Chapter-3.3⇒চ্যুতি

যে চ্যুতিতে চ্যুতিতল বরাবর অধোস্তূপ অপেক্ষা ঊর্ধ্বস্তূপ নীচের দিকে নেমে যায়, তাকে স্বাভাবিক চ্যুতি বা অনুলোম চ্যুতি বলে।

শিলায় অনুভূমিক টান ও অভিকর্ষজ টানের কারণে অনুলোম চ্যুতি সৃষ্টি হয়।

 

অনুলোম চ্যুতির সৃষ্টি ভূপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধির সহায়ক।

সংনমন বল খুব বেশি হলে খাড়া চ্যুতিতল বরাবর অধোস্তূপের ওপর ঊর্ধ্বস্তূপ উঠে এসে যে চ্যুতি গঠিত হয়, তাকে বিপরীত বা বিলোম চ্যুতি বলে।

অনুলোম ও বিলোম চ্যুতির একটি পার্থক্য হল—অনুলোম চ্যুতির ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বস্তূপ, অধোস্তূপ অপেক্ষা নীচে অবস্থান করে কিন্তু বিলোম চ্যুতির ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বস্তূপ অধোস্তূপের ওপর অবস্থান করে।

বিলোম চ্যুতির চ্যুতিতলের নতির পরিমাণ 45°-র কম হলে তাকে থ্রাস্ট চ্যুতি বলে।

দুটি স্বাভাবিক চ্যুতির মাঝখানের ভূভাগ বসে যাওয়ার ফলে অথবা চ্যুতিসংলগ্ন ভূমিভাগের চারপাশের অঞ্চল উঠে যাওয়ার ফলে যে নীচু ভূমিভাগ বা উপত্যকা সৃষ্টি হয়, তাকে গ্রস্ত উপত্যকা বলে।

দুটি বিপরীত চ্যুতির দ্বারা সৃষ্ট গ্রস্ত উপত্যকাকে র‍্যাম্প উপত্যকা বলে।

চ্যুতি গঠিত হলে ঊর্ধ্বস্তূপ ও অধোস্তূপের মাঝখানে যে খাড়া ঢালের দেয়াল প্রকাশিত হয় তাকে চ্যুতি ভৃগু বলে।

যে তল বা পৃষ্ঠ বরাবর শিলার খন্ডিত অংশ বা খণ্ডিত শিলাস্তূপ একে অপরকে ঘষতে ঘষতে দূরে সরে যায়, তাকে চ্যুতিতল বলে।

চ্যুতিতল এবং ভূপৃষ্ঠ যে রেখা বরাবর একে অন্যকে ছেদ করে, তাকে চ্যুতিরেখা বলে।

চ্যুতির ঊর্ধ্বক্ষেপ বা অধোক্ষেপের মধ্যে অনুভূমিক বা পাশাপাশি দূরত্ব বা ব্যবধানকে ব্যবধি বলে।

 

চ্যুতিতল বরাবর চ্যুতির দু-পাশের একই স্তরায়ণ তল বা শিলাস্তরের মধ্যে উল্লম্ব দূরত্ব বা ব্যবধানকে ক্ষেপ বলে।

চ্যুতিতল ও উল্লম্ব তলের মধ্যে উৎপন্ন কোণকে চ্যুতিকোণ বলা হয়।

চ্যুষিতলের ওপর পৃষ্ঠের শিলাস্তূপ যখন ঝুলন্ত রূপে অবস্থান করে তখন তাকে ঝুলন্ত প্রাচীর বলে।

চাতিতলের নীচের লিপকে পাদমূল প্রাচীর বলে।

চ্যুতিতল বরাবর যে ভূখণ্ডটি আপেক্ষিকভাবে অন্য ভূখণ্ড অপেক্ষা উঁচুতে অবস্থান করে তাকে ঊর্ধ্বক্ষেপ বলে।

চ্যুতিতল  বরাবর যে ভূখণ্ডটি আপেক্ষিকভাবে অন্য ভূখণ্ড অপেক্ষা নীচুতে অবস্থান করে, তাকে অধোক্ষেপ বলে।

ভূত্বকে শিলাস্তরের আপেক্ষিক স্থানান্তর সাধারণত প্রসারণ বল ও সংকোচন বলের প্রভাবে ঘটে।

সংকোচন বল ও সংনমন বলের প্রভাবে ফাটলের উৎপত্তি হয়।

 

স্বাভাবিক চ্যুতিতে উর্ধ্বস্তূপ নীচে বসে যায়।

অধিরোপণ চ্যুতির ক্ষেত্রে চ্যুতিতলের নতি 10% বা তার কম হয়।

বিলোম বা বিপরীত চ্যুতির ঝুলন্ত প্রাচীর চ্যুতিতল বরাবর ওপরে উত্থিত হয়।

চ্যুতিরেখার মধ্যবর্তী ভূমি চাপের ফলে উত্থিত হয়ে স্তূপ পর্বত বা হোস্ট সৃষ্টি করে।

দুটি স্বাভাবিক চ্যুতির মধ্যভাগ বসে যাওয়ার ফলে অথবা চ্যুতিসংলগ্ন ভূমিভাগের চারপাশের অঞ্চল উত্থিত হওয়ার ফলে অবনমিত ভূভাগ বা উপত্যকা হিসেবে গ্রস্ত উপত্যকা সৃষ্টি হয়।

চ্যুতিতল বরাবর পাদমূল প্রাচীর সর্বদা ঊর্ধ্বক্ষেপরূপে অবস্থান করলে স্বাভাবিক চ্যুতি ঘটে।

চালি বরাবর বুলন্ত প্রাচীর সর্বদা উলক্ষেপণে অবস্থান করলে বিপরীত চ্যুতি ঘটে।

দুটি তির্যক চ্যুত্তির মার্কখানের ভূমি উত্থিত হলে প্রকৃত ভূপ পর্বত সৃষ্টি হয়

নদী, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত, হিমবাহ প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন বহির্জাত শক্তির প্রভাবে চ্যুতিরেখা ভৃগু সৃষ্টি হয়।

বৈষম্যমূলক ক্ষণকার্যের ফলে সৃষ্ট চ্যুতিরেখা বরাবর ক্ষয়প্রাপ্ত আংশিক পুরাতন ভৃগু ও পরে তৈরি হওয়া নতুন ভৃগুকে একত্রে চ্যুতিরেখা তৃণু বলে।

যে পার্শ্বে প্রথম চ্যুতি ভৃগু সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষয়কাজের পরেও যদি সেই পার্শ্বে বা সেই দিকে ভৃগু অবস্থান করে, তখন তাকে পুনর্ভবা চ্যুতিরেখা ভৃগু বলে।

চ্যুতিরেখার যে পার্শ্বে প্রথমে চ্যুতি ভৃগু তৈরি ক্ষয়কাজের পরে যদি সেই পার্শ্বে বা সেই দিকে অব না করে, তার বিপরীতদিকে অবস্থান করে, তখন বলে বিপরা চ্যুতিরেখা ভৃগু বলে।

চ্যুতিরেখা ধরে কোনো ভৃগু যদি আংশিকভাবে ক্ষয়ের ও পুনরায় ভূ-আলোড়নের ফলে সৃষ্টি হয়, তখন তারে বিমিশ্র চ্যুতিরেখা ভৃগু বলে।

কোনো কারণে পলির দ্বারা চাপা পড়ে যাওয়া চ্যুতি পলির অপসারণের ফলে পুনরায় ভূপৃষ্ঠে প্রকাশিত হলে তাকে পুনরুজ্জীবিত চ্যুতি ভৃগু বলে।

ছাতি ভৃগু এবং চ্যুতিরেখা ভূগুর মধ্যে চ্যুতি দৃ অপেক্ষাকৃত নবীন।

মহীভাবক ও গিরিজনি আলোড়নের থেকে সৃষ্ট অন্তর্জাত শক্তির প্রভাবে চ্যুতি ভৃগু সৃষ্টি হয়।

স্বাভাবিক চ্যুতির ওপর নাম ‘অভিকর্ষ চ্যুতি’।

দুটি সমান্তরাল চ্যুতির মাঝখানের ভূখণ্ড উপরে উঠে হোস্ট পর্বত সৃষ্টি হয় কিন্তু দুটি তীর্যক চ্যুতির মাঝখানের উত্থিত হয়ে স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি করে।

গ্রস্ত উপত্যকা ও র‍্যাম্প উপত্যকা এক নয়, কারণ দুটি স্বাভাবিক চ্যুতির মধ্যবর্তীস্থানে প্রস্ত উপত্যকা সৃষ্টি হয় কিন্তু দুটি বিপরীত চ্যুতির মধ্যবর্তীস্থানে র‍্যাম্প উপত্যকা সৃষ্টি হয়।

চ্যুতি গঠনের সময় ঊর্ধ্বস্তূপ এবং অধোরূপ পরস্পরের গা ঘেঁষে ওঠা-নামা করলে চ্যুতিতল বরাবর ঘর্ষণের ফলে যে সরু সরু সমান্তরাল আঁচড় কাটা দাগ দেখা যায় তাকে স্লিকেনসাইড বলে।

চ্যুতিতল ও অনুভূমিক তল যে কাল্পনিক রেখা বরাবর একে ওপরকে ছেদ করে তার নাম হল চ্যুতিরেখা।

ভারতের হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলা ক্লিপের ওপর অবস্থিত।

থ্রাস্ট অঞ্চলে নদী নিম্নক্ষয়ের দ্বারা ন্যাপের প্রাচীন শিলাকে অপসারিত করে নীচের নবীন শিলাকে উন্মুক্ত করে দেয়। এইরূপ উন্মুক্ত উপত্যকাসম ভূমিরূপকে উইন্ডো বা ফেনস্টার বলে।

পশ্চিমবঙ্গের শুশুনিয়া পাহাড়ের খাড়া ঢালের পাদদেশে চ্যুতি ব্লেকসিয়া দেখা যায় ৷

পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রস্ত উপত্যকা হল পূর্ব আফ্রিকার বৃহৎ গ্রস্ত উপত্যকা' (Great Rift Valley)।

ক্রমাগত ভূ-আলোড়নের ফলে একই সঙ্গে শ্রেণিবদ্ধভাবে একাধিক স্বাভাবিক চ্যুতি সৃষ্টি হলে চ্যুতিগুলিকে দেখতে সিঁড়ির ধাপের মতো লাগে, এই ধরনের স্বাভাবিক চ্যুতিগোষ্ঠীকে সোপান চ্যুতি বলে।

থ্রাস্ট চ্যুতির চ্যুতিতলের নতি যখন 10° কিংবা আরও কম হয় এবং ঊর্ধ্বস্তূপ চ্যুতিতল বরাবর অধোস্তূপের ওপর দিয়ে বহুদূরে সরে যায়, তখন তাকে অধিরোপণ বা আবৃত চ্যুতি বলে ৷

থ্রাস্ট চ্যুতির চ্যুতিতলের নতি 10° বা তার কম হয় এবং অধোস্তূপ যদি চ্যুতিতল বরাবর ভূত্বকের আরও গভীরে জোরপূর্বক ঢুকে যায়, তখন তাকে অবরোপণ চ্যুতি বলে।

হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলা ক্লিপের ওপর অবস্থিত।

থ্রাস্ট অঞ্চলে নদী নিম্নক্ষয়ের দ্বারা ন্যাপের প্রাচীন শিলাকে অপসারিত করে নীচের নবীন শিলাকে উন্মুক্ত করে দেয়। এইরূপ উন্মুক্ত উপত্যকাসম ভূমিরূপকে উইন্ডো বা ফেনস্টার বলে।

পশ্চিমবঙ্গের শুশুনিয়া পাহাড়ের খাড়া ঢালের পাদদেশে চ্যুতি ব্রেকসিয়া দেখা যায় ৷

পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রস্ত উপত্যকা হল পূর্ব আফ্রিকার ‘বৃহৎ গ্রস্ত উপত্যকা' (Great Rift Valley)।

চ্যুতি
ভূ-আলোড়নের ফলে শিলায় যে সংনমন বলের সৃষ্টি হয়, তার প্রভাবে শিলায় সংকোচন ও পীড়ন ঘটে। অসমান সংকোচন ও তীব্ৰ পীড়নে শিলাদেহে ফাটল তৈরি হয়। ওই ফাটলের দুপাশে অনুভূমিকভাবে, উল্লম্বভাবে অথবা কৌণিকভাবে ফাটল বরাবর বা বিভঙ্গ তল (Fracture Plane) বরাবর শিলাস্তূপগুলি একে অন্যের থেকে দূরে সরে যায়। একে চ্যুতি (Fault) বলে।

চ্যুতি গঠনের প্রক্রিয়া

চ্যুতি গঠনের কতকগুলি পূর্ব শর্ত আছে। অথবা, অন্যভাবে বলা যায়, ভূত্বকে বা শিলাদেহে কতকগুলি অনুকূল অবস্থা দেখা দিলে চ্যুতি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়। সুতরাং, চ্যুতি গঠনের প্রক্রিয়া বা মেকানিজম আলোচনা করার আগে এর পূর্ব শর্তগুলি জানা । দরকার। এই পূর্ব শর্তগুলি হল—

1. ভূত্বক বা শিলাকে ভঙ্গুরতাজনিত বিকৃতিসাধনের (Brittle Deformation) অন্তর্গত হাতে হবে।

2. পীড়নের ফলে ভূত্বকে অবশ্যই কুন্ডন ফাটল (Shear Fracture) তৈরি হতে হবে।

3. ফাটল বরাবর ভূখণ্ডকে স্থানচ্যুত করতে হলে কৃত্তন পীড়নকে (r) একত্রে চাপ পীড়ন বল (Co) ঘর্ষণজনিত প্রতিরোধ শক্তির (ur) সমান অথবা বেশি হতে হবে। সুতরাং, কৃন্তন পীড়ন > চাপ পীড়ন বল + প্রতিরোধ শক্তি (T > Co + r) |

তত্ত্ব: ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ E. M. Anderson এর তত্ত্বের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের চ্যুতি ব্যাখ্যা করা হয়। তাঁর তত্ত্ব দুটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তত্ত্ব দুটি হল—

1. ভূত্বকের পীড়নজনিত অবস্থাকে সাধারণত তিনটি পরস্পর উল্লম্ব প্রধান অক্ষরেখা বরাবর অবস্থিত বলে ধরা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান পীড়ন অক্ষগুলির একটি হবে উল্লম্ব।

2. সর্বাধিক কৃত্তন তল বরাবর শিলাপতন বা শিলাচ্যুতি (Failure) ঘটবে।

ব্যাখ্যা: Anderson তিনটি প্রধান পীড়ন অক্ষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে চ্যুতি গঠনকে ব্যাখ্যা করেছেন। চাপ-পীড়ন অগুলিকে তিনি সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন, যেমন 61, 62 ও 83 যেখানে, (i) ঠ, অতি তীব্র প্রধান পীড়ন অক্ষ, (ii) 3g মাঝারি তীব্র প্রধান পীড়ন অক্ষ, (ii) 63 অল্প তীব্র প্রধান পীড়ন অক্ষ, এই তিনপ্রকার পীড়ন অক্ষের অবস্থান তথ্য সম্পর্ক অনুযায়ী মূল যে তিন ধরনের চ্যুতি গঠিত হয় তা উল্লেখ করা হল—
1. স্বাভাবিক চ্যুতি : অতি তীব্র প্রধান পীড়ন অক্ষ (61) উল্ল এবং মাঝারি ও অম্ল তীব্র প্রধান পীড়ন অক্ষ (d) ও অনুভূমিক হলে স্বাভাবিক চ্যুতি (Normal Fault) সৃষ্টি হয়।

2. আয়াম স্খলন চ্যুতি মাঝারি তাঁর প্রধান পীড়ন অক্ষ (bg) উল্লম্ব এবং অতি তীব্র ও অল্প তীব্র প্রধান পীড়ন (6) ) অনুভূমিক হলে আয়াম স্খলন চ্যুতি (Strike Slip Fault) সৃষ্টি হয় ।
3. বিপরীত চুটি: আম তীব্র প্রধান পীড়ন অক্ষ (63) উল্লম্ব হলে এবং বাকি দুটি পাঁড়ন অক্ষ (3,36) অনুভূমিক হলে স্বাভাবিকভাবেই চাপ অনুভূমিক তল বরাবর বেশি হয়। ফলে, বিপরীত চ্যুতি (Reverse Fault) সৃষ্টি হয় ।

চ্যুতির ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রকার ভূমিরূপ

চ্যুতি সৃষ্টির ফলে সরাসরি যেমন কতকগুলি ভূমিরূপের উৎপত্তি হয়, তেমনি চ্যুতির বিবর্তনের ফলেও কিছু ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় এ সম্বন্ধে নীচে আলোচনা করা হল

1. হোস্ট বা স্তূপ পর্বত: উৎপত্তিগত দিক থেকে হোস্ট ও স্তূপ পর্বত একই শ্রেণির অন্তর্গত হলেও এদের আলাদাভাবে চেনা যায়। প্রায় সমান্তরাল দুটি চ্যুতির মাঝখানের ভূখণ্ড ওপরে উঠে গিয়ে কিংবা বিস্তীর্ণ ভূভাগের চারপাশের অঞ্চল বসে গেলে যে বিস্তৃত উচ্চভূমি সৃষ্টি হয়, তাকে হোস্ট (Horst) বলা হয়। প্রথমে হোস্টের শীর্ষদেশ মালভূমির মতো চ্যাপটা হয়। কিন্তু পরে এটি নদনদীর দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পর্বতের আকার ধারণ করে। তখন একে স্তূপ পর্বত (Block Mountain) বলে। তবে দুটি তির্যক চ্যুতির মাঝখানে উত্থিত উচ্চভূমি হল প্রকৃত স্তূপ পর্বত।

2. গ্রস্ত উপত্যকা: দুটি স্বাভাবিক চ্যুতির মাঝখানের ভূভাগ বসে যাওয়ার ফলে অথবা চ্যুতিসংলগ্ন ভূমিভাগের চারপাশের অঞ্চল উঠে যাওয়ার ফলে যে নীচু ভূমিভাগ বা উপত্যকার সৃষ্টি হয় তাকে গ্রস্ত উপত্যকা (Rift Valley) বলে। দুটি বিপরীত চ্যুতির দ্বারা সৃষ্ট গ্রস্ত উপত্যকাকে র‍্যাম্প উপত্যকা বলা হয়। ভারতের নর্মদা ও তাপ্তি নদীর উপত্যকা, ইউরোপের রাইন নদীর উপত্যকা গ্রস্থ উপত্যকার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

3. চ্যুতি ভৃগু বা চ্যুতি খাড়া ঢাল: চ্যুতি গঠিত হলে ঊর্ধ্বস্তূপ ও অধোস্তূপের মাঝখানে যে খাড়া ঢালের দেয়াল প্রকাশিত হয় তাকে চ্যুতি ভৃগু (Fault Scarp) বলে। চ্যুতি গঠনের ঠিক পরেই অর্থাৎ চ্যুতি গঠনের প্রত্যক্ষ ভূমিরূপ হিসেবে চ্যুতি ভৃগু দেখা যায়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট বেসিন অঞ্চল- এর উদাহরণ।

2 চ্যুতির বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

চ্যুতিরেখা ভৃগু : চাতির ফলে অনেক সময় কঠিন শিলা ও কোমল শিলা পাশাপাশি চলে আসে। কোমল শিলা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষয় হলে চ্যুতিরেখা বরাবর নতুন করে ভৃগু সৃষ্টি হয়, কিন্তু কঠিন শিলা চ্যুতির সময়ে সৃষ্টি হওয়া চ্যুতি ভৃগু রূপে [7:06 am, 15/09/2022] Anju: রূপে দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে চ্যুতিরেখা। বরাবর বৈষম্যমূলক ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট নতুন ভৃগু ও প্রাচীন ভুগুকে একত্রে চ্যুতিরেখা ভৃগু (Fault Line Scarp) বলে। চ্যুতিরেখা ভৃগু বিভিন্ন প্রকার হয়। যথা

1. পুনর্ভবা চ্যুতিরেখা ভূগু: যে পার্শ্বে প্রথমে চ্যুতি ভৃগু সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষয়কাজের পরও যদি সেই পার্শ্বে বা সেই দিক করে ভৃগু অবস্থান করে, তখন তাকে পুনর্ভবা চ্যুতিরেখা ভৃগু (Resequent Fault Line Scarp) বলে। এক্ষেত্রে ভৃগুর দিক বা পার্শ্ব পরিবর্তন ঘটে না।

II. বিপরা চ্যুতিরেখা ভূগু: চাতিরেখার যে পার্থে প্রথমে সৃষ্টি হয়েছিল নরম শিলার উপস্থিতির জন্য যদি সেই পাশ্বটি অন্য পার্শ্ব অপেক্ষা দ্রুত ক্ষয় হয় ও অপেক্ষাকৃত
নীচে অবস্থান করে, তাহলে ভৃগুর দিক পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ ভৃগু যদি প্রথমে চ্যুতিরেখার ডানদিকে সৃষ্টি হয়। তাহলে পরবর্তীকালে এটি বাঁদিকে গঠিত হয়। একে বিপরা চ্যুতিরেখা ভৃগু (Obsequent Fault Line Scarp) বলে।

III. বিমিশ্র চ্যুতিরেখা ভৃগু: চ্যুতিরেখা ধরে কোনো ভৃগু যদি আংশিকভাবে ক্ষয়ের ফলে ও পুনরায় ভূ-আলোড়নের ফলে সৃষ্টি হয়, তাকে বিমিশ্র চ্যুতিরেখা ভৃগু (Composite Fault Line Scarp) বলে।

2. ক্লিপে কখনো-কখনো অল্প কোণবিশিষ্ট থ্রাস্টতল বরাবর ন্যাপের একটি বাহু বহু দূরে সরে গিয়ে অন্য কোনো এক যুগের শিলার ওপর অবস্থান করে। এরপর দীর্ঘকাল ধরে ন্যাপের এই অংশ ক্ষয় হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কঠিন শিলা আর ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে টুপির আকারে অন্য যুগের শিলার ওপর থেকে যায়। একে বলা হয় ক্লিপে (Klippe)। এরা পর্বতশীর্ষরূপে অবস্থান করে। যেমন: পশ্চিম হিমালয়ের সিমলা ক্লিপের ওপর হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলা অবস্থিত।

3.উইন্ডো বা ফেনস্টার: থ্রাস্ট অঞ্চলে নদী নিম্নক্ষয়ের দ্বারা ন্যাপের প্রাচীন শিলাকে অপসারিত করে এবং প্রাচীন শিলার নীচে অবস্থিত নবীন শিলাকে উন্মুক্ত করে দেয়। এভাবে উন্মুক্ত উপত্যকাসম ভূমিরূপকে উইডো (Windows) বা ফেনস্টার (Fenster) বলা হয়। শতদ্রু নদী দ্বারা উন্মুক্ত পশ্চিম হিমালয়ের শালি উইন্ডো এবং তিস্তা নদীর দ্বারা উন্মুক্ত সিকিম ইউন্ডো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

চ্যুতির গাঠনিক বা জ্যামিতিক উপাদান

চ্যুতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তার গাঠনিক বা জ্যামিতিক উপাদান দ্বারা জানা যায়। প্রধান প্রধান উপাদানগুলি হল—
বৈশিষ্ট্য: চ্যুতিগুলোর নতি থাকে ও এটি মোটামুটি সমতল বা মসৃণ হয়।

2.চ্যুতিরেখা: চ্যুতিতল এবং ভূপৃষ্ঠ যে রেখা বরাবর একে অন্যকে ছেদ করে, তাকে চ্যুতিরেখা (Fault Line) বলে।

বৈশিষ্ট্য: চাতিরেখা সরল ও বক্র হয়।

3 চিত্র আয়াম: অনুভূমিক তলের সঙ্গে চাতিতল যে কোশে হেলে থাকে, তাকে চ্যুতিতলের নতি বলে। অনুভূমিক তল ও চ্যুতিতল যে রেখা বরাবর একে অন্যকে ছেদ করে, তাকে চ্যুতির আয়াম (Strike) বলে।
বৈশিষ্ট্য: চ্যুতির নতির অভিমুখ ও পরিমাণ দুই-ই আছে এবং আয়াম সর্বদা নতি অভিমুখের সঙ্গে সমকোণে অবস্থান করে। ডিকোশ। চ্যুতিকোণ হল চাতিতলের এক কৌশিক পরিমাপ। উল্লম্ব তলের সঙ্গে চ্যুতিতল যে কোণে অবস্থান করে বা হেলে থাকে, তাকে চ্যুতিকোণ বলে।

5 ব্যবধি : চ্যুতির ঊর্ধ্বক্ষেপ ও অধোক্ষেপের মধ্যে অনুভূমিক বা পাশাপাশি দূরত্ব বা ব্যবধানকে ব্যবধি (Heave) বলে।

6. ক্ষেপ : চ্যুতিতল বরাবর চ্যুতির দু-পাশের একই স্তরায়ণ তল বা শিলাস্তরের মধ্যে উল্লম্ব দূরত্ব বা ব্যবধানকে ক্ষেপ (Throw) বলে।

7 ঝুলন্ত প্রাচীর ও পাদমূল প্রাচীর: একটি চ্যুতিতলে দুটি পৃষ্ঠ থাকে। একটি হল ওপর পৃষ্ঠ এবং অন্যটি হল তলার বা নীচের পৃষ্ঠ। চ্যুতিতলের ওপর পৃষ্ঠে যে শিলাস্তূপ অবস্থান করে, তাকে ঝুলন্ত প্রাচীর (Hanging Wall) বলে। এক্ষেত্রে মনে হয় চ্যুতিতলের ওপর থেকে শিলাস্তূপ ঝুলে রয়েছে। আবার, যে পাশের শিলাস্তূপ চ্যুতিভলের নীচের পৃষ্ঠের সঙ্গে লেগে থাকে অর্থাৎ চ্যুতিতলের নীচে অবস্থান করে, তাকে পাদমূল প্রাচীর (Foot Wall) বলে।

বৈশিষ্ট্য: চ্যুতিতল উল্লম্ব হলে ঝুলন্ত প্রাচীর বা পাদমূল প্রাচীর সৃষ্টি হয় না। একমাত্র হেলানো চ্যুতিতলের ক্ষেত্রে এদের সৃষ্টি হয়।

৪. উর্ধ্বণে ও অধোক্ষেপ: উল্লম্ব বা হেলানো চ্যুতিতলের ক্ষেত্রে স্থানচ্যুত দুটি ভূখন্ড একই উচ্চতায় অবস্থান করে না। চ্যুতিতল বরাবর যে ভূখন্ডটি আপেক্ষিকভাবে অন্য ভূখণ্ডটি অপেক্ষা উঁচুতে অবস্থান করে, তাকে উর্ধ্বক্ষেপ (Upthrow) বলে। আর যে খন্ডটি নীচুতে অবস্থান করে, তাকে অধোক্ষেপ (Downthrow) বলে।

শিলাস্তরে চ্যুতি শনাক্তকরণের উপায়।

চ্যুতির ফলে শিলাস্তরের বিচ্ছেদ দেখা যায়। শিলাস্তর একটানা বিস্তৃত না হলে চ্যুতি ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়।

1• চ্যুতি ব্রেকসিয়া, মাইকোনাইটের উপস্থিতি থেকে চ্যুতি চেনা যায়। পশ্চিমবঙ্গের শুশুনিয়া পাহাড়ের খাড়া ঢালের পাদদেশে চ্যুতি ব্লেকসিয়া দেখা যায়।

2. কোনো পাহাড়ের খাড়াতলে আঁচড় কাটা সরু সরু দাগ অর্থাৎ স্লিকেনসাইডের চিহ্ন থাকলে বুঝতে হবে এটি চ্যুতির ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

3. অপেক্ষাকৃত নবীন শিলাস্তরের ওপর প্রাচীন শিলাস্তরের অবস্থান অধিরোপণ চ্যুতির ইঙ্গিত দিতে পারে।

স্লিকেনসাইড

চ্যুতি গঠনের সময় যখন ঊর্ধ্বস্তূপ ও অধোস্তূপ পরস্পরের গা ঘেষে ওঠানামা করে, তখন চ্যুতিতলের ওপর সরু সরু সমান্তরাল ও মসৃণ আঁচড়কাটা দাগ পড়ে। এগুলিকে স্লিকেনসাইড (Slickenslide) বা ঘর্ষণরেখা বলে। শুশুনিয়া পাহাড়ের খাড়াতল বরাবর এই স্লিকেনসাইড লক্ষ করা যায়।

বৈশিষ্ট্য: এর সাহায্যে চ্যুতিকে শনাক্ত করা যায়।

চ্যুতি ভৃগু বা চ্যুতির খাড়া ঢাল-সংশ্লিষ্ট ভূমিরূপ

চ্যুতি সৃষ্টির পর চ্যুতিতল বরাবর বা চ্যুতির খাড়া ঢাল বরাবর বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ক্ষয়কাজের ফলে চ্যুতিরেখার পরিবর্তন ও বিবর্তন ঘটে। ফলে চ্যুতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন ভূমিরূপ গড়ে ওঠে। এগুলি হল— 1 চ্যুতি ভৃগু: চ্যুতি সৃষ্টির ঠিক পরেই ঊর্ধ্বস্তূপ ও অধোস্তূপের মাঝখানে যে খাড়া ঢালের দেয়াল প্রকাশিত হয়। এটি চ্যুতি গঠনের প্রত্যক্ষ ফল।

চ্যুতিরেখা ভৃগু : চ্যুতিরেখার দুপাশে কঠিন ও নরম শিলার মুখোমুখি অবস্থানের ফলে বৈষম্যমূলক ক্ষয়কাজ হয়। তখন প্রথমে সৃষ্ট ভৃগু কিছুটা হ্রাস পায় ও চ্যুতিরেখা বরাবর নতুন করে ভৃগু সৃষ্টি হয়। এভাবে চ্যুতিরেখা বরাবর ক্ষয়প্রাপ্ত আংশিক পুরাতন ভৃগু ও পরে তৈরি হওয়া নতুন ভৃগুকে একত্রে চ্যুতিরেখা ভৃগু বলে। চ্যুতিরেখা ভৃগু অনেক ধরনের হয়। যেমন—পুনর্ভবা চ্যুতিরেখা ভৃগু : যে পার্শ্বে প্রথমে চ্যুতি ভৃগু সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষয়কাজের পরও যদি সেই পার্শ্বে বা সেই দিক করে ভৃগু অবস্থান করে, তখন তাকে পুনর্ভবা চ্যুতিরেখা ভগু বলে। এক্ষেত্রে ভৃগুর দিক বা পার্শ্ব পরিবর্তন ঘটে না।

বিপরা চ্যুতিরেখা ভৃগু: চ্যুতিরেখার যে পার্শ্বে প্রথমে ভৃগুর সৃষ্টি হয়েছিল নরম শিলার উপস্থিতির জন্য যদি সেই পার্শ্বটি অন্য পার্শ্ব অপেক্ষা দ্রুত ক্ষয় হয় ও অপেক্ষাকৃত নীচে অবস্থান করে তাহলে ভৃগুর পার্শ্ব বা দিক পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ ভৃগু যদি প্রথমে চ্যুতিরেখার ডানদিকে সৃষ্টি হয়। তাহলে পরবর্তীকালে এটি বাঁদিকে গঠিত হয়। একে বিপরা চ্যুতিরেখা ভৃগু বলে।

বিমিশ্র চ্যুতিরেখা ভণু: চ্যুতিরেখা ধরে কোনো ভৃগু যদি আংশিকভাবে ক্ষয়ের ফলে ও আংশিকভাবে পুনরায় ভূ-আলোড়নের ফলে সৃষ্টি হয়, তাকে বিমিশ্র চ্যুতিরেখা ভৃগু বলে।

পুনরুজ্জীবিত চ্যুতি ভৃগু : কোনো কারণে পলির দ্বারা চাপা পড়ে যাওয়া চ্যুতিভৃগু পলির অপসারণের ফলে পুনরায় ভূপৃষ্ঠে প্রকাশিত হলে তাকে পুনরুজ্জীবিত চ্যুতি ভৃগু বলে।