Chapter -4⇒দিল্লি সুলতানি : তুর্কো-আফগান শাসন

উত্তর:

ইসলাম ধর্ম অনুসারে সমগ্র মুসলমান জগতের প্রধান ধর্মগুরু ও শাসক হলেন খলিফা। কিন্তু ক্রমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হল। ফলে একজন খলিফার পক্ষে সমস্ত অঞ্চল শাসন করা সম্ভব ছিল না, তাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শাসক শাসন করতেন। যেমন ভারতবর্ষ বা হিন্দুস্তানে শাসন করতেন সুলতানরা। আবার যখন কোনো সেনাপতি বা সুলতানের আত্মীয় সিংহাসন দখল করে নতুন সুলতান হতেন তখন তাঁর খলিফার অনুমোদন দরকার হত।

খলিকার অনুমোদন লাভ : ইলতুৎমিশ সুলতান হওয়ার পর খলিফার অনুমোদন নিয়েছিলেন। মুসলমান জগতের ধর্মগুরু বাগদাদের খলিফা অল-মুসতানসির-এর কাছ থেকে ইলতুৎমিশ ‘সুলতান-ই-আজম' (মহান সুলতান) উপাধি লাভ করেন (১২২৯ খ্রি.)।

গুৰুত্ব : ফলে মুসলিম জগতে দিল্লি সুলতানির স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় এবং দিল্লি সুলতানির গৌরব বৃদ্ধি পায়। তিনিও তাঁর মুদ্রায় নিজেকে ‘খলিফার সেনাপতি' বলে উল্লেখ করেন।

 উত্তর:

সুলতান ইলতুৎমিশ ছিলেন দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তুর্কি ভাষায় ইলতুৎমিশ' কথার অর্থ হল সাম্রাজ্যের পালনকর্তা'কুতুবউদ্দিন দিল্লিতে যে সামরিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ইলতুৎমিশ সেই সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন।

সমস্যা ও সমাধান : সিংহাসনে আরোহণের পর ইলতুৎমিশ কয়েকটি সমস্যার সম্মুখীন হন। এগুলি হল

বিদ্রোহ ও বিদ্রোহ দমন : প্রথমত, সমস্যা : মহম্মদ ঘুরির প্রতিনিধি তাজউদ্দিন ইয়ালদুজ ও নাসিরউদ্দিন কুৰাচা সুলতান ইলতুৎমিশের বিরোধিতা করেন।

সমাধান : তিনি তাজউদ্দিন ও নাসিরউদ্দিন কুবাচাকে পরাজিত করে নিজেকে কণ্টকমুক্ত করেন। দ্বিতীয়ত, সমস্যা : বাংলার শাসনকর্তা আলিমর্দান এবং রনথস্তোর,আজমির, গোয়ালিয়র প্রভৃতি অঞ্চলের শাসকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সমাধান : তিনি বাংলার শাসক আলিমর্দানকে পরাজিত করেন

সিংহাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা :

সমস্যা : ইলতুৎমিশ কুতুবউদ্দিনের ছেলে ছিলেন না, জামাই ছিলেন। তাই অনেকে তাঁকে দিল্লির সুলতান বলে মানতে চায়নি।

সমাধান : ইলতুৎমিশ অনেক উপহার পাঠিয়ে খলিফার কাছ থেকে সুলতানের বৈধতার অনুমোদন প্রার্থনা। করলেন। খলিফা দিল্লির সুলতানিতে তাঁর কর্তৃত্বকে অনুমোদন দেন।

মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ :

সমস্যা : ইলতুৎমিশের রাজত্বকালে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বীর চেঙ্গিজ খান খিবার শাসনকর্তা জালালউদ্দিন মঙ্গবরনির পশ্চাৎধাবন করে ভারত সীমান্তে উপস্থিত হন।

সমাধান : দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ইলতুংমিশ জালালউদ্দিনকে আশ্রয় না দেওয়ার ফলে চেঙ্গিজ খান ভারত ত্যাগ করে চলে যান। মোশারর

দিল্লি সুলতানিতে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা :

সমস্যা : ইলতুৎমিশ উত্তরাধিকারসূত্রে সিংহাসন পাননি।

 সমাধান : তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা যাতে সিংহাসনে বসতে পারে। তার জন্য তিনি তাঁর সুযোগ্য কন্যা রাজিয়াকে পরবর্তী সুলতান হিসেবে মনোনীত করেন। ফলে দিল্লির জনগণের মনে তিনি একটি বংশগত শাসনের ধারণা তৈরি করতে পেরেছিলেন।

 উত্তর :

রাজিয়া ছিলেন ভারতের মধ্যযুগের একমাত্র নারী যিনি দিল্লির সুলতানি সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান রাজিয়া ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শাসন পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিক নিজামি বলেছেন যে, রাজিয়া ছিলেন ইলতুৎমিশের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম।

সিংহাসন লাভ: রাজিয়ার পিতা সুলতান ইলতুৎমিশ মৃত্যুর পূর্বে রাজিয়াকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুলতানের মৃত্যুর পর দিল্লির আমির-ওমরাহরা রাজিয়ার ভাই রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসান। এর সাত মাস পর সেনাবাহিনী, অভিজাতদের একাংশ ও দিল্লির সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে রাজিয়া সিংহাসন লাভ করেন।

কৃতিত্ব : শাসনকার্য পরিচালনা, যুদ্ধবিদ্যা, প্রজাবাৎসল্য— সবদিকেই রাজিয়া কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

1.সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি বদায়ুন, মুলতান, লাহোর প্রভৃতি অঞ্চলের শাসকদের যুদ্ধে প্রাজিত করে সিন্ধুপ্রদেশ থেকে বাংলাপ্রদেশ পর্যন্ত নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। রাজিয়া

2.শাসনকার্য পরিচালনা এবং শাসনব্যবস্থায় নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। উলেমাদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি অমুসলমানদের উপর থেকে জিজিয়া কর তুলে দিয়েছিলেন।

3.তিনি পুরুষের পোশাক পরে দরবারে আসতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যের পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তিনি চল্লিশ চক্রের ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রণ করেন।

পতন : রাজিয়ার আমলে তুর্কি অভিজাতরা মনে করেন যে, রাজিয়া অ-তুর্কিদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই রাজিয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ভাতিন্ডার শাসনকর্তা আলতুনিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। রাজিয়া তার বিদ্রোহ দমন করতে এসে বন্দিনি হন। শেষ পর্যন্ত রাজিয়া আলতুনিয়াবে বিবাহ করে দিল্লি দখলের জন্য অগ্রসর হন, কিন্তু পথে তাঁর ভাই বাহরাম শাহের হাতে নিহত হন (১২৪০ খ্রি.)।

উত্তর :

দিল্লির সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুর বাহাউদ্দিন ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন বলবন নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসার পর তিনি অনেক সমস্যার সম্মুখীন হন। গিয়াসউদ্দিন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই সমস্যাগুলির সমাধানও করেন।

সমস্যা: -

1.ইলতুৎমিশের পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরাধিকারদের আমলে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় ও দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।

2.মেওয়াটি দস্যুদের উপদ্রবে দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

3.আমির-ওমরাহরা ক্ষমতালোভী ও ষড়যন্ত্রপ্রিয় হয়ে ওঠে।

4.দিল্লি সুলতানির রাজকীয় আদর্শ বিনষ্ট হয়।

5.বহিরাগত মোঙ্গলরা বারবার আক্রমণ করে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে।

সমাধান :

  1. গিয়াসউদ্দিন বলবন বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাছাউনি ও শাসনকর্তা নিয়োগ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
  2. দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলের দস্যুদের নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দমন করেন।
  3. তিনি কঠোর হাতে ক্ষমতালোভী আমির-ওমরাহদের দমন করেন এবং তাঁদের ‘চল্লিশ চক্র’ ভেঙে দেন।
  4. তিনি দরবারে সিজদা (সুলতানের সামনে নতজানু হওয়া) ও পাইবস (সম্রাটের পদযুগল চুম্বন) প্রথা চালু করেন। তিনি সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবৃত থেকে রাজোচিত গাম্ভীর্যের পরিবেশ তৈরি করেন।
  5. মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ করেন।

উত্তর:

দক্ষিণ ভারত অভিযানে আলাউদ্দিন খলজির প্রধান সেনাপতি ছিলেন মালিক কাফুর।

আলাউদ্দিনের মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা : সুলতান আলাউদ্দিন খলজির অর্থনৈতিক সংস্কারগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রবর্তন। এই ব্যবস্থার দ্বারা তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য নির্দিষ্ট করে দেন।

আলাউদ্দিন খলজির মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য :

1.সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষা করা : আলাউদ্দিন বিশাল সাম্রাজ্যের পরিচালনা, রাজ্যজয়, মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন। তিনি সেনাবাহিনীকে নগদ বেতন দিতেন (বার্ষিক ২৩৪ তঙ্কা)। সেনাদের বেতন বৃদ্ধি না করে একই বেতনে যাতে তাদের ব্যয়ভার বহন করতে অসুবিধা না হয় তার জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

2.মুদ্রাস্ফীতি রোধ : আলাউদ্দিন খলজি মুদ্রাস্ফীতি রোধ করার জন্য বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে সপ্তায় প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা।

3.জনকল্যাণ করা : জনগণ যাতে ন্যায্য মূল্যে দ্রব্যসামগ্রী পেতে পারে তার জন্য আলাউদ্দিন ব্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল না থাকলে জনগণের সুখ-শান্তি থাকে না।

উত্তর:

সিংহাসনে আরোহণের পর সুলতান আলাউদ্দিন খলজি সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে মনোনিবেশ করেন।

সামরিক সংস্কার : সুলতান আলাউদ্দিন খলজির স্বৈরতন্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি। তাই আলাউদ্দিন খলজি নগদ বেতন দিয়ে শক্তিশালী স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করেন। প্রত্যেক অশ্বারোহী সৈন্যের বেতন ছিল বছরে ২৩৪ তঙ্কা। 6. দাগ ও হুলিয়া : সেনাবাহিনীর মধ্যে দুর্নীতি দূর করার জন্য তিনি ‘দাগ’ বা অশ্ব চিহ্নিতকরণ ও ‘হুলিয়া' বা প্রত্যেক সৈন্যের দৈহিক বিবরণ লিপিবদ্ধকরণের প্রথা প্রবর্তন করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার : অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আলাউদ্দিন খলজির গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হল : 1.রাজস্ব সংস্কার ও 2.দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ।

রাজস্ব সংস্কার : তিনি সকল জমিকে ‘খালিসা’ জমিতে পরিণত করেন। তিনি জমি জরিপ করে উৎপন্ন ফসলের অর্ধাংশ রাজস্ব ধার্য করেন।

মূল্যনিয়ন্ত্রণ : সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ভারতে সর্বপ্রথম মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি খাদ্যদ্রব্য, পশু, এমনকি দাসদাসীর মূল্যও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তিনি প্রজাদের মঙ্গলের জন্য ‘রেশনিং ব্যবস্থা’ চালু করেন।

উত্তর:

আলাউদ্দিন খলজি ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান জালালউদ্দিন খলজিকে হত্যা করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।

রাজ্যজয় : উত্তর ভারত জয় :

গুজরাট জয় : ১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন খলজি সেনাপতি উলুঘ খাননসরৎ খানের নেতৃত্বে রাজা কর্ণদেবকে পরাজিত করে গুজরাট জয় করেন।

রনথম্ভোর জয় : আলাউদ্দিন খলজি রণথম্ভোরের চৌহান বংশীয় রাজা হামিরদেবকে পরাজিত করে ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে রনথম্ভোর জয় করেন।

মেবার জয় : কথিত আছে, আলাউদ্দিন মেবারের রানা রতন সিংহের পরমা সুন্দরী স্ত্রী পদ্মিনীকে লাভ করার জন্য মেবারের রাজধানী চিতোর আক্রমণ করেন।

মালব জয় : ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে মালবের রাজাকে পরাজিত ও নিহত করে উজ্জয়িনী, মাণ্ডু, চান্দেরি প্রভৃতি অঞ্চল জয় করেন।

দক্ষিণ ভারত জয় : সুলতান আলাউদ্দিন খলজির সবচেয়ে বড়ো সামরিক কৃতিত্ব হল দক্ষিণ ভারত বিজয়। সেনাপতি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে তিনি দক্ষিণ ভারতের যেসব রাজাকে পরাজিত করেছিলেন, তারা হলেন—

1.দেবগিরির যাদব বংশীয় রাজা রামচন্দ্র,

2.বরঙ্গলের কাকতীয় বংশীয় রাজা প্রতাপরুদ্র,

3. দ্বারসমুদ্রের হোয়সল রাজা তৃতীয় বিরবল্লাল প্রমুখ।

উত্তর:

সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন দিল্লির প্রথম সুলতান যিনি দাক্ষিণাত্যে সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার জন্য দাক্ষিণাত্য অভিযান করেন। এই অভিযানে আলাউদ্দিনের প্রধান সেনাপতি ছিলেন মালিক কাফুর

দাক্ষিণাত্য অভিযানের বিবরণ : আলাউদ্দিন খলজি দাক্ষিণাত্য অভিযান করেন- 1.দেবগিরি, 2.ওয়ারঙ্গল, 3. দ্বারসমুদ্র,4. পাণ্ড্য এবং আরও কয়েকটি ছোটো ছোটো রাজ্যের বিরুদ্ধে।

1.দেবগিরি: আলাউদ্দিন খলজি ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে মাণ্ডু দেবগিরি অভিযান করেন। দেবগিরিতে তখন যাদব বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন।

2.ওয়ারঙ্গল: আলাউদ্দিন খলজি দু-বার ওয়ারাল আক্রমণ করেন। প্রথমবার ১৩০২-১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে এবং দ্বিতীয়বার ১৩১১ খ্রিস্টাব্দে।

3.দ্বারসমুদ্র : আলাউদ্দিন ১৩১১ খ্রিস্টাব্দে দ্বারসমুদ্রে সামরিক অভিযান পাঠান। দ্বারসমুদ্রে হোয়সল রাজারা রাজত্ব করতেন।

4.পাণ্ড্য: ১৩১১ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন মাদুরাই-এ অভিযান পাঠান। মাদুরাই ছিল পাণ্ড্য রাজ্যের রাজধানী। ওই বছরই তিনি তাঙ্কোর আক্রমণ করেছিলেন।

উত্তর :

সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করেন।

কারণ : সুলতান আলাউদ্দিন খলজির শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। তার জন্য তিনি এক বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন। তিনি সৈন্যদের নগদ অর্থে বেতন দিতেন এবং বেতন ছিল নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তিত। ওই নির্দিষ্ট বেতনে যাতে সৈন্যরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে পারে তার জন্য বাজারের জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ করেন।

বাজারের ধরন : আলাউদ্দিন খলজির আমলে দিল্লিতে চার ধরনের বাজার ছিল- 1.মান্ডি (শস্যবাজার), 2. সেরা-আদল (কাপড়, চিনি, তেল প্রভৃতি), 3. পশুর বাজার, 4. প্রয়োজনীয় সাধারণ দ্রব্যের বাজার (শাকসবজি, মাছ)। সব বাজারেই জিনিসপত্রের দাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।

বাজার পরিদর্শক রাজকর্মচারী : বিভিন্ন ধরনের বাজার দেখাশোনা করার জন্য আলাউদ্দিন শাহানা-মান্ডি, দেওয়ান-রিয়াসৎ, বারিদ (গুপ্তচর) প্রভৃতি কর্মচারী নিযুক্ত করেন।

বাজারে সরকারি নিয়মাবলি : আলাউদ্দিনের সময় বাজারগুলিতে যে নিয়মাবলি ছিল সেগুলি হল—1. সরকারের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট দামে জিনিসপত্র বিক্রি করতে হত। বেশি দাম নিলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। 2. কোনো ব্যবসায়ী ওজনে ব্রব্যাদি কম দিলে তার দেহ থেকে সমপরিমাণ মাংস কেটে নেওয়া হত।

মতামত : আলাউদ্দিনের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বলা যায়—এটি ছিল সে যুগের বিস্ময় ও অভিনব এক প্রচেষ্টা। এর ফলে অসংখ সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। আলাউদ্দিনের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সুলতানি যুগের শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক কৃতিত্ব বলা যেতে পারে।

উত্তর:

মহম্মদ ঘুরির মৃত্যু : মহম্মদ ঘুরি ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। ,

মহম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য ভাগ : মহম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর তাঁর জয় করা অঞ্চল তাঁর অনুচরদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। তাঁর প্রধান অনুচর ছিলেন—

[1] তাজউদ্দিন ইয়ালদুজ : ইনি গজনির অধিকার পেয়েছিলেন।

[21 নাসিরউদ্দিন কুবাচা : ইনি মুলতান ও উছ-এর শাসক হয়েছিলেন।

[31 কুতুবউদ্দিন আইবক : ইনি লাহোরদিল্লির অধিকার পেয়েছিলেন।

[41 বখতিয়ার খলজি : বাংলাদেশের শাসক হন

উত্তর:

 সুলতান : কুতুবউদ্দিন আইবক ভারতে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কুতুবউদ্দিন আইবক তুর্কি ছিলেন। তুর্কি শাসকরা অনেকে সুলতান উপাধি গ্রহণ করেন। আরবি ভাষায় ‘সুলতান’ শব্দের অর্থ হল ‘কৰ্তৃত্ব’ বা ‘ক্ষমতা’।

দিল্লি সুলতানি : সুলতানি বলতে বোঝায় যে অঞ্চলে সুলতানের কর্তৃত্ব চলে। দিল্লিকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে সুলতানদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বজায় ছিল বলে কুতুবউদ্দিন প্রতিষ্ঠিত ভারতের শাসনকে 'দিল্লি সুলতানি’ বলে। দিল্লি সুলতানির শেষ শাসক ছিলেন ইব্রাহিম লোদি। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লিতে সুলতানি শাসন ছিল।

উত্তর:

 সুলতান হল একটি উপাধি। ভারতে তুর্কি শাসকদের মধ্যে অনেকে এই উপাধি ব্যবহার করতেন বা নিতেন। প্রকৃত অর্থে ‘সুলতান’ শব্দের মানে হল কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা। ভারতে দিল্লিকে কেন্দ্র করে সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কুতুবউদ্দিন আইবক।

 উত্তর:

খলিফা : হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পর ইসলাম জগতের প্রধান শাসক ছিলেন খলিফা। আবার খলিফা হলেন ইসলাম ধর্মের প্রধান ধর্মগুরু

দিল্লি সুলতানির উপর খলিফার অধিকার : খলিফা ছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামের আওতায় যত জমি ছিল তার প্রধান ও *’ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি।শাসক। দিল্লিতে ইসলাম শাসন বা সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ফলে দিল্লি সুলতানির উপরেও আদতে খলিফার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

 উত্তর:

খলিফা হলেন মুসলিম জগতের প্রধান ধর্মগুরু এবং ইসলামীয় জগতের প্রধান শাসক। ফলত, দার-উল-ইসলাম’-এর অংশ হিসেবে দিল্লি সুলতানির উপরেও খলিফারই অধিকার ছিল। তবে দিল্লির সুলতানদের সঙ্গে খলিফার সম্পর্ক ছিল আনুষ্ঠানিক। প্রকৃতপক্ষে, নিজেদের শাসনের বৈধতা লাভ, প্রজাদের কাছে নিজের কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করার জন্য তাঁরা খলিফার অনুমোদন নিতেন। তাঁরা খলিফার কাছে অনুমোদন চেয়ে নানাবিধ উপহার সামগ্রী পাঠাতেন। খলিফাও অনেকসময় সুলতানকে নানান উপাধিতে ভূষিত করতেন এবং ‘দুরবাশ’ ও ‘খিলাত’ প্রদান করতেন। তবে ফিরোজ শাহ তুঘলকের পরবর্তী সময় থেকে ভারতে খলিফার থেকে অনুমোদন চাওয়ার রীতি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

উত্তর:

ইসলাম ধর্ম অনুসারে সমগ্র মুসলমান জগতের প্রধান ধর্মগুরু ও শাসক খলিফা। কিন্তু ক্রমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হল। ফলে একজন খলিফার পক্ষে সমস্ত অঞ্চল শাসন করাও সম্ভব ছিল না, তাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জন শাসন করতেন। যেমন ভারতবর্ষ বা হিন্দুস্তানে শাসন করতেন সুলতানরা। আবার কোনো সেনাপতি বা সুলতানের কোনো আত্মীয় সিংহাসন দখল করে নতুন সুলতান হলে তখন তাঁর খলিফার অনুমোদন দরকার হত।

 অনুমোদন লাভের প্রয়োজনীয়তার কারণ :

সুলতানের স্বীকৃতি লাভ করার জন্য : খলিফা সুলতানকে স্বীকৃি দিলে তিনি সকলের কাছে স্বীকৃত হতেন

 অধিকারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য : খলিফা অনুমোদন করলে সিংহাসনে সুলতানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হত।

উত্তর:

 রাজা : রাজ্যের শাসককে ‘রাজা বলা হয়। 'রাজা' কথাটি সংস্কৃত শব্দ ‘রাজন’ থেকে এসেছে। ভারতে অমুসলমান শাসকদের রাজা বলা হত।

সম্রাট : সাম্রাজ্যের শাসককে 'সম্রাট' বলা হয়। রাজা যখন অনেক রাজ্য জয় করে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতেন তখন তিনি সম্রাট হতেন।

উত্তর :

খুতবা’ শব্দের আসল অর্থ হল ভাষণ। কোনো কোনো সুলতানের শাসনকালে মসজিদের ইমাম শুক্রবারের নামাজের পর খুতবা পাঠ করতেন। এই খুতবায় খলিফা ও সুলতানের নামের উল্লেখ থাকত।

খুতবা পাঠের উদ্দেশ্য : খুতবা পাঠের উদ্দেশ্য হল— সুলতান যে নিয়ম মেনে শাসন করছেন তা জনগণকে জানানো।

উত্তর:

 আমির : আমির শব্দের অর্থ হল উচ্চবংশের ধনী ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তবে দিল্লি সুলতানিতে শাসন কাজে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমির বলা হত।

দুরবাশ: দুরবাশ হল স্বাধীন সুলতানের প্রতীক দণ্ড। বাগদাদের খলিফা আল-মুসতানসির দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশকে দুরবাশ পাঠিয়েছিলেন।

খিলাত : খিলাত শব্দের অর্থ হল সম্মানজনক পোশাক। খলিফা ইলতুৎমিশকে খিলাত পাঠিয়েছিলেন।

উত্তর:

দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবকের মৃত্যুর পর (১২১০ খ্রি.) তাঁর জামাই ইলতুৎমিশ দিল্লির সুলতান হন। সিংহাসনে আরোহণের পর ইলতুৎমিশ প্রধান তিনটি সমস্যার সম্মুখীন হন। তাঁর তিনটি সমস্যা হল-

1.বিদ্রোহ : তাঁর আমলে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। কীভাবে সেই বিদ্রোহ দমন করা যাবে।

2.মোঙ্গল আক্রমণ : মোঙ্গলবীর চেঙ্গিজ খান তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তে উপস্থিত হয়েছিলেন। কীভাবে মোঙ্গল শক্তির মোকাবিলা করা যাবে।

3.উত্তরাধিকার বিরোধ : দিল্লি সুলতানিতে তখন নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারের নিয়ম চালু হয়নি। কীভাবে একটি রাজবংশ তৈরি করে উত্তরাধিকার সমস্যার সমাধান করা যাবে। কুতুবউদ্দিন আইবকের জামাই ইলতুৎমিশ সুলতান হওয়ার পর খলিফার অনুমোদন নিয়েছিলেন।

উত্তর:

মোঙ্গলরা ছিল মধ্য এশিয়ার এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা জাতি। সেই মোঙ্গলদের কাছ থেকে তাড়া খেয়ে খরিজমের শাসক জালালউদ্দিন মঙ্গবরনি উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবে এসে উপস্থিত হন এবং দিল্লিতে থাকার জন্য ইলতুৎমিশের কাছে সাহায্য ও অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু বিচক্ষণ ইলতুৎমিশ বুঝতে পারেন যে, মঙ্গবরনিকে আশ্রয় দিলে মোঙ্গল আক্রমণে দিল্লি বিপর্যস্ত হবে। তাই তিনি মঙ্গবরনিকে ভারত ত্যাগে বাধ্য করেন এবং দিল্লির শিশু সুলতানি সাম্রাজ্যকে মোঙ্গল আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেন।

উত্তর:

দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রথম দিকের সুলতানদের মধ্যে ইলতুৎমিশ সবচেয়ে সুদক্ষ রাজ্যবিজেতা এবং শাসক ছিলেন। তাঁর সবথেকে বড়ো কৃতিত্ব হল কুতুবউদ্দিন আইবক প্রতিষ্ঠিত শিশু সাম্রাজ্যকে মোঙ্গল আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করা এবং দিল্লিতে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসনের গোড়াপত্তন করে একটি সুবিন্যস্ত শাসনকাঠামো তৈরি করা। তিনিই প্রথম আরবীয় মুদ্রার অনুকরণে রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন করেন, যা তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক। তাই সবদিক থেকেই বলা যায়, তিনি ছিলেন দিল্লি সুলতানির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’।

উত্তর:

সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁর কন্যা রাজিয়াকে পরবর্তী সুলতান মনোনীত করেছিলেন। রাজিয়া ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির সুলতান ছিলেন। তাঁর শাসনকাল ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রথমত: দিল্লির সুলতানি শাসনে এই প্রথম ও শেষ একজন নারী দিল্লির মসনদে বসেছিলেন।

দ্বিতীয়ত : সুলতান রাজিয়ার সঙ্গে তুর্কি অভিজাতদের বিশেষত বন্দেগান-চিহলগানি'-র সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছিল। অভিজাতদের একাংশ একজন নারীর সুলতান হওয়ার বিরোধিতা করেছিল।

উত্তর:

সুলতান ইলতুৎমিশের কন্যা রাজিয়া ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সুলতান হন। তিনি ছিলেন দিল্লির মসনদে প্রথম নারী সুলতান। সুলতান রাজিয়াকে অনেকে সমর্থন করলেও অনেকে বিরোধিতা করে।

রাজিয়ার সমর্থক : সুলতান রাজিয়ার সমর্থক ছিলেন— দিল্লির সাধারণ লোক, অভিজাত ও সেনাবাহিনী।

রাজিয়ার বিরোধী : রাজিয়ার বিরোধী ছিল— অভিজাতদের একাংশ ও দিল্লির বাইরের তুর্কি অভিজাতরা, রাজিয়ার ভাই রুকনউদ্দিন ফিরোজ, উলেমা, রাজপুত শক্তি প্রভৃতি।

উত্তর:

দিল্লির সুলতানি শাসনে তুর্কি অভিজাতরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। রাজিয়ার সিংহাসনে বসার সময় থেকে তুর্কি অভিজাতরা তাঁর বিরোধিতা করেছিল।

বিরোধিতার কারণ :

1 . সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁর কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেও একজন নারীর সিংহাসনে বসা নিয়ে অভিজাতরা আপত্তি করেছিল।

2 .তুর্কি অভিজাতরা মনে করেছিল রাজিয়া অতুর্কি অভিজাতদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।