Chapter-2⇒জ্ঞানের স্বরূপ ও জ্ঞানসম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদ

◉ 'জানা'-র তিনটি শর্ত

জ্ঞানের বা জানার শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যাকে জানি বলে। দাবি করি, তাকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এই তিনটি শর্ত হল যথাক্রমে-

➀ বচনটি (P) সত্য হবে।

➁ বচনটির সত্যতায় জ্ঞাতার বিশ্বাস থাকবে। এবং

➂ বিশ্বাসের সমর্থনে উপযুক্ত বা পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ হাজির করতে হবে।

এই সাক্ষ্যপ্রমাণকে দু-ভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে : (i) সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়কে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। এবং (ii) সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়কে নমনীয়ভাবে প্রয়োগ করা। সাক্ষ্যপ্রমাণকে যদি জানার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা হবে জানার সবল অর্থ (Strong Sense)। আর সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়টিকে যদি নমনীয়ভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে তা হবে জানার দুর্বল অর্থ (weak sense)। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে 'জানা' ক্রিয়াপদটিকে সাধারণত দুর্বল অর্থেই ব্যবহার করি। কিন্তু দার্শনিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘জানা’ ক্রিয়াপদটিকে সবল অর্থেই প্রয়োগ করা হয়।

অধ্যাপক জন হস্পার্স তাঁর An Introduction to Philosophical Analysis' নামক গ্রন্থে জানা-র সবল ও দুর্বল অর্থের মধ্যে বিভাজন করেছেন। প্রখ্যাত যৌক্তিক অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক ম্যালকম ও তাঁর 'Knowledge and Belief" প্রবন্ধে জানার সবল ও দুর্বল অর্থের উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, 'জানা' ক্রিয়াপদটি সবল ও দুর্বল উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

বিভিন্ন বচনের ক্ষেত্রে জানার দুর্বল ও সবল অর্থের তফাত

‘জানা’র সবল ও দুর্বল অর্থ: ম্যালকমের মতানুসারে, 'আমি জানি যে P’ এরূপ বলার সময় যদি বিষয়টিকে পুনরায় পরীক্ষা করার মানসিকতা না থাকে, তাহলে তাকে বলা হয় জানার সবল অর্থ। অপরদিকে, ‘আমি জানি যে P– এরূপ বলার সময় বিষয়টিকে যদি জ্ঞাতার পুনরায় পরীক্ষা করার প্রবণতা থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে ‘জানা’ নামক ক্রিয়াপদটি দুর্বল অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

বৈশ্লেষিক বচনের সবল ও দুর্বল অর্থ: ম্যালকম্ তাঁর প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, বৈশ্লেষিক ও সাংশ্লেষিক –এই উভয় প্রকার বচনের ক্ষেত্রেই জ্ঞানের সবল ও দুর্বল অর্থের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বৈশ্লেষিক বচনের দুটি উদাহরণের উল্লেখ করেছেন—

➀ আমি জানি যে, ৯২×১৬-১৪৭২ এবং ➁ আমি জানি। যে, ২×২=৪। এই দুটি বচন গাণিতিক বচন এবং দুটি বচনই নিশ্চিত। তবুও এই দুটি ক্ষেত্রে 'জানা' শব্দটি একই অর্থে প্রযুক্ত হতে পারে না। কারণ, প্রথম বচনটির ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমাদের সন্দেহের অবকাশ থাকতেই পারে এবং সেকারণেই বিষয়টিকে পুনরায় পরীক্ষা (বা যাচাই) তথা গণনা করার প্রবণতা থেকে। যায়। সুতরাং, এটি দুর্বল অর্থে জানা-র বিষয়টিকে নির্দেশ করে। কিন্তু দ্বিতীয় বচনটির ক্ষেত্রে বচনের নিশ্চয়তা সম্পর্কে আমাদের কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না। আর তাই বিষয়টিকে পুনরায় পরীক্ষা বা গণনা করার মানসিকতা থাকে না। এরুপ ক্ষেত্রে ‘জানা’ শব্দটি সবল অর্থেই প্রযুক্ত।

সাংশ্লেষিক বচনের সবল ও দুর্বল অর্থ: অভিজ্ঞতামূলক সংশ্লেষক বচনের ক্ষেত্রেও ‘জানা’র সবল ও দুর্বল অর্থের পরিচয়। পাওয়া যায়। এক্ষেত্রেও দুটি উদাহরণের উল্লেখ করা যাক— ➀ আমার টেবিলে একটি কালির দোয়াত আছে। এবং ➁ সূর্য পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত। প্রথম বচনটি হল অভিজ্ঞতামূলক সাংশ্লেষিক বচন। কিন্তু একে পুনরায় পরীক্ষা বা যাচাই করার মতো মানসিকতা আমাদের থাকে না। বিষয়টিকে আমরা স্বাভাবিকভাবেই নিশ্চিত বলে মেনে নিই। সেকারণেই এরূপ বচন সরল অর্থে প্রযুক্ত। কিন্তু দ্বিতীয় বচনটির ক্ষেত্রে আমাদের মন স্বাভাবিকভাবেই সন্দিহান হয়ে উঠতে পারে। এবং বিষয়টিকে পুনঃপুন যাচাই করার প্রবণতা থাকে। তাই এরূপ বচনের ক্ষেত্রে 'জানা' ক্রিয়াপদটি দুর্বল অর্থেই প্রযুক্ত হয়।

◉ নরমপন্থী বুদ্ধিবাদ

ভূমিকা: জ্ঞানের উৎস সম্পর্কিত যে সমস্ত মতবাদ প্রচলিত, তাদের মধ্যে বুদ্ধিবাদ হল অন্যতম। বুদ্ধিবাদ অনুসারে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাকেই জ্ঞানের উৎসরূপে দাবি করা হয়। বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাকে জ্ঞানের উৎসরূপে স্বীকার করে নিলেও বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার ভূমিকা নিয়ে সমস্ত বুদ্ধিবাদী দার্শনিক কিন্তু কখনোই ঐকমত্য পোষণ করেন না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধিবাদের দুটি রূপ লক্ষ করা যায়। এদের একটি হল চরমপন্থী বুদ্ধিবাদ (Extreme Rationalism) এবং অন্যটি হল নরমপন্থী বুদ্ধিবাদ (Moderate Rationalism) |

একমাত্র নয়, কিন্তু মূল উৎস: নরমপন্থী বুদ্ধিবাদ অনুসারে বুদ্ধি জ্ঞানের মূল উৎসরূপে গণ্য হলেও, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই জ্ঞানের একমাত্র উৎস নয়। বুদ্ধি ছাড়াও জ্ঞানের আরও অন্যান্য উৎস থাকতেও পারে। সুতরাং, চরমপন্থী বুদ্ধিবাদীরা যেখানে বুদ্ধিকেই জ্ঞানের একমাত্র উৎস রূপে দাবি করেছেন, সেখানে। নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীরা তা পুরোপুরি মানেননি। তাঁরা জ্ঞানোৎপত্তির ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় সংবেদনের ভূমিকার কথা একেবারেই অস্বীকার করেননি। নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীদের অন্যতম হলেন, স্পিনোজা, লাইবনিজ, ইমানুয়েল কান্ট প্রমুখ দার্শনিকগণ।

জ্ঞানের বিভাজন: নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীরা জ্ঞানকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন— যথার্থ তথা সর্বোৎকৃষ্ট জ্ঞান এবং ® নিকৃষ্ট ধরনের জ্ঞান। যথার্থ তথা সর্বোৎকৃষ্ট জ্ঞান বিশুদ্ধ বুদ্ধি তথা প্রজ্ঞার দ্বারা লাভ করা গেলেও, নিকৃষ্ট ধরনের জ্ঞান ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতার দ্বারা লাভ করা যায়। সুতরাং অভিজ্ঞতার দ্বারা যে-কোনো জ্ঞানই লাভ করা যায় না, বা তা জ্ঞানের উৎসরূপে আদৌ গণ্য হতে পারে না, এরকম দাবি আদৌ সংগত নয়। নরম বা উদারপন্থী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মত অনুসরণ করে বলা যায় যে, জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধি উভয়েরই প্রয়োজন আছে। একটিকে ছাড়া অন্যটি অন্ধ বা শূন্যগর্ভরূপে গণ্য হয়। কান্ট দাবি করেন যে, জ্ঞানের প্রক্রিয়ায় জ্ঞানের উপাদান যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার আকারও প্রয়োজন। শুধুমাত্র উপাদান দিয়ে অথবা শুধুমাত্র আকার দিয়ে কখনোই জ্ঞান সৃষ্টি হতে পারে না। জ্ঞানের এই উপাদান পাওয়া যায় ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি বা বোধশক্তি জ্ঞানের আকার (Form) প্রদান করে। জ্ঞান শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা অথবা শুধুমাত্র বুদ্ধির একক ফসল নয়। এ হল বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার যৌথ প্রয়াস। সুতরাং, নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীদের মতে, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা জ্ঞানের মৌল উৎসরূপে গণ্য হলেও, তা কখনোই একমাত্র উৎস নয়।

স্পিনোজা ও লাইবনিজের মত: উদারপন্থী বুদ্ধিবাদী দার্শনিক স্পিনোজাও দাবি করেন যে, আমরা জ্ঞান লাভ করি বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা—উভয়ের মাধ্যমে। তিনি এও দাবি করেন যে, আমরা ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতায় যে জ্ঞান লাভ করি তা অসম্পূর্ণ ও দুর্বোধ্য। কিন্তু বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার মাধ্যমে যে জ্ঞান পাই, তা যথার্থ ও সম্পূর্ণ। অনুরূপভাবে লাইবনিজ 'বুদ্ধিলব্ধ সত্যজ্ঞান’ ও ‘বাস্তব ঘটনা বিষয়ক জ্ঞান’—উভয় প্রকার জ্ঞানকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। প্রথম ধরনের জ্ঞান লাভ করা যায় শুধুমাত্র বিশুদ্ধ বুদ্ধি দ্বারা, কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের জ্ঞান পাওয়া যায় আমাদের ইন্দ্রিয় সংবেদন দ্বারা। সুতরাং, নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীরা কখনোই শুধুমাত্র বুদ্ধিকে জ্ঞানের উৎসরূপে স্বীকার করেন না।

যথার্থ নরমপন্থী হিসেবে কান্ট: প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকেই প্রকৃত নরমপন্থী বুদ্ধিবাদী হিসেবে অভিহিত করা উচিত। কারণ, কান্ট দাবি করেন যে, জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধি উভয়েরই প্রয়োজন আছে। একটিকে ছাড়া অন্যটি অন্ধের মতো। তাঁর মতে, জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে জ্ঞানের উপাদানের যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার আকারেরও প্রয়োজন। শুধুমাত্র উপাদান এবং আকার দিয়ে জ্ঞানলাভ আদৌ সম্ভব হয় না। জ্ঞানের উপাদান আসে ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা থেকে আর তার আকার লাভ হয় বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে। সুতরাং, জ্ঞান হল বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা—উভয়ের যৌথ ফসল।

জ্ঞানের উৎস-সম্পর্কিত স্পিনোজার মতবাদ

প্রাথমিক ধারণা: প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক স্পিনোজা হলেন একজন বুদ্ধিবাদী দার্শনিক। তিনি বিশ্বাস করেন যে, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই হল জ্ঞানের মৌল উৎস। অর্থাৎ, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার মাধ্যমেই আমরা নিশ্চিত ও যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারি। তাঁর মতে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা যে জ্ঞান লাভ করি, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং সেকারণেই তা জ্ঞানের মর্যাদা লাভে সমর্থ নয়। যথার্থ জ্ঞান কখনোই অভিজ্ঞতালব্ধ নয়, অবশ্যই বুদ্ধিলব্ধ।

মূল উৎস হিসেবে সহজাত ধারণা: দেকার্তের মতো স্পিনোজাও দাবি করেন যে, আমাদের যথার্থ ও নিশ্চিত জ্ঞানের মৌল উৎস হল সহজাত ধারণা এবং এই সহজাত ধারণাগুলি হল অবশ্যই বুদ্ধিলব্ধ। দেকার্ত অবশ্য এই সহজাত ধারণা ছাড়া. আগভুক ও কৃত্রিম ধারণা নামক আরও দু প্রকার ধারণাকে স্বীকার করেছেন। কিন্তু সেই সমস্ত ধারণাপ্রসূত জ্ঞানকে তিনি অযথার্থ জ্ঞানরূপে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, দেকার্ত যথার্থ এবং অযথার্থ— এই দু প্রকার জ্ঞানের উল্লেখ করেছেন। দেকার্তকে অনুসরণ করেও স্পিনোজা কিন্তু তিনপ্রকার জ্ঞানের কথা বলেছেন। এই তিনপ্রকার জ্ঞান হল যথাক্রমে ➀ অসম্পূর্ণ জ্ঞান যা অযথার্থরূপে গ্রাহ্য, ➁ সম্পূর্ণ জ্ঞান যা যথার্থ বৌদ্ধিক জ্ঞানরূপেই গণ্য এবং ➂ স্বজ্ঞালব্ধ পরম জ্ঞান। প্রথম প্রকারের জ্ঞানের উৎস হল ইন্দ্রিয়লব্ধ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, কল্পনা প্রভৃতি। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞানের মৌল উৎস হল প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি। তাঁর মতে, এই ধরনের জ্ঞান হল যথার্থ ও অত্যন্ত সুস্পষ্ট। আর স্বজ্ঞালব্ধ পরম জ্ঞানের মৌল উৎস হল স্বজ্ঞা বা সাক্ষাৎ অনুভূতি (Intuition)। এই ধরনের জ্ঞানকে তিনি পরম জ্ঞানরূপে উল্লেখ করেছেন। কারণ, এই ধরনের জ্ঞান লাভ করার পর মানুষের আর অন্য কোনো কিছু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার থাকে না। এই স্বজ্ঞা বা সাক্ষাৎ অনুভূতিও হল বিশুদ্ধ বুদ্ধিপ্রসূত।

জ্যামিতিক পদ্ধতির প্রয়োগ: স্পিনোজা তাঁর দর্শনতত্ত্বের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, তা জ্যামিতিক পদ্ধতি (Geometrical Method) নামে খ্যাত। দেকার্ত যেমন বুদ্ধিলব্ধ ‘আমি’ বা ‘আত্মার’ ধারণা ও তার অস্তিত্বের ওপর দর্শনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন, স্পিনোজাও তেমনি বুদ্ধিলব্ধ একমাত্র দ্রব্য তথা ঈশ্বরের সহজাত ধারণার ওপর ভিত্তি করে জ্যামিতিক পদ্ধতিতে সবকিছুকেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরই হলেন একমাত্র দ্রব্য। ঈশ্বর হলেন অসীম, অনন্ত, সর্বশক্তিমান ও স্বনির্ভর এবং স্বতঃজ্ঞাত সত্তা, যা থেকে জীবজগৎ বা প্রকৃতির উৎপত্তি ঘটেছে। তাই তিনি বলেন, দ্রব্য = ঈশ্বর = প্রকৃতি। এরকম বিষয়টিকে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে প্রয়োজন হল বিশুদ্ধ বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার। সুতরাং, আমাদের বুদ্ধি তথা প্রজ্ঞার স্বচ্ছ আলোকে একমাত্র ঈশ্বরের জ্ঞানই লাভ করা যায় এবং এরূপ বুদ্ধিলব্ধ জ্ঞানই হল একমাত্র যথার্থ জ্ঞান।

জ্ঞানের উৎপত্তি-সংক্রান্ত লাইবনিজের অভিমত

  • প্রাথমিক ধারণা: প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক লাইবনিজ হলেন একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবাদী দার্শনিক। তাঁর মতে, বুদ্ধিই হল জ্ঞানের মৌল উৎস। কারণ, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার দ্বারাই যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়। পূর্বসুরিদের মতো তিনিও দাবি করেন যে, অভিজ্ঞতার দ্বারা আমরা কখনোই যথার্থ জ্ঞান পেতে পারি না। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা যে জ্ঞান লাভ করি, তা অবশ্যই। অযথার্থ ও সংকীর্ণ। শুধুমাত্র বুদ্ধিই হল যথার্থ জ্ঞানের নির্ণায়ক।

> জ্ঞানের প্রকারভেদ: লাইবনিজ বুদ্ধিলব্ধ সত্য (Truths of Reason) এবং তথ্যলব্ধ সত্য (Truths of Fact) এই দু প্রকার জ্ঞানের উল্লেখ করেছেন।

© বুদ্ধিলব্ধ সত্য : লাইবনিজের মতে, প্রথম প্রকার সত্য প্রকাশিত হয় আবশ্যিক বচনের মাধ্যমে। কারণ, আবশ্যিক বচনগুলি স্বতঃসিদ্ধ (Self-evident) অথবা তার থেকে নিঃসৃত বচনরূপে গণ্য। আবশ্যিক বচনগুলির বিরোধী বচনগুলি অবশ্যই মিথ্যা হয়। সুতরাং, সমস্ত বুদ্ধিলব্ধ সত্য আবশ্যিকভাবেই সত্য এবং সেগুলির সত্যতা বিরোধনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

© তথ্যলব্ধ সত্য: তথ্যলব্ধ সত্যগুলি কখনোই আবশ্যিক বচনের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে না। এই ধরনের জ্ঞানের সত্যতা আপতিক বচনের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। কারণ, এরূপ জ্ঞানগুলি আপত্তিকরূপেই গণ্য। অর্থাৎ, এই ধরনের জ্ঞান কখনো কখনো সত্য, আবার কখনো কখনো মিথ্যারূপে গণ্য। এই সমস্ত আপতিক বচনের বিরোধী বচন সর্বদাই সম্ভব। সুতরাং, তথ্যলব্ধ জ্ঞানের সত্যতা কখনোই। আবশ্যিক নয় এবং সেকারণেই এর বিপরীত বচন কল্পনা করা সম্ভব। এই জাতীয় বচন বা জ্ঞান কখনোই বিরোধনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়, তা পর্যাপ্ত হেতুর নীতির (Principle of Sufficient Reason) ওপর প্রতিষ্ঠিত।

  • দেকার্ত ও স্পিনোজার মতের সঙ্গে পার্থক্য: লাইবনিজ একজন আধুনিক বুদ্ধিবাদী দার্শনিকরূপে গণ্য হলেও, অপর দুই আধুনিক বুদ্ধিবাদী দার্শনিক দেকার্ত এবং স্পিনোজার মত থেকে তিনি কিছুটা স্বতন্ত্র বা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কারণ, দেকার্ত এবং স্পিনোজার মতে, আমাদের কোনো কোনো ধারণা হল সহজাত (Innate), কিন্তু লাইবনিজের মতে, আমাদের সমস্ত ধারণাই হল সহজাত।

● মনাদ-ই দ্রব্য বুদ্ধিলব্ধ : তাঁর মতে, চিদাণু বা চিৎ-পরমাণুই হল দ্রব্য এবং তা সংখ্যায় অগুনতি। বিশ্বজগৎ অসংখ্য চিৎ-পরমাণু সমন্বিত। চিৎ-পরমাণুগুলি হল আত্মার স্ফুলিঙ্গ স্বরূপ অধ্যাত্মিক একক এবং এগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এগুলিকেই তিনি মনাদ (Monad)-রূপে উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেকটি মনাদ নিজ নিজ শক্তিতে তার অন্তস্থ সুপ্ত জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়। মনাডের যাবতীয় ধারণা মনের মধ্যেই অব্যক্তভাবে উপস্থিত থাকে। আমাদের মানসিক ক্রিয়ার মাধ্যমেই সেগুলি ব্যক্ত হয়। সুতরাং, আমাদের সমস্ত ধারণাই হল সহজাত এবং সমস্ত যথার্থ জ্ঞান হল সহজাত ধারণাপ্রসূত। এগুলি শুধুমাত্র বুদ্ধির দ্বারাই লাভ করা যায়।

নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের মূল বক্তব্য

♦ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বুদ্ধিকেও স্বীকার: নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী ইন্দ্রিয় সংবেদন জ্ঞানের একটি মুখ্য ও নির্ভরযোগ্য উৎসরূপে গণ্য হলেও অপরাপর উৎসের মাধ্যমেও জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। অর্থাৎ, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার মাধ্যমেও জ্ঞান লাভ হতে পারে। নরমপন্থী বুদ্ধিবাদীরা জ্ঞানের উৎস সম্বন্ধীয় আলোচনায় অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধির ভূমিকাকেও স্বীকার করে নিয়েছেন। নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদীরূপে শীর্ষস্থান অধিকার করে আছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম।

♦ হিউমের দু-প্রকার জ্ঞানকে স্বীকৃতি দান: নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক ডেভিড হিউম দু প্রকার জ্ঞানকে স্বীকার করেছেন। এই দু-প্রকার জ্ঞানের একটি হল অভিজ্ঞতানির্ভর তথ্যমূলক জ্ঞান (Knowledge about Matters of Fact) এবং অপরটি হল বুদ্ধিনির্ভর ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান ( Knowledge about Relation of Ideas)।

  1. অভিজ্ঞতানির্ভর তথ্যমূলক জ্ঞান : এই প্রকারের জ্ঞান লাভ করা যায় মূলত ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। তাই এধরনের জ্ঞানগুলি কখনোই সুনিশ্চিতরূপে গণ্য নয়। এগুলি সত্যও হাতে পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে। অর্থাৎ এগুলি আপতিরুপেই গণ্য।
  2. ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞান : এই ধরনের জ্ঞান লাভ করা যায় মূলত বোধশক্তি তথা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে, কখনোই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নয়। এই প্রকারের জ্ঞান অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষরূপে গণ্য হওয়ায় তা অনিবার্যভাবে সত্য। এই ধরনের জ্ঞানের বিরোধী বচনগুলি সবসময়ই মিথ্যারূপে পণ্য। গণিতশাস্ত্র ও যুক্তিবিজ্ঞানের জ্ঞান মূলত এই ধরনের জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, ডেভিড হিউম একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরূপে গণ্য হলেও, তিনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বুদ্ধির বিষয়টিকে উপেক্ষা করেননি।

♦ সংশয়বাদের প্রতিষ্ঠা: নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের আরও একদফা পরিচয় পাওয়া যায় হিউমের সংশয়বাদের মাধ্যমে। জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে সংশয়বাদের আবির্ভাব হয় হিউমের দর্শনে। এ কথা বলা যায় যে, হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের স্বাভাবিক পরিণতি হল সংশয়বাদ। কারণ, কয়েকটি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা একটি সার্বিক বচন প্রতিষ্ঠা করি। এরূপ সার্বিক বচনটি কিন্তু কখনোই অনিবার্যভাবে সত্য হতে

পারে না। উদাহরণস্বরূপ বিশেষ বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্রে আগুনের দাহিকা শক্তিকে প্রত্যক্ষ করে আমরা সার্বিকভাবে বলি যে, সমস্ত ক্ষেত্রেই আগুন দহনক্রিয়া সম্পন্ন করে। এরুপ সার্বিক বচনকে কখনোই সুনিশ্চিতরুপে গণ্য করা যায় না। তাই এ ধরনের বচন সংশয়াত্মক। কিন্তু হিউম গাণিতিক বচনের ক্ষেত্রে সংশয়াত্মক মনোভাব পোষণ করেননি, যদিও তা বুদ্ধির দ্বারা লভ্য। সুতরাং দেখা যায়, জ্ঞানের উপায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে হিউম অভিজ্ঞতাবাদী হয়েও নরম মনোভাব গ্রহণ করেছেন।

No Content