Chapter-2, অস্থিত পৃথিবী

কয়েকটি মহাদেশীয় পাত হল- উত্তর আমেরিকান পাত, ও ইন্দো- অস্ট্রেলীয় পাত, ও ইউরেশীয় পাত, 4 আফ্রিকান পাত, 5 অ্যান্টার্কটিক পাত একটি মহাসাগরীয় পাতের উদাহরণ হল—প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত।

যে সীমানা বরাবর দুটি ভূত্বকীয় পাত পরস্পর থেকে বিপরীত দিকে সরে যায়, তাকে অপসারী পাত সীমানা বা প্রতিসারী পাত সীমান্ত বলে। এই ধরনের পাত সীমানায় দুটি মহাসাগরীয় পাত পরস্পর থেকে ক্রমণ দূরে সরে গেলে মাঝের ফাটল বরাবর ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে আসে এবং শীতল ও কঠিন হয়ে নতুন ভূমিরূপ তৈরি করে।

যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পর মুখোমুখি এগিয়ে আসে, তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে। এই ধরনের পাত সীমানায় দু-ধরনের ঘটনা ঘটে— ( অভিসারী নিমজ্জন: এক্ষেত্রে দুটি মহাসাগরীয় পাত্র  পরস্পরের দিকে এগিয়ে এলে তাদের মধ্যে

2 অভিসারী সংঘর্ষ: এক্ষেত্রে দুটি ভূত্বকীয় পাত পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসে এবং সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে দুটি পাতের মধ্যবর্তী পলিরাশিতে ভাঁজ পড়ে ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণি সৃষ্টি হতে পারে।

অপেক্ষাকৃত ভারী পাতটি হালকা পাতের নীচে প্রবেশ করে এবং এই নিমজ্জনের ফলে সেখানে দ্বীপ, দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়।

GPS (Global Positioning System) এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাতগুলি বছরে 2.5 সেমি থেকে 15 সেমি গতিবেগে সচল থাকে। যেমন— দক্ষিণ আমেরিকান পাতটি বছরে 2-3 সেমি বেগে পশ্চিমদিকে সরে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ইন্দো-অস্ট্রেলীয় প্লেটটি বছরে 4-6 সেমি বেগে উত্তর ও উত্তর- পূর্বে গতিশীল। এত ধীরগতি ও সুদীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চালিত হওয়ার কারণে পাতের চলন আমরা বুঝতে পারি না।

বিজ্ঞানী পিঁচোর মতে, ভূত্বক মোট 6টি প্রধান পাত নিয়ে তৈরি। এগুলি হল— আমেরিকান পাত, অ্যান্টার্কটিক পাত, ও ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাত, 4 ইউরেশীয় পাত, 5 প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত, 6 আফ্রিকান পাত। পরবর্তীকালে ভূবিজ্ঞানীরা আমেরিকান পাতকে উত্তর আমেরিকান পাত ও দক্ষিণ আমেরিকান পাতে ভাগ করেছেন। এ ছাড়া 20টি মাঝারি ও ছোটো পাতের মধ্যে আরবীয় পাত, কোকো পাত সোমালি পাত, ইরান পাত, মাদাগাস্কার পাত, বার্মা পাত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

যে সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পরের অভিমুখে অগ্রসর হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে। যেহেতু, এই পাত সীমানায় ভারী পাতটি নিম্নগামী হয়ে হালকা পাতটির নীচে প্রবেশ করে এবং প্রচণ্ড উন্নতায় গলে যায়, তাই একে বিনাশকারী পাত সীমানা বলে ।

পৃথিবীর সৃষ্টির সাপেক্ষে ভঙ্গিল পর্বত উত্থানের ইতিহাস খুব পুরোনো নয় | যেখানে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে প্রায় 460 কোটি বছর আগে সেখানে প্রাচীন যুগের ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি মাত্র 20 কোটি বছর আগে এবং নবীন ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি মাত্র 1-2.5 কোটি বছর আগে। এ ছাড়া, নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উত্থান ক্রিয়া এখনও চলছে | ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুসারে বয়স কম হওয়ায় এই ধরনেরপর্বতকে নবীন ভঙ্গিল পর্বত বলে।

যেখানে দুটি মহাদেশীয় পাত পরস্পরের মুখোমুখি অগ্রসর হয়, সেখানে দুটি পাতের মধ্যবর্তী অংশে অগভীর সংকীর্ণ সমুদ্র বা জিওসিনক্লাইন,অবস্থান করে। মহাদেশীয় পাত দুটি যতই কাছাকাছি এগিয়ে আসে ততই জিওসিনক্লাইন আরও সংকীর্ণ হয়। পাত দুটি মুখোমুখি আরও অগ্রসর হলে জিওসিনক্লাইনে সঞ্চিত পলিরাশি ভাঁজ প্রাপ্ত হয়ে ভঙ্গিল পর্বত গঠন করে। পৃথিবীর অধিকাংশ ভঙ্গিল পর্বত এভাবেই মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বদিকে অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকান পাতটি ক্রমশ পশ্চিমদিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতটি পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছে | তাই প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতটির আয়তন ক্রমশ কমছে | আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের উত্তর-পশ্চিমদিকে অবস্থিত ইউরেশীয় পাত ক্রমশ দক্ষিণ-পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের ওপরে উঠে আসছে | ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের পাতের আয়তন ধীরে ধীরে কমছে।

পাত সঞ্চালনের প্রধান কারণ হল—ভূঅভ্যন্তরের পরিচলন স্রোত। এ ছাড়াও পাত সীমানা বরাবর ম্যাগমার উত্থান, অভিকর্ষজ টান, পাতের নিমজ্জনজনিত টান, ভূঅভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙনের জন্য সৃষ্ট তাপশক্তি প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে পাতগুলি সঞ্চালিত হতে পারে।

→ পাত সঞ্চালনের ফলে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ গঠিত হতে পারে। যেমন— অপসারী পাত সীমানা বরাবর মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা গঠিত হয় এবং সাগর ও মহাসাগর সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে সমুদ্রবক্ষের বিস্তার ঘটে। অভিসারী পাত সীমানা বরাবর আগ্নেয়গিরি, আগ্নেয়দ্বীপ সৃষ্টি হয় এবং প্রবল ভূমিকম্প ঘটে। এই পাত সীমানা বরাবর ভঙ্গিল পর্বতও সৃষ্টি হয়। যেমন—আল্পস্, হিমালয় এবং অ্যাপালেচিয়ান পর্বত প্রভৃতি। ও দুটি পাতের পাশাপাশি চলনের জন্য সেখানে চ্যুতি ও গ্রস্ত উপত্যকা গঠিত হয়।

অপসারী পাত সীমানায় দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য দুটি পাতের সংযোগস্থলে ফাটল বৃদ্ধি পায় এবং এই ফাটল থেকে ভূঅভ্যন্তরের ম্যাগমা বেরিয়ে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি করে। অপসারী পাত সীমানায় সমুদ্রবক্ষের বিস্তার ঘটে। এজন্য সমুদ্রগর্ভের ফাটল দিয়ে যে ম্যাগমা বেরিয়ে আসে তা জমে মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরার আকার ধারণ করে (যেমন—মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা)। অপসারী পাত সীমানায় দুটি পাত বিপরীতে সরে গেলে গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয় (যেমন— আফ্রিকার বৃহৎ রিফট ভ্যালি) | অপসারী পাত সীমানায় সাধারণত নতুন ভূত্বক গঠিত হয় বলে একে গঠনকারী পাত সীমানা বলে।

পাত হল সিয়াল ও সিমাসহ ভূত্বকীয় খন্ডসমূহ, যা ছোটো বা বড়ো মাপের, পাতলা, অনমনীয় ও কঠিন প্রকৃতির | পৃথিবীতে এরকম চটি বড়ো পাত ছাড়াও 20টি মাঝারি ও ছোটো পাত রয়েছে। এই পাতগুলি অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের পরিচলন স্রোত, অভিকর্ষজ টান, উন্নতার তারতম্য, ভূগর্ভে তপ্তবিন্দুর অবস্থান প্রভৃতি কারণে সচল থাকে। বর্তমান GPS পদ্ধতির মাধ্যমেও পাতগুলির গতিশীলতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কখনও দুটি পাত পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয়ে অভিসারী পাত সীমানার সৃষ্টি করে, কখনও পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়ে প্রতিসারী পাত সীমানার সৃষ্টি করে। আবার কখনো কখনো পাতগুলি পাশাপাশি চলতে শুরু করে এবং নিরপেক্ষ পাত সীমানার সৃষ্টি করে। পাতগুলির এইরূপ বিভিন্ন দিকে চলনকেই পাত সঞ্চালন বলে।

পিঁচো, উইলসন, ম্যাকেঞ্জি, পার্কার, মর্গান প্রমুখ ভূবিজ্ঞানীদের মৌলিক গবেষণার সম্মিলিত ফল পাত সংস্থান তত্ত্ব । এই তত্ত্বের মূল কথা হল–ভূত্বক কতকগুলি দৃঢ় ও কঠিন খন্ড বা পাতে বিভক্ত। ভূত্বকের নীচের অ্যাসথেনোস্ফিয়ার স্তরে সৃষ্ট পরিচলন স্রোতের প্রভাবে এইসব পাত বিভিন্ন দিকে চলমান অবস্থায় আছে। এর ফলে পাতগুলি তাদের সীমানা বরাবর কখনো একে অপরের দিকে, কখনো বিপরীত দিকে আবার কখনো বা পাশাপাশি ঘর্ষণ করে অগ্রসর হয়। আর এই কারণেই পাত সীমানা বরাবর ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, ভঙ্গিল পর্বত, সমুদ্রখাত, দ্বীপমালা প্রভৃতির সৃষ্টি হয়।

1912 সালে আলফ্রেড ওয়েগনার তার গবেষণা গ্রন্থে মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ ভাবনা অবতারণা করেন। তাঁর মতে, কার্বোনিফেরাস যুগে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগ একটিমাত্র ভূখন্ড হিসেবে অবস্থান করত, যার নাম প্যানজিয়া এবং প্যানজিয়াকে ঘিরে একটিমাত্র সমুদ্র অবস্থান করত, যার নাম প্যানথালাসা। এই সময় প্যানজিয়ার দক্ষিণ অংশ গন্ডোয়ানাল্যান্ড দক্ষিণ মেরুর কাছেঅবস্থান করত। পরবর্তী সময়ে সুবিশাল প্যানজিয়া অনেকগুলি খণ্ডে ভেঙে যায় | এর ফলে সৃষ্ট মহাদেশগুলি ক্রমশ নিরক্ষরেখার দিকে এবং পশ্চিমদিকে সরে যেতে শুরু করে। নিরক্ষীয় অঞ্চলে স্থানান্তরের মূল কারণ বৈষম্যমূলক অভিকর্ষজ বল এবং প্লবতা। আর পশ্চিমে অগ্রসর হওয়ার কারণ জোয়ার শক্তি। ওয়েগনারের মতে হিমালয়, আল্পস্, রকি পর্বতগুলি মহাদেশগুলির পশ্চিমদিকে সরণের ফলে তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দিকে মহাদেশগুলির সরণকে ওয়েগনার তাঁর তত্ত্বে মহীসঞ্চরণ নামে অভিহিত করেন।

ভূঅভ্যন্তরের গলিত সান্দ্র ম্যাগমা, গ্যাস ও জলীয়বাষ্প ভূপৃষ্ঠের কোনো দুর্বল অংশ, ফাটল বা গহ্বরের মধ্য দিয়ে ওপরে উঠে আসে এবং ভূপৃষ্ঠের ওপর শীতল হয়ে জমাট বাঁধে। এই ঘটনাকে অগ্ন্যুগম বলে। অগ্ন্যুৎপাতের উৎসগুলি আগ্নেয়গিরি নামে পরিচিত।

এই ধরনের লাভা গাঢ়, সান্দ্র এবং ধীরগতিসম্পন্ন |শীতল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই লাভা মোটা আস্তরণ হিসাবে জমাট বাঁধে এবং খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয় । এই ধরনের লাভা খুবই আঠালো ধরনের হয়। এই লাভা খুব দ্রুত বেশিদূর প্রবাহিত হয় না | ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরিগুলি থেকে এরকম লাভা নির্গত হয়।

অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে আসার সময় ম্যাগমার বহির্মুখী চাপের ফলে শিলা ফেটে যায়, শিলার স্থানচ্যুতি ঘটে ও শিলায় ভাঁজ পড়ে নানারকম ভূমিরূপ গঠিত হয়। এ ছাড়া ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে লাভারূপে নির্গত হয়ে শীতল হয়ে জমার পর নতুন নতুন ভূমিরূপ তৈরি করে। সেজন্য অগ্ন্যুৎপাতকে ভূগাঠনিক প্রক্রিয়া বলে।

যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে ভবিষ্যতে আর কখনোই অগ্ন্যুৎপাত হবে না। বলে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন সেইসব আগ্নেয়গিরিকে মৃত আগ্নেয়গিরি বলে | এইসব আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে হ্রদ বা জলাশয় সৃষ্টি হয়। যেমন – মায়ানমারের মাউন্ট পোপা, হাওয়াই দ্বীপের মৌনা কিয়া প্রভৃতি এই ধরনের আগ্নেয়গিরি।

যেসব আগ্নেয়গিরি থেকে বহু বছর অগ্ন্যুৎপাত ঘটেনি কিন্তু ভবিষ্যতে ঘটতে পারে অথবা কিছু সময় অন্তর অন্তর লাভা উদ্‌গিরণ হয়, তাদের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বলে। এইধরনের আগ্নেয় উদ্‌গিরণের ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধি পায়। যেমন— ভারতের ব্যারেন আগ্নেয়গিরি থেকে 1803, 1832, 1991, 1995, 2005-06 32008-09 সালে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। জাপানের মাউন্ট ফুজি এই ধরনের আগ্নেয়গিরির অপর উদাহরণ।

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের আগ্নেয়গিরিগুলি থেকে যে অত্যন্ত তরল লাভা নির্গত হয়, তাকে পা হো হো লাভা বলে। এই লাভা খুব পাতলা বলে নিঃসরণের পর তা ভূপৃষ্ঠে বহুদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং এই লাভা প্রবাহের উপরিভাগ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে কুঁচকে গিয়ে পাকানো দড়ির মতো ভূমিরূপ গঠন করে।

ভূগর্ভের শিলাসমূহ প্রচণ্ড চাপে ও তাপে গলে যায় এবং গ্যাস ও বাষ্প মিশ্রিত হয়ে সান্দ্র অবস্থায় থাকে। একে ম্যাগমা বলে। ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা ভূত্বকের কোনো দুর্বল অংশ বা ফাটলের মধ্যে দিয়ে ওপরে উঠে এসে উত্তপ্ত তরল পদার্থরূপে ভূপৃষ্ঠে প্রবাহিত হয়। একে লাভা বলে।

যেসব আগ্নেয়গিরি উৎপত্তিনে হওয়ার পর থেকে অবিরামভাবে বা প্রায়ই অগ্ন্যুৎপাত হয়ে চলেছে, তাদের সক্রিয় বা জীবিত আগ্নেয়গিরি বলে। এই ধরর আগ্নেয়গিরি দুইপ্রকার—

অবিরাম আগ্নেয়গিরি: এই ধরনের আগ্নেয়গিরি থেকে প্রায় সবসময় লাভা বের হয়। যেমন— ইটালির লিপারি দ্বীপের স্ট্রম্বোলি আগ্নেয়গিরি। 2 সবিরাম আগ্নেয়গিরি: এই ধরনের আগ্নেয়গিরি থেকে কিছু দিন অন্তর অন্তর লাভা বা আগ্নেয় পদার্থ নির্গত হয়। যেমন— সিসিলি দ্বীপের এটনা,

জাপানের মাউন্ট আসামা, ভারতের ব্যারেন, নারকোন্ডাম ইত্যাদি।

অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে পৃথিবীপৃষ্ঠে দুই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—

  1. ধ্বংসাত্মক প্রভাব:

ভূমিকম্প: অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহে অবশ্যই ভূমিকম্প ঘটবে এবং এর ফলে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও অন্যান্য পরিকাঠামো ধ্বংস হতে পারে।

® সুনামি: সমুদ্রের তলদেশে প্রবল অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে সুনামি হতে পারে। প্রচন্ড তাপে সমুদ্রের জল গরম হয়ে প্রচুর সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি করে।

3 দূষণ: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বাতাসে মিশে বায়ুদূষণ ঘটায়।

4 দাবানল: আগ্নেয় লাভা বনভূমির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে দাবানল সৃষ্টি হতে পারে।

  1. গঠনমূলক প্রভাব:

1 মাটি সৃষ্টি : লাভাসঞ্চিত শিলা থেকে কালোমাটি তৈরি হয়। এই মাটি কৃষিকাজের উপযুক্ত।

2 খনিজ পদার্থ: অগ্ন্যুৎপাত্তের কারণেই বহু মূল্যবান ধাতু ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি চলে আসে।

3 ভূমিরূপ গঠন: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে লাভা নির্গত হয়ে এবং ভূপৃষ্ঠে তা সঞ্চিত হয়ে মালভূমি, সমভূমি এমনকি পর্বতও গঠন করে।

4 দ্বীপ সৃষ্টি : আগ্নেয় লাভা সমুদ্রবক্ষে জমা হয়ে দ্বীপ তৈরি করতে পারে। যেমন—ব্যারেন দ্বীপ।

ভিন্ন ধরনের দুটি পাতের মুখোমুখি অগ্রসর হওয়া, দুটি পাতের পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়া, বা দুটি পাতের পাশাপাশি চলন ঘটলে অগ্ন্যুৎপাত ঘটতে পারে। এ ছাড়াও আরও কয়েকটি কারণে অগ্ন্যুদৃগম হতে পারে। যেমন—

1 কখনো কখনো দুটি মহাসাগরীয় পাতের মধ্যে সংঘর্ষ হলে ভারী পাতটির নিমজ্জন এবং অগ্ন্যুপমের ফলে দ্বীপমালার সৃষ্টি হতে | অ্যালুশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।

2 কোনো ভূগাঠনিক কারণে মহাদেশীয় পাতে পীড়ন সৃষ্টি হলে এবং ওই পাতে ফাটল তৈরি হলে সেই ফাটলের মধ্য দিয়ে শান্তভাবে লাভা বেরিয়ে আসতে পারে। একে বিদার অগ্ন্যুগম বলে। এভাবেই ভারতের দাক্ষিণাত্যের লাভা মালভূমির সৃষ্টি হয়েছে।

3 তেজস্ক্রিয়তা-জনিত উত্তাপ বৃদ্ধির কারণে পাতের মধ্যস্থলে অনেকসময় উন্নতা বেড়ে যায় এবং তপ্তবিন্দুর সৃষ্টি হয়। এখান থেকে ম্যাগমা ঊর্ধ্বমুখী পরিচলন স্রোতের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। পৃথিবীতে এ ধরনের 21টি তপ্তবিন্দু রয়েছে | হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জটি এই তপ্তবিন্দু থেকে নির্গত অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এ ছাড়া ভূগর্ভে জল প্রবেশজনিত কারণে ও তরল শিলার উপস্থিতির কারণেও অগ্ন্যুৎপাত ঘটতে পারে।

ভূপৃষ্ঠের কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা কোনোরকম বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে তরল লাভারূপে ভূপৃষ্ঠে নির্গত হয়। এই সঞ্চয়ের ফলে ওই ভূমিরূপ যখন মালভূমির আকার ধারণ করে তখন তাকে লাভা মালভূমি বলে। ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমি এই ধরনের মালভূমি। বারবার লাভা উদ্‌গিরণের ফলে এই মালভূমিটি পশ্চিম থেকে পূর্বে ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো নেমে এসেছে বলে একে ‘ডেকান ট্র্যাপ' ও বলে।

ভূঅভ্যন্তরের কোথাও কোথাও বিশেষত প্লেট বা পাতের মধ্যস্থলে, আশেপাশের স্থানসমূহের তুলনায় উত্তাপ খুব বেশি হয়। ওই স্থানগুলিকে তপ্তবিন্দু বা hotspot বলে। এর ফলে সেখানে তাপের ঊর্ধ্বমুখী পরিচলন স্রোতের প্রভাবে ম্যাগমা ফোয়ারার মত ওপরে উঠে এসে পাতের তলদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা কালক্রমে সেখানকার ভূত্বক ভেদ করে অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়ে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়। সৃষ্টির কারণ: ভূত্বকের গভীরে তেজস্ক্রিয়তা-জনিত উত্তাপ বৃদ্ধির জন্য তপ্তবিন্দু গঠিত হয়। বৈশিষ্ট্য: তপ্তবিন্দুর ওপর আগ্নেয়গিরি অবস্থান করতে পারে। এই স্থানগুলির অগ্ন্যুৎপাতের আপাত স্থানান্তরের হার সমুদ্রতলের বিস্তারের হারের সমান।ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ববিদের মতে, ভূগর্ভে প্রায় 25 টি তপ্তবিন্দু আছে।

উদাহরণ: মধ্য সাহারার টিবেস্টি, আগার, জেবেল মারা প্রভৃতি মহাদেশীয় পাত সীমানার মধ্যস্থলে অবস্থিত তপ্তবিন্দু

যেসব প্রস্রবণে জলের উন্নতা স্বাভাবিকের থেকে বেশি, সেইসব প্রস্রবণকে উন্ন প্রস্রবণ বলে। সৃষ্টির পদ্ধতি: ভৌমজল অনেকসময় ভূগর্ভের বেশি গভীরে উরু অঞ্চলে পৌঁছালে সেখানকার তাপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ও ভূপৃষ্ঠের ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গের বক্রেশ্বরে, বিহারের রাজগিরে, হিমাচল প্রদেশের মণিকরণে এরকম উম্ন প্রস্রবণ রয়েছে।

যে উম্ন প্রস্রবণে জল এবং বাষ্প কিছু সময়ের ব্যবধানে ওপরের দিকে প্রবল বেগে উত্থিত হয় তাকে গাইজার বলে । সৃষ্টির পদ্ধতি: ভৌমজল ম্যাগমার সংস্পর্শে এলে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ফুটতে থাকে এবং জলীয় বাষ্প তৈরি করে। ওই বাষ্প ওপরে ওঠার জন্য চাপ দেয় এবং জলস্তর ওপরে উৎক্ষিপ্ত হয়। জল এবং জলীয় বাষ্পের ওপরে উৎক্ষেপণের ফলে গিজারের ছিদ্রপথে বাষ্পের চাপ কমে যায়। সেখানে পুনরায় ঠান্ডা জল প্রবেশ করে উত্তপ্ত হয় | উম্ন জল এবং জলীয় বাষ্প পুনরায় ওপরে উৎক্ষিপ্ত হয় | এই পদ্ধতি চক্রাকারে চলতেই থাকে।

উদাহরণ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইয়ালোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের ওল্ড ফেথফুল গিজার থেকে প্রায় 45 মিনিট অন্তর অন্তর উম্ন জল ওপরে ওঠে।

বিভিন্ন কারণে অগ্ন্যুগম হতে পারে | এগুলি হল—

O ভূপৃষ্ঠে দুর্বল ফাটলের অবস্থান: ভূত্বক গঠনকালে কোথাও কোথাও দুর্বল ফাটল বা ছিদ্রপথও থাকে| এইসব দুর্বল স্থানগুলি অগ্ন্যুপমের উৎসরূপে কাজ করে।

® তরল শিলার উপস্থিতি: ভূঅভ্যন্তরে গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিলাস্তরে চাপ ও উন্নতা বাড়তে থাকে। 100 কিলোমিটার গভীরে তাপমাত্রা হয় প্রায় 1000 °C এবং 1000 কিলোমিটার গভীরতায় তাপমাত্রা প্রায় 2000°C | এইসব স্তরে চাপজনিত কারণে শিলা গলে না গিয়ে স্থিতিস্থাপক অবস্থায় থাকে। কিন্তু কোনো কারণে ওপরের শিলাস্তরের চাপ কমে গেলে শিলার স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয় | ফলে শিল তরল অবস্থাপ্রাপ্ত হয়। এই তরল শিলা আয়তনে বেড়ে যাওয়ার ফলে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে এবং লাভারূপে প্রবাহিত হয়। ও ভূগর্ভে জল প্রবেশজনিত কারণ: ভূত্বকের ফাটল দিয়ে নদ-নদী, সমুদ্রের জল প্রবেশ করলে তা উত্তপ্ত শিলার সংস্পর্শে এসে বাষ্পীভূত হয়। এই উত্তপ্ত জলীয়বাষ্প এবং অন্যান্য গ্যাসের মিলিত চাপ ম্যাগমাকে ওপরে উঠতে সাহায্য করে।

= পাত সংস্থান: ভূপৃষ্ঠে 7টি বড়ো এবং 20টি মাঝারি ও ছোটো চলমান পাত রয়েছে। যে-কোনো দুটি পাতের সংযোগস্থলে মূলত অগ্ন্যুগম হয়ে থাকে।