Chapter-3, ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাদ্রাজে একটি বাণিজ্যিক ঘাঁটি তৈরি করেছিল। ব্রিটিশ কোম্পানি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য
মাদ্রাজপট্টনম গ্রামে সেন্ট জর্জ দুর্গ বানায়। পরবর্তীকালে মাদ্রাজ ও সেন্ট জর্জ দুর্গকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় সেন্ট জর্জ দুর্গ প্রেসিডেন্সি বা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি।

দক্ষিণ ভারতের বিরাট অঞ্চল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মধ্যে ছিল তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও উড়িষ্যার বেশ কিছু অঞ্চল। ঋতুর ভিত্তিতে দুটি কেন্দ্র থেকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হত- 1 গ্রীষ্মকালে ওটাকামুন্দ থেকেও শীতকালে মাদ্রাজ থেকে।

পশ্চিম ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান ঘাঁটি ছিল সুরাটে। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে সুরাট ঘাঁটির অবনতি ঘটে। এবং বোম্বাই ঘাঁটির উত্থান শুরু হয়। প্রথমদিকে বোম্বাই ঘাঁটি পশ্চিম প্রেসিডেন্সি নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে আরব সাগরের তীরবর্তী এই বোম্বাই বন্দর-শহর ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বোম্বাই প্রেসিডেন্সি হিসেবে খ্যাতিলাভ করে।

বোম্বাই প্রেসিডেন্সি ছিল পশ্চিম ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। বোম্বাই প্রেসিডেন্সির উত্থান হয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুরাট ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে। ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বোম্বাইকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ কোম্পানির কার্যকলাপ বিস্তৃত হয়। বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ছিল— পশ্চিম ভারত, মধ্য ভারত, আরব সাগরের তীরবর্তী অঞ্চল ও সিন্ধু প্রদেশ।

বাংলা বা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গড়ে উঠেছিল কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ কোম্পানি ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে
জয়লাভ, ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ, ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে নিজামতের অধিকার লাভ করে বাংলার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ফলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাংলা ভারতে কোম্পানির প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয় এবং বাংলা প্রেসিডেন্সি হিসেবে গড়ে ওঠে। বাংলার ব্রিটিশরা নিরাপত্তার জন্য * ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ বানিয়েছিল। তাই বাংলা প্রেসিডেন্সি ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ প্রেসিডেন্সি নামেও পরিচিত।

কলকাতাকে কেন্দ্র করে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গড়ে উঠেছিল। প্রথমে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত এলাকা ছিল – বাংলা, বিহার,
উড়িষ্যা, আসাম ও ত্রিপুরা। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পাঞ্জাব, উত্তর ভারত, মধ্য ভারত ও গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা অঞ্চল।

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তর ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
তিনটি প্রেসিডেন্সি হল- মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি,  বোম্বাই প্রেসিডেন্সি,  বাংলা প্রেসিডেন্সি।
• মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি : ব্রিটিশ কোম্পানি মাদ্রাজে সেন্ট জর্জ দুর্গ নামেও পরিচিত। বানিয়েছিল। তাই মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি সেন্ট জর্জ দুর্গ প্রেসিডেন্সি
• বোম্বাই প্রেসিডেন্সি : বোম্বাই পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত বলে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি গোড়ার দিকে পশ্চিম প্রেসিডেন্সি নামে পরিচিত ছিল।
• বাংলা প্রেসিডেন্সি : বাংলা প্রেসিডেন্সির প্রধান কেন্দ্র ছিল কলকাতা। কোম্পানি কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ বানিয়েছিল। তাই বাংলা প্রেসিডেন্সি ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ প্রেসিডেন্সি নামেও পরিচিত।

ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ করে ভারতের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যকলাপের ওপর
হস্তক্ষেপ করেছিল। এর ফলে-
1 গভর্নর জেনারেল নামক একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথম গভর্নর জেনারেল হন।
2 মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির গভর্নরগণ বাংলার গভর্নর জেনারেলের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হন। কলকাতা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের রাজধানী হয়।

১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত পিটের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল' তৈরি করা হয়। এই বোর্ডের ওপর কোম্পানির সামরিক ও অসামরিক শাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ভারতে কোম্পানির সমস্ত প্রশাসনিক কর্তাদের ওপর গভর্নর জেনারেলের আধিপত্যও এই আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলার গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস প্রচলিত আইনগুলিকে সংহত করে কোড বা বিধিবদ্ধ আইন চালু করেছিলেন। তিনি আইন ব্যবস্থাকে সংহত করার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন সেগুলি হল-
1 তিনি দেওয়ানি সংক্রান্ত বিচার ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পৃথক করেছিলেন।
2 নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদনের অধিকার দিয়েছিলেন।

লর্ড কর্নওয়ালিস ছিলেন বাংলার গভর্নর জেনারেল। তিনি ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য প্রচলিত আইনগুলিকে সংহত করে যে কোড বা বিধিবদ্ধ আইন চালু করেন তাকেই 'কর্নওয়ালিস কোড' বলা হয়। এর ফলে দেওয়ানি সংক্রান্ত বিচার ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব সংক্রান্ত বিষয়কে আলাদা করা হয়েছিল।

১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস নতুন বিচার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এই আইন অনুসারে-
1 প্রতি জেলাতে একটি করে দেওয়ানি ও একটি করে ফৌজদারি আদালত তৈরি করা হয়।
2 দেওয়ানি আদালতগুলিতে প্রধান ছিলেন ইউরোপীয়। তবে এখানে আইনের ব্যাখ্যা করতেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও মুসলিম মৌলবিরা।
3 ফৌজদারি আদালতে কাজি ও মুফতি আইনের ব্যাখ্যা করতেন।

১৭৭৩ থেকে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে।
● ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে বিচার ব্যবস্থার সংস্কার-
1 বিচার বিভাগের সব আদেশ লিখে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
2 সব দেওয়ানি আদালতগুলিকে একই আইনের অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়।

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং আইন অনুযায়ী ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সুপ্রিমকোর্ট তৈরি হয় কলকাতায়। সুপ্রিমকোর্টে নিয়োজিত একজন প্রধান বিচারপতি ও তিনজন বিচারপতি
কেবলমাত্র ভারতে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদেরই বিচার করবে বলে স্থির করা হয়। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সুপ্রিমকোর্টের সাথে কোম্পানির বিরোধ দেখা দিয়েছিল।

ওয়ারেন হেস্টিংস বিচার ব্যবস্থায় সমতা আনার জন্য সচেষ্ট হন। এর জন্য তিনি-
1 অভিন্ন আইন প্রচলিত আইনের অভিন্ন ব্যাখ্যার ব্যবস্থা করেন।
2 আইনের ইংরেজি অনুবাদ : তিনি ১১ জন হিন্দু পণ্ডিতকে দিয়ে হিন্দু আইনের সংকলন করেন এবং তার ইংরেজি অনুবাদ করেন। একইভাবে মুসলমান আইনেরও সংকলন করা হয়।
• আইনের ইংরেজি অনুবাদ দিয়ে ইউরোপীয় বিচারকগণ ভারতীয় সহকারী ছাড়াই বিচার করতে পারতেন।

মুঘল আমলের পুলিশ ব্যবস্থা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে সংস্কার করা হয়েছিল। সংস্কারের কারণ ছিল
1 আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা : ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে আইনশৃঙ্খলার যে অবনতি ঘটেছিল তার মোকাবিলা করা।
2 আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা : ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য পুলিশ ব্যবস্থার সংস্কার
করেছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য যে সেনাবাহিনী গঠন করেছিল, তাকে ‘কোম্পানির সেনাবাহিনী’ বলা হয়।
ব্রিটিশ কোম্পানি প্রথম থেকেই স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কোম্পানি মুঘল আমলের প্রথা অনুসরণ করে নিজেদের সেনাবাহিনী বা সিপাহি বাহিনী তৈরি করেছিল।

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় সুপ্রিমকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট-১৭৭৩' অনুসারে কলকাতায় সুপ্রিমকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। » আইনের শাসন :
ভারতে ইংরেজ শাসনের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব ছিল আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠা। আইনের শাসন বলতে বোঝায় দেশের নির্দিষ্ট আইন অনুসারে শাসন পরিচালনা করা, আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ইংরেজ শাসনের পূর্বে ভারতে আইনের শাসন ছিল না।

শাসনসংস্কার :
1 তাঁর আমলে ভারতীয়দের পুনরায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি কালেক্টর প্রভৃতি পদে নিয়োগ করা চালু হয়। লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক
2 ব্রিটিশ কোম্পানি কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণের পরিবর্তে শুধুমাত্র যোগ্যতা বিচার করবে— এই নীতি চালু করার কথা বলা হয়।
3 ঠগি দস্যুদের দমনের উদ্দেশ্যে বেন্টিঙ্ক একটি বিশেষ বিভাগ গঠন করেন।

ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনার পর ব্রিটিশ শিক্ষানীতি বা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে। এর কারণ ছিল—
1 প্রশাসনিক সুবিধা : ব্রিটিশ সরকার ইংরেজি শিক্ষিত কর্মচারী তৈরি করে প্রশাসনিক সুবিধা লাভের জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষার
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটায়।
2 খ্রিস্টধর্মের প্রসার : খ্রিস্টান মিশনারিরা খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য প্রসার ঘটায়।

লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে চাকরি করতে আসা ইউরোপীয় প্রশাসকদের ভালো করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইউরোপীয় অসামরিক ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ প্রশাসকদের পরিচিত করানো।

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যগুলিকে আধুনিক ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা এবং ভারতের প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে চর্চার উদ্দেশ্যে উইলিয়ম জোনস ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়ম জোনস এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এই চর্চার ফলে ভারতীয় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্ক দৃঢ় হয়।

টমাস বেবিংটন মেকলে ছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের আইন সচিব এবং ‘কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন'-এর সভাপতি। তিনি ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা সংক্রান্ত একটি বিখ্যাত প্রতিবেদন (মিনিট) পেশ করে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের সুপারিশ করেন। তাঁর সুপারিশের ভিত্তিতে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।

বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ঘোষণা করেছিলেন যে সরকারি চাকরিতে ইংরেজি জানা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া
হবে। লর্ড হার্ডিঞ্জের এই ঘোষণার ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল।

স্যার চার্লস উড ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি।
• তিনি ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক পরিবর্তনের জন্য একটি নির্দেশনামা পেশ করেন, এটি ‘চার্লস
উডের প্রতিবেদন' নামে পরিচিত। একে 'ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের মহাসনদ' বলেও অভিহিত করা হয়। এই
নির্দেশনামার ওপর ভিত্তি করে ভারতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো গড়ে ওঠে।

ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির বিস্তারের প্রধান লক্ষ্যই ছিল। সমাজের কিছু মানুষকে ইংরেজি শিখিয়ে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সাথে যুক্ত করে নেওয়া। অর্থাৎ সর্বসাধারণকে শিক্ষার আলোতে আনার কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। এই শিক্ষানীতিতে পুথিগত চর্চার উপর জোর দেওয়া হত। ভারতীয় প্রাচীন শিক্ষার চর্চা এবং নারীশিক্ষার বিষয়টি ছিল অবহেলিত।

জেমস রেনেল ছিলেন একজন সার্ভেয়ার। তিনি ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নদীপথগুলি জরিপ করেছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল পদে নিয়োগ করেন। তিনি বাংলার নদীপথগুলি জরিপ করে ১৬টি মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। এগুলি ছিল বাংলার নদীপথের প্রথম মানচিত্র।

‘রেগুলেটিং’ আইনের ত্রুটি ধরা পড়লে তার প্রতিকারের জন্য ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ‘ছোটো পিট' (Younger Pitt)-এর আমলে একটি নতুন আইনের প্রস্তাব পাস হয়। এটিই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যাক্ট ১৭৮৪’, বা সাধারণভাবে পিটের ভারত আইন' (Pitt's India Act 1784) নামে পরিচিত। ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকে আইনটি বলবৎ হয়েছিল।
» পিটের ভারত আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য: পিটের ভারত আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্যগুলি হল-
1 ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’, ১৭৭৩-এর ত্রুটিগুলি দূর করা এবং
2 ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকার যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখে তার কাজকর্মের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
» পিটের ভারত আইনে কোম্পানির পরিচালনা বিষয়ক ধারা: এই আইনে কোম্পানির শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উইলিয়ম পিট
1 ভারতে কোম্পানির গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা চার থেকে কমিয়ে তিন করা হয়।
2 কোম্পানির সামরিক ও অসামরিক শাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল’ গঠন করা হয়।
3 মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির ওপর গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
4 কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীগণ ভারত থেকে স্বদেশে ফিরে আসার সময় কী পরিমাণ টাকা নিয়ে আসছে তার হিসেব দাখিল করার কথা বলা হয়।
5 আইনে বলা হয় যে, ভারতে রাজ্যজয় ইংরেজ জাতির অভিপ্রায় ও আদর্শের বিরোধী। পরিশেষে বলা যায়, পিটের ভারত আইনের দ্বারা ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়েছিল। এই আইনে যে প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় অক্ষুণ্ণ ছিল।

দ্বৈত শাসনের কালে বাংলার বিচার ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছিল। ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় প্রথম সংস্হত বিচার ব্যবস্থার ভত্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
→ মফস্সল দেওয়ানি ও মফস্সল ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠা : ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলাকে ৩৫টি জলায় ভাগ করেন এবং প্রতি জেলায় মফস্সল দেওয়ানি ও মফস্সল ফৌজদারি আদালত স্থাপন করেন।
-→ সদর দেওয়ানি ও সদর নিজামত আদালত প্রতিষ্ঠা : মফস্সল দেওয়ানি ও মফস্সল ফৌজদারি আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য কলকাতায় সদর দেওয়ানি আদালত ও মুরশিদাবাদের নিজামত আদালত স্থাপন করেন।
● বিচারের এক্তিয়ার:
1 ১০ টাকার অনূর্ধ্বে ছোটোখাটো মামলার বিচার ইজারাদাররা করতে পারতেন।
2 ৫০০ টাকা পর্যন্ত মামলার বিচার করতে পারত মফস্সল দেওয়ানি আদালত।
3 ৫০০ টাকার ঊর্ধ্বে যে-কোনো মামলার বিচার হত সদর দেওয়ানি আদালতে।
● বিচারক : জেলার কালেক্টর জেলার উভয় আদালতে হিন্দু পণ্ডিত ও কাজির সাহায্য নিয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
1 দেওয়ানি : সদর দেওয়ানি আদালতে গভর্নর ও তাঁর কাউন্সিলের দুজন সদস্য বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
2 নিজামত: সদর নিজামত আদালতের প্রধান বিচারক ছিলেন নবাব। নবাবের প্রতিনিধি, প্রধান কাজি ও মুফতি এই বিচারকার্যের দায়িত্ব পালন করতেন। গভর্নর জেনারেল এই আদালতের কাজকর্মের ওপর নজর রাখতেন।
১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে বলা হয়েছিল যে, বিচার ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আদালতে মামলার নথিপত্র সংরক্ষণ ও সমস্ত আদেশ লিখে রাখ হবে। তিনি বিচারকদের মাসিক বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস ও সুপ্রিমকোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজ ইম্পে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে ইউরোপীয়করণ করার চেষ্টা করেন।

গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেন। বাংলার বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ওয়ারেন হেস্টিংস যে কাঠামো গড়ে তোলেন কর্নওয়ালিস তার সম্পূর্ণতা দান করেন।কর্নওয়ালিসের উদ্দেশ্য : কর্নওয়ালিসের উদ্দেশ্য ছিল—
প্রথমত, মুসলিম আইনের ত্রুটি দূর করে বিচার ব্যবস্থায় ইউরোপীয় চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটানো।
দ্বিতীয়ত, বিচার ব্যবস্থার উন্নতি ও আধুনিকীকরণ করা।
তৃতীয়ত, বিচার ব্যবস্থায় ইউরোপীয় বিচারকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
» অস্কার :
1 কর্নওয়ালিস কলকাতা, মুরশিদাবাদ, পার্টনা ও ঢাকায় চারটি প্রাদেশিক দেওয়ানি আদালত স্থাপন করেন। এই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সদর দেওয়ানি আদালতে আপিল কর যেত।
2 সদর দেওয়ানি আদালতের অধীন পর্যায়ক্রমে প্রদেশ, জেলা, সদর আমিন ও মুন্সেফি আদালত স্থাপন করে ।
3 তিনি জেলার ফৌজদারি আদালত তুলে দেন এবং কলকাতা, মুরশিদাবাদ, পাটনা ও ঢাকায় চারটি ভ্রাম্যমান আদালত প্রতিষ্ঠা করেন। এই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সদর নিজামত আদালতে আপিল করা যেত। সদর নিজামত আদালত মুরশিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়।
বিচারক:
1 দেওয়ানি : সপার্ষদ গভর্নর জেনারেল সদর দেওয়ানি আদালতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। জেলার দেওয়ানি আদালতে ‘জজ’ পদাধিকারী ইংরেজ বিচারক বিচারকার্য সম্পাদন করতেন।
2 নিজামত: সদর নিজামত আদালতে সপার্ষদ গভর্নর জেনারেল বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। প্রাদেশিক আদালতে কাজি ও মুফতিকে সঙ্গে নিয়ে দুজন ইংরেজ বিচারক বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
বিচার ব্যবস্থায় দণ্ডবিধির কঠোরতা হ্রাস এবং মানবিকতার আদর্শ তুলে ধরে কর্নওয়ালিস বিচার সংস্কারে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

ইংরেজরা যখন বাংলার শাসনক্ষমতা লাভ করে তখন বাংলার পুলিশি ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ওয়ারেন হেস্টিংস শাসনভার গ্রহণ করে এদেশে পুলিশি ব্যবস্থা প্রবর্তনে সচেষ্ট হন। তিনি প্রাক্ ব্রিটিশ আমলের বা নবাবি আমলের পুলিশি ব্যবস্থার সঙ্গে কিছু নতুন ব্যবস্থা সংযোজন করেন।
সংস্কার :
|1 বাংলা ও বিহার যথাক্রমে ১০টি ও ৮টি ফৌজদারি জেলায় বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক জেলায় শাস্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একজন ফৌজদার এবং তাঁর অধীনে কয়েকজন সিপাহি থাকত।
2 শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন কোতোয়াল।
3 গ্রামাঞ্চলে জমিদাররা নিজ নিজ এলাকায় শাস্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন। ওয়ারেন হেস্টিংস পুলিশি ব্যবস্থাকে জোরদার করার জন্য সচেষ্ট হন।
4 ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে হেস্টিংস ফৌজদারের পদ তুলে দেন এবং কোম্পানির দেওয়ানি আদালতের বিচারকদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিপাহি ও কেরানি তার কাজে সাহায্য করতেন।

ঐতিহাসিক পার্সিভেল স্পিয়ার বলেছেন যে, ওয়ারেন হেস্টিংস ছিলেন 'ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’। তবে ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতে পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কারে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেননি।

গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিমের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার। পূর্বে জমিদারগণ নিজ নিজ এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন।
সংস্কার : লর্ড কর্নওয়ালিসের সংস্কার অনুসারে-
1 কর্নওয়ালিস জমিদারদের কাছ থেকে পুলিশি ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি নিয়মিত পুলিশবাহিনী গড়ে তোলেন।
2 ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রত্যেক জেলাকে কতকগুলি থানায় ভাগ করে প্রতি থানায় একজন দারোগা নিযুক্ত করেন। প্রতি থানার গড় এলাকা ২০ মাইল নির্ধারিত হয়। প্রতি থানায় ২০-৩০ জন কনস্টেবল রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
3 জেলার ম্যাজিস্ট্রেট দারোগা নিয়োগ ও থানার কাজকর্মের ওপর নজর রাখতেন।
4 প্রত্যেক গ্রামের চৌকিদার গ্রামের আইনশৃঙ্খলার ওপর নজর রাখতেন।
5 শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কোতোয়াল থাকতেন। কলকাতার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হয়েছিলেন। কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত পুলিশি ব্যবস্থা পরবর্তীকালে সমগ্র ভারতবর্ষে চালু হয়। কয়েকজন কনস্টেবলের সাহায্যে একটি বিরাট থানার শাস্তিশৃঙ্খলা রক্ষা সহজসাধ্য না হলেও, পুলিশি ব্যবস্থায় কর্নওয়ালিসের সংস্কার তাঁর সৃজনী প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে।

বাংলার গভর্নর ও গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিস বাংলার বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করেছিলেন। উভয়ের বিচার সংস্কারের যেমন কিছু মিল ছিল, তেমনি কিছু অমিলও ছিল।
" মিলসমূহ:
• ওয়ারেন হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিস উভয়েই বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করে ইউরোপীয় বিচারপতিদের সংখ্যা বাড়িয়েছিলেন। তাঁরা ইউরোপীয় বিচারকদের ভারতীয় সহকারীদের ওপর নির্ভরশীলতার অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন।
● উভয়েই আইনগুলিকে বিধিবদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিংস হিন্দু আইন ও মুসলমান আইনগুলি পৃথকভাবে সংকলন করেছিলেন। পরে তিনি এগুলির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। কর্নওয়ালিস আইনগুলিকে সংকলন করে কোড বা বিধিবদ্ধ আইন চালু করেছিলেন।
● উভয়েই সব আদালতগুলিকে একই নিয়মে আনার পক্ষপাতী ছিলেন।
★ তামিলসমূহ:
ওয়ারেন হেস্টিংস
• বিচার ব্যবস্থায় ওয়ারেন হেস্টিংস অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের • সহায়তা নিয়েছিলেন।
কর্নওয়ালিস
কর্নওয়ালিস সব আদালতে ইউরোপীয় বিচারপতি নিয়োগ করেছিলেন এবং বিচার ব্যবস্থা থেকে ভারতীয়দের পুরোপুরি বাদ দিয়েছিলেন।
"ওয়ারেন হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিসের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে ভারতীয়দের ওপর প্রভাব :
11 ওয়ারেন হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিসের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের ফলে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের সূচনা হয়।
12 সারাদেশে একই আইন প্রবর্তনের সূচনা হয়।
13 বিচার বিভাগের সমস্ত আদেশ তখন থেকেই লিখে রাখার ব্যবস্থা হয়।

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন পাস হয়।
» কোম্পানির প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
● লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক সংস্কার : লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হওয়ার পর ভারতের প্রশাসনিক সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। লর্ড কর্নওয়ালিস আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের অনুকরণে ঔপনিবেশিক ভারতে শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
★ প্রশাসনিক সংস্কার :
1 দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠন : কোম্পানির আমলে কর্মচারীরা বেআইনি ব্যাবসাবাণিজ্যে লিপ্ত হত এবং একাধিক পদ দখল করে অবৈধভাবে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। কর্নওয়ালিস স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য ঘোষণা করেন যে, (ক) কোম্পানির কোনো কর্মচারী ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত হতে পারবে না। (খ) একই কর্মচারী একাধিক বিভাগে নিযুক্ত হতে পারবে না। কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজের পুলিশ বাহিনী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি : কোম্পানির কর্মচারীদের অল্প বেতনে কাজ করতে হত। লর্ড কর্নওয়ালিস উপলব্ধি করেন যে, কোম্পানির কর্মচারীদের দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হল তাদের অল্প বেতন। তিনি কর্মচারীদের পদ ও অভিজ্ঞতা অনুসারে বেতন বৃদ্ধি করে তাদের কর্মদক্ষ করে তুলতে সচেষ্ট হন।
ইউরোপীয়দের নিয়োগ : লর্ড কর্নওয়ালিস সরকারি উচ্চপদে বা বছরে ৫০০ পাউন্ডের বেশি বেতনের চাকুরিতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ করেন। ওইসব উচ্চপদে ইউরোপীয়দের নিয়োগ প্রথা চালু করেন। "
পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার : লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি গড়ে ২০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে সার্কেল বা থানার সৃষ্টি করেন। প্রতি থানায় একজন ভারতীয় দারোগা থাকতেন। দারোগা কয়েকজন কনস্টেবলের সাহায্যে থানা এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতেন। ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠাতা ও পথিকৃৎ ছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিস। তাঁর প্রশাসনিক সংস্কার ভারতের ইতিহাসে নবযুগের সূত্রপাত করেছিল।

ভারতে কোম্পানি শাসনের বিস্তার ও সেনাবাহিনীর বৃদ্ধির সম্পর্ক:
ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিস্তারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বৃদ্ধি সমানুপাতিকভাবে বেড়েছিল। অর্থাৎ ভারতে পানির সাম্রাজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর বৃদ্ধি ঘটেছিল। সমানুপাতিক বৃদ্ধির কারণ;
সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামনে যখনই নতুন এলাকা দখলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তখনই কোম্পানির প্রয়োজন হয়েছিল আরও সেনাবাহিনীর। অধিকৃত অঞ্চল দখলে রাখার জন্য : ব্রিটিশ কোম্পানি নতুন যে যে এলাকা দখল করেছিল সেই এলাকার নিরাপত্তার জন্য এবং অধিকৃত
অঞ্চলে কোম্পানির কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করার জন্য সেনাবাহিনীর বৃদ্ধি করা হয়েছিল। বিভিন্ন বিদ্রোহের মোকাবিলা করার জন্য : ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের ক্ষোভও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ক্ষুব্ধ জনগণ ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদের জন্য বার বার বিদ্রোহ ঘোষণাও করত। ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহের মোকাবিল করার জন্য কোম্পানি সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করেছিল। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল সেনাবাহিনী। ১৮৮০-র দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নবাহিনীতে ২ লক্ষ ৫০ হাজার সেনা ছিল।

স্তর ব্রিটিশ কোম্পানির প্রশাসন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের ভূমিকা:
ঔপনিবেশিক প্রশাসনে আমলাতন্ত্র অত্যন্ত জরুরি। ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনে আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আমলাতন্ত্র ছিল ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রধান হাতিয়ার।
■ আমলাদের প্রধান কাজ ছিল সরকার যে নীতি গ্রহণ করত সেই নীতিগুলি প্রয়োগ করা বা কার্যকর করা। তবে সরকারি নীতি নির্ধারণে মিলাদের স্বাধীনতা ছিল না।
একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠী হিসাবে ঐক্যবদ্ধ আমলা : লর্ড কর্নওয়ালিস সিভিল সার্ভিস বা অসামরিক প্রশাসনে আমলাতন্ত্রকে সংগঠিত করেছিলেন। কর্নওয়ালিস ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনকেনীতিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে-লর্ড বর্নওয়ালিসের ধারণা ছিল, হিন্দুস্তানের প্রতিটি মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত (Every native of Hindustan is corrupt)
1 APO ortom erafites facutat monet
2 আমাদের ভিন্ন ব্যবস্থা করেন।
3ীদের ব্যক্তি ব্যবসা উপহার দেওয়া বন্ধ করেন ও তাদের বেতন বৃদ্ধি করেন।
4 সভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের ব্রিটিশ ভারতে বিচার ব্যবস্থা লর্ড ওয়েলেসলি ইউরোপীয় প্রশাসকদের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
1 ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ: লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ প্রতিষ্ঠা করে সিভিল সর্ভেন্ট বাঅসামরিক প্রশাসকদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
2 হেইলবেরি কলেজ : ব্রিটিশ কোম্পানির পরিচালক সভা কলকাতার বদলে ব্রিটেনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। হেইলবেরি কলেজপ্রতিষ্ঠা করে প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এরপর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সব প্রার্থীদেরই এই কলেজে পড়াশোনা করতে হত।সিভিল সার্ভেন্টরা একই কলেজে পড়ত বলে তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ তৈরি হয়। তাঁরা নিজেদের একটি আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে শুরু করে।

আইনের শাসন ভারতে ইংরেজ শাসনের সবচেয়ে বড়ো অবদান হল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। আইনের শাসন বলতে বোঝায়-CD দেশের সকলকে একই আইন মেনে চলতে বাধ্য করা। 2 আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।PP ভারতে আাইনের শাসনের প্রয়োগ। ইংরেজরা ভারতে আইনের শাসনের উচ্চ আদর্শ প্রচার করলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। বিচার ব্যবস্থা ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হত। বিচার ব্যবস্থায় ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয়রা উঁচু পদ পেতেন না।
1 আমলাদের নির্দিষ্ট মেয়াদের চাকরিতে নিয়োগ করেন।
2 আমলাদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন।
3 প্রশাসনের কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যাবসা ও উপহার নেওয়া বন্ধ করেন ও তাদের বেতন বৃদ্ধি করেন।
4 লর্ড কর্নওয়ালিস সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের নিয়োগ বন্ধ করেন।
• কর্নওয়ালিস কোড : ভারতের বড়োলাট লর্ড কর্নওয়ালিস কর্মচারীদের অসাধুতা ও দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য যে আচরণ বিধি ও আইন
ণয়ন করেছিলেন তাকে ‘কর্নওয়ালিস কোড’ বলা হয়। কর্নওয়ালিস কোডে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনায় রাজ্যবিস্তার ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণে বেশি মনোযোগী হয়েছিল। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টি পড়েছিল বিলম্বে। ভারতে সরকারিভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তিত হয় বড়োলাট লর্ড বেন্টিঙ্কের মিলে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে।
→ উনিশ শতকে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা : ভারতে সরকারি প্রচেষ্টায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তনের পূর্বে বেসরকারি উদ্যোগে পাশ্চাত্য শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয় খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্যোগে।
• খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচেষ্টা : খ্রিস্টান মিশনারিগণ পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
[1 ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়ম কেরি, মার্শম্যান ও উইলিয়ম ওয়ার্ড শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যাপটিস্ট মিশন ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা করে।
2 বিশপ মিডলটন শিবপুরে ‘বিশপস্ কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
3 স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইন্সটিটিউশন, যা বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে পরিচিত। তিনি অনেকগুলি মিশনারি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
4 তা ছাড়া বোম্বাই-এর উইলসন কলেজ (১৮৩২ খ্রি.), মাদ্রাজের খ্রিস্টান কলেজ (১৮৩৭ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা ছিল উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।

টমাস মেকলে ছিলেন ভারতের বড়োলাট উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের আইসচিব। ভারতের শিক্ষানীতি কী হবে সে সম্পর্কে প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট এবং পাশ্চাত্যবাদী বা অ্যাংলিসিস্টদের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়েছিল। টমাস মেকলে ভারতের সরকারি শিক্ষানীতি সম্বন্ধে এই বিরোধের মীমাংসা করেছিলেন।
• প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী দ্বন্দ্ব : যারা প্রাচ্য শিক্ষাকে সরকারি শিক্ষানীতি হিসেব চালু করার পক্ষপাতী ছিলেন তাদের প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট বলা হয়। প্রাচ্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাধাকান্ত দেব, এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক প্রমুখ। যারা পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সরকারি শিক্ষানীতি হিসেবে চালু করতে চেয়েছিলেন তারা পাশ্চাত্যবাদী বা অ্যাংলিসিস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রামমোহন রায়, আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখ।
• মেকলের ভূমিকা : টমাস মেকলে ‘কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন’-এর সভাপতি হয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন উগ্র পাশ্চাত্যবাদী। তিনি ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ২ ফেব্রুয়ারি ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য বড়োলাট লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের কাছে একটি প্রতিবেদন বা মিনিটস পেশ করেছিলেন এটি ‘মেকলে মিনিটস’ নামে খ্যাত। পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সরকারি শিক্ষানীতি হিসেবে গ্রহণ : টমাস মেকলের এবং তাঁর প্রতিবেদনের যুক্তির ফলে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি শিক্ষাকে সরকারি শিক্ষানীতি হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলশ্রুতিতে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার জয়যাত্রার সূচনা হয়।

বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের জন্য ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই একটি নির্দেশনামা প্রকাশ করেন। এই নির্দেশনামা চার্লস উডের প্রতিবেদন (Wood's Despatch) নামে খ্যাত।
» চার্লস উডের সুপারিশ: উডের নির্দেশনামা বা প্রতিবেদনের সুপারিশগুলি হল—
1 শিক্ষার প্রসারের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষাবিভাগ গঠন করা।
2 কলকাতা, বোম্বাই ও মাত্রাজে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা।
3 সুদক্ষ শিক্ষক তৈরির জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ স্থাপন করা।
4 দেশীয় ভাষার মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষা প্রদান করা।
5 নারীশিক্ষার প্রসার ঘটানো।
•চার্লস উডের সুপারিশের ফলাফল : চার্লস উডের নির্দেশনামার ফলে—
চার্লস উড
1 ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে বড়োলার্ট লর্ড ডালহৌসি বাংলা, বোম্বাই, পাঞ্জাব প্রভৃতি প্রদেশে শিক্ষাদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন।
2 ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিশেষে বলা যায়, ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে উদ্রের প্রতিবেদনের ফলে ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সারা ভারতে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা হয় ১৩৬৩টি, যা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ছিল মাত্র ১৬৯টি। এই সময়ে বেসরকারি উদ্যোগেও বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

উনিশ শতকের ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের প্রভাবে ভারতে শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক জীবনে উন্নতি হয়েছিল।
পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের প্রভাব:
1 পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার : ব্রিটিশ সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে ভারতে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটেছিল। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠশালা, টোল, মক্তব ও মাদ্রাসায় সাহিত্য, ব্যাকরণ, ধর্মগ্রন্থ, তর্কশাস্ত্র, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির পঠন-পাঠন চলত। পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তনের ফলে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি, ইউরোপীয় সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত, দার্শনিক তত্ত্ব প্রভৃতির প্রসার ঘটেছিল, যার প্রভাবে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছিল।
2 ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব: পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ফলে ভারতে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল ভারতীয়দের এক অংশ চাকরি লাভের জন্যপাশ্চাত্য শিক্ষা লাভ করেছিল। তা ছাড়া অনেকে ইংরেজি শিখে উকিল, ডাক্তার, শিক্ষক, সাংবাদিকতার পেশায় নিযুক্ত হয়েছিল। ব্যাবসাবাণিজ্যের সুবিধার জন্য ব্যবসায়ীরাও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। বাংলায় মধ্যবিত্ত বেথুন স্কুলের প্রতিষ্ঠা শ্রেণির মধ্যে ছিল ইংরেজি শিক্ষিত চাকরিজীবী, উকিল, ডাক্তার, সাংবাদিক, লেখক, ব্যবসায়ী প্রভৃতি শ্রেণি।
3 দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি : ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ফলে দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। কারণ, সরকারি উদ্যোগে তখন ইংরেজি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। অপরদিকে সরকারি অনুদান ও উৎসাহের অভাবে দেশীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া ভারতীয়রাও তখন চাকরি ও নানারকম সুযোগ-সুবিধালাভের জন্য ইংরেজি স্কুলমুখী হয়েছিল এবং দেশীয় শিক্ষার প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছিল।
4 ইংরেজ সরকারের প্রশাসনিক সুবিধা : ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের ফলে ভারতে ইংরেজ শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছিল। ইংরেজি শিক্ষা
বিস্তারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতে কেরানিকুল সৃষ্টি করা। ইংরেজদের এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। ইংরেজি শিক্ষায়
শিক্ষিত মানুষেরা ভারতে ইংরেজ শাসনের স্তপ্তস্বরূপ ছিল। তারা ইংরেজ শাসন ও সভ্যতাকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং ইংরেজ শাসনের গোঁড়া সমর্থকে পরিণত হয়েছিল।
5 নারীশিক্ষার প্রসার : ভারতীয় সমাজে বাল্যবিবাহ, পর্দাপ্রথা, রক্ষণশীল মানসিকতা নারীশিক্ষা প্রসারের প্রধান বাধা ছিল। উনিশ শতকেইংরেজ সরকার, খ্রিস্টান মিশনারি ও কয়েকজন প্রগতিশীল ব্যক্তি, নারীশিক্ষার প্রসারে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের উদ্যোগে বিদ্যাসাগর মহাশয় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ৪টি জেলায় ২০টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চার্লস উত্তের প্রতিবেদনে নারীশিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাংলার বাইরে আগ্রা, বোম্বাই, পুনে প্রভৃতি অঞ্চলেও নারীশিক্ষার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সঙ্গে জমি জরিপের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। কারণ – ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার শাসনাধীন এলাকার নির্দিষ্ট আয়তন সম্পর্কে ধারণা করতে চেয়েছিল। কোম্পানি তার এলাকার জমি জরিপ করে তার ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ণয় করতে চেয়েছিল।
★ কোম্পানির জমি জরিপ:
• ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ কোম্পানি মিরজাফরকে বাংলার নবাব পদে বসিয়েছিল। কোম্পানির প্রতি কৃতজ্ঞ নবাব কোম্পানিকে কলকাতা থেকে কুলপি পর্যন্ত ২৪টি পরগনার জমিদারি দিয়েছিল। রবার্ট ক্লাইভ তখন এই নতুন জমিদারি এলাকার মাপজোখের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ২৪টি পরগনার জমি জরিপের কাজ শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই কাজ শেষ করেন
হপ্ ক্যামেরন।
● ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতের জমি জরিপ বিভাগের প্রধান বা সার্ভেয়ার জেনারেল পদে সার্ভেয়ার জেমস রেনেলকে নিয়োগ করেন। জেমস রেনেল বাংলার নদীপথ জরিপ করে মোট ১৬টি মানচিত্র তৈরি করেছিলেন।
» ইজারাদারি ব্যবস্থা :
১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস যে নতুন ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত চালু করেন তাতে জমির নিলামে যে ব্যক্তি বেশি খাজনা দেওয়ার ডাক দেবে তার সঙ্গে কোম্পানি পাঁচ বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত করবে। ওই ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের জন্য জমি ইজারা দেওয়া হত বলে একে ইজারাদারি ব্যবস্থা বা পাঁচসালা বন্দোবস্ত বলা হত।
★ ইজারাদারি বন্দোবস্ত চালু করার কারণ : ওয়ারেন হেস্টিংসের ইজারাদারি বন্দোবস্ত চালু করার কারণ ছিল—
1 নিলামের মাধ্যমে জমির ইজারা দিয়ে সর্বাধিক রাজস্ব আদায় করা।
2 বাংলার ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির স্বার্থে পরিচালিত করা।
● ইজারাদারি বন্দোবস্ত তুলে দেওয়ার কারণ : ইজারাদারি বন্দোবস্তে নানারকম সমস্যা থাকার জন্য এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছিল। তুলে দেওয়ার কারণ ছিল— জেমস রেনেল
|1 অনেক বাইরের লোক বেশি অর্থ দিয়ে নিলামে জমির ইজারা নিয়েছিলেন। তাদের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না। ফলে অনেকক্ষেত্রে তার যে রাজস্ব ধার্য হয়েছিল তা ছিল বাস্তবে আদায় করা রাজস্বের থেকে অনেক বেশি। ফলে তারা ধার্য রাজস্ব শোধ করতে পারত না।
2 ইজারাদার সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করার জন্য কৃষকদের ওপর অত্যাচার করত। তারা কৃষির উন্নতির দিকেও নজর দিত না।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনায় এদেশে মুঘল পুলিশি ব্যবস্থা চালু ছিল। পরে ওয়ারেন হেস্টিংস, কর্নওয়ালিস
পুলিশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করেন।
★ কোম্পানির পুলিশি ব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণ : ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুলিশি ব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণ হল-
1 আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা : ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ফলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছিল। মুঘল আমলের
পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই অবস্থার মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। তাই কোম্পানি পুলিশি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে সচেষ্ট হয়।
2 আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা : ব্রিটিশ কোম্পানির লক্ষ্য ছিল ভারতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আর এজন্য প্রয়োজন ছিল প্রচলিত
পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন ধাঁচের পুলিশি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
» সংস্কার :
1 ফৌজদারের বদলে ম্যাজিস্ট্রেট : ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস ফৌজদারের জায়গায় ম্যাজিস্ট্রেটদের পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব দেন।
2 ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে কর্নওয়ালিস প্রত্যেক জেলাকে কয়েকটি থানায় ভাগ করে পুলিশি ব্যবস্থা চালু করেন। @ প্রতি থানায় একজন
করে দারোগা নিযুক্ত করেন। @ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দারোগাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন।
3 ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে দারোগা ব্যবস্থার বিলোপ করে তার জায়গায় কালেক্টরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
4 ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু প্রদেশ অঞ্চলে নতুন ধাঁচের পুলিশি ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরবর্তীকালে আলাদা পুলিশ আইন বানানো হয়। এই পুলিশি ব্যবস্থা ভারতে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়।

১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন। তিনি নিলামের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য জমিদার বা ইজারাদারদের সঙ্গে জমি বন্দোবস্ত করেন (১৭৭২ খ্রি.)। এই ব্যবস্থা ইজারাদারি বন্দোবস্ত’ বা ‘পাঁচসালা বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত।
→ ইজারাদার : গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটান। তিনি বাংলা ও বিহারের দুই নায়েব দেওয়ান রেজা খাঁ ও সিতাব রায়কে পদচ্যুত করেন এবং রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব কোম্পানির এক্তিয়ারে নিয়ে আসেন। নিলামের মাধ্যমে যিনি সর্বোচ্চ হারে রাজস্ব দিতে সম্মত হতেন তাকেই পাঁচ বছরের জন্য জমি ইজারা দেওয়া হত। এই নিলামদাররা ইজারাদার' নামেও পরিচিত ছিল।
» ইজারাদারি বন্দোবস্তের সময়কাল : এই বন্দোবস্ত ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।
» ইজারাদারি বন্দোবস্তের ত্রুটি : কিছুদিনের মধ্যে হেস্টিংস প্রবর্তিত ইজারাদারি বা পাঁচসালা বন্দোবস্তের ত্রুটিগুলি প্রকট হয়ে ওঠে।
প্রথমত, নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ রাজস্ব দেওয়ার শর্তে ভুঁইফোঁড় ইজারাদাররা জমি পেলেও তারা নির্দিষ্ট রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হয়।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থায় সরকারের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, এই ব্যবস্থায় কৃষকদের ওপর অত্যাচার বেড়েছিল। কারণ, জমিতে জমিদারের স্বত্ব অনিশ্চিত হওয়ায় জমিদাররা কৃষকদের সর্বস্বান্ত করে রাজস্ব আদায় করত।
ওয়ারেন হেস্টিংস
★ পাঁচসালা বন্দোবস্তের অবসান : ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে পাঁচসালা বন্দোবস্তের অবসান ঘটান এবং ‘একসালা বন্দোবস্ত চালু করেন।