Chapter-3, রাজনীতির বিবর্তন-শাসনতান্ত্রিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা

পলিসের দুটি বৈশিষ্ট্য হল –

[1] গ্রিক পলিস বা নগর রাষ্ট্রগুলিআকারে এবং আয়তনে আধুনিক রাষ্ট্রের তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র হত।
[2] পলিসের জনসংখ্যা খুবই কম হত।

প্রাচীন গ্রিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পলিস ছিল এথেন্স, স্পার্টা,করিন্থ, থিবস, ইরিথ্রিয়া, আরগস, সিরাকিউজ প্রভৃতি।

নগর-রাষ্ট্রের ধারণা প্রাচীন গ্রিসে গড়ে উঠেছিল।

গ্রিক পলিসগুলির আয়তন ছিল বর্তমান রাষ্ট্রের তুলনায় খুব ছোটো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় করিন্থ নামে একটি পলিসের আয়তন ছিল মাত্র ৩৩০ বর্গমাইল।

গ্রিসের গলিসগুলির আয়তন খুব ছোটো হওয়ায় জনসংখ্যা খুব বেশি ছিল না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে অ্যাটিকা নামের পলিসটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার। আবার করিখের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ হাজার।

এথেন ও স্পার্টার সমিতির নাম যথাক্রমে একলেজিয়া ও অ্যাপেলা।

এথেন্স ও স্পার্টার পরিষদের নাম ছিল যথাক্রমে অ্যারিওপাগাসের কাউন্সিল ও গেরুসিয়া।

অধিকাংশ পলিসের কেন্দ্রস্থলে একটি উঁচু স্থানে বা পাহাড়ি অঞ্চলে পলিসের শাসনকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হত। এগুলিকে ‘অ্যাক্রোপলিস' বলা হত।

অধিকাংশ পলিসে জনসাধারণের জন্য একটি বাজার প্রতিষ্ঠিত হত যা 'অ্যাগোরা' নামে পরিচিত ছিল।

পলিসের নগর-প্রাচীরের বাইরে অবস্থিত দরিদ্রদের বসতি অঞ্চল ও পশুচারণভূমিযুক্ত গ্রামীণ অঞ্চলকে 'চোরা' বলা হত।

পলিসগুলির কয়েকজন প্রধান দেবদেবী ছিলেন জিউস, পসাইডন, হ্যাডেস, অ্যাপোলো, আরটিমিস, এথেনা, হারমিস, ডিমিটার, হেরা প্রমুখ।

গ্রিক পলিসে বসবাসকারী জনগণ মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। যথা—নাগরিক ও অনাগরিক। জন্মসূত্রে বসবাসকারীরা ছিল নাগরিক। আর অনাগরিকরা ছিল বিদেশি ক্রীতদাস ও মহিলা।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্ট, প্লেটো প্রমুখ পলিসের ক্ষুদ্রত্বকে সমর্থন করেছেন।

প্রাচীন গ্রিক পলিসগুলিতে তিন প্রকারের শাসন কাঠামো চালু ছিল। যথা— গণতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক প্রভৃতি।

পলিসগুলির রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান তিনটি অংশ ছিল। যথা-

[1] সমিতি,

[2] পরিষদ

[3] ম্যাজিস্ট্রেট।

খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে অলিম্পিক খেলা প্রথম শুরু হয়েছিল।

প্রাচীন গ্রিসে পরস্পর-বিরোধী এথেন্সের নেতৃত্বাধীন জোট ও স্পার্টার নেতৃত্বাধীন পেলোপনেসীয় লিগের মধ্যে পেলোপনেসীয় যুদ্ধ (৪৩১-৪০৪ খ্রিস্টপূর্ব) হয়।

গ্রিক পলিসগুলি আর্থিক দুর্বলতার কারণে পতনের দিকে এগিয়ে যায়। সামরিক শক্তি, বিশষত নৌ-শক্তির দুর্বলতা ছিল পলিসগুলির পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। সর্বোপরি পলিসের বাসিন্দাদের ব্যক্তিস্বার্থ বৃদ্ধি পেলে ও পলিসগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে পলিসগুলির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

নগর রাষ্ট্র বা পলিসের প্রতিষ্ঠার কারণ
গ্রিসে নগর রাষ্ট্রগুলি গড়ে ওঠার পিছনে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।বলে মনে করা হয়। এগুলি হল—
[1] গ্রিকদের মানসিকতা: প্রাচীন কালে গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্র বা পলিস গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গ্রিকদের মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রাজনৈতিক কাজে নাগরিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগবিশিষ্ট পলিসের এই ক্ষুদ্রত্বকে গ্রিকরা তাদের রাষ্ট্রের অন্যতম গুণ বলে মনে করত। তারা সমকালীন পারস্যের মতো বৃহদাকার রাষ্ট্রকে একমাত্র বর্বরদের বসবাসযোগ্য বলে মনে করত।
[2] ডোরিয়ান বিজয়ের প্রভাব: ডোরিয়ান বিজয়ের পরবর্তীকালে গ্রিসের উপত্যকা ও দ্বীপের বাসিন্দাদের আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে স্থানীয় পাহাড়ের চূড়ায় একটি শক্তিশালী কেন্দ্র নির্মিত হত, যা অক্টোপলিস নামে
পরিচিত ছিল। এই স্থান ক্রমে শাসকের বাসস্থান, জনগণের মিলনকেন্দ্র এবং ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নগরে পরিণত হয় এবং এখান থেকে সংলগ্ন অঞ্চল শাসিত হতে থাকে।
[3] বাজার প্রতিষ্ঠা : প্রাচীন গ্রিসে উৎপাদনকারীরা বিক্রির জন্য একসময় নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামগ্রী উৎপাদন করতে থাকে। ফলে পণ্য কেনাবেচার কেন্দ্র হিসেবে বাজার গড়ে ওঠে। এর ফলে পলিসগুলির স্থানীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়।
[4] সামাজিক মনোভাব : প্রাচীন গ্রিকরা তাদের বাসস্থানের বাইরে সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান পছন্দ করত। তারা গ্রাম বা শহরে তাদের বাড়ি থেকে হেঁটে কর্মস্থলে যেতে চাইত এবং স্থানীয় খোলা স্থানে বা বাজারে তাদের অবসর সময় কাটাতে পছন্দ করত। ফলে পণ্য। ক্রয়বিক্রয়ের বাজারগুলি ক্রমে বাক্তার-নগরে পরিণত হয় বা গ্রিকদের গোষ্ঠীজীবনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
[5] অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা : বাজার নগরগুলি গড়ে উঠলেও গ্রিসের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার ফলে সেখানে পণ্য চলাচল ব্যাহত হয়েছিল। তা ছাড়া গ্রিকদের যে স্বল্প পরিমাণ পণ্যসামগ্রীর প্রয়োজন হত তা স্থানীয় অঞ্চলেই উৎপাদিত হত। এজন্য বাক্তারগুলি কখনও বৃহৎ নগরীতে। পরিণত হতে পারেনি। ফলে বৃহৎ এলাকায় পারস্পরিক নির্ভরতার পরিবর্তে স্থানীয় অঞ্চলেই তাদের অর্থনীতি আবর্তিত হত।

পলিসের উত্থানের ধারাবাহিক পর্যায় 

ডোরিয়ান বিজয়ের (আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব) পরবর্তীকালে গ্রিকরা ক্ষুদ্র ও স্বাধীন নগর রাষ্ট্রগুলি গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। ইতিহাসবিদ ফিনলে মনে করেন যে, এই নগর-রাষ্ট্রগুলির প্রতিষ্ঠায় গ্রিকদের উদ্যোগের পশ্চাতে তাদের অনমনীয় স্বভাব কার্যকারী ছিল। গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে।
পলিস গঠনের ধারাবাহিক বিভিন্ন পর্যায় লক্ষ করা যায়। যেমন—
[1] শক্তিমান রাজা ও রাজ্যের অবলুপ্তি: ডোরিয়ান বিজয়ের পর থেকে গ্রিসে শক্তিমান রাজা ও বৃহৎ রাজ্যের অস্তিত্ব লুপ্ত হতে থাকে। এই সময় ভ্রাগামেমনন বা ইভোমিনিয়ান্স-এর মতো বৃহৎ রাজার সন্ধান আর পাওয়া যায় না। একদা ক্রীট দ্বীপে যেখানে ইভোমিনিয়ান্স ছিলেন একমাত্র রাজা সেখানে পরবর্তীকালে পঞ্চাশটিরও বেশি স্বাধীন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। গ্রিসের আয়োনিয়া, ইজিয়ান সাগরের বিভিন্ন দ্বীপ, পেলোপনেসাস
ও মধ্য গ্রিসের বৃহদংশ, দক্ষিণ ইটালি, সিসিলি প্রভৃতি অঞ্চলগুলিতেও অসংখ্য ক্ষুদ্র, স্বশাসিত ও স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে উঠতে থাকে।
[2] পলিসের প্রাথমিক পর্যায় : খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে সপ্তম শতকের মধ্যে গ্রিসের পন্নিসগুলি তাদের প্রাথমিক রূপ লাভ করতে শুরু করেছিল। স্বাধীন এই পলিসগুলিতে লোকসংখ্যা ছিল খুবই কম, মাত্র কয়েক হাজার।
তখনও পরিণত পলিসের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। পলিসের প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রিসের প্রতিবেশী কোনো কোনো অঞ্চলে বৃহৎ রাষ্ট্রের অস্তিত্বও ছিল।
[3] পলিসের চূড়ান্ত পর্যায় : গ্রিসের ইতিহাসের ধ্রুপদি যুগে (খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতক) সেখানকার পলিসগুলি পূর্ণরূপ লাভ করেছিল। গ্রিকরা যখন পূর্ব ও পশ্চিমে নিজেদের সম্প্রসারণের কাজ সম্পূর্ণ করতে
পেরেছিল তখন গ্রিসে নগর-রাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১৫০০। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিল এথেন্স ও স্পার্টা।

প্রাচীন গ্রিক পলিসের আয়তন ও জনসংখ্যা
গ্রিক ইতিহাসের ধ্রুপদি যুগে ওই দেশে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। এগুলি পলিস' নামে পরিচিত ছিল। পলিসগুলির আয়তন যেমন ক্ষুদ্র হত তেমনি এগুলির জনসংখ্যাও হত বেশ কম। এথেন্স বা সিরাকিউজের মতো পলিসগুলিতে জনসংখ্যার চাপ বেশি থাকলেও বহু পলিসের জনসংখ্যা ছিল ৫ হাজার বা তারও কম। মাইসিনি নামে একটি পলিস পারস্যের বিরুদ্ধে প্ল্যাটিয়ার যুদ্ধে ৮০ জন সৈন্য পাঠিয়েছিল। এ
থেকে তৎকালীন পলিসের ক্ষুদ্রত্ব সম্পর্কে সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
[1] প্লেটোর অভিমত : গ্রিক দার্শনিক প্লেটো পলিসগুলির ক্ষুদ্র আয়তন ও সীমিত লোকসংখ্যাকে সমর্থন করতেন। তিনি তাঁর 'রিপাবলিক' গ্রন্থে বলেছেন যে, একটি আদর্শ পলিসের লোকসংখ্যা হওয়া উচিত ৫০০০।
তবে তিনি পলিসে ৫০০০-এর কম জনসংখ্যাকে সমর্থন করেননি।
[2] অ্যারিস্টলের অভিমত: অ্যারিস্টট্ল তাঁর ‘পলিটিকস্’ গ্রন্থে বলেছেন যে, অত্যধিক জনসংখ্যা নিয়ে পলিস গঠন করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, পলিসের আয়তন এমন ক্ষুদ্র হওয়া উচিত, যাতে সেখানকার প্রতিটি
নাগরিকের মধ্যে প্রত্যক্ষ পরিচয় থাকে। তিনি অত্যন্ত ক্ষুদ্র বা বৃহৎ উভয় পলিসের অস্তিত্বেরই বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেছেন যে, ১০ জন নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে না, তেমনি
১ লক্ষ নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিসও সুদক্ষ শাসন পরিচালনা করতে পারবে না।
[3] হিপপোডামাসের অভিমত: সমকালীন পণ্ডিত হিপপোডামাস পলিসের ক্ষুদ্রত্বকেই সমর্থন করেছেন। তিনি মনে করেন যে, একটি পলিসের আদর্শ জনসংখ্যা হওয়া উচিত অনূর্ধ্ব ১০ হাজার।

বাস্তব পরিসংখ্যান

প্রাচীন গ্রিক পলিসগুলির আয়তন কতটা ক্ষুদ্র ছিল বা সেগুলির প্রকৃত জনসংখ্যা কেমন ছিল তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কষ্টসাধ্য বিভিন্ন লেখকের পরিসংখ্যানে ব্যবধানও বিস্তর। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে বিভিন্ন পলিসের আয়তন ও জনসংখ্যা সম্পর্কে কিছুটা আভাস পাওয়া যেতে পারে।
[1] আয়তন : বাণিজ্য নগরী করিখ-এর আয়তন ছিল মাত্র ৩৩০ বর্গমাইল। কিওস-এর মতো ক্ষুদ্র দ্বীপ চারটি পলিসে বিভক্ত ছিল। কয়েকটি পলিস আয়তনে বড়ো হলেও অধিকাংশ পলিসই ক্ষুদ্র ছিল। তবে স্পার্টা-র জনসংখ্যা অনেক কম হলেও তার ভূখণ্ড অন্যান্য পলিসের আয়তনের তুলনায় বড়ো ছিল।
[2] জনসংখ্যা : [i] কিট্টো বলেছেন যে, পেলোপনেসীয় যুদ্ধের শুরুতে (৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) অ্যাটিকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার।
[ii] ইতিহাসবিদ কিনলে বলেছেন যে, ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এথেন্সের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৭৫ হাজার। তাঁর মতে, জনসংখ্যার ব্যাপকতায় একমাত্র সিসিলির সিরাকিউজ এথেন্সের
সমকক্ষ ছিল। এ ছাড়া তখন করিখে ৯০ হাজার, থিবস, আরগস, করকায়রা এবং আক্রাগাস-এ ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার করে জনসংখ্যা ছিল বলে তিনি অভিমত দিয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ পলিসের জনসংখ্যার বেশির ভাগটাই ছিল অনাগরিক।
উপসংহার: গ্রিসের এই ক্ষুদ্র পলিসগুলিতে সকল নাগরিকদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকত এবং তারা প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে অংশ নিত। পলিসের এই ক্ষুদ্রত্ব গ্রিকদের কাছে রাষ্ট্রের অন্যতম গুণ বলে
বিবেচিত হত।

সূচনা: বাংলা নগর-রাষ্ট্র বা ইংরেজি ‘City-state' শব্দের গ্রিক প্রতিশব্দ হল পলিস যার অর্থ হল ‘স্বশাসিত রাষ্ট্র’ । প্রাচীন কালে গ্রিস, এশিয়া মাইনর, ইজিয়ান সাগরের দ্বীপসমূহ প্রভৃতি অঞ্চলে জনসংখ্যায় ও আয়তনে ক্ষুদ্র অসংখ্য নগর-রাষ্ট্র বা পলিসের অস্তিত্ব ছিল।
প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য
এই নগর-রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
[1] রাষ্ট্রের আয়তন ও জনসংখ্যা : গ্রিক পলিসগুলি আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ক্ষুদ্র হত। ‘রিপাবলিক' গ্রন্থে প্লেটো বলেছেন যে, একটি আদর্শ পলিসের লোকসংখ্যা হওয়া উচিত ৫০০০ । অ্যারিস্টট্ল বলেছেন যে, ১০ জন নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না, তেমনি ১ লক্ষ নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস সুদক্ষ শাসন পরিচালনা করতে পারবে না।
[2] রাজার অনুপস্থিতি: অধিকাংশ পলিসেই রাজতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল । পলিসগুলি অভিজাততান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এইরূপ বিভিন্ন ধরনের হত। অবশ্য স্পার্টায় বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র থাকলেও নির্দিষ্ট
অভিজাতদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চলে গিয়েছিল।
[3] নাগরিক ও বিদেশিদের অবস্থান : প্রতিটি পলিসে নাগরিক ছাড়াও বহু বিদেশি বসবাস করত। তাদের নাগরিক অধিকার ছিল না, তবে সেখানে বসবাসের বিষয়ে তারা সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। এথেন্সের শাসক পেরিক্লিস বলেছেন যে, “আমরা বিদেশিদের কোনো শিক্ষা বা দৃশ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখি না।”
[4] প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণ : গ্রিক পলিসগুলিতে নাগরিকরা শাসন পরিচালনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে পারত। অ্যারিস্টট্ল তাঁর ‘পলিটিকস্' গ্রন্থে বলেছেন যে, পলিসের আয়তন এমন ক্ষুদ্র হওয়া উচিত
যাতে সেখানকার প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে প্রত্যক্ষ পরিচয় থাকে।
[5] স্বাতন্ত্র্য : গ্রিসের প্রতিটি পলিস একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র ছিল। প্রতিটি পলিসের নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী, ক্যালেন্ডার থাকত। পলিসগুলির প্রতিটির পৃথক মুদ্রাব্যবস্থা এবং মানচিত্র ছিল বলেও অনুমান
করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পলিসগুলির পূজাপদ্ধতিও পৃথক হত।
[6] নগর ও গ্রামের সমন্বয় : গ্রিক নগর-রাষ্ট্র বলতে শুধু রাষ্ট্র জুড়ে নগরের অবস্থান বা নগর কর্তৃক গ্রাম শাসনকে বোঝায় না। প্রাচীন গ্রিসে যেমন এথেন্সের মতো উন্নত নগর-রাষ্ট্র ছিল তেমনি অনেক নগর রাষ্ট্র ছিল, যা আদৌ নগর ছিল না।
[7] অর্থনৈতিক বৈষম্য: গ্রিসের বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। যেমন, একদিকে করিন্থ ও মিলেটাসের মানুষ শিল্প ও বাণিজ্যের দ্বারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করত, অন্যদিকে স্পার্টা, এলিস ও আরকাডিয়ার মানুষ কৃষি, যুদ্ধকর ও মন্দিরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

গ্রিক গলিসের বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকার

গ্রিক পলিসগুলিতে বসবাসকারী নাগরিক, বিদেশি, ক্রীতদাস ও
মহিলাদের নাগরিক অধিকারের যথেষ্ট তারতম্য ছিল।
[1] নাগরিক : পলিসের বেশিরভাগ নাগরিক ছিল স্বাধীন কৃষক, কারুশিল্পী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নাগরিকরা বহু প্রত্যক্ষ সুযোগসুবিধা ভোগ করত। গ্রিক পলিসগুলির রাষ্ট্রীয় চরিত্রভেদে বিভিন্ন পলিসের নাগরিকদের
রাজনৈতিক অধিকারেও তারতম্য ছিল। [i] গণতান্ত্রিক পলিসগুলিতে মোটামুটিভাবে সকল নাগরিকের সমান রাজনৈতিক অধিকার ও রাজনৈতিক পদ লাভের সমান সুযোগ ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দুর্বল নাগরিকদের রক্ষার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হত। [ii] অভিজাত-তান্ত্রিক পলিসগুলিতে নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকারে বৈষম্য ছিল। সেখানে একমাত্র ধনীরাই অশ্বারোহী এবং ভারী অস্ত্রসজ্জিত পদাতিক বাহিনীতে যোগ দিতে পারত।
[2] বিদেশি : এথেন্স সহ বিভিন্ন পলিসে অসংখ্য বিদেশি বসবাস করত এবং তারা সেখানে সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করেছিল। তারা মেটিক নামে পরিচিত ছিল। তবে বিদেশিরা সেখানকার নাগরিক অধিকার থেকে
বঞ্চিত ছিল। এই বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কোনো ব্যবস্থাও সেখানে ছিল না। স্পার্টায় বিদেশিদের প্রবেশাধিকারই ছিল না।
[3] ক্রীতদাস ও মহিলা: বিদেশি ছাড়াও বিভিন্ন গ্রিক পলিসে অসংখ্য ক্রীতদাস ও মহিলা বসবাস করত যারা নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। ক্রীতদাসরা এথেন্সে থিটিস এবং স্পার্টায় হেলট নামে পরিচিত ছিল।
স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও নাগরিক অধিকার ছিল না। ধনীরা ক্রীতদাসদের নিজেদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করতে, ভাড়া খাটাতে, বিক্রি করতে, এমনকি হত্যাও করতে পারত।

পলিসের উত্থানের ধারাবাহিক পর্যায় 

ডোরিয়ান বিজয়ের (আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব) পরবর্তীকালে গ্রিকরা ক্ষুদ্র ও স্বাধীন নগর রাষ্ট্রগুলি গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। ইতিহাসবিদ ফিনলে মনে করেন যে, এই নগর-রাষ্ট্রগুলির প্রতিষ্ঠায় গ্রিকদের উদ্যোগের পশ্চাতে তাদের অনমনীয় স্বভাব কার্যকারী ছিল। গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে।
পলিস গঠনের ধারাবাহিক বিভিন্ন পর্যায় লক্ষ করা যায়। যেমন—
[1] শক্তিমান রাজা ও রাজ্যের অবলুপ্তি: ডোরিয়ান বিজয়ের পর থেকে গ্রিসে শক্তিমান রাজা ও বৃহৎ রাজ্যের অস্তিত্ব লুপ্ত হতে থাকে। এই সময় ভ্রাগামেমনন বা ইভোমিনিয়ান্স-এর মতো বৃহৎ রাজার সন্ধান আর পাওয়া যায় না। একদা ক্রীট দ্বীপে যেখানে ইভোমিনিয়ান্স ছিলেন একমাত্র রাজা সেখানে পরবর্তীকালে পঞ্চাশটিরও বেশি স্বাধীন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। গ্রিসের আয়োনিয়া, ইজিয়ান সাগরের বিভিন্ন দ্বীপ, পেলোপনেসাস
ও মধ্য গ্রিসের বৃহদংশ, দক্ষিণ ইটালি, সিসিলি প্রভৃতি অঞ্চলগুলিতেও অসংখ্য ক্ষুদ্র, স্বশাসিত ও স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে উঠতে থাকে।
[2] পলিসের প্রাথমিক পর্যায় : খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে সপ্তম শতকের মধ্যে গ্রিসের পন্নিসগুলি তাদের প্রাথমিক রূপ লাভ করতে শুরু করেছিল। স্বাধীন এই পলিসগুলিতে লোকসংখ্যা ছিল খুবই কম, মাত্র কয়েক হাজার।
তখনও পরিণত পলিসের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। পলিসের প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রিসের প্রতিবেশী কোনো কোনো অঞ্চলে বৃহৎ রাষ্ট্রের অস্তিত্বও ছিল।
[3] পলিসের চূড়ান্ত পর্যায় : গ্রিসের ইতিহাসের ধ্রুপদি যুগে (খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে চতুর্থ শতক) সেখানকার পলিসগুলি পূর্ণরূপ লাভ করেছিল। গ্রিকরা যখন পূর্ব ও পশ্চিমে নিজেদের সম্প্রসারণের কাজ সম্পূর্ণ করতে
পেরেছিল তখন গ্রিসে নগর-রাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১৫০০। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিল এথেন্স ও স্পার্টা।

প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য
এই নগর-রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
[1] রাষ্ট্রের আয়তন ও জনসংখ্যা : গ্রিক পলিসগুলি আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ক্ষুদ্র হত। ‘রিপাবলিক' গ্রন্থে প্লেটো বলেছেন যে, একটি আদর্শ পলিসের লোকসংখ্যা হওয়া উচিত ৫০০০ । অ্যারিস্টট্ল বলেছেন যে, ১০ জন নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না, তেমনি ১ লক্ষ নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস সুদক্ষ শাসন পরিচালনা করতে পারবে না।
[2] রাজার অনুপস্থিতি: অধিকাংশ পলিসেই রাজতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল । পলিসগুলি অভিজাততান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এইরূপ বিভিন্ন ধরনের হত। অবশ্য স্পার্টায় বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র থাকলেও নির্দিষ্ট
অভিজাতদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চলে গিয়েছিল।
[3] নাগরিক ও বিদেশিদের অবস্থান : প্রতিটি পলিসে নাগরিক ছাড়াও বহু বিদেশি বসবাস করত। তাদের নাগরিক অধিকার ছিল না, তবে সেখানে বসবাসের বিষয়ে তারা সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। এথেন্সের শাসক পেরিক্লিস বলেছেন যে, “আমরা বিদেশিদের কোনো শিক্ষা বা দৃশ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখি না।”
[4] প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণ : গ্রিক পলিসগুলিতে নাগরিকরা শাসন পরিচালনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে পারত। অ্যারিস্টট্ল তাঁর ‘পলিটিকস্' গ্রন্থে বলেছেন যে, পলিসের আয়তন এমন ক্ষুদ্র হওয়া উচিত
যাতে সেখানকার প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে প্রত্যক্ষ পরিচয় থাকে।
[5] স্বাতন্ত্র্য : গ্রিসের প্রতিটি পলিস একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র ছিল। প্রতিটি পলিসের নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী, ক্যালেন্ডার থাকত। পলিসগুলির প্রতিটির পৃথক মুদ্রাব্যবস্থা এবং মানচিত্র ছিল বলেও অনুমান
করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পলিসগুলির পূজাপদ্ধতিও পৃথক হত।
[6] নগর ও গ্রামের সমন্বয় : গ্রিক নগর-রাষ্ট্র বলতে শুধু রাষ্ট্র জুড়ে নগরের অবস্থান বা নগর কর্তৃক গ্রাম শাসনকে বোঝায় না। প্রাচীন গ্রিসে যেমন এথেন্সের মতো উন্নত নগর-রাষ্ট্র ছিল তেমনি অনেক নগর রাষ্ট্র ছিল, যা আদৌ নগর ছিল না।
[7] অর্থনৈতিক বৈষম্য: গ্রিসের বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। যেমন, একদিকে করিন্থ ও মিলেটাসের মানুষ শিল্প ও বাণিজ্যের দ্বারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করত, অন্যদিকে স্পার্টা, এলিস ও আরকাডিয়ার মানুষ কৃষি, যুদ্ধকর ও মন্দিরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

গ্রিক পলিসগুলির রাষ্ট্রীয় কাঠামো
খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে সপ্তম শতক নাগাদ গ্রিসে এক নতুন ধরনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রসার ঘটে। এই নতুন কাঠামোয় প্রাচীন বৃহৎ রাজতন্ত্রের স্থলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের উত্থান ঘটে, যেগুলি পলিস নামে  পরিচিত হয়। পলিসগুলির রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ক্রমে নানা ধারাবাহিক বিবর্তন ঘটতে থাকে।
(1) প্রাথমিক পর্বে পলিস: মোটামুটিভাবে একই ধরনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রচলিত ছিল। প্রথম দিকে রাজার শাসন চালু থাকলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন অভিজাত পরিবারগুলির সমন্বয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠীর দ্বারা পলিসগুলি পরিচালিত হতে থাকে। যুদ্ধ, বিচার, শাসননীতি নির্ধারণ প্রভৃতি বিষয়ে তাদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
(2) কাঠামোগত ব্যবধানের সূচনা : পরবর্তীকালে পলিসে ধারাবাহিক বিবর্তনের মাধ্যমে অভিজাততান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক —এইরূপ বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিকাশ ঘটতে থাকে। একে একে এথেন্সের মতো গণতান্ত্রিক, স্পার্টার মতো অভিজাততান্ত্রিক এবং সিরাকিউজের মতো স্বৈরতান্ত্রিক পলিসের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এথেন্সের গণতন্ত্রে সাধারণ নাগরিকদের যৌথ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও স্পার্টায় রাজা, অভিজাত এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে মিশ্র শাসন কাঠামো। গড়ে উঠেছিল।
[3] অনুন্নত রাষ্ট্রীয় কাঠামো : বিভিন্ন উন্নত পলিসের ধারাবাহিক অগ্রগতি ঘটলেও কিছু কিছু অনুন্নত পলিস ছিল যেখানে এই অগ্রগতি স্তব্ধ ছিল। এইসব পলিসের নাগরিকদের কাছে স্থলে বা জলে দস্যুতাবৃত্তি আদৌ অন্যায় বা অসম্মানের কাজ বলে বিবেচিত হত না।

গ্লিক পলিসগুলির গতনের কারণ

গ্রিক পলিসগুলি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে পারস্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলেও খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ম্যাসিডনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ফলে এই শতকে পলিসগুলির পতন ঘটে। পলিসগুলির পতনের বিভিন্ন কারণ ছিল—
[1] সেনাপতিদের দায়িত্ব: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অর্থনৈতিক দুর্বলতার ফলে এথেন্সের মতো বৃহৎ পলিসও তার সেনাপতিদের সম্পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই পেশাদার সেনাপতিরা অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই নিজেদের পলিসের পাশাপাশি বিদেশি শক্তিরও সেবা করতে বাধ্য হত। সেনাপতিদের এই দ্বিধাবিভক্ত দায়িত্বের ফলে আর সুযোগ্য সেনাপতি তৈরি হয়নি।
[2] নৌবহরের দুর্বলতা : অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাবে পলিসের নৌবহরের দুর্বলতাও প্রকট হয়ে পড়েছিল। এথেন্সের নৌবছরের আর্থিক দায়িত্ব যে ১২০০ ধনী পরিবার পালন করত তারা ক্রমে এই দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চাইছিল। আর্থিক দুর্বলতার কারণে স্বেচ্ছায় নাবিকের পেশায় আশা যুবকের সংখ্যা কমে আসছিল।
(3) সামরিক ত্রুটি: গ্রিসের অধিকাংশ সৈন্য ছিল, অপেশাদার ও কৃষক । তাই কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার জন্য তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইত না। তা ছাড়া গ্রিসের সৈনিকরা ঢাল, তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধে দক্ষ হলেও বিপৎসংকুল পার্বত্য অঞ্চলের যুদ্ধে তারা দক্ষতা দেখাতে পারেনি। আবার স্থলযুদ্ধে স্পার্টার শ্রেষ্ঠত্বের ফলে তাদের সীমাহীন আত্মতৃপ্তি ক্ষতি করেছিল।
[4] ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মানসিকতা : খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের অত্যধিক প্রকাশ লক্ষ  করা যায়। পলিসের আদর্শ বা সর্বজনীন বিষয়ের চেয়ে পলিসবাসী
নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ডায়োজিনিসের “আমি একজন বিশ্বনাগরিক” উক্তি থেকে প্রমাণ হয় যে, তাঁর কাছে ব্যক্তিই ছিল মুখ্য, সমাজ গৌণ।
(5) সংঘর্ষ : গ্রিসে বাণিজ্যের উন্নতি ঘটলে বিভিন্ন পলিসের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এর পরিণতিতে বিভিন্ন পলিসের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে যা পলিসগুলির শক্তি ও ঐক্য ধ্বংস করে।
[6] ম্যাসিডনের সামরিক দক্ষতা : পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ম্যাসিডন সামরিক শক্তিতে যে দক্ষতা দেখিয়েছিল গ্রিক পলিসগুলি তা পারেনি। ম্যাসিডনের শাসক দ্বিতীয় ফিলিপ যে বাহিনী নিয়ে গ্রিস আক্রমণ করে তা ছিল সুদক্ষ এবং নতুন যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ। গ্রিক পলিসগুলির সামরিক দক্ষতা যুগোপযোগী না হওয়ায় তারা ম্যাসিডনের সুদক্ষ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়।

প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য
এই নগর-রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
[1] রাষ্ট্রের আয়তন ও জনসংখ্যা : গ্রিক পলিসগুলি আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ক্ষুদ্র হত। ‘রিপাবলিক' গ্রন্থে প্লেটো বলেছেন যে, একটি আদর্শ পলিসের লোকসংখ্যা হওয়া উচিত ৫০০০ । অ্যারিস্টট্ল বলেছেন যে, ১০ জন নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না, তেমনি ১ লক্ষ নাগরিক নিয়ে গঠিত পলিস সুদক্ষ শাসন পরিচালনা করতে পারবে না।
[2] রাজার অনুপস্থিতি: অধিকাংশ পলিসেই রাজতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল । পলিসগুলি অভিজাততান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এইরূপ বিভিন্ন ধরনের হত। অবশ্য স্পার্টায় বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র থাকলেও নির্দিষ্ট
অভিজাতদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চলে গিয়েছিল।
[3] নাগরিক ও বিদেশিদের অবস্থান : প্রতিটি পলিসে নাগরিক ছাড়াও বহু বিদেশি বসবাস করত। তাদের নাগরিক অধিকার ছিল না, তবে সেখানে বসবাসের বিষয়ে তারা সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। এথেন্সের শাসক পেরিক্লিস বলেছেন যে, “আমরা বিদেশিদের কোনো শিক্ষা বা দৃশ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখি না।”
[4] প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণ : গ্রিক পলিসগুলিতে নাগরিকরা শাসন পরিচালনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে পারত। অ্যারিস্টট্ল তাঁর ‘পলিটিকস্' গ্রন্থে বলেছেন যে, পলিসের আয়তন এমন ক্ষুদ্র হওয়া উচিত
যাতে সেখানকার প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে প্রত্যক্ষ পরিচয় থাকে।
[5] স্বাতন্ত্র্য : গ্রিসের প্রতিটি পলিস একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র ছিল। প্রতিটি পলিসের নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী, ক্যালেন্ডার থাকত। পলিসগুলির প্রতিটির পৃথক মুদ্রাব্যবস্থা এবং মানচিত্র ছিল বলেও অনুমান
করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পলিসগুলির পূজাপদ্ধতিও পৃথক হত।
[6] নগর ও গ্রামের সমন্বয় : গ্রিক নগর-রাষ্ট্র বলতে শুধু রাষ্ট্র জুড়ে নগরের অবস্থান বা নগর কর্তৃক গ্রাম শাসনকে বোঝায় না। প্রাচীন গ্রিসে যেমন এথেন্সের মতো উন্নত নগর-রাষ্ট্র ছিল তেমনি অনেক নগর রাষ্ট্র ছিল, যা আদৌ নগর ছিল না।
[7] অর্থনৈতিক বৈষম্য: গ্রিসের বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। যেমন, একদিকে করিন্থ ও মিলেটাসের মানুষ শিল্প ও বাণিজ্যের দ্বারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করত, অন্যদিকে স্পার্টা, এলিস ও আরকাডিয়ার মানুষ কৃষি, যুদ্ধকর ও মন্দিরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

গ্লিক পলিসগুলির গতনের কারণ

গ্রিক পলিসগুলি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে পারস্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলেও খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ম্যাসিডনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ফলে এই শতকে পলিসগুলির পতন ঘটে। পলিসগুলির পতনের বিভিন্ন কারণ ছিল—
[1] সেনাপতিদের দায়িত্ব: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অর্থনৈতিক দুর্বলতার ফলে এথেন্সের মতো বৃহৎ পলিসও তার সেনাপতিদের সম্পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই পেশাদার সেনাপতিরা অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই নিজেদের পলিসের পাশাপাশি বিদেশি শক্তিরও সেবা করতে বাধ্য হত। সেনাপতিদের এই দ্বিধাবিভক্ত দায়িত্বের ফলে আর সুযোগ্য সেনাপতি তৈরি হয়নি।
[2] নৌবহরের দুর্বলতা : অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাবে পলিসের নৌবহরের দুর্বলতাও প্রকট হয়ে পড়েছিল। এথেন্সের নৌবছরের আর্থিক দায়িত্ব যে ১২০০ ধনী পরিবার পালন করত তারা ক্রমে এই দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চাইছিল। আর্থিক দুর্বলতার কারণে স্বেচ্ছায় নাবিকের পেশায় আশা যুবকের সংখ্যা কমে আসছিল।
(3) সামরিক ত্রুটি: গ্রিসের অধিকাংশ সৈন্য ছিল, অপেশাদার ও কৃষক । তাই কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার জন্য তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইত না। তা ছাড়া গ্রিসের সৈনিকরা ঢাল, তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধে দক্ষ হলেও বিপৎসংকুল পার্বত্য অঞ্চলের যুদ্ধে তারা দক্ষতা দেখাতে পারেনি। আবার স্থলযুদ্ধে স্পার্টার শ্রেষ্ঠত্বের ফলে তাদের সীমাহীন আত্মতৃপ্তি ক্ষতি করেছিল।
[4] ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মানসিকতা : খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের অত্যধিক প্রকাশ লক্ষ  করা যায়। পলিসের আদর্শ বা সর্বজনীন বিষয়ের চেয়ে পলিসবাসী
নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ডায়োজিনিসের “আমি একজন বিশ্বনাগরিক” উক্তি থেকে প্রমাণ হয় যে, তাঁর কাছে ব্যক্তিই ছিল মুখ্য, সমাজ গৌণ।
(5) সংঘর্ষ : গ্রিসে বাণিজ্যের উন্নতি ঘটলে বিভিন্ন পলিসের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এর পরিণতিতে বিভিন্ন পলিসের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে যা পলিসগুলির শক্তি ও ঐক্য ধ্বংস করে।
[6] ম্যাসিডনের সামরিক দক্ষতা : পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ম্যাসিডন সামরিক শক্তিতে যে দক্ষতা দেখিয়েছিল গ্রিক পলিসগুলি তা পারেনি। ম্যাসিডনের শাসক দ্বিতীয় ফিলিপ যে বাহিনী নিয়ে গ্রিস আক্রমণ করে তা ছিল সুদক্ষ এবং নতুন যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ। গ্রিক পলিসগুলির সামরিক দক্ষতা যুগোপযোগী না হওয়ায় তারা ম্যাসিডনের সুদক্ষ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়।

 

এথেন্সে গণতন্ত্রের ভিত্তি
গ্রিসে নগর-রাষ্ট্রগুলিতে কোথাও গণতন্ত্র বা কোথাও অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্রের পীঠস্থান ছিল এথেন্স। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এথেন্সে গণতন্ত্রের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
[1] সোলনের সংস্কার : গণতান্ত্রিক এথেন্সে প্রথম রাষ্ট্রপতি সোলন ম্যাজিস্ট্রেট আইন বা স্থানীয় শাসন সংস্কারের দ্বারা এথেনীয় গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করেন। তিনিই প্রথম বংশকৌলিন্যের বদলে সম্পদের ভিত্তিতে এথেন্সের নাগরিকদের চারটি গোষ্ঠীতে (ট্রাইব) ভাগ করেন। এ ছাড়াও তিনি হেলাইয়া নামে এক গণ-আদালত গড়ে তোলেন। এখানে সাধারণ মানুষ আর্কনদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকারী ছিলেন।
[2] ক্লিসথিনীসের সংস্কার : সোলনের পরবর্তীকালে ক্লিসথিনীস গোষ্ঠীভিত্তিক বিভাজনের পরিবর্তে গ্রাম (ডেমি) ভিত্তিক দশটি অঞ্চল গড়ে তোলেন। এগুলি হয়ে ওঠে স্থানীয় শাসনব্যবস্থার এক একটি একক। তিনি জন্মকৌলিন্য বা সম্পদভিত্তিক গোষ্ঠীর বদলে বাসস্থানভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলেন।

[3] এফিয়ালটিসের সংস্কার : এফিয়ালটিস এথেন্সে গণতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি আইন করে এরিওপেগাস কাউন্সিলের সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং তা গণ-পরিষদ, কাউন্সিল ও গণ-আদালতের মধ্যে
ভাগ করে দেন। এ ছাড়াও তিনি আর্কানদের রায়ের বিরুদ্ধে একলসিয়াস আপিল অধিকার দেন।
[4] পেরিক্লিসের সংস্কার : পেরিক্লিস লটারির মধ্য দিয়ে সমস্ত নাগরিককে শাসনকাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দেন। এ ছাড়াও আর্কন পদের অধিকারীকে রাষ্ট্রের বেতনভুক কর্মীতে পরিণত করেন। তিনি নাগরিকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এথেনীয় পিতামাতার সন্তানদেরই নাগরিক হওয়ার অধিকার দান করেন।
[5] লটারির মাধ্যমে নির্বাচন : এথেন্সে লটারির মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে থেকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শাসন কর্তাদের নির্বাচিত করা হত। এর ফলে সাধারণ শ্রেণির প্রতিনিধিদের অনেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেত। এভাবেই দরিদ্ররাও পরিষদে এবং জুরি আদালতে বসার অধিকার পেয়েছিল।
[6] গণবিতর্ক : এথেন্সে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল গণবিতর্ক ব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একলেসিয়ার অধিবেশনে বিতর্ক হত। কোনো একটি প্রস্তাব উঠলে তার পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের পর তা নির্বাচিত হত উপস্থিত নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের দ্বারা।
[7] জনগণের শাসন : গ্রিক শব্দ 'ডেমস’ ও ‘ক্রাটাসে’ থেকেই ইংরেজি ‘ডেমোক্রেসি' শব্দটি এসেছে। 'ডেমস’ হল কোনো একটি পলিসের সমস্ত নাগরিক সংখ্যা আর 'ক্রাটাস' হল শাসক। এই বিচারে এথেনীয় গণতন্ত্র ছিল জনগণের শাসক। শুধুমাত্র আক্ষরিক অর্থে নয় প্রকৃত অর্থেই এথেন্সে শাসনব্যবস্থা ছিল গণতান্ত্রিক।এই শাসনব্যবস্থায় দরিদ্র জনগণের একটা বড়ো অংশ যুক্ত হওয়ার ফলে এথেন্সে গণতন্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল
বলা চলে।
গ্রিক গলিসগুলির পতনের কারণ

গ্রিক পলিসগুলি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে পারস্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলেও খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ম্যাসিডনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ফলে এই শতকে পলিসগুলির পতন ঘটে। পলিসগুলির পতনের বিভিন্ন কারণ ছিল—
[1] সেনাপতিদের দায়িত্ব: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অর্থনৈতিক দুর্বলতার ফলে এথেন্সের মতো বৃহৎ পলিসও তার সেনাপতিদের সম্পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই পেশাদার সেনাপতিরা অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই নিজেদের পলিসের পাশাপাশি বিদেশি শক্তিরও সেবা করতে বাধ্য হত। সেনাপতিদের এই দ্বিধাবিভক্ত দায়িত্বের ফলে আর সুযোগ্য সেনাপতি তৈরি হয়নি।
[2] নৌবহরের দুর্বলতা : অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাবে পলিসের নৌবহরের দুর্বলতাও প্রকট হয়ে পড়েছিল। এথেন্সের নৌবছরের আর্থিক দায়িত্ব যে ১২০০ ধনী পরিবার পালন করত তারা ক্রমে এই দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চাইছিল। আর্থিক দুর্বলতার কারণে স্বেচ্ছায় নাবিকের পেশায় আশা যুবকের সংখ্যা কমে আসছিল।
(3) সামরিক ত্রুটি: গ্রিসের অধিকাংশ সৈন্য ছিল, অপেশাদার ও কৃষক । তাই কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ার জন্য তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইত না। তা ছাড়া গ্রিসের সৈনিকরা ঢাল, তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধে দক্ষ হলেও বিপৎসংকুল পার্বত্য অঞ্চলের যুদ্ধে তারা দক্ষতা দেখাতে পারেনি। আবার স্থলযুদ্ধে স্পার্টার শ্রেষ্ঠত্বের ফলে তাদের সীমাহীন আত্মতৃপ্তি ক্ষতি করেছিল।
[4] ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মানসিকতা : খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের অত্যধিক প্রকাশ লক্ষ  করা যায়। পলিসের আদর্শ বা সর্বজনীন বিষয়ের চেয়ে পলিসবাসী
নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ডায়োজিনিসের “আমি একজন বিশ্বনাগরিক” উক্তি থেকে প্রমাণ হয় যে, তাঁর কাছে ব্যক্তিই ছিল মুখ্য, সমাজ গৌণ।
(5) সংঘর্ষ : গ্রিসে বাণিজ্যের উন্নতি ঘটলে বিভিন্ন পলিসের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এর পরিণতিতে বিভিন্ন পলিসের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে যা পলিসগুলির শক্তি ও ঐক্য ধ্বংস করে।
[6] ম্যাসিডনের সামরিক দক্ষতা : পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ম্যাসিডন সামরিক শক্তিতে যে দক্ষতা দেখিয়েছিল গ্রিক পলিসগুলি তা পারেনি। ম্যাসিডনের শাসক দ্বিতীয় ফিলিপ যে বাহিনী নিয়ে গ্রিস আক্রমণ করে তা ছিল সুদক্ষ এবং নতুন যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ। গ্রিক পলিসগুলির সামরিক দক্ষতা যুগোপযোগী না হওয়ায় তারা ম্যাসিডনের সুদক্ষ বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়।

 

গ্রিক পলিসের রাজনৈতিক গঠন
গ্রিক পলিসগুলির রাজনৈতিক সংগঠন বা শাসন কাঠামোর প্রধান তিনটি অংশ ছিল।

যথা – [1] সমিতি, [2] পরিষদ এবং [3] ম্যাজিস্ট্রেট।

এথেন্স গণতান্ত্রিক এবং স্পার্টা অভিজাততান্ত্রিক শাসন কাঠামোর আদর্শ পলিস ছিল। এথেন্সের শাসনকাঠামোতে সমিতি, পরিষদ এবং ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াও হেলাইয়া বা জুরি আদালতের অস্তিত্ব ছিল, যা অন্যান্য পলিসে ছিল না।
[1] সমিতি বা একলেজিয়া: এথেন্সের সমিতির নাম ছিল একলেজিয়া এবং স্পার্টায় অ্যাপেলা। প্রথম পর্বে একলেজিয়ার অস্তিত্ব ও ক্ষমতা খুব বেশি ছিল না। পরবর্তীকালে নানান বিবর্তনের মধ্য দিয়েএকলেজিয়া শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সেই সময় এথেন্সের থিটিস (এথেন্সের ক্রীতদাস) -রা ছাড়া অন্য সকলেই একলেজিয়ার সদস্য হতে পারত।
[2] ভোটাধিকার : প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত সমিতির সিদ্ধান্ত অনুসারে পলিসের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারিত হত।

[i] গণতন্ত্রে প্রাপ্তবয়স্ক সকল স্বাধীন নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারত। এথেন্সে অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট না দিলেও সকল নাগরিকের সেই অধিকার ছিল এবং কখনো কখনো তারা তা প্রয়োগ করত।
[ii] অভিজাততন্ত্রে সকলের ভোটাধিকার ছিল না। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পত্তির মালিকরা সেখানে ভোটদানের অধিকার ভোগ করত।

[3] পরিষদ : সোলনের শাসনের পূর্ব পর্যন্ত এথেন্সে একটিমাত্র পরিষদ ছিল যার নাম ছিল এ্যারিওপাগাসের কাউন্সিল। সোলন এই কাউন্সিলের ক্ষমতা কমিয়ে চারশো জনের পরিষদ এবং পরে ক্লেইসথেনেস পাঁচশো
জনের পরিষদ গঠন করেন । অভিজাততন্ত্রে পরিষদের আয়তন হত ক্ষুদ্র। এখানে সদস্যরা নির্বাচনের পরিবর্তে মনোনীত হতেন। সাধারণভাবে অভিজাততন্ত্রে সমিতির তুলনায় পরিষদের গুরুত্ব বেশি থাকলেও স্পার্টা ছিল এর ব্যতিক্রম। স্পার্টার পরিষদের নাম ছিল গেরুসিয়া।এটি বিচারালয় হিসেবেও কাজ করত।
[4] ম্যাজিস্ট্রেট : পলিসে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ বা রাজার ক্ষমতা লুপ্ত হওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট পদের সৃষ্টি হয় । এথেন্সের শাসনব্যবস্থায় উচ্চবিত্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা নিযুক্ত হত। তাদের বলা হত আরকন। স্পার্টার ম্যাজিস্ট্রেটরা ইফর নামে পরিচিত ছিল। তারা পরিষদের সভায় যোগ দিতে পারত এবং সমিতির (অ্যাপেলা) সভা পরিচালনা করত।
গ্রিক পলিসের ধর্মীয় জীবন
রাজনৈতিক ক্ষেত্রের মতো ধর্মীয় ক্ষেত্রেও গ্রিক পলিসগুলি এক-একটি পৃথক একক হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পলিসের ধারণার সঙ্গে ধর্ম-ভাবনা যে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল তার উল্লেখ সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টোফানেসের রচনা থেকে জানা যায়।
[1] বিভিন্ন দেবদেবী : গ্রিক পলিসে বহু দেবতার আরাধনার প্রচলন ছিল। বিভিন্ন পলিসের দেবদেবীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জিউস, পসিডন, হ্যাডেস, অ্যাপোলো, আরটিসিস, এথেনা, হারমিস, ডিমিটার, হেরা প্রমুখ।
বিভিন্ন দেবতা বিভিন্ন ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে তারা মনে করত।
যেমন— জিউস ছিলেন আকাশের দেবতা, পসিডন ছিলেন সাগর ও ভূমিকম্পের দেবতা, হ্যাডেস ছিলেন পরলোকের দেবতা। জিউস ছিলেন দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
[2] পলিসের সঙ্গে সংযোগ : গ্রিসের দেবদেবীরা পলিসের উন্নতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল বলে গ্রিকরা বিশ্বাস করত। দেবদেবীগণ পলিসের নিয়মশৃঙ্খলার ধারক ও বাহক বলে পরিচিত ছিলেন।পলিসগুলিতে সারাবছর ধরে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের উৎসব, অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করা হত।
[3] দেবতার আরাধনা : গ্রিসের বিভিন্ন পলিসে যেমন পৃথক পৃথক দেবদেবীর পূজার প্রচলন ছিল, তেমনি একই দেবতা বা দেবী একাধিক পলিসেও পূজিত হতেন। যেমন, দেবী এথেনা এথেন্স এবং স্পার্টা উভয় পলিসেই পূজিতা হতেন। কিন্তু উভয় পলিসে তাঁর গুরুত্বে পার্থক্য ছিল। এথেন্সে দেবী এথেনার অত্যধিক গুরুত্ব ছিল এবং সেখানে এথেনাকে নগরের অভিভাবিকা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্পার্টায় এথেনার এই গুরুত্ব ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন পলিসে ভিন্ন ভিন্ন পূজাপদ্ধতি ও পৃথক ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও প্রচলন ছিল।

[4] দ্বৈত সত্তা : প্রাচীন গ্রিসের দেবদেবীদের দ্বৈত সত্তার অস্তিত্ব ছিল। দেবদেবীগণ একদিকে যেমন নির্দিষ্ট কোনো পলিসের দেবতা ছিলেন। অন্যদিকে তাঁরা আবার সমগ্র গ্রিক জাতিরও দেবতা ছিলেন।
[5] পরলোকচিন্তা : গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, মানুষের মৃত্যুর পর আত্মা ইহলোকে ঘুরে বেড়ায়। যথাযথ ধর্মীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর সেই আত্মা ইহলোক থেকে পরলোকে পৌঁছোয়। প্রাচীন গ্রিক মতে, পরলোক নিয়ন্ত্রিত হয় দেবতা হ্যাডেসের দ্বারা।
[6] ধর্মীয় সৌধ ও গ্রন্থ : গ্রিকরা স্থানীয়ভাবে পলিসের বিভিন্ন স্থানে পূণ্যভূমি ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করত। এই ধর্মীয় সৌধগুলি বিভিন্ন দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হত। হেসিয়ডের ‘থিওগনী’ এবং ‘ওয়ার্কস এন্ড ডেজ’, হোমারের ‘ইলিয়াড' এবং ‘ওডিসি’, পিন্ডারের ‘ওডেস' ছিল গ্রিকদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।

'সপ্তসিন্ধু' অঞ্চল বলতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সাতটি নদী অববাহিকাকে বোঝায়।

এই নদীগুলি হল- [1] শতরু. [2] বিপাশা, [3] বি. [4] চন্দ্রভাগা, [5] ইরাবতী [6] [7] সরস্বতী।

রামায়ণে উল্লিখিত ২৭টি প্রাচীন জনপদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-অন্ধ্র, পুণ্ড্র, চোল, পাণ্ডা, কেরল, উৎকল ইত্যাদি। মহাভারতে উল্লিখিত ২৫টি জনপদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – অঙ্গ, বঙ্গ, কলিজা, মগধ, কাশী, কোশল ইত্যাদি। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতে উল্লিখিত ১৫টি জনপদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- গান্ধার, মগধ, কলিঙ্গ, কুরু, কম্বোজ ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতে বৈদিক সভ্যতার সময় লৌহ যুগে (200 খ্রিস্টাপূর্বাব্দ) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হতে থাকে।

 

বৈদিক যুগে আর্য সমাজে কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি গোত্র, কয়েকটি গোত্র নিয়ে একটি গ্রাম, কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি বিশ ও কয়েকটি বিশ নিয়ে একটি 'জন' গড়ে ওঠে।

সংস্কৃত 'জন' শব্দের অর্থ হল 'উপজাতি' এবং 'পদ' শব্দের অর্থ হল 'পা'। সুতরাং, এই অর্থ অনুসারে, 'জনপদ' বলতে সেইসব স্থানকে বোঝায় যেসব স্থানে কোনো নির্দিষ্ট উপজাতি বা জনগোষ্ঠী বা 'জন' তার 'পদ' বা পা রেখেছে। অর্থাত্ নির্দিষ্ট কোনো উপজাতিগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কোনো বসতিই হল 'জনপদ'।

→ জনপদগুলিতে বিভিন্ন আর্য পরিবারের বসবাস ছিল। ক্রীতদাস, শুদ্রদের পাশাপাশি বণিকশ্রেণিও জনপদে বাস করত। বৈদিক সমাজে আর্য উপজাতিগোষ্ঠীর প্রধান রাজা নামে পরিচিত ছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ দুই বা ততোধিক জনপদ সংযুক্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত বৃহদায়তন রাজ্যের উত্থান ঘটে জনপদ অপেক্ষা বৃহৎ এই রাজ্যগুলি ‘মহাজনপদ' নামে পরিচিত।

ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে পনেরোটির উত্তর ভারতে এবং একটির (অস্মক) দক্ষিণ ভারতে উত্থান হয়েছিল।

বৌদ্ধগ্রন্থ অঙ্গুত্তরনিকায়, জৈনগ্রন্থ ভগবতীসূত্র, হিন্দু পুরাণ প্রভৃতি থেকে জানা যায় যে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে পনেরোটি এবং দক্ষিণ ভারতে একটি মহাজনপদের অস্তিত্ব ছিল। এগুলি একত্রে ষোড়শ মহাজনপদ নামে পরিচিত।

ষোড়শ মহাজনপদগুলির মধ্যে ১৪টি মহাজনপদই ছিল রাজতান্ত্রিক বৃজি ও মল্ল নামে দুটি মহাজনপদ ছিল অরাজতান্ত্রিক অর্থাৎ প্রজাতান্ত্রিক।

বৌদ্ধগ্রন্থ অঙ্গুত্তরনিকায়, জৈনগ্রন্থ ভগবতীসূত্র, হিন্দু পুরাণ প্রভৃতি থেকে ষোড়শ মহাজনপদের কথা জানা যায়।

ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে চারটি শ্রেষ্ঠ মহাজনপদ ছিল অবন্তী, বৎস, কোশল ও মগধ।

কাশী ও কোশল মহাজনপদের রাজধানী ছিল যথাক্রমে বারাণসী ও শ্রাবস্তী।

মহাজনপদগুলির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল—[1] মহাজনপদগুলির মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ ও লড়াই লেগেই থাকত।

[2] ষোলোটি মহাজনপদের মধ্যে দুটি ছিল প্রজাতান্ত্রিক (বৃজি ও মল্ল), বাকিগুলি ছিল রাজতান্ত্রিক প্রকৃতির।

[3] একটিমাত্র মহাজনপদ ছিল দক্ষি ভারতে (অস্মক), বাকিগুলি উত্তর ভারতে অবস্থিত ছিল।

বৌদ্ধগ্রন্থ ‘অঙ্গুত্তরনিকায়’, জৈনগ্রন্থ ‘ভগবতীসূত্র', 'হিন্দুপুরাণ' প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থ থেকে ষোড়শ মহাজনপদ সম্পর্কে জানা যায়।

সূচনা: ‘জনপদ' শব্দটি ‘জন' এবং 'পদ' নামে দুটি শব্দ সংযুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে। ‘জন' শব্দের অর্থ হল ‘উপজাতি' এবং 'পদ' শব্দের অর্থ হল 'পা'। তাই আক্ষরিক অর্থে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা ‘জন' যেখানে তার ‘পদ' বা পা রেখেছে তাকেই ‘জনপদ' বোঝায়। এই অর্থে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কোনো বসতিই হল ‘জনপদ'। প্রাচীন তথ্য অনুসারে ‘জনপদ' শব্দের দুটি অর্থ—[1] ভূখন্ড বা অঞ্চল এবং [2] ভূমির জনসমষ্টি। সাধারণ অর্থে, বৈদিক যুগে বা লৌহ যুগের সূচনায় (১২০০ খ্রিস্টপূর্ব) ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতিগোষ্ঠীর বসতিকেই জনপদ বোঝাত।

জনপদের উৎপত্তি

সূচনাপর্বে ভারতে আর্যদের রাজনৈতিক জীবন ছিল উপজাতীয় প্রকৃতির। আর্যদের এরূপ জীবনধারা যে ভূখণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হত তাকে বলা হত 'জন'। বিভিন্ন বৈদিক সাহিত্যে আর্যদের বসতি হিসেবে ‘জন” নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমদিকে পশুচারণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে অর্ধ-যাযাবর এই গোষ্ঠীগুলি কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেনি। পরবর্তীকালে আর্য সমাজে কৃষিব্যবস্থার বিকাশের ফলে তারা নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে লোহার হাতিয়ার দিয়ে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমির প্রসার ঘটায়। ক্রমে সেই এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয় এবং বসতির বিস্তার ঘটে। এভাবে আর্যদের এই ‘জন'গুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন ‘জনপদ' গঠিত হয় যা মহাকাব্যের যুগে চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে। জনপদের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একদা নেতার উত্থান ঘটে, যিনি অস্ত্রের জোরে অন্যের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এভাবে জনপদের শাসক হিসেবে ‘জনপদিন' পদের উত্থান ঘটে।

 বিভিন্ন জনপদের নাম

'রামায়ণ', 'মহাভারত', পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী', 'হিন্দু পুরাণ' প্রভৃতি সাহিত্যিক উপাদান থেকে বৈদিক যুগে ভারতের বিভিন্ন জনপদের নাম জানা যায়।

[1] অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থটি থেকে ১৫টি ক্ষত্রিয় জনপদের নাম জানা যায়। এগুলি হল সালভিয়া, গান্ধার, মগধ, কলিঙ্গ, সুরসেন, কোশল, অজদা (অযোধ্যা), কুরু, সালবা, প্রত্যাগ্রন্থ, কালকুট, অশ্বক, কম্বোজ, অবন্তী এবং কুপ্তি।

[2] 'মহাভারতে' পঁচিশটি প্রাচীন জনপদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই জনপদগুলি হল—অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ, কাশী, কোশল, বস, গর্গ, কারুশ, পুণ্ড্র, অবন্তী, দাক্ষিণাত্য, পারবরটক, দশের্ক, কাশ্মীর, উরস, পিশাচ, মুদগলা, কম্বোজ, বতধন, চোল, পাণ্ডা, ত্রিগর্ত, মালব এবং দরদ। এ ছাড়া এই মহাকাব্যে কুরু এবং পাঞ্চাল জনপদেরও উল্লেখ রয়েছে।

[3] 'রামায়ণে' প্রাচীন ভারতের যেসব জনপদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় সেগুলি হল— অন্ধ্র, পুণ্ড্র, চোল, পাণ্ডা, কেরল, যেখালা, উৎকল, দশার্ন, অভ্রবর্তী, বিদরডাস, ম্লেচ্ছ, পুলিন্দ, সুরসেন, প্রস্থল, ভারত, কুরু, মদ্রক, কম্বোজ, দরদাস, কিরাত, তঙ্গন, যবন, শক, চিন, মহাচিন প্রভৃতি।

উপসংহার: উপরোক্ত বিভিন্ন জনপদগুলি নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে বৃহৎ রাজনৈতিক আকার ধারণ করতে থাকে। এই বৃহৎ ভূখণ্ডগুলি মহাজনপদ নামে পরিচিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে এরূপ ষোলোটি মহাজনপদের অস্তিত্ব ছিল বলে বৌদ্ধগ্রন্থ 'অঙ্গুত্তরনিকায়', জৈনগ্রন্থ ‘ভগবতীসূত্র’, ‘হিন্দু পুরাণ' প্রভৃতি থেকে জানা যায়। এগুলি একত্রে ষোড়শ মহাজনপদ নামে পরিচিত অবশেষে অন্যতম মহাজনপদ মগধের নেতৃত্বে উত্তর ভারতে এক বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।

সূচনা:  বৌদ্ধগ্রন্থ 'অপুত্তরনিকায়', 'জৈনগ্রন্থ 'ভগবতীসূত্র', 'হিন্দু পুরাণ' প্রভৃতি থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে কোনো ঐক্যবদ্ধ কেন্দ্রীয় শক্তির অস্তিত্ব ছিল না। উক্ত সাহিত্যিক উপাদানগুলি থেকে এই সময় ভারতে ষোলোটি ছোটো ছোটো রাজ্যের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এই ষোলোটি ক্ষুদ্র রাজ্যকে একত্রে ষোড়ল মহাজনপদ বলা হয়। ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে উত্তর ভারতে পনেরোটি এবং দক্ষিণ ভারতে একটি রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল। ষোড়শ মহাজনপদের বিভিন্ন রাজ্য ষোড়শ মহাজনপদের রাজ্যগুলির অবস্থান ছিল আফগানিস্তানের কাবুল থেকে দক্ষিণ ভারতে গোদাবরী নদীর উপকূলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। রাজ্যগুলি হল—

[1] কাশী: এর অবস্থান ছিল বর্তমান উত্তরপ্রদেশের পূর্বদিক।

[2] কোশল: এর অবস্থান ছিল বর্তমান অযোধ্যা বা শ্রাবস্তী ।

[3] অঙ্গ : এর অবস্থান ছিল বর্তমান পূর্ব বিহার। এই রাজ্যের রাজধানী ছিল চম্পা।

[4] মগধ : মগধের অবস্থান ছিল বর্তমান বিহারের গয়া ও পাটনা জেলা। এর প্রথম রাজধানী ছিল গিরিব্রজ বা রাজগৃহ। পরে পাটলিপুত্র রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।

[5] অবন্তী: এর অবস্থান ছিল বর্তমান মালব ও মধ্যপ্রদেশের কিছু অংশে। এর উত্তরাংশের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী ও দক্ষিণাংশের রাজধানী ছিল মাহিস্মৃতি।

[6] বৎস: এর অবস্থান ছিল বর্তমান এলাহাবাদের নিকটবর্তী গঙ্গার দক্ষিণ তীরে। এর রাজধানী ছিল কৌশাম্বী।

[7] বৃজি: এর অবস্থান ছিল বর্তমান উত্তর বিহারে। এর রাজধানী ছিল বৈশালী।

[৪] মল্ল: এর অবস্থান ছিল বর্তমান উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলা। এর রাজধানী ছিল কুশীনগর বা পাবা।
[9] কুরু: এর অবস্থান ছিল বর্তমান দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। এর রাজধানী ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ।

[10] পাঞ্চাল : এর অবস্থান ছিল বর্তমান রোহিলখণ্ড। উত্তর পাঞ্চালের রাজধানী ছিল অহিচ্ছত্র এবং দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজধানী ছিল কাম্পিল্য।

[11] চেদি: এর অবস্থান ছিল বর্তমান বুন্দেলখন্ড ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। এর রাজধানী ছিল শুকতিমতী।
[12] মৎস্য: এর অবস্থান ছিল বর্তমান রাজপুতানার জয়পুর। এর রাজধানী ছিল বিরাটনগর।
[13] শূরসেন : এর অবস্থান ছিল যমুনা নদীর তীরে মথুরা অঞ্চল। এর রাজধানী ছিল মথুরা ।

[14] অস্মক: এর অবস্থান ছিল বর্তমান গোদাবরীর উপত্যকা অঞ্চল বা পাটলি। এর রাজধানী ছিল পোটালি বা পোটান।

[15] গান্ধার :এর অবস্থান ছিল বর্তমান রাওয়ালপিন্ডি ও কাশ্মীর উপত্যকা। এর রাজধানী ছিল তক্ষশিলা ।

[16] কম্বোজ : এর অবস্থান ছিল বর্তমান দক্ষিণ-পশ্চিম কাশ্মীর। এর রাজধানী ছিল রাজপুর।

মগধের উত্থানের কারণ

প্রথমদিকে ষোড়শ মহাজনপদের রাজ্যগুলির মধ্যে অবন্তী, বৎস, কোশল এবং মগধ—এই চারটি রাজ্য প্রাধান্য লাভ করেছিল। অবশেষে হর্ষঙ্ক, শৈশুনাগ, নন্দ ও মৌর্য—এই চারটি রাজবংশের আমলে মগধকে কেন্দ্র করে উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

[1] সুযোগ্য নেতৃত্ব : হর্ষঙ্ক বংশের বিম্বিসার, অজাতশত্রু, শৈশুনাগ বংশের শিশুনাগ, নন্দ বংশের মহাপদ্মনন্দ, মৌর্য বংশের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, অশোক প্রমুখ রাজন্যবর্গের দক্ষ নেতৃত্বে মগধের সাম্রাজ্য সফলভাবে পরিচালিত হয়েছিল। মগধের বাসাকর, কৌটিল্য, রাধাগুপ্ত প্রমুখ মন্ত্রীবর্গের সুযোগ্য পরামর্শও এবিষয়ে যথেষ্ট সহায়তা করেছিল।
[2] বিদেশি আক্রমণ থেকে রক্ষা : মগধের অবস্থান ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তের উপদ্রুত অঞ্চল থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বিদেশি আক্রমণকারীদের পক্ষে ভারতের অভ্যন্তরে এত দূরে আক্রমণ করা সহজ ছিল না।

[3] ভৌগোলিক অবস্থান : মগধ রাজ্য ও রাজধানী নদী ও পাহাড়ের দ্বারা বেষ্টিত ছিল। মগধের প্রথম রাজধানী রাজগৃহ ছিল পাহাড়বেষ্টিত। পরবর্তী রাজধানী পাটলিপুত্র গঙ্গা, শোন ও গণ্ডক নদীবেষ্টিত হয়ে যেন এক ‘জলদুর্গে’ পরিণত হয়েছিল। এরূপ ভৌগোলিক নিরাপত্তা ভেদ করে শত্রুদের পক্ষে মগধ আক্রমণ করা সহজ কাজ ছিল না।
[4] উবর কৃষিজমি: গঙ্গা ও অন্যান্য নদীবিধৌত মগধের কৃষিজমি ছিল খুবই উর্বর। কৃষিতে প্রচুর উৎপাদনের ফলে প্রভূত পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হত। ফলে মগধে সৈন্যদের ভরণ-পোষণে সুবিধা ও রাজকোশের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল।

[5] বৈদেশিক বাণিজ্য : বিভিন্ন দূর দেশের সঙ্গে মগধের রপ্তানি বাণিজ্য চলত। মগধের সমৃদ্ধ বৈদেশিক বাণিজ্যের ফলে সেখানকার অর্থনীতি মজবুত হয়েছিল। এই আর্থিক শক্তি মগধের সামরিক শক্তির ভিত ও শক্ত করেছিল।

[6] অরণ্য সম্পদ : মগধের ঘন অরণ্য ছিল হিংস্র জীবজন্তু ও অসংখ্য বৃক্ষে পরিপূর্ণ। এইসব বৃক্ষের কাঠ যুদ্ধপ্রকরণে কাজে লাগত। ছাড়া এই অরণ্য থেকেই মগধের সৈন্যের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রণহস্তী সংগ্রহ করা হত।

[7] খনিজ সম্পদ : মগধের তামা ও লোহার খনিগুলি সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরিতে ব্যবহৃত হত। ফলে মগধের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিরও উন্নতি হয়েছিল।

[8] মিশ্র সংস্কৃতি : মগধের সীমানার একদিকে আর্য ও অন্যদিকে অনার্য সংস্কৃতির অবস্থান থাকায় এখানে এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা মগধের অগ্রগতিকে সহজ করেছিল।

কোনো শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক বা অভিজাততান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর অধীনস্থ সুবৃহৎ রাষ্ট্রকে ‘সাম্রাজ্য’ বলা যায়।

সুপ্রাচীন কয়েকটি সাম্রাজ্য হল—আক্কাদীয় সাম্রাজ্য, অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য, মিশরীয় সাম্রাজ্য, আকিমেনীয় সাম্রাজ্য প্রভৃতি। সারাগনের নেতৃত্বে আক্কাদীয় ও তৃতীয় থুটমোসের নেতৃত্বে মিশরীয় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। পার্সিয়া অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আকিমেনীয়। সাম্রাজ্য।

পৃথিবীর প্রাচীনতম সাম্রাজ্য হল আক্কাদীয় সাম্রাজ্য।
সারাগন মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীর মধ্যবর্তী। অঞ্চল আক্কাদে বৃহৎ এই সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পরবর্তীকালে ভারতে মগধ এবং ইউরোপে ম্যাসিডন নামে বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।

ভারতে প্রথম গড়ে ওঠা সাম্রাজ্য হল খ্রিস্টপূর্ব যুগের মৌর্য সাম্রাজ্য।

প্রাচীন ভারতের দুটি উল্লেখযোগ্য সাম্রাজ্যের নাম হল মৌর্য সাম্রাজ্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্য।

কয়েকটি সুবৃহৎ সাম্রাজ্য ছিল— মগধ, ম্যাসিডনীয়, রোমান ইত্যাদি সাম্রাজ্য। ভারতে ষোড়শ মহাজনপদগুলির মধ্যে মগধ সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইউরোপে দ্বিতীয় ফিলিপ ও তৃতীয় আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীকালে এই ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর রোমান সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।

সাম্রাজ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—রাষ্ট্র কর্তৃক সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করা। সাম্রাজ্যের শাসন ক্ষমতা পরিচালিত হয় কোনো রাজতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্রের দ্বারা সাম্রাজ্য বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।

যেমন—বিভিন্ন গোষ্ঠী, জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতি।

সূচনা: বাংলা ‘সাম্রাজ্য’ বা ইংরেজি ‘empire’ হল একটি রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ধারণা।এই ‘empire' শব্দটি লাতিন শব্দ ‘imperium' থেকে এসেছে যার অর্থ হল ‘শক্তি’ বা ‘কৰ্তৃত্ব’।
সাম্রাজ্যের সংজ্ঞা
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যের সংজ্ঞা দেওয়া যায়। যেমন— [1] ‘সাম্রাজ্য’ বলতে একজন সম্রাটের অধীনস্থ এমন বিস্তৃত ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রকে (বিভিন্ন রাজ্যের সমষ্টি) বোঝায় যা রাজ্যের (Kingdom) চেয়ে সুবিস্তৃত হবে, যেখানে সর্বদা বিভিন্ন জাতির মানুষের বাস থাকবে এবং তাদের শাসন করার জন্য সম্রাটের একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকবে। এক কথায়, শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর অধীনস্থসুবিস্তৃত রাষ্ট্রকে ‘সাম্রাজ্য’ বলা হয়।

[2] অন্যভাবে বলা যায় যে, সাম্রাজ্য হল সেই ভৌগোলিক অঞ্চল, যেখানে সাম্রাজ্যবাদী নীতি কার্যকরী থাকে।
সাম্রাজ্য বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এই উপাদানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বিভিন্ন গোষ্ঠী, জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতি।
[3] রাজনৈতিক ধারণা অনুসারে, সাম্রাজ্য বলতে ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত বিভিন্ন রাজ্য ও জাতির ঐক্যবদ্ধ একক বোঝায় যেখানে শাসনকার্য পরিচালনা করে কোনো রাজতন্ত্র (সম্রাট বা সম্রাজ্ঞী)।
প্রাচীন বিশ্বের বিভিন্ন সাম্রাজ্য
[1] খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োবিংশ শতকে মহান সারাগনের নেতৃত্বে মেসোপটেমিয়ায় বৃহৎ আক্কাদীয় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত এটিই পৃথিবীর প্রথম সাম্রাজ্য।

[2] খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে প্রাচীন গ্রিসে বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল।

[3] প্রাচীন কালে বিশাল আসিরীয় সাম্রাজ্যের (২০০০-৬১২ খ্রিস্টপূর্ব) অস্তিত্ব ছিল।

[4] খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকেগ্রিসে তৃতীয় থুটমোসের নেতৃত্বে বৃহৎ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
[5] পার্সিয়া অঞ্চলে প্রথম সাম্রাজ্য ছিল মিডিয়ান সাম্রাজ্য।
[6] পরবর্তীকালে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা আকিমেনীয় সাম্রাজ্য (৫৫০- ৩৩০ খ্রিস্টপূর্ব) ছিল বিভিন্ন সংস্কৃতির সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত সুবিস্তৃত ও সফল সাম্রাজ্য। মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিসের অংশবিশেষ, থ্রেস, মধ্যপ্রাচ্য ও
মধ্য এশিয়ার বৃহদংশ আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে গিয়েছিল।
[7] খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ম্যাসিডনের অধিপতি আলেকজান্ডার গ্রিস থেকে উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। তিনি বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
[৪] পরবর্তীকালে পশ্চিমি দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীতে এক দীর্ঘকালীন ও সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য।

[9] চিনের হান সাম্রাজ্য (২০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২২০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল এক দীর্ঘকালীন সাম্রাজ্য।

[10] প্রাচীন ভারতে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সুবৃহৎ মৌর্য সাম্রাজ্য (৩২৪-১৮৭ খ্রি.পূ.) ও গুপ্ত সাম্রাজ্য (খ্রিস্টীয় ২৭৫ থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি) গড়ে ওঠে।
উপসংহার: প্রাচীন যুগ থেকে দেখা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন জনপদ, মহাজনপদ বা ক্ষুদ্র-বৃহৎ রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল করে যুগে যুগে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলির উত্থান ঘটেছিল। আবার সাম্রাজ্যবাদী
সেসব রাষ্ট্রের আয়তন বাড়তে বাড়তে ইতিহাসের নিয়মেই তার পতনের পথও প্রস্তুত হয়েছিল।

বিভিন্ন সময়ে মগধের রাজধানীগুলি ছিল গিরিব্রজ, রাজগৃহ ও পাটলিপুত্র নামক স্থানে।

মগধের মৌর্যবংশের শাসক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক রাজা বলা হয়।

মগধের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ চারটি রাজবংশের নাম হল হর্ষঙ্ক বংশ, শিশুনাগ বংশ, নন্দবংশ ও মৌর্য বংশ।

বাসসাকর, কৌটিল্য ও রাধাগুপ্ত ছিলেন যথাক্রমে অজাতশত্রু, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও অশোকের মন্ত্রী।

অজাতশত্রু যুদ্ধে ‘মহাশিলাকণ্টক’ ও ‘রথমুষল’ নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবহার করতেন।

৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কর্তৃক মগধে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ ষোড়শ মহাজনপদগুলির মধ্যে মগধের উত্থান ঘটে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আনুমানিক ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নন্দ বংশের শেষ শাসক ধননন্দকে পরাজিত করলে মগধে মৌর্য বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

জিশুখ্রিস্টের জন্মের অন্তত ৮০০ বছর পূর্বে ইউরোপের গ্রিসে ম্যাসিডনিয়ার উত্থান ঘটে। তৃতীয় অ্যামিনটাস সাম্রাজ্যকে সর্বপ্রথম সুসংহত রূপ দান করলেও পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ফিলিপ ও তৃতীয় আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যবাদী নীতির দ্বারা ম্যাসিডনিয়া একটি বৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

মৌর্য বংশের বিভিন্ন স্তূপ, গুহা স্থাপত্য ও স্তম্ভগুলি ছিল শিল্পকলার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এযুগে সাহিত্য, ছন্দ, ব্যাকরণ, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ের যথেষ্ট চর্চা হত। মৌর্য সংস্কৃতি মূলত ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল।

ম্যাসিডনীয় রাজ্যে শিল্পের কাজে বিশেষ গতি এসেছিল। কাব্য ছাড়াও ইতিহাস, জীবনকাহিনি, কল্পকাহিনি প্রভৃতি বিষয়ে প্রচুর গদ্যসাহিত্যও এযুগে রচিত হয়েছিল। এযুগে বহু বিলাসবহুল ও সুবিশাল প্রাসাদ, অট্টালিকা, সর্বজনীন ভবন, স্মৃতিস্তম্ভ প্রভৃতি নির্মিত হয়েছিল।

[1] মৌর্য ও ম্যাসিডনীয় উভয় সাম্রাজ্যই আয়তনের দিক থেকে সুবিশাল ছিল।

[2] উভয় সাম্রাজ্যেরই প্রকৃতি ছিল বংশানুক্রমিক রাজতান্ত্রিক।

[3] উভয় সাম্রাজ্যেই স্থাপত্য, শিল্পকলা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি ঘটেছিল।

মৌর্য বংশ ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মগধের সিংহাসনে বসে এবং ১৮৭ (মতান্তরে ১৮৫) খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই বংশের পতন ঘটে।

ম্যাসিডনের দুজন শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যবাদী শাসক হলেন দ্বিতীয় ফিলিপ ও তৃতীয় আলেকজান্ডার।

ক্যারানাস ম্যাসিডনীয় রাজ্যটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ম্যাসিডনিয়ার প্রথম রাজধানী ছিল পেল্লা।

গ্রিক বীর তৃতীয় আলেকজান্ডার উত্তর-পশ্চিম ভারতের সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চলে গ্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সিন্ধু ও পাঞ্জাব থেকে গ্রিকদের বিতাড়িত করেন।

সম্রাট অশোক কলিঙ্গ প্রদেশটি মগধের অন্তর্ভুক্ত করেন।
কলিঙ্গের রাজধানী ছিল তোষালি।

সিংহলে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে অশোক নিজ পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে পাঠান।

৩৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্স-সহ কয়েকটি গ্রিক নগর-রাষ্ট্র ও ম্যাসিডনের সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপের মধ্যে চেরোনিয়ার যুদ্ধ হয়েছিল।

ঝিলাম বা হিদাসপিসের যুদ্ধ ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজা পুরু ও তৃতীয় আলেকজান্ডারের মধ্যে হয়েছিল।

৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ব্যাবিলনে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়।

মৌর্য যুগের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল তক্ষশিলা, চম্পা, পাটলিপুত্র, বারাণসী, কৌশাম্বী প্রভৃতি।

মৌর্য যুগে ভারতে সাতটি জাতির অস্তিত্ব ছিল বলে মেগাস্থিনিস উল্লেখ করেছেন। এই জাতিগুলি হল— দার্শনিক, সৈনিক, পরিদর্শক, কৃষক, শিল্পী, সভাপণ্ডিত ও পশুপালক।

ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের কয়েকজন জ্যোতির্বিদ হলেন এরিস্টারকাস, হিপার্কাস প্রমুখ।

ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের দুজন উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন ইউক্লিড ও আর্কিমিডিস।

মেগাস্থিনিস ছিলেন গ্রিক রাজা সেলুকাসের দূত।
মেগাস্থিনিস ৩০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে আসেন।

ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের দুজন উল্লেখযোগ্য চিকিৎসক ছিলেন হিরোফিলাস ও ইরাসিসট্রেটস।

মৌর্য শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রাপ্তিস্থান হল কুমারহার, সাঁচী, সারনাথ, এলাহাবাদ, নন্দনগড় প্রভৃতি।

সর্বশেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে তাঁর মন্ত্রী পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ১৮৭ (মতান্তরে ১৮৫) খ্রিস্টপূর্বাব্দে মগধের সিংহাসনে বসলে মৌর্যবংশের পতন ঘটে।

ভারতে গড়ে ওঠা প্রথম সাম্রাজ্য হল মৌর্য সাম্রাজ্য।

ইউরোপে ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর এই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে সেখানে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। প্রাচীন যুগের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের এবং মধ্যযুগের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল।

৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইটালির টাইবার নদীর উপকূলে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠা হয়।

সম্রাট কনস্টানটাইন ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে বাইজানটিয়াম বা কনস্ট্যান্টিনোপল-এ রোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন।

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল রোম এবং পূর্ব রোমান
সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল বাইজানটিয়াম বা কনস্ট্যান্টিনোপল।

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার রোমান সাম্রাজ্যের সর্বাধিক সম্প্রসারণ ঘটান।

সম্রাট জুলিয়াস সিজার ৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কনসাল পদ লাভ করেন।

৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ও মিশরের রাজা ত্রয়োদশ টলেমির মধ্যে নীলনদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

"আমি এলাম, আমি দেখলাম, আমি জয় করলাম" বা "Vini, Vidi, Vici”—উক্তিটি রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের।

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার রোমান পঞ্জিকা ও ক্যালেন্ডারের সংস্কার করেন।

ব্লুটাস নামে জনৈক আততায়ী ৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করেন।

রোমান সম্রাট অক্টাভিয়াস বা অগাস্টাস সিজারের নাম অনুসারে ইংরেজি আগস্ট মাসের নামকরণ হয়।
অগাস্টাস সিজার ২৭ থেকে ১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

রোমান সমাজে জনগণ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা-
[1] প্যাট্রিসিয়ান বা অভিজাত শ্রেণি, [2] প্লেবিয়ান বা সাধারণ মানুষ  ও [3] ক্রীতদাস।

প্রাচীন রোমের আদি বাসিন্দাদের বংশধর এবং ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের ব্যক্তিরা প্যাট্রিসিয়ান নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে সমাজের সাধারণ মানুষ পরিচিত ছিল প্লেবিয়ান নামে।

৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে রোমে সবচেয়ে বড়ো দাসবিদ্রোহটি সংঘটিত হয়।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের (১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পরবর্তীকালে ভারতের কুষাণ, সাতবাহনসহ ছোটো-বড়ো বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থান ঘটে। কুষাণ ও সাতবাহন রাজ্যের পতনের পরবর্তীকালে ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে শ্রীগুপ্তের নেতৃত্বে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

গুপ্তযুগের সমাজে মানুষ চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা— ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।

প্তযুগের শেষভাগে নগরগুলির অবক্ষয়ের একটি কারণ ছিল— এযুগে শিল্প ও বাণিজ্যের অবক্ষয়ের ফলে নগরজীবনের অবক্ষয় শুরু হয়।

উচ্চবর্ণের পুরুষ ও নিম্নবর্ণের নারীর মধ্যে সংঘটিত বিবাহরীতি ‘অনুলোম’ বিবাহরীতি নামে পরিচিত।

উচ্চবর্ণের নারী ও নিম্নবর্ণের পুরুষের মধ্যে সংঘটিত বিবাহ ‘প্রতিলোম’ বিবাহরীতি নামে পরিচিত।

গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ নারী ও শূদ্র পুরুষের বিবাহজাত সন্তান ‘চণ্ডাল' নামে পরিচিত হত।

 

গুপ্তযুগে শাসকগণ পুণ্য অর্জনের জন্য ব্রাহ্মণ, পুরোহিত, মন্দির, বিহার প্রভৃতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিষ্কর জমি দান করতেন। এই প্রথা অগ্রহার বা ব্রহ্মদেয় প্রথা নামে পরিচিত।

সমুদ্রগুপ্ত উত্তর ভারত জয়ের ক্ষেত্রে যুদ্ধনীতি এবং উমূল্য নীতি গ্রহণ করেন। তিনি দক্ষিণ ভারত জয়ের ক্ষেত্রে যুদ্ধনীতি ছাড়াও গ্রহণ পরিমোক্ষ নীতি অর্থাৎ বন্দি ও মুক্তি নীতি নেন। তিনি এক্ষেত্রে সবশেষে অনুগ্রহ নীতি মেনে পরাজিত রাজাদের রাজ্য ফিরিয়ে দেন।

প্রাচীন রোমের আদি বাসিন্দারা ছিলেন প্যাট্রিসিয়ান বা অভিজাত শ্রেণি। রোমের সাধারণ মানুষরা অর্থাৎ দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, সেনা, ব্যবসায়িক প্রমুখরা ছিলেন প্লেবিয়ান। এ ছাড়াও রোমের সমাজ ব্যবস্থা একটা বড়ো অংশের মানুষ ছিল ক্রীতদাস।

গুপ্ত সমাজ চতুরাশ্রম প্রথায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র এই চারটি বর্ণে বিভক্ত ছিল। এ ছাড়াও গুপ্তযুগে পঞ্চম জাতি নামে এক অস্পৃশ্য জাতির অস্তিত্ব ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় ছিল সর্বোচ্চ মর্যাদা ও প্রতিপত্তির অধিকারী।

রোমান সমাজব্যবস্থা ছিল শ্রেণিবিভক্ত। রোমান সমাজব্যবস্থায় জনগণ প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। [1] প্যাট্রিসিয়ান বা অভিজাত শ্রেগি, [2] প্লেবিয়ান বা সাধারণ নানা স্তরভেদ ছিল।
গুপ্তযুগের সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র এই চারভাগে বিভক্ত ছিল।

রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য প্রায় ৮০০ বছর অস্তিত্বশীল ছিল। অপরদিকে রোমান সাম্রাজ্যের তুলনায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্থায়ীত্ব ছিল অনেক কম। গুপ্ত সাম্রাজ্য ২০০ বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী হয়ে

প্রাচীন রোমের শাসক অগাস্টাস রোমে এক শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগের সূচনা করেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রণীত প্রাচীন রোমান আইন Pax Romana নামে পরিচিত।

শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রণীত প্রাচীন রোমান আইন প্যাক্স রোমানা (Pax Romana) নামে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগের ইউরোপের সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে এই আইনকানুনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
এই আইনগুলির ভিত্তিতে সম্রাট জাস্টিনিয়ান পরে প্রায় ৪০০০ আইন সংবলিত ‘জাস্টিনিয়ান কোড' নামে এক আইনবিধি রচনা করেন।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করেন এবং ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন।

গুপ্ত সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীর সন্তান সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত লিচ্ছবি দৌহিত্র উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

> গুপ্তবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন সমুদ্রগুপ্ত।
> সমুদ্রগুপ্ত ৩৩৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

সমুদ্রগুপ্ত উত্তর ভারতে ৯ জন এবং দক্ষিণ ভারতে ১২ জন রাজাকে পরাজিত করেন।

সমুদ্রগুপ্ত দক্ষিণ ভারতের ১২ জন রাজাকে পরাজিত করে তাদের রাজ্য দখল করেও পরাজিত রাজাদের রাজ্য ফিরিয়ে দেন। তাঁর এই নীতি ‘গ্রহণ পরিমোক্ষ' নীতি নামে পরিচিত।

সমুদ্রগুপ্ত সীমান্তবর্তী ৫টি রাজ্য দখল করেন। এগুলি হল—[1] নেপাল, [2] কর্তৃপুর, [3] সমতট, [4] দাভক ও [5] কামরূপ ।

ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট আর্থার স্মিথ গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তকে ‘ভারতের নেপোলিয়ন' বলে অভিহিত করেছেন।

লাতিন ভাষা থেকে ইতালীয়, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, রোমান প্রভৃতি ভাষার উৎপত্তি ঘটে।

রোমান যুগের কয়েকজন খ্যাতনামা কবি ও সাহিত্যিক হলেন টেরেন্স, ভার্জিল, হোরাস প্রমুখ।

রোমান সাম্রাজ্যে চারতলা বিশিষ্ট ক্রীড়াক্ষেত্রে ৫০ হাজার দর্শক বসে গ্ল্যাডিয়েটরের যুদ্ধ, রথের দৌড় প্রভৃতি দেখতে পারত। এই ক্রীড়াক্ষেত্র অ্যাম্‌ফিথিয়েটার নামে পরিচিত।

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রোমান স্থাপত্যকর্ম হল প্যান্থিয়ন, অ্যাফিথিয়েটার বা কলোসিয়াম, ফোরাম প্রভৃতি।

রোমান যুগের কয়েকজন ভাস্কর ছিলেন আর্কিসিলোয়াস, বোথোস, স্টেটফানোস, জিনোড্রাউস প্রমুখ।

রোমান যুগের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য চিত্রকর ছিলেন ডেমিট্রিয়াস, টিমোম্যাচোস প্রমুখ।

প্রাচীন রোমের প্রধান দেবদেবী হলেন অ্যাপোলো, ডায়ানা, জুপিটার, মার্স, মারকিউরি, মিনার্ভা, ভেনাস প্রমুখ।

৩১২ (মতান্তরে ৩১৩) খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন প্রথম খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন।

রোমান সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস ৩৯১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ধর্মকে সাম্রাজ্যের বৈধধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

রোমান যুগে ক্রীতদাস ও ক্ষুধার্ত পশুর মধ্যে সংঘটিত নিষ্ঠুর লড়াই গ্ল্যাডিয়েটারের লড়াই নামে পরিচিত ছিল।

ভারতে গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয়।

গুপ্ত যুগের কয়েকজন বিখ্যাত পণ্ডিত ও দার্শনিক হলেন ঈশ্বরকৃঘ্ন, বসুবন্ধু, অসঙ্গ, গৌরপাদ, চন্দ্রগোমিন, বৌধায়ণ, দিন্নগাচার্য, ভর্তৃহরি, পাগিনি, পতঞ্জলি প্রমুখ।

বিশাখদত্ত ‘মুদ্রারাক্ষস’ এবং বিষ্ণুশর্মা ‘পঞ্চতন্ত্র' রচনা করেন।

গুপ্তযুগের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থপাত্য নিদর্শন হল মণিনাগের মন্দির, কোটেশ্বর মন্দির, তিগোয়ার বিষুমন্দির, ভূমারের শিবমন্দির, কুবীরের পার্বতীমন্দির, দেওগড়ের দশাবতার মন্দির, সাঁচি ও বুদ্ধগয়ার স্তূপ ইত্যাদি।

কনস্ট্যান্টিনোপলের বর্তমান নাম ইস্তানবুল।

ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার গুপ্তসম্রাট স্কন্দগুপ্তকে ভারতের রক্ষাকারী বলেছেন।

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে বাবর দিল্লিতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।

No Content

ওসমান ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে এশিয়ার উত্তর-পশ্চিম অংশে আনাতোলিয়ায় অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে অটোমান তুর্কি সুলতানরা তুরস্ক ও তুরস্কের বাইরে এক সুবৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর ও আফগান যোদ্ধা হিমুর মধ্যে হয়েছিল।

১১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে ওসমান তুর্কি আঙ্কারা থেকে কনস্ট্যান্টিনোপল পর্যন্ত সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। তাঁর নাম
অনুসারেই তাঁর বংশের লোকেরা অটোমান তুর্কি নামে পরিচিত হন। প্রসঙ্গত, আরবি শব্দ উথমান থেকে ওসমান শব্দটি এসেছে, যার ইংরেজি সংস্করণ হল অটোমান।

অটোমান শাসক সুলতান সুলেমান ‘আইনপ্রণেতা’ নামে পরিচিত ছিলেন।

মোগল সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মাণ করান।
→ তাজমহলের প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ ঈশা খাঁ।

তুজুক কথার অর্থ হল নিয়মকানুন।

বাবর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত ও নিহত করেন । তিনি দিল্লি ও আগ্রা দখল করে ‘বাদশাহ' উপাধি গ্রহণ করেন । এভাবে বাবরের নেতৃত্বে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়।

মোগল আমলের কয়েকজন চিত্রকর হলেন তারাচাঁদ, জগন্নাথ, বসাবন, কেসু, যশোবন্ত, আব্দুল সামাদ, সৈয়দ আলি, ফারুক বেগ প্রমুখ।

তোতাপাখির স্বর যেমন মিষ্ট, তেমনই আমির খসরুর লেখনীর ভাষাও মিষ্ট, তাই আমির খসরুকে ‘হিন্দুস্থানের তোতাপাখি' বলা হয়।

 

মোগল যুগের কয়েকজন সংগীত শিল্পী ছিলেন তানসেন, রামদাস, সুরদাস, হরিদাস, বাজবাহাদুর, বৈজু বাওরা প্রমুখ।

তুর্কি ভাষায় রচিত প্রথম উপন্যাসটি হল তাসুক-উ-তালাত ডি ফিৎনাৎ।
এটি রচনা করেন সেমসেটিন সামি।

আধুনিক তুর্কি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তেভফিক ফিকরেট।

অটোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত হস্তশিল্পী বিশারদ হলেন ইয়াকুত আল-মুসতাসিমি।

অটোমান যুগের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন হল সুলেমানীয় মসজিদ।
এর প্রধান স্থপতি ছিলেন মিমার সিনান।

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোগল সাম্রাজ্যের এবং ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়।