Chapter -3⇒ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা

উত্তর :

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে ভারতের অর্থনীতিতে এক বিশেষ ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে থাকে। এই পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়  সবার উপরে ছিলেন রাজা। রাজা তাঁর রাজ্যের জমি রাজস্ব প্রদানের শর্তে অনুগত ব্যক্তি বা সামন্তদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। সামন্ত আবার  উপসামন্তদের মধ্যে তার জমি ভাগ করে দিতে পারতেন। এই ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন স্তরে ছিল সাধারণ জনগণ। এই ব্যবস্থাকেই সামন্তব্যবস্থা বলা হয় ।

সামন্তব্যবস্থার উদ্ভবের কারণ : 

ব্যাবসাবাণিজ্যে মন্দা : খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে ভারতের বেশ কিছু জায়গায় ব্যাবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে মন্দা দেখা দিয়েছিল। ফলে এই সময়  কৃষির গুরুত্ব বেড়েছিল।

আঞ্চলিক রাজশক্তি ও নতুন রাজকর্মচারীর উত্থান : খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে আঞ্চলিক রাজশক্তির বাড়বাড়ন্ত ভারতে সামন্তব্যবস্থার উদ্ভবের  সহায়ক হয়েছিল। রাজশক্তির অধীন উঁচু রাজকর্মচারীদের ক্ষমতা বেড়েছিল। এঁরা সামন্ত, রাজ, রৌণক নামে পরিচিত ছিলেন। রাজা ও  কৃষকের মাঝে এই রাজকর্মচারীগণ সামন্তব্যবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন।

বেতনের পরিবর্তে জমিদান : রাজা তাঁর রাজকর্মচারীদের বেতনের পরিবর্তে অনেকসময় জমি দিতেন। ওই জমির সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের  কাছ থেকে যে রাজস্ব পাওয়া যেত তাই ছিল ওই কর্মচারীর আয়। ফলে তিনি সামন্ত হয়ে উঠেছিলেন।

পরাজিত রাজার রাজ্য: অনেক সময় যুদ্ধে জয়ী রাজা পরাজিত রাজাকে করপ্রদানের বিনিময়ে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দিতেন। পরাজিত রাজার  রাজ্য করদ রাজ্য বা সামন্ত রাজ্যে পরিণত হত।

উত্তর:

মধ্যযুগে ভারতে সামন্তব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। সামন্তব্যবস্থায় রাজা তাঁর রাজ্যের জমি নির্দিষ্ট রাজস্ব দেওয়ার শর্তে কয়েকজন বিশ্বস্ত  অধস্তন ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করে দিতেন। অধস্তন ব্যক্তি হতেন ছোটো সামন্ত। তিনি আবার তার এলাকার জমি কয়েকজন বিশ্বস্ত অধস্তন ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করে দিতে পারতেন। কৃষক ও রাজার মাঝে কয়েকটি স্তরে জমি ভাগ করে রাজস্ব আদায় ও শাসন পরিচালনার ব্যবস্থাকে সামন্তব্য  বলা হয়। ভারতের সামন্তব্যবস্থার ছবি আঁকতে গেলে একখানা ত্রিভুজের মতো দেখায়। কারণ—  1.এর সর্বোচ্চ  স্থানে থাকেন একজন রাজা।

2. তার নীচের স্তরে থাকেন তাঁর অধস্তন সামন্তরা। তার নীচের স্তরে থাকেন তাদের অধস্তন  উপসামস্তরা। এইভাবে ধাপে ধাপে বাড়তে বাড়তে শেষের স্তরে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকরা।

সামন্তদের জীবিকা : সামন্তব্যবস্থায় সামন্তরা কেউ পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করতেন  না। তারা অন্যের শ্রমে উৎপন্ন দ্রব্য বা রাজস্ব থেকে নিজেদের জীবিকানির্বাহ করতেন। কৃষকদের কাছ  থেকে ছোটো সামন্ত যত রাজস্ব আদায় করতেন তিনি তার কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে বাকি অংশ  ঊর্ধ্বতন সামস্তকে দিতেন। তার ওপরের মাঝারি সামস্তরাও তাদের নিজের নিজের অংশ রেখে বাকি  অংশ রাজাকে দিতেন। কৃষক ও রাজার মাঝের এই সামন্তরা মধ্যস্বত্বভোগী নামে পরিচিত ছিল।

উত্তর :

দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব লক্ষ করা যায়। দক্ষিণ ভারতের রাজারা অনেক মন্দির তৈরি করেছিলেন। চোল রাজ  রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোলের আমলে তাঞ্ঝোর ও গঙ্গাহকোণ্ডচোলপুরমে দুটি অসাধারণ  সুন্দর মন্দির তৈরি হয়েছিল।

মন্দিরের অর্থনীতি : 

মন্দিরে জমিদান : দক্ষিণ ভারতে মন্দির কর্তৃপক্ষকে রাজা, জমিদার ও ব্যবসায়ীরা  জমি দান করতেন। মন্দিরের জমি থেকে কর নেওয়া হত না অর্থাৎ এগুলি ছিল নিষ্কর জমি।

মন্দিরের বরচ : মন্দিরের জমির ফসল ও অর্থ পুজোর জন্য ও মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত  মানুষজনের জীবনযাপনের জন্য ব্যয় করা হয়।

মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি : 

মন্দিরে বসবাসকারী ব্যক্তি : দক্ষিণ ভারতে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা হলেন পুরোহিত, রাঁধুনি, মালাকার, গায়ক, নর্তক-নর্তকী প্রভৃতি।  এরা সবাই মন্দির চত্বরে বসবাস করত।

লোকালয় প্রতিষ্ঠা : দক্ষিণ ভারতে মন্দিরকে কেন্দ্র করে শিল্পীদের বসবাস ও লোকালয় গড়ে উঠত।

উত্তর:

চোল সাম্রাজ্যে রাজা ছিলেন সর্বেসর্বা। রাজাকে সাহায্য করত মন্ত্রীদের একটি পরিষদ। সমগ্র চোল রাজ্যকে 'চোলমণ্ডলম’ বলা হত।  চোলমণ্ডলমে সুন্দর শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

শাসনব্যবস্থা :

  প্রদেশ বা মণ্ডলম: সমগ্র চোল সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। চোল সাম্রাজ্যের প্রদেশকে 'মণ্ডলম' বলা হত।

জেলা বা কোট্রাম: চোলদের প্রদেশগুলি কয়েকটি জেলা বা ‘কোট্রাম’-এ বিভক্ত ছিল।

অঞ্চল বা নাড়ু : চোল রাজ্যে জেলাগুলি অঞ্চল বা ‘নাড়ু’-তে বিভক্ত ছিল। কতকগুলি গ্রাম নিয়ে নাড়ু গঠিত হত।

গ্রাম পরিষদ বা উর : চোল শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন একক ছিল গ্রাম। গ্রামকে শাসন করত গ্রাম পরিষদ বা ‘উর’  চোল শাসনব্যবস্থায় উর এবং নাড়ু ছিল স্থানীয় সংগঠন। এরা স্বায়ত্তশাসন, বিচার ও রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করত।

সভা : চোল রাজ্যে কাবেরী নদীর উপত্যকায় ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে নতুন নতুন গ্রামের পত্তন হয়েছিল। এই নতুন গ্রামগুলির তদারকি  ও প্রশাসনিক দায়িত্বপালন করত সভা। সভা ছিল অভিজ্ঞ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত সংগঠন।

নগরম : চোল রাজ্যে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও তাদের উন্নতির জন্য ‘নগরম' নামে একটি পরিষদ গড়ে উঠেছিল।

উত্তর :

পাল ও সেন রাজারা বাংলায় প্রায় ৫০০ বছর ধরে রাজত্ব করেছিল। পাল ও সেন রাজাদের আমলে বাংলার অর্থনীতি সম্পর্কে জান  যায় বিভিন্ন শিলালিপি এবং রামচরিত, বল্লালচরিত প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে।

'কৃষি : পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষি। রাজা সমস্ত জমির মালিক ছিলেন। তিনি কৃষকদের জমি দান, বিক্রয়   এবং চাষের জন্য প্রদান করতে পারতেন। কৃষিদ্ধ শস্যের মধ্যে প্রধান ফসল ধান হলেও আখ, সরষে, তুলো, নারকেল, সুপারি প্রভৃতি ফসলের উৎপাদন হত।

রাজস্বব্যবস্থা : পাল ও সেন আমলে প্রধানত চার ধরনের রাজস্বের কথা জানা যায়। এগুলি হল- 1.ভাগ 2.ভোগ, 3. কর ও  হিরণ্য। ভাগ হিসেবে রাজা উৎপন্ন শস্যের এক ষষ্ঠাংশ আদায় করতেন।

শিল্প : পাল ও সেন যুগের শিল্পের মধ্যে প্রধান ছিল বজ্রশিল্প, অলংকার শিল্প, কান্ঠশিল্প প্রভৃতি। দেওপাড়া লিপি থেকে জানা যায় এই  সময়ের শিল্পীর শিল্পীসংঘ বা 'গিল্ড' গড়ে তুলেছিল। শূলপাণি বারেন্দ্র শিল্পগোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন।

বাণিজ্য : আরব বণিকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে পাল ও সেন যুগে বাংলায় বাণিজ্যের অবনতি ঘটে। এই যুগে স্বর্ণমুদ্রা হিল  না। পাল যুগে রৌপ্যমুদ্রা কিছু প্রচলিত থাকলেও সেন যুগে তাও ছিল না, বিনিময়ের মাধ্যম ছিল কড়ি। এই সময়ে বিখ্যাত বন্দর ও নগর ছিল।  তাম্রলিপ্ত, দণ্ডভুক্তি, কর্ণসুবর্ণ প্রভৃতি।

পরিশেষে বলা যায়, এ যুগের অর্থনৈতিক অবক্ষয় পাল ও সেন রাজাদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। 

উত্তর:

পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল বাণিজ্য ও কৃষি।

পাল ও সেন যুগে বাংলার বাণিজ্য : পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতিতে ক্রমশ বাণিজ্যের গুরুত্ব কমে আসছিল। এই সময় বাণিজ্যের  অবনতির কয়েকটি কারণ ছিল-

[1] ভারতের পশ্চিমদিকে আরব সাগরে আরব বণিকদের কর্তৃত্ব বেড়েছিল। তাদের দাপটের ফলে বাংলার বণিকরা পিছু হটেছিল।

[2] পাল সেন যুগে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য সোনা-রুপার মুদ্রার ব্যবহার  কমে গিয়েছিল এবং কড়ির মাধ্যমে জিনিসপত্র  কেনাবেচা চলত। ফলে বাইরের ব্যবসায়ীরাও বাংলার সাথে ব্যাবসা করতে উৎসাহী ছিল না।

পাল ও সেন যুগে বাংলার কৃষি : পাল ও সেন যুগে বাংলার অর্থনীতিতে বাণিজ্যের অবনতির ফলে কৃষির গুরুত্ব বেড়েছিল।

[1] কৃষকদের উৎপন্ন ফসলের একের ছয় ভাগ (এক ষষ্ঠাংশ) কর দিতে হত।

[2] এযুগের উৎপন্ন ফসলগুলির মধ্যে প্রধান ছিল ধান, সরষে, বিভিন্ন ধরনের ডাল। তা ছাড়া আম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল, মহুয়া প্রভৃতি ফল  উৎপন্ন হত। মহুয়া ও আখ থেকে তৈরি পানীয় বাঙালি সমাজে প্রচলিত ছিল। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের চাষিরা পান, সুপারি, পাট, কাপাস  প্রভৃতি উৎপাদন করত।

উত্তর :

পাল ও সেন যুগে বাঙালির খাওয়াদাওয়ার বিবরণ সেই সময়ে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়।

ভাত : বাংলার প্রধান ফসল ছিল ধান, তাই বাঙালিদের প্রধান খাদ্য ছিল ভাত। ঘি দিয়ে গরম ভাত বাঙালির খুব প্রিয় খাদ্য ছিল।

শাকসবজি : সেই সময় বাংলায় যেসব শাকসবজি উৎপন্ন হত তার মধ্যে প্রধান ছিল-নালতে (পাট) শাক, লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে, বেগুন, কচু, ডুমুর, কাকরোগ প্রভৃতি। এইসব শাকসবক্রি বাঙালির নিত্যদিনের খাদ্য ছিল। আজও আমরা এইসব শাকসবজি খাই। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তখন বাঙালিরা আলু খেতে জানত না। বাংলায় আলুর চাষ ও খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার শুরু হয়েছে অনেক পরে। পোর্তুগিজরা এদেশে আসার পর তাদের কাছ থেকে বাঙালিরা আলু খেতে শিখেছে।

 মাছ: বাংলার নদী, নালা ও পুকুরে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যেত। যেমন— পুঁটি, মৌরলা, রুই, শোল প্রভৃতি। সমুদ্রসংলগ্ন নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। অনেকে শুকনো মাছও খেত।

মাংস: মাছের মতো মাংসও বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল। বাঙালি সমাজের সবাই না খেলেও অনেকে ছাগল, বিভিন্ন ধরনের পাখি, কচ্ছপ, কাকড়া, শামুক ও হরিণের মাংস খেত।

দুধ : বাঙালিরা দুধ ও দুধের তৈরি দই, পায়েস, ক্ষীর খেতে খুব পছন্দ করত। তা ছাড়া আখের গুড়, আখ ও মহুয়া থেকে তৈরি পানীয় বাঙালি সমাজে চালু ছিল।

উত্তর:

প্রাচীন বাংলাদেশের ইতিহাসে পাল ও সেন যুগ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বাংলার সাহিত্যের ক্ষেত্রে পাল ও সেন যুগ এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ।

 পাল ও সেন যুগের সাহিত্য :

পালযুগ : সাহিত্যের ক্ষেত্রে পালযুগ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। পালযুগে সংস্কৃত ও মাগধী প্রাকৃত ভাষার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ করা যায়। এই যুগে সংস্কৃত ভাষা একটি স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছিল, যা  নাটক, গদ্য সাহিত্য প্রভৃতির গ্রন্থ রচিত হয়েছিল।

পালযুগে রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- (1) শ্রীধর ভট্ট রচিত 'ন্যায়-কদলী’, (2) জীমূতবাহন রচিত দায়ভাগ,  (3)  সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত 'রামচরিত' প্রভৃতি।

 সেনযুগ : সেনযুগকে ‘সংস্কৃত সাহিত্যের সুবর্ণযুগ' বলা হয়। সেনযুগে রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – (1)  বল্লালসেন রচিত  ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর', (2) অনিরুদ্ধ ভট্ট রচিত 'হারলতা' ও 'পিতৃদয়িতা', (3)  হলায়ুধ রচিত 'ব্রাক্মণসর্বস্ব’, (4) ধোয়ী রচিত ‘পবনদূত’, (5)   জয়দেব রচিত 'গীতগোবিন্দম্', (6) শ্রীধর দাস সংকলিত 'সদুক্তিকর্ণামৃত'।

  উত্তর:

রামচরিত কাব্যের রচয়িতা হলেন সন্ধ্যাকর নন্দী।

রামচরিতের রচনাকলি:

 রচনাকাল : পালরাজা রামপালের ছেলে মদনপালের শাসনকালে (আনুমানিক ১১৪৩-১১৬১ খ্রি:) কবি সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিত কাবা  রচনা করেন।

রামচরিতের কাহিনি : রামচরিতের কাহিনি রামায়ণের কাহিনি অনুসারে লেখা হয়েছে। কবি সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিতে একই কথার  দু-রকম মানে করেছেন।

 নায়ক :  রামায়ণের নায়ক রাম, রামচরিতের নায়ক পালরাজা রামপাল।

কাহিনি: রামায়ণের মূল কাহিনি হল রামের সীতা উদ্ধারের কাহিনি। কবি সন্ধ্যাকর নন্দী এই কাহিনির সঙ্গে মিল রেখে বরেন্দ্রভূমি উদ্ধারের  কাহিনি বর্ণনা করেছেন। এজন্য পালরাজা রামপাল রামের সীতা খোঁজার মতো বিভিন্ন সামন্তরাজাদের সমর্থন জোগাড় করার জন্য বনে-জঙ্গলে  ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিভিন্ন সামন্তরাজাদের সমর্থন নিয়ে বিদ্রোহী কৈবর্তদের হাত থেকে পিতৃভূমি বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

সন্ধ্যাকর নন্দী রামায়ণের সীতার সঙ্গে বরেন্দ্রভূমিকে এক কল্পনা করে রামচরিত লিখেছেন।

তিনি সীতার রূপ বর্ণনার মতো বরেন্দ্রভূমির ভৌগোলিক পরিবেশ, নদনদী, ফুল-ফল প্রভৃতির বর্ণনা করেছেন।

রামায়ণে রাম সীতাকে উদ্ধার করেছেন। রামচরিতে রামপাল বরেন্দ্রভূমি উদ্ধার করেছেন।

উত্তর:

পালযুগে মাগধী অপভ্রংশ ভাষার গৌড়বঙ্গীয় রূপ থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়।

সেন রাজাদের আমলে সাহিত্য : সেনযুগে সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশের কারণ হল  ।

1.সেন রাজারা ছিলেন সংস্কৃত সাহিত্যের অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক।

2. সেনযুগে জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী প্রমুখ প্রতিভাবান কবির আবির্ভাব হয়েছিল। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় এই পাঁচজন কবি।  ‘পঞ্চরত্ব' নামে পরিচিত ছিলেন।

সংস্কৃত সাহিত্য : 

বল্লালসেনের রচনা : বেদ-স্মৃতি-পুরাণে সুপণ্ডিত সেন রাজা বল্লালসেন হিন্দুধর্মের ক্রিয়াকর্ম ও আচারপদ্ধতি নিয়ে 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর'  নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।

লক্ষ্মণসেনের রচনা : সেন রাজা লক্ষ্মণসেনও ছিলেন কবি, সাহিত্যানুরাগী ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। তিনি তাঁর পিতার অসমাপ্ত অদ্ভুতসাগর'  গ্রন্থ সমাপ্ত করেন।

জয়দেবের রচনা : সেনযুগের শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন জয়দেব। তিনি রাধাকৃষ্ণের প্রেম অবলম্বন করে রচনা করেন বিখ্যাত 'গীতগোবিন্দম্  কাব্য।  তা ছাড়া সে যুগে রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল–ধোয়ী রচিত ‘পবনদূত’, গোবর্ধন রচিত 'আর্যাসপ্তশতী’, জীমূতবাহন রচিত ‘দায়ভাগ’ প্রভৃতি।

উত্তর :

সাহিত্যকে সমাজের আয়না বলা হয়। আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন আমাদের ছবি দেখা যায়, সেইরকম সাহিত্য পড়লে সেই সময়ের  সমাজ সম্পর্কে জানা যায়। সেন যুগের সাহিত্য থেকে সেই যুগের সমাজের চিত্র ধরা পড়ে— রাজা, ধনী ব্যক্তি, সম্পন্ন কৃষক ও গরিবদের সম্পর্কে  জানা যায়।

রাজা ও ধনীদের সম্পর্কে : সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভার কবিরা রাজা লক্ষ্মণসেনকে কৃষ্ণের সঙ্গে তুলনা করে স্তুতি করেছেন। কবিদের সংস্কৃত ভাষায় লেখা কাব্য থেকে সে যুগের ধনীদের বিলাসী জীবনের ছবি ফুটে উঠে।

গ্রামের সম্পন্ন কৃষকদের সম্পর্কে : অবস্থাপন্ন কৃষকলের সম্পর্কে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে—

বর্ষার জলে চমৎকার ধান চাষ হয়েছে।

খেতে ভালো আখের চাষ হয়েছে। ফলে সে বছর তারা খুব আনন্দিত, তাদের আর কোনো ভাবনা নেই।

গরিব মানুষদের সম্পর্কে :

গরিব লোকের বাড়িতে শিশুরা খিদেয় কাতর হয়ে থাকত।

গরিবদের বাড়িতে থাকত ভাঙা কলসি, ছেঁড়া কাপড়। তারা কুঁড়েঘরে অতি কষ্টে কোনোমতে বসবাস করত। তাদের বাড়ির কাঠের খুঁটি  নড়ছে, মাটির দেয়াল ভেঙে পড়েছে, চালের খড় উড়ে যাচ্ছে।

সেই সময়ের লেখা চর্যাপদের একটি কবিতায় লেখা আছে হাঁড়িতে ভাত নেই বলে নিত্য উপবাস করে তাদের জীবন কাটছে।

 

 উত্তর:

ভাস্কর্যশিল্পের ইতিহাসে পাল যুগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাল রাজাদের আমলের মাটি, পাথর ও ধাতুর ভাস্কর্যের অনেক নিদর্শন  পাওয়া যায়।

পাল যুগের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর ছিলেন ধীমানবীটপাল

পাহাড়পুরের প্রত্নক্ষেত্রে মন্দিরের গায়ে যে পাথরের ফলক আছে তাতে স্থানীয় রীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। এই ফলকগুলিতে  বুদ্ধ অবলোকিতেশ্বর, শিব, কৃষ্ণ, বলরাম, যমুনা প্রভৃতির মূর্তি আছে। এই দেবদেবীর মধ্যে ব্রাহ্মণ্য প্রভাব লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ পাল রাজারা  বৌদ্ধ হলেও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

পাল যুগের পোড়ামাটির ভাস্কর্যগুলি ছিল লোকায়ত শিল্পের প্রতীক। এগুলিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখদুঃখ, পারিবারিক  জীবন, ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি ফুটে উঠেছে।

মানুষের মূর্তি নির্মাণ এ যুগের ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এগুলিতে  ও আধ্যাত্ত্বিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

উত্তর:

 পাল আমলের বাংলার শিল্প ও স্থাপত্য : শিল্পের ইতিহাসে বাংলায় পাল আমল বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। বাংলার পাল  যুগের শিল্পরীতিকে ‘প্রাচ্য শিল্পরীতি' বলা হয়। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা সবক্ষেত্রেই পাল আমলের অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়।

 * বৌদ্ধ ও জৈন স্তূপ : প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ ও জৈনদের স্তুপ নির্মাণের রীতি ছিল। পাল আমলেও স্তূপ নির্মাণের রীতি লক্ষণীয়। তবে  এই আমলে স্তূপ নির্মাণের রীতিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এযুগের স্তূপগুলি শিখরের মতো দেখতে ছিল। এযুগে নির্মিত স্তূপগুলির মধ্যে  উল্লেখযোগ্য হল— (1) বাংলাদেশের ঢাকা জেলার আসরফপুর, (2)  রাজশাহির পাহাড়পুর, (3) চট্টগ্রাম, (4)  পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার  ভরতপুর গ্রামের বৌদ্ধস্তূপ।

বৌদ্ধবিহার ও মন্দির : বাংলার স্থাপত্যশিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন ছিল পাল আমলে নির্মিত বৌদ্ধবিহারগুলি। এই বিহারগুলি ছিল  বৌদ্ধভিক্ষুদের বাসস্থান ও বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। পাল আমলের উল্লেখযোগ্য বিহারগুলি হল পাহাড়পুরের সোমপুর ও ওদন্তপুরের বৌদ্ধবিহার।  মন্দিরগুলির মধ্যে সোমপুর বিহারের মন্দির বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

  উত্তর:

ইউরোপে সামন্তত ত্রু: পশ্চিম ইউরোপে খ্রিস্টীয় নবম  শতকে যে বিশেষ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল, তা  ‘সামন্ততন্ত্র’ নামে পরিচিত। ত্রিভুজাকৃতি সামন্ত সমাজের একেবারে  উপরের স্তরে ছিলেন রাজা, মধ্যবর্তী স্তরে সামন্তউপসামন্তরা এবং  সর্বনিম্ন স্তরে ছিল ভূমিদাস এবং কৃষকরা। সামন্তপ্রভুরা দুর্গ নির্মাণ  করতেন এবং লৌহবর্ম-পরিহিত বীর নাইটরা তাদের হয়ে যুদ্ধ করত।  সামন্তপ্রভুরা তাদের খামারে ভূমিদাস বা সার্ফদের খাটাতেন উৎপাদনের  উদ্দেশ্যে। শুধু চাষবাস নয়, বাণিজ্যও হত আর সেই বাণিজ্যের সূত্র  ধরে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন নগর। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে ইউরোপীয়  সামন্ততন্ত্র চরম পর্যায়ে পৌঁছোয় এবং তার পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে  তা ভেঙে পড়ে।

উত্তর :

কৃষক ও রাজার মাঝে কয়েকটি স্তরে জমি ভাগ করে রাজস্ব  আদায় ও শাসন পরিচালনার ব্যবস্থাকে ‘সামন্তব্যবস্থা' বলা হয়। মধ্যযুগে ভারতে সামন্তব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ভারতে সামন্ততন্ত্রের ফলাফলগুলি হল নিম্নরূপ-

সামন্তব্যবস্থার ফলে রাজশক্তির দুর্বলতাগুলি প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

সামন্তনেতাদের দাপটে গ্রামগুলির স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাও নষ্ট হয়।

অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ায় কৃষির উপর চাপ বৃদ্ধি পায়।

 উত্তর:

দক্ষিণ ভারতে মন্দিরকে কেন্দ্র করে লোকালয় গড়ে উঠত  কারণ—

1.মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যেমন পুরোহিত, রাঁধুনি, মালাকার, গায়ক, নর্তক-নর্তকী প্রমুখ সবাই মন্দির চত্বরে বসবাস করত।

2.মন্দিরের নির্মাণশিল্পী, ভাস্কর এমনকি পুণ্যার্থীরাও মন্দিরের কাছাকাছি বসবাস করত।

 3.দক্ষিণ ভারতে যেহেতু রাজা ও ব্যবসায়ীরা মন্দির কর্তৃপক্ষকে নিষ্কর জমি প্রদান করতেন, তাই জমি থেকে প্রাপ্ত ফসল মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবনযাপনের জন্য ব্যয় করা হত।

উত্তর:

দক্ষিণ ভারতে চোলরা কৃষির উন্নতির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন।

খাল কেটে সেচব্যবস্থা : চোল রাজারা তামিলনাড়ু অঞ্চলে কাবেরী ও তার শাখানদী থেকে খাল কেটে জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা। করেছিলেন।

বৃষ্টির জল ধরে রেখে সেচব্যবস্থা : যেখানে নদী থেকে সেচের ব্যবস্থা কম ছিল সেখানে পুকুর কেটে বৃষ্টির জল ধরে রেখে সেচের কাজ করা হত।

কুয়ো খুঁড়ে সেচব্যবস্থা : কোথাও কোথাও কুয়ো খুঁড়ে কৃষিতে জলসেচের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

উত্তর :

চোল শাসনব্যবস্থায় উর ও নাডু হল দুটি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক সংস্থা।

উর: চোল  শাসনব্যবস্থায় প্রদেশ বা মণ্ডলমে কৃষকদের বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রামকে শাসন করত যে গ্রাম পরিষদ, তাকে উর বলা হত।

 নাড়ু : গ্রাম পরিষদ বা উর শাসিত কয়েকটি গ্রামকে নিয়ে গঠিত হত নাড়ু।

 উর ও নাড়ুর কাজ : উরনাড়ুর কাজ ছিল—

1.স্থানীয় অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন পরিচালনা করা,

  1. বিচার করা,
  2. রাজস্ব বা কর আদায় করা।

উত্তর :

খ্রিস্টীয় নবম থেকে একাদশ শতকের মধ্যেদক্ষিণ ভারতে  বাণিজ্যের উন্নতি ঘটেছিল । এই সময় দক্ষিণ ভারতে বাণিজ্যের উন্নতির কারণ ছিল—

1. দক্ষিণ ভারতের চোল রাজারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে সেইসব দেশের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বণিকদের ব্যাবসাবাণিজ্য বেড়েছিল।

2.দক্ষিণ ভারতের প্রশাসন ব্যাবসাবাণিজ্যের জন্য বণিকদের উৎসাহিত করত। ‘নগরম' নামে একটি পরিষদ ছিল, যার কাজ ছিল ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ও তাদের বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলা করা।

উত্তর:

খ্রিস্টীয় সপ্তম-দ্বাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে রাজাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব। তা ছাড়া অন্যান্য করও আদায় করা হত।

 রাজস্ব বা কর :

 ভূমি রাজস্ব : রাজারা কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত শস্যের উ থেকে অংশ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় করত।

বাণিজ্য কর : ভূমি রাজস্ব ছাড়াও রাজারা পশুপালক, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও রাজস্ব আদায় করতেন।

অতিরিক্ত কর : অনেক সময় রাজারা যুদ্ধ, বাঁধ নির্মাণ, মন্দির নির্মাণ ও অন্যান্য সংস্কারমূলক কাজের জন্য অতিরিক্ত কর আদায় করতেন।

রাজস্ব আদায় : রাজা স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবারগুলিকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিতেন। আদায়কারীরা রাজস্বের একাংশ রেখে বাকি অংশ রাজকোশে জমা দিতেন।

উত্তর:

দক্ষিণ ভারতের রাজাদের অনেকে স্থানীয় সামন্ত ও ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতেন। অনেক সময় রাজা ব্রাহ্মণদের জমি দান করতেন। ব্রাহ্মণরা অনাবাদী জমি ও জঙ্গল পরিষ্কার করে নতুন জনবসতি তৈরি করতেন। রাজা ব্রাহ্মণদের যে জমি দিতেন তার জন্য ব্রাহ্মণদের কর দিতে হত না। রাজার জমিদানের এই ব্যবস্থাকে ব্রষ্মদেয় ব্যবস্থা বলা হয়।

 উত্তর :

পাল ও সেন রাজারা প্রজাদের কাছ থেকে নানা ধরনের কর আদায় করতেন।

কৃষি কর : রাজারা কৃষি থেকে উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (ঊ ভাগ) কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করতেন ।

বাণিজ্য কর : রাজারা ব্যাবসাবাণিজ্য করার জন্য বণিকদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন। হাট ও খেয়াঘাট থেকেও কর আদায় করা হত। প্রজারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাজাকে কর দিত।