Chapter-20, বাঙালির চলচ্চিত্রের ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

বাংলা চলচ্চিত্র বিকাশের ক্ষেত্রে যাঁর নাম সর্বাগ্রে উল্লেখিত হয় তিনি জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান। তিনি বোম্বাইতে এলফিনস্টোন ড্রামাটিক ক্লাবে সহযোগীর কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় এসে বায়োস্কোপ দেখানোর কাজ শুরু করেন।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানির সুসময়ে ম্যাডান সাহেব দুহাজার টাকা ধার করে কলকাতা ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে বায়োস্কোপ প্রদর্শন শুরু করেন। ব্যাবসায়িক এবং সাংগঠনিক বুদ্ধিবলে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বায়োকোপের জগতে প্রবাদপুরুষে পরিণত হন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি 'এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস নামে একটি স্থায়ী চিত্রগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দি ভাষায় তৈরি 'কালীয় মর্দনা ফিল্মের স্বত্ব কিনে ম্যাডান তাতে বাংলা সাব-টাইটেল জুড়ে প্রচুর টাকা উপার্জন করেন। এরপর ম্যাডান কোম্পানির ম্যানেজার রুস্তমজি ধোতিয়ালা ভারতীয় ছবি তৈরির পরিকল্পনা করেন। তিনিই হলেন পরিচালক। জ্যোতিষচন্দ্র সরকার হলেন সিনেমাটোগ্রাফার। তৈরি হল হিন্দি ভাষায় 'মহাভারত', 'বিন্নু অবতার', 'নল-দময়ন্তী', 'ধ্রুবচরিতা। এই সময় প্রিয়নাথ গাঙ্গুলির প্রস্তাবে ম্যাডান বাঙালি অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে ছবি তৈরি শুরু করে। পরিচালক রুস্তমজি ধোতিয়ালার হাতে তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা কাহিনিচিত্র 'বিশ্বয়ঞ্জাল' ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর মুক্তি পায়। তৎকালীন অনেক সৃজনশীল মানুষ ম্যাডান কোম্পানির সংস্পর্শে আসেন। যেমন—মধু বসু, শিশিরকুমার ভাদুড়ি, নরেশচন্দ্র মিত্র প্রমুখ। এঁদের সাহায্যে ম্যাডান কোম্পানি প্রায় শতাধিক নির্বাক চিত্র নির্মাণ করে। যেমন— 'জয়দেব', 'কৃষ্ণকান্ডের উইল', 'কপালকুণ্ডলা', 'সরলা', 'গিরিবালা', 'নৌকাডুবি', 'দুর্গেশনন্দিনী' প্রভৃতি। কাননদেবী, অমৃতলাল বসু, অহীন্দ্র চৌধুরী, ইন্দু মুখার্জি, লীলাবতী প্রমুখ ম্যাডানের ছবিতে অভিনয় করেছেন। বর্তমান ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োটি তৈরি করে ম্যাডান কোম্পানি। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ম্যাডান কোম্পানির উদ্যোগেই তৈরি হয় প্রথম বাংলা সবাক চিত্র 'জামাইষষ্ঠী'।

বাংলা-হিন্দি সবাক চিত্রের স্বর্ণযুগের সূচনা স্যার বি এন সরকার প্রতিষ্ঠিত "নিউ থিয়েটার্স'-এর আমল থেকে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ধীরেন্দ্রনাথ সরকার 'চিত্রা' সিনেমা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩১ এ নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও থেকে মুক্তি পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র শরৎচন্দ্রের 'দেনাপাওনা'। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের নৃত্যনাট্য 'নটীর পূজাকে ক্যামেরাবন্দি করা হয় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে। এরপরে পরপর 'পুনর্জন্ম', 'চিরকুমার সভা', 'পল্লীসমাজ' ইত্যাদি মুক্তি পায়। যদিও নিউ থিয়েটার্স প্রথম খ্যাতি পায় দেবকী বসুর 'চণ্ডীদাস' সিনেমাটির জন্য। বাংলা সিনেমায় প্রথম আবহসংগীতের ব্যবহার করা হয় এখানেই। নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও প্রযোজিত প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ও অভিনীত 'দেবদাস' ছবিটি তুমুল জনপ্রিয়তা। পায় | ছবিটির হিন্দি রূপান্তরে মুখ্য চরিত্রে ছিলেন কুন্দনলাল সায়গল | একই বছরে এখান থেকে মুক্তি পাওয়া 'ভাগ্যচক্র' ছবিতে পরিচালক নীতিন বসু প্রথম প্লে-ব্যাকের প্রচলন করেন এবং দেবকী বোসের 'সীতা' ছবিটি প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করে। বম্বে টকিজের ছবিতে নেপথ্য সংগীত চালু হবার আগে পর্যন্ত বিভিন্ন পরিচালক অশোক কুমার, দেবিকা রানি, মুমতাজ আলিকে দিয়ে গান গাওয়াতেন। কে. এল. সায়গল, প্রমথেশ বড়ুয়া, পাহাড়ী সান্যাল, অসিতবরণ, ছবি বিশ্বাস, কানন দেবীর মতো অভিনেতা, কিংবা রাইচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজ মল্লিকের মতো সংগীত পরিচালককে বাংলা সিনেমায় নিউ থিয়েটাসই নিয়ে এসেছিল। পরবর্তীকালেও দীর্ঘদিন বাংলা সিনেমা আর নিউ থিয়েটার্স সমার্থক হয়েছিল |

১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পরে বাংলা চলচ্চিজের বাণিজ্যিক রায় (2.5.1921-23.4.194 ) না আবির্ভাব বিশেষ তাৎপ হাতে একের পর এক ছবি আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করে। বাংলা চলচ্চিত্রের সব্যসাচী সত্যজিত রায় শিল্প, সাহিত্য, সংগীত আর য এই চারটে জিনিসের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের মুখে করে বাংলা চলচ্চিত্রে সাফল্য দিয়েছেন।

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট মুক্তি পাওয়া সত্যজিত রায়ের 'পথের পাঁচালী'-র প্রথম প্রদর্শন হয় নিউ ইয়র্ক-এর মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-এ কলকাতায় সিনেমাটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। কান চলচ্চিত্র উৎসবে 'পথের পাঁচালি' পুরষ্কৃত হয়। এরপর 'অপরাজিত' (১৯৫৬), 'অপুর সংসার' (১৯৫৯) চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে অপু ট্রিলজি সম্পূর্ণ করেন সত্যজিৎ, রায়। 'অপরাজিত' ডেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরষ্কৃত হয়। 'অপুর সংসার' অভিনয়সূত্রেই বাংলা চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। 'অপরাজিত' আর 'অপুর সংসার'-এর মধ্যবর্তী সময়ে সত্যজিৎ রায় দুটি অসামান্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন 'জলসাঘর' এবং 'পরণসার। রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোটোগল্প নিয়ে 'তিনকন্যা', নষ্টনীড় উপন্যাস অবলম্বনে 'চারুলতা', পরবর্তীতে 'ঘরে-বাইরে' (১৯৮৪), এ ছাড়াও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে 'দেবি', শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে। "চিড়িয়াখানা', শঙ্করের উপন্যাস নিয়ে সীমাবদ্ধ' তৈরি করেন তিনি। সত্যজিৎ রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দুটি উপন্যাস 'অরণ্যের দিনরাত্রি' এবং 'প্রতিদ্বন্দ্বী'-রও চলচ্চিত্রায়ণ করেন। নিজের কাহিনি নিয়ে কাজ (১৯৬২), 'শাখা প্রশাখা' (১৯৯০), 'আগন্তুক' (১৯৯২), ছোটোদের 'সোনার কেল্লা' (১৯৭৪), 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' (১৯৬৮) এবং 'ধারক রাজার দেশে' ইত্যাদি ছবিতে তিনি সংগীত পরিচালনা করেন।

রাজার দেশে (১৯৮০) তৈরি করেন তিনি। বিশেষত শেষেরটি বস্তুবের গভীরতায় বড়োদেরও ভাবনার সিনেমা হয়ে ওঠে। সত্যজিৎ তাঁর পরিচালিত সিনেমায় শুধু কাহিনি বা চিত্রনাট্য রচনাতেই নয়, সংগীত পরিচালনাতেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। 'তিনকন্যা', 'নায়ক' (১৯৬৬), 'চালতা' 'হীরক সত্যজিৎ রায়ের তৈরি উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র - রবীন্দ্রনাথ', 'সিকিম', 'ইনার 'আই', 'সুকুমার রায়' প্রভৃতি। তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান *লিজিয়ন অব অনার'-এ ভূষিত হন। নিউ ইয়র্কের 'অ্যাকাডেমি অব মোশন 'পিকচার্স' কর্তৃক 'লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট'-এর জন্যে বিশেষ অফার সম্মান, 'ভারতরর' সম্মান সহ ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে তিনি শতাধিক পুরষ্কার ও সম্মান পান।

বাংলা চলচ্চিত্রের বিস্ময়কর প্রতিভা ঋত্বিক ঘটক (৪.১১.১৯ ৬.২.১৯৭৬)। ঢাকায় জন্ম নেওয়া ঋত্বিক ঘটকের কৈশোর ও প্রথম। যৌবনে পদ্মাপারে কাটানোর অভিজ্ঞতা তার চলচ্চিত্র নির্মাণের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। বিমল রায়ের সহযোগী হিসেবে চলচ্চিত্র সৃষ্টিতে তাঁর হাতে খাড়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হওয়া 'নাগরিক' ছবিটি আর্থিক কারণে। খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায়। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া সুবোধ ঘোষের র অবলম্বনে 'অযান্ত্রিক' সিনেমার যন্ত্রের সাথে মানুষের সম্পর্ককে যেভাবে বিষয় হিসেবে ঋত্বিক তুলে ধরেন তা অভিনব। সফল চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর পরিচালিত ছবির তালিকা—'নাগরিক' (১৯৫২), 'অযান্ত্রিক' | (১৯৫৭), 'বাড়ি থেকে পালিয়ে' (১৯৫৯), 'মেঘে ঢাকা তারা' (১৯৬০), 'কোমল গান্ধার' (১৯৬১), 'সুবর্ণরেখা' (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম' (১৯৭৩), 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো' (১৯৭৪)। সংখ্যায় খুবই অল্প তাঁর পরিচালিত ছবির তালিকা, কিন্তু প্রতিটি ছবিই শিল্পনিষ্ঠ এবং নতুনত্বের সন্ধানী। 'মেঘে ঢাকা তারাতে ভাঙনের মুখে দাঁড়ানো এক উদ্‌বাস্তু পরিবারের বড়ো বোনের আত্মদান সমাজবাস্তবতার এক অসামান্য দলিল। অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি, দেশবিভাগের যন্ত্রণা, পূর্ববঙ্গের জন্য নস্টালজিয়া উঠে আসে তাঁর 'কোমল গান্ধার', 'সুবর্ণরেখা'-তেও। ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় বলেছেন- “ঋত্মিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক, বাঙালি শিল্পী, আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তার সবচেয়ে বড়ো পরিচয়

বাংলা সিনেমায় নতুন ধারা নিয়ে আসেন দুগাল দেন। ১৯৫৫ থেকে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তাঁর যাত্রা শুরু। আজ অবধি সেই ধারা বহমান রয়েছে। টেলিফিল্ম, শর্টফিল্ম, ডকুমেন্টারি ফিলম এবং পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি সব মিলিয়ে সংখ্যাটি প্রায় পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। তাঁর প্রথম ছবি রাতভোর' (১৯৫৫)। ওই একই বছর মুক্তি পেয়েছে 'পথের পাঁচালী'। 'রাতভোর'-এ ব্যর্থ হলেন পরিচালক মৃণাল সেন। কিন্তু সেই ব্যর্থতা তাঁকে দমাতে পারেনি । পরবর্তী ছবি "নীল আকাশের নীচে' এবং তৃতীয় ছবি 'বাইশে শ্রাবণ'। এর মধ্যেই তিনি খুঁজে নিলেন নিজের চলার পথ। চলচ্চিত্র পরিচালনার আগে চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখালেখি থেকেই শৃগাল সেনের ছবি তৈরির ভাবনা শুরু হয়। সত্যজিৎ রায় যেমন গুরু থেকেই ধ্রুপদি সাহিত্য অবলম্বনে ছবি তৈরি করেছেন, মৃণাল সেন তা করেননি। বরং তাঁর বিপরীত অবস্থানটিই মুশাল সেনের ছবির বৈশিষ্ট্য। সত্যজিৎ রায় সে-কথা স্বীকার করে বলেছেন—“দে স্টার্টেড অ্যার্ট অ্যাবাউট দ্য সেম টাইম অ্যাজ আই ডিড, ঋত্বিক অ্যান্ড মুশাল, দেওয়্যার মেকিং ফিল্ম ডেরি ডিফারেন্ট ফ্রম মাইন, ডেরি ডিফারেন্ট, বাট ডেরি পাওয়ারফুল, আই থিংক।” মুগাল সেন পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল— 'নীল আকাশের নীচে' (১৯৫৮), 'বাইশে শ্রাবণ' (১৯৬০), 'আকাশ কুসুম' (১৯৬৫), 'ভুবন সোম' (১৯৬৯), কলকাতা ৭১' (১৯৭২), 'পদাতিক' (১৯৭৩), 'আকালের সন্ধানে' (১৯৮২), 'মহাপৃথিবী' (১৯৯১) ইত্যাদি। সারা জীবনে মৃণাল সেন অসংখ্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর নির্মিত তথ্যচিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে 'মুভিং পারসপেকটিভস' (১৯৬৭), 'হিন্দুরা প্রসঙ্গ' (১৯৮২), 'ক্যালকাটা মাই এলডোরাডো' (১৯৮৯), 'অ্যান্ড দি শো গোজ অন' (১৯৯৬)। এ ছাড়াও তিনি 'তসবির আপনি আপনি | (১৯৮৪) নামে একটি দূরদর্শন চিত্র, বহু দূরদর্শন ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য রচনা করেন (যেমন- 'দশ সাল বাদ', 'আজনডি', 'শাল', 'সালগিরা', 'জিত'; 'গো বহেন', 'আজকাল', 'রবিবার', 'আয়না', 'স্বয়ম্ভব', 'কভি দূর কভি পাস', 'অপরাজিত')। 'রাজধানী থেকে' (১৯৫৮), 'কানামাছি' (১৯৬১), জোড়ালীমির চৌধুরী পরিবার' (১৯৬৬) এবং কাচকাটা হীরে' (১৯৬৬) র চিত্রনাটাও মৃণাল সেনের রচনা।

পাঁচ-এর দশকে যে সমস্ত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালকের হাতে বাংলা ছবি প্রাণ ফিরে পায়, তাদের মধ্যে অন্যতম তপন সিংহ (২.১০.১928 ১৫.০১.২০০৯)। গতানুগতিক প্রেম-ভালোবাসা-ধর্মীয় বিষয়ের একঘেয়েমি থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর আবির্ভাবে বাংলা সিনেমা হয়ে ওঠে গীতিকবিতার মতন চিত্রধর্মী এবং মানবাবেগে ভরপুর এক শিল্পকলা। তাঁর প্রতিটি কালজয়ী ছবির দর্শক হয়ে উঠলেন সব রকম মানুষ সাধারণ আর বিশিষ্ট সকলেই। আর্ট-এর ক্ষেত্রে এবং বক্স অফিসের মেলবন্ধনে তিনি প্রমাণ করলেন আপন অনন্য প্রতিভা। রেনোয়ার সান্নিধ্য পাওয়া, পাইনউড স্টুডিওতে শব্দ প্রকৌশল শেখা তপন সিংহের প্রথম ছবি 'অঙ্কুর' দর্শকদের আনুকূল্য পায়নি। তৃতীয় ছবি 'কাবুলিওয়ালা' থেকেই তাঁর সাফল্যের সূচনা। রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার থেকে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার—তপন সিংহ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন দেশজুড়ে। রবীন্দ্রনাথ এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্যিকের গল্প উপন্যাস অবলম্বনে তিনি ছবি তৈরি করেছেন। বাঙালি দর্শক সম্পর্কে তিনি উচ্ছ্বসিত। তাঁর মতে—“সারা পৃথিবীতে দর্শক হিসেবে বাঙালি দর্শকই শ্রেষ্ঠ। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা, ছবির প্রতি ভালোবাসা, নাটকের প্রতি ভালোবাসা, আর কোনো দেশের দর্শকের মধ্যে খুঁজে পাবেন কিনা সন্দেহ।"

নিজের ছবি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য—“বৃহৎ অর্থে আমার দু-চারটি ছবি ছাড়া আর সব ছবিই তো ভালোবাসার। মানুষকে ভালোবাসা, পৃথিবীকে ভালোবাসার কথাই তো আমি বলতে চেয়েছি বরাবর।"

তপন সিংহ পরিচালিত বিখ্যাত বাংলা ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে 'কাবুলিওয়ালা' (১৯৫৭), 'লৌহকপাট' (১৯৫৮), 'ক্ষুধিত পাষাণ' (১৯৬০), 'ঝিন্দের বন্দি' (১৯৬১), 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা' (১৯৬২), 'নির্জন সৈকতে' (১৯৬৩), 'অতিথি' (১৯৬৫), 'সাগিনা মাহাতো' (১৯৭০), 'সবুজ দ্বীপের রাজা' (১৯৭৯), 'অন্তর্ধান' (১৯৯২) ইত্যাদি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন অনেক। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান।

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পেল প্রেমাঙ্কুর আতর্থী পরিচালিত 'দেনাপাওনা"। এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সবাক বাংলা কাহিনিচিত্র। অভিনয় করেছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর গাঙ্গুলি, ভানু ব্যানার্জি, ভূমেন রায়, কুসুমকুমারী দেবী, মা, শিশুবালা, অনুপমানেরী এবং আভাবতী। ওই একই খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় 'আলম আরা'। এরপর বাংলায় মুক্তি পায় 'জামাইষষ্ঠী' | পরিচালক অমর চৌধুরী। এরপর প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি পরিচালিত 'প্রহ্লাদ' | এখানে অভিনয় করেন অহীন্দ্র চৌধুরী, কাননদেবী। এর পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা ছবিতে আসে উত্তম-সুচিত্রা জুটি। শুরু হয় রোম্যান্টিক একের পর এক বক্স অফিস হিট ছবি | বাংলা ছবি প্রবেশ করল স্বর্ণযুগে। এই প্রেমের আখ্যান | ‘শাপমোচন', 'সাগরিকা', 'সপ্তপদী', 'পথে হল দেরি' ইত্যাদি পর্বের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন অভিনেতা — উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত, তপন চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ধৃতিমান চ্যাটার্জি প্রমুখ।

সঠিক তথ্যসমৃদ্ধ চলচ্চিত্রই তথ্যচিত্র। এর পরিসর স্বল্প, বিষয়ের ক্ষেত্রে থাকে একমুখীনতা। কোনো বিশেষ ঘটনা বা বিষয় কিংবা কোনো মহান মানুষের জীবনকাহিনিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় তথ্যচিত্র। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ধীরে ধীরে সমগ্র পৃথিবীর অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র। তখন কলকাতা শহরেও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি শুরু হয়। এই কাজে অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হলেন হীরালাল ও মতিলাল সেন, জে এফ ম্যাডান, অনাদি বসু প্রমুখ। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নানা মুহূর্ত, গান্ধিজি, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, বালগঙ্গাধর তিলক প্রমুখের বিভিন্ন স্মরণীয় দৃশ্য ও ঘটনাবলি তুলে রাখা হয় স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতে | অরোরা ফিল্ম কোম্পানির নামে অনাদি বসু ক্যালকাটা ফিল্ম গেজেটে নিয়মিতভাবে সংবাদ চিত্রমালা শুরু করেন। হরিসাধন দাশগুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, শান্তিপ্রসাদ চৌধুরী, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ গুণী পরিচালক তৈরি করেছেন অজস্র উন্নতমানের তথ্যচিত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্রগুলি হল—সত্যজিৎ রায়ের ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘ইনার আই’, ‘সুকুমার রায়’, ঋত্বিক ঘটকের ‘পুরুলিয়ার ছৌ, “আমার লেনিন’, গৌতম ঘোষের 'পরম্পরা', ‘মিটিং এ মাইলস্টোন', 'মোহর', “বিয়ন্ড দ্য হিমালয়াস্' ইত্যাদি।