Chapter-2, ভাত

বামুন ঠাকুর বড়োবউকে বলেছিল যে, উচ্ছব ভাত খাওয়ার বিনিময়ে সে বাড়িতে কাজ করবে।

বড়োপিসিমা ছিলেন বুড়োকর্তার অবিবাহিত কৃষ্ণা বোন এবং বড়োরউমা-সহ বাড়ির অন্য বউমাদের পিসিশাশুড়ি।

অল্পবয়সে স্ত্রী মারা যাওয়ায় বুড়োকর্তা সংসার নিয়ে 'নাটা ঝামটা হচ্ছিলেন।

বড়োপিসিমা বাড়ির রান্নাঘর, ভাড়াটে বাড়িতে মিস্তিরি লাগানো, দাদা অর্থাৎ বুড়োকর্তার সেবা করা—এসব দায়িত্ব সামলাতেন।

বড়ো বাড়ির বুড়োকর্তা লিভার ক্যানসারে মরতে বসেছিলেন বলে তাকে বাঁচাতেই হোমযজ্ঞ হচ্ছিল।

বুড়োকর্তার লিভার ক্যানসার অর্থাৎ যকৃতে কর্কট রোগ হয়েছিল।

মেজোবউ শাশুড়ির জন্য ইলিশ, পাকাপোনা, চিতল, ট্যাংরা এবং বড়ো ভেটকি মাছ রান্না করছিল।

বড়োবউ, শ্বশুরের দেখভালের জন্য নিযুক্ত নার্সকে চা খাওয়ার জন্য কিছুক্ষণ ছাড়তেই শ্বশুরের ঘরে ঢুকেছিল।

বড়ো বাড়ির বড়ো, মেজো ও ছোটো ছেলে সকাল এগারোটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না বলেই তাদের চাকরি করা হয়ে ওঠেনি।

আঠারোটা দেবত্র বাড়ি এবং বাদা অঞ্চলের প্রচুর উর্বর জমির মালিক হওয়ার জন্য বড়ো বাড়ির ছেলেদের চাকরি করার প্রয়োজন ছিল না।

ঘরে পাতা দই ও ইসবগুল দিয়ে শরবত দেওয়া এবং শ্বশুরের জন্য রুটি বা লুচি তৈরি করা এবং তাঁর বিছানা পাতা ও পা টেপার কাজ করত বড়োবউ।

বড়ো বাড়ির ছোটো বউয়ের বাবা তান্ত্রিক ডেকে এনেছিলেন।

যজ্ঞের জন্য বেল, ক্যাওড়া, তেঁতুল, বট, অশ্বত্থ প্রভৃতি গাছের আধ মন করে কাঠে লাগে ।

বড়ো বাড়ির ভজন চাকর যজ্ঞের জন্য কালো বিড়ালের লোম সংগ্রহ করতে গিয়েছিল।

তান্ত্রিক শ্মশান থেকে বালি আনার ফরমাণ করেন।

বড়ো বাড়ির একতলায় গেলে দেখা যায় গোলায় গোলায় স্তরে স্তরে বহু রকম চাল সাজানো রয়েছে।

হোমযজ্ঞ শুরু হওয়ার আগে তান্ত্রিক নীচের হলঘরে বসেছিলেন।

ঝিঙেশাল চালের ভাত নিরামিষ ডাল এবং তরি-তরকারি দিয়ে খাওয়া হয়।

বড়োবাবু কনকপানি ছাড়া এবং মেজো ও ছোটোবাৰু পদ্মজালি চাল ছাড়া ভাত খায় না বলে তাদের জন্য এই দু-রকমের চাল রান্না করা হত।

বড়ো বাড়িতে রাঁধুনি এবং ঝি-চাকররা মোটা-সাপ্‌টা চাল খেত।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' গল্পে বড়োপিসিমার বিয়ে হয়নি।

ভাত' গল্পে বুড়োকর্তার বাড়িগুলির নাম ছিল শিব, মহেশ্বর, ত্রিলোচন, উমাপতি ইত্যাদি।

'ভাত' গল্পে বড়ো বাড়ির বড়োবউয়ের কাছে তার শ্বশুর ঠাকুরদেবতা সমান ছিল।

'ভাত' গল্পের লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ইতিহাসনির্ভর জীবনী ঝাঁসীর রাণী।

এখানে হোমযজ্ঞের উদ্দেশ্যে যে বেল, ক্যাওড়া, অশ্বত্থ, বট ও তেঁতুল গাছের আধমন কাঠ কাটা হচ্ছিল, তার কথাই বলা হয়েছে।

কাজে নতুন যোগ দেওয়া উচ্ছবের উগ্র চাহনি বড়োবউয়ের ভালো লাগেনি।

বড়োবউমা বড়োপিসিমাকে উচ্ছব সম্বন্ধে এই প্রশ্ন করেছে।

বড়ো বাড়ির লোকেরা বলে যে, বড়োপিসিমার ঠাকুরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে এবং তাই তিনি দেবতার সেবিকা।

উত্তরা উচ্ছনের ঘর-সংসার এবং দেশ ঝড়ালে ভেসে গেছে বলেই বাসিন তাকে ডেকে এনেছে বলে জানিয়েছেন বস্তা বড়োপিবিনা।

শাশুড়ির বিধবা হওয়ার আশঙ্কায় তার জন্য নানারকম মাছ রান্না করার উদ্দেশ্যে মেজোবউ উনোন পাড়ে বসেছিল।

বৃদ্ধ বুড়োকর্তার চরম অসুস্থতার জন্য তার সেজো ছেলের বাড়িতে আসার কথা ওঠে না, কারণ সে বিলেতে থাকে।

বড়ো বাড়ির কর্তামশায়ের লিভার ক্যানসার হওয়ার কথা বোঝা গিয়েছিল এবং দেরিতে ধরা পড়ার জন্য ডাক্তারদের কিছু করার ছিল না।

বড়োব উমার কাছে তার শ্বশুর ঠাকুর-দেবতার মতো ছিল বলে সে তাঁর মৃত্যুর পর চাঁদ-সূর্য উঠবে কি না তা ভেবেছে।

ক্যানসারে আক্রান্ত বড়ো বাড়ির বৃদ্ধ গৃহকর্তার শেষ সময় উপস্থিত হয়েছে কথাই ডাক্তাররা বলে দিয়েছিল।

ডাক্তাররা বড়ো বাড়ির গৃহকর্তার শেষ সময় এসে গেছে বলে দিয়েছে। তাই তাঁকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে সে বাড়িতে হোমযজ্ঞ হচ্ছিল।

বাদা অর্থাৎ নিম্নভূমিতে জলের অভাব না থাকায় প্রচুর ফসল হয়। তাই বাদায় থাকা লোকেদের ভাতের আকাঙ্ক্ষা থাকে না বলে মনে করা হয়েছে।

অবিবাহিতা বড়োপিসিমা বলেছিলেন যে, শিব তাঁর পতিদেবতা । তাই তাঁকে যেন মানুষের সাথে বিয়ে দেওয়া না হয়। এখানে এই তথ্যের সত্যতা সম্বন্ধেই বলা হয়েছে।

বড়োবউয়ের কাছে তার শ্বশুরমশাই অর্থাৎ বুড়োকর্তা দিলেন ঠাকুর-দেবতা তুলা।

হোমযজ্ঞ অনুষ্ঠানে বেল, ক্যাওড়া, অশ্বত্থ, বট, তেঁতুল—এই পাঁচপ্রকার গাছের কাঠ, কালো বিড়ালের লোম, শ্মশানের বালি ইত্যাদি উপকরণের প্রয়োজন।

সংসারের সব কিছুই বড়োপিসিয়ার নিয়মে চলে ।

বড়োবউয়ের কাছে তার শ্বশুর ঠাকুর-দেবতার মতো ছিল।

প্রশ্নোকৃত উক্তিটিতে বড়োপিসিমার কথা বলা হয়েছে।

ঝিঙেশাল চালের ভাত নিরামিষ ডাল-তরকারি দিয়ে এবং রামশাল চালের ভাত মাছ দিয়ে খায়।

উচ্ছবের বউ তুমুল ঝড়বৃষ্টির সময় ছেলেমেয়েকে জড়িয়ে-জাপটে ধরেছিল এবং ঠান্ডায় ও ভয়ে কাপছিল।

উচ্ছব তুমুল ঝড়বৃষ্টিতে তার ঘরের মাঝখানের মাতালের মতো কাপতে থাকা খুঁটিটিকে মাটির দিকে চেপে ধরার চেষ্টা করছিল আর ভগবানকে ডাকছিল।

'ভাত' গল্পে তুমুল ঝড়বৃষ্টিতে উচ্ছব ভগবানকে ডাকায় লেখিকা বলেছেন যে, দুর্যোগের মধ্যে ভগবানও বোধ হয় কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমোন।

সাধন দাশ উচ্ছবকে বলেছিল যে, তার পরিবারের লোকজনকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বানের জল তাকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, গাছে বেঁধে সে রক্ষা পেয়েছে।

কৌটোটির মধ্যে ভূমিহীন উচ্ছবের সরকারের কাছে জমি চাওয়ার আবেদনপত্রের নকল কাগজ ছিল।

কৌটোটা ছিল টিনের তৈরি মুখকর করা চমৎকার দেখতে এবং বড়ো।

বন্যায় বউ-ছেলেমেয়ে ভেসে যাওয়ার পর ক-দিন ধরে উচ্ছবের লঙ্গরখানার রান্না খিচুড়ি খেতে যাওয়া হয়নি |

পুরোহিত মহানাম শতপথির অন্য দুটো গ্রামে শ্রাদ্ধকর্মের কাজ সমাধা করার জন্যই উচ্ছবদের গ্রামে আসতে দেরি হচ্ছিল।

এখানে কথাটি হল — “সরকার ঘর করতে খরচা দেবে।

উচ্ছবদের গ্রাম থেকে বাসিনীর বোন এবং ভাজ কিছুকাল ঠিকে কাজ করার উদ্দেশ্যে কলকাতায় যাচ্ছিল।

উৎসব প্রথমবার কলকাতায় বাসিনীর মনিবদের বড়ো বাড়িটা বাইরে থেকে দেখেছিল আর দেখেছিল বার-বাড়ির ঠাকুরদালান এবং শিবমন্দিরের মাথার পিতলের ত্রিশূল।

কলকাতায় বাসিনীর মনিবদের বাড়িতে যে ফেলানো ছড়ানো ভাত—সে গল্প গ্রামের সবাই শুনেছে।

ধানের গোছা হওয়ার আগেই ধানের সবুজ রং চলে গিয়ে কার্তিকেই ধান খড়ে পরিণত হতে দেখে উচ্ছব মাথায় হাত দিয়েছিল।

ঝিঙেশাল, রামশাল, কনকপানি, পদ্মজালি এবং মোটা-সাপ্‌টা ধানের চাল—এই পাঁচ ভাগে ভাত রান্না হত বড়ো বাড়িতে।

বড়োপিসিমা বাড়ির পরিচারিকা বাসিনীর মাধ্যমে লুকিয়ে বড়ো বাড়ির চাল বিক্রি করত।

বাসিনীর মনিবরা উচ্ছব ক-দিন ধরে খায়নি শুনেও তাকে আগে খেতে না দিয়ে কাজ করাচ্ছিল বলেই বাসিনী এমন উক্তি করেছিল।

বন্যায় বউ-ছেলেমেয়ে ভেসে যাওয়ার পর উচ্ছব পাগলের মতো তাদের খুঁজে বেড়ানোর জন্য কয়েকদিন বাড়িতেই পড়েছিল বলে রান্না খিচুড়ি তার খাওয়া হয়নি।

বন্যায় বউ-ছেলেমেয়ে ভেসে যাওয়ার পর যখন কদিন ধরে উচ্ছব তাদের খুঁজতে বাড়িতেই পড়েছিল, তখন তার বুদ্ধি হারিয়ে গিয়েছিল।

উচ্ছবকে কাঁদতে দেখে সাধনবাবু জানতে চেয়েছিল, মনিবের ধান নষ্ট হওয়ায় উচ্ছব কেন কাঁদছে।

‘বাদা' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল নিম্নভূমি বা জঙ্গলাকীর্ণ ভূমি | এই ধরনের জমিতে জলের অভাব থাকে না বলে ধান ভালো হয়।

মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'ভাত' গল্পে লোকটির নাম উৎসব হলেও সে উচ্ছব নাইয়া নামে পরিচিত ছিল।

শ্রাদ্ধ করার জন্য পুরোহিত মহানাম শতপথিকে খবর দেওয়া হয়েছিল।

এক রাতে মাতলা নদীর প্রবল বন্যায় উৎসবের স্ত্রী-সন্তান জলে ভেসে গিয়ে মারা যায়।

কাঠ কাটতে কাটতে দীর্ঘদিনের উপবাসী উচ্ছব বাসিনীর কাছে একমুঠো চাল চিবিয়ে খাওয়ার জন্য চাইলে তাকে নিরম্ভ করতে বাসিনী এ কথা বলে।

বাদায় উৎপন্ন পাহাড়প্রমাণ চালের একটা অংশ বড়োপিসিমা বাসিনীর মাধ্যমে লুকিয়ে লুকিয়ে বেচে দেন।

উৎসবের ঘরের মাঝখুঁটিটি তুমুল ঝড়বৃষ্টিতে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল।

বাসিনীর বোন এবং ভাজ অর্থাৎ ভাইবউ কিছুদিন ঠিকে কাজ করবে।

ঝড়বৃষ্টির সন্ধ্যায় উচ্ছব অনেকটা হিঞ্চে শাক সেখ এবং গুগলি সেদ্ধ, নুন ও লংকাপোড়া দিয়ে ভাত মেখে খেয়েছিল।

চরুনীর মা খেতে খেতে বলেছিল যে, দেবতার লক্ষণ ভালো নয় যারা নৌকা নিয়ে বেরিয়েছে তারা নৌকা-সহ না ডুবে মরে।

ঝড়বৃষ্টির রাতে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে উচ্ছব, যখন মাতাল মাতলার সফেন জলকে ছুটে আসতে দেখে তারপর থেকেই সব একাকার হয়ে যায় তার।

চন্নুনীদের অর্থাৎ বউ-ছেলেমেয়েকে যদি ভগবান তাহলে উচ্ছবের বুকে শত হাতির বল থাকত।

বন্যায় বউ-ছেলেমেয়ে মারা না গেলে উচ্ছবরা সবাই মিলে তাদের টিনের মুখবদ্ধ কৌটোটা নিয়ে ভিক্ষেয় বেরোত।

সতীশ মিস্তিরি ছিল ধনী কৃষক, যার জমিতে কাজ করে উচ্ছব দিন গুজরান করত।

সতীনবাবুর নাতির বেবি ফুডের মুখবন্ধ টিনের কৌটোটা উচ্চবের পছন্দ হয় বলে সতীশবাবুর কাছ থেকে সে কৌটোটা চেয়ে এনেছিল ।

তান্ত্রিকের পুরোনো বিধান ছিল যে, হোমে বসার আগে যেন তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে ফেলা হয়।

তান্ত্রিক নতুন বিধান হল যে, হোমের আগেই সব কিছু রান্না করে রাখতে হবে, কিন্তু খেতে হবে হোমের পরে।

বাসিনী ঝুড়িবোঝাই শাক মুতে আসার অজুহাতে উচ্ছবকে লুকিয়ে খাবার দিতে উঠোনে এসেছিল।

উচ্ছবদের বাদায় গেঁড়ি, গুগলি, কচু শাক ও সুসনি শাক পাওয়া যায়।

: ছাতু খাওয়ার পর উচ্ছব মিষ্টির দোকান থেকে ভাঁড় চেয়ে নিয়ে তাতে করে জল খেয়েছিল।

: দীর্ঘদিনের উপোসের পর মাত্র এক ঠোঙা ছাতু খেয়ে খিদে মেটেনি বলেই উচ্ছব বলেছিল যে, 'সাগরে শিশির পড়ে।

আসার সময় উচ্ছবকে গাঁ-জ্ঞেয়াতিরা বলেছিল যে, সে যখন কলকাতা যাচ্ছে, তখন কালীঘাটে গিয়ে যেন তার বউ ছেলেমেয়ের শ্রাদ্ধ সেরে নেয়।

মহানাম শতপথি উচ্চবদের গ্রামে এলে নদীর পাড়ে একসারিতে বন্যায় মৃত মানুষদের শ্রাদ্ধ হবে।

বউ-ছেলেমেয়ে অপঘাতে মারা যাওয়ায় উচ্ছব শোকে পাগল হওয়ার পরিবর্তে 'ভাত ভাত' করছিল বলে সতীশবাবু বলেছিলেন যে, উচ্ছবের মতিচ্ছন্ন হয়েছে।

যজ্ঞের জন্য উচ্ছবের কাটা কাঠগুলি দেড় হাত লম্বা ছিল।

'ভাত' গল্পে বুড়োকর্তার বাড়ির লোকেরা গরিবের গতর সম্ভা দেখে।

'ভাত' গল্পে বুড়োকর্তার মুটকি খাস ঝি-কে 'সাত নাতি' অর্থাৎ সাত লাথি মারার কথা বলা হয়েছে।

'ভাত' গল্পে বহুদিন ধরে উপোসী উহবের ভাত খাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলা হয়েছে।

হোমযজ্ঞ করার জন্য কাঠের দ্রুত প্রয়োজন ছিল বলে পিসিমা উচ্ছবকে তাড়াতাড়ি হাত চালাতে বলেছিলেন।

কাঠ কাটলে হোম হবে এবং হোম হওয়ার পর বহু আকাঙ্ক্ষিত জাত খেতে পারে বলেই উচ্ছব তাড়াতাড়ি হাত চালাচ্ছিল।

ঝড়বৃষ্টির রাতে যেদিন পরিবারের সকলের সাথে উচ্ছের খেতে বসেছিল, সেদিন চানীর মা অর্থাৎ উচ্ছবের বউ কথাটা বলেছিল।

উৎসবকে দিয়ে তাড়াতাড়ি কাঠ কাটানোর উদ্দেশ্যে বড়োপিসিমা খনখনিয়ে ওঠে।

বড়ো বাড়ির ফুটন্ত ভাতের গন্ধ উচ্ছবকে বড়ো উতলা করে ।

বড়ো বাড়ির রাশি রাশি রান্না শেষ হওয়ার কথা শুনে উচ্ছব বুকে বল পায়৷

: খ্যাতনামা সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্প থেকে আমরা জানতে পারি যে, মাতলা নদীর বন্যায় মৃত গ্রামবাসীদের সারবন্দিভাবে শ্রাদ্ধ হবে।

তান্ত্রিক হোম শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই দোতলা থেকে নাস নেমে এসে ডাক্তারকে খবর দিতে বলেছিল।

তান্ত্রিক হোম শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই দোতলা থেকে নার্স নেমে এসে ডাক্তারকে কল দিতে বললে বুড়োকর্তার তিন ছেলে হোমের ঘর থেকে। বেরিয়ে যায়।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে 'বড়ো বাড়ির যে অশীতিপর বৃদ্ধের মৃত্যু বর্ণিত হয়েছে, তাঁর ছিল চার পুত্র ও পুত্রবধূ। বড়ো, মেজো এবং ছোটো পুত্ৰ বাড়িতে থাকলেও সেজো পুত্র বিলেতে থাকে। বাড়িতে থাকা তিন পুত্রই ছিল। অত্যন্ত অলস-“এ বাড়ির ছেলেরা বেলা এগারোটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না।" যেহেতু বাড়ির জোষ্ঠ বুড়োকর্তার দূরদর্শিতায় আঠারোটা দেবত্র বাড়ি এবং বাদা অঞ্চলের অনেক উর্বর জমি তাদের অধিকারে, তাই তারা ছিল। ভীষণ কর্মবিমুখ এবং উপার্জনবিমুখ। তবে তাদের স্ত্রীরা ছিল অত্যন্ত কর্মপটু এবং কর্তবাসচেতন। এ গল্পে ছোটোবউয়ের বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে তার পিতা যে বুড়োকর্তাকে সুস্থ করার জন্য তান্ত্রিক নিয়ে এসেছিলেন, সেটুকুই জানা যায়। অন্যদিকে, মেজোবউকে আমরা দেখি শাশুড়ির জন্য বড়ো ইলিশ, বড়ো ভেটকি, চিতলের কোল, ডিমপোরা ট্যাংরা, পাকাপোনার পেটি প্রভৃতি মাছের বিভিন্ন পদ রান্না করতে, মুমূর্ষু শ্বশুরের মৃত্যু হলে শাশুড়ি আর আমিষ খেতে পারবেন না তাই।

বড়োবউ চরিত্রটি "ভাত" ছোটোগল্পের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। বড়োবউ শুধু কর্মপতীয়সীই ছিল না, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনেও তার কোনো খামতি ছিল না। শ্বশুর তার কাছে ঠাকুরদেবতা সমান' ছিল। সে শ্বশুরের জন্য প্রতিদিন দই পেতে সেই দইয়ের সঙ্গে ইসবগুল মিশিয়ে শরবত বানাত। শ্বশুর খেতে আসার পাঁচ মিনিট আগে তাঁর জন্য রুটি বা লুচি তৈরি করে দিত। এ ছাড়া, প্রতিদিন শ্বশুরের বিছানা করা এবং তাঁর পা টিপে দেওয়ার কাজও সে করত।

তাঁর' বলতে বড়োপিসিমার কথা বলা হয়েছে। → বড়োপিসিমা এ বাড়ির বউদের পিসিশাশুড়ি হন। এত বড়ো বাড়ির মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিয়ে হয়নি। তাঁর অবিবাহিত থাকা সম্বন্ধে নানা জনে নানা ব্যাখ্যা দেয়। প্রথমত, চারপাশের সবাই বলে যে, বড়ো বাড়ির সংসার  সামলানোর জন্যই নাকি পয়সা থাকা সত্ত্বেও বড়োপিসিমার বিয়ে দেওয়া হয়নি। বড়োপিসিমা যখন বিয়ের উপযুক্ত হন, তখন এ বাড়ির জ্যেষ্ঠ বুড়োকর্তার স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। ফলে তখন বড়োকর্তা সংসার নিয়ে নাজেহাল হচ্ছিলেন। তাই আর তিনি কন্যার বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেননি। দ্বিতীয় মত হল, বড়োপিসিমা নিজেই নাকি বলেছিলেন, শিবঠাকুরই তাঁর পতিদেবতা। তাই কোনো মানুষের সঙ্গে বড়োপিসিমা তাঁর বিয়ে দিতে বারণ করেছিলেন | বড়ো বাড়ির লোকেরাও তেমনটাই বিশ্বাস করে।

, বড়োপিসিমার বাড়িতে অনেক প্রকারের চাল মজুত করা ছিল। নিরামিষ ডাল ও তরকারির সঙ্গে খাওয়া হত ঝিঙেশাল চালের ভাত | মাছ রান্না হলে রামশাল চালের ভাত করা হত। বড়োবাবু খেতেন কনকপানি চালের ভাত। মেজো এবং ছোটো ছেলে বারোমাস পদ্মজালি চালের ভাত খেত। এ ছাড়া, রাঁধুনি ও পরিচারিকাদের জন্য রান্না হত সাধারণ মোটা-সাপ্‌টা চাল। অর্থাৎ চরিত্রভেদে এবং ব্যঞ্জনভেদে সেখানে আলাদা আলাদা চালের ভাত রান্না হত।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে ঝড়জল-বন্যার যে রাত উচ্ছবকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল, সেদিন সন্ধ্যাতেই অনেকদিন পর সে সপরিবারে পেট পুরে খেয়েছিল। খেতে খেতে চল্গুনীর মা বলেছিল যে, দেবতার গতিক ভালো নয়। নৌকা নিয়ে যারা বেরিয়েছিল, তাদের নৌকা-সহ ডুবে মরে যাওয়ার আশঙ্কাও সে প্রকাশ করেছিল। এরপরই শুরু হয় প্রবল ঝড়বৃষ্টি। ঝড়বৃষ্টিতে উচ্ছবদের কাঁচা বাড়ির মাঝ-খুঁটিটি 'মাতাল আনন্দে টলছিল' ধনুষ্টংকার রোগীর মতো। তাই উচ্ছব সর্বশক্তিতে ঘরের মাঝখানের খুঁটিটা মাটির দিকে চেপে ধরে ছিল। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল যা বসুন্ধরা যেন সেই খুঁটি রাখতে
চাইছেন না, ঠেলে বের করে দিতে চাইছেন। তাই ভয়ে ভগবানের নাম নিতে থাকে সে। অন্যদিকে, ছেলেমেয়েকে জাপটে ধরে তার বউ ঠান্ডায় এবং ভয়ে কাপতে থাকে। এ সময়েই হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে উচ্ছব দেখতে পায় মাতাল মাতলা নদীর সফেন জল বাতাসের তোড়ে দ্রুত ছুটে আসছে। পরে একসময় জল নেমে গেলেও উচ্ছবের ঘরের সব কিছু এবং তার পরিবারকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই জল। বানের জলে ভেসে যাওয়া উচ্ছব গাছে বেধে কোনোক্রমে প্রাণে বাঁচে। এভাবে ঝড়জল-বন্যার সেই রাত উচ্ছবের জীবনে সর্বনাশ ডেকে এনেছিল।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে উচ্ছব নাইয়া ছিল গ্রামের এক ভূমিহীন কৃষক। সে কাজ করত সতীশ মিস্তিরির জমিতে। বন্যার জলে বাড়িঘর ও সংসার ভেসে যাওয়া উচ্ছবের মাঝেমাঝে মনে পড়ে যায় তার কৃষকজীবনের স্মৃতি। প্রাথমিক দিশেহারা অবস্থায় সে শুধুই তার স্ত্রী আর সন্তানদের খুঁজেছিল, কিন্তু তার পরে যখন তার অস্থিরতা কমে, তখনই উচ্ছবের খিদের যন্ত্রণা তীব্রতর হয়ে ওঠে। কর্মজীবনের কথা, ফসল ফলানোর স্মৃতি, তখনকার উদ্‌বেগ আর অনিশ্চয়তার স্মৃতি মনের মধ্যে ভিড় করে আসে তার। মাথার ভেতরটা তার দপ দপ করতে, কোনো কথা গুছিয়ে ভাবতে পারে না সে। কী যে হয়ে গেল তার কূলকিনারা পায় না সে। কোনো কিছু ভাবতে গেলেই তার মনে হয় ধানের গোছা হওয়ার আগেই ধানগাছের সবুজ রং চলে যাচ্ছে। কার্তিক মাসেই ধান খড়ে পরিণত হয়ে গেল। এসব দেখে মাথায় হাত পড়ে উহবের। সে দেখল যে সতীশ মিস্তিরির হরকুল, পাটনাই এবং মোটা—এই তিনপ্রকার ধানেই মড়ক লেগেছে। সতীশ মিস্তিরির জমিতেই তো বছরের কমাস কাজ করে উচ্ছব। তাই উচ্ছব সতীশের খেতে হওয়া ধানের দশা দেখে কাঁদতে থাকে। সাধনবাবু তাকে মনিবের ধান নষ্ট হওয়ায় তার কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করে। উচ্ছব তার উত্তরেই সাধনবাবুকে বলে যে, লক্ষ্মীর আবাহনের আগেই তার বিসর্জন হয়ে যাচ্ছে বলে সে কাঁদছে, কারণ গ্রামের মানুষদের কাছে তো ফসলই লক্ষ্মী।

মহাশ্বেতা দেবীর ‘ভাত' ছোটোগল্পে আমরা দেখি, দুর্যোগের দিন সন্ধ্যাবেলায় চরুনীর মা খেতে খেতে বলছিল যে, দেবতার গতিক ভালো নয় । নৌকা নিয়ে যারা বেরিয়েছিল, নৌকা-সহ তাদের ডুবে মরার আশঙ্কাও সে প্রকাশ করেছিল। এরপরই শুরু হয় প্রবল ঝড়-বৃষ্টি। সেই দুর্যোগে উচ্ছবদের কাঁচা বাড়ির মাঝখানের খুঁটিটি ‘মাতাল আনন্দে টলছিল' ধনুষ্টংকার রোগীর মতো। তাই ঘরের মাঝখানের খুঁটিটা উচ্ছব মাটির দিকে সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরেছিল এবং ভয়ে ভগবানের নাম নিচ্ছিল। অন্যদিকে, ছেলেমেয়েদের জাপটে ধরে তার বউ ঠান্ডায় আর ভয়ে কাঁপছিল। এসময় হঠাৎ বিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে উচ্ছব দেখে, মাতাল মাতলা নদীর সফেন জল বাতাসের তোড়ে দ্রুত ছুটে আসছে নিমেষের মধ্যে সেই বানের জল উচ্ছবের বউ-ছেলেমেয়েকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় গাছে বেঁধে কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে যায় উচ্ছব।

→ ঘটনার আকস্মিকতায় সাময়িকভাবে উচ্ছবের বুদ্ধি লোপ পায়। বউ ছেলেমেয়ে-সহ সবকিছু পাবার আশায় শুনসান বাড়ি ছেড়ে তাই সে নড়ে না। লঙ্গরখানায় দেওয়া খিচুড়ি তাই তার খাওয়া হয় না। কয়েকদিন পর সরকার শুকনো চাল দিলে দীর্ঘদিন যাবৎ উপোসি উচ্ছব তা চিবিয়েই কয়েকদিন কাটায় | এরপর সে ভাত খাওয়ার জন্য পাগল হলেও কেউ তাকে ভাত দেয় না। এ সময় মাঝে-মাঝেই তার মনে পড়ে সেই দুর্যোগের রাতটার কথা। তার মনে হয়, দীর্ঘদিন ধরে ভাত না খেয়ে সে ভূত হয়ে যাচ্ছে, ভাত খেলেই সে পুনরায় মানুষ হবে এবং বউ-ছেলেমেয়ের দুঃখে কাঁদতে পারবে। তাই কয়েকদিন পেট পুরে ভাত খেতে সে কলকাতা রওনা হয় ।

এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে উচ্ছব নাইয়া মন্তব্য করেছে যে, সতীশবাবু ভাত না খেতে পারার জ্বালা বুঝতে পারবে না।

» সতীশবাবু অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। উচ্ছবদের মতো নদীর পাড়ে তার বাড়ি নয় আর মেটে ঘরেও সে থাকে না। প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে তার পাকা বাড়ি তাই ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই। এ ছাড়া ধান, চালও সে পাকা ঘরে রেখেছে। ফলে চোর ডাকাতের পক্ষেও তা চুরি করা সম্ভব নয়। দেশজুড়ে যখন দুর্যোগ চলছিল, লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল, তখনও সতীনবাবুর ঘরে রোজ রান্না হয়েছে। তাই ঘরবাড়ি এবং স্ত্রী-পুত্র হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া উচ্ছবদের মতো হতদরিদ্র মানুষের ক্ষুধার জ্বালা সতীশবাবুর মতো নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা লোকেরা কিছুতেই বুঝতে পারবে না। মাতাল মাতলা নদীর আগ্রাসী ঢেউয়ে উচ্ছব ভিটেমাটি, স্ত্রী-সন্তানদের হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। খিদের জ্বালায় সতীশবাবুর কাছে উচ্ছব একদিন ভাতের প্রার্থনা করলে সতীশবাবু তাকে ফিরিয়ে দেয়। উচ্ছবকে খেতে দিলে পঙ্গপালের মতো দলে দলে অভুক্ত মানুষ তার কাছে এসে জড়ো হবে। সতীশবাবু তাই উচ্ছবকে জানায় যে, ভগবানের মারের হাত থেকে সে উচ্ছবকে বাঁচাতে পারবে না। এর কিছুদিন পরই সতীশবাবু তার ভাগচাষি, অভাগা উচ্ছব সম্বন্ধে মন্তব্য করে। যে, উচ্ছবের মতিভ্রম হয়েছে। বউ সন্তানদের অপঘাতে মৃত্যু হলে মানুষ যেখানে শোকে পাগল হয়ে যায়, সেখানে উচ্ছব 'ভাত ভাত' করে মরছে। সতীশবাবু উচ্ছবের সঙ্গে এমনই অমানবিক আচরণ করেছিল।

এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর ভাতা ছোটোগল্প থেকে নেওয়া আলোচ্য উক্তিটিতে উচ্ছব নাইয়ার দেহের ক্ষমতার অভাবের কথা বলা হয়েছে।

* পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এলাকায় মাতলা নদীর তীরবর্তী কোনো এক অঞ্চলে স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভরা সংসার ছিল উচ্ছাবের। কিন্তু একদিন শীতের রাতে সেখানে প্রবল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। মাতাল মাতলার জল ভাসিয়ে নিয়ে যায় উচ্চবের ঘরবাড়ি এবং স্ত্রী সন্তানদের । পরদিন সকাল থেকে উদগ্রীব হয়ে উচ্ছব খুঁজে বেড়াতে থাকে তার হারিয়ে যাওয়া বউ এবং ছেলেমেয়েকে। ঘটনার আকস্মিকতায় শোকে পাগল হয়ে যায় উচ্ছব। নিজের পরিবারকে হয়রান হয়ে খোঁজার জন্য লঙ্ঘরখানা থেকে দেওয়া খিঁচুড়িও তার আর খাওয়া হয় না। তারপর যেদিন সে স্বাভাবিক হয়, সেদিন থেকে খাবার দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কিছুদিন সরকার প্রদত্ত কাঁচা চাল জল দিয়ে চিবিয়ে খেলেও ভাতের অভাবে উচ্ছবের শরীর ক্লান্ত, দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর ওপর স্ত্রী সন্তানদের হারিয়ে মানসিকভাবে সে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, তার শারীরিক সক্ষমতা এই ঘটনায় অনেকটা হ্রাস পেয়েছিল। তাই কলকাতায় গিয়ে গ্রামতুতো বোন বাসিনীর মনি বাড়িতে সে পেটভরে ভাত খাওয়ার আশাতেই অনেক কষ্টে কাঠ কাটার কাজটা করতে পেরেছিল।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্প থেকে নেওয়া আলোচ্য উক্তিটি করেছে উচ্ছব নাইয়া।

"" মাতলা নদীর বন্যায় স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের হারিয়ে শোকে পাগল উচ্ছব বেশ কিছুদিন অভুক্ত থাকার পর ভাতের আশায় চলে আসে তার গ্রামতুতো বোন বাসিনীর মনিবের বাড়ি কলকাতায়। সেখানে ভাত খাওয়ার বিনিময়ে তাকে সেই বাড়ির বুড়োকর্তার আয়ুবৃদ্ধির জন্য করা হোমযজ্ঞের কাঠ কাটতে হয়েছিল। এদিকে তান্ত্রিকের বিধান অনুযায়ী, যজ্ঞ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু খাওয়া বারণ ছিল। তাই খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়া উচ্ছবও ভাত খেতে পারেনি। মাঝে বাসিনীর দেওয়া ছাতু জল দিয়ে খেয়ে খিদে মেটানোর চেষ্টা করে উচ্ছব। যদিও এই সামান্য খাবারে তার পেট ভরেনি। কাঠ কাটা শেষ করে বাড়ির বাইরে গিয়ে উছর তাই শিবমন্দিরের বারান্দায় বসে। সেখানে শুয়ে ক্লান্তির ভারে ক্ষুধার তাড়নায় এবং স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিতে শোকাতুর হয়ে কাদতে কাদতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। অনেকক্ষণ পর একজনের পায়ের ধাক্কায় ঘুম থেকে জেগে উঠে সে দেখে যে, রাস্তায় বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং বড়ো বাড়ির সামনে লোকের ছোটো ছোটো জটলা। এই দৃশ্য দেখে ঘাবড়ে গিয়ে সে সামনে থাকা জনৈক ব্যক্তিকে প্রশ্নোদ্ধৃত কথাটি জিজ্ঞাসা করেছিল।

এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে আমরা উচ্ছব নামক একটি চরিত্রের সাক্ষাৎ পাই মাতলা নদীর বন্যায় স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের হারিয়ে পাগল হয়ে যাওয়া উচ্ছব বেশ কিছুদিন অভুক্ত থাকার পর ভাতের আশায় তার গ্রামতুতো বোন বাসিনীর মনিবের বাড়ি কলকাতায় চলে আসে। সেখানে ভাত খাওয়ার বিনিময়ে তাকে সেই বাড়ির বুড়োকর্তার আয়ুবৃদ্ধির জন্য করা হোমযজ্ঞের কাঠ কাটতে হয়েছিল। এদিকে তান্ত্রিকের বিধান অনুযায়ী, যজ্ঞ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু খাওয়া বারণ ছিল। তাই খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়া উচ্ছবও ভাত খেতে পারেনি। মাঝে বাসিনীর দেওয়া ছাতু জল খেয়ে খিদে মেটানোর চেষ্টা করে উচ্ছব। যদিও এই সামান্য খাবারে তার পেট ভরেনি। কাঠ কাটা শেষ করে বাড়ির বাইরে গিয়ে উচ্ছব তাই শিবমন্দিরের বারান্দায় বসে। সেখানে শুয়ে ক্লান্তির ভারে, ক্ষুধার তাড়নায় এবং স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিতে শোকাতুর হয়ে কাদতে কাদতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙার পরে সে বুঝতে পারে, বাড়ির কর্তা প্রয়াত হয়েছেন এবং অশৌচ লাগার জন্য রান্না করা সব ভাত বাইরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বহুদিন ধরে ভাত-উপোসী উচ্ছব বাসিনীর ফেলে দিতে আসা ভাতের ডেকচি নিয়ে হনহনিয়ে খানিকটা হেঁটে, পরে এক দৌড়ে স্টেশনে গিয়ে মনের সুখে ভাত খায় । অনেকদিন পরে আশ মিটিয়ে ভাত খেয়ে স্টেশনেই তৃপ্ত উচ্ছব সেই পেতলের ডেকচিটি জাপটে, তার কানায় মাথা ছুঁয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন ভোরে পুলিশ ঘুমন্ত উচ্ছবকে স্টেশনেই ধরে ফেলে এবং পেতলের ডেকচি চুরির অপরাধে তাকে মারতে মারতে থানায় নিয়ে যায়।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশে থাকা বাদা’ শব্দটির অর্থ হল জেল-জলপূর্ণ নীতু জমি।

→ ঝড়বৃষ্টির যে রাতে উচ্ছব তার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে হারিয়েছিল, সেদিন সন্ধ্যায় উচ্ছব পেট ভরে সপরিবারে ভাত খেয়েছিল। তারপর সর্বস্বান্ত উচ্ছব তার বন্যাবিধবস্ত ভিটেতে উন্মাদের মতো কয়েকদিন পড়ে থাকায় লঙ্গরখানার 'রান্না খিচুড়ি তার খাওয়া হয়নি'। তার যখন সম্বিত ফেরে তখন রান্না খাবার দেওয়া কধ হয়ে গেছে। কাঁচা চাল চিবিয়েই তাই তার দিন কাটতে থাকে। দীর্ঘদিন ভাত না খাওয়া উচ্ছব ভাবে, “পেটে ভাত নেই ব'লে উচ্ছবও প্রেত হয়ে আছে। ভাত খেলে সে মানুষ হবে।” উচ্ছব যার জমিতে কাজ করত, সেই সতীশ মিস্তিরিও যখন তাকে একবারের জন্যও ভাত দিতে অস্বীকার করে, তখন সে ভাতের আকাঙ্ক্ষাতেই কলকাতায় গ্রামতুতো বোন বাসিনীর মনি বাড়িতে আসে। সেখানে পেটভাতের চুক্তিতে কাঠ কাটার কাজে সে লেগে যায় । সুন্দরবনের নোনা জলের বাদার অধিবাসী উচ্ছব দেখে যে, বাসিনীর মনিবদের মিষ্টিজলের বাদায় হওয়া নানাপ্রকার চালে তাদের ঘর ভরে আছে। কিন্তু সেদিনই সে-বাড়ির বুড়োকর্তার মৃত্যু হলে তারা যখন বাড়ির সমস্ত ভাত এবং অন্যান্য রান্না খাবার ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, ত তখন পরিশ্রান্ত, অভুক্ত উচ্ছব আর মাথা ঠিক রাখতে পারে না। বাসিনীর হাত থেকে অশৌচ বাড়ির ভাতের ডেকিটা ছিনিয়ে নিয়ে সে স্টেশনে ছুটে আসে ।

মহাশ্বেতা দেবী সমাজের প্রান্তিক অবহেলিত মানুষদের জীবনের নিপুণ। রূপকার। প্রান্তিক জনসাধারণের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের এই ঘনিষ্ঠতা প্রসঙ্গে লেখিকা বলেছেন—“আমি তাদের কাছে যাই, যাচ্ছিই শুধু নয়, তারা আমার কাছে আসে, থাকে, তাও মাত্র নয়, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে আমি প্রত্যক্ষভাবেই যুক্ত।"

‘ভাত' গল্পের ঘটনা ও চরিত্রগুলিও লেখিকার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তিনি এই গল্পে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের বিপন্নতার ছবি নিপুণতার সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। তুলে ধরেছেন তাদের দুঃখবেদনা, অপমান-লাঞ্ছনা, শোষণ ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথা। তাঁর এই ছোটোগল্পে তিনি উচ্চবর্ণ তথা উচ্চবিত্তদের বিপরীতে সর্বহারা মানুষের জীবন পরম মমতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাদের অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির রোষ। 'উচ্ছব' চরিত্রটি সেই খামখেয়ালি প্রকৃতির অকারণ, চরমতম রোষের শিকার। উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের আচারসর্বস্ব, মানবিকতাহীন মানুষেরা তথাকথিত নীচু শ্রেণির মানুষের প্রতি কী অপরিসীম ঘৃণার মনোভাব পোষণ করে, এমনকি প্রশাসন পর্যন্ত কীভাবে তাদেরই ইশারায় পরিচালিত হয়— গল্পে সেই ছবিই ফুটে উঠেছে আর এরই বিপরীতে সমাজ ও প্রকৃতির বিরূপতায় পর্যুদস্ত মানুষের তীব্র জীবনতৃয়া ও অপরিমেয় প্রাণশক্তির পরিচয়ে তাঁর কাহিনির অবয়ব দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে। একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে কাহিনিটি আবর্তিত হলেও এর আবেদন শাশ্বত ও চিরকালীন।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে ঝড়জল-বন্যার রাতটি উচ্ছবের ঘরের সব কিছু এবং তার পরিবারকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও গাছে বেঁধে কোনোক্রমে বেঁচে যায় সে। জল নেমে গেলে পরদিন সকাল থেকে উচ্ছব সব কিছু ফিরে পাওয়ার ব্যর্থ আশায় কয়েকদিন উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় সাময়িকভাবে উচ্ছবের বুদ্ধি লোপ পায়। ঘরের চালের নীচ থেকে প্রিয়জনদের ডাক শোনার আশায় সে আকুল হয়ে ওঠে। সব কিছু ফিরে পাওয়ার আশায় শুনসান বাড়ি ছেড়ে কয়েকদিন কোথাও না নড়ায় তার কিছু খাওয়াও হয় না। এমনকি, লঙ্গরখানায় দেওয়া খিচুড়িও নয়। তারপর যখন সে খানিকটা স্বাভাবিক হয়, তখন খিচুড়ি দেওয়া বন্ধ করে সরকার শুকনো চাল দিতে থাকে । সেই চালগুলি চিবিয়েই সে কয়েকদিন কাটায়। টানা ব বেশ কিছুদিন ভাত না জোটায় সে ভাত খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়। কিন্তু এর ভার কারে সেই সতীশবাবুও তাকে ভাত দিতে অস্বীকন খানে বসে ডেকিতে হাত ঢুকিয়ে খাবল খাবল ভাত খেতে থাকে সে। সে তাকে এমন সুখ দিতে পারেনি কখনোই। বাস্তবিকই স্বর্গসুখ লাভ করে। এ কারণেই তার তখন মনে হয়, মিঠে জলের বাদার ভাত খেলেই। বাদা' অর্থাৎ 'অন্নের দেশ"-এর খোঁজ পেয়ে যাবে।

তুমি কী বুঝবে সতীশবাবু! নদীর পাড়েও থাক না, মেটে ঘরেও থাক। দেশজোড়া দুর্যোগেও তোমার ঘরে রান্না হয়।” দিনের পর দিন পর ফলে সব হারানো উচ্ছবের মানসিক বিকৃতি ঘটতে থাকে। প্রায়শই নে পড়ে সর্বনাশের রাতটার কথা। তার মনে হয়, দীর্ঘদিন ধরে পেটে পড়ায় সে প্রেত হয়ে যাচ্ছে। ভাত খেলে সে মানুষ হবে এবং তখনই সে ছেলেমেয়ের দুঃখে কাঁদবে।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র উচ্ছব কলকাতায় যে ত কাজের জন্য এসেছিল, সে বাড়ি ছিল তার গ্রামতুতো বোন বাসিনীর নাড়ি। এই বাড়িরই লিভারের ক্যানসারে আক্রান্ত, বিরাশি বছরের ক মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে হোমযজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছিল। কর্তার ছোটোবউমার বাবার পরিচিত এক তান্ত্রিক এই উপলক্ষ্যে সেই ত এসেছিলেন। যজ্ঞের জন্য বেল, ক্যাওড়া, বট, অশ্বত্থ এবং তেঁতুল এ কাঠ আধ মন করে আনা হয়েছিল। সেই আড়াই মন কাঠের প্রতিটি পড় হাত করে কাটতে বলা হয়েছিল উচ্ছবকে। বিড়ালের লোম, শ্মশানের বালি ইত্যাদি নানাপ্রকার জিনিসের ফরমাল ছিলেন তান্ত্রিক। প্রথমে হোমযজ্ঞের আগে রান্না এবং খাওয়া শেষ করার থাকলেও তান্ত্রিক নতুন বিধান দিয়েছিলেন যে রান্না শেষ করলেও হোম  না হলে কেউ খেতে পারবে না। টুকরোগুলি উচ্ছব পাঁচ ভাগে ভাগ করে দালানে রেখে আসার পর য় হোমযজ্ঞ বুড়োকর্তার বাস-ঝি হোমের জোগান দিচ্ছিল । তান্ত্রিক “ওঁ চং ঠং ভো ভো রোগ শুধু শুধু”— মন্ত্র বলে বুড়োকর্তার রোগকে দাঁড় ন, কালো বিড়ালের লোম দিয়ে রোগকে বাঁধেন এবং তারপর কর্তার তিন ছেলের উপস্থিতিতে হোম শুরু করেন। শত উল্লেখ্য, এই হোমযজ্ঞ শুরু হওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই বুড়োকর্তা মারা যান ।

শ্বতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে বিরাশি বছর বয়সে লিভার ক্যানসারে ভ্রান্ত হয়ে বুড়োকর্তা যেদিন মারা যান সেদিনই তাঁকে বাঁচাতে বড়ো -তে হোমযজ্ঞ হচ্ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ির মহিলা এবং পরিচারিকারা বতই কাঁদতে থাকে। বড়োপিসিমা কাঁদতে কাঁদতে তান্ত্রিককে এবং =র ছোটোবউয়ের বাবাকে দোষারোপ করতে থাকেন—“... তোমার টা বেয়াই কি ডাকাতে সন্নেসাঁ আনল গো দাদা! যজ্ঞি হল আর তুমিও ।" তার ধারণা হয়েছিল আটানব্বই বছরের পরিবর্তে বিরাশি বছরেই এর মৃত্যুর কারণ তান্ত্রিকের অক্ষমতা। গল্প ভাত উদ্দেশ্যে কর্মব্যস্ততাও লক্ষ করা যায়। ঠিক হয় যে, বুড়োকর্তার মেয়েরা এবং কীর্তনের দল আসার পর সে রাতেই মৃতদেহ বের করা হবে। পুরোহিতকে বলে প্রয়োজনীয় জিনিসের ফর্ম নেওয়া হয় এবং খই, ফুল, ধুতি, শববস্ত্র ইত্যাদির জোগাড় চলতে থাকে। চন্দন বাটা চলতে থাকে, খাট আনতে একজনকে বাগবাজারে পাঠানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা বোম্বাই খাট এসে যায়। মহিলারা মাঝেমধ্যেই কেঁদে উঠলেও শোকের বিশেষ চিহ্ন দেখা যায় না কারও মধ্যে। বাড়ির উনুন জ্বলবে না বলে রাস্তার দোকান থেকে চা আসতে থাকে। অবশেষে রাত একটার পর বোম্বাই ঘাটে শুইয়ে বৃদ্ধের মৃতদেহ বের করা হয়। পেশাদারি শববাহকরা তা দ্রুতগতিতে শ্মশানে নিয়ে যেতে থাকে। পেছন পেছন দৌঁড়ে যায় কীর্তনের দল। বাড়ির সব রান্না ফেলে দিয়ে ঘরদুয়ার সাফ করা শুরু হয়।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পের 'বড়ো বাড়ির দুই প্রজন্মের দুই কর্তাকেই যেহেতু লেখিকা 'বুড়োকর্তা' বলে অভিহিত করেছেন, তাই বুড়োকর্তার চরিত্র বলতে আমরা জোষ্ঠ বুড়োকর্তা এবং কনিষ্ঠ বুড়োকর্তা— এই দু-জনের চরিত্রই বুঝব।

প্রয়াত জোষ্ঠ বুড়োকর্তা ছিলেন বড়োপিসিমার পিতা। বড়োপিসিমা যখন বিয়ের উপযুক্ত হন, তখন তাঁর মা অর্থাৎ জোষ্ঠ বুড়োকর্তার স্ত্রী মারা যান। শ্রীবিয়োগের পর সংসার দেখার জনাই তিনি তাঁর কন্যার বিয়ে দেননি। তবে, তিনি দূরদর্শী লোক ছিলেন", আর তাঁর জন্যই বর্তমান প্রজন্ম কোনো কাজ না করেও বহাল তবিয়তে খেয়ে-পরে ছিল। তাঁর বাড়ির রাস্তার সবগুলি বাড়িই তিনি শিব, মহেশ্বর, ত্রিলোচন, উমাপতি ইত্যাদি বহু নামে শিবঠাকুরকে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে, তাঁর দৌলতেই আঠারোটা সেবাচ বাড়ি এবং বাদা অঞ্চলের বিস্তৃত, উর্বর জমি বড়ো বাড়ির অধিকারভুক্ত হয়। বড়ো বাড়ির বিশাল বসতবাড়িটা এবং বাড়ির শিব মন্দিরটাও সম্ভবত তিনিই তৈরি করিয়েছিলেন।

জ্যেষ্ঠ বুড়োকর্তার পুত্র হলেন কনিষ্ঠ বুড়োকর্তা, 'ভাত' ছোটোগল্পে যে অশীতিপর বৃদ্ধের মৃত্যু দেখানো হয়েছে, তিনি। চার পুত্র এবং বেশ কয়েকটি কন্যা সন্তানের পিতা ছিলেন এই মানুষটি। বড়োর উমার সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। আশি বছরে পৌঁছেও তিনি বেশ শক্তসমর্থ ছিলেন। কিন্তু হঠা লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বিরাশি বছরে তাঁর মৃত্যু হয়, যদিও তাঁর নাকি আটানব্বই বছর বেঁচে থাকার কথা ছিল। বেশ সমাদরের সঙ্গেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল। গল্পটিতে তাঁর চরিত্র সম্পর্কিত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল বড়োপিসিমা। তাঁর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি হল

ঈশ্বরভক্তি: বড়োপিসিমা হলেন এ গল্পে উল্লিখিত 'বড়ো বাড়ির অবিবাহিতা, প্রৌঢ়া কন্যা। প্রয়াত জোষ্ঠ বুড়োকর্তার যখন স্ত্রীবিয়োগ ঘটে, তখন তিনি সংসার সামলানোর কারণেই তাঁর এই বিবাহযোগ্য কন্যার বিয়ে দেননি। বড়োপিসিমা পিতার এই সিদ্ধান্তে অবশ্য অখুশি ছিলেন না। তিনি শিবকেই পতি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন — “উনি আমার পতি দেবতা।

সংসার-আসবি ও কর্তৃত্বপরায়ণতা: পিতৃবিয়োগের আগে পর্যন্ত বড়োপিসিমা সংসারের হেঁশেল দেখেছেন, ভাড়াটে বাড়িতে মিস্তিরি লাগিয়েছেন এবং তাঁর বাবার সেবা করেছেন। পিতার মৃত্যুর পর বিবাহিত দাদা সংসারের কর্তা হলেও সে-অভ্যাস তাঁর পালটায়নি। এই আধিপত্য থেকেই বাড়ির বউদের তিনি অনায়াসে তাচ্ছিল্য করেন। বড়োবাড়ির এই অনূঢ়া প্রৌঢ়াকে আমরা লুকিয়ে বাদার চাল বিক্রি করে দিতেও দেখি। সামান্য ক্ষোভ থাকলেও এই বৃদ্ধবয়সেও তিনি তাঁর পৈতৃক বাড়ির সব কিছুর দেখভাল করতেন অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে। দাদার শেষযাত্রাকে সুসম্পন্ন করার জন্য সবদিকেই তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল।

সংস্কারাচ্ছন্ন: তাই সংস্কারাচ্ছন্ন এই প্রৌঢ়া তান্ত্রিকের হোমযজ্ঞ করাকে অনুচিত মনে করেননি। যজ্ঞ সত্ত্বেও বুড়োকর্তা মারা গেলে তাঁকে বিষোদ্‌গার করতে দেখা যায় তান্ত্রিক এবং বাড়ির ছোটোবউয়ের বাবার ওপর। কারণ তিনিই এই তান্ত্রিককে নিয়ে এসেছিলেন। এ ছাড়া, এ গল্পের প্রধান চরিত্র উচ্ছবকে তিনিই বাড়িতে কাজে লাগিয়েছেন। সুতরাং, বড়োপিসিমা এ গল্পের একটি উল্লেখযোগ্য এবং সক্রিয় চরিত্র।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র উচ্ছব মাতলা নদীর পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সুন্দরবন অঞ্চলের এক দরিদ্র গ্রামে বাস করত। এ গল্পে এই গ্রামের সাধন দাশ, মহানাম শতপথি ও সতীশ মিস্তিরি র পরিচয় পাওয়া যায়।

সাধন দাশ উচ্ছবের বিশেষ পরিচিত ছিলেন। ঝড়বৃষ্টির রাতে ধনে-জনে সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া উচ্ছব যখন উন্মাদের মতো বউ-ছেলেমেয়েকে খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল, তখন সাধন দাশই তার সংবিৎ ফেরানোর উদ্দেশ্যে তাকে জানান— “তোরেও তো টেনে নেচ্ছেল। গাছে বেধে রয়ে গেলি।” এর কয়েকদিন পর উচ্ছব যখন কলকাতা যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়, তখন সাধন দাশ "সরকার ঘর কত্তে খরচা দেবে” জানিয়ে তাকে গ্রাম ত্যাগ করতে নিষেধ করেন। সুতরাং সাধন ছিলেন উচ্ছবের শুভাকাঙ্ক্ষী। মহানাম শতপথি ছিলেন ব্রাহ্মণ। চারপাশের কয়েকটি গ্রামের বন্যা-মৃতদের শ্রাদ্ধের দায়িত্ব ছিল তাঁর উপরই। জোতদার সতীশ মিস্তিরির জমিতেই বছরের কয়েকমাস চাষের কাজ করত উচ্ছব। কিন্তু ঝড়জলের রাতে সর্বস্বান্ত, উন্মাদপ্রায় হয়ে যাওয়া উচ্ছব একদিন তাঁর কাছে ভাত খেতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। উচ্ছবকে তিনি জানান, "তোকে এগলা দিলে চলবে? তাহলেই পালে পালে পঙ্গপাল জুটবে নে?" সুতরাং, এই ধনী ব্যক্তির দয়া-মায়া-মমতা বলে কিছুই ছিল না।

মহাশ্বেতা দেবীর "ভাত' ছোটোগল্পে ভাতের প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে। ঝড়বৃষ্টির যে রাতে উচ্ছবের জীবনে সর্বনাশ নেমে এসেছিল, সেদিন সন্ধ্যায় উচ্ছব পরিবার-সহ পেট ভরে ভাত খেয়েছিল। তারপর সব কিছু হারিয়ে কয়েকদিন সে উন্মাদের মতো প্রিয়জনদের সাড়া পাওয়ার আশায় নিজভিটায় পড়েছিল। তাই লঙ্গরখানার রান্না খিচুড়ি তার খাওয়া হয়নি।' রান্না খিচুড়ি দেওয়া বন্ধ হয়ে গেলে এরপর কয়েকদিন তাকে কাঁচা চাল চিবিয়েই কাটাতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভাত না খেতে দেখে নিে ভাবে, "পেটে ভাত নেই বলে ভাবও লেত হয়ে আছে। ভাত খেলে সে মানু হবে। তখন বউ ছেলে মেয়ের জন্য কাদবে । যার জমিতে কাজ করে, সেই সতীশ মিষ্টিরি যখন তাকে একদিনের জন্য তখন সে পেট ভরে ভাত খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাতের কলকাতায় থাে বাসিনীর মনি বাড়িতে আসে। সারাদিন ধরে ভাতের আশায় সে অমানুষিক পরিশ্রম করে বাড়ির কর্তার সুস্থতার উদ্দেশ্যে করা হোমযজ্ঞের কাঠ কাঠে। তার মনে পড়ে শৈশবে শোনা ঠাকুমার কথা - "কন্তু সেদিনই বুড়োকতার মৃত্যু হয়। শব বেরোনোর রান্না খাবার ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা হলে আর মাথা ঠিক রাখতে পারে না অভুক্ত উচ্ছব। বাসিনীর হাত থেকে অশৌচ বাড়ির ভারে বড়ো ডেকচি ছিনিয়ে নিয়ে তাই সে স্টেশনে ছুটে আসে এবং প্রাণ ভরে তার শেষে সেই ডেকচিটা জড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে পেতলের ডেকচি চুরির অপরাধে থানায় যেতে হয় তাকে। সুতরাং, এ কাহিনিতে ভাতের প্রসঙ্গ শুধু বারবার আসেইনি, এই প্রসঙ্গ গল্পটিকে নিয়ন্ত্রণও করেছে। 'আসন্ন বাদ্য অর্থাৎ অন্নের দেশ দেখার আকুলতা আর তার ব্যর্থতাই গল্পের মূল বিষয় হয়ে থাকে।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে উল্লিখিত বড়ো বাড়ির বড়োপিসিমা চিরকাল সংসারের হেঁশেল দেখেছেন, ভাড়াটে বাড়িতে মিস্তিরি লাগিে এবং তাঁর বাবার সেবা করেছেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর দাদার সংসারেও তাঁর ভূমিকা বিশেষ পালটায়নি।

উচ্ছবকে কাজ করতে দেখে বিরক্ত হয়ে বড়োবউ বামুন ঠাকুরকে জিজ্ঞা করে যে কোথা থেকে তার আগমন। এর উত্তরে বড়োপিসিমা মাঝের সঙ্গেই জানান যে, ঝড়জলে দেশ ভেসে যাওয়ায় বাসিনাই তার এই পরিচিত ব্যক্তিকে কাজের জন্য এই বাড়িতে এনেছে। বড়োবউমা উচ্ছবের চোরার সমালোচনা করলে তাকে বলেন যে, ময়ূর ছাড়া কার্তিক ঠাকুর নিশ্চয়ই কাজের জন্য আসবে না। বড়োবউকে উদ্দেশ্য করে কেনা চাল নয়, বাদা থেকে চাল আসছে। তা দিতেও আঙুল বেঁকে যাচ্ছে?" '—মন্তব্যে তাঁর তাঁর কর্তৃত্ববোধ প্রকাশ পায়। পরে তিনি কর্মরত উচ্ছবকে দেড় হাত মাপমতো কাঠ কাটার জন্য তাড়াও দিয়েছেন। দাদার মৃত্যু হলে সৎকারের জোগাড় এবং শোকপ্রকাশে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন। হোমযজ্ঞ চলাকালীন বাড়ির বড়ো, মেজো এবং ছোটো ছেলে উঠে যাওয়ার জন্যই যে দাদার প্রাণরক্ষার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে—এ কথাও চেঁচিয়ে বলতে তাঁর কোথাও আটকায়নি। এমনই ছিল তাঁর দাপট। তাই, কীর্তনের দল এলেই মৃতদেহ বেরোবে- বড়ো ভাইপোর এ কথা শুনে বড়োপিসিমাই তাঁর প্রতিবাদ করে জানান যে, তাঁর ভাইঝিরা এলেই শবদেহ বেরোবে। এরপর মৃতদেহ বেরিয়ে গেলে তিনিই বাসিনীর সাহায্যে রান্না করা সব অশুচি খাবার ফেলার ব্যবস্থা করেন। 'ভাত' ছোটোগল্পে বড়োপিসিমার কর্তৃত্ব এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাতা ছোটোগল্পের উৎসব নাইয়া নিম্নবর্গীয় সমাজব্যবস্থার একজন প্রতিনিধি । ভাগ্যের ফেরে মাতলার বন্যায় বউ-ছেলেমেয়েকে হারায় সে। ভেসে যায় তার মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকুও। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোধ উৎসবের জীবন থেকে সব কিছু কেড়ে নিলেও কেড়ে নিতে পারেনি তার আদিম প্রবৃত্তিকে, যে প্রবৃত্তির নাম খিদে। তাই প্রিয়জন হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তার মধ্যে জেগে ওঠে ভাতের জন্য হাহাকার | হাড়াতে উৎসবের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসার আগে পর্যন্ত তার মধ্যেও কোমলতার স্পর্শ ছিল। তাই সতীশ মিস্তিরির তিন ধানে মড়ক লাগলে ধানের প্রতি পরম মমতায় কেঁদে ভাসায় এই গরিব ভাগচাষি। ভেসে যাওয়া ঘরের চালের নীচ থেকে পরিচিত স্বর শোনার আশায় নাওয়াখাওয়া ভুলে বসে থাকে উৎসব | অসম্ভব জেনেও পাগলের মতো বলতে থাকে, “রা কাড় অ মুনীর মা!"

পরম আকাঙ্ক্ষিত ভাতের স্পর্শে 'প্রেত' উচ্ছবের ভিতর থেকে জেগে ওঠে “মানুষ' উৎসব। তাই বড়ো বাড়ি থেকে নিয়ে আসা ডেকচির ভাত খেতে খেতে সে মনে মনে সেই ভাত তুলে দেয় বউ ছেলেমেয়ের মুখে... “চল্গুনী রে! তুইও খা, মুনীর মা খাও, ছোটো খোকা খা, আমার মধ্যে বসে তোরাও যা!” আসলে উৎসবের মতো বঞ্চিত, প্রান্তিক মানুষদের সমাজজীবনে ব্যক্তিনামেরও কোনো মূল্য নেই। তাই আমরা দেখি তার নিরুৎসব জীবনে সে আর উৎসব থাকেনি, তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্ছব নাইয়া।

মহাশ্বেতী দেবীর ‘ভাত' ছোটোগল্প থেকে সংকলিত এই উদ্ধৃতিতে উল্লিখিত বাসিনী হল বড়ো বাড়ির পরিচারিকা ।

→ বাসিনী তার গ্রাম সম্পর্কিত দাদা উচ্ছবকে তার মনিবের বাড়িতে এনেছে। → ‘ভাত' ছোটোগল্পের প্রধান চরিত্র উচ্ছবের জীবনে এক ঝড়বৃষ্টির রাতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। যেদিন মাতলার বানে তার বউ-ছেলেমেয়ে ভেসে যায়। সেদিন সন্ধ্যাতেই উচ্ছব বউ-ছেলেমেয়ে সহ পেট পুরে ভাত খেয়েছিল বহুদিন পর। সেই বন্যার রাতের পর জল নেমে গেলেও কয়েকদিন ধরে সে তার ভিটেয় পড়েছিল প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আশায়। ফলে লঙ্গরখানার ‘রান্না খিচুড়ি তার খাওয়া হয়নি' | রান্না খিচুড়ি দেওয়া বন্ধ হয়ে গেলে তার সংবিৎ ফিরে আসে। ফলে কয়েকদিনের উপবাসের পর সে বেশ কয়েকদিন কাঁচা চাল চিবিয়েই কাটিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ভাত না খেতে গেয়ে দিশেহারা উচ্ছব ভেবেছিল, “পেটে ভাত নেই বলে উচ্ছবও প্রেত হয়ে আছে । ভাত খেলে সে মানুষ হবে। তখন বউ ছেলে মেয়ের জন্য কাঁদবে।” যার জমিতে সে কাজ করে সেই সতীশ মিস্তিরি যখন তাকে একদিনের জন্যও ভাত খেতে দিতে অরাজি হয়, তখন সে পেট ভরে ভাত খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাতেই গ্রামতুতো বোন বাসিনীর কলকাতাস্থ মনিবের বাড়িতে আসে। সুন্দরবনের বাদায় বাস করা উচ্ছবের একারণেই ‘ভাতের আহিংকে এতখানি' ছিল।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাতা একটি বড়ো আকারের ছোটোগল্প। ঝড়জল বন্যার এক রাতে সুন্দরবনের ভাগচাষি উচ্ছব নাইয়ার ঘরবাড়ি এবং স্ত্রী-সন্তান বানের জলে ভেসে যায়। প্রাথমিকভাবে শোক ও তারপর খিদের তাড়না তাকে পাগল করে তোলে। তার চাষ করা জমির মালিক সতীশ মিস্তিরির কাছে ভাতের প্রার্থনা করে ব্যর্থ হয়ে ক-দিন পেটপুরে ভাত খাওয়ার আশায় সে কলকাতায় চলে যায়। গ্রামতুতো বোন বাসিনীর মনি বাড়িতে গিয়ে পেটপুরে ভাত খাওয়ার চুক্তিতে সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সে। কিন্তু বিকেলে সেই ‘বড়ো বাড়ি'র বৃদ্ধের মৃত্যু ঘটলে দীর্ঘদিন ধরে ভাত না খাওয়া উচ্ছব প্রমাদ গোনে। তাই যখন সেই অশৌচ বাড়ির রাধা ভাত ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয়, তখন মরিয়া উচ্ছব বাসিনীর হাত থেকে ভাতের একটা পেতলের ডেকচি নিয়ে এক দৌড়ে স্টেশনে চলে যায়। সেই ভাত পেটপুরে খেয়ে সেখানেই সে শুয়ে পড়ে। ভোরে পেতলের ডেকচি চুরির অপরাধে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। যে বাদার জমির বিপুল ও উন্নত ধান বড়ো বাড়ি'কে বড়ো করে তুলেছিল, সেই 'আসল বাদাটার খোঁজ', কধ্যা বাদার অধিবাসী উচ্ছবের আর পাওয়া হয় না।

সুতরাং, উচ্ছবের ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করেই সুন্দরবন ও কলকাতার পটভূমিতে 'ভাত' ছোটোগল্পের মাত্র কয়েকদিনের কাহিনি গড়ে উঠেছে। এ পরে তাই স্থান-কাল-ঘটনাগত ঐক্য বজায় রাখা হয়েছে। তা ছাড়া, ঘটনার ঘনঘটা', ‘তত্ত্ব', বা ‘উপদেশ ও এখানে অনুপস্থিত। উচ্ছব এবং আরও চার পাঁচটি চরিত্র নিয়েই গল্পটি বিস্তার লাভ করেছে। সমাপ্তিতে উচ্ছবের জেলে যাওয়া এবং আসল বাদাটার খোঁজ না পাওয়ার মধ্যে যেমন চমক রয়েছে, তেমন তা গল্পটিকে চরম ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেও দিয়েছে। 'ভাত' তাই নিঃসন্দেহে একটি শিল্পসার্থক ছোটোগল্প |

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পের মুখ্য চরিত্র উচ্ছব নাইয়া তার গ্রাম সম্পর্কিত বোন বাসিনীর প্রতি এরকম আচরণ করেছিল।

পরে বড়োপিসিমা নির্দেশ দেন বাড়ির সব রান্না ফেলে দিয়ে আসার জন্য। আর মুহূর্তের মধ্যেই মরিয়া উচ্ছব স্থির করে নেয় সে কী করবে। সে সুন্দরবন বুড়োকর্ত্রীর মৃত্যুর পরে তার মৃতদেহ শ্মশানের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার থেকে শুধুমাত্র খাবারের সন্ধানে শহরের বড়ো বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল। কিন্তু বুড়োকর্তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হোমযজ্ঞ শেষ না হলে খাওয়া হবে না—এই যুক্তিতে সে তার চরম আকাঙ্ক্ষিত খাবার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। এর মধ্যে সে নানারকম চালের এবং খাবারের গল্প শুনেছে ও দেখেছে। ফুটন্ত ভাতের গন্ধে সে উতলা হয়েছে কিন্তু ভাত জোটেনি তার। তাই বাসিনী ভাত ফেলতে গেলে লক্ষ্যে স্থির উচ্ছব ভাতের বড়ো ডেকচিটা নিজেই নেয় এবং দূরে ফেলে দিয়ে আসার কথা বলে। ডেকচি নিয়ে উচ্ছব দ্রুত হাটতে, তারপর দৌড়োতে থাকে। যে বাদার ভাতের জন্য তার দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা, সেই ভাত এখন তার হাতের মুঠোয়। এই সময়েই যখন বাসিনী তাকে সেই 'অশুচ বাড়ির ভাত খেতে নিষেধ করে, তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে উচ্ছবের পক্ষে। সে ফিরে দাঁড়ায় এবং কামটের মতো হিংস্র চোখে বাসিনীর দিকে তাকায়। তার দাঁত বের করা মুখভঙ্গি কামটের মতোই হিংস্র লাগে বাসিনীর। আসলে খিদের মতো আদিম প্রবৃত্তি মানুষকে পশুর গল্প ভাত মতোই করে তোলে। তাই অভুক্ত উচ্ছর উদ্বৃত্ত ভাত খাওয়ার জন্য পশুর মতোই মরিয়া হয়ে উঠেছিল।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে বড়োপিসিমা ছিলেন গল্পে উল্লিখিত শহরের বড়ো বাড়ির সবথেকে সক্রিয় চরিত্র তাঁর বিয়ে হয়নি, এই বিয়ে না হওয়ার দুটি ব্যাখ্যা গল্পে পাওয়া যায়। যারা বাইরের লোক তারা বলে যে, বাড়ির জ্যেষ্ঠ বুড়োকর্তার স্ত্রীবিয়োগের পর সংসার চালানোর জন্যই বড়োলোক হওয়া সত্ত্বেও তিনি মেয়ের বিয়ে দেননি কিন্তু সেই বড়ো বাড়ির থেকে প্রচারিত হয়েছিল যে, বড়োপিসিমার আসলে বিয়ে হয়েছিল ঠাকুরের সঙ্গে এবং তিনি হলেন দেবতার সেবিকা। বড়োপিসিমাও নিজেকে শিবের স্ত্রী ভাবতেই পছন্দ করতেন— “উনি আমার পতিদেবতা। মানুষের সঙ্গে বিয়ে দিও না।” অবিবাহিত বড়োপিসিমাই ছিলেন বাড়ির সর্বময়ী কত্রী ।

মহাশ্বেতা দেবীর 'ভাত' ছোটোগল্পে উল্লিখিত বড়ো বাড়ির বড়োপিসিমা চিরকাল সংসারের হেঁশেল দেখেছেন, ভাড়াটে বাড়িতে মিস্তিরি লাগিে এবং তাঁর বাবার সেবা করেছেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর দাদার সংসারেও তাঁর ভূমিকা বিশেষ পালটায়নি।

উচ্ছবকে কাজ করতে দেখে বিরক্ত হয়ে বড়োবউ বামুন ঠাকুরকে জিজ্ঞা করে যে কোথা থেকে তার আগমন। এর উত্তরে বড়োপিসিমা মাঝের সঙ্গেই জানান যে, ঝড়জলে দেশ ভেসে যাওয়ায় বাসিনাই তার এই পরিচিত ব্যক্তিকে কাজের জন্য এই বাড়িতে এনেছে। বড়োবউমা উচ্ছবের চোরার সমালোচনা করলে তাকে বলেন যে, ময়ূর ছাড়া কার্তিক ঠাকুর নিশ্চয়ই কাজের জন্য আসবে না। বড়োবউকে উদ্দেশ্য করে কেনা চাল নয়, বাদা থেকে চাল আসছে। তা দিতেও আঙুল বেঁকে যাচ্ছে?" '—মন্তব্যে তাঁর তাঁর কর্তৃত্ববোধ প্রকাশ পায়। পরে তিনি কর্মরত উচ্ছবকে দেড় হাত মাপমতো কাঠ কাটার জন্য তাড়াও দিয়েছেন। দাদার মৃত্যু হলে সৎকারের জোগাড় এবং শোকপ্রকাশে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন। হোমযজ্ঞ চলাকালীন বাড়ির বড়ো, মেজো এবং ছোটো ছেলে উঠে যাওয়ার জন্যই যে দাদার প্রাণরক্ষার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে—এ কথাও চেঁচিয়ে বলতে তাঁর কোথাও আটকায়নি। এমনই ছিল তাঁর দাপট। তাই, কীর্তনের দল এলেই মৃতদেহ বেরোবে- বড়ো ভাইপোর এ কথা শুনে বড়োপিসিমাই তাঁর প্রতিবাদ করে জানান যে, তাঁর ভাইঝিরা এলেই শবদেহ বেরোবে। এরপর মৃতদেহ বেরিয়ে গেলে তিনিই বাসিনীর সাহায্যে রান্না করা সব অশুচি খাবার ফেলার ব্যবস্থা করেন। 'ভাত' ছোটোগল্পে বড়োপিসিমার কর্তৃত্ব এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।