ফাররুখশিয়র ফরমান কী? ফাররুখশিয়র ফরমানে ইংরেজরা কী কী সুবিধা লাভ করেছিল? 5
ফাররুখশিয়র ফরমান:
১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়ার ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুকূলে যে ফরমান জারি করেছিলেন তা শির ফরমান' নামে পরিচিত। সুরম্যানের নেতৃত্বে গঠিত ইংরেজজল সম্রাট ফাররুখশিয়রের কাছ থেকে এই ফরমান লাভ করেন।
• সুযোগসুবিধা লাভ: ফারদশিয়র ফরমানে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিছু বিশেষ সুযোগসুবিধা লাভ করেছিল।
1. মুঘল কোশাযারে বছরে তিন হাজার টাকা শুভ হিসাবে প্রদানের বিনিময়ে বাংলায় বিনাশুকে বাণিজ্য করার অধিকার দেওয়া হয়।
2. কলকাতার আশে পাশে অনেকগুলি গ্রাম কিনে কোম্পানির জমিদারির অধীনে আনার অনুমতি দেওয়া হয়।
3. মুরশিদাবাদে সম্রাটের টাকশালে হিসেব মতো বুপো জমা দেওয়ার বিনিময়ে কোম্পানিকে কোম্পানির মুদ্রা ছাপিয়ে নেবার অধিকার দেওয়া হয়।
4. বাংলায় কোম্পানির বাণিজ্য ও মান চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং অতিরি বা শুল্ক ধার্য না করার জন্য বাংলার নবাবকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
5. বাংলার বাইরে অন্যান্য বাণিজ্য কেন্দ্রে যথা- হায়দরাবাদ, মাদ্রা প্রভৃতি স্থানে কোম্পানি যে হারে শুখ প্রদান করে আসছে তাই বহাল রাখা হয়।
6. কোম্পানিকে সুরাট বন্দরেও বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অনুমতি দেওয়া হয়, বিনিময়ে কোম্পানি বাদশাহকে বছরে দশ হাজার টাকা দিতে অশীকার করে।
7 . বোম্বাই-এর টাকশালে ছাপানো কোম্পানির মুদ্রা মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বত্র বৈধ মুদ্রা বলে স্বীকৃত হয়। বাসানের - ফারবখশিয়রের ফরমান প্রদান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ
উপসংহার: ফাররুখশিয়রের ফরমান প্রদান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সি. আর. উইলসন বলেছেন, ' "ফাররুখশিয়র ফরমান ইংরেজদের কূটনৈতিক জয়ের প্রতীক। ঐতিহাসিক গুরম্ (Orme) ফাররুখশিয়র ফরমানকে ব্রিটিশ-বাণিজ্যের 'ম্যাগনা কার্টা' বা মহাসনদ বলে অভিহিত করেছেন।
পলাশির যুদ্ধের কারণগুলি উল্লেখ করো। অথবা, সিরাজের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধের কারণগুলি আলোচনা করো। 5
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজ-উদদৌলা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল তা ইতিহাসে পলাশির যুদ্ধ নামে পরিচিত। বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের মৃত্যুর পর তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজ-উদদৌলা বাংলার নবাব হন (১৭৫৬ খ্রি.)। নবাব সিরাজ-উদদৌলার সঙ্গে বিভিন্ন কারণে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল " এবং এই বিবাদের পরিণতি হিসাবেই পলাশির যুদ্ধ হয়েছিল।
1. ইংরেজ কোম্পানির ষড়যন্ত্র : সিরাজ উদদৌলা যখন বাংলার নবাব হন তখন তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন। সুযোগ বুঝে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিরাজ বিরোধী ঘসেটি বেগম ও সৌকত জা-এর সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সিরাজ-উদদৌলা এই ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে ইংরেজ কোম্পানিকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন।
2. যখন বাংলার নবাব হন তখন চিরিত প্রথা অনুসারে ফরাসি পূর্ণ নির্মাণ-কোর বিভোর বাংলায় ইংরেজ এবং ফরাসি কোম্পানি দুর্গ নির্মাণ করে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি চেয়েছিল। মরে সিরাজ-উদদৌলা এই বিদেশি কোম্পানিগুলিকে দুর্গ নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দিলে, নবাবের নির্দেশ ফরাসিরা মেনে নেয়, কিন্তু ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তা অগ্রাহ্য করেছিল। এর ফলে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
3. নিয়ে ঘসেটি বেগমের প্রিয় পাত্র ঢাকার দেওয়ান রামবন্নতের বিরুদ্ধে নবাবি তছরুপের অভিযোগ ছিল। নবাব সিরাজ উদদৌ মুরশিদাবাদ এসে তাকে হিসাবপত্র দেখানোর নির্দেশ দেন। তখন দেওয়ান রাজার পুত্র কৃত্তনামকে প্রচুর ধনরত্নসহ কলকাতায় ইংরেজদের কুঠিতে পাঠিয়ে দেন। নবাব বারংবার কল্পনাসকে প্রত্যর্পণ করার নির্দেশ দিলেও, ইংরেজরা নবাবের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে।
4. নবাবের দূতকে অপমান : নবাবের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির দুর্গ নির্মাণ, কুমনাম প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসার জন্য নবাব দূত নারায়ণ দাসকে কলকাতায় পাঠান। ইংরেজরা দূত নারায়ণ দাসকে অপমান করলে নবাব ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্ধ হন।
5 .দত্তকের অপব্যবহার সর্বোপরি ইংরেজদের সঙ্গে। নবাবের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে দত্তকের অপব্যবহার কে কেন্দ্র করে। মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়রের ফরমান অনুযায়ী শুধুমাত্র কোম্পানি 'দত্তক' অর্থাৎ বিনাপুদ্ধে বাণিজ্যের ছাড়পত্র পেয়েছিল, কোম্পানির বণি কর্মচারীরা নয়। কিন্তু, কোম্পানির কর্মচারীরা এই সুযোগের অপব্যবহার করতে শুরু করলে সিরাজ ইংরেজদের ওপর ক্ষুদ্ধ হন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নবাব ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুন ইংরেজ কুঠি কাশিমবাজার দখল করেন। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি কলকাতা পুনর্দর্শন করেন এবং নবাবের সঙ্গে আলিনগরের সন্ধি (৯ ফেব্রুয়ারি) স্বাক্ষর করেন। ইংরেজরা নবাব সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে মিরজাফরের সঙ্গে যড়যন্ত্র করে এবং ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন পলাশির যুদ্ধে সিরাজ-উদদৌলাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে।
বক্সারের যুদ্ধের কারণগুলি আলোচনা করে।।। অথবা, ইংরেজদের সঙ্গে মিরকাশিনের মুখের কারণগুলি দেখো। 5
বক্সারের যুদ্ধ হয়েছিল ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে। এই মুগ্ধ হয়েছিল বাংলার নবাব নিরকাশিন, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদদৌলা ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মিলিত বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পূর্ববর্তী নবাব মিরজাফরকে সরিয়ে মিরকাশিমকে বাংলার সিংহাসনে বসায়। কিন্তু সিংহাসনে আরোহণের পর মিরকাশিম স্বাধীনভাবে রাজত্ব চালনা করতে চাইলে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে।
[1] মুখোরে রাজধানী স্থানান্তর সিংহাসনে আরোহণের পর মিরকাশিম স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার জন্য রাজধানী স্থানান্তরিত করেন মুঙ্গেরে। বাংলার রাজধানী মুরশিদাবাদ ছিল ইংরেজ প্রভাবিত। তাই তিনি রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেছিলেন।
[2] বৈধ ফরমান লাভ : মিরকাশিম ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে অবৈধভাবে বাংলার সিংহাসন লাভ করেন। তিনি নিজেকে বৈধ নবাব হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকার করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের ফরমান নিয়েছিলেন। এই ব্যবস্থা ইংরেজরা মেনে নিতে পারেনি।
[3] ইউরোপীয় রণকৌশল গ্রহণ : নবাব মিরকাশিম চিরাচরিত রণকৌশলের পরিবর্তে উন্নত ইউরোপীয় ধাঁচে সেনাবাহিনীকে
মজবুত করতে চেয়েছিলেন। এর জন্য তিনি আর্মেনীয় গ্রেগরিকে প্রধান সেনাপতি, ফরাসি সমরু এবং আর্মেনীয় মার্কারকে সহসেনাপতি পদে নিযুক্ত করেছিলেন।
[4] আগ্নেয়ার নির্মাণের কারখানা প্রতিষ্ঠা : মিরকাশিম উপলব্ধি করেছিলেন তাঁর সেনাবাহিনীর অন্যতম দুর্বলতার কারণ উন্নত আগ্নেয়াস্ত্রের অভাব। এই অসুবিধা দূর করার জন্য তিনি মুঙ্গেরে কামান, বন্দুক, গোলাবারুদের কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। বলা বাহুল্য মিরকাশিমের এইসব কার্যকলাপ ইংরেজদের সহ্য হয়নি।
দেশীয় বণিকদের শুল্ক প্রত্যাহার : ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়রের কাছ থেকে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যাবসাতে এই ফরমানের অপব্যবহার করতে থাকে। এতে নবাব ও দেশীয় বণিকগণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এমতাবস্থায় নবাব দেশীয় বণিকদের শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এই সমস্ত ঘটনার মিলিত পরিণামেই ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধ হয়।
ভারতে ইংরেজ বণিকের মানদণ্ড স্তানে রাজদণ্ডে পরিণত হয় ব্যাখ্যা করো। অথবা, ১৭১৭ থেকে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার ইংরেজ শক্তির উত্থানের বিবরণ দাও । 5
[ইংরেজ বণিকরা ভারতে এসেছিলেন ব্যাবসা করার জন্য, কিন্তু কালক্রমে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে ভারতের শাসকে পরিণত হন। তারা প্রথমে পলাশির যুদ্ধ ও পরে বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ করে বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে বণিক ইংরেজরা শাসক ইংরেজে পরিণত হয়।
» বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে রূপান্তরের ক্রমপর্যায় :
1 . ভারতে বণিক ইংরেজদের আগমনের সূচনা রানি এলিজাবেথের রাজত্বকালে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর লন্ডনে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি' প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশপত্র নিয়ে ক্যাপ্টেন হকিন্স মুঘল সম্রাট জাহাজিরের দরবারে আসেন। হকিন্স জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে ইংরেজ কোম্পানির জন্য সুরাটে একটি বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অধিকার লাভ করেন। ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ দ্রুত স্যার টমাস রো ভারতে এসে সুরাট, আগ্রা-সহ অনেকগুলি স্থানে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন।
2 . ফররুখশিয়র ফরমান লাভ। এরপর ইংরেজরা মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়রের কাছে সুরম্যান-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার ব্যাবসাবাণিজ্যে বিশেষ সুযোগসুবিধা লাভ করা। মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়র ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির অনুকূলে একটি ফরমান জারি করে বাংলায় ইংরেজদের বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অধিকারসহ দস্তক প্রদান করেন।
3 . পলাশির যুদ্ধ জয় ক্রমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নবাব সিরাজ উদদৌলাকে পলাশির যুদ্ধে (১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন) পরাজিত করে। পরে ইংরেজরা বাংলার নবাব পদে মিরজাফরকে বসালেও তারাই বাংলার প্রকৃত শাসনকর্তা হয়ে ওঠে। বণিক ইংরেজরা বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।
4 . বক্সারের যুদ্ধ জয় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর) একযোগে বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদদৌলা, দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মিলিত জোটকে পরাজিত করে। বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজদের ক্ষমতা বাংলা চাড়িয়ে দিখি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
5 .বিরুত বক্সারের যুদ্ধ জয় : ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর) একযোগে বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদদৌলা, দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মিলিত জোটকে পরাজিত করে। বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজদের ক্ষমতা বাংলা ছাড়িয়ে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
6 . দেওয়ানি লাভ : বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ইংরেজদের সঙ্গে এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি স্বাক্ষর করেন। ফলে কোম্পানি বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বাংলার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে (১৭৬৫ খ্রি.)। বাংলার রাজস্বের ওপর ইংরেজ কোম্পানির আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত হয়।
পলাশির যুদ্ধের গুরুত্ব কী ছিল ? 5
ভারতের ইতিহাসে পলাশির যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রি.) গুরুত্ব অপরিসীম। এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা তথা ভারতে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়েছিল। তাই অধ্যাপক পি. জে. মার্শাল বলেছেন, “পলাশির যুদ্ধ নিছক যুদ্ধই ছিল না, পলাশির ঘটনা হল একটি বিপ্লব।”
» পলাশির যুদের গুরুত্ব
1 . পলাশির যুদ্ধের ফলে বাংলার নবাব ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে নতুন নবাব মিরজাকারের কোনো ক্ষমতাই ছিল না, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। কোম্পানি নবাবের “সিংহাসনের পশ্চাতে প্রকৃতশক্তি”-তে পরিণত হয়েছিল।
2 . পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজ কোম্পানি ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার সুযোগ পাওয়ার ফলে বাংলা থেকে অন্যান্য বণিক গোষ্ঠী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।
3. পলাশির যুদ্ধে জয়ের ফলে কোম্পানির মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই যুদ্ধে কোম্পানির সামরিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা প্রমাণিত হয়েছিল।
4. ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করে। বাংলার সম্পদ হস্তগত করেছিল। এই সম্পদ লাভের ফলে তারা দক্ষিণ ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং বাণিজ্যের উন্নতি ঘটিয়েছিল।
5. পলাশির যুদ্ধের পর বাংলা তথা ভারতে পাশ্চাত্য ভাবধারার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, ফলে এক নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটেছিল। পলাশির যুদ্ধের গুরুত্ব প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার বলেছেন, “পলাশির যুদ্ধ মধ্যযুগের অবসান ও আধুনিক যুগের সূচনাঘটিয়েছিল"।
বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব উল্লেখ করো। 5
বক্সারের যুদ্ধ হয়েছিল ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সার নামক জায়গায়। এই যুদ্ধ হয়েছিল বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ্ দৌলা ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের মিলিত বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজদের। ভারতের ইতিহাসে বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্র বলেছেন, “বক্সারের যুদ্ধ সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ"।
» বারের যুদ্ধের গুরুত্বঃ
[1 চূড়ান্ত বিজয় : পলাশির যুদ্ধে ভারতে ইংরেজদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও, বক্সারের যুদ্ধে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পলাশির যুদ্ধে ইংরেজ কোম্পানি কূটনীতি ও বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে অনভিজ্ঞ নবাবকে পরাজিত করে। কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হন দিল্লির সম্রাট-সহ প্রাদেশিক দুই নবাব। ঐতিহাসিক স্মিথ বলেন, “পলাশির যুদ্ধ ছিল কয়েকটি কামানের লড়াই, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধ ছিল। চূড়ান্ত বিজয়”।
2. ভারতে ইংরেজদের আধিপত্যের সূচনা : বক্সারের যুদ্ধে কেবলমাত্র সুজা-উদৌলা দ্বিতীয় শাহ আলম বাংলার নবাব মিরকাশিমই নন, তাঁর সঙ্গে পরাজিত হন অযোধ্যার নবাব ও দিল্লির মুঘল বাদশাহ। এর ফলে, ভারতবর্ষের ওপর ইংরেজদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। নামসর্বস্ব' মুঘল সম্রাট ইংরেজ কোম্পানির বৃত্তিভোগীতে পরিণত হন।
3 . দেওয়ানি লাভ: বক্সারের যুদ্ধের পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি অধিকার লাভ করেন। এর ফলে কোম্পানির বৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
4 . বাংলায় কোম্পানির প্রতিষ্ঠালাভ : বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর ইংরেজ কোম্পানি মিরজাফরকে পুতুল নবাব হিসাবে সিংহাসনে। বসায়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নাবালক পুত্র নজম-উদদৌলাকে সিংহাসনে বসিয়ে ইংরেজরা সমস্ত সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অধিকার করে।
বাংলার দ্বৈত শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো। 5
বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থার প্রবর্তক ছিলেন লর্ড ক্লাইভ। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা প্রদেশের দেওয়ানি লাভ করার ফলে বাংলায় যে নতুন শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়, তাকে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা বলা হয়।
1 দ্বৈত বা বিকেন্দ্রিক শাসন : মুঘল আমলে প্রাদেশিক প্রশাসনের দুটি প্রধান বিভাগ হল ---
1 .নিজামত বা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং 2. দেওয়ানি বা রাজস্ব-সংক্রান্ত অধিকার। দ্বৈত শাসনব্যবস্থায় বাংলার নবাবের হাতে ছিল নিজামত বা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ও কোম্পানির হাতে ছিল দেওয়ানি বা রাজস্ব-সংক্রান্ত অধিকার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নবাবের প্রচুর দায়িত্ব থাকলেও তাঁর কোনো ক্ষমতা ছিল না, অপরপক্ষে কোম্পানির প্রচুর ক্ষমতা ছিল, অথচ কোনো দায়িত্ব ছিল না।
2 . প্রবর্তনের কারণ : বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বৈত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণ হল বাংলার প্রশাসনিক বিষয়ে ইংরেজদের অনভিজ্ঞতা। বাংলার অর্থ বা রাজস্ব শোষণ করাই ছিল ইংরেজদের মূল লক্ষ্য।
3 . সমালোচনা অনেকে ইংরেজ ও নবাবের এই শাসনব্যবস্থাকে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা বলতে রাজি নন। কারণ তখন বাংলার নবাবের হাতে কোনো ক্ষমতাই ছিল না, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী ছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাই একে অনেকে মুখোশ ঢাকা শাসনব্যবস্থা (Masked system) বলে অভিহিত করেন।
4 . ফলাফল:
1 আর্থিক শোষণ : বাংলায় কোম্পানির আর্থিক শোষণ চরম আকার ধারণ করেছিল। ১৭৬৪-৬৫ খ্রিস্টাব্দে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা এবং ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি আদায় করেছিল ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ।
2 . ছিয়াত্তরের মন্বন্তর : দ্বৈত শাসনব্যবস্থায় কোম্পানির শোষণের ফলে বাংলায় ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সৃষ্টি হয়েছিল। এতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোক অনাহারে প্রাণত্যাগ করেছিল। শেষ পর্যন্ত বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছিলেন।
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের মুখ আলোচনা করো।। 5
বক্সারের যুদ্ধের পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি স্বাক্ষর করে (১২ আগস্ট, ১৭৬৫ খ্রি.)। এই সন্ধির ধারা ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাটকে কারা ও এলাহাবাদ অগ্রল এবং বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা কর প্রদানের অঙ্গীকার করে। বিনিময়ে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত অধিকার প্রদান করেন।
» দেওয়ানি লাভের গুরুত্ব:
1 কোম্পানির বৈধতা প্রতিষ্ঠা:
দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলা তথা ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আইনগত বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত হয় ।
2.নবাবের ক্ষমতা হ্রাস: ইংরেজ কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলায় নবাবের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল। নবাব সম্পূর্ণভাবে ইংরেজ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে নামসর্বস্ব শাসকে পরিণত হয়েছিলেন।
3 . দ্বৈত শাসনের সূচনা কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় নবাবের হাতে ছিল নিজামত বা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। আর কোম্পানির হাতে ছিল দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত অধিকার। বাস্তবে নবাবের ছিল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব, অপরপক্ষে কোম্পানির হাতে ছিল দায়িত্বহীন ক্ষমতা।
4 .ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের প্রসার : কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার রাজস্বের লভ্যাংশ ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হত। ফলে ইংল্যান্ডের ধনভান্ডার পূর্ণ হয়েছিল – যা সেখানকার শিল্পবিপ্লবে সহায়ক হয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিক বলেন, বাংলার এই সম্পদ ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল।
করেছিল। পলাশির যুদ্ধ ও বক্সারের যুদ্ধের মধ্যে কোনটি ব্রিটিশ কোম্পানির ভারতে ক্ষমতা বিস্তারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তোমার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাও। 5
" বক্সারের যুদ্ধ ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষমতা বিস্তারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষমতা বিস্তারে রক্সারের যুদ্ধের গুরত্ব:
ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষমতা বিস্তারের ক্ষেত্রে বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহাসিক স্মিথ বলেছেন যে, “পলাশির যুদ্ধ। ছিল কয়েকটি কামানের লড়াই, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধ ছিল চূড়ান্ত বিজয়।"
1 ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষমতা বৃদ্ধি : বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ্ দৌলা এবং ভারতের মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ আলম। ফলে ভারতের রাজনীতিতে কোম্পানির ক্ষমতা ও মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়।
2 . কোম্পানির দেওয়ানি লাভ: বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল কোম্পানির দেওয়ানি লাভ। বক্সারের যুদ্ধের সুবিধা লাভ করার জন্য বাংলার গভর্নর লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ আলমের সঙ্গে এলাহাবাদের সন্ধি স্বাক্ষর করেন। এই সন্ধিতে বছরে ২৬ লক্ষ টাকা সম্রাটকে দেওয়ার বিনিময়ে কোম্পানি সুবা বাংলার দেওয়ানি অধিকার লাভ করে।
3 .বাংলায় কোম্পানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা : বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বাংলার নবাবের ওপর কোম্পানি পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, বাংলার নবাব নামমাত্র শাসকে পরিণত হয়েছিল। ইংরেজ বাহিনীর মর্যাদা বৃদ্ধি ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা : বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ করার ফলে ভারতে ইংরেজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছিল। ফলে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মিরকাশিমের সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানির বিরোধের ক্ষেত্রে কোম্পানির বণিকদের ব্যক্তিগত ব্যাবসার কী ভূমিকা ছিল। বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থার প্রভাব কী হয়েছিল ? 5
মিরকাশিম ও কোম্পানির বণিকদের ব্যক্তিগত ব্যাবসা :
ব্রিটিশ কোম্পানির বণিকদের ব্যক্তিগত ব্যাবসাবাণিজ্যকে কেন্দ্র করে কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাব মিরকাশিমের বিবাদ শুরু হয়। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়রের কাছ থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি যে ফরমান লাভ করেছিল তাতে শুধুমাত্র ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করেছিল। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাবসায় ফরমান ব্যবহার করত।
1 . কোম্পানির বর্ণিকাদের বেআইনি ব্যাবসার ফলে বাংলার অর্থনীতি সমস্যার মুখে পড়েছিল।
2 . কোম্পানির বণিকরা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ায় নবাবের রাজস্ব ঘাটতি পড়েছিল।।
3 . দেশীয় বণিকরা শুল্ক দিতে বাধ্য হওয়ার জন্য তারা ব্যাবসায় অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়েছিল।
» বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থার প্রভাব: ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় দ্বৈত শাসন চলেছিল। বাংলায় দ্বৈত শাসনের প্রভাব ছিল ভয়াবহ।
1 . আর্থিক শোষণ : দ্বৈত শাসনের ফলে বাংলায় কোম্পানি চরমভাবে অর্থ শোষণ করেছিল। ১৭৬৪-৬৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা। দেওয়ানি লাভের পর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি বাংলায় রাজস্ব আদায় করেছিল ২ কোটি ২০ লক্ষ। টাকা।
2 . ৭৬-এর মন্বন্তর : দ্বৈত শাসনব্যবস্থার প্রভাবে বাংলায় ৭৬-এর মন্বন্তর হয়েছিল (১১৭৬ বঙ্গাব্দে বা ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে)। এই মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোক অনাহারে প্রাণ ত্যাগ করেছিল। বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান করেছিলেন।
লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির শর্ত কী ছিল? কোন্ দেশীয় রাজ্য এই নীতি প্রথম গ্রহণ করেছিল। এর গুরুত্ব কী ছিল ? 5
বাংলার গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রবর্তন করেন। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে তিনি এই নীতির শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য দেশীয় রাজাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।।
[1 অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির শর্ত : অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির শর্তগুলি হল—
• এই নীতি গ্রহণকারী রাজ্যকে অভ্যন্তরীণ বিপদ ও বৈদেশিক আক্রমণ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রক্ষা করবে।
• কোম্পানির বিনা অনুমতিতে মিত্রতায় আবদ্ধ রাজ্য অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ বা মিত্রতা করতে পারবে না।
• রাজ্যে একদল ইংরেজ সৈন্য ও একজন ইংরেজ প্রতিনিধি থাকবেন।
• ইংরেজ সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার মিত্রতা নীতি গ্রহণকারী রাজ্যকেই বহন করতে হবে।
• রাজ্য থেকে ইংরেজ বাদে সব ইউরোপীয়দের বিতাড়িত করতে হবে।
2 গ্রহণকারী রাজ্য : অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রথম গ্রহণ করেছিল নিজাম শাসিত হায়দরাবাদ রাজ্য (১৭৯৮ খ্রি.)। তারপর যথাক্রমে অযোধ্যা (১৮০১ খ্রি.), পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও (১৮০২ খ্রি.), ভোঁসলে (১৮০৩ খ্রি.), সিন্ধিয়া (১৮০৩ খ্রি.) এই নীতি গ্রহণ করেন।
» গুৰুত্ব । এই নীতি প্রয়োগের ফলে—
• ইংরেজ কোম্পানির শক্তি ও সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
• ইংরেজরা ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়।
• ইংরেজ সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার মিত্রতা নীতি গ্রহণকারী রাজ্য বহন করায় ইংরেজদের সামরিক ক্ষেত্রে ব্যয় সংকুচিত হয়।
• এই নীতির শর্ত অমান্যকারী রাজ্যগুলিকে গ্রাস করায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পায়।
হারাদার আলির নেতৃত্বে কীভাবে মহীশূর রাজ্যের উত্থান হয়েছিল। হায়দার আলির সময়ে ইঙ্গ-মহীশূর সম্পর্ক কী ছিল ? 5
১৫ মহীশুর সাম্রাজ্যে হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের উত্থান ভারতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে হায়দার ইংরেজদে লালি একজন সাধারণ সৈনিক থেকে মহীশূরের সর্বেসর্বা হন। এই সময় ইংরেজরা দক্ষিণ ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারে সচেষ্ট হলে তাদের কে হায়দার আলি ও তাঁর পুত্র টিপু সুলতানের সংঘর্ষ বাঁধে।
হায়দার আলির নেতৃত্বে মহীশূরের উত্থান :
1 . পূর্ব জীবন : ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে বুনিকোটে হায়দার আলি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ফাতে মহম্মদ একজন ভাড়াটে সৈনিক ছিলেন। হায়দার আলি মহীশূরের শাসক নঘুরাজের অধীনে এক সাধারণ সৈনিক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তারপর ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে মহীশূরের শাসক নগুরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে মহীশূর সাম্রাজ্যের সর্বেসর্বা হন।
2 . বিস্তার সিংহাসনে আরোহণের পর হায়দার আলি রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তিনি বিদপুর, গুটি, সেরা প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে নিজ সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করেন। তাঁর রাজ্যবিস্তারের ফলে ইংরেজ, মারাঠা ও নিজাম ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে।
3 .প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ: এমতাবস্থায় হায়দার আলিকে দমন করার জন্য ইংরেজরা মারাঠা ও নিজামকে নিয়ে একটি শক্তিজোট গঠন করেন। ক্ষুদ্ধ হায়দার আলি ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূচনা হয়। হায়দার আলি ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে অতর্কিতে নারাজ
আক্রমণ করলে ইংরেজরা হায়দারের সঙ্গে মাদ্রাজের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। কোম্পানির
মাদ্রাজের সপ্তির শর্ত মাম্রাজের সন্ধির শর্ত অনুসারে স্থির হয় যে, হায়দার আলি ও ইংরেজ মধ্যে কোনো এক পক্ষ তৃতীয় পক্ষ দ্বারা আক্রান্ত হলে একে অন্যকে সাহায্য করবে।
দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ:
• যুদ্ধের কারণ: মারাঠারা ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে মহীশূর আক্রমণ করলে মাদ্রাজের সন্ধির শর্ত অনুসারে ইংরেজরা মহীশূরাকে সাহায্য করেনি,ইংরেজরা মহীশূরের বিনা অনুমতিতে মহীশূরের অন্তর্গত ফরাসি উপনিবেশ মাহে আক্রমণ করে। ফলে হায়দার আলি ক্ষুদ্ধ হন।
যুদ্ধ : হায়দার আলি ইংরেজ আশ্রিত কর্ণটির আক্রমণ করলে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু এর মধ্যে ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে কর্কট (ক্যানসার) রোগে আক্রান্ত হয়ে হায়দার আলি মারা যান।
টিপু সুলতানের সময় ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ ও মহীশূর রাজ্যের পতন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো। 5
টিপু সুলতানের নেতৃত্ব: টিপু সুলতান ছিলেন মহীশূর রাজ্যের একজন অন্যতম শাসক। পিতা হায়দার আলির মৃত্যুর পর তিনি শুর সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য ইংরেজনের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন। উভয়পক্ষের ইচ্ছানুসারে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ম্যাঙ্গালোরের এ স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে মহীশূর সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
ম্যাঙ্গালোরের সন্ধির শর্ত: ম্যাঙ্গালোরের সন্ধির শর্ত অনুসারে একে অপরের অধিকৃত অঞ্চল ফেরত দেয়। এই সন্ধির ফলে দ্বিতীয় ইচ্ছা-মহীশূর যুদ্ধের অবসান ঘটে।
তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ
যুদ্ধের কারণ : টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সালো যোগসাজশ করেন। অপরদিকে জ বড়োলটি কর্নওয়ালিস ইচ্ছাকৃতভাবে মহীশূরের নাম বাদ দিয়ে মিত্র রাজ্যের একটি তালিকা করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে টিপু ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের মিত্ররাজ্য ত্রিবাঙ্কুর আক্রমণ করলে ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূচনা হয়। দু-বছর বীরবিক্রমে যুদ্ধ করার পর টিপু সুলতান পরাজিত হন। শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
শ্রীরাপত্তমের সন্ধির শর্ত: শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির শর্ত অনুসারে টিপুকে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ও অর্ধেক রাজ্য ইংরেজদের ছেড়ে দিতে হয়, ক্ষতিপূরণের টাকার জামিনস্বরূপ টিপুর দুই পুত্রকে ইংরেজরা আটক রাখে।
ইংরেজদের কাছে টিপু সুলতানের আত্মসমর্পণ।
[3. চতুর্থ ইলা-মহীশূর যুদ্ধ: কিছুকাল পর টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে আবার ফরাসিদের সাহায্য লাভের চেষ্টা করেন। এদিকে বড়োলাট লর্ড ওয়েলেসলি টিপুকে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিতে স্বাক্ষর করতে বললে টিপু তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। ফলে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূচনা হয়।
• মহীশূরের পতন এই যুদ্ধে টিপু ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে পরাজিত ও নিহত হন। ফলে মহীশূর সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
লর্ড ওয়েলেসলির আমলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার কীভাবে হয়েছিল। ৫
ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে বড়োলাট লর্ড ওয়েলেসলির শাসনকাল (১৭৯৮-১৮০৫ খ্রি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পিয়ার বলেছেন, লর্ড ওয়েলেসলির রাজত্বকালে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে এক নবযুগের সূচনা হয়েছিল। » ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে ওয়েলেসলির উদ্দেশ্য:
1 ব্রিটিশ সুশাসন প্রতিষ্ঠা : লর্ড ওয়েলেসলি মনে করতেন, ইংরেজদের সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থা হল শ্রেষ্ঠ এবং ভারতীয় রাজারা অত্যাচারী ও নীতিহীন। তাই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তার করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।।
2 ভারতে ব্রিটিশ পণ্যসামগ্রীর বাজার প্রতিষ্ঠা ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের ফলে পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার করে ব্রিটিশ পণ্যসামগ্রী বিক্রির বাজার তৈরি করতে চেয়েছিলেন। [ 3 ফরাসি আধিপত্যের বিনাশ। এ ছাড়া ভারতবর্ষ থেকে ফরাসি আধিপত্যের সমূলে বিনাশ ঘটানোও ওয়েলেসলির অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
ওয়েলেসলির সাম্রাজ্যবিস্তার নীতি : লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য তিনটি নীতি গ্রহণ করেছিলেন, যথা ১।যুদ্ধের মাধ্যমে রাজ্য জন্ম, ২ ।ছলনার মাধ্যমে রাজ্য জয় এবং ৩। অধীনতামুলক মিত্রতা নীতির মাধ্যমে রাজ্য জয় ।
1. যুদ্ধের মাধ্যমে রাজ্য জয় :
চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ লর্ড ওয়েলেসলি যুদ্ধনীতি অনুসরণ করে মহীশূর সাম্রাজ্য দখল করেন। তিনি মহীশূরের অধিপতি টিপু সুলতানকে অধীনতামূলক মিত্রতায় স্বাক্ষর করতে বললে টিপু সুলতান তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ।
2 . ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সূচনা হয়। যুদ্ধে টিপু সুলতান পরাজিত ও নিহত হন। মহীশুরে ইংরেজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ মারাঠা দলপতি সিন্ধিয়া ও ভোসলে ইংরেজ মিত্ররাজ্য হায়দরাবাদ রাজ্য আক্রমণ করলে দ্বিতীয় ইচ্ছা-মারাঠা যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে সিন্ধিয়া ও ভোঁসলে পরাজিত হয়ে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি মেনে নেয়। ফলে মারাঠা সাম্রাজ্যের এক বিস্তৃত অঞ্চলের ওপর ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
2 ছলনার মাধ্যমে রাজ্যজয় : লর্ড ওয়েলেসলি ছলনার আশ্রয় নিয়ে তিনটি রাজ্য দখল করেন, সেগুলি হল- তাঙ্গোর, সুরাট ও কর্ণাটক।
3 . অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি : লর্ড ওয়েলেসলি ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রবর্তন করেন। এই নীতি অনুযায়ী 1 . কোনো দেশীয় রাজ্য ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতায় আবদ্ধ হলে সেই রাজ্যের নিরাপত্তার তার ব্রিটিশদের,2 . ওই রাজ্যটিতে একজন ইংরেজ রেসিডেন্ট থাকাবেন এবং 3 . রাজ্যটির নিজস্ব সেনাবাহিনী ভেঙে দিতে হবে। এই নীতি প্রয়োগ করে তিনি অনেক দেশীয় রাজ্য গ্রাস করেন। এই রাজ্যগুলি হল হায়দরাবাদ (১৭৯৮ খ্রি.), অযোধ্যা এবং (১৮০১ খ্রি.), সিন্ধিয়া ও ভোঁ খ্রি.) রাজ্য প্রভৃতি।
সুৰা বাংলায় কীভাবে মুর্শিদকুলির ক্ষমতা চূড়ান্ত হয়ে পড়েছিল? 3
দেওয়ান মুর্শিদকুলি
• সুবা বাংলার রাজস্ব আদায় করার জন্য মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব
মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার দেওয়ান হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন। " নাজিম মুর্শিদকুলি
• মুঘল সম্রাট ফররুখশিয়র মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার দেওয়ান পদে পাকাপাকিভাবে নিয়োগ করেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে বাংলার নাজিম পদে নিয়োগ করা হয়।
ফলে দেওয়ান ও নাজিম এই দুই পদের যৌথ দায়িত্ব পাওয়ার পর সুবা বাংলায় মুর্শিদকুলির ক্ষমতা চূড়ান্ত হয়ে ওঠে।
কার নেতৃত্বে ও কীভাবে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে বাংলার উত্থান ঘটেছিল ? 3
নেতৃত্ব: মুর্শিদকুলি খানের নেতৃত্বে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে বাংলার উত্থান হয়েছিল।
বাংলার উত্থান :
বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের একটি ‘সুবা’ বা প্রদেশ। মুঘল সম্রাটের মনোনীত সুবাদাররা বাংলা শাসন করতেন।
১৭০০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার 'দেওয়ান' নিযুক্ত করেন।
• ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়রের আমলে তিনি "বাংলার নাজিম বা সুবাদার পদে নিযুক্ত হন। দেওয়ান ও নাজিম (সুবাদার)-এর যৌথ দায়িত্ব পাওয়ার পর মুর্শিদকুলি খানের ক্ষমতা চূড়ান্ত ভাবে বেড়ে যায়। ফলে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে বাংলার উত্থান ঘটে এবং বাংলায় স্বাধীন নবাবি শাসনের সূচনা হয়।
কত খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান মারা যান ? তাঁর মৃত্যুর পর কে এবং কীভাবে বাংলার নবাব হয়েছিলেন? 3
১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান মারা যান।
মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর আলিবর্দি খান বাংলার নবাব হন।
১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বাংলার সিংহাসন দখল করা নিয়ে গোলযোগ শুরু হয়। তারপর সিংহাসনে বসেন তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন (১৭২৭-৩৯ খ্রি.) ও তাঁর দৌহিত্র সরফরাজ খান (১৭৩৯-৪০ খ্রি.)। কিন্তু তাদের অকর্মণ্যতার জন্য নবাবি শাসন ভেঙে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে জগৎ শেঠ ও কয়েকজন ক্ষমতাবান জমিদারের মদতে সেনাপতি আলিবর্দি খান বাংলার নবাব হন ।
কে, কীভাবে ও কবে হায়দরাবাদে আঞ্চলিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ? 3
সাদাৎ খান অযোধ্যায় আঞ্চলিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
১৭২২ খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যায় আঞ্চলিক শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। মুঘল আমলে অযোধ্যা ছিল মুঘলদের অধীন একটি সুবা বা
প্রদেশ। সাদাৎ খান অযোধ্যা অঞ্চলের স্থানীয় রাজা ও গোষ্ঠী 2 নেতাদের বিদ্রোহ দমন করে নিজের ক্ষমতা বাড়ান। মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ্ তাঁকে বুরহান-উল মুলক উপাধি দেন। তিনি অযোধ্যার সুবাদার নিযুক্ত হন। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। ততদিনে অযোধ্যা প্রায় স্বাধীন রাজ্য হিসাবে গড়ে ওঠে।
ফাররুখশিয়র ফরমান বলতে কী বোঝায় ? 3
ফাররুখশিয়র ছিলেন মুঘল সম্রাট। তিনি ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অনেক সুযোগসুবিধা দিয়ে যে আদেশ বা ফরমান জারি করেছিলেন তা ‘ফাররুখশিয়র ফরমান’ নামে পরিচিত।
ফাররুখশিয়র ফরমান অনুসারে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বছরে মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলায় ব্যাবসাবাণিজ্য করার অধিকার লাভ করেছিল।)
ফাররুখশিয়রের ফরমানের গুরুত্ব কী ছিল ? 3
১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়র ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য যে আদেশ বা ফরমান জারি করেছিলেন সেটি ভারতের ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
1 বাংলায় অবাধে বাণিজ্য করা : ফাররুখশিয়র ফরমানের জন্য ব্রিটিশ কোম্পানির বাংলায় অবাধে বাণিজ্য করার পথ খুলে কো গিয়েছিল।
2 বাংলায় ক্ষমতা দখলের পটভূমি রচনা : ফাররুখশিয়র ফরমান লাভ করার ফলে বাংলার নবাবদের সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয় এবং ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতা দখল করে।
ফাররুখশিয়র কোন্ সালে ইংরেজদের অনুকূলে ফরমান জারি করেন? এই ফরমানের তিনটি শর্ত লেখো। 3
ফাররুখশিয়র ১৭১৭ সালে ইংরেজদের অনুকূলে ফরমান জারি করেন।
» ফাররুখশিয়র ফরমানের তিনটি শর্ত :
ফাররুখশিয়র ফরমানের তিনটি শর্ত হল—
1. ইংরেজ কোম্পানি বার্ষিক মাত্র ৩০০০ (তিন হাজার) টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করতে পারবে।
2 . ইংরেজ কোম্পানি বাণিজ্যের ব্যাপারে দত্তক বা ছাড়পত্র ব্যবহার করতে পারবে।
3 .ইংরেজ কোম্পানি প্রয়োজনে মুরশিদাবাদের টাকশাল ব্যবহার করতে পারবে।
দস্তক কী? ইংরেজরা করে কার কাছ থেকে দস্তক ব্যবহারের অধিকার লাভ করেন ? 3
দস্তক বলতে বোঝায় বাণিজ্যিক ছাড়পত্রকে। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়র ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে 'ফরমান' প্রদান করেছিলেন। এই ফরমানে তিনি ইংরেজ কোম্পানিকে বাংলার বাণিজ্যে 'দত্তক' ব্যবহারের অধিকার প্রদান করেছিলেন।
ইংরেজরা ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে দস্তক লাভ করেছিল।
মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়রের কাছ থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দস্তক লাভ করেছিল।
দস্তক ব্যবহারের ফলে কেন ইংরেজদের সঙ্গ্যে নবাবদের বিরোধ হয়েছিল? 3
দস্তকের ব্যবহার ও নবাবদের সঙ্গে বিরোধ:
মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়র বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যে দত্তক ব্যবহারের অধিকার দিয়েছিলেন। এই দপ্তকের ব্যবহার নিয়ে বাংলার নবাবদের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির, সমস্যা তৈরি হয়েছিল।
প্রথমত, ইংরেজ কোম্পানি বাংলার বাণিজ্যে দত্তক ব্যবহারের ফলে নবাবের বাণিজ্যশুষ্ক থেকে আয় কমে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীরাও অন্যায়ভাবে ব্যক্তিগত ব্যাবসায় দত্তকের ব্যবহার করত। এই দস্তকের ব্যবহার বা অপব্যবহারে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন আলিবর্দি খান, সিরাজ-উদ্ দৌলা, মিরকাশিম ইংরেজ কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং বাংলার নবাবদের মধ্যে বিরোধের প্রধান কারণ কী ছিল? 3
• ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং বাংলার নবাবদের মধ্যে বিরোধের প্রধান কারণ ছিল – ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের দ্বারা দস্তকের অপব্যবহার।
মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়র ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দস্তক ব্যবহার করার অধিকার প্রদান করেছিলেন। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসায় দস্তক বা ছাড়পত্র ব্যবহার করে নবাবকে ফাঁকি দিত।
সিরাজ-উদদৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্রকারী দুজনের নাম লেখো। এই ষড়যন্ত্র কীভাবে সিরাজের ক্ষমতা হ্রাস করে ? 3
সিরাজ-উদ্ দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্রকারী দুজনের নাম হল— 1 রবার্ট ক্লাইভ 2 মিরজাফর।
সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ফলে পলাশির যুদ্ধ হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি মিরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন ফলে সিরাজের সামরিক ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তিনি পরাজিত হন।
অন্ধকূপ হত্যা বলতে কী বোঝায়? 3
অন্ধকূপ হত্যা ইংরেজ কর্মচারী হলওয়েলের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, নবাবের ফোর্ট উইলিয়ম দখলের পর নবাব-বাহিনীর হাতে কোম্পানির ১৪৬ জন কর্মচারী বন্দি হয়েছিল। ওইরাত্রে ১৮ ফুট লম্বা ও ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি চওড়া একটি কক্ষে বন্দিদের রাখা হয়েছিল। পরদিন সকালের মধ্যে তাঁদের ১২৩ জন মারা গিয়েছিল। এই ঘটনা 'অন্ধকূপ হত্যা' নামে পরিচিত। তবে ঐতিহাসিকগণ এই ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন।