচার অনুষ্ঠানমূলক গান। পশ্চিমাঞ্চল বা মালভূমি অঞ্চলের গানের মূলধারাটি ঝুমুর। তা ছাড়াও ভাদু, টুসু, রাঢ়ের বাউল কুমিগান, হাপু গান, ছড়া গান ইত্যাদির প্রচলন আছে। আর দক্ষিণবঙ্গের ধারাগুলির মধ্যে মূলধারাটি বনবিবির গান। তা ছাড়াও রয়েছে দক্ষিণরায়ের গান, দাঙ্গুরায়ের গান, অষ্টক গান, দক্ষিণবঙ্গের ভাটিয়ালি গান। ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগে মুরশিদাবাদ অঞ্চলে আলকাপ, বোলান গানের চল আছে অঞ্চলভেদে লোকগানগুলি পৃথক হলেও এগুলির মধ্যে এক। সর্বজনীন আবেদন আছে। যেমন- ঝুমুর, ভাওয়াইয়া, ঘাটু পৃথক অঞ্চলের গান হলেও এদের প্রত্যেকের বিষয়বস্তু প্রেম। ভাওয়াইয়া উত্তরবঙ্গের আŁলিক গান। বাংলাদেশের রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর, কোচবিহার ও আসামের গোয়ালপাড়া ভাওয়াইয়া গানের প্রকৃত অঞ্চল। এই গানগুলিতে স্থানীয় সংস্কৃতি, সাধার খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক ঘটনাবলির পরিচয় পাওয়া যায়। রাজবংশীরা এই গানের ধারক ও বাহক। এই গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। গানের বিষয় মূলত প্রেম । নদী-নৌকা মাঝিকেন্দ্রিক ভাটিয়ালি গান মূলত পূর্ববঙ্গের গান। এ গানের বিষয়বস্তু লৌকিক ও আধ্যাত্মিক প্রেম। এটি অলস মুহূর্তের গান, তাই এর সুর ও লয়। বিলম্বিত। বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার প্রায় নেই। সারি গানও মাঝিদের গান। তারা দাঁড় টানার সময় সারিগান গায়। প্রেমের সঙ্গে যুক্ত বলে এই গানের গতি প্রবাহ বিচিত্রমুখী। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্তজুড়ে ঝুমুর গানের চল। এটি মূলত প্রেমসংগীত। এর সুর সহজসরল। বাংলা দেশের লোকায়ত সম্প্রদায় বাউলরা তাদের গানের মাধ্যমে প্রচার করেছেন মানবতার বাণী। মানবাত্মাকে জানার মধ্যে দিয়ে পরমাত্মাকে জানা, সেই পরমে লীন হয়ে যাওয়া বা আধ্যাত্মিক প্রেমই বাউল গানের মূল উপজীব্য বিষয়। লালন সাঁই ছিলেন জাতীয় গানের প্রধান গীতিকার।

নরনারীর জীবনপ্রবাহ, প্রেম, বিরহ ব্যাকুলতা, যৌন আবেগ, নারীর বাল্যবিবাহ প্রথা এবং জীবনযন্ত্রণা—এসব নিয়েই ভাওয়াইয়া গান। কোচবিহার, দিনাজপুরের উত্তরাংশ, বাংলাদেশের রংপুর, আসামের গোয়ালপাড়া ও ধুবড়ি—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিজস্ব সংগীত ভাওয়াইয়া। এই অঞ্চলের রাজবংশী (বা কামরূপী) ভাষায় পরিবেশিত হয় এই গান। ভাওয়াইয়া গান কারও কাছে মন উদাস করা গান, কারও কাছে ভাবের গান, কেউ আবার এই গানকে বলেন, 'বায়ুবাহিত গানা। আসলে উদাস মনে উদাত্ত কণ্ঠে এই গান পাওয়া হয়। ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রভাবিত মানুষের প্রধানত প্রেমজীবনের বিভিন্ন দিকের প্রকাশ ঘটে এই গানে। মানবজীবনের নানা স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই এই গানের বিষয়। এখানে রয়েছে তত্ত্বকথা, অর্থনৈতিক সমস্যা, জীবনের জটিলতা, শোষণ, দারিদ্র্য, মানবজীবন দর্শন, বাল্যবিবাহ, সঙ্গিনী প্রথা, হুদুমদেও নামক জাদু অনুষ্ঠান, সমাজের গিরিপ্রজা ব্যবস্থা, কাতি ও ষাইটোল পূজা, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ইত্যাদি। এই গানের মুখ্য বিষয় নরনারীর প্রেম। নায়ক সাধু মৈশাল কমু, মাহুত বন্ধু, বৈদ্য, রাখাল বন্ধু প্রভৃতি চরিত্রের কথা এই গানে জীবন হয়ে উঠেছে। একটি ভাওয়াইয়া গান “ও মো চান্দরে, ও মোর সোনা আজি ছাড়িয়া না যান বৈদ্যাশ বন্দরেরে। বাইতে চান্দ তুমি ফুটিবে জলে গানটিতে এক নারী তার পুরুষ জীবনসঙ্গীর আসন্ন বিচ্ছেদে বাধা দিতে চায় । বন্দি হোলা ফ্লটিবে তাতে মন মোর হতাশে উড়াইরে মোর, সোনারে” কারণ, সঙ্গলাভেই তার চরম প্রাপ্তি, বিরহ-বিচ্ছেদে তার যন্ত্রগা। নারীমনের ভালোবাসার বোধ এই গানে প্রকাশিত। এইভাবেই মানবপ্রেম জীবন্ত আর জলন্ত হয়ে উঠেছে ভাওয়াইয়া গানে। সাহিত্যিক আর সাংগীতিক উভয় গুণে এই গান অতুলনীয়। এই গানের প্রথিতয়শা শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। এ ছাড়াও এই গানের অন্যতম সাধক সুরেন্দ্রনাথ রায় বসুনিয়ার (১৯০৬-৭০ খ্রি.)।

উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসংগীত ভাওয়াইয়ার সঙ্গে সঙ্গে চটকার কথা উচ্চারিত হলেও আবেদনের দিক থেকে উভয়ের বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। রংপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ির নিজস্ব সংগীত ভাওয়াইয়াতে প্রেমের অনুভূতি, গভীরতা, বাজনা, বিরহ-কাতরতা ও নারীমনের নৈরাশাকে উপজীব্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ভাওয়াইয়ার সুর তাই মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর।

অন্যদিকে, চটকা হল লঘু সুরে বিন্যস্ত একপ্রকার চতুল ভাবের গান। বাহারি, মনোরঞ্জক, চটকদার বিষয় নিয়ে লেখা চটকা গানে সুরবৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। জীবনঘনিষ্ঠ নানা ঘটনা ও প্রণয়কে বিষয় করে এই গান রচিত। ভাওয়াইয়া ও চটকা গানের অবিস্মরণীয় শিল্পী আববাসউদ্দিন আহমেদ তাঁর লেখায় ভাওয়াইয়া ও চটকা গানের পার্থক্য নিরূপণ করেছেন এইভাবে “ভাওয়াইয়া টানা সুরের গান, শিল্পীর গলা ভেঙ্গে ভেঙে যায় গানের সময়, সুরের বৈচিত্র্যাও বেশি। রচনার দিক থেকে এ গান বিরহমূলক, উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি যথাযথভাবে ধরা পড়ে এ গানে, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, গরুর গাড়ি, পাহাড়ের ফাঁজ যেন এ গানের সুরে রূপ পায়। চটকা চতুল দ্রুত তালের গান।" ভাওয়াইয়া আর চটকার মধ্যে মানবিক প্রেমভাব প্রকাশে সুরবিন্যাসে, বাক্যবদ্ধ রচনায় কিংবা উচ্চারণ ভঙ্গি এবং গানের রীতির ক্ষেত্রে মিল লক্ষ করা যায় ।

ভাটিয়ালি নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লোকসংগীত হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। ভাটিয়ালি গানে মাঝি-মাল্লা, কৃষকের, মেহনতি মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-ভালোবাসা, প্রেমভক্তির পরিচয় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। তত্ত্বভারমুক্ত এই গানগুলি সুপ্রাচীন কাল থেকে পূর্ববঙ্গের মৈমনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরের লোককবিদের রচিত ভাটিয়ালি সুরের প্রক্ষেপে গড়ে উঠেছে। সুরটির নাম ভাটিয়ালি, যা পরবর্তীকালে গানগুলিরও পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। অঞ্চলবিশেষে এই সুরের পাঁচটি ধাঁচ—

সুরঙ্গ, ডাওয়াইল্যা, বিক্রমপুরা, বাখরগঞ্জা, গোপালগঞ্জ্যা-যা নির্ভর করে গায়কের কন্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গি ও শিক্ষার উপরে। প্রতিটি ধাঁচে রয়েছে চারটি 'লহর' বা টান: 'বিচ্ছেদ লংর', 'সারী লহর পর' ও 'ফেসাই শহর'। এই লহর বা চান নির্ভর করে গানের ছন্দ রচনার উপর। গুি 'বিচ্ছেদ লহর' করুণরসাত্মক গানে একক কণ্ঠে, 'সারী লহরা হাস্যরসাত্মক গানে দলবদ্ধভাবে, ঝাঁপ লহর' করুণরসাত্মক ছাড়া অন্য খানে মানানসই। এই তিনটি লহর ছাড়া বাকী সবই 'ফোসাই লহর' নামে পরিচিত।

গঠনজঙ্গির যে বৈশিষ্ট্য ভাটিয়ালিতে লক্ষ করা যায়, তা হল- (১) দু-তিনটি শব্দ নিয়ে একটি শব্দগ্রাহ এক একবারে উচ্চারিত হয়ে থাকে। (২) উচ্চারণের পরেই দীর্ঘ চান মাকে। উচ্চারণের শেষ বাটি দীর্ঘ হয়। (৩) আরম্ভেই তা প্রধানত চড়ানুরের দিকে চলে যায়, তারপর কখনো ধীর মন্দাক্রান্তাসয়ে অথবা দ্রুত ছন্দে নেমে আসে ও বিশ্রাম লাভ করে। (৪) ভাটিয়ালিতে বানুষঙ্গ খুব একটা ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। এই গানে। বৈঠার জল টানা শব্দ, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, ছন্দ পেটানোর হাতুড়ির শব্দের পালাপাশি বেহালা, বাঁশি বা সারিন্দার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।

নরনারীর জীবনপ্রবাহ, প্রেম, বিরহ ব্যাকুলতা, যৌন আবেগ, নারীর বাল্যবিবাহ প্রথা এবং জীবনযন্ত্রণা—এসব নিয়েই ভাওয়াইয়া গান। কোচবিহার, দিনাজপুরের উত্তরাংশ, বাংলাদেশের রংপুর, আসামের গোয়ালপাড়া ও ধুবড়ি—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিজস্ব সংগীত ভাওয়াইয়া। এই অঞ্চলের রাজবংশী (বা কামরূপী) ভাষায় পরিবেশিত হয় এই গান। ভাওয়াইয়া গান কারও কাছে মন উদাস করা গান, কারও কাছে ভাবের গান, কেউ আবার এই গানকে বলেন, 'বায়ুবাহিত গানা। আসলে উদাস মনে উদাত্ত কণ্ঠে এই গান পাওয়া হয়। ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রভাবিত মানুষের প্রধানত প্রেমজীবনের বিভিন্ন দিকের প্রকাশ ঘটে এই গানে। মানবজীবনের নানা স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই এই গানের বিষয়। এখানে রয়েছে তত্ত্বকথা, অর্থনৈতিক সমস্যা, জীবনের জটিলতা, শোষণ, দারিদ্র্য, মানবজীবন দর্শন, বাল্যবিবাহ, সঙ্গিনী প্রথা, হুদুমদেও নামক জাদু অনুষ্ঠান, সমাজের গিরিপ্রজা ব্যবস্থা, কাতি ও ষাইটোল পূজা, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ইত্যাদি। এই গানের মুখ্য বিষয় নরনারীর প্রেম। নায়ক সাধু মৈশাল কমু, মাহুত বন্ধু, বৈদ্য, রাখাল বন্ধু প্রভৃতি চরিত্রের কথা এই গানে জীবন হয়ে উঠেছে। একটি ভাওয়াইয়া গান “ও মো চান্দরে, ও মোর সোনা আজি ছাড়িয়া না যান বৈদ্যাশ বন্দরেরে। বাইতে চান্দ তুমি ফুটিবে জলে গানটিতে এক নারী তার পুরুষ জীবনসঙ্গীর আসন্ন বিচ্ছেদে বাধা দিতে চায় । বন্দি হোলা ফ্লটিবে তাতে মন মোর হতাশে উড়াইরে মোর, সোনারে” কারণ, সঙ্গলাভেই তার চরম প্রাপ্তি, বিরহ-বিচ্ছেদে তার যন্ত্রগা। নারীমনের ভালোবাসার বোধ এই গানে প্রকাশিত। এইভাবেই মানবপ্রেম জীবন্ত আর জলন্ত হয়ে উঠেছে ভাওয়াইয়া গানে। সাহিত্যিক আর সাংগীতিক উভয় গুণে এই গান অতুলনীয়। এই গানের প্রথিতয়শা শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। এ ছাড়াও এই গানের অন্যতম সাধক সুরেন্দ্রনাথ রায় বসুনিয়ার (১৯০৬-৭০ খ্রি.)।

ভাটিয়ালি নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লোকসংগীত হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। ভাটিয়ালি গানে মাঝি-মাল্লা, কৃষকের, মেহনতি মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-ভালোবাসা, প্রেমভক্তির পরিচয় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। তত্ত্বভারমুক্ত এই গানগুলি সুপ্রাচীন কাল থেকে পূর্ববঙ্গের মৈমনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরের লোককবিদের রচিত ভাটিয়ালি সুরের প্রক্ষেপে গড়ে উঠেছে। সুরটির নাম ভাটিয়ালি, যা পরবর্তীকালে গানগুলিরও পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। অঞ্চলবিশেষে এই সুরের পাঁচটি ধাঁচ—

সুরঙ্গ, ডাওয়াইল্যা, বিক্রমপুরা, বাখরগঞ্জা, গোপালগঞ্জ্যা-যা নির্ভর করে গায়কের কন্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গি ও শিক্ষার উপরে। প্রতিটি ধাঁচে রয়েছে চারটি 'লহর' বা টান: 'বিচ্ছেদ লংর', 'সারী লহর পর' ও 'ফেসাই শহর'। এই লহর বা চান নির্ভর করে গানের ছন্দ রচনার উপর। গুি 'বিচ্ছেদ লহর' করুণরসাত্মক গানে একক কণ্ঠে, 'সারী লহরা হাস্যরসাত্মক গানে দলবদ্ধভাবে, ঝাঁপ লহর' করুণরসাত্মক ছাড়া অন্য খানে মানানসই। এই তিনটি লহর ছাড়া বাকী সবই 'ফোসাই লহর' নামে পরিচিত।

গঠনজঙ্গির যে বৈশিষ্ট্য ভাটিয়ালিতে লক্ষ করা যায়, তা হল- (১) দু-তিনটি শব্দ নিয়ে একটি শব্দগ্রাহ এক একবারে উচ্চারিত হয়ে থাকে। (২) উচ্চারণের পরেই দীর্ঘ চান মাকে। উচ্চারণের শেষ বাটি দীর্ঘ হয়। (৩) আরম্ভেই তা প্রধানত চড়ানুরের দিকে চলে যায়, তারপর কখনো ধীর মন্দাক্রান্তাসয়ে অথবা দ্রুত ছন্দে নেমে আসে ও বিশ্রাম লাভ করে। (৪) ভাটিয়ালিতে বানুষঙ্গ খুব একটা ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। এই গানে। বৈঠার জল টানা শব্দ, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, ছন্দ পেটানোর হাতুড়ির শব্দের পালাপাশি বেহালা, বাঁশি বা সারিন্দার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।

সারিগান সংগ্রামপ্রবৃত্তিজাত মৌলিক আবেগ প্রকাশক কর্মসংগীত। নৌকার মাঝি —যারা বৈঠা টানে আর নৌকা চালায়, তারাই এই গানের ধারক বাহক। এই গানের মূল উদ্দেশ্য— একঘেয়ে কাজের ভার কিছুটা লাঘব করা আর মনের আনন্দ প্রকাশ। এ জাতীয় গানে ছেলেরাই গায়ক। কাজের ছন্দে ছন্দে তারাই সমবেত কন্ঠে এ গান গায়। জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে এ গানের ধারা আজও বহমান। যুগে যুগে এ গান রচিত হয়েছে। এই শতাব্দীর সূচনা থেকে অধিকাংশ সারিগান নৌকা বাইচের গানরূপে সংগৃহীত হয়েছে। পরবর্তীকালে ছাদ পেটাইদের কর্মসংগীত রূপেও এই গানের ব্যবহার শুরু হয়। কাজের সাথে গান আর গান গেয়ে গেয়ে কাজ-এর মাধ্যমে বাঙালি জাতি জীবনকে সরস ও প্রাণচঞ্চল করেছে। সারিগান আসলে শ্রমজীবী গোষ্ঠীর একান্ড হলেও এর জনপ্রিয়তা দেশব্যাপী। জাতীয় ঐতিহ্যের প্রসঙ্গে জারি ও সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ব্রতকথা, ব্রতচারী, আলপনা, পটচিত্র প্রায় একসাথেই উচ্চারিত হয়। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল দুই প্রিয় গীতিকারই সারিগানের সুরে গান সৃষ্টি করেছেন। এ গানে ভাবের গভীরতা নেই, আছে বিষয়ের বৈচিত্র্য। প্রধানত পাঁচটি উত্স থেকে বিষয় সংগ্রহ করে সারিগান রচনা করা হয়। যেমন— (১) পৌরাণিক রাধাকৃর প্রসঙ্গ (২) ঐতিহাসিক — নিমাই সন্ন্যাস প্রসঙ্গ, (৩) লৌকিক-লৌকিক প্রেম ও জীবন, (৪) আধ্যাত্মিক দেবতত্ত্ব ও মরমীয়াবাদ, (৫) ব্যঙ্গকৌতুক আক্রমণ ও রঞ্জারসিকতা। তবে এই গানে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ জাগতিক ও মানবিক আবেগ-আকাঙ্ক্ষার রূপক হিসেবেই ব্যবহৃত । সে দিক থেকে এ গান সম্পূর্ণ ইহজাগতিক। সারিগান তালপ্রধান। প্রধানত দাদরা ও কাহারবা—এই দুটি তালে গাওয়া হয়। বদরপিরের নামে রচিত সারি আছে। একটি সারিমানের দুই পড়তি - "এমন রঙের নাও বানাইয়ামে

মন মাঝি রে, রঙরাজ দেখাইয়া দে মোরে।।”

লোকগানের সবথেকে আকর্ষণীয় দিক তার স্বতংস্কৃততা আর অকৃষিন সুর। বিশেষ করে ঝুমুর গানে এই সুরের মূর্ছনা এক অপূর্ব পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, আ কিছু অংশ ঝুমুর বলয়। সামুর মূলত প্রেমসংগীত। কৃষ্ণরাধার প্রেমই হ ছাপিয়ে বাঙালির জীবনে প্রেমের রূপ পায়। তার ফলে বহুক্ষেত্রে লোকায় জীবনে এই গান নারী-পুরুষের প্রেম প্রকাশের মাধ্যম। ঝুমুর তাই এর মৃত্তিকাশ্রয়ী, বর্ণময় ভাব ও রসবৈচিত্রাযুক্ত গান। ভারতবর্ষের লোকসংগীরের পরিপ্রেক্ষিতেও অনন্য। এ গানের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। প্রধানত কৰ্মী, লোই সাঁওতাল, ভূমিজ, মুন্ডা, হো, বাউরি, হাড়ি, বাজোয়ার প্রভৃতি আদিবাসীদের সমাজে ঝুমুর প্রাণের সম্পদ। তাঁরা এ গান মাদল, ধামসা, বাঁশি, ঘুঙুর, ফোন, চেরাপেটি, সহযোগে গায়। ঝুমুরের সুরের সাথে সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ একদম মিলে যায়। লালমাটি, পাথর, চেউখেলানো জমি, বনা শাল, কুসুম, শিমুল, মহুয়া, আর পলাশ। আর রয়েছে টিলা, পাহাড়ি নদীর বাঁক। প্রাথমিকভাবে ঝুমুরকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়— (১) লৌকিক ও (২) দরবারি প্রয়োগগত দিক থেকে ঝুমুর হয় রকম— (১) নাচনি নাে ঝুমুর, (২) চাঁড় ঝুমুর, (৩) ছৌ নাচের ঝুমুর, (৪) খেমটা নাচের (৫) করম নাচের ঝুমুর আর, (৬) পাতা নাচের ঝুমুর। মানে অধ্যাত্মভাবনা যেমন আছে, তেমনি আছে সামাজিক রীতিনীতি, জীবনযাপন চিত্র, অভাব, লড়াইয়ের আহ্বান, পুরাণ, রাজনীতি, ইতিহাস, আর সব ছাপিয়ে প্রেম। সে প্রেম লৌকিক এবং তাতে দেহেরই প্রাধান্য। ষোড়শ শতকে প্রान সংগীতবিষয়ক গ্রন্থ 'সংগীত দামোদর'-এ ঝুমুর এবং সংজ্ঞাদান প্রসঙ্গে শৃঙ্গার রসের আধিক্যের কথাই বলা হয়েছে। একটি ঝুমুর গানে দেখি— “চোখে চোখে ইশারাতে আর মনের কথা বলি তোমাকে, রসিক যে জন বুঝবে সে জন আমার মনের বেদনা।/ ও হামার যৌবন-জ্বালা বড়ো জানা বন্ধু বিঁধেছে মদনা।” উল্লেখযোগ্য ঝুমুর পদকর্তা জগৎ কবিরাজ, পদার চৌধুরী, ভবপ্রীতানন্দ ওঝা, রামকৃর গাঙ্গুলি, সৈকত রক্ষিত প্রমুখ।

বাউল সাধনা বিশ্বের অন্যতম মরমিয়া সাধনা। এই সাধকেরা বৈদিক হিন্দু এবং শরিয়তি ইসলাম থেকে কুদূরে অবস্থান করেন। আসলে মা সংস্কারমুক্ত এবং ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠান থেকে সরে থাকেন। বাউলের মরমিয়া প্রেম আসলে রূপের মধ্যে অরূপ সাধনা। রূপ বা দেহ সাধনার মাধ্যমে অরুণ অর্থাৎ নিরাকার পরমাত্মার সন্ধানই বাউল সাধনার মন্ত্র। বাংল লৌকিক ধর্ম ও লোকজীবন পরিচয়ের অন্যতম শিল্পমাধ্যম এই বাউলগান। এই গানে বাংলার আধ্যাত্মিকতা, আচার-অনুষ্ঠান, শরীরসাধনা তমা দেহবাদ জাদুবিদ্যাচর্চা সমস্ত কিছুই প্রত্যক্ষ করা যায়। তাদের মান একাধারে সাহিত্য ও সংগীত হিসেবে একটি স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছে। বাউলরা কেবল ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়, তারা গায়ক সম্প্রদায়ও। তবে তাদের ধর্মসাধনার মাধ্যম মান। অক্ষয়কুমার দত্ত বাউলদের 'উপাসক সম্প্রদায়' বলে উল্লেখ করেছেন। এঁরা গেরুয়া বস্ত্র পরিধান করেন, হাতে একতারা। নির্দিষ্ট আখড়ায় তারা সমবেত হন। তাদের সাধনসঙ্গিনীও থাকে। যদিও তাঁরা আরডোলা, ছাড়া এবং বৈরাগ্যপখী। তাঁরা গান গেয়ে মনের মানুষের সংস্থান করেন। বাউল ভক্ষাজীবী, ছা বাউল আর পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাউলরা ভাবের পাগল। তাঁদের প্রভাবই সু বাউলদের পাগল, ক্ষ্যাপা বা পোনাইও বলা হয়। বাউলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবির জালন শাহ। তিনি প্রতিভাবান কবি। রান রানা করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে ছিলেন। তিনি হিন্দু না মুসলমান সেই বিতর্ক আজও তেছে। আসলে তিনি সর্বসংস্কারমুক্ত এক মরমিয়া সাধক। তাঁর গানে পাঠ পূর্ব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, লাগন কয় জাতের কীরূপ দেখলাম না এই নজরে।” তাঁর একটি বিখ্যাত গান "খাঁনের ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়/ধরতে পারলে মনো বেড়ি দিতাম তাহার পায় ।"

আরাফ সিদ্দিকী তাঁর 'লোকসাহিত্য গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে জারিগান সম্বন্ধে লিখেছেন—“শোকবিংবর মহরম মাসেই জারিগানের ব্যবস্থা হয়-এতে মানসিকভাবেও শ্রোতা-দর্শক দল প্রস্তুত থাকত। অঞ্চলে উন্মুক্ত বৃক্ষবা শামিয়ানার নীচে হওয়া জারি গানে সাধারণত দুইটি থাকত। একদল পরিশ্রান্ত হলে অন্যদল গাইত। প্রধান কবিয়ালের পায়ে নূপুর, হাতে দক্ষ্, কখনও গালে হাত দিয়ে (বাংলা কথ) গান করত কখনও মধ্যে বসা বয়াতির চারিদিকে চক্রাকারে ঘুরে বাজনা বাজাত সোহারগণ বয়াতি গানের মাধায়ে নানা অাডঙ্গি করে কাহিনিকে গিয়ে নিতে ....... লোকের মহরম মাসে এই জারিগান শুনে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের চোখ অনুসজল হয়ে উঠত। বীররস, হাস্যরস, কররসের অপরূপ মিশেলে। তৈরি এবং অপূর্ব উপস্থিত বুদ্ধি বলে স্বতঃসान লোকায়ত বাংলা এবং লোকমানসের অত্যন্ত কাছের সামগ্রী, অসাধারণ জনপ্রিয়। জারিগানেও বন্দনা অংশ লক্ষ করা যায়। মহরম ম অন্যসময়ে সোনাভান, চাতেমতাই, বেচুলা-লখিন্দরের কাহিনি নিয়ে জারিগানের আদলে গান তৈরি হতে দেখা যায়। নারীভূমিকায় কিশোরদের অংশগ্রহণে তা লোকরঞ্জক হয়ে উঠেছিল।

বাংলার মুসলমান সমাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বহুপ্রচলিত নাচ হল জারিনাচ। শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা মহরমপুর পালনকে ধর্মীয় অঙ্গ বলে মনে করেন। মহরমের চাদ দেখার রাত থেকে জারিগানের সঙ্গে শুরু হ জারিনাচ, চলে প্রায় দশদিন। সাধারণত এক একটি দলে ১৫-২০ জন কিশোর ও তরুণ এই নাচে অংশ নেয়। দলের প্রধান যিনি, তিনি গান করেন, কিন্তু নাচে অংশগ্রহণ করেন না। গায়ককে অঞ্চলবিশেষে হাদি, দে বয়াতি, জোগালি—ইত্যাদি নামে বোঝানো হয়ে থাকে। মানে ও নাচে অংশগ্রহণকারীদের 'পাইল', 'দোহার' বলা হয়। সাধারণত প্রতিদিনের ব্যবহারের লুজি, শার্ট বা গেছি, হাতে ও মাথায় লাল রুমাল জড়িয়ে জারিয়ালরা নেচে থাকে। কেউ কেউ পায়ে নূপুর বাঁধে। | কোথাও বয়াতি চটি নামক চামড়ার তৈরি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে, দোহারা হাততালি দেয়। মুরশিদাবাদে 'ঝরানি রাজ্যও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।জারিনাচ বৃত্তাকার রেখায় হয়ে থাকে। লায়ন প্রধানত কারবা পরসের গামা পায়, দোহারেরা দিলা বা পড়ান গেয়ে তাকে সাহায্য করে। লোকাভাব ফুটিয়ে তোলাই জারিগান বা জারিনাদের মূল লক্ষ্য। উৎসবের শেষ দিনে স্থানীয় কোনো দরগাহ বা কারবালায় বিভিন্ন সমাবেশে নাচ গান উৎসাহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

 

আধুনিক বাংলা গানে নিজস্ব গায়কি এবং অসামান্য বুৎপত্তি মান্না দে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। খ্রিস্টাব্দের মে কলকাতার এক বনেদি বাড়িতে তাঁর জন্ম। তাঁর রতেই ছিল উত্তরাধিকার। কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে সেকালের বিস্ময়কর সংগীতস্রষ্টা। তাঁর কাজেই দের শৈশবের সংগীত হয়েছিল। এ ছাড়াও ওস্তাদ দবীর ধারে কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষা নেন। ছোটোবেলায় খেলাধুলাতেই আগ্রহ স্কটিশচার্চ কলেজে ইন্টারমিডিয়েটা পড়ার সময়ে কলেজ উৎসবে তিনবার মান্না দে প্রথম হন। বলা যেতে পারে বাংলা গানের জগতে নক্ষত্রের জন্ম হয় থেকেই। ১৯৪২-এ কাকা কৃরতে দের সঙ্গী তিনি মুম্বাই যান। এখানে প্রথমে কাকা এবং পরে শচীনদেব বর্মন অন্যান্যদের সঙ্গে পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। তামান্না! সুরাইয়া-র “জানো, আমি ঊষা দিয়ে শিল্পী হিসেবে মান্না দের আবির্ভাব ১৯৫০-এ 'মশাল' ছবিতে শিল্পী হিসেবে মান্না দে-কে পাওয়া যায়। এর মধ্যেই নিজে পরিচালনা ব্যস্ততার মধ্যেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিয়েছেন ওস্তাদ আমন আলি খান ওস্তাদ আব্দুল রহমান কাছে এবং ধীরে ধীরে হিন্দি ও ওঠেন মান্না ১২৫০টি বাংলা গান গেয়েছেন। আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, ভক্তিগীতি সংগীতের শাখাতেই ছিল ভোজপুরি, মৈথিলি, অসমিয়া, ওড়িয়া, গুজরাটি, পাঞ্জাবিসহ সবকটি ভারতীয় মান্না দে করেছেন। 'লঘবেনা', 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি', 'চৌরঙ্গি, "তিন অধ্যায়', 'বনপলাশীর 'মৌচাক', 'গুরু', অসংখ্য চলচ্চিত্রে মান্না দের গাওয়া ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। বাঙালির চিরস্থায়ী জায়গা করেছে। ওপার থেকে', 'দীপ ছিল শিখা ছিল', 'কফি হাউসের আড্ডাটা, "আমি যে জলসাঘরে' ইত্যাদি অজস্র চলচ্চিত্রে একাধিকবার জাতীয় তাঁকে পদ্মভূষণ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে।

ভাটিয়ালি নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লোকসংগীত হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। ভাটিয়ালি গানে মাঝি-মাল্লা, কৃষকের, মেহনতি মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-ভালোবাসা, প্রেমভক্তির পরিচয় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। তত্ত্বভারমুক্ত এই গানগুলি সুপ্রাচীন কাল থেকে পূর্ববঙ্গের মৈমনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরের লোককবিদের রচিত ভাটিয়ালি সুরের প্রক্ষেপে গড়ে উঠেছে। সুরটির নাম ভাটিয়ালি, যা পরবর্তীকালে গানগুলিরও পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। অঞ্চলবিশেষে এই সুরের পাঁচটি ধাঁচ—

সুরঙ্গ, ডাওয়াইল্যা, বিক্রমপুরা, বাখরগঞ্জা, গোপালগঞ্জ্যা-যা নির্ভর করে গায়কের কন্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গি ও শিক্ষার উপরে। প্রতিটি ধাঁচে রয়েছে চারটি 'লহর' বা টান: 'বিচ্ছেদ লংর', 'সারী লহর পর' ও 'ফেসাই শহর'। এই লহর বা চান নির্ভর করে গানের ছন্দ রচনার উপর। গুি 'বিচ্ছেদ লহর' করুণরসাত্মক গানে একক কণ্ঠে, 'সারী লহরা হাস্যরসাত্মক গানে দলবদ্ধভাবে, ঝাঁপ লহর' করুণরসাত্মক ছাড়া অন্য খানে মানানসই। এই তিনটি লহর ছাড়া বাকী সবই 'ফোসাই লহর' নামে পরিচিত।

গঠনজঙ্গির যে বৈশিষ্ট্য ভাটিয়ালিতে লক্ষ করা যায়, তা হল- (১) দু-তিনটি শব্দ নিয়ে একটি শব্দগ্রাহ এক একবারে উচ্চারিত হয়ে থাকে। (২) উচ্চারণের পরেই দীর্ঘ চান মাকে। উচ্চারণের শেষ বাটি দীর্ঘ হয়। (৩) আরম্ভেই তা প্রধানত চড়ানুরের দিকে চলে যায়, তারপর কখনো ধীর মন্দাক্রান্তাসয়ে অথবা দ্রুত ছন্দে নেমে আসে ও বিশ্রাম লাভ করে। (৪) ভাটিয়ালিতে বানুষঙ্গ খুব একটা ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। এই গানে। বৈঠার জল টানা শব্দ, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, ছন্দ পেটানোর হাতুড়ির শব্দের পালাপাশি বেহালা, বাঁশি বা সারিন্দার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।

ভাটিয়ালি নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লোকসংগীত হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। ভাটিয়ালি গানে মাঝি-মাল্লা, কৃষকের, মেহনতি মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-ভালোবাসা, প্রেমভক্তির পরিচয় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। তত্ত্বভারমুক্ত এই গানগুলি সুপ্রাচীন কাল থেকে পূর্ববঙ্গের মৈমনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরের লোককবিদের রচিত ভাটিয়ালি সুরের প্রক্ষেপে গড়ে উঠেছে। সুরটির নাম ভাটিয়ালি, যা পরবর্তীকালে গানগুলিরও পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। অঞ্চলবিশেষে এই সুরের পাঁচটি ধাঁচ—

সুরঙ্গ, ডাওয়াইল্যা, বিক্রমপুরা, বাখরগঞ্জা, গোপালগঞ্জ্যা-যা নির্ভর করে গায়কের কন্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গি ও শিক্ষার উপরে। প্রতিটি ধাঁচে রয়েছে চারটি 'লহর' বা টান: 'বিচ্ছেদ লংর', 'সারী লহর পর' ও 'ফেসাই শহর'। এই লহর বা চান নির্ভর করে গানের ছন্দ রচনার উপর। গুি 'বিচ্ছেদ লহর' করুণরসাত্মক গানে একক কণ্ঠে, 'সারী লহরা হাস্যরসাত্মক গানে দলবদ্ধভাবে, ঝাঁপ লহর' করুণরসাত্মক ছাড়া অন্য খানে মানানসই। এই তিনটি লহর ছাড়া বাকী সবই 'ফোসাই লহর' নামে পরিচিত।

গঠনজঙ্গির যে বৈশিষ্ট্য ভাটিয়ালিতে লক্ষ করা যায়, তা হল- (১) দু-তিনটি শব্দ নিয়ে একটি শব্দগ্রাহ এক একবারে উচ্চারিত হয়ে থাকে। (২) উচ্চারণের পরেই দীর্ঘ চান মাকে। উচ্চারণের শেষ বাটি দীর্ঘ হয়। (৩) আরম্ভেই তা প্রধানত চড়ানুরের দিকে চলে যায়, তারপর কখনো ধীর মন্দাক্রান্তাসয়ে অথবা দ্রুত ছন্দে নেমে আসে ও বিশ্রাম লাভ করে। (৪) ভাটিয়ালিতে বানুষঙ্গ খুব একটা ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। এই গানে। বৈঠার জল টানা শব্দ, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, ছন্দ পেটানোর হাতুড়ির শব্দের পালাপাশি বেহালা, বাঁশি বা সারিন্দার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।

নরনারীর জীবনপ্রবাহ, প্রেম, বিরহ ব্যাকুলতা, যৌন আবেগ, নারীর বাল্যবিবাহ প্রথা এবং জীবনযন্ত্রণা—এসব নিয়েই ভাওয়াইয়া গান। কোচবিহার, দিনাজপুরের উত্তরাংশ, বাংলাদেশের রংপুর, আসামের গোয়ালপাড়া ও ধুবড়ি—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিজস্ব সংগীত ভাওয়াইয়া। এই অঞ্চলের রাজবংশী (বা কামরূপী) ভাষায় পরিবেশিত হয় এই গান। ভাওয়াইয়া গান কারও কাছে মন উদাস করা গান, কারও কাছে ভাবের গান, কেউ আবার এই গানকে বলেন, 'বায়ুবাহিত গানা। আসলে উদাস মনে উদাত্ত কণ্ঠে এই গান পাওয়া হয়। ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রভাবিত মানুষের প্রধানত প্রেমজীবনের বিভিন্ন দিকের প্রকাশ ঘটে এই গানে। মানবজীবনের নানা স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই এই গানের বিষয়। এখানে রয়েছে তত্ত্বকথা, অর্থনৈতিক সমস্যা, জীবনের জটিলতা, শোষণ, দারিদ্র্য, মানবজীবন দর্শন, বাল্যবিবাহ, সঙ্গিনী প্রথা, হুদুমদেও নামক জাদু অনুষ্ঠান, সমাজের গিরিপ্রজা ব্যবস্থা, কাতি ও ষাইটোল পূজা, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ইত্যাদি। এই গানের মুখ্য বিষয় নরনারীর প্রেম। নায়ক সাধু মৈশাল কমু, মাহুত বন্ধু, বৈদ্য, রাখাল বন্ধু প্রভৃতি চরিত্রের কথা এই গানে জীবন হয়ে উঠেছে। একটি ভাওয়াইয়া গান “ও মো চান্দরে, ও মোর সোনা আজি ছাড়িয়া না যান বৈদ্যাশ বন্দরেরে। বাইতে চান্দ তুমি ফুটিবে জলে গানটিতে এক নারী তার পুরুষ জীবনসঙ্গীর আসন্ন বিচ্ছেদে বাধা দিতে চায় । বন্দি হোলা ফ্লটিবে তাতে মন মোর হতাশে উড়াইরে মোর, সোনারে” কারণ, সঙ্গলাভেই তার চরম প্রাপ্তি, বিরহ-বিচ্ছেদে তার যন্ত্রগা। নারীমনের ভালোবাসার বোধ এই গানে প্রকাশিত। এইভাবেই মানবপ্রেম জীবন্ত আর জলন্ত হয়ে উঠেছে ভাওয়াইয়া গানে। সাহিত্যিক আর সাংগীতিক উভয় গুণে এই গান অতুলনীয়। এই গানের প্রথিতয়শা শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। এ ছাড়াও এই গানের অন্যতম সাধক সুরেন্দ্রনাথ রায় বসুনিয়ার (১৯০৬-৭০ খ্রি.)।

ভাটিয়ালি নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লোকসংগীত হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। ভাটিয়ালি গানে মাঝি-মাল্লা, কৃষকের, মেহনতি মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-ভালোবাসা, প্রেমভক্তির পরিচয় নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। তত্ত্বভারমুক্ত এই গানগুলি সুপ্রাচীন কাল থেকে পূর্ববঙ্গের মৈমনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরের লোককবিদের রচিত ভাটিয়ালি সুরের প্রক্ষেপে গড়ে উঠেছে। সুরটির নাম ভাটিয়ালি, যা পরবর্তীকালে গানগুলিরও পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। অঞ্চলবিশেষে এই সুরের পাঁচটি ধাঁচ—

সুরঙ্গ, ডাওয়াইল্যা, বিক্রমপুরা, বাখরগঞ্জা, গোপালগঞ্জ্যা-যা নির্ভর করে গায়কের কন্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গি ও শিক্ষার উপরে। প্রতিটি ধাঁচে রয়েছে চারটি 'লহর' বা টান: 'বিচ্ছেদ লংর', 'সারী লহর পর' ও 'ফেসাই শহর'। এই লহর বা চান নির্ভর করে গানের ছন্দ রচনার উপর। গুি 'বিচ্ছেদ লহর' করুণরসাত্মক গানে একক কণ্ঠে, 'সারী লহরা হাস্যরসাত্মক গানে দলবদ্ধভাবে, ঝাঁপ লহর' করুণরসাত্মক ছাড়া অন্য খানে মানানসই। এই তিনটি লহর ছাড়া বাকী সবই 'ফোসাই লহর' নামে পরিচিত।

গঠনজঙ্গির যে বৈশিষ্ট্য ভাটিয়ালিতে লক্ষ করা যায়, তা হল- (১) দু-তিনটি শব্দ নিয়ে একটি শব্দগ্রাহ এক একবারে উচ্চারিত হয়ে থাকে। (২) উচ্চারণের পরেই দীর্ঘ চান মাকে। উচ্চারণের শেষ বাটি দীর্ঘ হয়। (৩) আরম্ভেই তা প্রধানত চড়ানুরের দিকে চলে যায়, তারপর কখনো ধীর মন্দাক্রান্তাসয়ে অথবা দ্রুত ছন্দে নেমে আসে ও বিশ্রাম লাভ করে। (৪) ভাটিয়ালিতে বানুষঙ্গ খুব একটা ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। এই গানে। বৈঠার জল টানা শব্দ, নদীর ঢেউয়ের শব্দ, ছন্দ পেটানোর হাতুড়ির শব্দের পালাপাশি বেহালা, বাঁশি বা সারিন্দার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।