Chapter-19, বাংলা চিত্রকলার ইতিহাস – সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

বাংলার প্রাচীনতম ছবির নিদর্শন পাওয়া যায় পালরাজা প্রথম মহিপালদেবের শাসনকালের ষষ্ঠ বছরে। আনুমানিক ৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে নালন্দা মহাবিহারে লেখা 'অষ্টসহব্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা' পুঁথির বারোটি রঙিন ছবি তালপাতার উপরে আঁকা হয়েছিল। তাঁর আমলের আঁকা আরও দুটি পুথি এবং পালরাজাদের দীর্ঘ সাড়ে চারশো বছরের শাসনপর্বের বহু পুথিচিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও তাদের আমলে স্থাপত্য, ভাষ্কর্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। ধর্মপাল দক্ষিণবিহারের ওদন্তপুরী ও বিক্রমশীলা আর উত্তরবঙ্গের সোমপুর বিহারের সংস্থাপক ছিলেন। দেবপাল, প্রথম মহিপাল, ছিলেন নালন্দা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষক, যেখানে তাদের সময়কালীন দু প্রস্তর ও ধাতুর মূর্তির সন্ধান মিলেছে। এ ছাড়াও মহাযানপন্থী যৌথ পালরাজাদের শাসনকালে আঁকা ছবিতে যানী, বজ্রযানী ও কালচক্রমানী দেবদেবীর প্রতিমার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ধর্মপাল ও দেবপালের সমসাময়িক ইতিহাসবিখ্যাত ভাষ্কর তথা চিত্রশিল্পী ধীমান ও তাঁর পুত্র বিটাপাল পূর্বদেশীয় এবং মধ্যদেশীয় রীতিতে ছবি আঁকেন। পালযুগের পুথিচিত্রে গৌতম বুদ্ধের জীবনের প্রধান আটটি ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। এগুলি | (1) লুম্বিনী বনে জন্ম, (২) বুদ্ধগয়ায় বোধিলাভ, (৩) সারনাথে ধর্মচক্র প্রবর্তন, (৪) কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ, (৫) শ্রাবন্তী নগরে আলৌকিক ক্রিয়া প্রদর্শন, (৬) সকাশ্যে স্বর্গাবতরণ, (৭) রাজগৃহে নালগিরি বর্ণীকরণ এবং (৮) বৈশালীর আম্রবনে বানরের মধুদান গ্রহণ। এ ছাড়াও ও যুগের চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে মহাযান বজ্রমানসম্মত দেবদেবীর প্রতিকৃতি, যার মধ্যে রয়েছেন প্রজ্ঞাপারমিতা, তারা, লোকনাথ, মৈরেয়, মহাকাল, বজ্রপাণি, বসুধারা প্রমুখ। অবশ্য ভারতীয় চিত্রকলার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে গুপ্ত। সম্রাটদের শাসনকালে (৩২০-৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ)।

বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলই বৌদ্ধ পালরাজাদের অধিকার থেকে প্রকাদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুগামী সেন ও বর্ষণ রাজাদের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। পালরাজাদের পরধর্মসহিন্নতার প্রতিফলন শিল্প-স্থাপত্য-ভাস্কর্যের মধ্যেও ধরা দিয়েছিল। কিন্তু সেন বর্মণ রাজাদের আমলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা চরম নিগৃহীত হয়। ফলে পাল-পুথিচিত্রের ধারাটি ক্রমণ বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে তুর্কি আক্রমণের ফলশ্রুতিতে দক্ষিণবিহার ও বাংলার বৌদ্ধবিহারগুলি ধ্বংস হলে নিরাশ্রয়। পূর্ব ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নেপাল ও তিব্বতে আশ্রয় নেন। এবং এভাবেই সেখানে পূর্ব ভারতীয় শিল্পরীতি স্থান পায়। তাঁদের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই বাংলার রূপকলার ভিত্তিতে নেপাল ও তিববতের ভাস্কর্য ও চিত্রকলা গড়ে ওঠে।

সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে (১৩৪২-৫৭ খ্রিস্টাব্দ) বাংলায় সুশাসন। প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীকালে হুসেন শাহির শাসনকালে তা আরও ব্যাপ্তি লাভ করে। সুলতানি আমলে বাংলার স্থাপত্যে বাঙালির সৃজনশীলতার পাশাপাশি উত্তর ভারতীয় সুলতানি স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়। মুসলিম শাসনের সূচনাপর্বে বাংলার মূর্তি ও চিত্রকলা অনুশীলন ব্যাহত হলেও গ্রামীণ লোকচিত্রের মাধ্যমে তা আপন অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল, যার পরিচয় গ্রামবাংলার পটচিত্রে সহজেই পাওয়া যায়। এ ছাড়াও গৌড়ের মসজিদ ও সমাধিসৌধে পোড়ামাটির ইট ও টালির উপর অলংকরণে নানান নকশার এ দেশীয় কারিগরদের শিল্পপ্রতিভার সাক্ষ্য ছড়িয়ে রয়েছে। সেই চিত্রকলায়। পশ্চিম এশিয়ার আরবীয় ও ভারতীয় নকশার অপরূপ সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

বাংলার নবাব মুরশিদকুলি খাঁ (১৭০০-১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ)-র আমলে নিছক ধর্মীয় কারণেই দিল্লি থেকে আসা শিল্পীরা মহরম আর খাজাখিজির উৎসবে অম্রফলকের লন্ঠন চিত্রণের কাজ করতেন। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে আঁকা একটি | ছবিতে এই উৎসবের রূপ ফুটে উঠেছে, যাতে মুঘল শৈলীর পরস্পরায় দুরশিদাবাদ শৈলীর প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়।

দুরশিদাবাদ শৈলীর প্রকৃত বিকাশ ঘটে মুরশিদকুলি খাঁর শাসনকালের পরে। সুজাউদ্দিন বা সরফরাজ খাঁ-র আমলের কোনো মুরশিদাবাদ শৈলীর ছবি পাওয়া যায়নি। আলিবর্দি খাঁর সময়কালে এই নেলীর বিকাশ ও সমৃদ্ধি বটেছিল (বিশেষত ১৭৫০-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)। তার আমলে আঁকা ছবিতে শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বার্তা মেলে। শিল্পীর আঁকা ছবিতে তাঁর শিকার করার ও সপার্ষদ সময় কাটানোর মুহূর্তগুলি ধরা পড়েছে।

সিরাজ-উদ্-দৌলার শাসনকালে তাঁর বর্ণময় বিলাসী জীবনযাত্রার প্রভাব শিল্পকলাকেও প্রভাবিত করে। মুরশিদাবাদ শৈলীতে বৈচিত্র্য ও সজীবতা দেখা দেয়। কোথাও সকাল-সন্ধ্যার চিত্রসমৃদ্ধ রাগমালা সিরিজের ছবি আঁকা হয়। আবার কোনো ছবির বিষয় হয়ে ওঠেন সিরাজ নিজেই। ছবির জ্যামিতিক বিন্যাস নিয়েও নানা পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়। কখনও তা দূরে সরিয়ে রেখেই শিল্পীরা গ্রামবাংলার জীবনধারা ছবিতে ফুটিয়ে তোলেন। কখনও বা রাজস্থান চিত্রকলার জয়পুর শৈলীর প্রভাব বাংলা চিত্রকলায় ফু উঠে মুঘল শাসন সূত্রে জয়পুরের সঙ্গে বাংলার সাংস্কৃতিক যোগসূত্রটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। নবাবি আমলে এই যোগসূত্রটি আরও নিবিড়তা পায়। মুরশিদাবাদের কাছে নশিপুর থেকে পাওয়া কয়েকটি ছবি থেকেই তার প্রমাণ মেলে।

সিরাজ-উদ্-দৌলার পর মিরজাফরের আমলেও মুরশিদাবাদ শৈলীর ধারা চলেছিল। তাঁর আমলে শিল্পীরা নবাব পরিবার ছাড়াও হিন্দু অমাত্য জমিদার, এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। এ সময়ে শিল্পীরা হিন্দু পৌরাণিক আখ্যাননির্ভর ছবি আঁকেন। মিরকাশিমের সময়ে লখনউ থেকে শিল্পীরা মুরশিদাবাদে এলে মুরশিদাবাদ শৈলীর উপর লখনউ শৈলীর প্রভাব পড়ে।

মিরজাফরের উত্তরসূরি মিরকাশিম ইংরেজদের কাছে পরাজিত হলে তারা মিরজাফরকেই আবার মুরশিদাবাদের মসনদে বসায়। এর মধ্যে দিয়ে নবাবি মসনদের অমর্যাদাও মুরশিদাবাদ শৈলীর অবক্ষয় সূচিত হয়। বৈচিত্র্য আর সৃজনশীলতা ভুলে শিল্পীরা জনরুচিকে প্রাধান্য দিয়ে নবাব-বাদশার আলেখ্যচিত্রের রূপায়ণে যত্নবান হলেন। ১৯৭৬-এর ভয়াবহ মন্বন্তরের প্রভাবে মুরশিদাবাদ শৈলীর ধারাও অবলুপ্ত হয়। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পী মুঘল ও পাশ্চাত্য রীতির সমন্বয়ে এক নতুন শৈলী গড়ে তুললেন—যার নাম দেওয়া হল কোম্পানি শৈলী। এই শৈলীর প্রথম ছবি মুরশিদাবাদেই দেখা যায়। প্রথমদিকে মুঘল-পরম্পরা শৈলীতে শিল্পীরা মুঘল বাদশা, বাংলা আর অযোধ্যার নবাব, শাসকদের প্রতিকৃতির ছবি আঁকলেও পরে ক্রমশ তারা পাশ্চাত্য চিত্ররীতির প্রতি আকৃষ্ট হন।

ইংরেজ শাসনাধীন ভারতবর্ষে কোম্পানি শৈলীর চিত্রকলা অর্থাৎ দেশজ ও ইউরোপীয় শৈলীর মিশ্রিত চিত্রকলা প্রথম আঁকা হয় তাঞ্জোরে। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ভাগে মুরশিদাবাদে এই শৈলীর আবির্ভাব ঘটে। ক্রয়ে তা কলকাতা, পাটনা, কটক, ছাপড়া, আরা, বারাণসী, লখনউ, দিল্লি, আগ্রায় ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পীরা এই পর্বে প্রধানত পোশাক, বাজারহাট, যানবাহন, উৎসব, মন্দির-দেবদেবী আর কারুকার্যের ছবিতে জীবনধারার বাস্তবনিষ্ঠ পরিচয়টিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কোম্পানি শৈলীতে রুমে পাশ্চাত্যরীতির অনুসরণে শিল্পীরা চিত্রপটকে সিপিয়ার নানা যাত্রার রঙে রঙিন করে। তুললেন, ছবিতে কালো বর্ডার জুড়লেন, ছবির আকারকেও বড়ো করে তুললেন। মুরশিদাবাদের চিত্রকরেরা কাগজ ছাড়াও অস্ত্রের পাতের উপর নানা যানবাহন, পোশাক, শোভাযাত্রা, উৎসবের ছবি মিনিয়েচার ফর্মে আঁকতেন। উনিশ শতকের সূচনায় কলকাতা ব্যাবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে থাকলে মুরশিদাবাদের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।

ইংরেজশাসিত ভারতে কলকাতায় আনা ইংরেজরা এদেশ সম্পর্কে কৌতূহলী মিল। ভারতের শিল্পীরা বিভিন্ন ছবির মধ্য দিয়ে ইংরেজদের সেই কৌতূহল রিহাম করেন। শুধুমাত্র পেশাদারি আর শৌখিন ইংরেজ শিখাদের দিয়ে এই কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব ছিল না। তাই মুঘল-পরস্পরার শিল্পীরাও রুমে কলকাতায় সমবেত হলেন। ইংরেজরা তাদের দিয়েই নিজেদের পছন্দের ছবি আঁকিয়ে নিতে থাকেন। প্রসঙ্গত পাইনা থেকে আসা অন্যতম শিল্পী জৈনুদ্দিন ছাড়াও ভবানী দাস ও রাম দাস ছিলেন এদের মধ্যে অন্যতম। এরা সুপ্রিমকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি স্যার এলিজা ইমুপের পত্নীর শ মেটাতে তাঁর সংগ্রহশালার অনুপাণির অজস্র ছবি আঁকেন।

শ্রীমতী ইপে ছাড়া শ্রীমতী এডওয়ার্ড হুইলার, নাথানিয়েল নিউটন, এমিলি ইডেন, চার্জস ডায়েলি প্রমুখের মধ্যে কেউ কেউ এদেশি শিল্পীদের দিয়ে ছবি। আঁকান, কেউবা কপি করান, আবার কেউ বা শিল্পীদের রেনেসান, ইউরোপীয় রীতিতে ছবি আবার শিক্ষিত করে তোলেন। শিল্পীদের ছবি আঁকার বিষয় হল ভারতবর্ষের মানুষ, পুরাকীর্তি, নিनর্শ, এমনকি কোম্পানির নানা প্রয়োজনীয় ও ব্যাবহারিক নকশা। এ সময়ের বিখ্যাত ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে বোটানিকাল গার্ডেনের লতা-পাতা, বৃক্ষ ও ফুল-ফলের ছবি, ব্যারাকপুরের *Institute of Promoting Natural History of India'র পশুশালার পশুদের ছবি, ভারতের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের ছবি ও নকশা, আচার-আচরণ, বেশভূষা, ধর্মোৎসব, চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজনীয় ছবি প্রভৃতি। বিলাতি সাদা কাগজে ঘন উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে, ব্রিটিশ রীতির স্বচ্ছ জলরঙে কোম্পানি শৈলীর কলকাতাপর্বের ছবির কাজ শুরু হয়। পাশ্চাত্য দেশীয় ছবি থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি প্রাগ্রেডিং এর কাজেও দেশি শিল্পীরা নিযুক্ত হলেন। উনিশ শতকের ইয়ের দশক পর্যন্ত কোম্পানির শিল্পীদের ছবির চাহিদা কলকাতায় ছিল। ফোটোগ্রাফি চর্চার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ছবির ক্রমশ গুরত্ব হারিয়ে যেতে থাকে। . সি. দাস ছাড়াও কোম্পানি শৈলীর শেষ সার্থক শিল্পী ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হলেন মহম্মদ আমির।

ভারতীয় পাতিতে শিল্পশিক্ষার উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রান শিল্পসত্তা। পরবর্তীকালে এটি জাতীয় শিল্পের অন্যতম প্রকাশরূপে "দি ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট নামে পরিচিত হয়। সোসাইটির প্রথম সভাপতি ও যুগ্মসচিব হলেন যথাক্রমে লর্ড। কিচেনার, নানান ব্রান্ড এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অনেক বিদেশি উদ্যোক্তার পাশাপাশি ছিলেন উত্তরপাড়ার রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়, নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়, বর্ধমানরাজ বিশ্রী মহান, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। সোসাইটির। বার্ষিক প্রদর্শনীতে অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ প্রমুখের থাকা থাকি ও পূর্ব এশিয়ার শিল্পকীর্তি দেখানোর ব্যবস্থা হত। বাংলার গভর্নর লর্ড রোনাল্ডশে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের অধীনে নিয়ে আসেন। তাঁর এবং সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহায়তায় সোসাইটির আর্ট স্কুল খোলা হয়। এই স্কুলে ছবি আঁকার তিন বছরের পাঠ্যসূচি প্রবর্তিত হয়।
প্রতিষ্ঠানটিতে স্মৃতি থেকে মানুষ ও প্রকৃতির ছবি আঁকার পাশাপাশি প্রার মুতির ও ছবির অনুকরণও শেখানো হত। শিক্ষা পরিচালনার ভার প্রধানত না বসু, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার ও শৈলেন্দ্রনাথ দের ওপর। মূর্তিকলা শেখানোর দায়িত্ব নেন কৌলিকবৃত্তিধারী গিরিধারী মহাপার। নি নিবেদিতা, উত্তরক, জেমস্‌ কাজিনস্ এবং অবনীন্দ্রনাথের ে পৃষ্ঠপোষকদের হাত ধরে এই সোসাইটি শিল্প সমালোচনার ক্ষেতে এক নতু আদল গড়ে তোলে। এ ছাড়া সোসাইটির ক্যাটালগে প্রতি ছবির সঙ্গে চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দেওয়ার রীতি এখানেই গড়ে ওঠে। এভাবেই ভারতীয় চিত্ররীতির বিকাশসাধন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি, শিল্প সংক্রান্ত আলোচনা সভার আয়োজন, শিधরুচির পরিবর্তন ঘটানো, পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে সাধারণের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক তৈরি, দেশীয় শিল্পের পৃষ্ঠপোষকরা। প্রভৃতি ছিল সোসাইটির নানান মহৎ উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যামিনী রায়, অমিত হালদার, মুকুল দে, অতুল বসু, রখীন মৈত্র, দেবীপ্রসাদ রামুরী যামিনীপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার প্রমুখ। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নানাবিধ জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী অন্নদাপ্রসাদ বাগচি চব্বিশ পরগনার শিখরালি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন চন্দ্রকান্ত বাগচি। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে আদাপ্রসাদ স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস-এর ক্রাগ্রেডিং ক্লাসে ভরতি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি পাশ্চাত্যরীতির চিত্রাঙ্কনবিদ্যা চর্চা করেন। কর্মজীবনের প্রথম পর্বে অন্নদাপ্রসাদ স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়ান আর্টসে শিক্ষ হিসেবে যোগ দেন এবং পরে ওই প্রতিষ্ঠানেই প্রধান শিক্ষক হন। পাশ্চাত্যরীতিতে প্রতিকৃতি অঙ্কন করে তিনি প্রভূত সুনাম অর্জন করেন। আঁকা মনীষীর প্রতিকৃতি উচ্চ প্রশংসিত হয়। তিনি শিল্প-বিভা প্রথম বাংলা পত্রিকা গুলি (১২৯২ বঙ্গাব্দ) প্রকাশের অন্যতন, উদ্যোক্তা ছিলেন। কলকাতায় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় কলাসংস হলে তিনি তার সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের লেখা দি অ্যান্টিকুইটিজ অব ওড়িশা এবং যুদ্ধ পয়া শীর্ষক বই দৃষ্টিতে তাঁর আঁকা ছবি রয়েছে। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আর্ট স্টুডিয়ো প্রতিষ্ঠার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। এই স্টুডিয়ো থেকে লিমোগ্রাফি পদ্ধতিতে ছাপা পৌরাণিক বিষয়ক বহু চিত্র প্রকাশিত হয়। শিল্পী অন্নদাপ্রসাদ এই স্টুডিয়োকে কেন্দ্র করে নিজের আদর্শে বহু তরুণ শিল্পী গড়ে তোলেন।

রোম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রশিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। অবনীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যরীতি অনুসরণে ान লাজি এবং ইংরেজ শিল্পী পামার এর কাছে প্যাস্টেল, জনর তেলরং এবং প্রতিকৃতি একন লেখেন। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে ভারতীয় চিত্রাঙ্কন নীতি পুনরুদ্ধারের সাধনা শুরু করেন। ভারতীয় রীতিতে আঁকা তাঁর প্রথম দিকের মুরতি ঋতুসংহার, রাখ, সুজাতা, প্রভৃতি বিষয়ক নিতেও ভারতীয় আঙ্গিকের অনুকরণ প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ধ্যান্ডের সাহেবের আসছে অবনীন্দ্রনাথ কলকাতার আর্ট কলেজের উপাধ্যক্ষ হন। তিনি জাপানি শিল্পী কানের কাছে জাপানি তা করেন, যার প্রভাব ওমর খৈয়াম চিত্রাবলিতে দেখা যায়। শিক্ষকরূপে সারা ভারতে ভারতীয় চির ধারের যে বাপিক আগোলন অবনীন্দ্রনাথ পূর্ণ করেন, তার মাধ্যয়েই ভারতীয় শি পাজ করে। শেষ জীবনে তিনি রুমে কাটাম নামে বিখ্যাত আকারনিষ্ঠ বিমূর্তরূপ সৃষ্টি করেন। ভগিনী নিবেদিতা, স্যার তা উত্তরক, হাজেল প্রমুখের উদ্যোগে অবনীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ৯২০৭ খ্রিস্টাব্দে 'ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটি আণিত হয়। ভারত ছাড়াও লন্ডনে, প্যারিসে, জাপানে তাঁর ছবির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর আঁকা বিখ্যাত কিছু ছবির নাম—সাহাজাদপুর দৃশ্যাবলি, আরব্যোপন্যাসের গল্প, কবিকঙ্কন চণ্ডি, প্রত্যাবর্তন, জারনিস ৪৫, সাজাহান প্রভৃতি। এ ছাড়াও তিনি বন্ধু মুখোশের পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন।

বিচারের মুঙ্গের জেলায় বসবাসকারী খড়্গাপুরের এক বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহন করেন নন্দলাল বসু। তিনি ছেলেবেলায় কুমোরদের দেখাদেখি মূর্তি পড়তেন। তাঁর পিসতুতো ভাই অতুল মির ছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র। তাঁর পরামর্শে নিজের আঁকা ছবি নিয়ে নন্দলাল আর্ট কলেজে অবনীন্দ্রনাথ ও মাডেল সাহেবের সঙ্গে দেখা করেন ও আর্ট স্কুলে ছাত্র হিসেবে গৃহীত হন। ১৯০৬-১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁর আঁকা বিখ্যাত ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে- সিখিদাতা গণেশ', 'শোকার্ত সিদ্ধার্থ', 'সতী', 'শিবসতী', 'জগাই মাধাই', 'কর্ণ', 'গরুড়ভাতলে শ্রীচৈতন্য', 'নটরাজের তাণ্ডব', 'ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা', 'জতুগৃহদাহ', 'অহল্যার শাপমুক্তি', 'পার্থসারথি', 'শিব মুখমণ্ডল, "শিবের বিষপান', 'যম ও নচিকেতা', 'মহাপ্রস্থানের পথে যুধিষ্ঠির' 'উমার বাঘা', 'উমার তপস্যা', 'প্রত্যাবর্তন' প্রভৃতি। পৌরাণিক বিষয়কে ভিত্তি করে আঁকা তাঁর এই ছবিগুলিতে রূপনির্মাণের বিশেষ জতিল ধরা পড়েছে।

১৯৯১লা আর্ট স্কুলের পাঠ শেষ করে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জোড়াসাঁকোয়া শিল্পতো না বসুর এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ভগিনী নিবেদিতার বইয়ের চিত্রসজ্জা রচনা করা ছাড়াও তিনি রবীন্দ্রনাম ও অবনীন্দ্রনাথেরও বহু বইয়ের অলংকরণ করেন। লেডি হেরিংহ্যামের সহকারী হিসেবে তিনি অজন্তা হাচিত্রের নকল করার কাজ করেন (১৯০৯)। তাঁর স্মরণীয় কীর্তির মধ্যে রয়েছে গোয়ালিয়রের বাগ্ হার চিরিচিত্রের প্রতিলিপিগ্রহণ, জগদীশচন্দ্রের আহবানে 'বন্ধু বিজ্ঞানমন্দির' অলংকরণ, জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন ক্লাবে শিল্প শিক্ষকতা, মহাত্মা গান্ধির আহবানে লখনউ, ফৈজপুর ও হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশন উপলক্ষ্যে ভারতলিতে প্রদর্শনী সংগঠন, "হরিপুরাপB" অঙ্কন ইত্যাদি। 'শিখাচ্চো' ও 'ৰূপাবলী' তাঁর লেখা শিল্পসংক্রান্ত প্রাণ। তিনি রামায়ণ হাভারতের কাহিনিকে কালীঘাটের রঙিন পটের মতো করে রূপদান করেন। ভারতীয় সংবিধান তাঁরই আঁকা চিরে ও নির্দেশে অলংকৃত হয়।

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর কলকাতার জোড়াসাঁকোয় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন শেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন গগনেন্দ্রনাথ ছবি এঁকে পুরষ্কৃত হন। আইর স্কুলের শিক্ষক হরিচরণ বসু-র কাছে তিনি ছবি আঁকা শেখেন। পরিণত বয়সেই তিনি প্রধানত ছবি আঁকার চর্চা করেছেন। ওকাকুরা প্রেরিত জাপানি শিল্পী তাইকান আর হিসিদার কাছে তিনি অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে জাপানি কালি-তুলি আর ওয়ানের কাজ শেখেন । ইউরোপীয় পদ্ধতির জলরঙের ব্যবহারেও তাঁর দক্ষতা ছিল। বাস্তবধর্মী চিত্রশিল্পী গগনেন্দ্রনাথ দেশে ফরাসি শিল্পভাষাগত উপাদান প্রবর্তনের প্রচেষ্টায়ও অগ্রগণ্য প্রবাসী ও মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় তিনি অজস্র কার্টুন বা বাঙাচিত্র এঁকেছেন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি Indian Society for Oriental Art' এর সম্পাদক হন। বাংলার কারুশিল্প প্রচারের জন্য ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে 'Bengal Home Industries Association' স্থাপন করেন এবং তার সম্পাদক হন। মঞ্চসজ্জা, দৃশ্যপট রচনার অভিনবত্বে, কাকের ছবি সম্বলিত 'টুয়েলভইঙ্ক স্কেচেস' অ্যালবাম তৈরিতে, চিত্রশিল্পের নানান পরীক্ষানিরীক্ষায়, ভোঁদড় বাহাদুর গ্রন্থ রচনার তাঁর প্রতিভার সাক্ষ্য ছড়িয়ে রয়েছে। বিরূপ অদ্ভুতলোক Realm of the Absurd, नড়ে, Reform Screams গ্রন্থে তাঁর আঁকা বহু ব্যঙ্গচিত্র স্থান পেয়েছে। আধুনিক শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ গগনেন্দ্রনাথ ১০২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি পরলোকগমন করেন।

বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী যামিনী রায়। গ্রামে মাটির মূর্তি-শিল্পীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েই তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা হয়। গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করার পর তিনি ফাইন আর্ট বিভাগে ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক রীতির চিত্রবিদ্যা লেখেন। ১৯১৮-১৯ থেকে তাঁর ছবি ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অর ফাইন আর্টের পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। গ্রামবাংলার নিসর্গচিত্র, আদিবাসী জীবন ও জীবিকা, ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতা ও ধর্মকাহিনিনির্ভর ছবি আর পটচিত্র অঙ্কনে তিনি ছিলেন অনবদ্য। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ছবি সর্বভারতীয় প্রদর্শনীতে ভাইসরয়ের স্বর্ণপদক লাভ করে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি 'পদ্মভূষণ' উপাধিতে ভূষিত হন। আর্ট স্কুলে গিলার্ডি সাহেবের কাছে তেলরঙে আঁকায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও পরবর্তীকালে যামিনী রায় জলরঙে অসামান্য সব ছবি এঁকেছেন। কালীঘাটের পটুয়াদের শৈলীর দ্বারা তিনি বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। ফরাসি চিত্রধারার মধ্যে যাঁরা সরলরেখার। পরিবর্তে ছবিতে 'কার্ড ব্যবহার করেন, তাঁদের চিত্রকলা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। সেজান, ভ্যান গগ আর গন্ধ্যার মতো পোস্ট ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের ছবি দেখে তিনি আকৃষ্ট হয়েছেন। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তাঁর মূল লক্ষ্যটিকে তিনি নিজেই নির্দিষ্ট করেছেন, তা যেন অন্য সকলের ছবির থেকে আলাদা হয় তা সে ভালোই হোক বা মন্দই হোক।' পরবর্তী শিল্পীদের অনেকেই তাঁর দেখানো পথে নিজের নিজের চিত্রভাষা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এক বিপুল ঐতিহ্যমণ্ডিত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে তিনি দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাহচর্যে এবং নিজের চেষ্টায় আঁকা শেখেন। তাঁর তরুণ বয়সে আঁকা কিছু ফেচের সন্ধান পাওয়া যায় মালতী পুথিতে (১৮৭৮), পকেট বুকে (১৮৮৯) এবং হেঁয়ালি চিত্রে (১৮৯২) পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি ঢেকে দেবার জন্য উদ্দেশ্যহীন আঁকাআঁকি থেকে রেখায় রেখায় মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প চর্চা শুরু হয়। কালো পেনসিল, প্যাস্টেল বা রঙিন খড়ি, ব্লটিং পেপার, জলরং, নানা ধরনের ফুল, লতাপাতা, গাছের রস থেকে তৈরি রঙকে তিনি ছবি আঁকার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নারকেল, সরষে, তিলের তেল ছবিতে ব্যবহার করে তার গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ করতেন। কলম দিয়ে তিনি অত্যন্ত দ্রুত ছবি আঁকতেন। তেল ও জলরঙের সঙ্গে সঙ্গে প্যাস্টেল, রঙিন চক, ড্রাই পেন্ট এবং এচিং-এর কাজ তিনি করেছেন। নানান মৌলিক চিন্তা ও পদ্ধতিতে তিনি বিচিত্র কৌশলে কখনো মানুষ, পশু, পাখি, ফুল, সাপ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাঁক, আবার কখনো বা পাখির ঠোঁট, উদ্যত নখ ও চলার ভঙ্গিকে তাঁর ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিদেশের প্যারিসে আর্ট স্কুলে তাঁর চিত্র প্রদর্শনী হয়। তাঁর আঁকা ছবিতে তিনি মানুষের লোভ, হিংসা, সন্দেহ, আভিজাত্য, গাম্ভীর্য প্রভৃতি ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি যে আত্মপ্রতিকৃতিটি আঁকেন, তাতে তাঁর অন্তলোকের পরিচয় পাওয়া যায়। নারীমূর্তি, রেখায় টানা মুখ, কলম ও মোটা তুলিতে আঁকা মুখাবয়ব, নিসর্গ চিত্র, পরিচিত অনেকের প্রতিকৃতি (রাজশেখর বসু, পুপে, মুসোলিনি) অদ্ভুতদেহী পশুপাখির ছবি আঁকায় তাঁর বিশিষ্টতা ধরা পড়ে। সে বইয়ের গল্পের সঙ্গে রেখার ছবি তিনিই আঁকেন, খাপছাড়া বইয়ের ছবি আঁকেন রঙিন কালি, পেনসিল অথবা তুলি দিয়ে ১৯৩২-এ কলকাতায় প্রদর্শিত তাঁর ছবিগুলির মধ্যে ছিল শেষ নিঃশ্বাস', "অহল্যা হল পাষাণী", "কচ ও দেবযানী', 'আবু হোসেন', 'বৌদ্ধ ভিক্ষু' ইত্যাদি প্রাত্যহিক জীবনের বহুবিচিত্র অনুভূতিকে নিজের চিত্রশিল্পে দৃঢ়নিষ্ঠা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে তিনি রূপ দিয়েছেন।

শিল্পী অসিতকুমার হালদার ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন শ্রী সুকুমার হালদার। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে ছাত্রেরা 'নব্যবঙ্গীয় চিত্রকলা'র প্রসার ঘটিয়েছিলেন, অসিতকুমার ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। নন্দলাল বসুর অন্যতম সহযোগী হিসেবে ১৯০৯ থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি অজন্তা গুহাচিত্রের অনুলিপির কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি বাগ্‌ গুহাচিত্র ও যোগীমারা গুহাচিত্রের অনুলিপির কাজ করেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতনের অধ্যক্ষরূপে কলাভবনের সূচনা করেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে অসিতকুমার জয়পুর শিল্প বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হন। ১৯২৫ থেকে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি লক্ষৌ সরকারি শিল্প মহাবিদ্যালয়ের স্থায়ী অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর আঁকা অজস্র ছবির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য 'রাসলীলা', 'যশোদা ও শ্রীকৃষ্ণ', 'অগ্নিময়ী সরস্বতী', 'কুগালের চক্ষুশান্ত', "ওমর খৈয়াম' ইত্যাদি। 'অজন্তা', 'বাগ্‌ গুহা ও রামগড়', 'হো-দের গল্প', “পাথুরে বাঁদর রামদাস ও কয়েকটি গল্প', 'ভারতের কারুশিল্প", "ঋতুসংহার' 'ও 'মেঘদূত' কাব্যের অনুবাদ তাঁর সাহিত্য ও শিল্প প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে। মূর্তিকলাতেও তিনি বিশিষ্টতা অর্জন করেন। তাঁর কৃতি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন মুকুল দে, রমেন চক্রবর্তী, প্রতিমা ঠাকুর প্রমুখ। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসান হয়।

প্রখ্যাত ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ বাঁকুড়ার যুগীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের মধ্যে শৈশব অতিবাহিত হলেও শিল্পের প্রতি ছিল রামকিঙ্করের গভীর অনুরাগ। দেবদেবীর ছবি আঁকায়, ছুতোর কামারদের কাজে, পুতুল গড়ায়, পোস্টার লিখনে থিয়েটারের মঞ্চসজ্জায় তার সহজাত ক্ষমতা ছিল। 'প্রবাসী' পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় তাকে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি নন্দলাল বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন। শান্তিনিকেতনে তাঁর সতীর্থদের মধ্যে ছিলেন রমেন্দ্রনাথ চক্রব বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। পরে তিনি শান্তিনিকেতনের শিক্ষক হিসেবে ভাস্কর্য বিভাগের প্রধানের পদ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে অবসর নেন। তাঁর আঁকা অজস্র ছবি ও ভাস্কর্যের মধ্যে বিখ্যাত - “উৎসবী চোখ", "শিলং সিরিজ', 'শরৎকাল', 'কৃষ্ণের জন্ম', 'নতুন শস্য', 'বিনোদিনী', 'মহিলা ও কুকুর', 'গ্রীষ্মের দুপুর', 'সুজাতা', 'বুদ্ধদেব', 'গান্ধীজী', 'হার্টের সাঁওতাল পরিবার', 'কাজের শেষে সাঁওতাল রমণী', 'কালের পথে', রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, আলাউদ্দিন খাঁ প্রমুখের মূর্তি প্রভৃতি । ভারতের নানা স্থানে তাঁর ছবি ও মূর্তির প্রদর্শনী হয়েছে। দেশের প্রধান সংগ্রহশালাগুলিতে তাঁর শিল্পকর্ম মর্যাদার সঙ্গে স্থান পেয়েছে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে রামকিঙ্কর 'পদ্মভূষণ উপাধি পান। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশ্বভারতীর 'এমেরিটাস প্রোফেসার হন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভারতী তাঁকে 'দেশিকোত্তম' উপাধিতে ভূষিত করেন। রামকিঙ্কর বেইজ ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট লোকান্তরিত হন।

অবনীন্দ্রনাথ নন্দলালের স্নেহধন্য শান্তিনিকেতনের আবহাওয়ায় লালিত এক মহান শিল্পী ছিলেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভরতি হন।

১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বিনোদবিহারী কলাভবনের শিক্ষক এবং সেইসঙ্গে সেখানকার ছোটো মিউজিয়ামের কিউরেটর ও লাইব্রেরিয়ান হন। টেমপেরা তাঁর প্রিয় মাধ্যম হলেও তেলরং ও ম্যুরালেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। ভারতীয় শিল্পকলায় জাপানি ভাবধারা আনয়নে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। তাঁর শিল্পপ্রতিভার কিছু নিদর্শন শান্তিনিকেতনের কলাভবন ও হিন্দিভবনের ফ্রেসকোগুলিতে ছড়িয়ে রয়েছে। নেপাল সরকারের অনুরোধে ওই দেশের শিক্ষাবিভাগের উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন বিনোদবিহারী। তিনি পরে বো কিছুকাল নেপালের সরকারি মিউজিয়ামের কিউরেটরও ছিলেন। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসায় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে অপারেশন করাতে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন।

১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বিনোদবিহারী কলাভবনে ফিরে কিছুকাল সেখানে। অধ্যাপনা করার পরে সেখানকার অধ্যক্ষ হন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে। এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে কিছুদিন কলাভবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।।

হারিয়ে ফেলার পরেও বিনো ছবি এঁকেছেন, করিয়েছেন, কাগজ কেটে ছবি বসিয়েছেন এবং তালি দিয়ে অজস্র মুরালের কাজ করেছেন। চিত্র সমালোচক এবং লেখক হিসেবেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তারর প্রশ্নটি বিখ্যাত, কর্তাবাবা তাঁর আজ বাংলা। তিনি পদ্মভূষণ (১৯৭৪) ও বিশ্বভারতীর 'দেশিকোত্তম' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

হেমেন (হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার) ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল (১৩০৯ ব্যাগ) বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের অন্তর্গত পতিতাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলেন। পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষ্যে এই কলেজের ছাত্রদের তোরণসজ্জার আদেশ দেওয়া হলে দেশপ্রেমিক হেমেন্দ্রনাথ তা অগ্রাহ্য করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কলেজ ত্যাগ করে স্বাধীনভাবে শিল্পসাধনায় রত হন। বোগাই সাম্রাজ্য, দিল্লি ও কলকাতায় অনুষ্ঠিত চিত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তিনি শীর্ষস্থান অধিকার করেন এবং শিল্পীসমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। চিত্রকলার প্রায় সকল বিভাগেই তাঁর প্রতিভা লক্ষ করা যায়। বসুমতী, প্রবাসী, ভারতবর্ষ প্রভৃতি নামী পত্রিকায় তাঁর বহু ছবি মুদ্রিত হয়। ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে তিনি পাঞ্জাবের পাতিয়ালা রাজ্যের রাজশিল্পী পদে যোগ দেন। তাঁর আঁকা 'স্মৃতি', 'মানসকমল', 'পরিণাম', 'অন্যের সুর', 'সাকী', 'কমল না কণ্টক' প্রভৃতি ছবি বিখ্যাত। 'আর্ট অব মজুমদার', 'শিল্পী', 'ইন্ডিয়ান মাস্টার' প্রভৃতি ত্রিপত্রিকাগুলি তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে যোগেশে শীল, যামিনী রায়, অতুল বসু প্রমুখের সহযোগী হিসেবে তিনি 'Indian Academy of Fine Arts' প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। ১৫० ব্যাদে শিল্পী হেমেন মজুমদারের মৃত্যু হয়।

'১৯৪৩ বাংলা দুকি' নামে বিখ্যাত চিত্রাবলির শিল্পী জয়নুল আবেদিনের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে। তিনি কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল (বর্তমানে কলেজ) থেকে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে পাস করেন। প্রথমে তাঁর আঁকার বিষয়বস্তু ছিল প্রধানত রোমান্টিক ল্যান্ডস্কেপ ও বর্ণময় উপজাতি মহিলা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে সারা বাংলাদেশ জুড়ে দুর্ভিক্ষের যে বিভীষিকা তিনি দেখেন, তা তাঁর শিল্পকর্মকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ম্যাডোনা ১৯৪৩' ছবিতে দুর্ভিক্ষের শিকার কঙ্কালসার মৃত্যুপথযাত্রী সন্তানের সদ্য মৃত মায়ের বুক থেকে সুধা টেনে নেবার ঐকান্তিক ষ্টোর নির্মম দৃশাকে তিনি ফুটিয়ে তোলেন। দেশ বিভাগের পর তিনি করাচিতে পাকিস্তান সরকারের আই বিভাগে যোগ দেন। এখানে থাকার সমনো আবেদিন ঢাকায় আ ইষ্টিটিউশনের পরিকল্পনা করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আচ ও কা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার অধ্যক্ষ হন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকান্টি অব ফাইন আর্ট-এর ডিনপদ। লাভ করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কলকাতা ও টাকার মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের সময় কলকাতায় তাঁর আঁকা ছবির একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এইসব ছবির মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধ মানুষের অবস্থা দেখিয়েছেন।

ভট্টাচার্যের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য। চিত্তপ্রসাদ চট্টগ্রামেই তাঁর বিদ্যালয় ও কলেজ জীবন অতিবাহিত করেন। স্নাতক স্তরে পাঠরত থাকার সময়ে চট্টগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এসে তিনি গণ-আন্দোলনে যুক্ত হন। চিত্রাঙ্কনে স্বাভাবিক প্রতিভার অধিকারী চিত্তপ্রসাদ, ১৯৪২-৪৩ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট আন্দোলনের ও দুর্ভিক্ষের পটভূমিকায় আঁকা ছবিগুলির জন্য শিল্পজগতে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুরের দুর্ভিক্ষের যে ছবি তিনি এঁকেছিলেন, তা সর্বকালীন দুর্ভিক্ষের প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নৌবিদ্রোহের এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের তেলেঙ্গানার কৃষক বিদ্রোহের ছবিগুলি তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি। বোম্বাই, দিল্লি, কলকাতার নানা স্থানে তাঁর এই ছবিগুলির প্রদর্শনী হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথের বা পাশ্চাত্যের প্রভাব থাকলেও গ্রামের সাধারণ দুঃখী ও সংগ্রামী মানুষই তাঁর শিল্পকলার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল। তিনি স্কেচ ও উডকাটের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ চিত্রাবলি এঁকেছেন বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে। তাঁর আঁকা 'তেভাগার প্রতিরোধ', আর ফসলের অধিকার' শিরোনামের ছবি দুটি ছাড়াও শিরোনামহীন আরও কয়েকটি ছবিতে আন্দোলনের সময়কার আবহ ফুটে উঠেছে। ৩৩ বছর বোম্বাই-এর আধেঁরিতে থাকাকালীন অ্যালবাম, কার্ড, ছবি প্রভৃতি বিক্রি করে অনিয়মিত উপার্জনের মাধ্যমে তিনি নানা অসুবিধার মধ্যেই থাকতেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি কলকাতায় চিকিৎসার জন্য আসেন এবং কলকাতাতেই তার মৃত্যু হয়।

প্রাচীন পটশিল্পের এবং পটশিল্পীদের উল্লেখ সুপ্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের পাতায়। পাওয়া যায়। পটুয়াদের আঁকা ছবি ও তার কাহিনি বর্ণনাধর্মী পটের গান। ধর্মপ্রচারে একান্ত সহায়ক হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মঙ্গলকাব্যের পট উল্লেখযোগ্য।

কালীঘাটের পট: ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় কালীঘাটে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে ক্রমশ পটুয়ারা তার সংলগ্ন বাজারে তাঁদের আঁকা পট ও পুতুলের পসরা সাজিয়ে তোলেন। মিশ্রজীবিকার মানুষের অংশগ্রহণে পটে অপরূপ বৈচিত্র্য দেখা দিয়েছিল। দেবদেবীর মুখাবয়ব, সরা, চৌকো পটে আঁকা মূর্তি পূজোয় ব্যবহৃত হত। পরবর্তী সময়ে পৌরাণিক কাহিনি সংবলিত পট তৈরি হতে দেখা যায়। সংগ্রহে ও গৃহসজ্জায় এগুলির চল এখনও আছে। সামাজিক অবক্ষয়, নব্য বাবু-কালচারের বিকৃতি, ব্যভিচার, সাজসজ্জা সহ সমসাময়িক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা নিয়েও বাষ্পের মধ্য দিয়ে পটচিত্র এঁকেছেন শিল্পীরা। সমাজ সচেতনতার কাজেও (যেমন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, গাছ বাঁচাও প্রভৃতি) পটচিত্রের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ক্রমশ বিদেশি শিল্পীদের উজ্জ্বল রঙের ছবির সঙ্গে সমতা রক্ষা করতে না পেরে পটশিল্প হারিয়ে যেতে থাকে। কালীঘাটের পটের উৎস থেকে বিলুপ্তি (১৮১৫-১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত মোট তিনটি প্রধান ধারা প্রচলিত।

১. ইন্দ্রমোহন ঘোষ, কালীচরণ ঘোষ, নিবারণ ঘোষদের ধারা

২. বলরাম নীলমণি ও গোপাল দাসের ধারা

৩. চিত্রকর সম্প্রদায়ের ধারা—কার্তিক চিত্রকর, গদাধর চিত্রকর, গৌরাঙ্গ চিত্রকর, গণেশ চিত্রকর, প্রভাস চিত্রকর, নারায়ণ চিত্রকর প্রমুখ।

ভারত সরকার স্বীকৃত কালীঘাট পটের শেষ শিল্পী হিসেবে রজনী চিত্রকর ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃানের হাত থেকে পুরস্কার লাভ করেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতীয় সাহিত্য তো বটেই, সমগ্র বিশ্বের সাহিত্যই পুথিনির্ভর। পুথির আনুষঙ্গিক বহু উপাদানের মধ্যে রয়েছে গ্রন্থপাটা, চ্ছদ, গ্রন্থসূত্র, প্রচ্ছদসূত্র বা লেভি ইত্যাদি। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল গ্রন্থপাটা বা পুথিপাটা।

সংস্কৃত 'পুট' শব্দ থেকে পাটা' শব্দটি এসেছে, যার অর্থ আবরণ। পুঁথির আবরণ বা ঢাকনাই হল প্রশ্নপাটা। পুথিকে ধুলো, বালি, জলীয় বাতাস থেকে বাঁচানোই এর উদ্দেশ্য। আধুনিক পরিভাষায় গ্রন্থের মলাটই হল গ্রন্থপাটা। প্রাচীনকালে দু-খণ্ড কাঠ দিয়ে পুথিপাটা তৈরি হত। তুলোট কাগজের পুথির পাটা হিসেবে নিম, কাঠাল, সেগুন, শালকাঠের টুকরো ব্যবহার করা হত। পুঁথির মাপের উপরে পাতার মাপ নির্ভর করত। গ্রন্থপাটাকে অনেকসময় আধুনিক ছাপা বইয়ের মলাটের প্রচ্ছদচিত্রের মতোই নানান রঙে, রেখায় বা খোদাই করা কাজের মাধ্যমে অলংকৃত করা হত। প্রথপাটা ছাড়াও পুথির পৃষ্ঠায় নানা বর্গের বিষয়ানুগ চিত্র ও অলংকরণও চোখে পড়ে। এর মধ্যে দিয়ে চিত্রকলাচর্চার এক বিশেষ ঐতিহ্য ধরা পড়ে, যা প্রথমালিক ও শিল্পীর রুচিরও পরিচায়ক।

শিল্পশৈলীর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পাটাচিত্রকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়

(১) রাজস্থান ও পাহাড়ি শৈলী, (২) ওড়িশি শৈলী, (৩) স্থানীয় লোকায়ত শৈলী—যার মধ্যে রয়েছে বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান, হুগলি, বীরভূম, মেদিনীপুর, মুরশিদাবাদ ও কোচবিহার জেলায় প্রাপ্ত পাটাচিল

বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত লোকশিল্প হল চারশো বছরের পুরোনো দশাবতার তাস। মন্ত্ররাজ বীরহাম্বীরের সময় থেকে বিষ্ণুপুরে দশাবতার তাস খেলা শুরু হয়। বিষ্ণুর দশ অবতার—মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, বুধ ও কফিকে নিয়ে পরিকল্পিত এই খেলার মধ্যে ধর্মভাবনা নিহিত। বিষ্ণুপুরে বুদ্ধ অবতারের স্থানে জগন্নাথের চিত্র দেখা যায়। এটি ওড়িশা থেকে খেলাটি আসার প্রভাব বলে অনুমিত হয়।

বিন্নুপুরের ফৌজদার পরিবার এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পের ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। কথিত আছে, রাজা বীরহাম্বীর তাঁর সেনাপতি কার্তিক ফৌজদারকে তাস আঁকতে বলেন। তেঁতুল বিচির আঠা, পাতলা কাপড়, খড়িমাটি, মেটে সিঁদুর, গালার রং, তুলি, কাঁচি, স্থানীয় অঞ্চল থেকে জোগাড় করা রং ইত্যাদি ব্যবহার করে মূলত বৃত্তাকার তাস তৈরি করা হয়। তাসে আঁকা ছবির সহজ-সাবলীল রেখাভঙ্গি, প্রাকৃতিক রং-এর ব্যবহার সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দশাবতার তাসে তিন রকমের তাস দেখা যায় রাজা তাস ১০টি, মন্ত্রী বা উজির তাস ১০টি এবং রং তাস ১০০টি। এই রং তাসকে ব্রহ্মা, দোক্কা, তো, চৌকা, পঞ্জা, ছক্কা, সাত্তা, আটা, না, দল নামে ডাকা হয়। বিভিন্ন অবতারের এক একটি সেটে ১২টি করে তাসের জন্য বিি প্রতীক ও জমিনের আলাদা রং ব্যবহার করা হয়। ৫ জন করে খেলোয়াড় একসঙ্গে বসে শুদ্ধাচারে, ভগবানকে স্মরণ করে এই তাস খেলতেন। তবে কেউ কারও সহযোগী হতে পারতেন না। আশ্চর্য সুন্দর শিল্পকীর্তির নি হলেও সময়ের সঙ্গে তাসের খেলাটি হারিয়ে যাওয়ায় এই শিল্পটিও কম হারিয়ে যেতে বসেছে।

মাটির বাড়ির দেয়ালে, পাঁচিলে ফ্রেসকো, রিলিফ সমন্বিত যে চিত্র দেখতে পাওয়া যায়, তাই দেয়ালচিত্র হিসেবে পরিচিত। আদিবাসী জনসমাজে সাঁওতাল, সরাক, মাহাতো, ভূমিজ, কামার, কুমোর, ডোম, বাউরি প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে দেয়ালচিত্রের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। স লোকপুরাণে গল্পের আকারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে আবশ্যিক আচরণবিধির মধ্যে স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রাচীনকালে শিকারের কাছে পুরুষদের সাফল্য কামনা করে ঘরের দেয়ালে ছবি আঁকত মেয়েরা। এই জাদুবিশ্বাসই রুমে সৌন্দর্যবোধের ভাবনায় রূপান্তরিত হয়েছে। সাঁততान। গৃহে দেয়ালচিত্রের আধাররূপে পিতা বা পিন্ডে এবং কাধের ক উল্লেখযোগ্য। পিন্ডে দেয়ালের ছবি আঁকার ক্যানভাসের পরিসীমা রচনায় এবং রঙের বৈচিত্র্য স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ। আর কাঁধের মধ্যে রয়েছে ফ্রেসকো ও রিলিফ জাতীয় কাজ। রিলিফ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রথম গৃহনির্মাণের সময়, আর ফ্রেসকো প্রতি বছরের উৎসব-অনুষ্ঠানের সময় নতুন করে দেয়ালে আঁকা হয়। কাঁধ বা দেয়াল পুরুষেরা তৈরি করলেও মূলত মহিলারছি দেয়াল চিত্রণের কাজ করতেন। সাঁওতাল বাড়ির দেয়ালে কখনও ধনুকের মতো কিংবা অর্ধবৃত্তাকার রেখার ক্রমআবর্তন দেখা যায়, আবার কোথাও জ্যামিতিক নকশার আকারে পদ্ম, গাঁদা, সূর্যমুখী, গোলাপ: ময়ূর, মুমু, মুর পেঁচা, হাতি, প্রজাপতির ছবি দেখা যায়। গিরিমাটি, গুঁড়ো নীল, আলতা, ঘড়িমাটি, সিমপাতার রস লাগিয়ে জ্যামিতিক আকার ও ছবিতে বৈচিত্র্যা আনা হয়। কোশে কোশে রিলিফের কাজে খণ্ডিত কাহিনিচিত্র ও ইঙ্গিতধনী রিলিফের কাজও লক্ষ করা যায়।

১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে কালীঘাটের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে ভক্তমহলে ও দর্শনার্থীদের কাছে পট বিক্রির অভিপ্রায়ে গ্রামীণ পটুয়ারা সেই এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাদের কাছে থাকত দেবদেবীর মুখের মূর্তি, পুতুল, সরাচিত্র ইত্যাদি। পরবর্তীতে ক্রমশ চৌকো পটে দেবতার মূর্তি আঁকা শুরু হয়। কালীঘাটের পটুয়াদের পটচিত্রের ক্রমবিকাশের রূপটিকে দেবদেবীর মুখের অবয়ব ও পুতুল, সরায় আঁকা দেবদেবীর ছবি, ধর্মীয় পট, পৌরাণিক পট, দৈনন্দিন জীবনের ছবি, ব্যঙ্গচিত্র ইত্যাদি বিভিন্ন ধারায় বিন্যস্ত করা যেতে পারে। পটের বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল— দাঁড়ে বাঁধা কাকাতুয়া, পাকানো চাদর গায়ে বিলাসী বাবু, পটের বিবি, গড়গড়ার নল মুখে সাহেব, মাছকুটুনী বাঙালি গিন্নি, বীণাবাদনরতা যুবতী, সালংকারা গৃহবধূর সামনে হুঁকো হাতে চেয়ারে বসা গৃহকর্তা, মোহন্ত এলোকেশী, মহাদেবের কোলে ঘুমন্ত পার্বতী ও বৃক্ষশাখায় শুকপাখি ইত্যাদি। ১৮০০ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতার সমাজে লক্ষণীয় বাবু-কালচারের ক্ষয়িষ্ক রূপের প্রতিফলন। পটচিত্রে ধরা পড়েছিল। বস্তুত, পটুয়ারা সমাজ পরিবর্তনের ধারাটিকেই তাদের শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন এবং যাবতীয় সামাজিক অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গের কশাঘাত হেনেছেন। এক্ষেত্রে সমাজ সংশোধনই ছিল তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য। মুসলিম ও ইংরেজ শাসনের মুগসন্ধিক্ষণে যে কালীঘাটের পটের উদ্ভব ঘটেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই তা বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়।

লোকশিল্পের অন্যতম প্রাচীন মাধ্যম পটশিল্প। বাংলাদেশেও পটশিল্পের ইতিহাস প্রাচীন | পটুয়াদের আঁকা ছবি ও সেখানে উল্লিখিত কাহিনি ধর্মপ্রচারে একান্ত সহায়ক হয়েছিল। মঙ্গলকাব্যের পট এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মুসলিম শাসকরাও ইসলাম ধর্মপ্রচারের জন্য পটুয়াদের সাহায্য নিতেন। ষোড়শ শতকে পটচিত্রের সাহায্যেই তুলে ধরা হত চৈতন্যদেবের বাণী। মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে পটের উল্লেখ আছে। পুরাণ এবং লোক কথাকে আশ্রয় করে। একটি বড়ো ক্যানভাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে গল্প বলতেন পটশিল্পীরা—ছবির মাধ্যমেই এই গল্প বলা হত। উনিশ শতকে কালীঘাটের পট বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছিল। প্রথমদিকে কালীঘাটের পটে দেবদেবীর ছবি আঁকা হলেও পরবর্তীকালে পটে উঠে আসে নানা সামাজিক প্রসঙ্গ | সামাজিক অবক্ষয়, নব্য বাবু কালচার এসব পটশিল্পীদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়। ১৮০০ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতার বাবু-কালচারের ক্ষয়িষ্ণু রূপের প্রতিফলন ধরা পড়েছিল এই পটচিত্রে। কালীঘাটের পট বিশ্বজোড়া খ্যাতি পায় । ইন্দ্রমোহন ঘোষ, বলরাম দাস, কার্তিক চিত্রকর প্রমুখ আলাদ আলাদা ধারায় কালীঘাটের পটশিল্পের প্রসার ঘটান।