Chapter-3.2⇒ভাঁজ

পার্শ্বচাপের ফলে যে বক্রতলের সৃষ্টি হয় তাকে ভাঁজ বলা হয়।

যে ভাঁজের দু-পাশের বাহু সমকোণে দুদিকে হেলে থাকে এবং দুটি বাহুর দৈর্ঘ্য সমান হয়, তাকে প্রতিসম ভাঁজ বলে ।

দু-দিকের সংকোচনকারী বল সমান হলে প্রতিসম ভাঁজের সৃষ্টি হয় ৷

 

সমান পার্শ্বচাপের ফলে এই প্রকার ভাঁজের দুটি বাহুর নতি ও দৈর্ঘ্য সমান হয়।

যে ভাঁজের একদিকের বাহু বড়ো ও অন্যদিকের বাহু ছোটো হয় এবং বাহু দুটির নতি ও নতির অভিমুখ ভিন্ন ভিন্ন হয়, তাকে অপ্রতিসম ভাঁজ বলে।

যে ভাঁজের দুটি বাহুর নতির পরিমাণ সমান ও বাহু দুটি পরস্পরের সমান্তরালে একই দিকে হেলে অবস্থান করে, তাকে সমপ্রবণ ভাঁজ বলে।

সংকোচন চাপের ফলে যখন পরস্পর সমান্তরাল শিলাস্তরে স্থানীয়ভাবে বাঁকের সৃষ্টি হয়, এবং তা খুব খাড়াভাবে নত থাকে, তখন তাকে একনত ভাঁজ বলে।

যে ভাঁজের অক্ষতলের নতি ভূমির প্রায় সমান্তরাল (0°-10° র মধ্যে) তাকে শায়িত ভাঁজ বলে ।

অত্যধিক চাপের ফলে শায়িত ভাঁজের মাঝবরাবর শিলাস্তর ফেটে যায় এবং ভাঁজের একটি অংশ অন্য অংশ থেকে বিচ্যুত হয়, এই ধরনের ভাঁজকে উদ্ঘট্ট ভাঁজ বলে।

যে ভাঁজের ঊর্ধ্বভঙ্গের দুটি বাহুর নতি পরস্পরের কাছাকাছি এবং অধোভঙ্গের দুটি বাহুর নতি একে অন্যের থেকে দূরে অবস্থান করে, তাকে পাখা ভাঁজ বলে।

জুরা গঠন ক্ষয়চক্রের প্রাথমিক পর্যায়ে গড়ে ওঠে।

ভাঁজ গঠনযুক্ত অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়কার্যের ফলে অনেক সময় দেখা যায় নবীন শিলা প্রাচীন শিলা দ্বারা বেষ্টিত হয়ে অবস্থান করছে। একে বলা হয় বহিষ্ক।

অনেক সময় ক্ষয়কার্যের ফলে প্রাচীন শিলা নবীন শিলা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করলে তাকে আন্তরক বলে।

দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়কার্যের ফলে ঊর্ধ্বভঙ্গ উপত্যকারূপে এবং অধোভঙ্গ জলবিভাজিকারূপে অবস্থান করলে বৈপরীত্য ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়।

ভাজ সৃষ্টির প্রধান দুটি প্রক্রিয়া হল— (i) জ্যামিতিক বা সরণজনিত প্রক্রিয়া, (ii) সংযুক্ত পীড়নজনিত প্রক্রিয়া।

ভাঁজ-অক্ষ থেকে দুদিকে বিস্তৃত দুটি অংশ বা পার্শ্বকে ভাঁজের বাহু বলে।

শিলাস্তর বা ভাঁজের বাহু অনুভূমিক তলের সাপেক্ষে যে কোণে হেলে থাকে, তাকে নতি বলে।

শিলাস্তর অনুভূমিক তলকে বা স্তরায়ণ তলকে যে রেখা বরাবর ছেদ করে তাকে আয়াম বলে।

ভাঁজের অক্ষতল ও শিলার স্তরায়ণ তলের ছেদরেখাকে অক্ষ বলে।

শিলাস্তরে ভাঁজ পড়লে ভাঁজের যে বিন্দুতে ভাঁজের বক্রতা সবচেয়ে বেশি সেই বিন্দুকে গ্রন্থিবিন্দু বা হিঞ্জ বলে।

প্রস্থচ্ছেদ অনুযায়ী ভাঁজের সর্বোচ্চ বিন্দু শীর্ষবিন্দু এবং সর্বনিম্ন বিন্দু পাদবিন্দু নামে পরিচিত।

একটি ভাঁজের দুটি গ্রন্থিবিন্দুকে যোগ করলে যে রেখা পাওয়া যায় তাকে গ্রন্থিরেখা বলে।

ভাঁজের গ্রন্থিরেখা থেকে দুই দিকের বিস্তৃত অংশকে বাহু বলে।

শিলাস্তরের যে এলাকায় ভাঁজের বক্রতা সবচেয়ে বেশি সেই এলাকাকে গ্রন্থিবলয় বলে।

পাললিক শিলাস্তরে একটি স্তর ওপর একটি স্তরের থেকে যে তল বরাবর পৃথক থাকে সেই তলকে স্তরায়ণ তল বলে।

বিশালাকৃতি শায়িত ভাঁজ, যার দুই বাহুই অনুভূমিক থাকে, তাকে ন্যাপ বলে।

কাশ্মীর উপত্যকায় ন্যাপ দেখতে পাওয়া যায়।

পীড়ন সহ্যসীমা অতিক্রম করলে শায়িত ভাঁজের অক্ষ বরাবর চ্যুতি সৃষ্টি হয়।

সংনমন বলের প্রভাবে শিলাস্তরে ভাঁজের সৃষ্টি হয়।

ক্ষয়চক্রের শেষ পর্যায় ঊর্ধ্বভঙ্গে উপত্যকা এবং অধোভঙ্গে শৈলশিরা সৃষ্টি হয়।

ভাঁজযুক্ত শিলাস্তরের প্রাথমিক ঢাল অনুসরণ করে যে নদী প্রবাহিত হয় তাকে অনুগামী নদী বলে।

অনুগামী নদীর বিপরীত ঢালে বিপরা নদী সৃষ্টি হয় ।

 

অনুগামী নদীর পরে কোমল শিলাস্তরের আয়াম বরাবর যে নদী প্রবাহিত হয় তাকে পরবর্তী নদী বলে।

ভাঁজের উর্ধ্বভঙ্গের বাহু বরাবর লম্ব অনুগামী নদী প্রবাহিত হয়।

ভূ-আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের যে অংশ উত্থিত হয় তার পার্শ্ববর্তী অংশ অবনমিত হয়ে অবনত ভূভাগ সৃষ্টি হয় ৷

শিলাস্তরে উৎপন্ন সংনমন বল যখন সমগ্র স্তরকে ঢেকে রাখার মতো অর্থাৎ মোড়কের মতো বাঁকিয়ে দেয় তখন তাকে বাকলিং বলে।

ভূপৃষ্ঠের ওপর শিলাস্তরের উন্মুক্ত অংশটি উদ্‌ভেদ বা আউটক্রপ নামে পরিচিত।

কৃন্তনজনিত সরণের পরিমাণ শিলাস্তরের প্রান্তভাগে শূন্য এবং গ্রন্থিরেখায় সবচেয়ে বেশি হয়।

সংযুক্ত পীড়ন শিলাস্তরের আড়াআড়ি ঘটলে শিলাস্তর বলয়ের মতো মোচড় খায়, তখন তাকে বেন্ডিং বলে।

যে ভাঁজে শিলাস্তর ওপরের দিকে বেঁকে গিয়ে উত্তল ভাঁজ তৈরি হয়, তাকে ঊর্ধ্বভঙ্গ বলে।

ঊর্ধ্বভঙ্গে নবীন শিলা ভাঁজের বাইরের দিকে অবস্থান করে।

যে ভাঁজে শিলাস্তর নীচের দিকে বেঁকে গিয়ে অবতল ভাঁজের সৃষ্টি হয়, তাকে অধোভঙ্গ বলে।

অধোভঙ্গে অন্তর্মুখী নতি দেখা যায়।

অধোভঙ্গে নবীন শিলা ভাঁজের কেন্দ্রের দিকে অবস্থান করে।

রকি ও আন্দিজ পর্বত মহাদেশীয় ও সামুদ্রিক পাতের ঘর্ষণে সৃষ্ট।

পীড়নের মাত্রা শিলার প্রসারণ বা সংকোচনের নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে ফাটল সৃষ্টি হয়।

একদিকে অত্যধিক পার্শ্বচাপের ফলে ভাঁজের অক্ষতল যখন প্রায় অনুভূমিক হয়ে যায়, তখন তাকে শায়িত ভাঁজ বলে।

ভাঁজের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

শিলাস্তরে ভাঁজের গঠন বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিরূপেরও পরিবর্তন ঘটে।

1 ভঙ্গিল পর্বতের গঠন: যখন মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় পাত একে অপরের দিকে অগ্রসর হয় তখন বেশি ঘনত্বের শিলা দ্বারা গঠিত মহাসাগরীয় পাতের চাপে হালকা মহাদেশীয় পাতের প্রান্ত বেঁকে যায় ও নিম্নখাতের সৃষ্টি হয়, যাকে মহীখাত বলা হয় । এই নিম্নখাতে পলি সঞ্চিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে যখন এই দুটি পাত পরস্পর আরও এগিয়ে আসে তখন বেশি ঘনত্বের মহাসাগরীয় পাত কম ঘনত্বের মহাদেশীয় পাতের তলায় প্রবেশ করে বলে চাপ আরও বেড়ে যায়। ফলে মহীখাতে সঞ্চিত পলি ভাঁজ প্রাপ্ত হয়ে ওপরে উঠে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে। রকি আল্পস, হিমালয়-এর অন্যতম উদাহরণ।

2 নদীর প্রবাহপথ গঠন : ভাঁজযুক্ত শিলাস্তরের প্রাথমিক ঢাল অনুযায়ী অনুগামী নদী (Consequent River) এবং অনুগামী নদীর বিপরীত ঢালে বিপরা নদী (Obsequent River) গঠিত হয়। অনুগামী নদীর পরে পরবর্তী নদী (Subsequent River) গঠিত হয় এবং কোমল শিলাস্তরের আয়াম বারাবর প্রবাহিত হয়।

3 জুরা গঠন শিলাস্তর ভাঁজপ্রাপ্ত হওয়ার পর ঊর্ধ্বভঙ্গ ভাঁজে ঊর্ধ্বভঙ্গ শৈলশিরা (Anticlinal Ridge) এবং অধোভঙ্গ ভাঁজে অধোভঙ্গ উপত্যকা (Synclinal Valley) গঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডের জুরা পর্বতে এইভাবে শিলাস্তরের অভ্যন্তরীণ গঠনের সঙ্গে ওপরের ভূমিরূপ গঠিত হয়েছে। ভারতের শিবালিক পর্বত এই ধরনের গঠনের সঙ্গে ওপরের ভূমিরূপের বিশেষ মিল লক্ষ করা যায়। এজন্য পৃথিবীর যেখানে যেখানে অভ্যন্তরীণ গঠনের সঙ্গে ভূমিরূপের সুন্দর মিল লক্ষ করা যায়, সেগুলিকে জুরা গঠন ও ভূমিরূপ (Jura structure and Landform) বলা হয়। অবশ্য এই ধরনের ভূমিরূপ সাধারণত ক্ষয়চক্রের প্রথম পর্যায়ে গড়ে ওঠে।

4 বন্ধুর ভূমিরূপ গঠন : শিলাস্তরে উর্ধ্বভঙ্গধারা বা অধোভঙ্গধারা থাকলে বিরাট অঞ্চল জুড়ে বন্ধুর ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পাখা ভাঁজ, আবৃত ভাঁজ, তীক্ষ্ণ ভাঁজ, সমনতি ভাঁজ প্রভৃতি ভাঁজে বন্ধুর ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়।

5 প্রতিসম ও অপ্রতিসম শৈলশিরা গঠন: প্রতিসম ভাঁজের ওপর প্রতিসম বা সমনত শৈলশিরা এবং অপ্রতিসম ভাঁজের ওপর ভৃগু (Escarpment) আকৃতির অপ্রতিসম শৈলশিরা সৃষ্টি হয়।

6. গভীর নদী উপত্যকা গঠন : তীক্ষ্ণ ভাঁজে শিলাস্তরের নতি খুব বেশি হয় বলে গভীর নদী-উপত্যকা গড়ে উঠতে পারে।

7 শৈলশিরার অভিক্ষিপ্তাংশ গঠন: অবনত ভাঁজ থেকে শৈলশিরা বা শৈলশিরার অভিক্ষিপ্তাংশ (Spur) সৃষ্টি হতে পারে।

৪. জলবিভাজিকা গঠন: যে উচ্চভূমি দুই বা তার বেশি নদীগোষ্ঠীকে পৃথক করে, তাকে জলবিভাজিকা বলে। বাক্স
ভাঁজের ওপর জলবিভাজিকা (পর্বত, মালভূমি, শৈলশিরা) গঠিত হলে তার শীর্ষদেশ চওড়া হয়।

9 অন্যান্য ভূমিরূপ গঠন: ভূমিরূপ গঠনের ওপর ভাঁজের অন্যান্য প্রভাবগুলি হল—
1 ভাঁজগঠনযুক্ত অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়কার্যের ফলে অনেকসময় দেখা যায় নবীন শিলা প্রাচীন শিলা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করছে। একে বলা হয় বহিষ্ক (Outlier)।

2 আবার, অনেকসময় ক্ষয়কার্যের ফলে প্রাচীন শিলা নবীন শিলা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করলে তাকে আন্তরক (Inlier) বলা হয়।

3 দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়কার্যের ফলে ভূপ্রকৃতির স্বরূপ উলটে গিয়ে অর্থাৎ ঊর্ধ্বভঙ্গ উপত্যকারূপে এবং অধোভঙ্গ জলবিভাজিকারূপে অবস্থান করলে বৈপরীত্য ভূমিরূপ (Inversion of Relief) সৃষ্টি হয়।

4 ভূ-আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের যে অংশ উত্থিত হয় তার পার্শ্ববর্তী অংশ অবনমিত হয়ে অবনত ভূভাগ সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ভাঁজ সৃষ্টির প্রক্রিয়া

সাধারণত স্তরযুক্ত শিলায় ভাঁজ পড়ে। তাই, পাললিক শিলায় ভাঁজ গঠিত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় শিলাস্তর সমতল তলবিশিষ্ট। হয়। কিন্তু, যখন সমতল তলবিশিষ্ট এ জাতীয় শিলা বক্রতলে পরিবর্তিত হয় তখনই ভাঁজ গঠিত হয়।

ভাঁজ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার শ্রেণিবিন্যাস: দুটি মুখ্য দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে ভাঁজ সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ভাগ করা হয়। যেমন—

1 জ্যামিতিক বা সরণজনিত প্রক্রিয়া: শিলাস্তরে আরোপিত বল যখন গতির সঞ্চার করে ভাঁজের উৎপত্তি ঘটায়, তখন তাকে জ্যামিতিক বা সরণজনিত প্রক্রিয়া বলা হয়। শিলাস্তরে এই বল দু'ভাবে আসে। তাই, এই প্রক্রিয়াকে দু'টি উপশ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা— আনত · সরণ প্রক্রিয়া (Flexural Slip Mechanism) 2 বিষম সহজ কৃন্তন প্রক্রিয়া (Heterogeneous Simple Shear Mechanism) |

1• আনত সরণ প্রক্রিয়া: এক্ষেত্রে শিলার স্তরায়ণ তলের সমান্তরালে দুই প্রান্ত থেকে পীড়ন শুরু হয় যার মাত্রা সীমানায় সবচেয়ে বেশি হয় ও গ্রন্থির দিকে ক্রমশ কমতে কমতে গ্রন্থিরেখায় তা শূন্য হয়। সীমানায় পীড়ন বেশি কার্যকরী হওয়ায় স্তরায়ণ তল ওপরের দিকে অথবা নীচের দিকে বেঁকে যায় ও ভাঁজ প্রাপ্ত হয়। শিলাস্তরগুলিও বক্রতাকে অনুসরণ করে সমান্তরালভাবে বাইরের দিকে অথবা ভিতরের দিকে সরতে থাকে যা স্তর সমান্তরাল সরণ (layer Paralled Slip) নামে পরিচিত। একটি মোটা বইকে দুপাশ থেকে চাপ দিলে অর্থাৎ একটি মোটা বইকেভাঁজ করলে বক্রতা অনুযায়ী পাতগুলি যেভাবে সরে সরে যায় শিলাস্তরগুলিও ঠিক সেভাবে সরে যায়।

2. বিষম সহজ কৃন্তন প্রক্রিয়া: কৃন্তন প্রক্রিয়ায় ধরে নেওয়া হয় যে, শিলাস্তর স্তরায়ণ তলের সাপেক্ষে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত অদৃশ্য অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফালির সমন্বয়ে গঠিত। ফাটল বরাবর টুকরো ফালিসমূহের এদিক-ওদিক স্থানচ্যুতি বা স্খলনকে কৃন্তন (Shearing) বলে। প্রতিটি ফাটল প্রকৃতপক্ষে অতি ক্ষুদ্র চ্যুতি নির্দেশ করে। ভাঁজের উৎপত্তিতে এক্ষেত্রে পীড়ন স্তরায়ণ তলের সমান্তরালে কার্যকরী না হয়ে আড়াআড়িভাবে কার্যকরী হয়। কৃন্তন জনিত সরণের পরিমাণ শিলাস্তরের প্রান্তভাগে হয় শূন্য এবং তা গ্রন্থির দিকে ক্রমশ বাড়তে বাড়তে গ্রন্থিরেখায় সবচেয়ে বেশি হয়। তখন ওই অতি ক্ষুদ্র আড়াআড়ি ফালিগুলি শিলাস্তরের প্রায় সমান্তরালে এসে যায়। প্রান্তভাগ থেকে গ্রন্থিবিন্দু পর্যন্ত এভাবে অসমান কৃন্তনের জন্য সমতলপৃষ্ঠ বক্রতলে পরিণত হয়ে ভাঁজ সৃষ্টি করে।

2. সংযুক্ত পীড়নজনিত প্রক্রিয়া: অনুভূমিক স্তরের সাপেক্ষে পীড়ন বলের অবস্থান অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—বাকলিং ও বেন্ডিং।
1.বাকলিং: বল যখন শিলাস্তরের সমান্তরালে দু'দিক থেকে কার্যকরী হয় তখন সংনমন বল অর্থাৎ চাপ-পীড়ন (Compressive Stress) উৎপন্ন হয়। এই উৎপন্ন বল যখন সমগ্র স্তরকে ঢেকে রাখার মতো অর্থাৎ মোড়কের মতো বাঁকিয়ে দেয় তখন তাকে বলে বাকলিং (Buckling)। ঊর্ধ্ব বাকলিং-এ ঊর্ধ্বভাঁজ ও নিম্ন বাকলিং-এ অধোভাঁজ গঠিত হয়।
2.বেন্ডিং: সংযুক্ত পীড়ন যদি শিলাস্তরের আড়াআড়ি ঘটে তাহলে শিলাস্তর বলয়ের মতো মোচড় খায়, যাকে বলা হয় বেল্ডিং (Bending)। এরূপ দুভাবেও শিলা ভাঁজপ্রাপ্ত হয়।

ভাঁজ সৃষ্টির কারণ

শিলাস্তরে বিভিন্ন কারণে ভাঁজ পড়লেও পার্শ্বচাপের ফলে সৃষ্ট সংকোচন বলের প্রভাবে শিলা বেশি ভাঁজপ্রাপ্ত হয়। যে যে কারণে শিলা সংকুচিত হয় ও তাতে ভাঁজ পড়ে, তা হল—

1 মহাদেশীয় ও সামুদ্রিক পাতের ঘর্ষণ: অধঃপাত অঞ্চলে হালকা মহাদেশীয় পাতের সঙ্গে ভারী সামুদ্রিক পাতের ঘর্ষণে সং সমুদ্রের পাললিক স্তর পার্শ্বচাপে কুঞ্চিত হয়ে ভাঁজপ্রাপ্ত হয় এবং ভাঁজ বিশাল আকার ধারণ করলে ভঙ্গিল পর্বত গঠিত হয়। উদাহরণ: রকি ও আন্দিজ পর্বত।

2 দুটি মহাদেশীয় পাতের চলন বা পার্শ্বচাপ: দুটি চলমান অভিসারী মহাদেশীয় পাতের মধ্যবর্তী অগভীর সমুদ্রের পলিস্তর পার্শ্বচাপের কারণে কুঞ্চিত হয় এবং তখন পাললিক শিলায় ভাঁজ পড়ে ও ভাঁজ বড়ো আকার ধারণ করে ভঙ্গিল পর্বত গঠন করে।
উদাহরণ: উত্তরে আঙ্গারাল্যান্ড ও দক্ষিণে গন্ডোয়ানাল্যান্ডঃএই দুটি অভিসারী মহাদেশীয় পাতের মাঝখানে অবস্থিত টেথিস নামক অগভীর সমুদ্রের পাললিক শিলা ভাঁজপ্রাপ্ত হয়ে হিমালয় পর্বত সৃষ্টি হয়েছে।

3 মহীখাতে পলিসঞ্চয়ঃ ক্রমাগত পলিসঞ্চয় ও তার ভারে মহীখাত নীচের দিকে বসে গেলে দুদিক থেকে পার্শ্বচাপ বাড়তে থাকে এবং পলিস্তর ক্রমশ ভাঁজপ্রাপ্ত ও উত্থিত হতে থাকে। এর ফলে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি হয়।

4 শীতলীভবন ও সংকোচনগত তারতম্য: পৃথিবীর ভূত্বক ও এর নীচের স্তর অসমান হারে শীতলীভবন ও সংকোচনের কারণেও শিলায় ভাঁজ পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রথমে উত্তপ্ত পৃথিবীর ভূত্বকের ওপরের অংশ শীতল ও সংকুচিত হয়ে কঠিন অবস্থা লাভ করে। পরে এর নীচের অংশ শীতল ও সংকুচিত হয়। কিন্তু নীচের স্তরে যে পরিমাণ সংকোচন হয়েছিল ওপরের স্তর কঠিন থাকায় সে পরিমাণ সংকোচন হয়নি। ফলে, সংকুচিত অভ্যন্তরভাগের সঙ্গে ওপরের ত্বকের ভারসাম্য রক্ষার জন্য সংনমনের ফলে শিলায় ভাঁজ পড়ে ও ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়।

5. ম্যাগমা এবং কেলাসিত লবণের উর্ধ্বমুখী চাপ : ভূ-অভ্যন্তর থেকে ম্যাগমার ঊর্ধ্বমুখী প্রবল চাপে শিলা বক্রতা লাভ করে। এ ছাড়া, বহু প্রাচীন যুগের সঞ্চিত লবণ ভূ-অভ্যন্তরে কেলাসে পরিণত হলে, তা ওপরের দিকে চাপ দেয়। তখন শিলা বক্রতা লাভ করে।

[6] পরিচলন স্রোত: আর্থার হোমস্-এর পরিচলন স্রোত মতবাদ অনুসারে, ভূগর্ভে যেখানে দুদিক থেকে আসা দুটি নিম্নমুখী স্রোতের মিলন হয়, সেখানে প্রবল চাপে ভূত্বকে ভাঁজ সৃষ্টি হয় ৷

ন্যাপ

বিশালাকৃতি শায়িত ভাঁজ, যার দুই বাহুই অনুভূমিক থাকে, তাকে ন্যাপ (Nappe) বলে। উদ্ঘট্ট ভাঁজ অথবা শায়িত ভাঁজের ওপর অনুভূমিক চাপ খুব বেশি বেড়ে গেলে ভাঁজের মূল (root) থেকে বিশালাকৃতি শিলাদেহ ভেঙে বা আলাদা হয়ে সামনের দিকে অনেকটা দূরে গিয়ে (সাধারণত দেড় কিলোমিটারের অধিক) অবস্থান করে এবং ওখানকার স্থানীয় শিলাস্তরকে ঢেকে দেয় (কাপড়ের আবরণের মতো)। এইভাবে ন্যাপ ভাঁজের সৃষ্টি হয় (Nappe একটি ফরাসি শব্দ, এর অর্থ Table Cloth)। উদাহরণ—কাশ্মীর উপত্যকায় ন্যাপ দেখতে পাওয়া যায়।

বৈপরীত্য বা উলটানো ভূমিরূপ

ভাঁজযুক্ত শিলাস্তরের প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিরূপ হিসেবে ঊর্ধ্বভঙ্গে শৈলশিরা বা পর্বত ও অধোভঙ্গে উপত্যকা সৃষ্টি হয় । এই সময়ে ভূমিরূপের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু ক্ষয়চক্রের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিলালক্ষণজনিত কারণে পরবর্তী নদী ও লম্ব অনুগামী উপনদী ঊর্ধ্বভঙ্গে গঠিত শৈলশিরাকে অধোভঙ্গের তুলনায় অতি দ্রুত ক্ষয় করতে থাকে এবং অবশেষে ওই শৈলশিরা অংশটিতে উপত্যকা সৃষ্টি হয়। কিন্তু অধোভঙ্গে উপত্যকা সেই তুলনায় খুব কম ক্ষয় হওয়ায় এটি তখন উচ্চভূমিরূপে অবস্থান করে। ভূতাত্ত্বিক গঠনের সঙ্গে এধরনের ভূমিরূপ বিপরীত সম্পর্ক নির্দেশ ঊর্ধ্বভঙ্গে উপত্যকা ও অধোভঙ্গে উচ্চভূমি করে।
একে বৈপরীত্য বা উলটানো ভূমিরূপ (Invertion of Relief or Topography) বলা হয়।