Chapter-3, ভারতবর্ষ

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে শীতের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গ্রামের বটতলার পোঁদলে আশ্রয় নিয়েছিল যে বৃদ্ধা, পরের দিন বৃষ্টি থামলে দেখা যায় সে নিঃসাড় অবস্থায় পড়ে আছে। নাড়ি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যে বৃদ্ধা মারা গেছে। এই অবস্থায় চৌকিদার পরামর্শ দেয় যে, 'ফাঁপি'তে অর্থাৎ প্রবল শীতে বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ায় এক ভিখিরির মৃত্যুতে থানাপুলিশ করার কোনো প্রয়োজন নেই। পাঁচ কোন দূরের থানায় খবর দিলে পুলিশ আসতে যে দীর্ঘ সময় ব্যয় হবে তাতে মৃতদেহ পচে দুর্গন্ধ বেরোবে। কারণ চৌকিদারের কথায়, ইতিমধ্যে মৃতদেহ 'ফুলে ঢোল হয়েছে। এই অবস্থায় গ্রামের সকলে পরামর্শ চাইলে চৌকিদার মৃতদেহটি নদীর চড়ায় ফেলে দিয়ে আসতে বলে। সেখানে তার যা গতি হওয়ার তা হবে বলে মন্তব্য। করে সে। এই পরামর্শই গ্রামের সকলে মেনে নিয়েছিল।

* চৌকিদারের পরামর্শমতো গ্রামের মানুষেরা দুই মাইল দূরে অবস্থিত শীতকালে শুকিয়ে যাওয়া নদীর চড়ায় বাঁশের চ্যাংদোলায় নিয়ে গিয়ে বুড়ির মৃতদেহ ফেলে আসে। বুড়ির শরীর উজ্জ্বল রোদে তপ্ত বালিতে চিত হয়ে পড়ে থাকে। আর গ্রামে ফিরে এসে সকলে দিগন্ধে চোখ রাখে, ঝাঁকে ঝাঁকে কখন শকুন নামবে তার জন্য।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের "ভারতবর্ষ' গল্পে শীতের দিনে 'ফাঁপি'-র প্রতিকূল আব্বাওয়ায় গ্রামে চলে আসা বৃদ্ধা যার মৃতদেহকে ঘিরে হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল—সেই বৃদ্ধার কথাই এখানে বলা হয়েছে।

* গ্রামের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা নদীর চড়ায় ফেলে আসা বৃদ্ধার মৃতদেহকে গ্রামে ফিরিয়ে আনে এবং তাকে মুসলমান দাবি করে কবরস্থ করার উদ্যোগ নেয়। এই নিয়ে হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের উপক্রম হয়। বুড়ির মৃতদেহের দু-পাশে দুই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র মানুষেরা দাঁড়িয়ে যায়। মোয়াসাহেবের নেতৃত্বে একপক্ষ থেকে চিৎকার ওঠে “আল্লাহু আকবর", অন্যপক্ষ থেকে উইচাষমশাইয়ের নেতৃত্বে গর্জন শোনা যায়—“জয় মা কালী ।" উভয়পক্ষকে ঠেকিয়ে রাখতে চৌকিদার প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই সময়েই দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। বুড়ির মৃতদেহতি নড়ছে এবং আস্তে আস্তে তা উঠে বসার চেষ্টা করছে। লড়াই ফেলে সম্ভ জনতা সেদিকে তাকিয়ে থাকে। বুড়ি উঠে দাঁড়ায়, ভিড়কে দেখে এবং বিকৃত মুখে হেসে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে সে এগিয়ে যায়। যুযুধান মানুষেরা সরে গিয়ে তাকে পথ করে দেয়। দূরের দিকে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা যেন ভারতবর্ষের অন্তরাত্মার প্রতীক হয়ে ওঠে। বিদ্বেষ বা উগ্রতার কোনো জায়গা নেই। এর মাধ্যমেই লেখক বোঝাতে চান যে মানুষের ধর্মপরিচয় নিয়ে বিশ্বেষ বা উগ্রতার কোনো জায়গা নেই।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্পে দেখা যায় যে, পৌষমাসের অকাল দুর্যোগে এক ঘুঘুড়ে বৃদ্ধা ভিখারিনিকে মৃত ভেবে রায়বাংলার কোনো একটি বাজারে উপস্থিত কয়েকজন হিন্দু গ্রামবাসী তাকে নদীর চড়ায় ফেলে আসে। কিন্তু সেদিনই বিকেলে দেখা যায় যে, কয়েকজন মুসলমান বুড়িকে নিয়ে আসছে আরবি মন্ত্র পড়তে পড়তে। ফলে 'মৃতা' বুড়ির সৎকারের অধিকার নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত বেধে যায়।

বাজারের হিন্দুদের রুদ্ধ প্রশ্নের উত্তরে মুসলিম শববাহকরা জানায় যে, বুড়ি মুসলমান। হিন্দুরা তার প্রমাণ চাইলে তারা জানায় যে, তাদের অনেকেই বুড়িকে বিড়বিড় করে 'আল্লা' বা 'বিসমিল্লা' বলতে শুনেছে। মোয়াসাহেব শপথ করে জানান যে, সকালে বটতলায় যখন তিনি শহরের বাস ধরতে এসেছিলেন, তখন সেখানে মুমূর্ষু বুড়িকে কলমা পড়তে শুনেছেন। ইতিমধ্যে সেখানে এসে উপস্থিত হওয়া উচাজমশাই মোয়াসাহেবের কথার প্রতিবাদ করে জানান যে, তিনিও মোপ্লাসাহেবের সঙ্গে একই বাসে সকালে শহরে যান। কিন্তু বটতলাতে তিনি সকালে মুমূর্ষু বুড়িকে স্পষ্ট 'শ্রীহরি'-র নাম নিতে শোনেন। তার সমর্থনে নকড়ি নাপিত জানায় যে, আগেরদিন সে বটতলায় এসে বুড়িকে হরিধবনি দিতে শুনেছিল। ফজলু সেখ তখন তার প্রতিবাদে। জানায় যে, সে নিজের কানে বুড়িকে 'লাইলাহা ইল্লায় বলতে শুনেছে। একসময়ের ডাকাত নিবারণ বাগদি তখন ফজলুকে চিৎকার করে মিথ্যেবাদী বললে একসময়ের পেশাদার লাঠিয়াল করিম ফরাজি হুংকার দেয় 'খবরদার'। বুড়ির মৃতদেহ সৎকার করার অধিকার নিয়ে প্রভাবেই বাসা তৈরি হয়েছিল।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পের মোয়াসাহেব এবং ভটচাজমশাই এই দুজন দুই সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীদের নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন। চৌকিদারের পরামর্শে বুড়িকে মৃত ভেবে বাঁশের চ্যাংদোলায় করে শুকনো নদীর চড়ায় যেদিন ফেলে আসা হয়, সেদিন সকালবেলায় উভয়েই বটতলার বাসস্ট্যান্ডে আসেন। মুমূর্ষু বুড়িকে দূর থেকে দেখে একই বাসে শহরে যান। বিকেলে ফিরে এসে মোল্লাসাহেব যখন শোনেন যে মৃত বুড়িকে নদীর চড়ায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি সে মৃতদেহ কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি ক্রুদ্ধ হিন্দুদের জানান যে, বুড়ি মুসলমান। কেননা সকালে তিনি মু বুড়িকে স্পষ্ট কলমা পড়তে শুনেছেন। ঠিক সেই সময়েই ভট্টচাজমশাই সদা বাস থেকে নেমে সেই ভিড়ের মধ্যে ঢোকেন এবং মোল্লাসাহেবের কথার প্রতিবাদ করে জানান যে, সকালে মোল্লাসাহেবের সঙ্গে একই বাসে ওঠার আগে তিনি মুমূর্ষু বুড়িকে 'শ্রীহরি' জপ করতে স্পষ্ট শুনেছেন। সুতরাং এভাবেই দুই সম্প্রদায়ের দুই নেতা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করেন। শুধু তাই নয়, মোয়াসাহেব এরপর নিজ-সম্প্রদায়ের মানুষকে প্ররোচিত করতে 'জেহাদ' অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা করেন। উলটোদিকে উচ্চাজমশাইও একইভাবে হিন্দু জনতাকে প্ররোচিত করতে যবন হত্যার উদ্দেশ্যে মা কালীর আবির্ভাব আহবান করতে থাকেন।

সুতরাং মোল্লাসাহেব এবং ভট্টচাজমশাই—দুজনের কেউই মুমূর্ষু বৃদ্ধাকে বাঁচাতে সচেষ্ট হননি অথচ তার মৃত্যু হয়েছে ভেবে তার মৃতদেহের অধিকার নিয়ে তারা লড়াই করেছেন। তারা কেবল মিথ্যাচারই করেননি, উগ্র এবং ধর্মান্ধ হয়ে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সহজসরল মানুষকে ভয়ংকর দাঙ্গায় প্ররোচিতও করেছেন।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পের চৌকিদার চরিত্রের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্নতা: বাজার-পার্শ্ববর্তী বটগাছতলায় বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে ভেবে গ্রামের লোকেরা চৌকিদারকে খবর দেয়। চৌকিদার অকুস্থলে এসে গ্রামবাসীকে খবরটা থানায় দিতে বারণ করে। পৌষের অকাল-দুর্যোগে এক

ভিখারিনি বুড়ির মৃত্যু থানায় খবর দেওয়ার মতো তত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তা ছাড়া, থানা যেহেতু সেখান থেকে পাঁচ ক্রোশ দূরে, তাই খবর পেয়ে থানার লোকেদের আসতে আসতে মাঝরাত্রি হয়ে যাবে। ততক্ষণে লাশের দুর্গস্থ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। তাই সে বুড়িকে নদীর চড়ায় ফেলে আসার বাস্তবোচিত পরামর্শ দেয়। তবে বাস্তববুদ্ধির অধিকারী চৌকিদারের পর্যবেক্ষণে একটু ভুল হয়েছিল। কেননা সে জীবন্ত বুড়িকে দেখে বলেছিল। যে, লাশ ফুলে উঠেছে।

কর্তব্যসচেতনতা: বুড়ির মৃতদেহের অধিকার নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হলে, বিপন্ন চৌকিদার শুধুমাত্র একটি লাঠিকে সম্বল করে দুপক্ষকে নিরম্ভ করতে শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়। সশস্ত্র কোনো পক্ষ যখনই এক কদম এগোনোর চেষ্টা করছিল, তখনই নীল ইউনিফর্ম পরা চৌকিদার তার লাঠিটা পিচে ঠুকে 'সাবধান' বা 'খবরদার' বলে গর্জন করে উঠছিল। বুড়ি উঠে না দাঁড়ালে সে হয়তো একা দাঙ্গা ঠেকাতে সমর্থ হত না, কিন্তু কর্তব্যসচেতন চৌকিদারের মরিয়া চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের "ভারতবর্ষ' ছোটোগল্পের থুথুড়ে বৃদ্ধাটি দুর্যোগনয় বৃষ্টির দিনে বাজার-সংলগ্ন বটগাছতলায় আশ্রয় নিয়েছিল। তার পরদিনের রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে তাকে সেখানেই চিত হয়ে অসাড়ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক বেলা হয়ে যাওয়ার পরও যখন তাকে নড়তে দেখা গেল না, তখন চাওয়ালা জগা সেখানে উপস্থিত সবাইকে জানায় “নির্ঘাত মরে। গেছে বুড়িটা।” এরপর নিঃসাড় বুড়ির চারপাশে ক্রমশ জড়ো হওয়া লোকজন বুড়ির শরীরের এবং নাড়ির স্পন্দনহীনতা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে আসে যে, বুড়ি মৃত। চৌকিদারকে খবর দেওয়া হলে সে এসে সব দেখেশুনে খবরটা থানায় দিতে বারণ করে। কারণ পৌষের অকাল দুর্যোগে এক ভিখারিনি। বৃদ্ধা মরেছে। তা ছাড়া, থানা যেহেতু সেখান থেকে পাঁচ ক্লোন দূরে, তাই সেখানে খবর দিতে এবং খবর পেয়ে তারপর থানার লোকেদের অকুস্থলে আসতে মাঝরাত্রি হয়ে যাবে। ততক্ষণে লাশের দুর্গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে বলে চৌকিদার জানায়। তাই চৌকিদার উপস্থিত সবাইকে বুড়ির লাশ নদীর চড়ায় ফেলে আসার পরামর্শ দেয়। সেই পরামর্শমতো উপস্থিত কয়েকজন মিলে বাঁশের মাচায় বুড়িকে ঝুলিয়ে নিয়ে দু-আইল দূরবর্তী শুকনো নদীর চড়ায় ফেলে দিয়ে আসে। উজ্জ্বল রোদে নদীর চড়ায় গরম বালির ওপর বুড়ির দেহ চিত হয়ে পড়ে থাকে।

> নদী থেকে বাজারে ফিরে এসেই সবাই দিগন্তের আকাশে চোখ রেখেছিল। বুড়ির মৃতদেহের লোভে কখন ঝাঁক ঝাঁক শকুন নেমে আসে—তা দেখার আশায়।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পের শেষদিকে বুড়ির মৃতদেহের অধিকার নিয়ে সশস্ত্র হিন্দু ও মুসলমান গ্রামবাসীদের মধ্যে যখন রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখনই বুড়ির দীর্ঘনিদ্রা ভঙ্গ হয়। বাঁশের মাচায় লায়িত বুড়ি হঠাৎ নড়ে উঠে বসতে চেষ্টা করে। দুপক্ষের মারমুখী জনতা এবং চৌকিদার বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। বুড়ি এরপর ক্রমে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার দু-দিকের দু-দলের ভিড় দেখে তার মুখ ব্যাজার হয়ে যায়। সেই ব্যাজার মুখেই তারপর ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ওঠে সে। চৌকিদারের “বুড়িমা! তুমি মরনি!”—এই বিস্ময়সূচক প্রশ্ন শুনে এরপর সে শতগুষ্টি সহ চৌকিদারেরই মরণ কামনা করে। সমবেত জনতাও যখন চিৎকার করে একই কথা বলতে থাকে তখন বুড়ি তাদের 'মুখপোড়া' বলে গালি দিয়ে শাপশাপান্ত করে। বুড়ি হিন্দু না মুসলমান—এ কথা এরপর একজন জিজ্ঞাসা করলে প্রচন্ড রেগে গিয়ে বুড়ি জনতাকে জানায় যে, তারা তাদের চোখের মাথা খেয়েছে। নরকখেকো', 'শকুনচোখো' ইত্যাদি গালাগাল সহযোগে সে জনতাকে জানায় যে, তারা বুড়িকে দেখে তার ধর্মপরিচয় যেহেতু বুঝতে পারছে না, তাই বুড়ি তাদের সবার চোখ গেলে দেবে। জনতাকে দূর হতেও বলে সে। কথাগুলো বলে বুড়ি নড়বড় করতে করতে সেখান থেকে বেরোলে জনতা সরে গিয়ে তাকে পথ করে দেয়। দিনের শেষ রোদ্দুরে রুমে অস্পষ্ট হয়ে যায় সে। এভাবেই দীর্ঘনিদ্রা-থেকে-জেগে-ওঠা বুড়ি দু-সম্প্রদায়ের মারমুখী জনতাকে শান্ত করেছিল।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে রাতবাংলায় এক পৌষমাসের অকালদুর্যোগে মৃত এক মুহুড়ে ভিখারিনির মৃতদেহের সৎকারকে ঘিরে হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে প্রবল বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল, সে প্রসঙ্গেই এই মন্তব্য করা হয়েছে।

* বৃদ্ধা ভিখারিনি প্রাণ হারিয়েছে বলে মনে করে কয়েকজন হিন্দু গ্রামবাসী তাকে শুকনো নদীর চড়ায় ফেলে আসে। কিন্তু সেদিনই বিকেলে দেখা যায়। যে, কয়েকজন মুসলমান আরবি ম্যা পড়তে পড়তে বুড়িকে কবর দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে আসছে। বুড়ির মৃতদেহের অধিকার নিয়ে মোল্লাসাহেবের নেতৃত্বে মুসলমানরা এবং উটচাজমশাইয়ের নেতৃত্বে হিন্দুসম্প্রদায় প্রবল বচসায় জড়িয়ে পড়ে। চারিদিকে ক্রমে ক্রমে প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এই উত্তেজনার ফলশ্রুতিতে বাজারের দোকানপাট একে একে বন্ধ হতে শুরু করে | পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে দুই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ অসুস্থ সহ অকুস্থলে জড়ো হতে শুরু করে। বুড়ির মাচার দু-পাশে জড়ো হওয়া দু-দলের জনতা অসহায় চৌকিদারের উপস্থিতিতে পরস্পরের উদ্দেশ্যে প্ররোচনামূলক উক্তি করতে থাকে। মোল্লাসাহেব 'নারায়ে তকবির', 'আল্লাহ্ আকবর' ইত্যাদি ধর্মীয় স্লোগান তুলে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করতে থাকেন। অন্যদিকে ভট্টচাজমশাই মাঝে মাঝেই চিৎকার করে যা কালীর নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগলেন। এরকম দাঙ্গা-পরিস্থিতির মাঝখানেও কর্তব্য সচেতন বিপন্ন আইনরক্ষক চৌকিদার তার লাঠিটি উচিয়ে দু-পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো পক্ষ এক কদম এগোনোর চেষ্টা করলেই সে লাঠি। ঠুকে 'সাবধান' বা 'খবরদার' বলে গর্জন করতে থাকে। কিন্তু তার প্রচেষ্টা যখন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ার মুখে, ঠিক তখনই দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে উঠে দাঁড়িয়ে বুড়ি সেই উত্তেজনায় জল ঢেলে দেয়।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্প থেকে সংকলিত উদ্ধৃতিটিতে যে 'অদ্ভুত' দৃশ্যের কথা বলা হয়েছে, তা হল—যার মৃতদেহের অধিকার নিয়ে হিন্দু-মুসলমান দু-পক্ষ দাঙ্খার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, সেই আপাত-মৃত বৃদ্ধাটি হঠাৎ মাথা নাড়ায় এবং নড়তে নড়তে উঠে বসার চেষ্টা করে। ক্রমশ সে উঠে বসে এবং দাঁড়িয়েও পড়ে।

বৃদ্ধা ভিখারিনি প্রাণ হারিয়েছে বলে মনে করে কয়েকজন হিন্দু গ্রামবাসী তাকে শুকনো নদীর চড়ায় ফেলে আসে। কিন্তু সেদিনই বিকেলে দেখা যায়। যে, কয়েকজন মুসলমান আরবি ম্যা পড়তে পড়তে বুড়িকে কবর দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে আসছে। বুড়ির মৃতদেহের অধিকার নিয়ে মোল্লাসাহেবের নেতৃত্বে মুসলমানরা এবং উটচাজমশাইয়ের নেতৃত্বে হিন্দুসম্প্রদায় প্রবল বচসায় জড়িয়ে পড়ে। চারিদিকে ক্রমে ক্রমে প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এই উত্তেজনার ফলশ্রুতিতে বাজারের দোকানপাট একে একে বন্ধ হতে শুরু করে | পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে দুই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ অসুস্থ সহ অকুস্থলে জড়ো হতে শুরু করে। বুড়ির মাচার দু-পাশে জড়ো হওয়া দু-দলের জনতা অসহায় চৌকিদারের উপস্থিতিতে পরস্পরের উদ্দেশ্যে প্ররোচনামূলক উক্তি করতে থাকে। মোল্লাসাহেব 'নারায়ে তকবির', 'আল্লাহ্ আকবর' ইত্যাদি ধর্মীয় স্লোগান তুলে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করতে থাকেন। অন্যদিকে ভট্টচাজমশাই মাঝে মাঝেই চিৎকার করে যা কালীর নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগলেন। এরকম দাঙ্গা-পরিস্থিতির মাঝখানেও কর্তব্য সচেতন বিপন্ন আইনরক্ষক চৌকিদার তার লাঠিটি উচিয়ে দু-পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো পক্ষ এক কদম এগোনোর চেষ্টা করলেই সে লাঠি। ঠুকে 'সাবধান' বা 'খবরদার' বলে গর্জন করতে থাকে। কিন্তু তার প্রচেষ্টা যখন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ার মুখে, ঠিক তখনই দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে উঠে দাঁড়িয়ে বুড়ি সেই উত্তেজনায় জল ঢেলে দেয়।

[7:43 am, 30/09/2022] Anju: সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে বুড়ির ‘মৃতদেহ যখন নড়ে ওঠে।

এবং উঠে দাঁড়ায় তখন সমবেত জনতা তার কাছে জানতে চায় যে, সে হিন্দু না মুসলমান। এই প্রশ্নের উত্তরেই বৃদ্ধা উল্লিখিত মন্তব্যটি করেছে।
ভিখিরি এবং ভবঘুরে হিসেবে গল্পে বৃদ্ধার আবির্ভাব ঘটেছিল। প্রথম থেকেই তার মেজাজ ছিল অত্যন্ত চড়া। প্রায় কারও কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে বৃদ্ধা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বটগাছের খোঁদলে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া তাকে আটকাতে পারেনি। কিন্তু কয়েকদিন পরে বৃষ্টি থামলে তাকে নিঃসাড় অবস্থায় পাওয়া যায় | এরপরে বৃদ্ধার মৃতদেহ সৎকার করার দাবিকে ঘিরে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও অপ্রীতিকর অবস্থা তৈরি হয়। আর তখনই কাহিনির নাটকীয় মোড় ঘুরিয়ে বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ায়। যে জনতা পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচু করেছিল তারা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, পক্ষান্তরে বুড়ি সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বিকৃত মুখে হেসে ওঠে। সকলেই যখন তাঁর মৃত্যু না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে তখনও বৃদ্ধা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে— “তোরা মর। তোরা মর্ মুখপোড়ারা?" সে হিন্দু না মুসলমান—এ প্রশ্নের উত্তরেও সে বলে “চোখের মাথা খেয়েছিস মিনসেরা? দেখতে পাচ্ছিস নে?” আসলে হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মনুষ্যত্বকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে বৃদ্ধা। ভিড়কে দু পাশে সরে যেতে বাধ্য করে যেভাবে সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে তা চিরজীবী মনুষ্যত্বেরই জয় ঘোষণা করে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্পে পৌষের অকাল-দুর্যোগে রাতৃবাংলার একটি ছোট্ট বাজারের পাশের বটগাছতলায় আশ্রয় নেয় পরিচয়হীন এক থুথুড়ে বুড়ি ভিখিরি। দুর্যোগ কাটলে সেখানে নিষ্পন্দ হয়ে পড়ে থাকা বৃদ্ধাকে হিন্দু গ্রামবাসীরা মৃত ভাবে। চৌকিদারের পরামর্শে তারা বুড়ির মৃতদেহকে বাঁশের মাচায় করে নিয়ে গিয়ে শুকনো নদীর চড়ায় ফেলে দিয়ে আসে। কিন্তু সেদিন বিকেলেই মুসলমানরা সেই মাচায় করেই বুড়ির দেহটা কবর দিতে বাজারে নিয়ে আসলে সেই শরের অধিকার নিয়ে দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত বাধে। একসময় তা দাঙ্গার দিকে বাঁক নেয়। কিন্তু হঠাৎই দু-দলের সশস্ত্র জনতাকে হতচকিত করে বুড়ি জেগে উঠে দাঁড়ায়। একজন বুড়ির ধর্মপরিচয় জানতে চাইলে ক্রুদ্ধ বুড়ি তাদের গাল দেয়, নড়বড় করতে করতে রাস্তা ধরে চলতে থাকে এবং ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়।

গ্রামসংলগ্ন বাজারকে কেন্দ্র করেই এ গল্পের দু-দিনের এই কাহিনি গড়ে উঠেছে বলে স্থান-কাল-ঘটনাগত ঐক্য এ গল্পে রক্ষিত হয়েছে। তা ছাড়া মাঝারি আয়তনের এ গল্পে 'ঘটনার ঘনঘটা', 'অতিকথন', চরিত্রের বহু সমাবেশ’, ‘তত্ত্ব' বা ‘উপদেশ' অনুপস্থিত। এ গল্পের বৃদ্ধা চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক ভারতমাতার প্রাচীনত্ব, দারিদ্র্য এবং অসহায়তা যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনই এদেশ যে শুধুমাত্র হিন্দু বা মুসলমানের নয়, বরং আপামর ভারতবাসীর সেই সত্যও উম্মোচিত করেছেন। গল্পের সমাপ্তিতে বৃদ্ধার জেগে ওঠার মাধ্যমে লেখক পাঠকদের চমকিতও করে দিয়েছেন। সুতরাং 'ভারতবর্ষ' নিঃসন্দেহে একটি শিল্পসার্থক ছোটোগল্প।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পের কোলকুঁজো থুথুড়ে ভিখারিনি বৃদ্ধাটি ছিল রাক্ষসীর মতো দেখতে। তার ক্ষয়াটে ছোট্ট মুখমণ্ডলের বলিরেখাগুলি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে, মাথা ভরতি সাদা চুল, পরনে ছেঁড়া নোংরা একটি কাপড়, গায়ে জড়ানো তুলোর এক চিটচিটে কম্বল আর হাতে একটি ছোটো লাঠি।
অসহায় ভিখারিনি হলেও সে অত্যন্ত তেজি, মেজাজি এবং আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মহিলা। তার তেজ এবং চালচলন নিয়ে আড্ডাধারীরা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করলে সে তাদের তীব্রভাবে ভর্ৎসনা করে। যখন দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর চারপাশের মারমুখী হিন্দু মুসলিম জনতাকে দেখে-শুনে সে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ওঠে তখন বৃদ্ধার রসিকতাবোধের প্রমাণ পাওয়া যায়।

লেখক এই বৃদ্ধা চরিত্রের মধ্য দিয়েই ভারতমাতার প্রাচীনত্ব, দারিদ্র্য এবং অসহায়তা যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনই তার ধর্মনিরপেক্ষতাও প্রকাশিত হয়েছে। তাই গল্পের শেষে ভিড়ের মধ্য থেকে একজন যখন বুড়ি হিন্দু না মুসলমান তা জিজ্ঞাসা করে, তখন বুড়ি ক্ষিপ্ত হয়ে জানায়-- ..... চোখের মাথা খেয়েছিস মিনসেরা? ... আমি কী তা দেখতে পাচ্ছিস নে?" সুতরাং বৃদ্ধার চরিত্রের মধ্য দিয়েই লেখক গল্পের জনতাকে এবং পাঠকদের এই চেতনায় উদ্‌বুদ্ধ করেছেন যে, এদেশ হিন্দুর নয়, মুসলমানের নয়, এদেশ আপামর ভারতবাসীর। সুতরাং এ গল্পের বুড়িটি একটি উদ্দেশ্য ও আদর্শের প্রতীক।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্পে পৌষের অকাল- দুর্যোগে রাঢ়বাংলার এক ছোট্ট বাজারের দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে এক চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন অলস গ্রামবাসী আড্ডা দিচ্ছিল। তখন এক থুথুড়ে ভিখারিনি বৃদ্ধা সেখানে ভিজতে ভিজতে চা খেতে আসে। সেখানে কৌতূহলী আড্ডাধারীরা সেই অসহায় বৃদ্ধাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করলে বৃদ্ধা তেজ ও মেজাজের সঙ্গে তাদের সেই অহেতুক আগ্রহের প্রতিবাদ করে এবং তাদের শাপশাপান্ত করে। চায়ের দাম মিটিয়ে বৃদ্ধা ভিজতে ভিজতে পাশের বটতলায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরদিন সকালে রোদ উঠলে সেখানেই বুড়িকে অসাড়ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়। হিন্দু গ্রামবাসীরা তার দেহের তাপমাত্রা এবং নাড়ি পরীক্ষা করে তাকে মৃত ভাবে এবং চৌকিদারকে খবর দেয়। তারপর চৌকিদারের পরামর্শে বুড়ির দেহটা বাশের মাচায় করে কয়েকজন হিন্দু বয়ে নিয়ে গিয়ে নদীর চড়ায় ফেলে আসে। কিন্তু সেদিন বিকেলেই মুসলমানরা সেই মাচায় করেই বুড়ির দেহটা কবর দিতে বাজারে নিয়ে এলে সেই শবের অধিকার নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম সংঘাত বাধে। বুড়ির মৃতদেহকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র জনতার মধ্যে যখন দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে বুড়ি নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ায়। বিস্মিত জনতার একজন বুড়ি হিন্দু না মুসলমান, তা জিজ্ঞাসা করলে ক্রুদ্ধ বুড়ি জানায় যে, তাদের দেখার চোখ নেই | তারপর নড়বড় করে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায় সে।

নিজ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ এবং নিজ-সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজন সম্বন্ধে ইতিবাচক এবং অন্যান্য ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষজন সম্বন্ধে নেতিবাচক পক্ষপাতিত্ব পোষণ করার মানসিকতাকেই বলা হয়, সাম্প্রদায়িকতা (Communalism)। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে পৌষের অকাল-দুর্যোগে এক ঘুঘুড়ে বৃদ্ধ ভিখারিনি দীর্ঘসময় ধরে মৃতের মতো হয়ে থাকলে, তার মৃত্যু হয়েছে ভেবে সেই মৃতদেহের অধিকার নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। মোল্লাসাহেবের উসকানিতে মুসলমানরা এবং উটচাজমশাইয়ের উসকানিতে হিন্দুরা পরস্পরের বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে ওঠে এবং রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সবাইকে অবাক করে দিয়ে বুড়িটি নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ায়। ব্যাজার মুখে দু-দিকের ভিড়ে দৃষ্টিপাত করে দুই সম্প্রদায়ের ছেলেমানুষি কাণ্ডটা বুঝতে পেরে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ওঠে সে। তারপর বুড়ি গালাগাল ও শাপশাপান্ত করে সেই অতি-কৌতূহলী, নির্বোধ জনতাকে। বুড়ি হিন্দু না মুসলমান—এ কথা একজন জিজ্ঞাসা করলে জনতাকে ‘নরকখেকো', 'শকুনচোখো' বলে গালাগাল দিয়ে বুড়ি জানায় যে, তারা তাদের চোখের মাথা খেয়েছে। এভাবেই সেই বড়ো আকারের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় জল ঢেলে দিয়ে বুড়ি উধাও হয়ে যায়।

'ভারতবর্ষ' গল্পে লেখক নিপুশভাবে সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ চিত্রিত করেছেন। গল্পের শেষে তিনি গল্পের জনতা এবং পাঠককে অসাম্প্রদায়িক এক মানবিক অনুভবে উত্তীর্ণ করেছেন। সুতরাং সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী গল্প হিসেবে 'ভারতবর্ষ' সার্থক।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্প থেকে নেওয়া আলোচ্য উক্তিটি। রাতৃবাংলার একটি গ্রামের একজন চৌকিদারের।

→ আলোচ্য ছোটোগল্পে দেখা যায়, পৌষমাসের অকাল-দুর্যোগে রাচবাংলার কোনো একটি বাজারের চায়ের দোকানে কয়েকজন অলস গ্রামবাসী আড্ডা দিতে থাকে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডা হতে হতে পরিস্থিতি যখন ক্রমশ। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন সবাইকে সচকিত করে দিয়ে সেই চায়ের দোকানে চা খাওয়ার জন্য কোলকুঁজো এক থুঘুড়ে বৃদ্ধা ভিখারিনির আগমন হয়। পিচের রাস্তা থেকে ভিজতে ভিজতে সে চায়ের দোকানে আসে। তারিয়ে তারিয়ে আরাম করে চা খেয়ে, দাম মিটিয়ে দিয়ে, চায়ের দোকানের কৌতূহলী আড্ডাধারীদের শাপশাপান্ত করে বৃদ্ধা ভিখারিনি আশ্রয় নেয় বাঁকের মুখের বটগাছতলায়। পরের দিন অনেক বেলা হয়ে যাওয়ার পরেও যখন বুড়িকে নড়তে দেখা যায় না, তখন চা-বিক্রেতা জগা জানায় যে, বুড়িটা নিশ্চয়ই মরে গেছে। বুড়ির কপাল ছুঁয়ে, নাড়ি পরীক্ষা করেও প্রাণের কোনো স্পন্দন খুঁজে না পাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বুড়িটা মারা গেছে। গ্রামের চৌকিদারকে খবর দেওয়া হলে সে গ্রামবাসীদের থানায় খবর দিতে বারণ করে, যেহেতু খবর দেওয়ার পর পাঁচ ক্রোশ দূর থেকে থানার লোকেদের আসতে রাত দুপুর হয়ে যাবে। তাই হাঙ্গামা এড়ানোর জন্য এবং মৃতদেহের দুর্গন্ধের হাত থেকে গ্রামবাসীদের যুক্তি দিতে সে পরামর্শ দেয় যে, বুড়ির মৃতদেহটিকে 'নদীতে' অর্থাৎ নদীতে ফেলে আসতে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্প থেকে নেওয়া আলোচ্য উত্তিটি যে বুড়ির সম্বন্ধে করা হয়েছে সে ছিল কোলকুঁজো এক ভিখারিনি। তাকে রাক্ষসীর মতো দেখতে। একমাথা ভরতি সাদা চুল তার। বুড়িটির গায়ে ছিল। একটা ছেঁড়া, নোংরা কাপড়। তার শরীরে জড়ানো ছিল তুলোর এক চিটচিটে কম্বল, হাতে ছিল একটা ছোটো লাঠি। পিচের রাস্তা থেকে ভিজতে ভিজতে, চায়ের দোকানে সে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে, তার ক্ষয়ে যাওয়া ছোট মুখের বলিরেখাগুলি বেশ স্পষ্ট, যা তার বেশি বয়সের দিকে ইঙ্গিত করে।

" গল্পটির শেষাংশে দেখা যায়, বুড়ির মৃতদেহটিকে নিয়ে যখন হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই সশস্ত্র সংঘর্ষে যেতে একেবারে প্রস্তুত, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পিচের ওপর বাঁশের মাচায় শুয়ে থাকা তার দেহটি নড়ে ওঠে। বুড়ি উঠে বসে এবং তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দু-দিকের ভিড় লক্ষ করে ব্যাজার মুখে থাকার পরই ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ওঠে। চৌকিদার তখন তাকে 'বুড়িমা' সম্বোধন করে তার বেঁচে থাকা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলে বুড়ি চৌকিদারেরই পুষ্টিসহ মৃত্যুকামনা করে। বুড়ি হিন্দু না মুসলমান কথা একজন জিজ্ঞাসা করলে বুড়ি ক্ষিপ্ত হয়ে জানায় — “চোখের মাথা খেয়েছিস মিনসেরা? দেখতে পাচ্ছিস নে?... আমি কী তা দেখতে পাচ্ছিস নে?"। এই বলে সে ভিড় সরিয়ে নড়বড় করে রাস্তা দিয়ে চলে যায়। গল্পের শেষে এভাবেই দীর্ঘকালীন ঘুম থেকে জেগে-ওঠা বুড়ি দুই সম্প্রদায়ের অসচেতন ভারতবাসীকে জাগিয়ে তোলে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃতিটিতে উল্লিখিত বুডিটি ছিল কোলকুঁজো এক ভিখারিনি। এক মাথা-ভরতি সাদা চুলের বুড়িটাকে দেখতে ছিল রাক্ষসীর মতো। তার গায়ে ছিল একটা ছেঁড়া এবং নোংরা কাপড়। একটা তুলোর চিটচিটে কম্বল জড়িয়েছিল সে। হাতে ছিল ছোটো লাঠি। তার ক্ষয়ে যাওয়া, ছোট মুখের বলিরেখাগুলি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের "ভারতবর্ষ' ছোটোগল্পের থুথুড়ে বৃদ্ধাটি দুর্যোগনয় বৃষ্টির দিনে বাজার-সংলগ্ন বটগাছতলায় আশ্রয় নিয়েছিল। তার পরদিনের রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে তাকে সেখানেই চিত হয়ে অসাড়ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক বেলা হয়ে যাওয়ার পরও যখন তাকে নড়তে দেখা গেল না, তখন চাওয়ালা জগা সেখানে উপস্থিত সবাইকে জানায় “নির্ঘাত মরে। গেছে বুড়িটা।” এরপর নিঃসাড় বুড়ির চারপাশে ক্রমশ জড়ো হওয়া লোকজন বুড়ির শরীরের এবং নাড়ির স্পন্দনহীনতা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে আসে যে, বুড়ি মৃত। চৌকিদারকে খবর দেওয়া হলে সে এসে সব দেখেশুনে খবরটা থানায় দিতে বারণ করে। কারণ পৌষের অকাল দুর্যোগে এক ভিখারিনি। বৃদ্ধা মরেছে। তা ছাড়া, থানা যেহেতু সেখান থেকে পাঁচ ক্লোন দূরে, তাই সেখানে খবর দিতে এবং খবর পেয়ে তারপর থানার লোকেদের অকুস্থলে আসতে মাঝরাত্রি হয়ে যাবে। ততক্ষণে লাশের দুর্গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে বলে চৌকিদার জানায়। তাই চৌকিদার উপস্থিত সবাইকে বুড়ির লাশ নদীর চড়ায় ফেলে আসার পরামর্শ দেয়। সেই পরামর্শমতো উপস্থিত কয়েকজন মিলে বাঁশের মাচায় বুড়িকে ঝুলিয়ে নিয়ে দু-আইল দূরবর্তী শুকনো নদীর চড়ায় ফেলে দিয়ে আসে। উজ্জ্বল রোদে নদীর চড়ায় গরম বালির ওপর বুড়ির দেহ চিত হয়ে পড়ে থাকে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' ছোটোগল্পে আমরা দেখি যে, পৌষমাসের অকাল দুর্যোগের মধ্যে রাতবাংলার এক ছোট বাজারের এক চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন গ্রামবাসী জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। আড্ডায় তাদের আলোচনার বিষয় ছিল 'বোমরাইয়ের' অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক, মুখ্যমন্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধি, এমএল বা গ্রামেরই বাসিন্দা সরা বাউরি। এমন সময় এক থুথুড়ে ভিখিরি বুড়ি ভিজতে ভিজতে সেখানে এসে উপস্থিত হলে সে আড্ডায় ছেদ পড়ে। আরাম করে চা খাওয়ার পর বৃদ্ধা বসে থাকা সকলের মুখের দিকে নিঃশব্দে চায়। একজন জিজ্ঞাসা করে যে, সে কোথা থেকে এসেছে। বুড়ি মেজাজের সঙ্গে জানায়— "সে-কথায় তোমাদের কাজ কী বাছারা?" এ কথা শুনে সবাই একসঙ্গে হেসে ওঠে এবং একজন গ্রামবাসী বুড়িকে ব্যঙ্গ করে টাট্টু ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করে। বৃদ্ধা তখন তাদের বাবার নাম নিয়ে গালাগাল দেয়। আজেবাজে কথা বলতে বারণ করে সে সবাইকে হুঁশিয়ারও করে দেয়। এরপর সে চায়ের দাম মিটিয়ে দিয়ে নড়বড় করে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় নেমে যায়। চায়ের দোকানের আড্ডাধারীরা তখন তাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে জানায় যে, সে নির্ঘাত মরবে। এ কথা শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে বুড়ি তাদের এবং তাদের শতগুষ্টির মৃত্যু কামনা করে। তারপর সে বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে বটতলায় গিয়ে আশ্রয় নিলে তা নিয়েও আলোচনা চলতে থাকে। কয়েকজন গ্রামবাসী বলে, বটগাছতলার পরিবর্তে বারোয়ারিতলায় আশ্রয় নিলেই বুড়ি ভালো করত। এইভাবে বুড়িকে নিয়ে 'অনেক কথা' এসে পড়ায় আড্ডা আবার জমে ওঠে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পটি গড়ে উঠেছে রাড়বাংলার একটি। ছোট্ট গ্রাম্য বাজারকে কেন্দ্র করে। পিচের সড়ক আদ্যিকালের এক বটগাছের পাশে যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখানেই গড়ে উঠেছিল বাজারটি। → বাজারটিতে সবমিলিয়ে ছিল তিনটি চায়ের দোকান, দুটো সন্দেশের দোকান, তিনটি পোশাকের দোকান, একটা মনিহারির দোকান এবং দুটি মুদিখানা। এ ছাড়াও একটি আড়ত এবং একটি হাড়িং মেশিনেরও দোকান। ছিল সেখানে। বাজারটির উত্তরে ছিল বিরাট একটি মাঠ এবং পেছনে ছিল বাঁশবন। চারপাশের গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এখানেই কেনাকাটা করতে আসত।

পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকলেও বাজারে বিদ্যুৎ ছিল। সকাল থেকে শুরু করে রাত ন-টা পর্যন্ত এই বাজার খোলা থাকত। চারপাশের গ্রামের পুরুষদের কাছে এটা তাই একটা আড্ডার জায়গাও ছিল। সভ্যতার ছোট উনোনের পাশে হাত-পা সেঁকে নিতো তারা প্রায়শই বাজারে আসত, বিশেষত সন্ধ্যায়, যখন গ্রামগুলি প্রায় অন্ধকার থাকত। বাজারের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত চায়ের দোকানে বসে তারা গল্পগুজব করে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত। বোম্বাইয়ের গায়ক-গায়িকা বা অভিনেতা-অভিনেত্রী অথবা দেশের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী কিংবা স্থানীয় মানুষদের নিয়েই সে আড্ডা চলত। রাত নটায় বাজার ফাঁকা হয়ে গেলে জনহীন বাজারের বৈদ্যুতিক আলোয় দু-একটা নেড়িকুত্তাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। একটা দুটো ট্রাক কখনো সখনো রাস্তা দিয়ে শহরের দিকে চলে যেত। রাতের নিস্তদ্ধ বাজারের পাশের বটগাছ থেকে প্যাঁচার ডাক শোনা যেত।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে রায়বাংলার যে ছোট গ্রামা বাজারের পরিচয় পাওয়া যায়, সেই বাজারটা চারপাশের গ্রামের পুরুষদের কাছে একটা আড্ডার স্থান ছিল। বৈচিত্রহীন গ্রাম্যজীবনে সভ্যতার ছোঁয়া বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত। পৌষমাসের অকাল-দুর্যোগের শেষ দিনটিতে তেমনিভাবেই বাজারের চায়ের দোকানে এসে বসেছিল কয়েকজন অলস গ্রামবাসী। খেতের ধান তখনও কেটে নেওয়া হয়নি বলে সেই অসময় দুর্যোগে ধানের প্রভূত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় তাদের মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে ছিল। চায়ের দোকানে বসে গল্পচ্ছলে তাই তারা রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের অপেক্ষা করছিল। কেউ কেউ হতাশ হয়ে ঈশ্বর বা আপ্পার মুন্ডুপাতও করছিল। একজন যুবক চাষি তো চরম ক্ষোভ ও হতাশায় চিৎকার করে বলতে শুরু করল যে, তাদের মাথার ওপর ঈশ্বর বা আল্লা নামধারী কোনো নিয়ন্ত্রক নেই। কেউই নেই। সুতরাং বা আমার থাকা বা না-থাকা নিয়ে তর্ক বেধে গেল এইবার। তর্কটা যখন হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে গেল, তখনই সেই আড্ডার বিষয় পরিবর্তিত হল। আড্ডার নিয়মই হল এই যে, তার কোনো প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গ থাকে না। যাই হোক, এরপরই বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতের গায়ক ও অভিনেতা -অভিনে এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা পাখি, মুখ্যমন্ত্রী এবং বিধায়কের প্রসঙ্গ চলে আসে আলোচনায়। পাড়ার সরা বাউরির বিষয়ে নানা আলোচনাও প্রসঙ্গত এসে পড়ে। এইভাবে আড্ডা যখন জমে ওঠে, তখনই সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে সেখানে এক বৃদ্ধার আগমন ঘটে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পটিতে কাহিনির সূত্রেই লেখক রায়বাংলার অকাল প্রাকৃতিক দুর্যোগের আলোচনা করেছেন।
পৌষমাসের এক মঙ্গলবার রাঢ়বাংলার একটি গ্রাম্য বাজারে হঠাৎই উত্তরের মাঠ থেকে কনকনে ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে আসতে শুরু করেছিল। তারপরই ছাইরঙের মেঘে ঢেকে যায় আকাশ শুরু হয়ে যায় বৃষ্টি। রাঢ়ের প্রবল জাঁকালো শীত সেই বৃষ্টিপাতের ফলে তীক্ষ্ণতর হয়। পৌষের এই বৃষ্টিকে ভদ্রলোকে বলে ‘পউষে বাদলা’, ছোটো জাতের লোকেরা বলে 'ডাওর'। কিন্তু যেহেতু পৌষের বৃষ্টির সঙ্গে প্রবল বাতাসও চলছিল, তাই অবস্থাটা ইতরজনের ভাষায় ছিল 'ফাঁপি' অর্থাৎ সংকটজনক অবস্থা। খেতের ধান তখনও যেহেতু কেটে নেওয়া হয়নি, তাই কৃষিজীবী গ্রামবাসীরা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় তিরিক্ষে মেজাজের হয়ে উঠেছিল। অকালবর্ষণের সেই দিনগুলিতে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে আসা গরিব মানুষগুলি গল্পগুজব করতে করতে তাই রোদ-ঝলমল দিনের অপেক্ষা করছিল। সেখানে বসে হতাশ হয়ে কেউ কেউ ঈশ্বর বা আল্লার মুণ্ডুপাতও করছিল।

বিখ্যাত জ্ঞানী পুরুষ ডাক তার বচনে বলেছিলেন যে, পৌষে শনিবার বৃষ্টি শুরু হলে সাত দিন, মঙ্গলবারে হলে পাঁচ দিন, বুধবারে হলে তিন দিন থাকে এবং অন্য বারগুলিতে হলে একদিনই বৃষ্টি থাকে। তবে মঙ্গলবারে শুরু হওয়া বৃষ্টির শেষদিন এবং তার পরের রৌদ্রোজ্জ্বল দিন—এই দু-দিনের কাহিনি নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘ভারতবর্ষ' গল্পের পটভূমি ।

পিচের সড়ক আদ্যিকালের একটি বটগাছের পাশে যেখানে বাঁক নিয়েছিল, সেখানেই বাজারটি গড়ে উঠেছিল।

বাজারটিতে তিনটি চায়ের দোকান, দুটো সন্দেশের দোকান, তিনটে পোশাকের দোকান, একটা মনিহারি দোকান এবং দুটি মুদিখানা ছিল।

গল্পটিতে পৌষ মাস এবং ঋতু হিসেবে শীতকালের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে।

রাচবাংলার শীত খুব জাঁকালো প্রকৃতির, বৃষ্টি হলে তা হয় ধারালো।

পৌষের শীতে বৃষ্টির সঙ্গে জোরালো বাতাস বইতে শুরু করায় ধানের প্রচন্ড ক্ষতি হয়ে যাবে বলে লোকের মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল।

চাষাভুসো মানুষ চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে রোদ ঝলমল দিনের প্রতীক্ষা করছিল।

চাষাভুসো মানুষ চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে আন্না তথা ভগবানের মুণ্ডুপাত করছিল।

শীতের অকাল বৃষ্টিতে রাতবাংলায় ধানের ক্ষতি হয়।

পৌষমাসের বৃষ্টি গ্রামবাংলায় ভদ্রলোকের কাছে ‘পউষে বাদলা' অভিধায় এবং ছোটোলোকের কাছে 'ডাওর' নামে পরিচিত।

শীতকালে বৃষ্টির সঙ্গে জোরালো বাতাস বইলে রাতবাংলার গ্রামা, তথাকথিত 'ছোটোলোকের ভাষায় সেই আবহাওয়াকে 'ফাঁপি' বলে।

চায়ের দোকানের আড্ডায় 'বোমবাইয়ের' অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক, ইন্দিরা গাখি, মুখ্যমন্ত্রী, বিধায়ক থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজনকে নিয়েও গল্পগুজব চলছিল।

পৌষমাসের অকাল দুর্যোগে ঘরে বসে গ্রামের পুরুষদের সময় না কাঠায় বাজারে এসে সেখানকার সভ্যতার ছোট্ট উনোনের পাশে হাত-পা সেঁকে নেওয়াই ছিল তাদের সুখা।

'ভারতবর্ষ' প্রশ্নের বুড়িটি ছিল রাষ্ট্রসী হোরার, কুঁজো এক সাদাফুলের ঘুগুড়ে বুড়ি। তার ক্ষয়ে যাওয়া, ছোট মুখমণ্ডলের বলিরেখাগুলি স্পষ্টভাবে তার দীর্ঘ আয়ু প্রকাশ করছিল।

বৃদ্ধা নোংরা একটা কাপড় পরেছিল এবং তার গায়ে জড়ানো ছিল তুলোর ষ্টিচিটে একটা কমল।

 

বৃদ্ধার হাতে ছিল ছোটো একটা লাঠি।

বৃদ্ধার মুখমণ্ডল ছিল ছষ্ট বলিরেখাযুক্ত।

 

মুসুড়ে কুঁজো বৃদ্ধা পৌষমাসের তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে বেঁচেবর্তে থেকে চায়ের দোকানে হেঁটে হেঁটে আসতে পারল—সেই ভাবনাই সবাইকে অবাক করেছিল।

দোকানে ঢুকে চা খাওয়ার ঠিক পরপরই বৃথা কোনো না বলে দোকানে বসে থাকা সবার মুখের দিকে তাকিয়েছিল।

ভারতবর্ষ' গল্পে চায়ের দোকানে বসে থাকা গ্রামবাসীদের একজন সেই সময় বুড়িকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, সে কোথা থেকে এসেছে।

চায়ের দোকানে চা খেয়ে বৃদ্ধাটি কোনো কথা না বলে বসে থাকা সবার মুখের দিকে তাকালে একজন তাকে প্রশ্ন করেছিল।।

চায়ের দোকানে আসা বৃদ্ধাকে সে কোথা থেকে এসেছে জানতে চাওয়ায় তার মেজাজি পালটা প্রশ্ন ছিল যে, তাতে তাদের কাজ কী? বুড়ির এই অস্বাভাবিক আচরণে সবাই হেসে উঠেছিল।

চায়ের দোকানে একজন বুড়িকে “ভারি তেজি দেখছি। এই বাদলায় তেজি টার মতন বেরিয়ে পড়েছে।” বলায় বুড়ি খেপে গিয়েছিল।

একজন ঠাণ্ডা মাথায় বুড়িকে বলেছিল যে, বুড়ি কোথায় থাকে, তারা তাই জিজ্ঞাসা করছে।

বুড়ি চা খেয়ে তার কমলের ভেতর থেকে একটা ন্যাকড়া বের করে তার মধ্যে বাঁধা পয়সা বের করে চায়ের দাম দিয়েছিল।

“মরবে যে, নির্ঘাত মরবে বুড়িটা কথা বলেই লোকেরা কুঁচিয়ে উঠেছিল।

বুড়ি চায়ের দোকানে ঢুকে চা খেয়ে, তার দাম হিলিয়ে যখন তরা বর্ষার মধ্যে রাস্তায় আবার নেমেছিল তখনই লোকেরা চেঁচিয়ে উঠেছিল।

'ভারতবর্ষ' গল্পের বুড়িটা ঘুরে দাঁড়িয়ে চায়ের দোকানে বসে-থাকা লোকদের বলেছিল, “তোরা যর, তোদের শতগুষ্টি মরুক।"

‘ভারতবর্ষ' গল্পে উল্লিখিত বটতলাটা সেইসময় জনহীন ছিল এবং সেখানকার মাটি ভিজে কাদা কাদা হয়ে গিয়েছিল।।

বটগাছতলায় বটের গুঁড়ির কাছে থাকা একটি শিকড়ের ওপর বসে পেছনের গুঁড়ির কোটরে পিঠ ঠেকিয়ে বসার অভিজ্ঞতার কথা এখানে বলা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেছিল যে, বটগাছতলায় না গিয়ে গ্রামের বারোয়ারিতলায় গেলেই বুড়ি ভালো করত। দুর্যোগে বটগাছতলায় সে

নির্ঘাত মারা পড়বে।

চা-দোকানের লোকদের প্রশ্নের উত্তরে বুড়ি তাদের বলেছিল যে, তার নিবাস তাদের মাথায়।

কম্বলের ভেতরে একটি ন্যাকড়ার মধ্যে বুড়ি পয়সা বেঁধে রেখেছিল।

'ভারতবর্ষ' গল্পের গল্পকথক বুড়ির স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে বড়ো মেজাজি' এবং 'ভারি তেজি'—এই দুটি বিশেষণ ব্যবহার করেছেন।

: ডাকের মতে পৌষের বৃষ্টি রবিবার, সোমবার, বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার শুরু হলে সেইদিনই থেমে যায়।

'ডাকপুরুষের' পুরোনো 'বান'-এ পৌষের বৃষ্টি সম্বন্ধে বলা আছে যে, শনিবার শুরু হলে সাত দিন, মঙ্গলবার হলে পাঁচ দিন এবং বুধবার হলে তিন দিন বৃষ্টি চলবে। অন্যবারে শুরু হলে বৃষ্টি সেদিনই থামবে।

অন্যদিন বলতে রবি, সোম, বৃহস্পতি ও শুক্র—এই চার দিনের কথা বলা হয়েছে।

ভারতবর্ষ' গল্পে পৌষমাসের এক মঙ্গলবার যে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, সেই বৃষ্টি ছাড়ার অর্থাৎ থেমে যাওয়ার কথা এখানে বলা হয়েছে।

পৌষের বৃষ্টি যেদিন ছাড়ল সেদিন আকাশ পরিষ্কার হয়ে সূর্যের উজ্জ্বল মুখ দেখা গেল।

পৌষের বৃষ্টি থেমে গেলে যেদিন পরিষ্কার আকাশে সূর্যের উজ্জ্বল মুখ দেখা গেল, সেদিনই সবাই আবিষ্কার করল।

সবাই আবিষ্কার করল যে, বটগাছের গুড়ির কোটরে পিঠ রেখে বুড়ি চিৎ হয়ে অসাড়ভাবে পড়ে রয়েছে।

"ভারতবর্ষ' গল্পের বিশাল মাঠটি ছিল বাজারের উত্তরদিকে।

রাবাংলার শীতকালে বৃষ্টি হলে সেই শীত আরও বেড়ে যায়। গ্রাম বাংলার তথাকথিত ছোটোলোকদের ভাষায় সেই অবস্থাকে বলে 'ডাক্তরা।

'রাবোংলা' বলতে এককথায় গঙ্গার পশ্চিম তীরবর্তী স্থানকে বোঝায়। এর দক্ষিণে দ্বারকেশ্বর নদ, পশ্চিমে মানভূম- সিংভূম, উত্তরে অজয় নদ এবং পূর্বে গঙ্গা রয়েছে।

ধানের মরশুম বলতে এই গল্পে ধান কাটার সময়কে অর্থাৎ শীতকালকে বোঝানো হয়েছে।

পিচের সড়ক আদ্যিকালের একটি বটগাছের পাশে যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখানেই 'ছোট্ট বাজারটি গড়ে উঠেছে।

যখন গ্রামের কাঁচা রাস্তায় সবুজ ঝোপের ফাঁক দিয়ে বাজারের দিকে এগিয়ে আসে গ্রাম্য কোনো যুবক বা যুবতী, তখনই বিমর্ষ সভ্যতার মুখ চোখে পড়ে।

প্রশ্নোক্ত যুবক বা যুবতী আমেদাবাদের মিলে তৈরি সম্রা পোশাকে সজ্জিত থাকে।

বাজারের চারপাশের গ্রামগুলিতে যেহেতু বিদ্যুৎ-সংযোগ ছিল না, সে কারণেই লেখক 'কিন্তু' অবায় ব্যবহার করে বুঝিয়েছেন যে, বাজারে বিদ্যুৎ আছে।

ভারতবর্ষ' গল্পে আমরা দেখি যে, পিচের সড়ক যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেই বাঁকের মুখেই বাজার-পার্শ্ববর্তী বটগাছটি অবস্থিত ছিল।

'ভারতবর্ষ' গল্পের বটগাছ-পার্শ্বস্থ বাজারটি রাত নটার পর যখন অত্যন্ত নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন বটগাছে পেঁচার ডাকাও ভদ্ধতার অন্তর্গত মনে হত।

রাতবাংলার প্রবল জাকালো শীত বৃষ্টিতে ধারালো হয়েছিল।।

পৌষমাসের বৃষ্টিকেই গ্রামবাংলার ভদ্রলোকে 'পউষে বাদলা' বলে।

দুর্দান্ত শীতের প্রাকৃতিক দুর্যোগে গ্রামবাসীদের ঘরে বসে দিন কাটতে চায় না বলেই তারা বাজার-রূপ উনোনের কাছে চলে আসে।

ভারতবর্ষ' গল্পে উল্লিখিত গ্রামীণ বাজারটিকেই 'সভ্যতার ছোট্ট উনোন' বলা হয়েছে।

মুম্বাইয়ের নায়ক নায়িকা অথবা গায়ক, বিধায়ক, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি ইত্যাদি নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ মানুষের কথা—সবই আড্ডায় এসে পড়ে।

সেইসময় ধান কাটার মরশুম চলছিল বলে গ্রামের মানুষদের হাতে যেহেতু টাকার জোগান ছিল, তাই চাওয়ালা টাকা পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল।

পিচের রাস্তা দিয়ে ভিজতে ভিজতে একই গতিতে হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকানে এসে ঢুকেছিল বুড়ি।

এক ঘুঘুরে, কুঁজো বুড়িকে চায়ের দোকানে ঢুকতে দেখে আড্ডা দেওয়া চাষাভুসো মানুষরা তাদের তর্ক থামিয়েছিল।

প্রবল শীতের অকালবর্ষণে অপ্রতুল পোশাকে অশীতিপর বৃদ্ধাটি বাইরে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছিল বলেই এমন আশঙ্কা করা হয়েছে।

বুড়ির দেহকে বাঁশের চ্যাংদোলায় ঝুলিয়ে নদীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

হঠাৎ বিকেলে দেখা গেল যে, উত্তরের মাঠ অতিক্রম করে বাজারের দিকে একটা চ্যাংদোলা আসছে।

বুড়ি যে মুসলমান তার প্রমাণস্বরূপ মুসলমান শববাহকরা জানিয়েছিল যে, তাদের অনেকেই বুড়িকে বিড়বিড় করে 'আপ্পা' বা 'বিসমিল্লা' বলতে শুনেছিল।

ব্যাপারটা ছিল যে মুসলমান পাড়ার লোকেরা নদীর চড়া থেকে বুড়ির ফেলে দেওয়া মৃতদেহ চ্যাংদোলায় করে তুলে নিয়ে এসেছে।

মোয়াসাহেব শহরের দিকে যাওয়ার সময় বটতলায় আশ্রয় নেওয়া বুড়িকে কলমা পড়তে স্পষ্ট শুনেছিলেন।

মোল্লাসাহেব ভোরের নামাজ সেরে যখন শহরে যাওয়ার বাস ধরার উদ্দেশ্যে আসছিলেন, তখন তিনি বটতলায় মুমূর্ষু বুড়িকে দেখেছিলেন।

বটগাছতলায় পড়ে থেকে কলমা পড়তে থাকা বুড়ি শেষ পর্যন্ত মরল কি না—তা দেখা হয়নি মোল্লাসাহেবের।

মোল্লাসাহেব মামলা লড়তে শহরে যাচ্ছিলেন বলে বটগাছতলায় আশ্রয় নেওয়া বুড়ি মরল কিনা তা তার দেখা হয়নি।

মুসলমান বুড়ির মৃতদেহ কবরস্থ না করে নদীতে ফেলে দেওয়া এখানে মোল্লাসাহেব তা না হওয়ার কথা বলেছেন।

ভটচাজমশাই বুড়িকে 'শ্রীহরি শ্রীহরি শ্রীহরি' বলতে শুনেছিলেন।

বুড়িকে নদীতে ফেলে আসার দিন সকালে বটগাছতলা থেকে মোল্লাসাহেব এবং ভটচাজমশাই একই বাসে করে শহরে গিয়েছিলেন।

বুড়ি মারা যাওয়ার সময় 'শ্রীহরি' এবং 'হরিবোল' উচ্চারণ করেছিল বলে হিন্দুরা জানিয়েছিল।

বুড়ি মারা যাওয়ার সময় কলমা পড়েছিল এবং 'আন্না', 'বিসমিল্লা', 'লাইলাহা ইল্লাল্লা' উচ্চারণ করেছিল বলে মুসলমানরা জানিয়েছিল।

অসময়ের জলবৃষ্টিতে এক ভিখিরি বুড়ির নেহাতই ঘটনা চৌকিদার সে থানায় দেওয়ার প্রয়োজন বলে করেছিল।

বটতলা থেকে ক্রোশ দূরবর্তী থানায় খবর এবং তা পুলিশ দুর্গন্ধ ছড়াবে বলে চৌকিদার থানায় মৃত্যুসংবাদ দিতে বারণ করেছিল।

চৌকিদার বুড়ির মৃতদেহ নদীতে ফেলে তার ব্যবস্থা করেছিল।

ভারতবর্ষ' নদীটা বাজার অবস্থিত ছিল।

চড়ায় বালিতে সূর্যালোকে পড়েছিল।

দিকে তাকিয়ে ঝাঁক ঝাঁক শকুনের নেমে আসার অপেক্ষা করছিল।

পর তৎক্ষনাৎ গ্রামের চৌকিদারকে খবর দিয়েছিল।

ফজলু সেখ যখন জানায় যে, সে নিজের কানে মুমূর্ষু বুড়িকে 'লাইলাহা ইল্লার' বলতে শুনেছে, তখন নিবারণ বাগদি সে কথাকে মিথ্যে বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল।

বটগাছতলায় দাড়ি কামানোর উদ্দেশ্যে এসে বৃষ্টিতে সেখানকার কাদা হয়ে যাওয়া মাটির অবস্থা দেখে নকড়ি নাপিত বুঝতে পেরেছিল সেখানে বসা যাবে না।

'লাইলাহা ইল্লার' কথাটির অর্থ হল আল্লা ছাড়া অন্য উপাস্য নেই।

‘নারায়ে তকবির' কথাটির অর্থ হল উচ্চকন্ঠে আল্লার প্রশংসা বা গুণকীর্তন।

'আল্লাহু আকবর' কথাটির অর্থ হল আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ।

ইসলামধর্মের আত্মশুদ্ধি-সাধক মূল ইষ্টমাত্রই হল কলমা।

'ভারতবর্ষ' গল্পে 'খবরদার' কথাটা উচ্চারণ করেছিল একসময়ের পেশাদার লাঠিয়াল করিম ফরাজি এবং এলাকার চৌকিদার।

ফজলু সেখ বলেছিল যে সে নিজের কানে বুড়িকে 'লাইলাহা ইয়ারা বলতে শুনেছে।

'ভারতবর্ষ' গল্পের নিবারণ বাগদি ছিল রাগি লোক। সে একসময় দাগি ডাকাত ছিল।

'ভারতবর্ষ' গল্পের করিম ফরাজি বর্তমানে নিয়মমতো নামাজ পড়া বান্দা মানুষ হলেও এককালে সে ছিল পেশাদার লাঠিয়াল।

উত্তেজনা ছড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় বাজারের দোকানগুলোর ঝাপ বদ্ধ হতে থাকল এবং গ্রাম থেকে বহু লোক অম্লশদ সহ দৌড়ে বাজারে আসতে ।

মোল্লাসাহেব 'জেহাদ' কথাটি উচ্চারণ করে এবং নারায়ে তকবির- আল্লাহ্ আকবর!" বলে নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের উত্তেজিত করেছিলেন।

'ভারতবর্ষ' গল্পের শেষে দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর বুড়ি উৎসাহী জনতার উদ্দেশ্যে মুখপোড়া', 'নরকখেকো' এবং 'শকুনচোখো'— এই গালাগাল বর্ষণ করেছিল।

উচাজমশাই 'জয় মা কালী' ধ্বনি তুলে তাঁকে যবন নিধনে অবতীর্ণ হওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন।

'থু্যুমার গর্জন প্রতিগর্জন' চলাকলীন চৌকিদার দু-পক্ষের মাঝখানে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে দু-পক্ষকে নিরস্ত করার চেষ্টা করছিল।

হিন্দুপক্ষ যখন এক পা এগিয়ে আসছিল, তখন চৌকিদার হাতের লাঠিটা পিচ রাস্তায় ঠুকে 'খবরদার' বলে গর্জে উঠছিল।

দু-দিকের সশস্ত্র জনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছিল যে, বুড়ির দেহটা নড়ছে এবং নড়তে নড়তে বুড়ি উঠে বসার চেষ্টা করছে।

দীর্ঘ ঘুম থেকে উঠে দু-পাশের ভিড় দেখে প্রাথমিকভাবে বুড়ির মুখটা বিকৃত হয়ে গেলেও এরপর ফ্যাক ক্যাক করে হেসে উঠেছিল সে।

চৌকিদারের কথার উত্তরে বুড়ি শতগুষ্টিসহ চৌকিদারের মৃত্যুকামনা করে বলেছিল—“মর্, তুই মর্। তোর শতগুষ্টি মরুক!”

বুড়িটা নড়ে ওঠার ঠিক আগে চৌকিদার পালা করে হিন্দু ও মুসলিমপক্ষ—এই দু-পক্ষের দিকে একবার করে পিচে লাঠি ঠুকছিল এবং খবরদার বলে চিৎকার করছিল।

দু-পক্ষের বিবদমান জনতা যখন বুড়িকে জিজ্ঞাসা করেছিল বুড়ি হিন্দু না মুসলমান, তখনই বুড়ি খেপে গিয়ে কথাগুলো বলেছিল।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘ভারতবর্ষ' গল্পে উদ্ধৃতাংশের বক্তা হলেন মোল্লাসাহেব।

‘ভারতবর্ষ' গল্পের বৃদ্ধাটির মৃত্যু হয়েছে ভেবে গ্রামবাসীরা চৌকিদারকে খবর দিলে সে এসে মৃতদেহ পরীক্ষা করে থানায় খবর না দেওয়ার যুক্তিতে কথাটি বলে।

থানাটি বটতলা থেকে পাঁচ ক্রোশ দূরে অবস্থিত বলে সেখানে খবর দিলে থানা থেকে পুলিশের আসতে রাত দুপুর হবে ।

বক্তা চৌকিদারের মতে করে না-করে মরা বুড়ির লাশ যেহেতু ফুলে ঢোল হয়েছে, তাই সেদিন রাত-দুপুরের মধ্যে সেই মড়ার দুর্গন্ধ ছড়াবে বলে মনে করে সে।

বৃদ্ধার মৃতদেহ নদীতে ফেলে দিয়ে আসলেই তার আত্মার গতি হবে বলে জানিয়েছে চৌকিদার।

বুড়ির মৃতদেহ ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নদীর চড়ায় নিয়ে যেতে তাকে বাঁশের চ্যাংদোলায় ঝোলানো হয়েছিল।

বুড়িকে মৃত ভেবে চ্যাংদোলায় ঝুলিয়ে শুকনো নদীর চড়ায় ফেলে ফিরেছিল কয়েকজন হিন্দু গ্রামবাসী।

বুড়িকে নদীর চড়ায় ফেলে বাজারে ফিরে ঝাঁক ঝাঁক শকুনের নেমে আসা দেখার অপেক্ষায় গ্রামবাসীরা দিগন্তে চোখ রেখেছিল।

বাজারে বুড়ির মৃতদেহের অধিকার নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীর মধ্যে যখন বচসা চলছিল, তখনই বাস থেকে নেমে ভট্টচাজমশাই অকুস্থলে প্রবেশ করেন।

বুড়িকে যে ভটচাজমশাই মুমূর্ষু অবস্থায় 'শ্রীহরি' বলতে শোনেন, অর্থাৎ বুড়ি যে হিন্দু, তার সপক্ষে প্রমাণ জুটেছিল |

ভট্টচাজমশাইয়ের সপক্ষে নকড়ি নাপিত প্রমাণ জুগিয়েছিল যে, ক্ষৌরকর্ম করতে বটতলায় গিয়ে সে বুড়িকে 'হরিবোল' বলতে স্পষ্ট শুনেছে।

মোল্লাসায়ের চেঁচিয়ে বলছিলেন " মোছলেম ভাইসকল। জেহাদ, জেহাদ। নারায়ে তকবির-আল্লাহ্ আকবর।"

বুড়িকে হরিবোল বলতে স্পষ্ট শুনেছে নকড়ি নাপিত।

শুয়ে থাকা মৃতদেহ মনে করে হিন্দু-মুসলমান দুপক্ষের মানুষ তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখেই বুড়িটি বিকৃত মুখে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে উঠেছিল।

বুড়ি হিন্দু না মুসলমান—এই বিতর্কের মাধ্যমেই দুপক্ষের মধ্যে বচসা বেড়ে গেল।