Chapter -2⇒ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা

উত্তরঃ- ভারতের একটি প্রাচীন জনপদ হল 'বঙ্গ' বা 'বঙ্গদেশ'। বিংশ শতকের পূর্বে বঙ্গদেশ বলতে যা বোঝাত প্রাচীনকালে তা বোঝাত না। বঙ্গদেশের বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল।

রাঢ় সুহ্ম: বর্তমানে যে অঞ্চল রাঢ় অঞ্চল বলে সুপরিচিত সেটি ছিল প্রাচীনকালের রাঢ়দেশ। রাঢ়দেশ দু-ভাগে বিভক্ত ছিল- (1) উত্তর রাঢ় ও (2) দক্ষিণ রাঢ়।

উত্তর রাঢ় ‘বজ্জভূমি' ও দক্ষিণ রাঢ় ‘সুব্‌ভ ভূমি’বা ‘সুক্ষ্মভূমি' নামে পরিচিত ছিল। অজয় নদ ছিল উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ়ের মধ্যবর্তী সীমারেখা। অজয় নদের উত্তরে ছিল উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণে দক্ষিণ রাঢ়। উত্তর রাঢ় ছিল বর্তমান মুরশিদাবাদ, বীরভূম, সাঁওতাল পরগনা, বর্ধমান প্রভৃতি জেলার অংশ নিয়ে গঠিত। দক্ষিণ রাঢ় ছিল হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও বর্ধমানের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। মহাভারত ও কালিদাসের কাব্যে আছে যে, ভাগীরথী ও কাঁসাই (কংসাবতী) নদীর মধ্যবর্তী এলাকা থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দক্ষিণ রাঢ় বিস্তৃত ছিল।

গৌড়: প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে গৌড় ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। আবার গৌড় বলতে একটি জনগোষ্ঠীকেও বোঝাত। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে বরাহমিহিরের রচনা থেকে জানা যায় মুরশিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমান জেলার পশ্চিম অংশ নিয়ে সেকালের গৌড় রাজ্য গড়ে উঠেছিল।

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে গৌড়ের রাজা ছিলেন শশাঙ্ক। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। খ্রিস্টীয় অষ্টম-নবম শতকে সমগ্র পাল সাম্রাজ্যকে গৌড় বলা হত।

উত্তর: প্রাচীন বাংলার প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলি ছিল—পুণ্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র, বঙ্গ, বঙ্গাল, রাঢ়-সুহ্ম, গৌড়, সমতট ও হরিকেল।

পুণ্ড্রবর্ধন: প্রাচীন বাংলার অঞ্চলগুলির মধ্যে বৃহত্তম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন। এই অঞ্চলটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহি, পাবনা ও শ্রীহট্ট (সিলেট) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বরেন্দ্র: ভাগীরথী ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল বরেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল।

বঙ্গ : পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর মাঝে ত্রিভুজের মতো দেখতে বদ্বীপ এলাকাকে বঙ্গ বলা হত।

বঙ্গাল: বঙ্গের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী বঙ্গোপসাগরের উপকূল অঞ্চল বঙ্গাল নামে পরিচিত ছিল।

রাঢ় সুহ্ম: রাঢ় অঞ্চল দুভাগে বিভক্ত – (1) উত্তর রাঢ় (বজ্জ ভূমি) ও দক্ষিণ রাঢ় (সুব্‌ভ ভুমি বা সুহ্মভুমি)। অজয় নদের উত্তরদিক উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণদিক দক্ষিণ রাঢ় নামে পরিচিত।

গৌড় : বর্তমান মুরশিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমান জেলার পশ্চিমভাগ নিয়ে গৌড় রাজ্য গড়ে উঠেছিল।

সমতট : মেঘনা নদীর পূর্বদিকের এলাকা, বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা ও নোয়াখালি অঞ্চল সমতট নামে পরিচিত।

হরিকেল : সমতটের দক্ষিণ-পূর্ব দিক, বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূল অঞ্চল হরিকেল নামে পরিচিত।

উত্তর: শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম সার্বভৌম রাজা। প্রথম জীবনে তিনি মহাসেনগুপ্তের সামন্ত ছিলেন। গুপ্ত বংশের দুর্বলতার সুযোগে ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

উপাদান : শশাঙ্ক সম্পর্কে জানা যায় কবি বাণভট্ট রচিত হর্ষচরিত, চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং) রচিত সি-ইউ-কি এবং বৌদ্ধ প্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থ থেকে।

শশাঙ্কের রাজ্যবিস্তার : গৌড় রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণের পর শশাঙ্ক সমগ্র গৌড়দেশ, মগধ, বুদ্ধগয়া অঞ্চল এবং ওড়িশার একাংশ জয় করেন। তাঁর রাজত্ব উত্তর পশ্চিম বারাণসী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল বর্তমান  মুরশিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণ।

স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা : শশাঙ্ক প্রথম বাংলার গৌড়ে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি উত্তর ভারতেও আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

মৈত্রীজোট গঠন ও কনৌজ আক্রমণ : গৌড় রাজ্যের প্রতিবেশী রাজ্য কনৌজের রাজা গ্রহবর্মার সঙ্গে থানেশ্বরের রাজকন্যা রাজ্যশ্রীর বিবাহ হলে কনৌজ ও থানেশ্বর জোটবদ্ধ হয়। শশাঙ্কও মালবরাজ দেবগুপ্তের সঙ্গে মিলিত হন, তাদের আক্রমণে কনৌজরাজ নিহত হন। তাঁর পত্নী রাজ্যশ্রী বন্দিনি হন। থানেশ্বররাজ রাজ্যবর্ধনও শশাস্ত্রের হাতে নিহত হন।

শশাঙ্ক-হর্ষবর্ধন দ্বন্দ্ব: হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণ করে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। হর্ষবর্ধনের সঙ্গে শশাঙ্কের যুদ্ধের ফল কী হয়েছিল সে সম্পর্কে সঠিক জানা যায় না। তবে পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, শশাঙ্ক যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন পর্যন্ত হর্ষবর্ধন গৌড় দখল করতে পারেননি।

গৌড়তন্ত্র : গৌড়ের সিংহাসনে বসার পর শশাঙ্ক একটি সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এটি ‘গৌড়তন্ত্র' নামে পরিচিত ছিল।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি যে রাজ্যজয়ের নীতি অনুসরণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তা অনুসরণ করে পাল বংশের রাজারা এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

উত্তর : শশাংক ও হর্ষবর্ধনের সংঘাতের কারণ ও ফলাফল :

কারণ : গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক সমগ্র বাংলা ও বিহার এবং ওড়িশার কিছু অংশ জয় করার পর কনৌজ দখলের পরিকল্পনা করেন। কনৌজের রাজা গ্রহবর্মা থানেশ্বরের রাজকন্যা হর্ষবর্ধনের ভগিনী রাজ্যশ্রীকে বিবাহ করেন। ফলে কনৌজ ও থানেশ্বর জোটবদ্ধ হয়। শশাঙ্কও মালবরাজ দেবগুপ্তের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন এবং কনৌজ আক্রমণ করেন। ফলে-

(1) শশাঙ্ক কনৌজ দখল করে গ্রহবর্মাকে হত্যা করেন।

(2) কনৌজ উদ্ধারে আগত হর্ষবর্ধনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা থানেশ্বররাজ রাজ্যবর্ধনকে শশাঙ্ক হত্যা করেছিলেন।

এরপর হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং শশাঙ্কের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন।

ফলাফল : হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণ করে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এই সংঘাতের ফলাফল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। যেমন—

[1] বাণভট্ট এবং হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং) এই যুদ্ধ সম্পর্কে নীরব।

[2] আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে বলা আছে, হর্ষবর্ধন শশাঙ্ককে পরাজিত করেছিলেন। তবে বর্তমানে গ্রহণযোগ্য মত হল হর্ষবর্ধন শশাঙ্কের কোনো ক্ষতি করতে পারেননি। শশাঙ্কের মৃত্যুর (৬৩৭ খ্রি.) পর হর্ষবর্ধন বাংলা জয় করেছিলেন।

উত্তর : গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। এটি ‘কানসোনা' নামেও পরিচিত।

কর্ণসুবর্ণ নগরের অবস্থান : পশ্চিমবঙ্গের মুরশিদাবাদ জেলার চিরুটি রেলস্টেশনের কাছে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের ধ্বত পাওয়া গেছে। স্থানীয়ভাবে এটি রাজা কর্ণের প্রাসাদ নামেও পরিচিত।

ঐতিহাসিক প্রত্নস্থল : বর্তমান চিরুটি রেলস্টেশনের কাছে রাজবাড়িডাঙায় রক্তমৃত্তিকা (রাঙামাটি) বৌদ্ধবিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। চিনা পর  হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং) একে ‘লো-টো-মো-চিহ’ বলেছেন। এর পাশেই গৌড়ের রাজধানী  কর্ণসুবর্ণ নগরের প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে।

অধিবাসীদের বিবরণ: হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং) এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে,  এখানকার মানুষের চরিত্র খুব ভালো, শিক্ষাদীক্ষার পৃষ্ঠপোষক এবং তাঁরা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কর্ণসুবর্ণ  নগরে বৌদ্ধ ও শৈৰ উভয় ধর্মের মানুষ বসবাস করত।

জলবায়ু : কর্ণসুবর্ণ অঞ্চলের জমি নীচু ও আর্দ্র— তাই এখানে কৃষিকাজ ভালো হয়।  এখানে প্রচুর ফুল ও ফল পাওয়া যায়। এখানকার জলবায়ু নাতিশীতোয়।

ব্যাবসাবাণিজ্য: কর্ণসুবর্ণ সেকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।  শশাঙ্কর রাজত্বের আগে থেকেই এখানের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগ  ছিল। রক্তমৃত্তিকা থেকে একজন বণিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় দ্বীপে ব্যাবসা করতে গিয়েছিলেন তার প্রমাণ পাও ।

পতন : শশাঙ্কের মৃত্যুর পর কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মা কর্ণসুবর্ণ আক্রমণ ও দখল করেন। তারপর রাজা জয়নাগ কর্ণসুবর্ণ শহরে রাজধা  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর পরবর্তীকালে কর্ণসুবর্ণ নগরের অবক্ষয় ও অবসান ঘটে।

উত্তর : শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার গৌড়ের রাজা। তিনি ৬০৬ থেকে ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে গৌড়ে রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর আমলে  ব্যাবসাবাণিজ্য হ্রাস পেয়েছিল এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির গুরুত্ব বেড়েছিল। 

 ব্যাবসাবাণিজ্য : শশাঙ্কের আমলে বাংলায় ব্যাবসাবাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছিল।  ব্যাবসাবাণিজ্যের অবনতির ফলে সমাজে শ্রেষ্ঠী বা বণিকদের ক্ষমতা ও গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। 

মুদ্রা : শশাঙ্কের আমলে বাংলায় সোনার মুদ্রা চালু ছিল তবে তার মান পড়ে গিয়েছিল।  তখন নকল সোনার মুদ্রাও ছিল, কিন্তু রুপোর মুদ্রা ছিল না।

কৃষি: শশাঙ্কের আমলে মানুষ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়েছিল। ফলে সমাজে জমির চাহিদাও  বেড়েছিল। সমাজ ক্রমশ গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। সমাজে স্থানীয় প্রধানদের বা মহত্তরদের ক্ষমতা ও গুরুত্ব বেড়েছিল। এই সময় স্থানী  প্রধানরা বণিক বা শ্রেষ্ঠীদের মতো সামাজিক মর্যাদা লাভ করেছিল।

উত্তর: শশাঙ্ক ছিলেন গৌড়ের রাজা। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। তিনি ছিলেন শিবের উপাসক বা শৈব। শশাঙ্কের সঙ্গে বৌদ্ধদের সম্পর্ক  কীরকম ছিল তা জানা যায় মূলত বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প থেকে।

শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল:-

1। তিনি বুদ্ধগয়ার পবিত্র 'বোধিবৃক্ষ' কেটে দিয়েছিলেন এবং তার শিকড় উপড়ে দিয়েছিলেন।

2। তিনি পাটলিপুত্রে বুদ্ধদেবের পদচিহ্ন অঙ্কিত পাথর নষ্ট করে দিয়েছিলেন।

3। তিনি কুশীনগর বিহার থেকে বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেছিলেন এবং তিনি অনেক বৌদ্ধভিক্ষুকে হত্যা  করেছিলেন।

শশাঙ্ক বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন বলে মনে হয় না। কারণ- 

[1] শশাঙ্কের শাসনকালের কয়েক বছর পর চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং) কর্ণসুবর্ণ’ নগরের

[2] শশাঙ্কের মৃত্যুর ৫০ বছর পর চিনা পর্যটক ইৎ-সি বাংলায় বৌদ্ধধর্মের উন্নতি লক্ষ করেছেন।

[3] শশাঙ্ককে যারা বৌদ্ধবিদ্বেষী বলেছেন তাঁরা ছিলেন শশাঙ্কের শত্রু হর্ষবর্ধনের আশ্রিত।

উত্তর: গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর (৬৩৭ খ্রি.) পর প্রায় একশো বছর ধরে বাংলায় যে অরাজকতা চলেছিল, তাকে মাৎস্যন্যায় বলা হয়।

মাৎস্যন্যায় শব্দের অর্থ : বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছকে গিলে খায়, বাংলায় সেরকম সবল মানুষ দুর্বালের উপর অত্যাচার করত। মাছের জগতের মতো বাংলার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে একে মাৎস্যন্যায় বলা হয়।

মাৎস্যন্যায় সৃষ্টির কারণ : বাংলায় মাৎস্যন্যায় সৃষ্টির কারণ হল-

প্রথমত, শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় কোনো শক্তিশালী রাজার আবির্ভাব হয়নি। দ্বিতীয়ত, বাংলা তখন কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল; যথা- ( কাজঙ্গল, ও কর্ণসুবর্ণ, ও পুণ্ড্রবর্ধন, 4 তাম্রলিপ্ত, 5 সমতট প্রভৃতি। ফলে অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল না।

রাজনৈতিক অবস্থা :

বিশৃঙ্খলা : বাংলায় দুর্বল মানুষের উপর সবলের অত্যাচার ও হত্যা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বৈদেশিক আক্রমণ: হর্ষবর্ধন, কামরূপরাজ ভাস্করবর্মা, নাগ সম্প্রদায়ের রাজা জয়নাগ, কাশ্মীরের মুক্তাপিড় ললিতাদিত্যের আক্রমণ ও লুণ্ঠনে বাংলা ছারখার হয়ে গিয়েছিল। ফলে বাংলার জনগণের দুঃখদুর্দশার অন্ত ছিল না।

মাৎস্যন্যায়ের অবসান : প্রায় একশো বছর ধরে এই অরাজকতা চলার পর বাংলার নেতৃবৃন্দ (প্রকৃতিগুপ্ত) সম্মিলিতভাবে গোপাল নামে জনৈক সামন্তরাজাকে বাংলার রাজা মনোনীত করে (৭.৫০ খ্রি.)। ফলে বাংলায় মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘাটে।

উত্তর:

বাংলায় পাল বংশের উত্থান: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় একশো বছর বাংলায় অরাজক অবস্থা চলেছিল। এরপর বাংলার প্রভাবশালী লোকেরা গোপাল নামে একজন সামন্তরাজাকে বাংলার রাজা নির্বাচন করে। এই সময় থেকে বাংলায় পাল বংশের শাসন শুরু হয়।

গোপাল (৭৫০-৭৭৪ খ্রি.) : গোপাল ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় পাল শাসনের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলার অধিকাংশ এলাকাকে নিজের শাসনের আওতায় এনেছিলেন।

ধর্মপাল (৭৭৪-৮০৬ খ্রি.): গোপালের পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল পাল বংশের রাজা হন। কনৌজাকে কেন্দ্র করে যে ত্রিশক্তি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। তাতে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

দেবপাল (৮০৬-৮৪৫ খ্রি.) : ধর্মপালের পর তাঁর পুত্র দেবপাল পাল বংশের রাজা হন। তিনি । পূর্বে প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে পশ্চিমে কম্বোজদেশ এবং উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান।

পাল বংশের পতন : দেবপালের পর পালদের ক্ষমতা কমতে থাকে। পালদের ক্ষমতা হ্রাসের কারণ হল- পালদের নিজেদের মধ্যে নানান সমস্যা। 121 দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট, পশ্চিম ভারতের প্রতিহার, ওড়িশার শাসকরা বাংলা ও বিহারের অনেক এলাকা জয় করেন। পালরাজা প্রথম মহীপাল পাল শাসনের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনেন।

কৈবর্ত বিদ্রোহ: পালরাজা দ্বিতীয় মহীপালের কর্মচারী দিব্য বরেন্দ্র অঞ্চলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরে পালরাজা রামপাল বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই পাল রাজত্ব কার্যত শেষ হয়ে যায়।

উত্তর: গোপাল ছিলেন বাংলার পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। গোপাল সম্পর্কে জানা যায় আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থ, খালিমপুর লিপি, মুঙ্গের লিপি প্রভৃতি থেকে।

গোপালের পূর্বপরিচয় : গোপাল ছিলেন সুনিপুণ যোদ্ধা, ৰপ্যট পুত্র। গোপালের পিতামহ দয়িতবিষু ছিলেন ‘সর্ববিদ্যা বিশারদ। গোপাল যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী একজন সামন্তরাজা ছিলেন। তাঁদের আদি বাসভূমি ছিল বরেন্দ্র এবং তাঁরা ক্ষত্রিয় ছিলেন।

গোপালের সিংহাসনলাভের পটভূমি : গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় একশো বছর ধরে বাংলায় চরম অরাজক অবস্থা বা মাৎস্যন্যায় চলছিল। জনগণের দুঃখদুর্দশা অবসানের জন্য বাংলার নেতৃবৃন্দ (প্রকৃতিপুঞ্জ) ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গোপালকে রাজা মনোনীত করেন।

কৃতিত্ব : সিংহাসনে আরোহণের পর গোপাল বাংলায় অরাজক অবস্থার অবসান ঘটান। তিনি সমগ্র বাংলায় নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাই খালিমপুর লিপিতে তাঁকে 'পরম সৌগত' বলা হয়েছে।

উত্তর :

গোপালের পর ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে যোদ্ধা ও কূটনীতিবিদ ধর্মপাল ক্ষুদ্র পাল রাজ্যকে সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। তাঁর আমলে বাংলা ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ আসন লাভ করেছিল।

কৃতিত্ব :

রাজ্যজয়: সিংহাসনে আরোহণের পর ধর্মপাল কনৌজ দখলের জন্য প্রতিহার ও রাষ্ট্রকুটদের সঙ্গে ত্রিশক্তি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন এবং কনৌজে তাঁর আধিপত্য বজায় রাখেন। তিনি কেদার (গাড়োয়াগ) ও গোকর্ণ (নেপাল) দখল করেন। গুজরাটি কবি সোল তাকে উত্তরাপথস্বামী বলে অভিহিত করেছেন।

অন্যান্য গুণাবলি :

[1]আর্যাবর্তের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর ওই অঞ্চলে তিনি সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন।

[2] তাঁর আমলে বিক্রমশীল মহাবিহার, সোমপুরী ও ওদন্তপুরী বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

[3] তিনি বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে তাঁকে ‘পরম সৌগত’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাঁর উপাধি ছিল ‘পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ'। তাঁর রাজত্বকালকে ঐতিহাসিকড রমেশচন্দ্র মজুমদার 'বাঙালির জীবন প্রভাত' বলে অভিহিত করেছেন।

উত্তর : 

কৃতিত্ব :

রাজ্যজয়: দেবপাল উত্তরাধিকার সূত্রে কনৌজ দখলের জন্য ত্রিমুখী লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। তবে তিনি প্রতিহাররাজ রামভদ্র ও মিহিরভোজকে পরাজিত করেন। রাষ্ট্রকুটরাজ প্রথম অমোঘবর্ষও তাঁর হাতে পরাজিত হন এবং তিনি কনৌজ দখল করতে সক্ষম হন। তিনি উৎকল, দ্রাবিড় ও কম্বোজ জয় করেন। কামরূপের রাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেন। তাঁর আমলে পাল সাম্রাজ্যের গৌরব চরম শিহরে উন্নীত হয়।

অন্যান্য গুণাবলি :

[1]দেবপাল সাম্রাজ্যে সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

[2] তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

[3] তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষু।

[4] শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজা বালপুত্রদেবকে তিনি নালন্দায় বৌদ্ধমঠ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন।

[5]তাঁর আমলে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রীবৃদ্ধি হয়। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর রাজত্বকালকে 'বাংলার ইতিহাসের মহান যুগ' বলে অভিহিত করেছেন।

  উত্তর: 

পালরাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে (১০৭০-৭১ খ্রি.) কৈবর্ত দিব্য বা দিব্বোকের নেতৃত্বে বরেন্দ্রভূমিতে যে বিদ্রোহ হয়েছিল  তাকে ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ বলা হয়। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত', কুমারপালের মন্ত্রী বৈদ্যদেবের 'কামাউলিপট্ট', মদনপালের 'মানাহালি দানপত্র'  থেকে কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা জানা যায়।

নেতা : কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা ছিলেন দিব্য (দিব্বোক বা দিবোক), তাঁর ভাই রুদোক (রুদ্রোক) এবং রুদোকের পুত্র ভীম।

বিদ্রোহের কারণ : কৈবর্ত্তরা কেন বিদ্রোহ করেছিল তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ আছে।

প্রথমত: পালরাজা রাজ্যপালের মন্ত্রী হন কৈবর্ত যশোদাস। তারপর থেকে কৈবর্তদের রাজনৈতিক উত্থানের সূচনা হয়।

দ্বিতীয়ত : কৈবর্ত দিব্য ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি। পাল রাজাদের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ এবং রাজপরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে  দিব্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

দিব্যের জয় : বিদ্রোহীদের হাতে পালরাজা মহীপাল নিহত হন। বিদ্রোহে জয়লাভ করে দিব্য বরেন্দ্রতে তাঁর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন।  দিব্য-র মৃত্যুর পর রূদোক ও ভীম সিংহাসনলাভ করেন।

বিদ্রোহ দমন : পালরাজা রামপাল কয়েকজন আঞ্চলিক সামস্তরাজাদের সাহায্য নিয়ে কৈবর্ত শাসক ভীমকে পরাজিত ও নিহত করেন এবং  বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন। রামপাল রামাবতী নগরে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই বিদ্রোহ পাল সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়।

 উত্তর :

বাংলায় সেন বংশের উত্থান :

খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে বাংলায় সেন বংশের শাসন শুরু হয়। সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল  দক্ষিণ ভারতের কর্ণাট অঞ্চল। তাঁরা সেখান থেকে এসে বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন।

[1]সামন্তসেন : সামস্তসেন বাংলায় সেন বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।

[2]হেমন্তসেন : সামস্তসেনের পুত্র হেমন্তসেন রাঢ় অঞ্চলে সেনদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ‘মহারাজাধিরাজ' উপাধি নেন।

[3]বিজয়সেন (১০৯৬-১১৫৯ খ্রি.) : হেমন্তসেনের পুত্র বিজয়সেনকে স্বাধীন সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি রাঢ়, গৌড়  পূর্ববঙ্গ এবং মিথিলা জয় করে সেন রাজ্যের পরিধি বাড়িয়েছিলেন।

[4]বল্লালসেন (১১৫৯-১১৭৯ খ্রি.) : বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন পাল রাজা গোবিন্দপালকে পরাস্ত করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

[5]লক্ষ্মণসেন (১১৭৯-১২০৪/৫ খ্রি.) : বল্লালসেনের পুত্র লক্ষণসেন প্রয়াগ, বারাণসী ও পুরীতে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিি  পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন।

সেন বংশের পতন (১২০৪/৫ খ্রি.) :

তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির আক্রমণে কার্যত বাংলায় সে  শাসনের অবসান ঘটে।

 উত্তর :

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট আমাদের দেশ ভারত স্বাধীন  হয়। এই সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীন ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য।  স্বাধীনতা লাভের আগে পশ্চিমবঙ্গ বঙ্গ, বাংলা বা বেঙ্গল-এর  অংশ ছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের সময় বাংলা ভাগ হয় এবং  বাংলার পূর্বভাগ নতুন দেশ পাকিস্তানে চলে যায়। বাংলার পশ্চিমভাগ  পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) নামে ভারতের একটি রাজ্য হিসেবে  আত্মপ্রকাশ করে।

উত্তর :

বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের প্রতিবেশী একটি দেশ। ১৯৪৭  খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের আগে বাংলাদেশ ভারতের অংশ ছিল। তখন  তা বাংলা বা বেঙ্গল নামে পরিচিত ছিল। দেশভাগের সময় বাংলার  পূর্ব অংশ নতুন দেশ পাকিস্তানে চলে যায়। তখন তার নাম হয়  পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান  স্বাধীন হয় এবং এই স্বাধীন দেশটির নাম হল বাংলাদেশ।

 উত্তর:

প্রাচীন বাংলার প্রধান অঞ্চলগুলির নাম : প্রাচীন বাংলার  প্রধান অঞ্চলগুলির নাম হল – বঙ্গ, © বঙ্গাল, © বরেন্দ্র, ©  পুণ্ড্র, © রাঢ়, © সুক্ষ্ম, গৌড়, ® সমতট এবং হরিকেল।  অঞ্চলের নামকরণের কারণ : প্রাচীন বাংলার প্রধান  অঞ্চলগুলির নামকরণ হয়েছে সাধারণভাবে ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের  নাম অনুসারে। যেমন— পুণ্ড্র, গৌড় প্রভৃতি নামগুলি হল এক-একটি  জনগোষ্ঠীর নাম।

উত্তর :

পুণ্ড্রবর্ধন ছিল প্রাচীন বাংলার অঞ্চলগুলির মধ্যে সবচেয়ে  বড়ো। পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চল গড়ে উঠেছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও  বাংলাদেশের দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহি, পাবনা নিয়ে। এক সময়  শ্রীহট্ট বা সিলেট পুণ্ড্রবর্ধনের ভিতরে ছিল। গুপ্ত রাজাদের আমলে  পুণ্ড্রবর্ধন ছিল একটি ভুক্তি বা শাসন এলাকা।

 উত্তর: 

বরেন্দ্র : বরেন্দ্র ছিল প্রাচীন বাংলার একটি প্রধান অঞ্চল।  বরেন্দ্র বলতে বোঝায় ভাগীরথী ও করতোয়া নদীর মাঝের এলাকাকে।

বঙ্গাল : বঙ্গাল প্রাচীন বাংলার অপর একটি প্রধান অঞ্চল।  বঙ্গাল বলতে বঙ্গের সীমান্তবর্তী বঙ্গোপসাগরের উপকূল এলাকাকে  বোঝায়।

উত্তর: 

প্রাচীন বাংলা যেসব জনপদে বিভক্ত ছিল তার মধ্যে ‘বঙ্গ’ ছিলঅন্যতম একটি। পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর মাঝে ত্রিভুজের মতো দেখতে  • বদ্বীপ এলাকাকে বঙ্গ বলা হত। অনেকে বলেন, ভাগীরথী নদী-সংলগ্ন  পশ্চিমদিকের এলাকাকেও বঙ্গ বলা হত। ভাগীরথী নদীর পশ্চিমদিকের  এই এলাকা রাঢ় ও সুষ্ম নামে পরিচিত ছিল। একাদশ-দ্বাদশ শতকে  বঙ্গ বলতে বাংলাদেশের ঢাকা, বিক্রমপুর, ফরিদপুর, বরিশাল প্রভৃতি  অঞ্চলকে বোঝাত।

 উত্তর :

 উত্তর রাঢ় : যা বজ্জভূমি বা বজ্রভূমি নামে পরিচিত এবং

দক্ষিণ রাঢ় : যা সুভভূমি (সুগ্মভূমি) নামে পরিচিত।

এলাকা : 

উত্তর রাঢ় বা বজ্জভূমি : উত্তর রাঢ় গড়ে উঠেছিল বর্তমান  বীরভূম ও সাঁওতাল পরগনা, মুরশিদাবাদ, বর্ধমান প্রভৃতি জেলার  কিছু অংশ নিয়ে।

দক্ষিণ রাঢ় বা সুত্তভূমি : দক্ষিণ রাঢ় অঞ্চল গড়ে উঠেছিল অজয়  ও দামোদর নদের মাঝের বিস্তৃত অঞ্চল এবং হাওড়া, হুগলি,  বর্ধমান জেলার কিছু অংশ নিয়ে।

উত্তর :

গৌড় : প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় গৌড় ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ  অঞ্চল। বর্তমান মুরশিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমান জেলার পশ্চিম অংশ  নিয়ে গৌড় অঞ্চল গড়ে উঠেছিল।

  গৌড়ের রাজধানী : গৌড়ের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ।

উত্তর :

মেঘনা নদীর পূর্বদিকের এলাকাকে প্রাচীন বাংলায় সমতট বলা  হত। বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা, নোয়াখালি অঞ্চল প্রাচীন সমতট  অঞ্চলের মধ্যে ছিল। মেঘনা নদী সমতট অঞ্চলকে বাংলার বাকি অঞ্চল  থেকে আলাদা করে রেখেছিল বলে সমতটকে বাংলার সীমান্তবর্তী  এলাকা বলা হত।

উত্তর :

প্রাচীন বাংলায় হরিকেল বলতে বোঝাত সমতট অঞ্চলের  দক্ষিণ-পূর্ব দিকের এলাকাকে। বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম  উপকূল অঞ্চল প্রাচীন যুগে হরিকেল নামে পরিচিত ছিল। আবার  অনেকে বলেন শ্রীহট্টের প্রাচীন নাম ছিল হরিকেল।

উত্তর :

শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম সার্বভৌম রাজা। ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে  তিনি স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  রাজ্যজয় : গৌড়ের সিংহাসন আরোহণের পর শশাঙ্ক  সমগ্র গৌড়দেশ, মগধ, বুদ্ধগয়া অঞ্চল এবং ওড়িশার একাংশ জয়  করেন। তাঁর রাজত্ব উত্তর-পশ্চিম বারাণসী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।  শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। কনৌজ দখলকে কেন্দ্র করে  হর্ষবর্ধনের সঙ্গে তাঁর সংঘাত শুরু হয়।

 উত্তর:

 শশাঙ্কের রাজধানী : শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ।

কর্ণসুবর্ণের অবস্থান : বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুরশিদাবাদ  জেলার চিরুটি রেলস্টেশনের কাছে রাজবাড়িডাঙায় প্রাচীন রক্তমৃত্তিকা  বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এর কাছেই কর্ণসুবর্ণ অবস্থিত।  কর্ণসুবর্ণ স্থানীয়ভাবে রাজা কর্ণের প্রাসাদ নামে পরিচিত।

উত্তর:

শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ সম্পর্কে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন  সাঙ (সুয়ান জাং) লিখেছেন যে— দেশটি জনবহুল এবং এখানকার  অধিবাসীরা অতি সমৃদ্ধ। এখানকার জমি নীচু ও আর্দ্র, নিয়মিত কৃষিকাজ  হয়, অঢেল ফুল-ফল পাওয়া যায়; জলবায়ু নাতিশীতোয় এবং এখানকার  মানুষজনের চরিত্র ভালো ও তাঁরা শিক্ষাদীক্ষার পৃষ্ঠপোষক। এখানে  বৌদ্ধ এবং শৈব উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই বসবাস করত।

উত্তর:

 গ্রন্থে শশাঙ্কের নিন্দা : শশাঙ্ককে বৌদ্ধবিদ্বেষী বলে  নিন্দা করা হয়েছে –

1. আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে,  2. হিউয়েন সাঙের (সুয়ান জাং) ভ্রমণবৃত্তান্ত সি-ইউ-কি গ্রন্থে এবং  3. হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট রচিত হর্ষচরিত গ্রন্থে।

শশাঙ্ককে বৌদ্ধবিদ্বেষী বলার কারণ : গৌড়ের রাজা  শশাঙ্ক ছিলেন শিবের উপাসক (শৈব)। তাঁর বিরুদ্ধে হিউয়েন সাঙ,  বাণভট্ট ও বৌদ্ধদের অভিযোগ হল— শশাঙ্ক বৌদ্ধভিক্ষুদের হত্যা  করেছিলেন।  বৌদ্ধদের পবিত্র স্মারক ধ্বংস করেছিলেন।

উত্তর : গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক গৌড় রাজ্যে যে শাসনব্যবস্থা গড়ে  তুলেছিলেন তাকে বলা হয় গোড়তন্ত্র। শশাঙ্কের শাসনব্যবস্থায়  রাজ্যে এক ধরনের কর্মচারী বা আমলাশ্রেণি গঠন করা হয়, যারা  গ্রামের স্থানীয় লোকেরা মেসর প্রশাসনিক কাজ করত সেহ কাজেহস্তক্ষেপ করত। অর্থাৎ শশাঙ্ক গৌড়রাজ্যে এমন এক নতুন ধরনের  প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন যাকে কেন্দ্র থেকে সমগ্র রাজ্যের গ্রামস্তর  পর্যন্ত প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হত।

No Content