Chapter-3⇒পরমাণু, অণু ও রাসায়নিক বিক্রিয়া

উঃ-রাসায়নিক বিক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য :

(i) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক পদার্থের সমস্ত ধর্ম লোপ পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ উৎপন্ন হয়।

(ii) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একধরনের পদার্থ অন্য ধরনের পদার্থে পরিণত হলেও মোট ভর অপরিবর্তিত থাকে। একেই ভরের নিত্যতাসূত্র বলে।

(iii) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক পদার্থ এবং বিক্রিয়াজাত পদার্থের মোট পরমাণু সংখ্যা সর্বদা নির্দিষ্ট থাকে।

(iv) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক পদার্থগুলি নির্দিষ্ট ওজন অনুপাতে পরস্পর যুক্ত হয়ে বিক্রিয়াজাত পদার্থ উৎপন্ন করে।

(v) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক পদার্থের অণুর গঠন বিক্রিয়াজাত পদার্থের অণুর গঠনের থেকে পৃথক হয়।

(vi) বিক্রিয়ক পদার্থের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে।

(vii) রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তাপের উদ্ভব বা শোষণ হবেই।

(viii) রাসায়নিক বিক্রিয়া চলাকালীন রঙের পরিবর্তন, গ্যাস নির্গমন, অধঃক্ষেপণ, তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

(ix) রাসায়নিক বিক্রিয়া একটি পারমাণবিক ঘটনা। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরমাণুগুলি অংশগ্রহণ করে।

উঃ-যোজ্যতা : কোনো মৌলের একটি পরমাণু যে ক-টি হাইড্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বা হাইড্রোজেন ঘটিত কোনো যৌগের অণু থেকে যতগুলি হাইড্রোজেন পরমাণুকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে, সেই সংখ্যাকে ওই পরমাণুর যোজ্যতা (Valency) বলে। যেমন —একটি অক্সিজেন পরমাণু দুটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যৌগ জল (H2O) গঠন করে। তাই অক্সিজেনের যোজ্যতা 2

হাইড্রোজেন ব্যতীত অন্য মৌল ক্লোরিন প্রায় সকল মৌলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই কোনো মৌলের একটি পরমাণু যতগুলি ক্লোরিন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সেই সংখ্যা দ্বারা ওই মৌলের যোজ্যতা পরিমাপ করা হয়। যেমন —একটি সোডিয়াম পরমাণু একটি ক্লোরিন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে NaCl গঠন করে। সুতরাং, সোডিয়াম পরমাণুর যোজ্যতা 1। আবার, একটি অ্যালুমিনিয়াম পরমাণু তিনটি ক্লোরিন পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে AICI3 গঠন করে। সুতরাং, অ্যালুমিনিয়ামের যোজ্যতা 3

 

উঃ-মূলক : একই মৌলের এক বা একাধিক পরমাণু বা বিভিন্ন মৌলের একাধিক পরমাণু পরস্পরের সঙ্গে জোটবদ্ধ অবস্থায় থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এইরূপ স্বাধীন পরমাণুপুঞ্জকে বলা হয় মূলক বা যৌগমূলক

♦ এটি দু-প্রকার। যথা প্রশম মূলক ও তড়িদ্‌গ্রস্ত মূলক। তড়িদ্‌গ্রস্ত মূলককে আবার দু-ভাগে ভাগ করা যায়। যথা — ধনাত্মক তড়িদ্‌গ্রস্ত মূলক ও ঋণাত্মক তড়িদ্‌গ্রস্ত মূলক। ।  

উঃ-দুটি অধাতব মৌল দ্বারা গঠিত কোনো যৌগের সংকেত লেখার সময় প্রথমে বেশি তড়িৎ ধনাত্মক মৌলের চিহ্ন এবং পরে অপেক্ষাকৃত কম তড়িৎ ধনাত্মক মৌলের বা তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলের চিহ্ন বসে। কার্বন ডাইঅক্সাইডের একটি অণু একটি কার্বন পরমাণু এবং দুটি অক্সিজেন পরমাণু দ্বারা গঠিত। কার্বন, অক্সিজেনের চেয়ে অধিকতর তড়িৎ ধনাত্মক। সেজন্য কার্বন ডাইঅক্সাইডের সংকেত O₂C না লিখে CO₂ লেখা হয়।

 

উঃ-‘O’ বলতে একটি অক্সিজেন পরমাণুকে বোঝায়, ‘O₂' বলতে একটি অক্সিজেন অণু বোঝায়, ‘3O’ বলতে তিনটি অক্সিজেন পরমাণু বোঝায়, ‘40₂’ বলতে চারটি অক্সিজেন অণু বোঝায়।

 

উঃ- প্রদত্ত বিক্রিয়াটি থেকে জানা যায়—

(i) হাইড্রোজেন ক্লোরিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড উৎপন্ন করে।

(ii) 1টি হাইড্রোজেন অণু ও 1টি ক্লোরিন অণু মিলে 2টি হাইড্রোজেন ক্লোরাইড অণু উৎপন্ন করে।

(iii) বিক্রিয়কের মোট পরমাণু সংখ্যা = (2 × 1) + (2 × 1) = 4। বিক্রিয়াজাত পদার্থের মোট পরমাণু = 2(1 + 1) = 4। অর্থাৎ, বিক্রিয়ক ও বিক্রিয়াজাত পদার্থের পরমাণু সংখ্যা সমান।

(iv) একই চাপ ও উষ্ণতায় 1 আয়তন হাইড্রোজেন 1 আয়তন ক্লোরিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে 2 আয়তন হাইড্রোজেন ক্লোরাইড উৎপন্ন করে।

উঃ-H₂ বলতে একটি হাইড্রোজেন অণু বোঝায় যা দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু দ্বারা গঠিত।

♦ 2N বলতে দুটি পৃথক নাইট্রোজেন পরমাণুকে বোঝায়।

 

উঃ-মৌলের ক্ষুদ্রতম কণা যার মধ্যে ওই মৌলের সমস্ত ধর্ম বজায় থাকে, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে, যা স্বাধীনভাবে থাকতে পারে না, তাকে পরমাণু (Atom) বলে।

যেমন – হাইড্রোজেন পরমাণু (H), অক্সিজেন পরমাণু (O), নাইট্রোজেন পরমাণু (N) ইত্যাদি।

 

উঃ-মৌলিক বা যৌগিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যার মধ্যে ওই মৌলের সমস্ত ধর্ম বজায় থাকে, যা স্বাধীনভাবে থাকতে পারে, তাকে ওই মৌলের বা যৌগের অণু (Molecule) বলে। যেমন – হাইড্রোজেন অণু (H₂), অক্সিজেন অণু (O₂) ইত্যাদি। অণু দু-প্রকার।

যথা – মৌলিক অণু ও যৌগিক অণু।

 

উঃ-একই মৌলিক পদার্থের পরমাণু পরস্পর যুক্ত হয়ে যে অণু গঠন করে, তাকে বলে মৌলিক অণু

যেমন — H₂, 0₂, Cl₂, N₂  ইত্যাদি।

উঃ-দুই বা ততোধিক মৌলের পরমাণু পরস্পর যুক্ত হয়ে যে অণু গঠন করে, তাকে বলে যৌগিক অণুযেমনH₂O, NH3, HCI, ইত্যাদি।

 

উঃ-পরমাণু তিনটি মূল কণিকা দ্বারা গঠিত।

♦ কণিকাগুলি হল — প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন।

 

উঃ- ইলেকট্রিল ও প্রোটনের মধ্যে দুটি সাদৃশ্য হল —

(i) পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংখ্যা সমান।

(ii) ইলেকট্রন ও প্রোটন উভয়েরই আধানের মান সমান।

 

উঃ-ইলেকট্রন এ প্রোটনের মধ্যে দুটি বৈসাদৃশ্য হল—

(i) প্রোটন ধনাত্মক তড়িদ্‌গ্রস্ত কণা, কিন্তু ইলেকট্রন ঋণাত্মক তড়িদ্‌গ্রস্ত।

(ii) প্রোটন অবস্থান করে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে, কিন্তু ইলেকট্রন অবস্থান করে নিউক্লিয়াসের বাইরের বিভিন্ন কক্ষপথে।

উঃ-যেসব মৌলের যোজ্যতা শূন্য, তাদের বলা হয় শূন্যযোজী মৌল। বাস্তবে নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলি (হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, ক্রিপ্টন, জেনন, রেডন) অন্য কোনো মৌলের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না বা যুক্ত হতে চায় না। তাই এদের যোজ্যতা শূন্য ধরা হয়, এই কারণে এদের শূন্যযোজী মৌল বলে।

 

উঃ-দ্বিযোজী মৌল – জিংক, ত্রিযোজী মৌল – নাইট্রোজেন, চতুর্যোজী মৌল – কার্বন, পঞ্চযোজী মৌল - ফসফরাস।

 

উঃ-কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত প্রোটন ও নিউট্রন সংখ্যার সমষ্টিকে ওই মৌলের বা পরমাণুর ভরসংখ্যা বলে। অর্থাৎ, মৌলের ভরসংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা + নিউট্রন সংখ্যা।

 

উঃ-মৌলের ভরসংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা + নিউট্রন সংখ্যা এবং পারমাণবিক সংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা। সুতরাং, ভরসংখ্যা পারমাণবিক সংখ্যা + নিউট্রন সংখ্যা, বা পারমাণবিক সংখ্যা = ভরসংখ্যা – নিউট্রন সংখ্যা

উঃ-যে প্রক্রিয়ায় এক বা একাধিক পদার্থের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটার ফলে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট এক বা একাধিক পদার্থ উৎপন্ন হয়, তাকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলে। যেমন সোডিয়াম ধাতুর (Na) সঙ্গে ক্লোরিন গ্যাসের বিক্রিয়ায় সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl) উৎপন্ন হয়।

 

উঃ-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী পদার্থগুলিকে বিক্রিয়ক পদার্থ (Reactant) বলে।

 

উঃ-রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যেসব নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ উৎপন্ন হয়, তাদের বিক্রিয়াজাত পদার্থ (Product) বলে।